তুমি আমার শেষবেলা পর্ব ১
নীতি জাহিদ
মাথার পাশে বসে সেই তখন থেকে কা/দঁ/ছে মেয়েটা। অফিসের ম্যানেজাররা, হেডরা এইচ.আর ডিপার্টমেন্ট এবং স্টাফরা সবাই জড়ো হয়েছে মিনহাজ ইকবালের কেবিনে। মিনহাজ টিউলিপ ইন্টারন্যাশনাল এর স্বত্তাধিকারী। রুনা নামের মেয়েটি মিনহাজের অফিসের এইচ আর ডিপার্টমেন্ট এ আছে। তখন থেকে মোনাকে বুঝাচ্ছে তার বাবা সুস্থ হয়ে উঠবে, না কাঁদতে। স্কুল থেকে ড্রাইভার আংকেল সরাসরি বাবার অফিসে নিয়ে এসেছে। এসে দেখে বাবার মাথায়, হাতে ব্যান্ডেজ। বাবা ছাড়া আপনজন আর কেউ নেই মোনার। যারা আছে তারাও মনে হয় যেন সুসময়ের বন্ধু।
কিছুক্ষন আগের ঘটনা,
গুলশানে “গ্লোরিয়া জিন্স কফি” থেকে মিনহাজ মিটিং শেষ করে অফিসের দিকে আসতে গাড়িতে উঠার সময় অতর্কিত আক্রমণ হয় মিনহাজের উপর। ক্লায়েন্টদের মধ্যে একজন গুরুতর আ/হ/ত হাসপাতালে ভর্তি। কয়েকটা ছেলে বাইকসহ এসে হকি স্টিক দিয়ে আঘাত করে ছু/রি চালায়। আল্লাহ রহমত করেছে, পুলিশের গাড়ি সামনে ছিলো। তাই রক্ষে হয়েছে। ড্রাইভার একা পারছিলোনা ছেলেগুলোর সাথে। এরপর পুলিশের সাহায্যে হাসপাতাল থেকে সোজা অফিসে আসে। ড্রাইভার ও অনেকটা ব্যা/থা পেয়েছে। এখন বাসায় গেলে মা হাসিনা বেগম তু/ল/কা/লা/ম বাঁধিয়ে দিবে। মোনার গতকাল ক্লাস এইট এর বার্ষিক পরীক্ষার রেজাল্ট দিয়েছে। আজ বাবাকে দেখা করতে বলেছিলো অভিভাবক মিটিং এর জন্য। কিন্তু মিনহাজের
অ/সু/স্থ/তা/য় যেতে পারবেনা শিক্ষককে জানালে মেয়ে ক্লাস না করে কান্নাকাটি শুরু করে দেয়। অবশেষে ড্রাইভার গিয়ে নিয়ে এসেছে মোনাকে। মিনহাজ মেয়েকে কাছে ডেকে বুকে টেনে নিয়ে বললো,
– ‘মাই প্রিন্সেস, তুমি এভাবে কান্না করলে বাবার যে ক/ষ্ট হবে। প্লিজ কেঁদো না। বাবা সুস্থ হয়ে যাবো,তুমি দোয়া করো।’
নাক টেনে মোনা কান্না বন্ধ করার চেষ্টা করছে। সবাইকে যার যার কাজে পাঠিয়ে দিলো মিনহাজ। মেয়েকে রুনা খাইয়ে দিলো। মিনহাজ মেয়ের দিকে তাকিয়ে বলে,
-‘ আম্মাজান, বাবার একটা কথা রাখবেন?’
-‘ কি বাবা?’
-‘ বাসায় যে হোম মিনিষ্টার আছে হাসিনা বেগম উনার কাছ থেকে আজ আমাকে রক্ষা করতে হবে?’
মোনা নাক মুখ কুঁ/চ/কে ফেললো। কারণ জানে দাদীআম্মা আজ বাবার বারোটা বা/জি/য়ে ফে*লবে। দাদীকে মোনার একদম স/হ্য হয়না। মোনা বাবার অসহায় মুখের দিকে তাকিয়ে বললো,
-‘ ফুফিকে ফোন দিয়ে বলছি দাঁড়াও। সিচুয়েশন যেন স্বাভাবিক রাখে। ‘
মায়া,মোনার ফোন পেয়ে বাবার রুমে গিয়ে মিনহাজের সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনা বললো। মামুন সাহেব উঠে ড্রইং রুমে অপেক্ষা করছে। মিনহাজের ছোট ভাই মনসুর ও চলে এসেছে ভার্সিটি থেকে। মনসুর ভার্সিটির লেকচারার। এতক্ষনে হাসিনা বেগমের কানে খবর চলে গিয়েছে। এই খবর দিয়েছে মনসুরের বউ সালমা। এই মহিলা সব সময় বাড়াবাড়ি করে। হাসিনার পছন্দের বউ হচ্ছে সালমা।
কলিংবেল বেজে উঠলে মনসুর উঠে গিয়ে দরজা খুলে ভাই আর ভাইঝিকে নিয়ে ড্রইং রুমে আসে। সাথে ড্রাইভার এবং এসিস্ট্যান্ট ও ছিলো। হাসিনা বেগম ছেলের এই অবস্থা থেকে হা হু/তা/শ শুরু করে দিলেন। আবার সেই আগের প্যান প্যান শুরু করে দিয়েছে মিনহাজের বিয়ে নিয়ে। আজ যদি বউ থাকতো তাহলে বউ সেবা করতো। আর কতদিন এভাবে থাকবে, বউ ম*রে*ছে আজ ১২ বছর এরপরো আগের স্মৃতি আঁকড়ে কেনো বসে আছে, এই সেই আরো কত কি। মায়াকে মিনহাজ ধমক দিলো,
-‘ এই তোর ম্যানেজ। বাসায় আসছি শান্তির জন্য আর মা কি শুরু করছে। শরীর টা ভালো না মাকে থামা।’
মামুন সাহেবের ধমকে হাসিনা বেগম থেমে গিয়েছে। এসিস্ট্যান্ট বাশার মিনহাজের ফোনটা এগিয়ে দিয়ে বললো স্যার ফোন। ফোনে কথা বলার পর মিনহাজের মুখটা একদম চুপসে গিয়েছে। সবাই ওর মুখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো কি সমস্যা?
-‘ ইমরান ল্যান্ড করেছে ঘন্টা দুয়েক আগে। বাড়িতে আসছে। মরার উপর খাড়ার ঘাঁ। আজকে কার মুখ দেখে ঘুম থেকে উঠলাম।’
মনসুর হাসলো,
-‘ ভাইয়া তোমার তো খুশি হওয়া উচিত,এত বছর পর আসছে মানুষটা’
-‘ সে আমার ক্লাস নিতে আসছে,আমাকে খুশি করতে নয়।’
-‘ তোমাকে টাইট দিতে এর চেয়ে ভালো সলুশ্যন হতেই পারেনা। রাগটাকে নিয়ন্ত্রণ করলে তো এই সমস্যা গুলো হতনা।’
মামুন সাহেব খুশিতে হাসিনা বেগমকে ডেকে বললো,
-‘ বাড়িতে রান্নার আয়োজন করো অতিথি আসছে এত বছর পর।’
মিনহাজ অসহায় মুখে বাবার দিকে চেয়ে আছে। বাবা মনে করে ইমরানই একমাত্র ব্যক্তি যার কথা মিনহাজ মনোযোগ দিয়ে শুনে। ইমরান মানুষটাও এমনই যে যাকে ভালো না বেসে পারা যায় না। কখনো বজ্রের মত অটল,তো কখনো কুসুমের মত নরম। কখনো স্রোতের মত গতিহীন আবার কখনো শীতকালের মত শান্ত। যার গলার স্বরে এখনো অফিসের ফ্লোরে প্রতিধ্বনি হয়। যার পায়ের জুতার শব্দ শুনলেই মনে হয় ইমরান আসছে। এত যত্ন করে হাঁটে। তার প্রতিটি কাজে যত্ন ভেসে উঠে। দেশে আসার সংবাদটা মিনহাজের জন্য কষ্টের আতঙ্কের কারণ তার রগচটা স্বভাবের জন্য ইমরান বহুবার বুঝিয়েছে। তবে আজ আর ছাড়বেনা। কাজ ফেলে ছুটে আসছে মিনহাজের অসুস্থতা শুনে।
কথাটা কানে যেতেই একজনের মনের মধ্যে না পাওয়া আকাঙ্ক্ষা ফিরে পাওয়ার লোভ জাগে। এতবছর পর মানুষটা আসছে, এই খুশি যেন ধরে রাখা যায় না। সেই ছোট্টবেলার পছন্দের মানুষটা। চোখের সামনে থাকতো কিন্তু চোখের তেষ্টা মিটতোনা। অপেক্ষার অবসান হয় এক সময়। এবার আসলে একদমই দূরে যেতে দিবেনা। কিশোরী বয়স ছাড়িয়ে এখন পরিণত নারী। সুখ দু:খ, হাসি কান্নার সাক্ষী কিন্তুবকি যে হলো।হঠাৎ দূরত্ব এরপর মানুষটার হারিয়ে যাওয়া। পরিবারের লোকজনকে সময়ে বলতে না পারার কষ্ট টা আজও সহ্য করতে হয় এই নারীকে। কথায় বলে,
‘সময়ের এক ফোঁড়, অসময়ের দশ ফোঁড়’
এই সময় আর স্রোত কারো জন্যই অপেক্ষা করেনা। তবে সুযোগ আরেকবার যখন হাতের কাছে,এই সুযোগ ছাড়া যাবে না। এবার তাকে স্বার্থপর হতেই হবে। ১৭ কিংবা ১৮ বছরের উষ্ণ অনুভূতি এবার বাস্তবায়নে সর্ব প্রকার চেষ্টা করবে। যদি যেতে হয় পরিবারের বিপক্ষে তাও যাবে। তবে মানুষটাকে আপনা করার চেষ্টায় থাকবে এবার। অপেক্ষার অবসান হতে চললো।
