তুমি আমার শেষবেলা পর্ব ১৩
নীতি জাহিদ
“ভিজে যাচ্ছিস মোনা??”
মোনা পেছন থেকে আসা কন্ঠের দিকে মনোযোগ না দিয়ে এখনো আগের জায়গায় ঠাঁয় দাঁড়িয়ে আছে। পাশের বাসার আম গাছটা বেয়ে পানি ওর রুমের বারান্দায় এসে পড়েছে। পর্তুলিকা গাছ গুলোতে হরেক রকম ফুল। পানিতে গাছের ধুলাবালি সাফ হয়ে গিয়েছে।
” বার বার বলছি ভিজে যাচ্ছিস, ভেতরে আয়। ঠান্ডার ধাৎ আছে তোর এই কথা কি ভুলে গিয়েছিস?”
আর কোনো বাক্য ব্যয় না করে মোনা চয়নের পেছন পেছন রুমে প্রবেশ করে। বেডের উপর বসে চায়ের কাপটা এক পাশে রাখলো। কেমন অন্য মনস্ক হয়ে আছে। সময় চোখের পলকে অতিবাহিত হয়েছে। মাঝে তিনটা বছর এর উপর অতিবাহিত হয়েছে। স্কুল, কলেজ এর গন্ডি পেরিয়ে মোনা এখন ভার্সিটির প্রথম বর্ষে। বাসা থেকে ক্যাম্পাস দূরে হয় দেখে এখানে একটা ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়েছে ওরা তিন বান্ধবী।
” মোনা তোকে আংকেল বার বার কল দিচ্ছে। তোকে না পেয়ে আমাকে কল দিয়ে বললো আধ ঘন্টার মধ্যে গাড়ি পাঠাচ্ছে রেডি হয়ে বের হতে।”
স্টেজ এর কারটেইন কালার এবং ফুলের কালার অনেকটা ম্যাচিং হওয়াতে বেশি সোবার লাগছে স্টেজ টা। কিছুক্ষন আগে বউকে স্টেজে এনে বসানো হয়েছে। হলুদ কাতান শাড়িতে কনেকে খুব মিস্টি লাগছে। তার উপর সেজেছে কাঁচা ফুলে। মোনা তখন থেকে কনেকে দেখছে। কনে মিনহাজদের এক ছোটবোনের মেয়ে, অন্যদিকের কনের বাবা বিজনেসম্যান । ব্যবসায়ীরা, বন্ধুরা সকলে স্বপরিবারে আমন্ত্রিত। কল্পনা আন্টি মোনাকে নিজের মেয়ের মত ভালোবাসে তাই না এসেও পারলো না। কনেকে দেখে মানসপটে নিজের ও এমন একটা ছবি একেছে। তবে মোনা তার গায়ে হলুদে সবুজ শাড়ি পড়বে বলে ঠিক করেছে।
ঘাড় ঘুরিয়ে চেয়ারে রানী কালারে জামদানী পরিহিত যুবতীকে দেখে মনে হলো, আজ কারো বুকের ধুকপুকানি বেড়ে গিয়েছে অস্বাভাবিকভাবে। যা অপ্রত্যাশিত ছিলো।লুকিয়ে চুরিয়ে রাখা আবেগ কেনো বেরিয়ে আসতে চাইছে। তবে এটাই কি চেয়েছিলো অবাধ্য মন। না এই অনুভূতি বড্ড পীড়াদায়ক। যুবতী তাকে রন্ধ্রে রন্ধ্রে গ্রাস করার ক্ষমতা নিয়ে জন্মেছে। খোঁপায় বেলীর গাজরা, হাতে এক ঝাঁকড়া কাচের চূড়ি। শাড়ির ভাঁজে, ব্লাউজের ডিজাইনে এতটাই শালীনতা, ভদ্রতা আর যত্ন প্রকাশ পাচ্ছে তা হয়তো সদ্য উনিশে পা দেওয়া কিশোরী বুঝতে পারেনি কেউ একজন তার এই রূপে ভস্ম হয়ে যাচ্ছে। হাত টা বুকের বাঁ পাশে ধরে রেখেছে। নিশ্বাস স্বাভাবিক রাখার প্রচেষ্টায় পাশ থেকে চেয়ার টেনে বসে পড়ে। বন্ধুরা সবাই ঘিরে ধরেছে।
” শরীর কি বেশি খারাপ লাগছে তোর?”
” উহু, ব্যস্ত হস না। ঠিক আছি আমি।”
সবাই একটু দূরে সরে গেলো। ইমরানকে সহজ হতে দেওয়ার জন্য।ভাবছে হয়তো এতটা পথ এসেছে প্রায় তিন বছর পর।তাই হয়ত শরীর খারাপ লাগছে। আরেকবার সামনে তাকাতেই ইমরান দেখতে পায়, একটা ছেলের সাথে মোনা গল্প করছে। ছেলেটার চোখের ভাষা ভালোনা। ইমরান সামনে থেকে উঠে ছাদে চলে যায়। একটা সি গা রে ট ধরিয়ে অম্বরের দিকে তাকিয়ে আছে। বুকটা পোড়াচ্ছে। হাতের ফিল্টার টুকু ফেলে নিচে নেমে আসে ইমরান। এত কষ্ট কেনো হচ্ছে।তারই বা বুকের ভেতরটা জ্বলছে কেনো?অনুভূতিরা আজ তার বিপক্ষে অবস্থান করছে।
সবাই কনেকে হলুদ দিচ্ছে। কালো পাঞ্জাবিতে আরো বেশি সুপুরুষ লাগছে। টান টান দেহ, রোদে পোড়া গায়ের রঙ। দূর থেকে দেখলে মনে হবে গায়ের রঙ এর সাথে পাঞ্জাবির রঙ একদম খাপে খাপ এতকিছুর পর ও বয়স বুঝা যায় না কেনো এই লোকের। নির্ঘাত বয়সচোরা স্বভাব আছে এদের জেনেটিকেলি। বিয়েতে আসা অনেক মেয়ের চক্ষু আটকে গিয়েছে এই মধ্যবয়সী ইমরানে। ছাদ থেকে নেমে আবার স্টেজের সামনে আসে, ফোনে কথা বলে পেছন দিকে ঘুরতেই বাড়ি খায় কারো সাথে। স্যরি বলে ঘাড় উঠাতেই দেখতে পায় সেই নিষিদ্ধ আকাঙ্খাকে। মোনা পলক না ফেলে চেয়ে আছে। ইমরান এর এখনো চোখ বন্ধ। পণ করেছে তাকাবেনা। এতে যে বুকের সিস্টেমিক ফাংশন ফেইল করতে পারে স্পষ্ট বুঝতে পারছে। চোখ খুলেই পাশ কাটিয়ে চলে যায় ইমরান।
নিজের পাতের ভাত গুলো নাড়াচাড়া করছে ইমরান। কিন্তু খেতে পারছেনা। আশেপাশে তাকিয়ে যখন কারো অস্তিত্ব অনুভব করলো না, তখন মনকে দমিয়ে না রেখে অকস্মাৎ মাথা তুলে মিনহাজকে বললো,
” মোনালিসা কোথায় মিনহাজ ভাই? ”
” আর বলিস না, এতক্ষন ভালোই ছিলো। হঠাৎ একটু আগে বলে, বাবা ড্রাইভারকে বলো বাসায় ড্রপ করে দিতে। চলে যাব।”
” ওহ।খেয়ে গিয়েছে?”
” নাহ, কল্পনা ওর জন্য আর ওর বান্ধবীর জন্য খাবার দিয়ে দিয়েছে। ফ্ল্যাটে গিয়ে খাবে হয়তো দুজন একসাথে।”
” কোন ফ্ল্যাটে?”
” মোনা আমার সাথে থাকেনা ইমরান। শুক্রবার এসে থেকে আবার চলে যায় শনিবার । আলাদা ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়েছে তিন বান্ধবী। ”
“অনেক বড় হয়ে গিয়েছে।”
” তা তো হয়েছে। মেয়ে আমার আগের মত নেই রে। চুপচাপ থাকে। মেয়েরা মায়ের সাথে অনেক ফ্রি থাকে। আমার মোনা তো মা পেলোনা।”
একরাশ হতাশা মিনহাজ এর চোখে।
” Tomar basar opposite e gach tolay achi, niche namo. ami opekkha korchi”
~ Imran Sharif
মোনার হাত পা কাঁপছে রীতি মতো। যাবে না যাবে না করতে করতে প্রায় এক ঘন্টা পার হয়ে গিয়েছে। সিনক্রিয়েট যেন না হয় তাই নিচে নেমে আসলো। এই বিল্ডিং টা ৮ তলা। ওরা ৭ তলা থেকে নামতে নামতে ৫ মিনিট লেগেছে। হাত পা এখনো কাঁপছে।নিচে নাইট ডিউটি করা কেয়ার টেকার বসে আছে। কি বলবে ভেবে সামনে দাঁড়ালে, লোকটা হাসি দিলো। বাসা থেকে লোক এসেছে বলাতে চাচা আর বাঁধা দিলো না। গাছ তলায় এক পাশে কালো পাঞ্জাবি পরে হাতে ফোন নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে আগের বেশভূষায়। মনোযোগ দিয়ে স্ক্রল করছে।অবশ্য মোনা নিজেও এতক্ষন হলো শাড়ি খুলেনি। কান্নার কারনে চোখ মুখ ফুলিয়ে বসে আছে। গালে অশ্রুর দাগ এখনো লেগে আছে। মেক আপ উঠানোর পর আরো স্নিগ্ধ লাগছে। পায়ের আওয়াজ শুনে মাথা তুললো ইমরান। ইমরান থেকে দূরত্ব বজায় রেখে পাশাপাশি দাঁড়ালো মোনা।
” কেমন আছো মোনালিসা ”
এতগুলা বছর পর এই নামটা শুনে মনে হলো এক পশলা বৃষ্টি হৃদয়কে ভিজিয়ে দিয়ে গিয়েছে। কথা বলতে ইচ্ছে করছে , তবুও কথা বলবে না।
” কথা বলবে না?”
মোনা চায়না মানুষ টা বেশিক্ষন তার সামনে থাকুক। তাই নিজের অনিচ্ছা সত্ত্বেও বললো,
” আলহামদুলিল্লাহ ভালো,আপনি?”
” হুম ভালো।”
” পরিণত লাগছে তোমাকে”
” কতটা? কারো বউ হওয়ার মত?”
ইমরান সম্মোহনী চোখে তাকিয়ে আছে। চোখ ফেরাতে পারছেনা কেনো? বেহায়া চোখ কেনো সামনে দাঁড়ানো মায়াবীনিকে এড়াতে পারছেনা। কিশোরীর গলার আওয়াজ কি স্পষ্ট। প্রশ্ন করার ধাঁচ কত সাবলীল। কিছু একটা ভেবে ইমরান বলল,
“হুম।”
“ধন্যবাদ ”
আবার নিরবতা। ইমরান অনেক কিছু বলবে ভেবেছে কিন্তু জড়তার জন্য সব গুলিয়ে ফেলছে। অনেক কষ্টে এই বাড়ির এড্রেস জোগাড় করে এখানে এসেছে। মিনহাজ ভাইয়ের মেয়ে না হলে এড্রেস কালেক্ট করাটা কোনো ব্যাপারই ছিলোনা। তার কাছ থেকে মেয়ের বাসার এড্রেস জানতে চাওয়াটা ভারী লজ্জার। পুনরায় নিরবতা ভেঙ্গে ইমরান প্রশ্ন করলো,
” ভালোবাসো আজ ও??”
” নাহ।”
মোনার এমন কাট কাট গলায় উত্তর শুনে ইমরানের মনে হলো কেউ তার কলিজা ধরে টান দিয়েছে। এত বছর বুকে আগলে রেখেছে এই নিষিদ্ধ ভালোবাসা যত্নের সাথে। সাহস হয়নি। সে তো এটাই চেয়েছিল মোনা ভুলে যাক তাকে। তবে আজ কি হলো।
” তবে ওই চোখের অশ্রু কার জন্য?”
” আপনি নিজেকে এত ভাগ্যবান মনে করেন? দুঃখিত এই চোখের পানি লজ্জার। তিন বছর আগে করা ভুলের কথা মনে পড়লেই চোখ দিয়ে পানি পড়ে। এনিওয়ে, কেনো এসেছেন এখানে?”
” এসেছিলাম তো অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করতে। কিন্তু এখন তার প্রয়োজন নেই।”
“ওহ, কাল বাসায় যাব। আপনি ও যাবেন। আমাকে ছেলের বাড়ি থেকে দেখতে যাবে।”
তুমি আমার শেষবেলা পর্ব ১২
কথা শেষ করেই মোনা চলে গেলো। দাঁড়িয়ে রইলো ইমরান। বুক ধরে বসে পড়ে গাছের ইট বাঁধানো বসার জায়গায়। হয়তো কোনো প্রেমিক পুরুষ গাছ তলা সাজিয়েছে তার প্রেমিকার কথা স্মরণ করে। এখন কয়জন বট গাছতলায় এভাবে বসার জায়গা করে সুসজ্জিতভাবে!!!
