তুমি আমার শেষবেলা পর্ব ১৪
নীতি জাহিদ
ড্রইং রুমের সোফায় সবাই বসে আছে। সেই আগের মত। সেদিন মায়ার বিয়ের কথা হচ্ছিলো, আজ মোনার। মিনহাজ বার বার অনুরোধ করাতে না করেনি। ইমরানকে দেখে হঠাৎ ছেলে পা ছুঁয়ে সালাম করতে এগিয়ে আসলে ইমরান দূরে সরে গিয়ে বুকে জড়িয়ে ধরে ছেলেকে। সবাই বিস্ময় নিয়ে তাকালে ছেলে বলে,
” স্যার আমাদের বুয়েটের ভিপি ছিলেন যখন আমরা ক্যাম্পাসে নতুন।”
ইমরান বুয়েট থেকে পড়েছে ইলেক্ট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এ। বিজনেস টাও শুরু করেছিলো ইলেকট্রনিকস দিয়ে। এরপর অন্যদিকে আগ্রহ থাকাতে আস্তে আস্তে বায়িং,সুইং,ফেব্রিকস সাথে বড় ইলেকট্রনিকস শো রুম। বুয়েটে পড়া অবস্থায় ছাত্ররাজনীতি করেছিলো। সেই সুবাধে অনেক মানুষের সাথে সখ্যতা ছিলো। যা পরে তার ব্যবসায়ীক জীবনে খুব সফলভাবে প্রভাব ফেলে।
এরপর বাকি সব কথা চলতে থাকে। মায়া একবার ইমরানের দিকে তাকায়। ওর চোখে এখনো সেই মোহ।নিজেকে সংযত করলো মায়া। বিয়ে হয়েছে এক বাচ্চার মা,এখন এসব তার জন্য বেমানান। কিন্তু ইমরান মানুষটাই যে ভালোবাসার। সহজে রাগে না, কি সুন্দর, সাবলীলভাবে হেসে সবার সাথে কথা বলে। ভেতর থেকে লাল এবং সোনালী কাঞ্চিপুরাম পরিহিত মোনালিসাকে নিয়ে বের হলো মায়া এবং সালমা।ছেলের মায়ের পাশে বসালো মোনাকে। সবার সব কিছু পছন্দ হলে ছেলে মেয়ে দুটিকে আলাদা কথা বলতে পাঠায়। ওরা যতক্ষন রুমে ছিলো ততক্ষন ইমরাম শ্বাসরুদ্ধ অবস্থায় বসে ছিলো। মনে প্রাণে চেয়েছে তাড়াতাড়ি বের হোক। মিনহাজের অসুস্থতা আজ মেয়েকে বিয়ে দিতে বাধ্য করছে। কেনো মিনহাজ অসুস্থ হলো, ইমরান মনে মনে দোয়া করছে যেন মিনহাজ সবসময় সুস্থ থাকে।
কথা বলা শেষে ওদের পাশে বসিয়ে আংটি পরানোর সময় ছেলে মোনার হাত ধরে। মোনা ইমরানের দিকে একবার তাকায়। দুইহাত মুঠ করে নিচের ঠোঁট কামড়ে মাথা নিচু করে ইমরান বসে আছে। চোখ দুটো ছলছল। এখনই চোখের পানি গড়িয়ে পড়বে। ইচ্ছামত হাত কচলাচ্ছে। মনে হচ্ছে একবার মোনাকে জড়িয়ে ধরতে চায়। একবার ওর বুকে মাথা রাখতে চায়। কি অধিকারে বলবে, “মোনালিসা না করে দাও। তুমি তো তোমার জেন্টালম্যান এর প্রেমে পড়েছিলে? কষ্ট দিও না জেন্টালম্যানকে।” কিন্তু এসব বলবে না ইমরান শরীফ। মোনা আপনমনে ভেবে তাচ্ছিল্য করে হাসলো। তবুও মোনার মনে হচ্ছে ইমরান চাচ্ছেনা আংটি টা পরানো হোক। অকস্মাৎ মোনা সেন্সলেস হয়ে গিয়েছে। পানি দিচ্ছে কিন্তু উঠানো যাচ্ছে না। ইমরান, মিনহাজ বাড়ির সকলে ভয় পেয়ে গিয়েছে। মোনার সুস্থতা কামনা করে ছেলেরা অন্য দিন আসবে বলে চলে গেলো। ডাক্তার এসে বলে গেলো প্রেসার কম তাই এমন হয়েছে। হওয়ারই কথা,সারাদিন ইচ্ছে করে কিছু খায়নি। রুমে এখন মিনহাজ, মোনা এবং ইমরান। মিনহাজ ইমরানকে বসিয়ে রুম থেকে বের হলো মোনার খাবার আনতে। ঘুমে আচ্ছন্ন মোনা। ইমরান মোনার হাত ধরে বসে আছে।
” এটা কি সৃষ্টিকর্তার ভালো ইশারা নাকি খারাপ ইশারা আমি জানিনা। তবে মোনালিসা তোমার হাত ধরে যখন ছেলেটি বসে ছিলো ওই মুহুর্তে আমার পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাচ্ছিলো। সত্যি রিংটা পরিয়ে দিলে আমি মেজর হার্ট এট্যাক করতাম। এত ভালোবেসেও প্রকাশ করতে পারিনা মোনালিসা। এরচেয়ে কষ্টের আর কি হতে পারে?”
কথা শেষ করে মোনার হাত টা নিজের বুকে ধরলো ইমরান। দরজা খচ করে আওয়াজ করতেই হাত ছেড়ে দিলো। মিনহাজ খাবার নিয়ে ঢুকেছে। কিছুক্ষন কথা বলে ইমরান বেরিয়ে আসে।
মাঝে কয়েকটা দিন পেরিয়ে যায়৷ ইমরান বা মোনা কেউই একে অন্যের দেখা পায় নি। ইমরান নিজের কাজে ব্যস্ত মোনা ভার্সিটি নিয়ে। মোনার ঘুম আসছেনা তাই বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালে দেখে কেউ একজন বেনজ্ জি ক্লাস নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এক মুহুর্তের জন্য মনে হলো এটা ইমরান। পরক্ষনে মনে হলো কি উলটা পালটা ভাবছি। এও সম্ভব নাকি!! আবার তাকিয়ে দেখে কিন্তু মুখটা ঝাপসা। মোনা নতুন সিমটা দিয়ে ইমরানের নাম্বারে কল দিয়ে পর্দার আড়ালে চলে গেলো। তাকিয়ে দেখে সত্যি ইমরান পকেট থেকে ফোন বের করে ফোন রিসিভ করেছে। মোনা ফোন কেটে দিলো। যেই ভাবা সেই কাজ। দরজা লক করে দিয়ে গায়ে হুডি চাপিয়ে,জিন্স,স্নিকার্স পরে নিচে নেমে আসে। গেইটে এসে দেখে দারোয়ান নাক ডেকে ঘুম। রাতের বাজে আড়াইটা। মনে মনে দোয়া করছে যেন ইমরান চলে না যায়। ক্লোরোফর্ম শি শি টা তে হালকা রুমালটা চেপে দারোয়ান এর নাকে ধরতেই ব্যাটা ঘুমে কুপোকাত। এরপর গেইট বেয়ে উঠে লাফ দিয়ে পড়লো ইমরানের গাড়ির সামনে। ইমরান ততক্ষনে গাড়িতে চেপে বসে মাত্র স্টার্ট দিবে,ধুপ করে সামনে কিছু পড়ার আওয়াজ শুনে গাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলো। সামনে এসে চক্ষু চড়কগাছ। দৌঁড়ে এসে মোনাকে উঠায়।
” মোনালিসা তুমি কোথ থেকে উদয় হলে?”
” আগে আমাকে ধরে গাড়িতে বসান। ধরা পড়লে আজকে আমি শেষ। ”
ইমরান মোনাকে কোলে তুলে সিটে বসিয়ে নিজেও বসে পড়লো।
” কোথায় যাব?”
” আপনার যেখানে ইচ্ছে।”
ইমরান গাড়ি নিয়ে নাইট ভিউ একটা রেস্টুরেন্টে আসলো। মোনাকে চেয়ারে বসিয়ে ফাস্ট এইড বক্স নিয়ে হাটু গেড়ে ওর সামনে বসে আছে। মোনা নিজ থেকেই বললো,
” এত কি ভাবছেন?? আমার পায়ে হাত দিয়ে স্নিকার্স খুলে ব্যান্ডেজ করে দিলে কি আপনার জাত যাবে।”
ইমরান ঠোঁট কামড়ে হাসছে।
” ইউ আর সো ক্লেভার মোনালিসা।”
“আই নো আই এম। তাই তো সেদিন সেন্সলেস হওয়ার ড্রামা টা করেছিলাম।”
ইমরান সাথে সাথে ধপাস করে ফ্লোরে বসে পড়ে।
” কিহ! কি ডেঞ্জারাস মেয়ে? পুরা বাসার মানুষ সব টেনশনে শেষ আর এই মেয়ে।”
” আমার কারো কিছুতে কিছু এসে যায় না। বাবার জন্য টেনশন হচ্ছিলো আর অন্য একজন আছে রিং পরানোর আগে তার দিকে তাকিয়েছিলাম, মনে হচ্ছিলো সেদিন যদি রিং টা আমার হাতে উঠে সে ভেতরে ভেতরে শেষ হয়ে যাবে। অবশ্য ভালোবাসা প্রকাশ না করাটা অনেক বড় অন্যায়ের।”
” আমি বিবাহিত”
” আমি জানি,সাথে এটাও জানি আপনার বিয়ে করা বউ এর সাথে সেপারেশন হয়েছে আরো অনেক বছর আগে।”
ইমরান কথা না বাড়িয়ে চেয়ার টেনে বসে টপিক চেঞ্জ করতে চাইলো।
” দেয়াল টপকালে কেনো?”
” কাউকে এক নজর দেখবো বলে”
মোনা নিজের চেয়ার থেকে উঠে পা খুড়িয়ে ইমরানের পাশের চেয়ারে বসে ইমরানের হাত জড়িয়ে ধরলো। ইমরান ভ্রু কুচকে তাকিয়ে আছে।
তুমি আমার শেষবেলা পর্ব ১৩
” বউ হব এই পুরুষটার ” আঙ্গুল দিয়ে ইশারা করে বললো মোনা।
” সেদিন কে যেন নাকোচ করে দিয়েছিলো আমাকে।”
মোনা চোখ রাঙালো। ইমরান উচ্চ শব্দে হেসে উঠলো। হাসলে এই লোকটাকে ভারী মিষ্টি লাগে। মিষ্টি তো মেয়েদের লাগে। তাহলে উনাকে কি লাগে? রসগোল্লা লাগে না না কালো জাম লাগে। উনি তো জাম কালার।
