Home প্রফেসর জিয়ান কায়সার প্রফেসর জিয়ান কায়সার পর্ব ৩১

প্রফেসর জিয়ান কায়সার পর্ব ৩১

প্রফেসর জিয়ান কায়সার পর্ব ৩১
জান্নাতুল ফেরদ্দোস ময়না

​রিত্তিকা সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে এলো ডাইনিং টেবিলে কাছে এসে সে সোজা জিয়ার পাশের চেয়ারটা টেনে বসে পড়ল। প্লেটে জ্যাম-পাউরুটি মাখিয়ে মুখে এক গাল পুরে নিয়ে বললো,
__​”জিয়া, আজ ভার্সিটি যাবি তো?”
​___”হুম, যাবো। তুই?”
__​”হুম, আজ তো টেস্টের খাতা দেখাবে।”
​__ “হ্যাঁ, কে জানে কত পাবো!”
​__ “আরেহ! ভালোই তো লিখেছি, তাই ভালোই পাবো, দেখিস!”
​ঠিক তখনই পাশ থেকে রেনিয়া কায়সার কড়া গলায় বলে উঠলেন, “খেতে খেতে এত কথা বলতে নেই রিত্তিকা!”
​রিত্তিকা একটু জিব কেটে চুপ হয়ে গেল। ডাইনিং টেবিলে হালকা নীরবতা নামতেই আজমল কায়সার চায়ের কাপ নামিয়ে রেখে স্ত্রী রেনিকে জিজ্ঞেস করলেন,

__”তা তোমার ছেলে কবে আসবে, রেনি?”
​রেনিয়া কায়সার একটু বিরক্ত হয়ে বললেন,
__ “চলে আসবে তাড়াতাড়ি।”
​ ফের গম্ভীর গলায় বললেন,
__ “তোমার এই প্রশ্রয়ের জন্যই ছেলেটা বিগড়ে যাচ্ছে। কোনো সময় তো শাসন করতে দাও না! জিয়ানের বিয়ের মাত্র দুই দিন পর গেল, এখনো সে আসার নাম করছে না!”
__​”চলে আসবে বললাম তো! সকালে উঠে এমন করেন কেন?”
​পরিস্থিতি কিছুটা গরম হচ্ছে দেখে নওশাদ কায়সার সবাইকে থামিয়ে দিয়ে বললেন,
__”আচ্ছা, এবার সবাই চুপ করে খাও তো। আর হ্যাঁ, বাবা সামনের মাসে আসবেন। ওনার নাকি এবার বৃদ্ধাশ্রমে থাকতে খুব ভালো লাগছে!”
​রিত্তিকা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,
__”আব্বু, কিন্তু দাদু ওখানে কেন থাকে?”
​নওশাদ কায়সার মৃদু হেসে বললেন,

__”বাবা মাসখানেক করে বৃদ্ধাশ্রমে গিয়ে থাকেন, এতে ওনার নাকি খুব ভালো লাগে। একটু নতুন পরিবেশ, সমবয়সী মানুষ—ওটাই ওনার ভালো লাগার জায়গা।”
__​”ওও…” রিত্তিকা মাথা নাড়ল।
​খাওয়া-দাওয়া শেষ করে সবাই যার যার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। রিত্তিকা ফোনে হাসিমুখে আহনাফের সাথে কথা বলতে বলতে ঢুকলো।
​জিয়ান তখন ঘরেই ছিল। রিত্তিকার মুখে আহনাফের সাথে এমন হেসে হেসে কথা বলা দেখেই জিয়ানের মেজাজটা খিঁচে গেল। বুকের ভেতর হালকা হিংসার আগুন জ্বলে উঠল। মনে মনে বিড়বিড় করল—
__‘ফের ওই ছেলের সাথে কথা বলছে? দাঁড়াও, তোমার শিক্ষা তোমায় পেতেই হবে!’
​জিয়ানের মাথায় সাথে সাথে একটা শয়তানি বুদ্ধি খেলে গেল।
আজ তাদের ক্লাসের টেস্ট পরীক্ষার খাতা দেখচ্ছিল জিয়ান। খাতাগুলো আগে থেকেই দেখা ছিল, কিন্তু মার্কস বসানো বাকি ছিল। জিয়ান একটু বাঁকা হেসে রিত্তিকার খাতাটা টেনে বের করল।
​খাতায় দারুণ লিখেছিল রিত্তিকা, ২৭/২৮ অনায়াসেই পায়। কিন্তু জিয়ান খাতার ওপরে বড় বড় করে লিখে দিল— ১৮

___’বেশি করে অন্য ছেলেদের সাথে কথা বলো, আমিও বেশি করে মার্ক কেটে নেব!
​ঠিক তখনই রিত্তিকা দরজায় এসে দাঁড়াল। জিয়ান দ্রুত খাতাটা ঢেকে ফেলল।
​রিত্তিকা স্বাভাবিক গলায় জিজ্ঞেস করল, “আপনি খাবেন না?”
​জিয়ান খাতা গুছিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে ভাবলেশহীন মুখে
বলল, “হ্যাঁ, আমি খেয়ে আসছি। তুমি রেডি থাকো।”
__​”আচ্ছা।”
​জিয়ান রুম থেকে বেরিয়ে যেতেই রিত্তিকার নজর গেল স্টাডি টেবিলের ওপর রাখা খাতার বান্ডিলটার দিকে। তার চোখ দুটো কৌতূহলে চকচক করে উঠল।
__​”এগুলো তো আমাদের টেস্ট পরীক্ষার খাতা! দেখি তো আমি কত পেয়েছি!”
​পা টিপে টিপে টেবিলের কাছে গিয়ে খাতাগুলো উল্টাতে লাগল রিত্তিকা। কয়েকটা খাতা পরেই পেয়ে গেল নিজের নাম লেখা খাতাটা। কিন্তু খাতা খুলেই তার চোখ ছানাবড়া!

__​৩০-এ ১৮?!
​রিত্তিকার মাথার রগ লাফিয়ে উঠল। রাগে তার গাল দুটো লাল হয়ে গেল।
___”আমি ৩০-এ ১৮ পেয়েছি? কিভাবে সম্ভব! সব লিখেছি, একটা উত্তরও ভুল নেই, তবুও ১৮?! নিশ্চয়ই ইচ্ছা করে ১৮ দিয়েছে! লোকটার মন চাচ্ছে একদম গলাটা টিপে ধরি!”
​রাগ কাটতে না কাটতেই রিত্তিকার মাথায় বুদ্ধি খেলে গেল। একটা দুষ্টুমি ভরা চওড়া হাসি ফুটে উঠল তার মুখে।
___​”না থাক! একমাত্র বর আমার, মেরে ফেলে লাভ নেই। তার চেয়ে বরং… ১৮-কে ২৮ করে নিই! তাহলেই খেলা সমান, হি হি!”
​রিত্তিকা কলম বের করে খুব যত্ন করে ১৮-এর এক সংখ্যাটাকে বাঁকিয়ে সুন্দর করে দুই বানিয়ে দিল!
​তারপর খাতাটা ঠিক যেভাবে ছিল, আগের মতোই বান্ডিলে সাজিয়ে রেখে মুচকি হাসতে হাসতে রেডি হতে চলে গেল।
​ভার্সিটিতে আজ প্রথম ক্লাসটাই ছিল জিয়ানের।
​জিয়ান গাম্ভীর্য বজায় রেখে ক্লাসে ঢুকতেই সব স্টুডেন্ট দাঁড়িয়ে সালাম দিল। জিয়ান মৃদু হেসে সালামের উত্তর দিয়ে বলল,

“বসো আজ তোমাদের টেস্ট পরীক্ষার খাতা দেখাব।”
​সবাই বুক টিপটিপ করে বসে রইল। জিয়ান একে একে সবাইকে নাম ডেকে খাতা দিতে লাগল।
​অবশেষে এলো রিত্তিকার খাতা। খাতাটা হাতে নিতেই জিয়ানের চোখ কপালে উঠে গেল!
​বড় বড় করে লেখা ২৮!
​জিয়ান মনে মনে চরম অবাক হয়ে বিড়বিড় করল, ‘২৮ কিভাবে এলো?! আমি তো স্পষ্ট মনে আছে ১৮ দিয়েছিলাম!
​জিয়ান স্তব্ধ হয়ে খাতার দিকে তাকিয়ে আছে দেখে রিত্তিকা উঠে দাঁড়িয়ে হাত বাড়িয়ে মিষ্টি গলায় বলল,
__”স্যার, আমি খাতাটা পাইনি…”
​জিয়ান কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে রিত্তিকার দিকে তাকাল, তারপর কোনোমতে খাতাটা এগিয়ে দিয়ে বলল,
__”হ্যাঁ… এই নাও।”
​রিত্তিকা খাতাটা হাতে নিয়েই চিৎকার করে উঠল,
__”বাহ! ২৮! আমি তো মনে হয় সবার থেকে বেশি পেয়েছি!”
​পাশে বসা নিহারিকা খাতা দেখে চোখ গোল গোল করে বলল,
__”বাহ রিত্তি! দারুণ তো! সত্যি সবার থেকে বেশি পেয়েছিস!”
​রিত্তিকা জিয়ানের দিকে তাকিয়ে একগাল হেসে বলল,
__”হুমম, কষ্ট করলে ফল পাওয়া যায় রে!”
​সামনে দাঁড়িয়ে থাকা জিয়ান তখন রিত্তিকার সেই চতুর হাসি দেখে আসল রহস্য বুঝতে পারল যে এটা ওরই কাজ।
​আর রিত্তিকা জিয়ানের সেই বেকুব মার্কা চেহারা দেখে মনে মনে হেসে কূল পাচ্ছে না!

​ভার্সিটি শেষে বাড়ি ফিরে ফ্রেশ হয়ে রিত্তিকা সোজা রান্নাঘরের দিকে গেল। সেখানে গিয়ে দেখল শাশুড়ি রিহানা কায়সার বেশ যত্ন করে কী যেন বানাচ্ছেন।
___​”আম্মা, কী করছেন?” রিত্তিকা কৌতুহল নিয়ে কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করল।
​রিহানা কায়সার প্লেটে পুডিং সাজাতে সাজাতে সুন্দর একটা হাসি দিয়ে বললেন,
__ “পুডিং বানালাম রে মা। সেটাই প্লেটে গুছিয়ে নিচ্ছি, জিয়ান খেতে খুব পছন্দ করে তো তাই।”
__​”ওও, আচ্ছা…” রিত্তিকা প্লেটের দিকে তাকাল।
​ঠিক তখনই বাহির থেকে নওশাদ কায়সারের গলা পাওয়া গেল, “রিহানা! এদিকে একটু এসো তো!”
​রিহানা কায়সার প্লেটটা টেবিলের ওপর রেখে রিত্তিকার দিকে তাকিয়ে বললেন,
__”শোন মা, এটা তুই একটু জিয়ানকে দিয়ে আয় তো।” বলেই তিনি নওশাদ কায়সারের ডাকে ঘরের বাইরে চলে গেলেন।
__​”আচ্ছা,” রিত্তিকা মাথা নাড়ল।
​শাশুড়ি চলে যেতেই রিত্তিকার চোখ গেল পাশে রাখা ঝাল অর্থাৎ মরিচের গুঁড়ার কৌটোটার দিকে। এক মুহূর্তের মধ্যে তার মাথায় একটা মারাত্মক দুষ্টু বুদ্ধি খেলে গেল!
__​”আমাকে মার্কস কম দিয়েছিলেন না প্রফেসর সাহেব? দাঁড়ান, এবার একটু ঝাল খান! বোঝেন মজা!”
​রিত্তিকা তড়িঘড়ি করে মরিচের গুঁড়ার কৌটো থেকে কিছুটা ঝাল তুলে পুডিংয়ের মাঝখানটায় ঢুকিয়ে দিল। তারপর ওপরের অংশটা এমনভাবে সুন্দর করে সমান করে দিল, যাতে বাইরে থেকে বিন্দুমাত্র বোঝার উপায় না থাকে। মুখে এক চিলতে বিজয়ের হাসি নিয়ে সে প্লেট হাতে ঘরের দিকে রওনা হলো।

​জিয়ান তখন ঘরে ল্যাপটপ খুলে গভীর মনোযোগ দিয়ে ভার্সিটির কাজ করছিল।
​রিত্তিকা ঘরে ঢুকে প্লেটটা টেবিলের ওপর রেখে বেশ মিষ্টি গলায় বলল,
__ “প্রফেসর সাহেব, আপনার জন্য পুডিং নিয়ে এসেছি! খেয়ে নিন।”
​জিয়ান ল্যাপটপের স্ক্রিন থেকে মুখ তুলে রিত্তিকার অস্বাভাবিক মিষ্টি স্বভাবের দিকে একনজর তাকাল। সন্দেহ হলেও প্রকাশ না করে বলল,
__”রাখো, পরে খাচ্ছি।”
__​”না, এখনই খান!” রিত্তিকা একপ্রকার জেদ ধরেই বলল।
​জিয়ান আর কথা না বাড়িয়ে চামচটা হাতে নিয়ে বলল,
__”দাও।”
​জিয়ান পুডিংয়ের প্রথম বাইটটা মুখে দেওয়া মাত্রই তীব্র ঝাল টের পেল! চোখ দুটো তার এক মুহূর্তের জন্য বড় হয়ে গেল। কিন্তু তার যে ঝাল লেগেছে তা রিত্তিকাকে বিন্দুমাত্র বুঝতে দিল না। মুখের ভাব একদম স্বাভাবিক রেখে, যেন পৃথিবীর সবচেয়ে সুস্বাদু খাবার খাচ্ছে—এমন একটা তৃপ্তির ভাব নিয়ে আবার চামচটা পুডিংয়ের দিকে বাড়াল।
​রিত্তিকা তো হাঁ হয়ে জিয়ানের কাণ্ড দেখছিল! তার চোখ ছানাবড়া! ‘এ কী! লোকটার কি জিহ্বা নেই নাকি? এত ঝাল দেওয়ার পরও স্বাভাবিকভাবে খেয়ে যাচ্ছে!’
​আর সহ্য করতে না পেরে রিত্তিকা নিজেই বলে উঠল,

__”থাক, আর খাওয়া লাগবে না! দিন আমাকে!”
​জিয়ান তৃপ্তির হাসি দিয়ে চামচ নাড়িয়ে বলল,
__”উঁহু! ইটস ভেরি ইয়ামি!”
​রিত্তিকার রাগ আর সহ্য হলো না। সে মেজাজ সামলাতে না পেরে বলেই ফেলল,
__”কী যাতা বলছেন? কত ঝাল দিয়েছি জানেন? তবুও খেয়েই যাচ্ছেন!”
​জিয়ান ভ্রূ নাচিয়ে খুব শান্ত গলায় বলল,
__”তাতে কী হয়েছে?” বলেই সে আরেক বাইট পুডিং মুখে তুলে নিল।
​এবার রিত্তিকা একপ্রকার জোর করেই জিয়ানের হাত থেকে পুডিংয়ের বাটিটা কেড়ে নিল।
​জিয়ান নিষ্পাপ মুখে জিজ্ঞেস করল,

__ “কী হলো, নিয়ে নিলে কেন?”
__​”আর খাওয়া লাগবে না!” রিত্তিকা বাটিটা দূরে সরিয়ে রাখল।
​জিয়ান কাঁধ ঝাঁকিয়ে ল্যাপটপে হাত রেখে বলল, __”তোমার যা ইচ্ছা।”
​রিত্তিকা এক গ্লাস পানি ঢেলে জিয়ানের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, “নিন, পানি খান।”
​জিয়ান আড়চোখে পানির দিকে তাকিয়ে জবাব দিল, _”উহু, পরে খাবো।”
__​”যা ইচ্ছা তাই করুন গা!” রিত্তিকা চোখ পাকিয়ে গ্লাসটা টেবিলে ধপ করে রাখল। কিছুক্ষণ পর বললো,
“শুনুন, একটু পর আমাকে মার্কেটে নিয়ে যাবেন।”

প্রফেসর জিয়ান কায়সার পর্ব ৩০

​জিয়ান কাজের ফাঁকে জিজ্ঞেস করল, “কেন?”
​”দুই দিন পরেই তো আরিফ ভাইয়ের বিয়ে! কিছু জিনিসপত্র কিনতে হবে। আর বাসায় এখন কেউ নেই, আমি আর জিয়া ছাড়া। গ্যারেজে গাড়িও তো নেই আপনারটা ছাড়া! তাই আপনিই নিয়ে যাবেন।”
​জিয়ান ভাবলেশহীন মুখে সোজা বলে দিল,
“পারবো না।”

প্রফেসর জিয়ান কায়সার পর্ব ৩২

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here