মৌটুসী পর্ব ৮
ঋতস্বিনী মাহবিশ
”চুলুই পাখি, পলাশোনা কলবে না?”
চড়ুইকে হাত-পা গুটিয়ে চুপচাপ বসে থাকতে দেখে ওর ডান দিকের ফ্রেঞ্চ বেনীটা আলতো করে ছুঁয়ে জিজ্ঞেস করল বীর।
আড়মোড়া ভেঙে সোজা হয়ে বসল চড়ুই। বলল, “এখন পড়ব না। মিস আসলে পড়ব।”
তারপর চড়ুই ব্যাগ থেকে দুটো সেন্টার ফ্রুট বের করল। একটা বীরের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে অন্যটা ছিঁড়ে মুখে পুরে নিল। বীরকে তারটা হাতে ধরে থাকতে দেখে বলল,
“বীর বন্ধু, খাচ্ছ না কেন? তুমি চুইংগাম খাও না?”
বীর সরল চোখে তাকিয়ে থেকে ছোট স্বরে বলল, “আমি ছিলতে পালি না।”
চড়ুই এবার বীরের হাত থেকে চুইংগামটা নিয়ে চটজলদি দাঁত দিয়ে র্যাপারটা ছিঁড়ে ক্যান্ডিটা বের করে দিল। বীর হাত বাড়িয়ে সেটা নিয়ে মুখে পুরে নিল। এরপর দুজন একে অপরের দিকে তাকিয়ে তাল মিলিয়ে শব্দ করে চুইংগাম চিবোতে লাগল। কিছুক্ষণ চিবানোর পর চড়ুই জিহ্বা দিয়ে একটা বাবল বানাল। তা দেখে বীর বিস্মিত কণ্ঠে বলল,
“তুমি বাবল বানাতে পালো? আমার সাফান চাচ্চুও পালে।”
চড়ুই তার বাবলটা ফাটিয়ে বীরের দিকে তাকাল। ভাবটা এমন, যেন সে পাহাড় জয় করেছে। “তুমি পারো না?”
বীর মাথা নেড়ে বলল, “না আমি পালি না। সাফান চাচ্চু বলেছে, আমাকে শিখিয়ে দিবে।”
চড়ুই এবার একটু সিনিয়রের ভাব নিল। ছোট ছোট চোখে বড়দের মতো আত্মবিশ্বাস। বীরের দিকে তাকিয়ে কিছুটা গম্ভীর গলায় বলল সে, “আচ্ছা, তুমি যখন একটু বড় হবে, আমিও শিখিয়ে দেব তোমাকে কিভাবে চুইংগাম দিয়ে বাবল বানাতে।”
বীর ও চড়ুইয়ের মিষ্টি মিষ্টি সরল কথোপকথনের মাঝেই তাদেরই ক্লাসমেট রোহান নামের একটা ছেলে বেঞ্চের সামনে এসে দাঁড়াল। ছেলেটা বয়সের তুলনায় একটু বেশিই ইঁচড়েপাকা আর চঞ্চল। রোহান প্যান্টের পকেটে দুই হাত গুঁজে, বাঁকা চোখে বীরের দিকে তাকিয়ে খ্যাশখ্যাশে গলায় জিজ্ঞেস করল, “এই যে তোতলা, তোর নামটা একবার বল তো?”
বীর বেশ সরল মনে, নিজের মতো করেই উত্তর দিল, “আযান বীল শিকদাল।”
রোহান যেন এমন সুযোগেরই অপেক্ষা করছিল। এবার মুখটা বিকৃত করে বীরের কথাটাকে বিদ্রূপের সুরে কপি করল সে, “আযান বীল শিকদার! কিসের বীল রে? নদী নালা খাল বীল? তোতলার ঘরের তোতলা!”
এতক্ষণ চুপচাপ সব দেখছিল চড়ুই। রোহানের এমন আচরণে তার ভ্রু যুগলের সন্ধিস্থলে গভীর ভাঁজ পড়ল। চোখের মণি দুটো রাগে চিকচিক করে উঠল। এই পর্যায়ে সে বিরক্ত গলায় বলল, “এই ছেলে! তুমি পচা কথা বলো কেন?”
রোহান এবার চড়ুইয়ের দিকে তাকিয়ে চিকন ঠোঁট দুটো প্রসারিত করে মনোমুগ্ধকর এক হাসি দিল। বাঁ হাত পকেট থেকে বের করে চুলে ব্যাক ব্রাশের মতো করে বলিউড বিখ্যাত শাহরুখ খানের ভাব নিয়ে বলল, “হাই কিউটি! তুমি মন খারাপ করছ কেন? তোমাকে তো বলছি না।”
”কিন্তু আমার বন্ধুকে কেন বলছ?”
”ওই তোতলা তোমার বন্ধু? কিউটি, তোমার বন্ধু হবে আমার মতো জুনিয়র কিং শাহরুখ খান! ওই তোতলা তো এখনো ফিডার খায়।”
চড়ুই ভ্রু কুঁচকে বলল, “বীর ছোট মানুষ, তাই ফিডার খায়।”
”ছোট না, পুচকো। তাও ফিডার খাওয়া তোতলা পুচকো।” বলেই খিকখিক করে হাসতে লাগল রোহান।
চড়ুই কিছু বলতে যাবে তখনই আরেকজন ছেলে দরজার কাছ থেকে রোহানের নাম ধরে ওকে ডাক দিল। রোহান চড়ুইয়ের দিকে তাকিয়ে একগাল হেসে বলল, “আচ্ছা কিউটি, থাকো। বাই! পরে দেখা হবে।”
তারপর চুলে ব্যাকব্রাশ করতে করতে বেশ ভাব নিয়ে সেদিকে হাঁটা দিল।
রোহান চলে যেতেই বীর চড়ুইকে জিজ্ঞেস করল,
“চুলুই পাখি, তুমি জানো তোতলা মানে কি?
চড়ুই তখন রোহানের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে কোনো একটা বিশেষ ভাবনায় গভীরভাবে মত্ত। তাই বীরের কথাটা গুরুত্ব দিল না। বরং বীরের মুখের সামনে তালু এগিয়ে দিয়ে বলল,
“বীর বন্ধু, তোমার মুখের চুইংগামটা আমাকে দাও।”
”কিন্তু এটা তো পঁচা হয়ে গেছে! এটা এখন ডাস্টবিনে ফেলে দিতে হবে।”
”আহহা, তুমি দাও। দেখো আমি কি করি।”
বীরও আর কোনো প্রশ্ন না করে চড়ুইয়ের কথা মতো মুখের চুইংগামটা হাত দিয়ে মুখ থেকে বের করে নিয়ে চড়ুইয়ের তালুতে রাখল। এবার চড়ুইও তার মুখেরটা থু করে রাখল সেখানে। তারপর দুইটা এক জায়গায় পিণ্ড করে উঠে রোহানের বেঞ্চের কাছে গিয়ে এদিক-ওদিক ভালো ভাবে তাকিয়ে নিল। সবাই নিজেদের নিয়ে হইচই করতে ব্যস্ত, এদিকে কারো খেয়াল নেই। এই সুযোগে চড়ুই চুপিচুপি রোহানের সিটে চুইংগামটা ভালো করে মাখিয়ে দিয়ে দ্রুত নিজের জায়গায় ফিরে এল।
এদিকে বীর একপ্রকার হাবলার মতোই তাকিয়ে আছে। চড়ুই আসতেই ওকে জিজ্ঞেস করল, “ওখানে গিয়ে কি কললে চুলুই পাখি?”
চড়ুই বীরের মুখের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“কিছু না। চুপ করে থাকো এখন কথা বলো না। একটু পর নিজেই দেখতে পারবে।”
এর কিছুক্ষণ পরই ক্লাসরুমে মিস প্রবেশ করলেন। রোহানসহ সকল বাচ্চারা দ্রুত পায়ে দৌড়ে এসে নিজেদের সিটে বসল।
রোহান বেঞ্চে বসার সাথে সাথেই তার প্যান্টের পেছনের অংশ সিটের সাথে কেমন যেন আটকে গেল। বিষয়টা বুঝতে না পেরে একটু নড়াচড়া করল সে, আর তাতে প্যান্টের কাপড়টা চুইংগামের আঠায় আরও জাঁকিয়ে বসল। রোহান ভ্রু কুঁচকে পেছনে হাত দিয়ে বোঝার চেষ্টা করল কী হয়েছে। আঙুলে আঠালো কিছু লাগতেই প্রচণ্ড বিরক্তিতে মুখটা বিকৃত করে ফেলল সে। বিব্রত হয়ে একবার ডানে, একবার বামে তাকাল।
ক্লাসের সবাই ততক্ষণে নিস্তব্ধ হয়ে বসেছে, মিস পড়া শুরু করেছেন।
রাগে অপমানে আর স্থির থাকতে পারল না রোহান। তীব্র স্বরে মিসকে ডাকতে লাগল, ক্রোধে গলাটা কাঁপছে তার।
“মিস, মিস আমার… আমার প্যান্ট বেঞ্চের সাথে আটকে গেছে। কেউ চুইংগাম দিয়ে রেখেছে!”
ক্লাসের সবাই উৎসুক হয়ে তার দিকে তাকাল। মিস অবাক হয়ে এগিয়ে এলেন। রোহানের অবস্থা দেখে তিনি ভ্রু কুঁচকে সবার উদ্দেশ্যে বললেন, “বাচ্চারা, এমন পঁচা কাজ কে করেছে হাত তোলো? এসব নোংরা কাজ করলে মিস পানিশ করবে, জানো না?”
পুরো ক্লাসে পিনপতন নীরবতা। কেউ হাত তুলছে না, কোনো কথাও বলছে না। সবাই কেবল বিস্ময় আর কৌতূহল নিয়ে তাকিয়ে আছে।
চড়ুই শান্ত হয়ে বইয়ের ওপর ঝুঁকে পড়ছে। এমনভাবে বসে আছে, যেন পৃথিবীর কোনো কিছুতেই তার কিছু যায় আসে না। কেউ দেখেনি সে কখন কী করেছে। কারো মনে বিন্দুমাত্র সন্দেহ হওয়ার কোনো সুযোগই নেই।
রোহান তৎক্ষণাৎ আঙুল উঁচিয়ে বলে উঠল, “মিস, আমি জানি কে করেছে। ওই যে, ওই তোতলা বীর!”
চড়ুই এবার বই থেকে মুখ তুলে নিষ্পাপ চোখে চেয়ে বলল, “না মিস, বীর করে নি। ও তো এখানেই আমার পাশেই চুপ করে বসে ছিল।”
মিস আর কিছু বলল না। শুধু শুধু একজনের কথায় সন্দেহের বশে একটা বাচ্চাকে বকাবকি করা অনুচিত। এছাড়া ছোট ছোট বাচ্চারা এমন একটু আধটু দুষ্টুমি করবেই। তাই জন্য তো আর তাদের পানিশ করা যাবে না, বুঝিয়ে বলতে হবে। এই জন্যই স্কুল শিক্ষকদের খুবই ধৈর্যশীল হতে হয়। মিস রোহানকে ফ্রেশ করাতে তাকে নিয়ে কমন রুমে চলে গেল।
প্রথম ক্লাস শেষে আজ আবারো নীতি এল চড়ুইদের ক্লাসে। হাতে বড়সড় একটা চকলেটের বাক্স। বীরকে খুঁজে নিয়ে হাসিমুখে ওর দিকে এগিয়ে এল। চকলেটের বাক্সটা দিয়ে মিষ্টি মিষ্টি কয়েকটা কথা বলল, আদরও করল। বীর বরাবরের মতোই গুড বয় হয়ে সায় জানাচ্ছে। আজ আর বীরের পাশে বসে থাকা চড়ুইকে দৃষ্টি এড়াল না নীতির। খানিক অবাক হয়েই জিজ্ঞেস করল,
“তুমি চড়ুই না?”
চড়ুই ওপর-নিচ মাথা নাড়িয়ে বলল,
“হ্যাঁ।”
”এখানে ভর্তি হয়েছ বুঝি?”
চড়ুই আবারও মাথা নাড়িয়ে সায় দিল।
“হ্যাঁ।”
এবার তাচ্ছিল্যের ভাবে ঠোঁটের ডান কোণটা মৃদু প্রসারিত হয়ে উঠল নীতির। তবে বাহ্যিক অভিব্যক্তি স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করে কেবল ছোট করে বলল, “ভালোই!”
নীতি চলে গেলে বীর চকলেটের বাক্সটা খুলল। দুই হাতের তালু ভরে চকলেট নিয়ে চড়ুইয়ের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, “চলুই পাখি, নাও।”
চড়ুই তাকাল চকলেটগুলোর দিকে। বলল, “এগুলো তো তোমার চকলেট, বীর। নীতি মিস তোমাকে দিয়েছে, আমি কেন নেব?”
বীর সরল গলায় বলল, “তোমাকেও দিয়েছে, আমাদেল দুজনকেই দিয়েছে।”
”না, তোমার হাতে দিয়েছে মানে শুধু তোমাকেই দিয়েছে। এগুলো আমি নিলে মাম্মা বকা দিবে আমাকে। এগুলো তুমি খাও। আমি মাম্মাকে বলব আমাকে কিনে দিতে। তখন আমি খাব।”
স্কুলের পুরো সময়টা খুব ভালোভাবেই কাটল বীর আর চড়ুইয়ের। বোরাক আজ বীরকে রিসিভ করতে আসেনি। আসেনি বললে ভুল, সম্ভব হয়নি।
সাফওয়ান বীরের হাত ধরে স্কুলের মেইন গেটের কাছে দাঁড়িয়ে আছে।
মৌটুসী আর চড়ুইয়ের থেকে বিদায় নিয়ে গাড়ির দিকে পা বাড়াল তারা। তখনই নীতি এসে দাঁড়াল তাদের সামনে। বীরের দিকে তাকিয়ে মিষ্টি হেসে জিজ্ঞেস করল, “বীর, তোমার বাবা আজ আসেনি?”
বীর দুদিকে মাথা নাড়িয়ে না বুঝাল।
নীতি এবার বীরের হাত ধরে রাখা সাফওয়ানের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল,
“হাই, আমি বোরাকের ফ্রেন্ড, এবং বীরের মিস।”
সাফওয়ান সৌজন্যমূলক হেসে বলল,
“হ্যালো আপু, আমি বীরের চাচ্চু।”
”আমার জানামতে বোরাকের দুজন ছোট বোন আছে, কিন্তু ভাই!”
সাফওয়ান এবার মৃদু হেসে ভেঙে বলল নিজের আসল পরিচয়,
“আমি আযান আঙ্কেলের ম্যানেজারের ছেলে।”
”অহ! আচ্ছা।”
বীরের মন খারাপ, কারণ কাল শুক্রবার, স্কুলের অফ ডে। তার চড়ুই পাখির সাথে দেখা হবে না। ওকে মন খারাপ করে বসে থাকতে দেখে সাফওয়ান ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল,
“বীর, মন খারাপ করো না চাচ্চু। কালকের দিন পরেই তো আবার স্কুলে আসব আমরা। তখন আবার তোমার চড়ুই পাখির সাথে দেখা হবে।”
”তাহলে বলো কালকে তুমি কাজ কলবে না, শুধু আমাল সাথে খেলবে।”
সাফওয়ান হাসল। বলল,
“আচ্ছা চাচ্চু। কালকে সারাদিন আমি তোমার সাথে খেলব। কোনো কাজ করব না। কেউ কাজ কোনো করতে বললে, বলব, আজকে আমি বীরের পার্সোনাল অ্যাসিস্ট্যান্ট। তার ছাড়া আর কারো হুকুম মানব না।”
হঠাৎ সাফওয়ানের মনে হলো মৌটুসীর নাম্বারটা নিয়ে রাখা উচিত ছিল তার। তাহলে বীরের বেশি মন খারাপ হলে কল দিয়ে চড়ুইয়ের সাথে কথা বলিয়ে দেওয়া যেত। এবার দেখা হলে সর্বপ্রথম নাম্বারটাই নিতে হবে।
বিকেলের দিকে বোরাক বীর, আশা আর ভূবনকে নিয়ে বাইরে বের হলো। শিশু পার্ক থেকে ঘুরে রেস্টুরেন্টে খাওয়াদাওয়া করে বাড়িতে এল তারা। বাইরে থেকে ঘুরে এসে বীরের মন এখন বেশ ফুরফুরে। বোরাকের বেড রুমের মেঝেতে বেবি ম্যাটের উপর বসে বীর আর টাইটান গাড়ি নিয়ে খেলায় মত্ত। আর বোরাক পাশের সোফাতেই বসে ল্যাপটপে কাজ করছে আর মাঝে মাঝে চোখ তুলে বীরকে লক্ষ্য করছে।
খেলতে খেলতে হঠাৎ বীর চিৎকার করে উঠল, “উফ, উফ পাপা!”
বোরাক ল্যাপটপে ডুবে ছিল, ছেলের আর্তনাদে চমকে উঠল সে। ল্যাপটপটা একপ্রকার ছুঁড়ে দিয়ে হন্তদন্ত হয়ে দৌড়ে এল বীরের কাছে। অস্থির গলায় জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে বাবা? কোথায় ব্যথা পেয়েছ? দেখি পাপাকে দেখাও!”
বীরের চোখে অশ্রু চিকচিক করছে। আঙুল দিয়ে পা দেখিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলল, “পাপা, এখানে… এখানে অনেক ব্যথা পেয়েছি।”
বোরাক ঝুঁকে দেখল, বীরের ফর্সা চামড়ায় লালচে দাগ হয়ে আছে। পায়ের কাছেই একটা বিষ পিঁপড়ে দাপাদাপি করছে। খেলনাগুলোর মাঝেই হয়তো কোনোভাবে লুকিয়ে ছিল। বোরাক দ্রুত হাত বাড়িয়ে পিঁপড়াটাকে মারতে যাবে, তখনই নিষ্পাপ বীর কাঁদতে কাঁদতেই বলে উঠল, “পাপা, ওকে মেলো না! ব্যথা পাবে। মেলো না।”
বোরাক ছেলের কথায় আর মারল না পিঁপড়াটাকে। হাতে তুলে তাড়াতাড়ি করে জানালা দিয়ে ফেলে দিয়ে এসে বীরকে কোলে তুলে সোফায় বসল। কামড়ের জায়গাটা লালচে হয়ে একটা ছোট গোটার মতো উঠেছে। বোরাক সেখানে আলতো করে তার জিভের ডগা ছুঁইয়ে লালা লাগিয়ে দিল। ক্রমাগত ফুঁ দিতে লাগল সেখানে। বীরের কান্না কিছুটা কমল, এবার পাপার বুকে মুখ গুঁজে চুপচাপ বসে রইল সে। বোরাক ছেলের মাথায় আদুরে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে এটা ওটা বলছে,
“দুষ্টু পিঁপড়াটা আমার কলিজাকে কিভাবে ব্যথা দিয়েছে বাবা……”
”অর্ডার ক্যানসেল মানে? কথা ভেবে বলছেন?”
ফোনের ওপাশ থেকে কাস্টমারের মিনমিনে স্বরে উত্তর ভেসে এল,
“জ্বি আপু। কেকটা নেওয়া কোনোভাবেই সম্ভব হচ্ছে না। আমরা যেই প্রোগ্রামের জন্য কেক অর্ডার করেছিলাম তা ক্যানসেল হয়ে গিয়েছে।”
”আমার কেক বানানো অলরেডি ডান। ক্রিমও রেডি। এখন ডেকোরেশন করতে বসব, আর এই সময় আপনারা এসে বলছেন অর্ডার ক্যানসেল! মগের মুল্লুক? এসব এখন আমি কি করব? এত বড় কেক বানানোর খরচ কেমন কোনো আইডিয়া আছে? আপনারা কেক নিবেন না ভালো কথা, আমাকে আমার খরচের টাকাটা আমাকে দিয়ে দিন।”
”টু টু টু”, ওপাশ থেকে কল কাটার শব্দ। বুঝতে পেরে মৌটুসী এক মুহূর্ত স্থির হয়ে রইল। পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিয়ে রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে আবার সেই নাম্বারে ডায়াল করল সে। কিন্তু কানে এলো যান্ত্রিক কণ্ঠস্বর— ‘আপনার কাঙ্ক্ষিত নাম্বারটি বর্তমানে বন্ধ আছে’।
মৌটুসী কান থেকে ফোন সরিয়ে তা বিছানায় ছুড়ে মেরে ঘরময় পায়চারী করতে লাগল। রাগে থরথর করে শরীর কাঁপছে তার।
“পাঁচ পাউন্ডের কেক! এটা কি কোনো ছোটখাটো বিষয়?” একবার দাঁড়িয়ে বিড়বিড় করে উঠল মৌটুসী। কেক বেকিং থেকে শুরু করে হুইপ ক্রিম ব্লেন্ড করা পর্যন্ত— সবই শেষ, এখন কেবল ডেকোরেশনটা বাকি। আর শেষ মুহূর্তে কাস্টমার ফোন করে বলছে তারা কেকটা নেবে না। তাহলে কেমন লাগে? পাঁচ পাউন্ডের একটা চকলেট কেক তৈরি করতে কি কম ডিম, ময়দা, চিনি, চকলেট লেগেছে! এখন সে কি করবে এটাকে? রাতের মাঝে তো কোনো অর্ডার আসারও কোনো সম্ভাবনা নেই।
মৌটুসী বিছানার ওপর বসে মাথার চুল খামচে ধরল, নিজের ওপরই রাগ হচ্ছে, সে কেন মানবিকতা দেখিয়ে ক্যাশ অন ডেলিভারির ওপর এত ভরসা করতে গেল? প্রিপেইড হলে কি এই শেষ সময়ে অর্ডার ক্যানসেল করতে পারত? মানুষ এতটা অমানবিক হয় কি করে? দুপুরের অর্ডার রাতে ক্যানসেল করে!
মৌটুসী মনে মনে কানে ধরল, এবার থেকে আর ফুল ক্যাশ অন ডেলিভারির ধারে কাছে যাবে না, হাফ অ্যাডভান্স হাতে পাওয়ার পরই অর্ডার কনফার্ম করবে সে।
এদিকে ল্যাপটপের কাজ শেষে এবার ফোনটা হাতে নিল বোরাক। ফেসবুকে ঢুকে স্ক্রল করতে করতে নিউজ ফিডে আসা একটা চকলেট কেকের ওপর নজর আটকে গেল ওর, কেকটার ডেকোরেশনটা খুবই সুন্দর আর লোভনীয়। বীরের চকলেট পেস্ট্রি ভীষণ পছন্দের, আর বাড়িতে এখন আশা ও ভূবনও আছে। সব মিলিয়ে এমন একটা চকলেট কেক অর্ডার দিলে বিষয়টা মন্দ হয় না। সবাই মিলে কাটলে বীর বেশ খুশি হবে। যেই ভাবনা সেই কাজ, মৌ’স কেক হাউস নামক পেইজটার প্রোফাইলে ঢুকল সে। বায়োতেই কন্টাক্ট নাম্বার দেওয়া আছে। সেই নাম্বারে সরাসরি কল দিল বোরাক।
মৌটুসী কপালের ওপর হাত ভাঁজ করে রেখে বিছানার ওপর সটাং হয়ে শুয়ে আছে। তার পাশেই চড়ুই বসে রং পেন্সিল দিয়ে নিজের মতো আঁকিবুঁকি করছে খাতায়। এমন সময় ফোনের রিংটোন বেজে উঠল। চড়ুই দৌড়ে নেমে গিয়ে টেবিলের ওপর থেকে ফোনটা নিয়ে এসে মৌটুসীকে দিল,
“মাম্মা, তোমার ফোন।”
মৌটুসী হাতে নিল ফোনটা। স্ক্রিনে অপরিচিত একটা নাম্বার দেখে ফোনটা ধরে খানিক গম্ভীর স্বরে বলল, “হ্যালো!”
ওপাশ থেকে পুরুষালি ভারী তবে বিনয়ী কণ্ঠস্বর,
“মৌ’স কেক হাউস থেকে বলছেন?”
কাস্টমারের ফোন বুঝতে পেরে মৌটুসী উঠে বসল। স্বাভাবিক সুন্দর গলায় বলল,
“জি ভাইয়া। বলুন কিভাবে সাহায্য করতে পারি?”
”একটা চকলেট কেকের অর্ডার করার ছিল। আপনাদের অর্ডার কি এভেইলেবল?”
”জি, অবশ্যই। কত পাউন্ড এবং ডেকোরেশন ডিজাইন কেমন চাইছেন, বলুন প্লিজ।”
”তিন, তিন পাউন্ড। আর ডিজাইন আপনার পেইজের লেটেস্ট পোস্টের ছবির মতো হলে ভালো হয়। আপনি কি আগামীকালের মধ্যে ডেলিভারি দিতে পারবেন?”
”হ্যাঁ, সমস্যা নেই। আমি কাল সকালেই আপনার ডেলিভারি পৌঁছে দেব, আপনার ঠিকানাটা প্লিজ সেন্ড করবেন। আর অর্ডারের অর্ধেক টাকা আপনাকে অ্যাডভান্স পেমেন্ট করতে হবে।”
”ওকে, টোটাল প্রাইজ?”
”তিন পাউন্ড চকলেট কেক আমরা পনেরো শ রাখি।”
”আচ্ছা আমি হাফ পেমেন্ট করে দিচ্ছি, এই নাম্বারেই তো না?”
”জি, এই নাম্বারেই বিকাশ করা যাবে।”
”আর পারলে আপনি প্লিজ কেকের চারপাশে যেকোনো কয়েকটা চকলেট অ্যাড করে দিবেন। আমি চকলেটের দাম আলাদা করেই পে করব।”
”জি, সমস্যা নেই। আর কেকে কি বিশেষ কোনো লেখা দিব?”
”উমমম! না, কিছু লেখার দরকার নেই।”
”ঠিক আছে।”
কান থেকে ফোনটা নামিয়ে একটা গভীর শ্বাস টেনে নিল মৌটুসী। ফোনের ওপারের মানুষটার সাথে কথা বলে ওর ভেতরের চাপা রাগটা একটু থিতু হয়ে এসেছে যেমন। মৌটুসীর মনে হলো, মানুষটার কথাবার্তা সাধারণ মার্জিত হলেও, কণ্ঠস্বর যেন একটু অদ্ভুত, একটু অসাধারণ।
পৃথিবীতে সত্যিই কিছু মানুষ থাকে, যাদের সাথে দু-চারটে অতি সাধারণ কথা বললেও মনে হয় পাহাড়সমান চাপ হালকা হয়ে গেছে। তাদের কণ্ঠে এক অন্যরকম জাদু থাকে, সে হোক পুরুষ অথবা নারী! তাদের দুটো সাবলীল-মার্জিত কথাও মৌনতার নাশক হিসেবে কাজ করে।
মৌটুসী পর্ব ৭
মোবাইলে একটা মৃদু ‘টুং’ শব্দ হলে মৌটুসী ফোনটা তুলে নিল। বিকাশে টাকা ঢোকার কনফার্মেশন এসএমএস—সেই সাথে একটা ঠিকানা।
আড়মোড়া ভেঙে এবার উঠে দাঁড়াল মৌটুসী। পাঁচ পাউন্ডের কেকটা মেপে তিন পাউন্ড করে কেটে নিল। আর বাকি অংশগুলো দিয়ে ছোট ছোট কয়েকটা কাপ কেক বানাবে ভাবল।
