তুমি আমার শেষবেলা পর্ব ১১
নীতি জাহিদ
আদিনাথ মন্দির থেকে ঘুরে ওরা স্বর্ণ মন্দির দেখতে গেলো। পুরোনো ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক এই মন্দির। এখানে ঢুকতে টিকিট দিয়ে ঢুকতে হয়। জুতা খুলে খালি পায়ে ভেতরে যেতে হয়। চারদিকটা ফুল গাছে ভরা। এই মন্দিরের ভেতর ১৩টি ছোট বড় মন্দির রয়েছে। বৃষ্টি পুরো জায়গাটা ভিজিয়ে দিয়েছে। ছোট ছোট শামুক দেখা যাচ্ছে গাছে,মাটিতে। মোনা কিছুটা ভয় পেয়ে বাবার হাত ধরলো। পেছনে তাকিয়ে দেখে ইমরান নিজের মত হাঁটছে। মিনহাজ মেয়েকে বর্ণনা দিয়ে বুঝাচ্ছে। ফটোগ্রাফিতে মিনহাজের পুরোনো শখ। ঘুরে ঘুরে ছবি তুলছে। মোনা ইমরানের কাছে এগিয়ে গিয়ে বলে,
” কথা বলছেন না কেনো আমার সাথে?”
” বলা কি বাধ্যতামূলক নাকি?”
ইমরানের এমন কথা শুনে ছোট্ট মনটা বি*ষ*ন্ন হয়ে গেলো। পুনরায় বলল,
” আমরা না ফ্রেন্ড? কাল ফ্রেন্ডশিপ করলাম?”
” তোমার ফ্রেন্ডশিপে আ*ঘা*ত বেশি, র*ক্তা*ক্ত করে।”
বোটে হাত কেটে যাওয়ায় রাগ করেছে। মোনা তো বুঝতে পারেনি এমন দূ*র্ঘ*ট*না ঘটবে। এরপর মিনহাজ সামনে চলে আসলো। ওরা বেরিয়ে আবার অটোতে চেপে বসলো। তারপর ঝাউবন, বৃষ্টি এবং জোয়ারের পানিতে ঝাউবন ভেসে ভেসে উঠেছে। সেদিকে না যাওয়াই মঙ্গল আপাতত। শুটকির বাজারের মত একটা জায়গায় গেলো। শুটকি দেখে নাক ছিটকালো মোনা। কিন্তু শুটকি খেতে অনেক মজা লাগে। মহেশখালীর পান দেখে টেস্ট করবে ভেবে আর করেনি মিনহাজ এবং ইমরান। দাঁত মুখ লাল হয়ে যায়। এর মধ্যে ঝড়ের পূর্বাভাস পাচ্ছে। আবার বোটে চেপে কক্সবাজার এর উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলো। ঢেউ ফুলে উঠছে। সমুদ্র অনেক উত্তাল। এবার মোনা ভয় পেলেও কাউকে ধরেনি। চোখ মুখ খিঁচে চুপচাপ বসে ছিলো। ইমরান মোনার দিকে তাকিয়ে একটু সামনে এগিয়ে গিয়ে মোনাকে এক হাত দিয়ে আগলে ধরলো কাছে টেনে নিলো।। মোনা কারো হাতের উপস্তিতি পেয়ে তাকিয়ে দেখে ইমরান। কেমন যেন বুকের ধুকপুকানি বেড়ে গেলো। এই অনুভূতি নতুন। কিন্তু মোনা মুখ ফিরিয়ে অন্য দিকে ফিরে রইলো। কি স্নিগ্ধ লাগছে মানুষটাকে। মিনহাজকে একটা ধমক দিলো ইমরান,
” ক্যামেরা রাখো, মোনালিসাকে ধরো। ভয় পাচ্ছে ও”
” তুই থাকতে আমার কিসের চিন্তা, তুই ধর।”
মোনা হা করে একবার ইমরানের দিকে তাকায় আরেকবার বাবার দিকে। নিজে নিজে ফিসফিস করে বলল,
” বাঘের ডেরায় পাঠিয়ে দিয়ে বাঘকে বলে বাঘ মামা দেখে রাইখো”
ইমরান একটু ঝুঁকে উত্তর দিলো।
” ঠিক এই জন্য তোমার সাথে আমি কথা কম বলি। সব কথার মিনিংলেস মিনিং বের করো”
“কেউ বলেছে নাকি কথা বলতে, হুহ।”
ইমরান চোখ রাঙিয়ে তাকায় মোনার দিকে। সমুদ্রের দিকে তাকাতেই দেখে পানিতে ফেনা। মোনা হাত দিয়ে ধরতে চাইলে ইমরান খপ করে ওর হাত টা ধরে ধমক দেয়,
” এ্যাঁই মেয়ে, একটা চড় দিব। নোংরা পানিতে হাত দিচ্ছ কেনো, এগুলা বীচ এর পানির মত স্বচ্চ না।”
মোনা ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে গাল ফুলিয়ে চোখের পানি ছেড়ে দিলো। ইমরান মিনহাজের দিকে তাকিয়ে দেখে সে প্রকৃতির ছবি তুলতে ব্যস্ত, বোটে বসা একজন এর সাথে গল্প জুড়ে দিয়েছে। কে বলবে এত বড় মেয়ের বাপ এটা! মেয়ের দিকে কোনো মনোযোগই নেই। মুখে বিরক্তিজনক শব্দ করলো ইমরান। মোনার দিকে আবার তাকিয়ে বলে,
” মোনালিসা লুক, এসব পানিতে শ্যাওলা থাকতে পারে, আরো অনেক জীবানু, দেখো পানি রঙ কত নোংরা। আশে পাশে বোতল,চিপসের প্যাকেট বিভিন্ন নোংরা জিনিস ভাসছে। হাত দেয় না কেমন। পরে এলার্জির সমস্যা হলে তো ঘুরতে পারবেনা।”
মোনার চুপ করে বসে আছে,মুখে কোনো শব্দ করলো না। কিছুক্ষনের মধ্যে আবার ঘাটে এসে ওরা পউশীতে যায় লাঞ্চ করতে। এত ভালো না। মোটামুটি মানের হোটেল। অনেক রকমের ভর্তা শাক, রূপচাঁদা মাছ নিলো। দাম নিলো ২৫০ টাকা ভর্তা প্লেট, রূপচাঁদা মাছ ৬০০ টাকা পার পিচ, সাথে ডাল।মোনার খাবার খাওয়ার ধরন দেখে ইমরান হাসছে। চিমটি দিয়ে ভাত খাচ্ছে মনে হয় যেন ভাত ব্যাথা পাবে। মিনহাজ মোনার প্লেট টেনে নিয়ে লোকমা ধরে ওকে খাওয়াতে শুরু করে বললো,
” আপনি যেভাবে খাচ্ছেন আম্মাজান আমাদের তো দুপুর গড়িয়ে রাত হবে।”
” আমি তো একসাথে এত খাবার খেতে পারিনা।”
মিনহাজ পুরোটা ভাত খাইয়ে দিলো। মিনহাজ ভাত খাওয়াচ্ছে, ইমরান চেয়ে আছে। মিনহাজ ইমরান এর দিকে তাকিয়ে বলে,
” মেয়েটারে বিয়ে দিব কেমনে বলতো, জামাই কি এভাবে খাওয়াবে? কাঁটা বেছে খেতে পারেনা, বড় মাছ বেছে দিতে হয়, আস্তে আস্তে খাওয়াতে হয়। আগে মায়া খাওয়াতো। এখন আমার কাঁধে দায়িত্ব।”
” এমন কারো সাথে বিয়ে দিবে যে কোলে বসিয়ে ভাত মেখে খাইয়ে দিবে। মেয়ে তোমার আদরের তাকে বুঝিয়ে দিবে। ”
মোনা ইমরানের দিকে তাকিয়ে লজ্জা পেলো। ইমরান মোনার চালচলন দেখে অন্যদিকে ফিরে খেতে লাগলো। মিনহাজ হাত ধুতে গেলে মোনা প্রশ্ন করলো,
” আপনি আমাকে কোলে নিয়ে খাইয়ে দিলে আপনার বাসার লোকজন কিছু মনে করবেনা???”
এহেন প্রশ্নে ইমরান হতচকিত হয়ে গেলো। দুই অধর আলগা হয়ে গেলো। বুকের দামামা বাজছে,শব্দতরঙ্গ ক্রমশ বেড়েই যাচ্ছে। এই মেয়ে কি শুরু করেছে।।এমন অদ্ভুত প্রশ্ন কস্মিনকালেও শুনেছে কিনা সে জানেনা। অথচ মেয়েটা ওর তীর ওর দিকেই ছুড়লো! কি বুঝাতে চাইলো আর কি বুঝলো এই মেয়ে। বিস্ময় কাটিয়ে উঠার আগে মিনহাজ চলে আসলো।
এরপর ওরা হোটেলে গিয়ে রেস্ট নিতে যার যার রুমে চলে গেলো। মিনহাজ তো বিছানায় মাথা রেখেই ঘুম। মোনা চুপি চুপি বেরিয়ে ইমরানের দরজা নক করলো। ইমরান মাত্র গোসল সেরে ট্রাউজার পরে গলায় তোয়ালে ঝুলিয়ে মাথা মুছতে মুছতে দরজা খুললো। মোনা ইমরানের দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে আছে। কালো হাল্কা কোকড়ানো চুল থেকে পানি পড়ছে, শরীরে এখনো বিন্দু বিন্দু পানি, বুকের লোমগুলো কেমন সতেজ। মাসল গুলা ফুলে উঠেছে। মোনাকে দেখে প্রশ্ন করলো,
” কিছু বলবে?”
” আপনার মাসল”
ইমরান ভড়কে গেলো। পরক্ষনে ভাবলো একদম উচিত হয়নি এভাবে আসা এই মেয়ের সামনে।এখন সরে গেলে ভাববে লজ্জা পাচ্ছি।কি বি*প*দ!
” আসল, অনেক দিনের পরিশ্রমের ফল। প্রতিনিয়ত জিম করি। কি বলবে সেটা বলো”
” গল্প করবো।”
” রুমে যাও। আমি ঘুমাবো।”
মোনা দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকে বসে পড়লো বেডে। ইমরান সোফায় বসতে বসতে গায়ে টি শার্ট গলিয়ে দিলো। ইমরান মোনার দিকে তাকিয়ে বলে,
” মোনালিসা, এখনো তুমি অনেক ছোট। তুমি যা করতে চাচ্ছ বা বুঝাতে চাচ্ছো কোনোটাই ঠিক নয়। সব আবেগ।”
” আমি তো আপনাকে কিছু বলিনি”
” আমার বয়স ৩৬ বছর চলে। গুনে গুনে ২১ বছরের গ্যাপ তোমার আমার। পড়াশোনা করো মিনহাজ ভাইকে খুশি করো। অনেক আশা করে তোমাকে নিয়ে। আর কি যেন বললে? তুমি তো কিছু বলোনি তাই না?। তোমার চোখের ভাষা কি আমি বুঝিনা? নাকি আমাকে তোমার সমবয়সী মনে হয়? তোমার জন্মের সময় তোমার মাকে তোমার বাবা সামলাতে গিয়ে তোমার প্রতি কেয়ার ঠিক ভাবে করতে পারেনি।তখন আমি আর নয়নই তোমাকে কোলে নিয়ে হেঁটেছি। রাত পার করেছি। তুমি যা ভাবছো বা করছো লোকে আমায় স্যুগার ডেডি বলবে। বুঝো স্যুগার ডেডির মানে? এই বয়সে সম্মান খোয়াতে পারবোনা মোনালিসা। আর একটি কথাও না রুমে যাও”
মোনা কথা গুলো মনোযোগ দিয়ে শুনে চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়ালো। আবার পিছিয়ে গিয়ে বললো,
“আমার কাছে আপনি এনটাইস এর গ্রে’সন এর মত”
” তুমি কি নিজেকে রিভার মনে করো নাকি? ওরে বাবাহ। কে শেখাইছে এসব। তুমি এসব বই পড়ো তাতো জানতাম না। আজই আমি মিনহাজ ভাইকে বলবো কোথায় ফিজিক্স, ম্যাথ,বায়োলজি পড়বে তা না সে এনটাইস পড়ছে। এসব উপন্যাস পড়া অফ করো। এগুলোই মাথা খারাপ করেছে তোমার। সবকিছুর একটা বয়স আছে। পজিটিভ নেগেটিভ আছে। তুমি নেগেটিভ টাই গ্রহন করলে।”
তুমি আমার শেষবেলা পর্ব ১০
” আপনি ক্যামিস্ট্রি বই টা ভালো করে পড়বেন কাজে দিবে। হুহ”
মোনা মুখ ভেঙচি দিয়ে নিজের রুমে চলে গেলো। আর ইমরান ওর যাওয়ার দিকে চেয়ে রইলো। এতটুকুন মেয়ে কি তেজটাই না দেখালো। এসব বন্ধ করতে হবে। নাহলে সামনে ঘোর বিপদ।
