Home মৌটুসী মৌটুসী পর্ব ১০

মৌটুসী পর্ব ১০

মৌটুসী পর্ব ১০
ঋতস্বিনী মাহবিশ

​মৌটুসী ফেরার সময় বাজার হয়ে এল। একটা মুরগি, দুই কেজি মাছ, এক খাঁচা ডিমসহ আরো প্রয়োজনীয় কিছু বাজার সদাই করে নিল। বাজারে আজ অনেক ভিড়, চাকরিজীবীদের এই ছুটির দিনেই বাজারের কাজটা এগিয়ে রাখতে হয় কি-না! বাড়িতে ঢুকতেই আঙিনায় লালবানু বেগমকে দেখে উনার হাতে বাজারের ব্যাগ ধরিয়ে দিয়ে বলল,
“বাজারগুলা বের করো আম্মা। মাছ-মুরগি আছে, আমি এসে কাটতেছি।”
​ভদ্রমহিলা ব্যাগটা হাতে নিয়ে বললেন,
“থাক, আমিই কাইটা নিতাছি। তুই পাখিরে দেখ তো। কইতাছে, পেট ব্যথা করতাছে না-কি।”
​মৌটুসীর কপালের চামড়া জড়ো হয়ে এল। আতঙ্কিত গলায় বলল, “কি বলছ? কোথায় চড়ুই পাখি?”
​”ঘরো, শুইয়া আছে।”
​মৌটুসী আর কথা বাড়াল না, দ্রুত পায়ে ঘরের দিকে হাঁটা দিল।
​পেছন থেকে লালবানু বেগম হাঁক দিলেন, “রান্নাঘরে গরম ভাত রাইন্ধা রাখছি, দুধও ভিজাই রাখছি। পাখিরে খাওয়াইয়া দিয়া ওষুধ দিয়া দিস।”

​বিছানায় কম্বল মুড়ি দিয়ে চড়ুই গুটিশুটি মেরে শুয়ে আছে। মৌটুসী হন্তদন্ত হয়ে বিছানায় উঠে মেয়েকে হাতের ওপর তুলে নিল। চড়ুইয়ের মলিন মুখখানা দেখে বুকে তোলপাড় শুরু হয়ে গেল মৌটুসীর। অস্থির হয়ে শুধাল,
“চড়ুই পাখি? মাম্মা, কি হয়েছে তোমার?”
​চড়ুই চোখ কচলাতে কচলাতে দুর্বল গলায় বলল, “মাম্মা, পেটে ব্যথা।”
​মৌটুসী পেটে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে চিন্তিত স্বরে বলল,
“পেট ব্যথা! কেমন ব্যথা মা? অল্প নাকি বেশি?”
​”অল্প, অল্প।” ফিসফিস করে বলল চড়ুই।
​একটু স্বস্তি পেল মৌটুসী। মেয়েকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে সান্ত্বনার সুরে বলল, “ঠিক হয়ে যাবে মাম্মা। আজকে পটি হয়নি, তাই পেট ভারী হয়ে ব্যথা করছে। ওষুধ খেলেই ঠিক হয়ে যাবে। দেখি আমি পানি নিয়ে আসি। পানি খাও।”
​মৌটুসী উঠে গিয়ে এক গ্লাস পানি এনে দিল চড়ুইকে। তারপর ডাইনিং টেবিলে গিয়ে দেখল গরম ভাত আর কালকে রাতের তরকারি। বাসি তরকারি এখন খাওয়ানো যাবে না চড়ুইকে। ভিজিয়ে রাখা দুধটুকু জ্বাল দিয়ে গরম করে নিল মৌটুসী। তারপর গরম ভাত চটকে তাতে দুধ দিয়ে নিয়ে গেল ঘরে। মৌটুসীর হাতে খাবারের প্লেট দেখেই নাক সিটকাল চড়ুই। “খাব না আমি।”
​মৌটুসী আদরে আদরে বলল,

“আমার মা, একটু খেতে হবে মাম্মা! তারপর ওষুধ খেতে হবে। নাহলে তো অসুখ ভালো হবে না, সোনা পাখি!”
​”উমম! খাব না। খাব না।”
​”একটু, এই অল্প একটু খেতে হবে।” হাত দিয়ে এক চিমটি ইশারা করে বলল মৌটুসী। মেয়েটার চাদরটা সরিয়ে পরম মমতায় চুলগুলো সরিয়ে দিয়ে বলল, “দেখো তো, চড়ুই পাখির জন্য কি এনেছি? দুধ-ভাত। নরম নরম, গরম গরম দুধ-ভাত! মাম্মা খাইয়ে দেবে—একটুও কষ্ট হবে না তার পাখির।”
​চড়ুইয়ের চোখের পাতায় কিঞ্চিৎ চঞ্চলতা দেখা দিল। “দুধ-ভাত?”
​মৌটুসী মৃদু হাসল। “হুম, দুধ-ভাত। তুমি শুধু হা করো, আমি খাইয়ে দিই। খেয়ে, ওষুধ খেয়ে পটি করলেই পেট ব্যথা ভালো হয়ে যাবে।”
​মৌটুসী এক লোকমা ভাত মেয়ের মুখের সামনে ধরল,
“চড়ুই পাখি হা করবে, হা।”
​চড়ুই মুখটা অল্প হা করে ধরল, মৌটুসী হাতের লোকমাটা মুখে ঢুকিয়ে দিল। “এই তো! এখন একটু চিবিয়ে কোঁৎ করে গিলে নাও।”
​পাঁচ-ছয়বারের মাথায় খাবার মুখে নিয়েই উগরাতে শুরু করল চড়ুই। আর খেতে পারল না। মৌটুসীও আর জোর করল না। খাবার রেখে এবার কাঙ্ক্ষিত সিরাপটা খাইয়ে দিল। তারপর মেয়েকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে শুয়ে পড়ল। মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে এটা-ওটা গল্প করে ব্যস্ত রাখতে চাইছে তাকে। একটু পরেই ওষুধের প্রভাবে পেট চড়ুইয়ের মোচড় দিয়ে উঠল । মৌটুসী বুঝতে পেরে ওয়াশরুমে নিয়ে গেল তাকে। কিছুক্ষণ বসে থাকার পর অল্প একটু টাইট পটি হলো। মৌটুসী ফ্রেশ করিয়ে আবার ঘরে নিয়ে এল চড়ুইকে। গামছা দিয়ে পা মুছে দিতে দিতে জিজ্ঞেস করল,

“এখনো ব্যথা আছে মাম্মা?”
​চড়ুই দুই দিকে মাথা নেড়ে ‘না’ বোঝাল। মৌটুসী যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। স্বস্তির দীর্ঘশ্বাস ফেলে মেয়ের কপালে একটি গাঢ় চুমু একে দিল সে। এরপর প্যান্ট পরিয়ে চড়ুইকে শুইয়ে দিয়ে বলল, “তুমি শুয়ে থাকো মাম্মা, আমি একটু আসছি।”
​ততক্ষণাৎ চড়ুই হাত বাড়িয়ে আঁকড়ে ধরল তাকে, “তুমি কোথায় যাবে?”
​”আমি একটু কাজ করি! নানিমনি একা একা কাজ করছে তো।”
​”না, এখানেই থাকো। আমার সাথে শুয়ে থাকো।”

​অগত্যা মৌটুসীও মেয়েকে জড়িয়ে নিয়ে সাথে শুয়ে পড়ল। বাচ্চাটা তার এমনই, একটু অসুস্থ হলে তাকে একটুও কাছ ছাড়া করতে চাইবে না। মায়ের বুকের উষ্ণতায় মুখ ডুবিয়ে দিল চড়ুই। মেয়েটা চুপচাপ পড়ে আছে, কেবল মাঝে মাঝে নিঃশ্বাস একটু ভারী হয়ে উঠছে। মৌটুসী মেয়ের মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে অন্যমনস্ক হয়ে এক ধ্যানে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে রইল। তার বাচ্চাটার একটু অসুখ হলে পৃথিবীটা তার ফাঁকা-ফাঁকা লাগে। শ্বাস-প্রশ্বাসও ভারী হয়ে আসে যেন। বুকটা তোলপাড় করে। মৌটুসীর মনে হয়, তার নামের সবটুকু সুখ যেন আল্লাহ তার মেয়ের নামে লিখে দেন। আর তার মেয়েটার সবটুকু অসুখ তার নামে। চোখ নামিয়ে বুকের চড়ুইকে দেখল সে। ঘুমিয়ে পড়েছে মেয়েটা।
​মৌটুসী আস্তে করে উঠে কম্বলটা ভালো করে জড়িয়ে দিল চড়ুইয়ের গায়ে। দিনদুপুর শুয়ে বসে থাকার ভাগ্য তার নেই। চুলগুলো হাত দিয়ে খোঁপা করতে করতে এগিয়ে গেল সে। একগাদা ময়লা কাপড় জমা হয়েছে। সেগুলো আগে ধুয়ে দিতে হবে।

​ড্রয়িংরুমের পরিবেশ আজ অনেকটাই অশান্ত। সাফওয়ান আর বীর কার্পেটের ওপর হাঁটু গেড়ে আয়েশে বসেছে, সামনে ছড়িয়ে আছে রঙ-বেরঙের পোকেমন কার্ড। বীর খুব উৎসাহ নিয়ে কার্ডগুলো সাজাচ্ছে, ফেলছে। মাঝে মাঝে যখন আবার সাফওয়ানের কার্ড খেয়ে নিতে পারছে, ড্রয়িং রুমের চার দেয়ালে তার খিলখিল হাসির ঝংকার নেমে আসছে।
​তন্মধ্যে সিঁড়ি বেয়ে নেমে এল বোরাক। সোফায় হেলান দিয়ে, পায়ের ওপর পা তুলে আরাম করে বসে পড়ল। এক হাতে কানে ফোন ধরে আছে সে, অন্য হাতটা আলতো করে সোফার হাতলের ওপর রাখা। চোখ স্থির রইল ছেলের খেলার দিকে। তবে মুখ স্থির নয়, জিহ্বা চালিয়ে ওপাশের লোকটার সাথে ক্রমাগত বকবক করে চলছে সে।
​সাফওয়ান কার্ডের দিকে ঝুঁকে পড়ে বলল, “বীর, এই কার্ডটা দাও! এটা দিয়ে পিকাচু অ্যাটাক করবে!”
​বীর মুখ টিপে হেসে কার্ডটা দেওয়ার ভান করল, আবার সরিয়ে নিল। তারপর খিলখিল করে হেসে উঠল।
​কথা বলা শেষ করে কান থেকে ফোন নামাল বোরাক। একইভাবে বসে থেকে মন দিয়ে উৎফুল্ল ছেলের খেলা দেখতে লাগল। তার বাচ্চাটার আবদার বলতেই ‘খেলা’, ওইটুকুই। তার খেলায় সঙ্গ দিলে আর কোনো ভেজাল নেই।
​ভুবনকে কোলে করে নিয়ে আশাও এল সেখানে। ছেলেকে সাফওয়ান ও বীরের কাছে নামিয়ে দিয়ে বোরাকের পাশে এসে বসল।

“খালামনি ফোন করেছিল। চারটায় পপুলারে ডাক্তারের অ্যাপয়েন্টমেন্ট রেখেছে বলল? তুমি বলে রেখেছিলে?”
“হুম।”
“বীরকে দেখাবে?”
“হুম। স্পিচ-থেরাপিস্ট।”
​আশা অবাক হয়ে বলল,
“থেরাপিস্ট কেন? বীর তো মাশাআল্লাহ সবই বলতে পারে!”
​”পারে, কিন্তু ‘র’-এর উচ্চারণটা ‘ল’ হয়ে যাচ্ছে। এটা নিয়ে একটু কথা বলতাম।”
​”বীর এখনো অনেক ছোট ভাইয়া। এটা তো খুবই স্বাভাবিক। বয়স বাড়ার সাথে সাথে ঠিক হয়ে যাবে। এত চিন্তা করছ কেন তুমি?”
​”বীর আমাদের সন্তান বলে আমাদের কাছে স্বাভাবিক মনে হচ্ছে আশা। কিন্তু বাহিরের মানুষের কাছে এটা অস্বাভাবিক। বিশেষ করে ওর সহপাঠীদের কাছে। ছোট বাচ্চা, কখন কি বলে বসে বলা যায় না। ছেলেটা নিজেকে নিয়ে কোনো হীনম্মন্যতায় ভুগুক তা চাই না, তাই এই প্রচেষ্টা।”
​আশা একটু ভাবল, তারপর মাথা নেড়ে বলল, “হুম, তাও ঠিক। যাও, দেখিয়ে এসো। থেরাপিস্টরা তো অনেক ভালো ভালো মুখের এক্সারসাইজ দেয়।”
​”হুম।”
​আশা এবার সাফওয়ানকে উদ্দেশ্য করে বলল, “সাফওয়ান, আজকে বিকেলে গাড়ি নিয়ে গিয়ে চাচিকে নিয়ে এসো। স্নেহা-নীলিমা ওরা আসছে। সবার সাথে একটু সময় কাটালে ভালো লাগবে চাচির।”
​সাফওয়ান কার্ড থেকে চোখ সরিয়ে বলল, “আম্মা সকালেই আসবে বলে জেদ ধরেছিল। আমি বুঝিয়ে-সুঝিয়ে রেখে আসলাম।”

​বোরাক বলল, “নিয়ে আসোনি কেন? বাড়িতেও তো শুয়ে-বসেই থাকে, এখানেও থাকবে। আশা আছে এখন, একটু কথা বললে ভালো লাগবে।”
​তখনি আরোয়া দৌড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এল। ড্রয়িংরুমে ভাই-বোনকে বসে থাকতে দেখে দাঁড়িয়ে গিয়ে বলল,
“আপু তুমি এখনো এখানে বসে আছো? দুলাভাই এসেছে!”
​আশা অবাক হয়ে ভ্রু কুঁচকে জানতে চাইল, “কোন দুলাভাই?”
​”অহ! আমার দুলাভাই কয়টা? তোমার মিস্টার। এসো রিসিভ করি ভাইয়াকে।”
​কথাটা বলেই আরোয়া মেইন দরজার দিকে দৌড় দিল। কিন্তু তার দরজার কাছে পৌঁছানোর আগেই ওপাশ থেকে প্রবেশ করল লম্বা-চওড়া গড়নের এক পুরুষ। আরোয়া খুশিতে ডগমগ হয়ে সেখানেই দুলাভাইয়ের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ল। সামাজিকভাবে তারা শালী-দুলাভাই হলেও, তাদের সম্পর্কের গভীরতা আপন ভাইবোনের মতোই অন্তত স্নেহপূর্ণ। হাসান তালুকদার যখন এই বাড়িতে জামাই হয়ে এসেছিল, আরোয়া তখন মাত্র এগারো-বারো বছরের বালিকা। শ্বশুরবাড়িতে আসলেই সারাক্ষণ মেয়েটা তার পিছু পিছু ঘুরঘুর করত। এদিকে হাসানও খুব রসিক একজন মানুষ। সহজেই সকলের সাথে মিশে যেতে পারে, মন থেকে আপন করে নিতে পারে।
​হাসানের দুই হাতেই নানারকম খাবারের প্যাকেট। অগত্যা সে এক হাত কোনোমতে উঁচিয়ে আরোয়ার মাথায় হাত বুলিয়ে দিল।

“আমার আদরের আরু বউটা কেমন আছে?”
​”ভালো। কিন্তু তোমাকে দেখে ভালো প্রোম্যাক্স হয়ে গেছি।”
​এদিকে বীর খেলা ছেড়ে উঠে ‘ফোঁপা ফোঁপা’ বলে ছুট দিয়েছে। ছোট্ট ভুবনও বাবাকে দেখে ‘পাপা পাপা’ বলে হামাগুড়ি দিতে আরম্ভ করেছে। বীর আসতেই আরোয়া সরে দাঁড়াল। হাসান আরোয়ার হাতে খাবারের প্যাকেটগুলো ধরিয়ে দিয়ে এক হাতে বীরকে কোলে তুলে নিল ও অন্য হাতে ভুবনকে। কোলে ওঠার সাথেই ভুবন বাবার দাড়ি ধরে মুখে মুখ লাগিয়ে ভেজা আদর দিয়ে অস্থির করে দিল।
আশা, সাফওয়ান আর বোরাকও উঠে এগিয়ে এল। সাফওয়ান সালাম দিল।
​আশা বলল, “তুমি আসবে বললে না তো!”
​হাসান স্ত্রীর দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,
“কেন? তোমাকে সব কথা বলতে হবে? তুমি বলো? আমার অগোচরেই আমার একমাত্র সম্বন্ধীবাবুর বিয়ে দিয়ে দিচ্ছ! বলেছ আমাকে?”
​আশা এবার সরু চোখে আরোয়ার দিকে তাকাল। আরোয়া ধরা পড়ে গিয়ে দাঁত বের করে হাসল।
আশা বলল, “তুমি বলেছিলে তুমি খুবই ব্যস্ত, তাই বিরক্ত করতে চাইনি।”
​বোরাক বলল, “আচ্ছা এসব কথা পরে হবে। আশা খাবার রেডি কর। আরোয়া দরজা ছাড়, ভাইয়াকে ভেতরে আসতে দে।”
​“ওহ! সরি!” আরোয়া দ্রুত দরজা থেকে সরে দাঁড়িয়ে মাথা নিচু করে রাজকীয় ভঙ্গিতে প্রবেশের পথ দেখিয়ে বলল, “আসুন জামাইবাবু, শ্বশুরবাড়ি মধুর হাঁড়িতে আপনাকে সুস্বাগতম!”

​দুপুর হতে চলল। মৌটুসী দুই বালতি ময়লা কাপড়গুলো ধুয়ে শুকাতে দিয়ে এবার রান্নাঘরে এল। লালবানু বেগমের কেটে রাখা মুরগির মাংসগুলো ভালো করে ধুয়ে পেঁয়াজ-রসুন কুচি সহ প্রয়োজনীয় তেল-মসলা দিয়ে ভালো করে মেখে মেখে চুলায় চড়িয়ে দিল।
​তারপর ভাজার জন্য ঢেঁড়স কাটতে লাগল বটিতে। এমন সময় বাইরের দিক থেকে পায়ের আওয়াজ এসে ঠেকল কানে। মৌটুসী রান্নাঘরের গ্রিল দিয়ে বাইরে তাকাল। মাসুম এসেছে। মেহেরুনকে আশেপাশে দেখা যাচ্ছে না। মনে হয় ঘরের ভেতর আছে। মৌটুসী চুলাটা মৃদু আঁচে দিয়ে উঠে দ্রুত পায়ে ঘরের ভেতর গেল। ফ্রিজ থেকে কালকে বানানো একটা চকলেট কাপকেক বের করে আনল। বারান্দার দরজার কাছে এসে আস্তে করে ডাকল মাসুমকে,
“মাসুম, আব্বু এদিকে এসো তো।”
​মাসুম একবার সতর্ক দৃষ্টিতে এদিক-ওদিক তাকাল। মাকে আশেপাশে কোথাও দেখতে না পেয়ে ধীর পায়ে এগিয়ে এল।

“কি হইছে ফুপু?”
​মৌটুসী মুচকি হেসে কাপকেকটা ওর দিকে এগিয়ে দিল, “নাও।”
​কেক দেখেই এক চিলতে আনন্দ খেলে গেল মাসুমের গোলগাল চেহারায়। মৌটুসীর হাত থেকে কেকটা নিয়েই এক কামড় বসিয়ে দিল তাতে।
মৌটুসী হাত বাড়িয়ে মাসুমের চুলে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে মমতাভরা কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, “স্কুলে যেতে চাও না কেন বাবা? ফুপুকে বলো তো।”
​মাসুমের খাওয়া থেমে গেল। অকপটে বলে দিল, “স্কুলে যাইতে ভালা লাগে না।”
​মৌটুসী আবার জিজ্ঞেস করল, “ভালো লাগে না কেন? স্কুলে না গেলে তো পড়া শিখতে পারবে না, বড় হতে পারবে না। আচ্ছা, স্কুলে টিচাররা বকা দেয়? কেউ কি কিছু বলে?”
​ফুপুর আস্কারা পেয়ে এবার গড়গড় করে বলতে লাগল মাসুম।
“খালি বকে না ফুপু। স্কুলে মারে। পড়া না পারলে পড়ায় না, বোঝায় না, খালি মারে। এইরম বড় বড় কঞ্চি দিয়া মারে। আবার কামও কইরা নেয়।”

​মৌটুসীর ভ্রূযুগল কুঁচকে উঠল। বিস্ময় নিয়ে আবার জিজ্ঞেস করল ও, “কি কাম করে নেয়?”
​“স্কুলের যত কাম আছে—ক্লাসরুম, উঠান ঝাড়ু দেওয়ায়, পায়খানা পরিষ্কার করায়ে নেয়। কারেন্ট গেলে হাতপাখা দিয়া বাতাস কইরা নেয়। আবার মাঝে মধ্যে মাথা টিপাই নেয়, আর স্যার-ম্যামেরা ঘুমায়।”
​মৌটুসীর সারা শরীর ঘৃণায় কাঁপতে লাগল। সে কি ঠিক শুনছে? একটা শিশু স্কুলে যায় মানুষ হওয়ার জন্য, আর সেখানে তাকে দিয়ে চাকরের মতো কাজ করানো হচ্ছে? দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার এত অধপতন কবে হলো? দেশের নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তরা তাদের সন্তানকে নামীদামী স্কুলে পড়াতে পারে না, বাড়ির পাশের সরকারি প্রাইমারিতেই পড়তে পাঠায়। অথচ সেখানে পড়াশোনার নামে বাচ্চাদের এক প্রকার ট্রমাতে ফেলা হচ্ছে!
​তন্মধ্যে মাসুমদের ঘরের দরজা খোলার শব্দ হলো। মেহেরুন বের হওয়ার আগেই মাসুম এক দৌড়ে বাড়ির বাইরে চলে গেল। মাসুমের হাতে কেক দেখলেই মেহেরুন আবার শুরু করে দেবে। মৌটুসী একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে রান্নাঘরে চলে গেল। এই বিষয়ে পরে ভাইয়ের সাথে কথা বলবে।

​দুপুরের পর চড়ুইয়ের পেটব্যথা আবার ফিরে এল। এবার সকালের চেয়েও খারাপ অবস্থা, তার ওপর একবার বমিও করে দিল মেয়েটা। মৌটুসীর উদ্বেগের সীমা রইল না; সকালে যা-ও একটু স্বস্তি পেয়েছিল, এখন সব মিলিয়ে সে দিশেহারা। অস্থিরতায় মাথা কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে তার, বুঝতে পারছে না কি থেকে কি করবে? তার ওপর আজ শুক্রবার, অধিকাংশ ডাক্তারের চেম্বার বন্ধ। সরকারি আউটডোরেও দেখানো সম্ভব না। এখন নিলে ইমার্জেন্সিতে নিতে হবে। সিদ্ধান্ত তাই হলো। কিন্তু এর মাঝে হুট করে কিছু মনে পড়তেই অস্থির হাতে মোবাইল ফোনটা তুলে নিল। কন্টাক্ট লিস্ট থেকে ‘আলিফ’ নামটা খুঁজে বের করে ডায়াল করল।
​রিসিভ হতেই মৌটুসী বলে উঠল, “হ্যালো!”
​ফোনের ওপাশ থেকে ভেসে এল চেনা ঘুম জড়ানো, তবে প্রাণোচ্ছল কণ্ঠ, “সূর্য আজকে কোন দিকে উঠছে, মৌ? নিজে থেকেই এই অধমের ফোনে তোর কল!”
​মৌটুসী তিতিবিরক্ত গলায় বলল, “ফাজলামি রাখ আলিফ। কোথায় আছিস তুই?”

​“আমি তো গ্রামের বাড়িতে আসছি। কেন? কী হয়েছে?”
​“শোন, পপুলারে তোর পরিচিত কে যেন চাকরি করে? উনাকে একটু ফোন করে বল তো, আজকে বিকেল বা সন্ধ্যায় কোনো শিশু ডাক্তার বসবেন কি-না! ইমার্জেন্সি দরকার।”
​“কেন? কার কী হয়েছে? চড়ুই ঠিক আছে?”
​“হুট করেই সকাল থেকে চড়ুইয়ের পেটে ব্যথা শুরু হয়েছে। একটু আগে বমিও করল। কিছুই বুঝতে পারছি না, আমার মেয়েটা কষ্ট পাচ্ছে আলিফ।”
​”মৌ! তুই একদম টেনশন করিস না। আমি এখনই আমার বন্ধুটাকে ফোন করছি। তুই চড়ুইকে খেয়াল রাখ, আমি পাঁচ মিনিটের মধ্যে তোকে কনফার্ম করছি।”
​ফোন কেটে কাপড় নিয়ে চড়ুইয়ের কাছে এল মৌটুসী। লালবানু বেগমের কোলে নেতিয়ে পড়েছে মেয়েটা। লালবানু বেগম উদ্বিগ্ন কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন, “কাকে ফোন করেছিলি? কী বলল?”
​“আমার এক বন্ধু। পপুলারে খোঁজ নিয়ে দেখবে। ওখানে ডাক্তার না থাকলে সরকারি হাসপাতালেই নিয়ে যেতে হবে, এছাড়া তো আর উপায় নেই।”
​মৌটুসী মেয়েকে আলতো করে নিজের কোলে টেনে নিল। গলার স্বর নামিয়ে কোমল স্বরে বলল, “মাম্মা? আমার চড়ুই পাখি? বেশি কষ্ট হচ্ছে মাম্মা?”
​চড়ুই মলিন মুখে দুই দিকে মাথা নাড়ল। ছোট হাত দিয়ে পেটের দিকে ইশারা করে দুর্বল গলায় বলল, “এখানে… অল্প কষ্ট।”
​মৌটুসীর চোখ ভরে উঠল। কিন্তু বুঝতে দিল না। অশ্রু গড়িয়ে পড়ার আগেই হাতের পিঠ দিয়ে চোখ মুছে মেয়েকে বুকের সাথে জড়িয়ে নিল, “ঠিক হয়ে যাবে মাম্মা। ডাক্তারের কাছে গেলেই সব ব্যথা ম্যাজিকের মতো ভালো হয়ে যাবে।”
​লালবানু বেগম বললেন,

“আমিও যাই তোদের সাথে?”
“না থাক। আব্বা বাড়িতে একা।”
“তুই একা সব সামলাতে পারবি?”
“হয়ে যাবে। চিন্তা করো না।”
মৌটুসী দ্রুত হাতে চড়ুইয়ের জামা বদলে দিল। নিজেও কোনমতো হাতের কাছের একটা কুর্তি আর স্কার্ট নিয়ে তৈরি হয়ে নিল। তখনি ফোনটা বেজে উঠল, আলিফের ফোন। রিসিভ করে কানে ধরতেই আলিফের চঞ্চল কন্ঠ ভেসে এল,
​”হ্যালো মৌ, শোন! ডাক্তার আছে, আমি অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়ে রেখেছি। তুই সোজা পপুলারের চতুর্থ তলায় চলে যাবি। ছয় নম্বর চ্যাম্বার। আর আমার বন্ধুর নম্বর মেসেজ করে দিচ্ছি, দরকার লাগলে ফোন করিস।”
​“ইমার্জেন্সি বলেছিস তো?”
​”হুম সমস্যা নেই। তোর পৌঁছাতে যতক্ষণ সময় লাগে!”
​”আচ্ছা দোস, থ্যাংক ইউ।”
​”ঠিক আছে। পরে ফোন করব নি। চড়ুইয়ের খেয়াল রাখ ভালো করে। আমি কাল সকালের ট্রেনেই চলে আসব।”
​মৌটুসী টোট ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে চড়ুইকে কোলে তুলে নিল। লালবানু বেগম তাদের গলি পেরিয়ে বড় রাস্তা পর্যন্ত এগিয়ে এলেন। মৌটুসী একটা রিকশা দাঁড় করিয়ে চড়ুইকে নিয়ে উঠে পড়ল। “আম্মা, তুমি বাসায় যাও।”
​“সাবধানে যাস।” লালবানু বেগম চড়ুইয়ের পায়ে হাত বুলিয়ে দিয়ে আদর করে বললেন,
“আমার পাখি, নানুমনি! ডাক্তারের কাছে গেলেই আল্লাহ সব অসুখ ভালা কইরা দিব। যাও।”

​লক্ষ্মীপুরের মোড়, পপুলার হাসপাতালের চতুর্থ ফ্লোরের ওয়েটিং করিডোরে অপেক্ষারত রোগী ও স্বজনদের ভিড়ে চড়ুইকে কোলে নিয়ে বসে আছে মৌটুসী। আলিফের এক বন্ধু হাসপাতালের মেইন রিসিপশনে চাকরি করে, সে-ই এসে সব গুছিয়ে দিয়ে গেছে, এখন শুধু অপেক্ষার পালা। ভেতরে একজন রোগী আছে, তিনি বের হলেই চড়ুইয়ের ডাক পড়বে। চড়ুই ঘাপটি মেরে মৌটুসীর বুকের সাথে লেপ্টে আছে, ব্যথার তোড়ে মেয়েটার মুখটা ছোট হয়ে একদম এইটুকুন হয়ে গেছে। মাঝে মাঝে বেশি উদ্যমে ব্যথা উঠলে ‘মাম্মা’ বলে ডেকে মায়ের কোলের মাঝেই ছোট্ট শরীরটা ছটফট করে উঠছে। মেয়ের এমন যন্ত্রণা দেখেও মৌটুসী যথেষ্ট শক্ত।নিজেকে শক্ত রাখা ছাড়া তো কোনো উপায়ও নেই তার! সে অস্থির হয়ে উঠলে তার বাচ্চাটাকে সামলাবে কে? রুমুকে ফোন করেছিল, কিছুক্ষণের জন্য একটু আসতে বলতে চেয়েছিল। কিন্তু সে না-কি কোনো এক আত্মীয়র বিয়ের দাওয়াতে আছে। তাই আর বিরক্ত করে নি তাকে।

​মেয়েকে বুকে নিয়ে শক্ত হয়ে বসে অপেক্ষার প্রহর গুনছে মৌটুসী। এই মুহূর্তে তার প্রতিটি মুহূর্ত যেন কাটছে এক একটা শতাব্দীর মতো; দৃষ্টি আটকে আছে ডাক্তারের চেম্বারের বন্ধ দরজার দিকে। তার পাশের চেম্বারটা আবার একজন স্পিচ-থেরাপিস্টের। এবং তখনি সেই চেম্বার থেকে বীরের হাত ধরে বেরিয়ে এল বোরাক। করিডোর পার হয়ে লিফটের দিকে যাওয়ার সময় হঠাৎ বীরের কৌতূহলী চোখ কোণায় বসে থাকা মৌটুসীর ওপর গিয়ে পড়ল।
​চড়ুইকে দেখে বীর খুশিতে বোরাকের হাতটা জোরে ঝাঁকিয়ে বলে উঠল, “পাপা! পাপা! দেখো, চুলুই পাখি!”
​বোরাক এক হাতে বীরের হাত ধরা, আর অন্য হাতে ফোন। দৃষ্টি তার ফোনের দিকে, সাফওয়ানের নাম্বারে ডায়াল করে ফোন কানে ধরল। বীরের কথায় খুব একটা গুরুত্ব না দিয়ে আলতো গলায় বলল, “চড়ুই পাখি এখানে নেই বাবা, ভুল দেখছ তুমি।”

রিং হওয়ার আগেই সাফওয়ান এসে দাঁড়াল তাদের সামনে।
​এদিকে বীর অস্থির হয়ে আঙুল তুলে দেখাল, “না পাপা! ওই যে, দেখো, চুলুই পাখি!”
​বীরের আঙুল অনুসরণ করে সাফওয়ানের দৃষ্টি গেল সেদিকে। চড়ুইকে কোলে করে মৌটুসীকে বসে থাকতে দেখে মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল, “চড়ুই অসুস্থ নাকি?”
​ততক্ষণে বোরাকের দৃষ্টিও সেদিকে আবদ্ধ হলো। ভ্রূদ্বয় তার কুঁচকে উঠল মুহূর্তেই। স্মৃতিপটে ভেসে উঠল সেদিনের সেই ছোট এক্সিডেন্টের দৃশ্য। এটা সেই মেয়েটা নয়? ভুল হওয়ার সম্ভাবনা নেই। এই চেহারা এত সহজে ভুলবার নয়। সেই রণমূর্তির চেহারা, সেই তেজ—বোরাক গাড়ির স্টিয়ারিংয়ে হাত দিলেই তার চোখের সামনে একবার হলেও ভেসে ওঠে। কিন্তু তার কোলের বাচ্চাটাও তো চড়ুই! তার মানে কি দাঁড়াল?
এদিকে বীর ক্রমাগত তার হাত টানছে। তারা এগিয়ে গেল সেদিকে।
​”চুলুই পাখি, তোমাল কি হয়েছে?”
বীরের গলার স্বরে মৌটুসী ডাক্তারের চেম্বারের দিক থেকে চোখ সরিয়ে পাশে তাকাল। বীরকে দেখে দারুণ অবাক হলো সে, “বীর? তুমি এখানে?”
​”চুলুই পাখিল কি হয়েছে?”
মৌটুসী এক হাত তুলে বীরের মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,
​”চড়ুই পাখি অসুস্থ বাবা।”

​মায়ের বুকে চোখ বুঝে পড়ে থাকা চড়ুই এবার পিটপিট করে চোখ মেলে দিল। অস্ফুট স্বরে ডাকল,”বীর বন্ধু…”
​বীর হাত বাড়িয়ে চড়ুইয়ের নুইয়ে পড়া ছোট হাতটা আলতো করে ধরে বলল, “চুলুই পাখি! তুমি অসুস্থ?”
​চড়ুই মলিন মুখে মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ বুঝাল।
​সাফওয়ান জিজ্ঞেস করল,
“কি সমস্যা আপু?”
​”পেটে ব্যথা।” মৌটুসীর কণ্ঠে উদ্বেগ স্পষ্ট। কপালটা চিন্তায় ভাঁজ হয়ে আছে।
​এদিকে ওদের কথোপকথন শুনে বোরাক হাঁ হয়ে মৌটুসীর দিকে তাকিয়ে আছে। একটু আগ অব্দিও জানত সে, মেয়েটা বাকপ্রতিবন্ধী। অথচ সে দিব্যি স্বাভাবিক ও স্পষ্টভাবে কথা বলছে!
​সাফওয়ান আবার জিজ্ঞেস করল,
“আপু ডাক্তার দেখিয়েছেন? নাকি এখন দেখাবেন?”
​”এখন দেখাব। ভেতরে অন্য রোগী আছে।”
​এবার বোরাক কিছুটা বিস্মিত হয়ে মুখ খুলল, “মেয়েটা ব্যথায় কুঁকড়ে আছে আর আপনি সিরিয়ালের অপেক্ষায় আছেন? ইমারজেন্সিতে ভর্তি করাইতেন!”
​মৌটুসী এবার মাথা ঘুরিয়ে তাকাল, বীরের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বেশ লম্বা করে এই পুরুষটাকে এতক্ষণ সে লক্ষ্য করেনি। প্রথম দেখাতেই মস্তিষ্ক জানান দিল, এর আগেও এই লোকটাকে তুই কোথাও দেখেছিস মৌ। কিন্তু দুশ্চিন্তা আর উদ্বিগ্নতার ঠেলায় স্থান-কাল কিছুই মনে পড়ল না। এই মুহূর্তে সে স্মৃতি ঘেঁটে মনে করার প্রয়োজনও বোধ করল না। এত কিছু ভাববার সময় এখন নয়। সে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্নের জবাব দিল, “ভেতরের রোগী বের হলেই আমাদের ডাকা হবে।”

​এরই মধ্যে ছোট্ট চড়ুই এক কাণ্ড করে বসল। মায়ের কোলে শুয়ে থাকা মেয়েটা এবার সোজা হয়ে বসল, মাথা উঁচু করে বোরাকের দিকে তাকিয়ে কোনো জড়তা ছাড়াই দুই হাত বাড়িয়ে দিল তার দিকে।
​মৌটুসী হতবাক হয়ে মেয়ের কাণ্ড দেখল। প্রায় অপরিচিত এক মানুষের দিকে নিজের মেয়েকে এভাবে অনায়াসে হাত বাড়িয়ে দিতে দেখে অস্বস্তি হলো তার। অথচ মেয়েটাকে দেখো? কি স্বতঃস্ফূর্তভাবেই না দুই হাত বাড়িয়ে মায়া মায়া চোখে তাকিয়ে আছে!
​মৌটুসী কিছু একটা বলে চড়ুইকে নিজের কাছে ফিরিয়ে নিতে যাবে, তার আগেই বোরাক কোনো দ্বিধা-সংকোচ ছাড়াই শিরদাঁড়া বাঁকিয়ে মৌটুসীর কোল থেকে ছোট্ট পাখিটিকে নিজের বলিষ্ঠ বাহুর আশ্রয়ে তুলে নিল। ঠোঁটের কোণে তার অকৃত্রিম মুচকি একটা হাসি। চড়ুই সাথে সাথে বোরাকের গলা জড়িয়ে ধরে কাঁধে মাথা এলিয়ে দিল, মুখটা গুঁজে দিল গলার ভাঁজে। চড়ুইয়ের পরনে তার মখমলি কোমল শরীরের মতোই মখমল তুলার তৈরি ফ্রগ আর পায়জামা। মাথায় লাল রেশম টুপি। লাল টুপির মাঝে ছোট্ট শুভ্র মুখটার সৌন্দর্য আজ মলিনতায় ছেয়ে আছে। বোরাক একহাতে চড়ুইয়ের নাজুক শরীরটা আগলে ধরে, অন্য হাতটি ওর পিঠে আলতো করে বোলাতে লাগল।
“উম! উহম! মাম্মা!”

মৌটুসী পর্ব ৯

চোখ বুঁজে সেভাবে থাকতে থাকতেই এরেকদফা ব্যথায় কুঁকড়ে উঠল চড়ুই।
কাধে থাকা ছোট্ট অস্তিত্বটার ছটফটানি টের পেতেই বোরাকের পিতৃত্ব যেন অস্থির হয়ে উঠল। করিডোরের এদিক ওদিক হেটে চড়ুইকে দুলাতে দুলাতে আদুরি গলায় বলল, “স্ট্রং বার্ড, স্পোরোর কি হয়েছে, হু? কিচ্ছু হয় নি মামনি! এই যে আমরা এখনই ডক্টর আঙ্কেলের কাছে যাব! আর আমাদের স..ব কষ্ট ভ্যানিশ হয়ে যাবে!”
এদিকে নির্বাক ​মৌটুসী কেবল ফ্যালফ্যাল দৃষ্টিতে চেয়ে রইল সেদিকে।

মৌটুসী পর্ব ১১

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here