মৌটুসী পর্ব ৯
ঋতস্বিনী মাহবিশ
রাতের গভীরতা বাড়ছে। জানালার বাইরে বাগানের মাটি থেকে ঝিঁঝিঁ পোকার মৃদু ডাক ভেসে আসছে। নীরবতা নেমেছে বোরাকের মাস্টার বেডরুমে। বোরাকের প্রশস্ত বুকের ওপর উপুড় হয়ে শুয়ে আছে বীর, বোরাকের একটা হাত আলতো করে ওকে জড়িয়ে রেখেছে, অন্য হাত বীরের চুলের ভাঁজে। ছোট্ট বীর এখন বাবার উষ্ণতায় নিশ্চিন্ত।
হঠাৎ বীর তার ছোট মাথাটা উঁচু করল। বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে অদ্ভুত এক প্রশ্ন করে বসল সে, “পাপা, তোতলা মানে কী?”
বোরাক এক মুহূর্তের জন্য চমকাল, থমকাল। ভ্রূ জোড়া কুঁচকে এলো তার। তার অবুঝ ছোট্ট ছেলেটার মুখে এই প্রশ্ন অনাকাঙ্ক্ষিত! বোরাক এবার সাবধানে বীরকে বুক নামিয়ে বাহুর ওপর শুইয়ে দিল। ছেলের নিষ্পাপ মুখের দিকে তাকিয়ে অবাক স্বরে জিজ্ঞেস করল, “এই কথা তুমি কোথায় শিখেছ পাপা? কেউ বলেছে তোমাকে?”
“পাপা স্কুলেল একটা বন্ধু আমাকে তোতলা বলেছে।” এরপর একে একে আজকে স্কুলে ঘটে যাওয়া সকল ঘটনা খুলে বলল, চড়ুই কীভাবে রোহানকে পানিশ করেছে তাও বলল। বলেই আবার নিজেই ঠোঁট চেপে হাসল।
সব শুনে বোরাক স্তব্ধ বনে গেল। তার ছেলেটার বয়সই বা কত? পাঁচই তো পূর্ণ হয়নি এখনো। কথা বলার সময় তার ‘র’ বা ‘ঢ়’-এর মতো অক্ষরগুলো উচ্চারণ করতে গিয়ে জিভ জড়িয়ে ‘ল’ হয়ে যায়। বোরাক এটাকে এতদিন খুব স্বাভাবিকভাবেই নিয়েছিল। ভেবেছিল বয়স বাড়ার সাথে সাথে সময়ের নিয়মেই হয়তো সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু না, এখন এটাকে কেবল সময়ের ওপরই ছেড়ে দিয়ে হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকলে হবে না।
ছেলেটা এখন স্কুলে যাচ্ছে, বাইরের জগতের মানুষের সাথে মিশছে। বড়রা হয়তো বাচ্চার এই ছোট্ট ত্রুটিটুকু বুঝবে, কিন্তু সমবয়সীরা তো তা বুঝবে না। আজকে একজন তাকে তোতলা বলেছে, কালকে আরো একজন বলবে। যখন বীর এর সত্যিকারের মানে বুঝতে পারবে তখন নিশ্চয়ই খুব কষ্ট পাবে, নিজেকে ছোট ও সীমাবদ্ধ মনে করবে। আর এমন কিছু হওয়ার আগেই তাকে এর একটা কার্যকর সমাধান বের করতে হবে, অন্তত চেষ্টা তো করতে হবেই।
বোরাক ছেলেকে বিষয়টা অন্যভাবে বোঝাল। বলল, “তোতলা একটা পঁচা কথা বাবা। এগুলো পঁচা বাচ্চারা বলে। তোমার বন্ধু ব্যাড বয়, তাই বলেছে। ব্যাড বয়রা এমন অনেক পঁচা পঁচা কথা বলে, তাদের কথায় তুমি মন খারাপ করবে না। কানে না নিয়ে চুপ করে থাকবে, সেখান থেকে চলে আসবে, তাহলে তারা বিরক্ত হয়ে আর বলবে না।”
বীর বোরাকের খোঁচা খোঁচা দাড়িযুক্ত গালে হাত ছুঁইয়ে সায় দিল। “ওকে পাপা। চুলুই পাখিকেও বলব চুপ কলে থাকতে। ওলা পঁচা।”
বেলা আটটা। শিকদার ম্যানশনের গেটের ওপর এসে পড়েছে। মৌটুসী ঠিকানা অনুসরণ করে কাঙ্ক্ষিত গেটের সামনে এসে বাইক দাঁড় করাল। হেলমেট খুলে চুলের পনিটেলে একবার হাত বুলিয়ে সামনে তাকাল সে। বিশাল গেট, ভেতরে ছায়াঘেরা বাগান, কিন্তু আশেপাশে কেউ নেই। মৌটুসী এগিয়ে গিয়ে লোহার গেটের সরু ফাঁকগুলো দিয়ে ভেতরে উঁকি দিল একবার, কিন্তু বাগানটা ছাড়া আর কিছুই চোখে পড়ল না। ঘড়ির দিকে তাকাল সে—আটটা বেজে পাঁচ। অগত্যা পকেট থেকে ফোনটা বের করে কালকের সেই নম্বরে কল করল।
রিং হতে হতে কয়েক সেকেন্ড সময় নিল। কলটা কেটে যাওয়ার একেবারে আগ মুহূর্তে রিসিভ হলো তা।
“হ্যালো!”
ওপাশ থেকে ভেসে এল ঘুম জড়ানো এক ভারী কণ্ঠস্বর—যেন গভীর ঘুমের ঘোরেই বিরক্ত ভঙ্গিতে কল রিসিভ করেছেন অজ্ঞাত সেই ব্যক্তি।
এদিকে ফোনের এপাশে মৌটুসী পুরো স্তব্ধ বনে রইল। হ্যালো! এই একটা শব্দই তাকে থমকে দিল। এ কেমন কণ্ঠস্বর? কোনো এক সম্মোহনী আকর্ষণ মুহূর্তের মধ্যে মৌটুসীর সমস্ত চিন্তা আচ্ছন্ন করে ফেলল। পাল্টা কিছু বলার ভাষা হারিয়েছে সে।
মৌটুসীর সাড়া না পেয়ে ওপাশ থেকে আবারো ভেসে এল,
“হ্যালো, কে বলছেন? হ্যালো! কেউ আছেন কি?
ইশ! একেকটা শব্দ মৌটুসীর বুকে এসে বিঁধছে যেন। একটা মানুষের ঘুম জড়ানো কণ্ঠস্বর এতটা সুন্দর হয় কীভাবে? মূল কথা এত মাদকতামিশ্রিত! অসম্ভব ভারী, তবে খ্যাঁশখ্যাঁশে নয়। এই সংবেদনশীল পুরুষালি স্বরকে ব্যাখ্যা করা অসম্ভব। নিজের অজান্তেই মৌটুসীর কোমল নারী মন মোহাচ্ছন্ন হয়ে উঠল। ফাঁকা একটা ঢোক গিলে মরুভূমির মতো প্রখর হয়ে ওঠা গলাটা ভিজিয়ে নিল সে। তার অবচেতন হৃদয় আবারো সেই কণ্ঠ শোনার অপেক্ষায়। কিন্তু বেশ খানিকক্ষণ পেরিয়ে গেলেও ওপাশ থেকে কোনো কথা না আসায় এবার হুট করেই মৌটুসীর ঘোর ছুটে গেল। ঘোর থেকে বেরিয়ে বাস্তবে ফিরে আসতেই চট করে কান থেকে ফোন নামিয়ে দেখল, কল কেটে দিয়েছে।
এবার নিজের আচরণের ওপরই নিজের লজ্জা হতে লাগল মৌটুসীর। একটা অচেনা মানুষের কণ্ঠস্বর শুনে সে কিনা এভাবে বিভোর হয়ে রইল? ছিঃ! মৌটুসী বিরক্তিতে কপাল চাপড়ে মনে মনে বিড়বিড় করে উঠল, “অহ মৌ! অহ! কী করছিস তুই? এতক্ষণ কী ভাবছিলি? ধুর!”
মৌটুসী অপ্রস্তুত হয়ে দুই হাতে মুখটা একবার মুছে নিল। এতক্ষণ আগে ঘটে যাওয়া সকল ঘটনা মাথা থেকে মুছে ফেলে আমার কল লিস্টে ঢুকল সে। আবেগকে প্রশ্রয় দিয়ে এভাবে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে লজ্জা পেলে তো আর ডেলিভারি দেওয়া হবে না! এবার আর দ্বিধা নয়, বরং পেশাদারিত্ব বজায় রাখার তাগিদে আবার ডায়াল করল। একদিকে রিং হচ্ছে অন্যদিকে মৌটুসী নিজের মনকে শক্ত করছে। কিছুক্ষণ রিং হওয়ার পর ওপাশ থেকে কলটা রিসিভ হলো। অপরপক্ষকে কিছু বলতে না দিয়ে সে নিজেই প্রথমে স্পষ্ট গলায় বলে উঠল, “আসসালামু আলাইকুম, ভাইয়া। আমি মৌ’স কেক হাউস থেকে বলছি।”
”ওয়ালাইকুম আসসালাম। জি, বলুন।”
এবার স্বরটা আগের চেয়ে অনেকটাই সজাগ, স্বাভাবিক।
মৌটুসী দম ফেলে স্বাভাবিক হয়ে বলল,
“আসলে আমি আপনার গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। ডেলিভারিটা রিসিভ করে নিলে ভালো হতো।”
”অহ আচ্ছা আচ্ছা। আপনি প্লিজ আরেকটু ওয়েট করুন।”
মৌটুসী কেকের বাক্স হাতে দাঁড়িয়ে। তার অগোচরেই ভেতরে অজানা একটা চাপা উত্তেজনা কাজ করছে—যার কণ্ঠস্বর এমন মাদকতাময়, যার প্রতিটি শব্দে একটা আভিজাত্য মিশে থাকে, সে মানুষটা দেখতে কেমন হবে? হয়তো ভীষণ পরিপাটি, কথার মতোই আভিজাত্যপূর্ণ ব্যক্তিত্বের অধিকারী! উত্তেজনার পারদ নিয়ন্ত্রণ করার জন্য সে বারবার গায়ে জড়ানো চাদরের পাড়টা ঠিক করে নিচ্ছে। এমন ছেলেমানুষীর কোনো মানেই হয় না মৌটুসীর কাছে। তবুও অবাধ্য বুকের ভেতরের ধুকপুকানিটা থামছেই না। মৌটুসী সান্ত্বনা দিল নিজেকে, হয়তো তেমন কিছু না, কেবল কৌতুহল থেকেই এই উত্তেজনা!
অথচ এই শীতের সকালে মৌটুসীর কল্পনাতে এক বালতি ঠান্ডা পানি ঢেলে দিয়ে গেট খুলে এক মাঝবয়েসী লোক বেরিয়ে এল। পরনে লুঙ্গি আর জ্যাকেট। চোখে এখনো ঘুমের আবেশ লেপ্টে আছে, মুখভর্তি অবিন্যস্ত দাড়ি আর এলোমেলো চুল।
মৌটুসী বড় বড় চোখে সেদিকে তাকিয়ে। তার চোখের পলক পড়ছে না। মাথা থেকে পা পর্যন্ত স্ক্যান করা শেষ। তার কাঙ্ক্ষিত কণ্ঠের মালিক কি তবে এই অনাকাঙ্ক্ষিত মানুষটাই? হতেই পারে। অসম্ভব তো কিছু না। এই জন্যই বলে কারো সম্পর্কে অল্প জেনেই তাকে কল্পনা করা যায় না। আবার বাহ্যিক রূপ দেখেও তাকে নিয়ে মন্তব্য করা উচিত না।
লোকটি আড়চোখে মৌটুসীর দিকে তাকিয়ে এক গাল হাই তুলে অস্পষ্ট স্বরে বলল, “আপনি কি কেক লয়ে আইসেন?”
লোকটার কথা শুনে মৌটুসী আরেক দফা চমকাল। সাথে স্বস্তিও পেল বুঝি! লোকটির উচ্চারণের ধরন, স্বরের টান—সবকিছুই একদম সাধারণ, আঞ্চলিক। এটি কোনোভাবেই ফোনের সেই মাদকতাময়, গভীর আভিজাত্যে ভরা কণ্ঠস্বর নয়। এবার সে নিশ্চিত, এই মানুষটি সেই ব্যক্তি নন।
তবে মৌটুসী নিজের ওপরই চরম বিরক্ত। কেন সে এত কল্পনাপ্রবণ হয়ে উঠছে? কেন একটা কণ্ঠস্বর তাকে এতটা প্রভাবিত করছে?
মৌটুসী দীর্ঘশ্বাস ফেলে কেকের বক্সটি বাড়িয়ে ধরল। লোকটা আলসেমি করে বক্সটা হাতে নিল। জিজ্ঞেস করল, “আর কতো পাইতেন?”
”বাকি আটশো টাকা।”
লোকটি জ্যাকেটের পকেট থেকে খসখসে কিছু নোট বের করতে করতে বলল, “আইচ্ছা, দিতাছি।”
দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে মৌটুসীর নজর গেল সামনের খোলা গেটটার দিকে। গেট খোলা থাকায় ভেতরে থাকা অফ-হোয়াইট রঙের বিশাল ট্রিপ্লেক্স বাড়িটা সরাসরি দৃশ্যমান। মৌটুসী বেশ অবাক হলো, ছোটখাটো কোনো রাজপ্রাসাদের চেয়ে কোনো অংশে কম নয় বাড়িটা। এত সুন্দর বাড়িও তাদের রাজশাহীতে আছে?
এবার আরেকটু ভালো করে তাকাতেই মৌটুসীর চোখ জোড়া বিস্ময়ে বড় বড় হয়ে গেল। গেটের ওপর বড় বড় অক্ষরে লেখা—‘শিকদার ম্যানশন’। বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল তার। সে কি তবে খোদ শিকদার বাড়িতে ডেলিভারি দিতে এসেছে? রাজশাহী অঞ্চলে শিকদার বংশকে চেনে না, এমন মানুষ মেলা ভার। এলাকার অন্যতম আভিজাত্যপূর্ণ এবং প্রভাবশালী বংশ হিসেবে তাদের খ্যাতি অনেক পুরোনো। এমনকি প্রাক্তন মেয়র আযান উদ্দিন শিকদারও ছিলেন এই বংশেরই একজন। মানুষ আজও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে, তিনি কী অসাধারণ দক্ষতার সঙ্গে পুরো পৌরসভাকে নিয়ন্ত্রণ করতেন! ভদ্রলোকের মৃত্যুর পর থেকে সেই শৃঙ্খলা আর শান্তির দেখা যেন আর মেলেই না শহরে।
সে কিনা এই শিকদার বাড়িরই একজনকে এতক্ষণ কল্পনা করেছে? তার কণ্ঠের ওপর ক্রাশ খেয়ে বসে আছে! হায় হায়! সেই ব্যক্তি যদি একবার সেই খবর জানতে পারেন, তবে তার গর্দান নিয়ে ছাড়বেন। আল্লাহ!
তখনই সামনের লোকটা টাকা এগিয়ে ধরল তার দিকে।
“এই ন্যান, আপনার বাকি টেকা।”
মৌটুসী চোখ সরিয়ে টাকাগুলোর দিকে তাকাল। খপ করে সেগুলো নিয়ে কোনো গুনাগুনিই ছাড়া ব্যাগে ঢুকিয়ে নিয়েই বাইকের কাছে ফিরে এল। এখান থেকে পালাতে পারলেই বাঁচে সে। এসব জায়গা তাদের জন্য নয়।
বেলা ইতিমধ্যেই সাড়ে আটটা। আজকে শুক্রবার হওয়ায় নিয়ম ভেঙে এতক্ষণ ঘুমিয়েছে বোরাক। বিছানা ছেড়ে উঠে মেঝেতে কয়েকবার পুশআপ দিয়ে শরীরের আড়মোড়া ভাবটা কাটিয়ে নিল সে। তারপর ওয়াশরুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে এসে বীরকেও উঠিয়ে ফ্রেশ করিয়ে আনল।
এরপর বাবা-ছেলে আর টাইটান নিচে নেমে এল। আশা আর একজন পরিচর্যাকারী টেবিলে নাস্তা সাজাচ্ছে। সারা ডাইনিংয়ে গরম গরম খিচুড়ির মৌ মৌ গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে।
কাছে আসতেই বীর বাবার কোল থেকে ফুপুমনির দিকে হাত বাড়িয়ে দিল। “গুড মর্নিং, ফুপুমনি!” বীরের মিষ্টি কণ্ঠস্বর শুনে আশা মুচকি হেসে তাকে কোলে তুলে নিল। বীরের গালে চুমু খেয়ে বলল, “গুড মর্নিং সোনা। আমার বাবাটার ঘুম ভেঙেছে?”
তারপর বোরাকের দিকে তাকিয়ে বলল, “শুভ সকাল ভাইয়া।”
বোরাক চেয়ার টেনে বসতে বসতে বলল, “শুভ সকাল! ভুবন কোথায়?”
”ঘুমাচ্ছে ভাইয়া। ভোরে উঠে জ্বালাতে শুরু করেছিল। একটু আগে আবার ঘুমাল।”
”তুইও ভুবনের সাথে একটু রেস্ট করে নিতে পারতি!”
”রেস্ট করতে গেলে নাস্তা বানাত কে?”
”তুই না থাকলে নাস্তা তৈরি হয় না?”
”হয় তো, কেন হবে না? কিন্তু কী তৈরি হয় তা-ও জানি। এই জন্যই পার্মানেন্ট সলিউশন বের করতে চাচ্ছি।”
বোরাক প্রসঙ্গ পাল্টে জিজ্ঞেস করল, “কেক পেয়েছিস?”
”অ হ্যাঁ, আলম চাচা দিতে গেল। তুমি অর্ডার করেছিলে?”
”হুম।”
”যাক ভালোই হলো। গোল্লাছুটের দলবল আসছে আজকে, সবাই মিলে কাটা হবে।”
“কখন আসবে ওরা?”
“বিকেলের দিকে।রাতে এখানে খাবে।”
”আচ্ছা, বাজার লাগবে কোনো?”
না, মাছ মাংস সবই আছে। তারপরও কিছু লাগলে আমি আলম চাচাকে দিয়ে আনাব।”
“আরোয়া ওঠেনি?”
”না, মহারানির ছুটির দিন না আজকে?”
”ডেকে দে ওকে। কথা আছে।”
আশা বীরকে কোলে নিয়েই আরোয়াকে ডাকতে তার ঘরের দিকে চলে গেল। এদিকে বোরাক একটি বাটিতে কিছুটা ক্যাটফুড নিয়ে টাইটানের সামনে রাখল। টাইটান খুশিতে ‘মেও মেও’ করে ধন্যবাদ জানিয়ে তার ব্রেকফাস্ট শুরু করে দিল। এরপর বোরাক বীরের নাশতার জন্য টেবিলের ফলের ঝুড়ি থেকে একটি কলা, আপেল, কিছু লাল আঙুর এবং স্ট্রবেরি নিল। সেগুলো ছোট ছোট টুকরো করে কেটে তার সাথে তিন-চার চামচ ইয়োগার্ট মিশিয়ে নাড়াচাড়া করে নিল। ব্যস, তৈরি হয়ে গেল বীরের নাস্তা, ফ্রুট ইয়োগার্ট। বীর এই খাবারটা ভীষণ পছন্দ করে, তাই প্রায় প্রতিদিনই সকালে এটাই তার নাশতার মেনু।
আরোয়াকে ডেকে দিয়ে ফিরে এল আশা। বীরকে বোরাকের পাশের চেয়ারে বসিয়ে দিয়ে রান্নাঘরে চলে গেল। বোরাক চামচে করে ফ্রুট ইয়োগার্ট নিয়ে বীরের মুখের সামনে ধরতেই বীর নাক সিটকে পেছনে সরে গেল।
”পাপা, আমি ফ্লুট খাব না। ওই যে ওই খিচুলি খাব!” খিচুড়ির বাটির দিকে আঙুল তাক করে বলল বীর।
আশা বলল,
“বীর বাবা তুমি খিচুড়ি খেতে পারবে না। খিচুড়ি অনেক ঝাল।”
”ঝালই খাব।”
বোরাক বলল,
“পাপা জেদ করে না। তুমি ঝাল খেতে পারবে না।”
বীর নাছোড়বান্দা, ”না, পালব। খিচুলি দাও।”
অগত্যা ছেলের জেদের কাছে হার মেনে বোরাক অল্প একটু খিচুড়ি চামচে নিয়ে বীরকে খাইয়ে দিল। কিন্তু বীরের জিহ্বা তো ঝাল খাবারের সাথে একেবারেই অভ্যস্ত নয়। মুখে দেওয়া মাত্রই জ্বালায় অস্থির হয়ে বীর “ঝাল ঝাল” বলে মুখ থেকে সবটুকু খিচুড়ি বোরাকের হাতের তালুতে উগলে দিল। আশা হাসতে হাসতে তাড়াতাড়ি করে পানি খাইয়ে দিল ওকে। বলল, “নাও এবার! খিচুড়ি তো বীর খেতে পারল না। তাহলে এখন কী খাবে?”
বীর পানি খেয়ে মুখ কাঁচুমাচু করে বলল, “খুচিলি অনেক ঝাল, বীল ফ্লুটই খাবে।”
বোরাক মৃদু হেসে ফ্রুট ইয়োগার্ট খাওয়াতে লাগল ছেলেকে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই আরোয়া এসে উপস্থিত হলো টেবিলে।
“গুড মর্নিং ভাইয়া, আপু।”
”গুড মর্নিং।”
“গুড মর্নিং। বস।”
বীরও মিষ্টি স্বরে ডেকে উঠল, “গুড মলনিং ফুপুমনি!”
”আমার বাবাটা!” আরোয়া মুচকি হেসে বীরের গাল টেনে দিয়ে আশার পাশের চেয়ারটাতে গিয়ে বসল।
খাওয়ার একপর্যায়ে বোরাক আরোয়াকে উদ্দেশ্য করে জিজ্ঞেস করল,
“ভার্সিটি কেমন চলছে?”
”ভালো ভাইয়া।”
”ইনকোর্সের ডেট দিয়েছে নাকি?”
”না, দেয় নি। তবে মার্চের প্রথম সপ্তাহেই শুরু হতে পারে।”
”আচ্ছা ভালো। বর্তমানে যেই ফ্রেন্ড সার্কেলে আছিস সেখান থেকে বেরিয়ে আসবি।”
আরোয়ার হাত থেমে গেল। অবাক হয়ে বলল, “ভাইয়া, বুঝলাম না।”
”যেই বন্ধুমহলের সাথে চলাফেরা করছিস, তাদের সাথে আর চলবি না।”
”কেন ভাইয়া, কোনো সমস্যা?”
”অনেক সমস্যা। আমার কানে যেন না আসে আবার তাদের সাথে মিশছিস তুই।”
আশা এবার মুখ খুলল,
“এত বড় ফ্রেন্ড সার্কেল দিয়ে কী করবি? দুই-একটা বিশ্বস্ত বেস্ট ফ্রেন্ড থাকবে, যাদের সাথে সব শেয়ার করা যাবে—তাতেই তো যথেষ্ট! আমরাও তো পড়াশোনা করেছি, আমার জীবনে বান্ধবী বলতে ওই দুইটাই। সেই হাইস্কুল থেকে আজ পর্যন্ত, একটাও বাড়েনি, কমেনি।”
মৌটুসী পর্ব ৮
আরোয়া কিছুটা বিরক্ত হয়েই বলল, “আপু, তোমাদের সময় আর আমাদের সময় আলাদা। আমরা দুটো আলাদা জেনারেশন। তাই আমার সবক্ষেত্রে তোমার জীবনের যুক্তি কার্যকর হবে না।”
বোরাক বলল,
“বন্ধু-বান্ধব খারাপ জিনিস না। তবে বন্ধু নির্বাচনে সচেতন থাকতে হবে। বাইরে চোখ-কান খোলা রেখে চলতে হবে। যত ভালো বন্ধুই হোক না কেন অন্ধবিশ্বাস করা যাবে না কাউকেই।”
