তুমি আমার শেষবেলা পর্ব ৯
নীতি জাহিদ
হিমছড়ি থেকে সোজা ফিরে এসেছে ওরা। সন্ধ্যা হয়ে যাচ্ছে। এদিকটা রিস্ক ও হতে পারে। আগামীকাল বাকিটা স্পট ঘুরা যাবে। রাতের কক্সবাজার ভয়ংকর। তাই দ্রুত ফিরে এসে হোটেলে ডুকলো নাস্তার জন্য। হালকা নাস্তা সেরে রুমে কিছুক্ষন রেস্ট নিলো বাবা- মেয়ে। মায়া ফোন দিয়েছে। মোনা মায়াকে সব খুলে বলছে। কি কি হলো। মিনহাজ অফিসের কাজ করছে ল্যাপটপে বসে। ওরা কলাতলী দুদিন থাকবে নেক্সট রিসোর্ট বুক করেছে মেরিন ড্রাইভ রোডে। কাল মহেশখালি যাবে। কক্সবাজার এসেছে, মহেশখালী যাবে না তা তো হতে পারে না।
রুমে এসে কিছুক্ষন রেস্ট নিয়ে নয়টার দিকে সমুদ্রের পাড়ে গেলো। মিনহাজ দেখলো মেয়ে এক দৌড়ে ওই ফল বিক্রেতার কাছে গেলো। এখানে দাম কম ৩০ টাকা। তাই মিনহাজ দুটি নিলো। নাহ, এবার খেতে বেশ লাগছে। টক মিস্টি ফ্লেবার। কিছুক্ষন ঢেউ এর কাছে দাড়ালো। মিনহাজ মেয়েকে জিজ্ঞেস করলো সী ফুড খাবে কিনা। মেয়ে বললো, আজকে না, কালকে খাবে। আজকে শরীর টায়ার্ড এনজয় করতে পারবে না। ঝালমুরি, ফুচকা, রোলার আইস্ক্রিম খেলো ওরা। মিনহাজ মেয়েকে বললো,
” আম্মা আপনি খুশি? ”
” অনেক বাবা, আমার মনে হচ্ছে দুই বন্ধু মিলে ঘুরতে এসেছি। কিন্তু আমি কাউকে মিস করছি।”
“কাকে?”
” ওই যে তোমার ওই মি. এংরিম্যান ইমরান সাহেবকে। আমি শিউর সে থাকলে বলতো এটা খাবে না, ওটা খাবেনা। আন হাইজেনিক ব্লা,ব্লা ব্লা।”
মেয়ের কথা শুনে মিনহাজ অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে। মেয়েকে অবাক করে দিয়ে বললো,
” ইমরানের ঘুরার নেশা আরো বেশি। আমরা একসাথে অনেক ঘুরেছি।”
” এই গোমড়া মুখো ঘুরতেও জানে।”
বাবা মেয়ে এসব নিয়ে গল্প করতে করতে প্রায় রাত ১১ টা বেজে গিয়েছে বীচ এর সামনে। ঠান্ডা হিম শীতল বাতাস। মোনা কিছু মুক্তার গয়না দেখছে। মিনহাজ ফোনে কথা বলতে বলতে ভিড় থেকে সরে দাঁড়ালো। পাশ ফিরে দেখে মোনা নেই। আশ পাশ টা ভালো করে চেক করে দেখে কোথাও নেই। ছবি ধরে সবাইকে জিজ্ঞেস করলো। উপায় না পেয়ে হোটেলে ফোন দিলো মোনা গিয়েছে কিনা জানতে। যায়নি শুনে চিন্তায় পড়ে গেলো। ইমরানকে ফোন দিলো মেসেঞ্জারে । কক্সবাজার থানায় পরিচিত এসপি আছে ওর। কিন্তু রিং হয়ে ইমরানের কল কেটে গেলো। মিনহাজ চিন্তায় অস্থির। মেয়ে ছাড়া তার আর কেউ নেই। ছোট্ট মোনা কক্সবাজার এর কিছুই চিনেনা। ইমরান কল ব্যাক করলে মিনহাজ কেঁদে উঠে বলল,
” ইমরান আমার মেয়ে, মোনাকে পাচ্ছিনা”
ইমরান একটা বড় নিঃশ্বাস নিয়ে বলল,
” হোটেলে আসো আমি দেখছি”
মিনহাজ একটা রিক্সা নিয়ে হোটেলের সামনে চলে গেলো। গিয়ে দেখে ইমরান দাঁড়িয়ে আছে রিসেপশনের সামনে। ইমরানকে পেয়ে আবেগে জড়িয়ে ধরে কেঁদে দিলো। ইমরানকে এই মুহুর্তে এখানে দেখে চমকালেও মেয়ের টেনশনে প্রশ্ন করতে ভুলে গিয়েছে মিনহাজ। এর মধ্যে হোটেলের সামনে কয়েকজন পুলিশ চলে এসেছে। একসাথে সবাই বেরিয়ে পড়ে মোনাকে খুঁজতে। পুরো সুগন্ধা বীচ এর আশে পাশে সব জায়গা খুঁজে পেলো না। খুঁজতে খুঁজতে লাবনী পয়েন্ট এর দিকে গেলো সবাই। মিনহাজ বলে,
” এত দূর একা আসবে কিভাবে ও তো জানেই না এখানে লাবনী পয়েন্ট আছে।”
” কথা কম বলো। ও জানেনা ঠিক আছে, জব্বার তো জানে। তোমার কি একবারো মনে হয় নি ফ্লাইট উড়িয়ে মালয়েশিয়া থেকে আমি এখন এখানে কেনো এসেছি? সকালে ফোনে কথা বলার সময় যখন জব্বার তোমার সামনে ছিলো তখনই আমি জানতে পারলাম জব্বার কক্সবাজার এক মুহুর্ত দেরী না করে টিকিট কেটেছি। তুমি একা থাকলে চিন্তা হত না। সাথে মোনালিসা ছিলো। ওর মোনালিসাকে করা বিশ্রী উক্তি আমি শুনেছি ফোনে মিনহাজ ভাই।”
লাবনী পয়েন্টে এদিক সেদিক সবাই মিলে খোঁজা শেষ করে হঠাৎ ইমরানের চোখে পড়লো কেউ একটা কোনায় বসে গুটিশুটি হয়ে কাঁদছে। ইমরান একটু এগিয়ে গিয়ে দেখে মোনা। সামনে গিয়ে ডাক দিলো,
” মোনালিসা!!!”
মোনা ইমরানকে দেখে ভূত দেখার মত চমকে উঠলো। দৌঁড়ে এসে ইমরানকে ঝাপ্টে ধরলো। ইমরান দুহাত দিয়ে শক্ত করে আগলে রাখলো। মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। স্বাভাবিক করার জন্য মোনাকে বললো,
” লুক ফেয়ার লেডি, ডোন্ট ক্রাই। কি হয়েছে। তুমি এখানে কি করে এলে? এটা তো অনেক দূর। ”
মোনা কাঁদতে কাঁদতে বলে,
” বাবার কাছে যাব।”
ইমরান আর কথা বাড়ালো না মেয়েটা ভয় পেয়ে গিয়েছে বুঝতে পেরে। এরপর ওকে নিয়ে সামনে অগ্রসর হলো। নিজের হাতের মুঠোয় শক্ত করে ছোট্ট হাত খানা ধরলো যেন পালিয়ে না যায়। মোনা পরিচিত আশ্রয় পেয়ে আঁকড়ে ধরলো বলিষ্ঠ অমসৃণ হাতটা। ওর এখন মনে হচ্ছে আর কারো সাধ্য নেই ওকে এই বাঁধন থেকে মুক্ত করার। সেই শান্তি, বাবার পর সবচেয়ে বড় আশ্রয় কেনো ইমরান সাহেবকেই মনে হচ্ছে!! বেশি দিনের পরিচিত তো নয় ইমরান সাহেব!! এই মানুষটাকে মোনার চাই। মিনহাজ মেয়েকে দেখে দৌঁড়ে এসে বুকে টেনে নিলো। হোটেলে ফিরে মোনা রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নিলো। ইমরান পুলিশদের বিদায় দিলো। আপডেট জানাবে বললো। এমনি একটা জিডি করবে আগামীকাল তা জানালো। বাইরে থেকে রাতের খাবার নিয়ে আসলো ইমরান। মিনহাজের রুমটা এপার্টমেন্ট এর মত। ডাবল রুম। একটা বেলকনি। ইমরান সহ বসে রুমেই রাতের ডিনার টা সেরে নিলো। মোনা কেঁদে গাল ফুলিয়ে ফেলেছে। মিনহাজ মেয়েকে প্রশ্ন করলো,
“আম্মা গেলেন কিভাবে এতদূর? ”
“আমি যাইনি সকালে তুমি যেই লোকটার সাথে কথা বললে উনি এসে কথা বললো আমার সাথে। এরপর আমাকে বললো তুমি নাকি বলেছো আমাকে নিয়ে যেতে। তুমি একটু সামনে গিয়েছো। আমি তো ভাবলাম তোমার পরিচিত। এতকিছু তো বুঝিনি। আশে পাশে তোমাকে চোখ বুলিয়ে খুঁজলাম কিন্তু পেলাম না। তাই ভাবলাম উনি পরিচিত উনার সাথেই যাই। কিন্তু উনি আমাকে ওই বীচ এর সামনে নিয়ে গিয়ে কোথায় চলে গেলো। কত ডাকলাম কেউ এলোনা। কত গুলা বখাটে ছেলে কেমন করে তাকাচ্ছিলো আমি ওখান থেকে সরে এলাম। ফোন চাইলাম অনেকের কাছে, কেউ ফোন দিলোনা বাবা। কক্সবাজার খুব খারাপ।কেউ একটু হেল্প করে না। উলটা আমাকে দেখে একটা লোক বলে, দাম কত তোর? ”
কথা শেষ করে মোনা কেঁদে দিলো। মিনহাজ মেয়েকে আগলে ধরে বসে আছে। ইমরান পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বলল,
” মোনালিসা রাতের বেলা কক্সবাজার সেইফ না। আর কোথাও এভাবে যাবে না। বাবাকে না পেলেও যেখানে ছিলে সেখানে যদি থাকতে বাবাই খুঁজে নিতো। পৃথিবীতে সবাইকে বিশ্বাস করা ঠিক না। ”
“আমি তো বুঝতে পারিনি”
ইমরান দম ফেললো। স্নিগ্ধ গাল ফোলা মোনার দিকে চেয়ে ভাবলো, এই মেয়েকে নিয়ে অনেক কষ্ট পোহাতে হবে। হঠাৎ মনে হলো এত কি ভাবছি ওকে নিয়ে। উঠে চলে যাবে মিনহাজ থেকে বিদায় নিলো সেই মুহূর্তে মোনা এসে আবার জড়িয়ে ধরলো মিনহাজের সামনেই। কাঁদো কাঁদো গলায় বললো,
তুমি আমার শেষবেলা পর্ব ৮
” আপনি না থাকলে আমি কি করতাম ইমরান সাহেব!!”
বুকটা ধড়াক করে উঠলো। মিনহাজের দিকে চোখ দিতেই মিনহাজ হাসছে। সে তো জানেনা তার মেয়ের হেয়ালিপনা। মেয়ে অনেকদূর এগিয়েছে…
