মৌটুসী পর্ব ২৩
ঋতস্বিনী মাহবিশ
ধরনী থেকে সূর্য মামা বিদায় নিয়েছে অনেকটা আগেই। অন্ধকার নামার সাথে সাথেই ব্যস্ত শহরের অলিগলি আর রাজপথে হেডলাইটের হলদেটে আলোর মিছিল শুরু হয়েছে। সূর্য নিজে মুখ লুকালেও শহরের ক্লান্তি যেন বাড়ছেই। কর্মজীবী মানুষগুলোর ঘরে ফেরার তাড়া, আবার রাস্তার মোড়ে মোড়ে চায়ের দোকানের আড্ডা এখন প্রাণচাঞ্চল্য। শীতের এই সন্ধ্যায় এক কাপ চায়ের সাথে আলাপচারিতায় না মাতলে যেন কারোরই হয় না।
বিকেলের পর থেকে শোরুমে কাস্টমারের বেশ ভিড় ছিল। তাই প্রতিদিন সন্ধ্যা ছয়টার মধ্যেই মৌটুসীর ডিউটি শেষ হলেও, আজ কাস্টমার সামলাতে সামলাতে ঘড়ির কাঁটা সাড়ে ছয়টা পেরিয়ে গেল। রানিং কাস্টমারদের তো আর মাঝপথে ছেড়ে আসা যায় না। একরাশ ক্লান্তি নিয়ে অবশেষে সব গুছিয়ে শোরুম থেকে বেরিয়ে এল রুমু আর মৌটুসী। বাইরে ঠান্ডা পড়েছে বেশ। হুহু করে বাতাস বইছে। পরনের কার্টিগানটা আরেকটু ভালোভাবে টেনে বোতাম গুলো লাগিয়ে নিল মৌটুসী। রুমু চৌরাস্তার মোড় পর্যন্ত মৌটুসীর বাইকে করেই যাবে। তারপর তাদের বাড়ির রাস্তা দুদিকে ভাগ হয়ে গেছে। অবশ্য সেই মোড় থেকে অটোতে করে পাঁচ টাকা ভাড়াতেই রুমুর বাড়ি পৌঁছে যাওয়া যায়।
এদিকে মৌটুসীকে বেরোতে দেখে সামনের দোকানটার অন্ধকার কোণ থেকে আলিফ তার হাতের জ্বলন্ত সিগারেটটা ফেলে দ্রুত পায়ে এগিয়ে আসতে লাগল। ডেকে উঠল, “মৌ!”
গ্যারেজের দিকে পা বাড়িয়েছিল মৌটুসী আর রুমু। এই পর্যায়ে থেমে হাতের ডানে তাকাতেই পরিচিত মুখ আলিফের দেখা পেল মৌটুসী। আলিফ ততক্ষণে তাদের সামনে এসে দাঁড়াল। আলিফকে এই সময় এখানে দেখে মৌ ভ্রু কুঁচকাল।
“তুই?”
”হুম, চল সামনের চায়ের দোকানটাতে বসি।”
”না। এমনতেই আজকে দেরি হয়ে গেছে।”
”আরে সময় লাগবে না। চল, গুরুত্বপূর্ণ কথা আছে। চা খেতে খেতে বলি।”
মৌটুসী না করল না। এখন এক কাপ গরম চা পেলে সত্যিই ভালো হতো। চায়ের অছিলাতেই রাজি হলো সে। রুমুর দিকে তাকিয়ে বলল,
“রুমু চলো এক কাপ চা খেয়ে আসি।”
রুমু রাজি হওয়ার আগে একবার চোখ তুলে তাকাল আলিফের দিকে। তার চোখমুখে বিরক্ত স্পষ্ট। নিশ্চয় সে চাচ্ছে না রুমু তাদের সাথে থাকুক। একান্তই কথা বলবে হয়তো! প্রাইভেসির কথা চিন্তা করে রুমু বলল,
“আজকে না মৌ। বাসায় ফিরতে হবে। আমি বরং রিকশা নিয়েই চলে যাই। তুমি এসো।”
অতঃপর আলিফ আর মৌটুসী রাস্তার ওপারের টঙের দোকানটার দিকে এগিয়ে গেল। চাওয়ালাকে অর্ডার দিতে গিয়ে গলা উঁচিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“মৌ, চায়ের সাথে অন্য কিছু নিবি? ফুচকাও আছে কিন্তু।”
”না, শুধু চা। লাল চা।”
আলিফ এসে মৌয়ের পাশের টুলটার উপর বসল। কিছুক্ষণ চুপ থেকে প্রসঙ্গ তুলল সে,
“মাস্টার্সের ভর্তি তো শুরু হয়ে গেল। কবে হচ্ছিস?”
“হচ্ছি না।”
আলিফ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “হচ্ছিস না মানে?”
”হচ্ছি না মানে হচ্ছি না। মাস্টার্সে ভর্তি হচ্ছি না আমি।”
”পড়াশোনা বাদ দিবি?”
”বহুত পড়েছি জীবনে। এই এক মাস্টার্স না করলে কিছু আটকে থাকবে না। হুদাই টাকা আর সময়ের অপচয়।”
”এক বছরেরই তো ব্যাপার। এতটুকুর জন্য একটা ডিগ্রি বাদ রাখবি?”
”পরে একসময় করে নিব। এখন তো কোনো কিছু আটকে থাকছে না। অনার্সের সার্টিফিকেট দিয়েই সব জায়গায় আবেদন করতে পারছি। তাহলে? মাস্টার্স যেকোনো সময়ই করা যাবে।”
”তাও ঠিক!”
“তুই ভর্তি হলি?”
“না, হবো।”
এরই মধ্যে চাওয়ালা মামা দুই কাপ লাল চা দিয়ে গেল। আলিফ কাপ হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ সেদিকে তাকিয়ে থেকে আড়ষ্ট গলায় আস্তে করে বলল,
“মৌ! বিষয়টা আরেকবার ভাবা যায় না?”
এদিকে তখনই মৌটুসী গরম কাপে চুমুক বসাতে গিয়ে চোখমুখ কুঁচকে নিল। জিহ্বাটা মনে হয় গেল। মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল অস্ফুট আর্তনাদ।
“উফ!”
“কী হলো মৌ? ছ্যাকা লাগছে?” রীতিমতো অস্থির হয়ে পড়ল আলিফ।
“আস্তে খাবি তো নাকি! পানি দিব?”
”না, ঠিক আছি। বস।”
আলিফ ফের বসল। মৌটুসী ভ্রু কুঁচকে তার দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল, “কী যেন বলছিলি?”
আলিফ মাথা নুইয়ে কাপের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সেভাবেই বলল,
“মৌ! তুই বিশ্বাস কর, আমি চড়ুইকে কখনো নিজ সন্তানের চেয়ে কম করে দেখব না। আমাকে একটা সুযোগ দেওয়া যায় না?”
”আন্টির নাম্বারটা দে। কথা বলে তোর বাপ হওয়ার ব্যবস্থা করে দিতে বলছি। এতই যখন বাপ হওয়ার শখ!”
”মৌ মজা নিবি না। আমি সিরিয়াস।”
”আমিও সিরিয়াস। বুঝতে পারছি তোর কিসের প্রয়োজন। লজ্জা নেই। বয়সটা এমনই। এই বয়সেই তো বিয়ের আসল মজা!”
”তাহলে রাজি হয়ে যা। আমার তো কোনো সমস্যা নেই!”
মৌটুসী এবার ধৈর্য ধরে রাখতে পারল না। খোলস থেকে বেরিয়ে নিজের চিরচেনা রূপে চলে এল।
“এই ছ্যামরা এই? কী করস তুই? মাসে কয় টেকা কামাস? আমার মাইয়া পালতে খরচ কেমন জানস? আমার মাইয়ার স্কুলের বেতন তোর পকেট খটচের ডাবল। তার উপর পোশাক-জুতো, খাওয়া, খেলনা, চুলের প্রসাধনী, চামড়ার প্রসাধনী! আমিই হিমশিম খেয়ে যাচ্ছি! আর সে আসছে……
হঠাৎ থামল মৌটুসী। হুট করেই কিছু মনে হলো যেন,
“তুই না গত মাসে আমার থেকে পাঁচশ টাকা ধার নিছিলিস! টাকা দে আমার। এই টাকা দে! আমার থেকে ধার না নিলে নিজের একটা মাসও যায় না, আর সে আসছে আমার দায়িত্ব কাঁধে নিতে!”
আলিফ মাথা নুইয়ে বসে আছে। কথা তো ভুল বলেনি মৌ। কিন্তু এত ভারী বাস্তবতা কি আর প্রেমিক মন মানে?
মৌটুসী তাচ্ছিল্যের সাথে হেসে নিজের মতো বলেই চলেছে,
“আমি মাসে এত টাকা কামাইয়াও সব সামলাতে হিমশিম খাওয়ার জোগাড়। আর তুই ভবঘুরে দিন পার করে সেই দায়িত্ব নিবার জন্য উঠে পড়ে লাগছিস? এত সাহস কই থেকে আসে তোর?”
”মৌ! তুই শুধু খরচ টাকা এসবই দেখছিস। আর আমার ভালোবাসা?”
”দেখ আলিফ। জীবনে বহুত কষ্ট করছি। একবার না, বারবার ধ্বংসের দ্বারপ্রান্ত থেকে ঘুরে আসছি। এই ছোট্ট জীবনে বহুত অভিজ্ঞতা আছে। সাথে এটা জানাই দিয়ে গেছে, মানুষ মুখে মুখে যতই বলুক ভালোবাসাই সুখের হাতিয়ার। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সুখের মূল হাতিয়ার আর্থিক স্বচ্ছলতা, মানে টাকা ভাই টাকা। টাকা না থাকলে ভালোবাসা জানলা দিয়ে পালায়। আর সব কথার এক কথা, তোর প্রতি আমার সেরকম কোনো ফিলিংস নাই। তোরে দেখি নাই কোনোদিন তেমন নজরে। আমার চোখে তুই এখনো সেই অনার্স ফার্স্ট ইয়ারে পড়ুয়া তরুণ আলিফ, যার এখনো দাঁড়ি-গোঁফটাও ওঠেনি ঠিকমতন।”
নীরবতা…
নীরবতা ভেঙে চায়ে চুমুক দিয়ে মৌটুসীই আবার বলল,
“এখন বিয়া করলে একটা ব্যাটা মানুষরে করব। চাকরি-বাকরি করা ব্যাটা মানুষ। মাথায় চুল না থাকলেও সমস্যা নাই। পকেটে টাকা আর মনে একটুখানি সম্মান-ভালোবাসা থাকলেই হইব।”
”চাকরি কি আমি করব না মৌ? এখন বেকার, তাই বলে সারা জীবন এভাবেই থাকব? মাত্রই তো অনার্স শেষ হলো। একটু তো সময় দিবি! একটা ভালো চাকরির প্রিপারেশন নিতে গিয়েই তো কাজে লাগতে পারছি না।”
”অবশ্যই করবি। ভালো চাকরি করবি। সুন্দরী মেয়ে বিয়ে করবি। দুই-চারটা ছানাপোনা ডাউনলোড করবি। জাস্ট ভাব, সামনে তোর জন্য কত সুন্দর একটা জীবন অপেক্ষা করছে! তুই কেন হুদাই এক বুড়ির পেছনে পড়ে থাকবি?”
”আমার চোখে তুইই পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর নারী।”
”সুন্দরী? মহিলার কাতারে পড়ে গেছি! কিন্তু তুই বিয়ে করবি নাইন-টেনে পড়ুয়া কচি মেয়ে। তোর কথায় উঠবে বসবে। বিয়ের পর চুটিয়ে প্রেম করবি। বাসায় ফেরার সময় এক গোছা কাঁচের চুড়ি আর একটা গোলাপ নিয়ে এসে বউয়ের হাতে তুলে দিবি, দেখবি তোর বাচ্চা বউ খুশিতে ডগমগ হয়ে তোর পা থেকে জুতা জোড়া স্বয়ং খুলে দিবে। মানে অল্প খরচেই আনলিমিটেড সুখ। জীবন তো কেবল শুরু তোর ভাই।”
”আর তোর? আমরা তো একই বয়সের!”
মৌটুসী ঘাড় ঘুরিয়ে সামনের আধো অন্ধকার রাস্তার দিকে তাকাল। মৃদু হেঁসে বলল,”মেয়েদের জীবন একটু আগেই শুরু হয়। তাই হয়তো ঝরেও পড়ে আগেই!”
আবারো নিরবতা….
“আমার বেতনের অর্ধেকটা চড়ুইয়ের স্কুলের বেতন দিতেই চলে যায়। তার উপর যাবতীয় এটা ওটার খরচা তো আছেই! দিনদিন খরচ বাড়ছে, সামনে কিভাবে সব সামলাব বুঝতে পারছি না।” চিন্তিত মাতৃত্ব বোধ থেকে আনমনেই কথা গুলো বলল মৌ।
কিন্তু আলিফ উল্টোটা বুঝে চট করে বলল,
“মেয়েকে যখন এতই বোঝা মনে হচ্ছে তাহলে ওর বাপের কাছে দিয়ে আয়! তাহলে তো আর কোনো সমস্যা থাকছে না, তাই না?”
মৌটুসী কিছুক্ষণ অদ্ভুত স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল আলিফের দিকে। তারপর হঠাৎ বা হাতের পাঁচ আঙুল উঠিয়ে থাপ্পড় ইশারা করে রুক্ষ গলায় বলল, “এই হাতের থাবড়া খেয়ে সুন্দর চোপাটা বাঁকা করতে মন না চাইলে স্টপ যা। আমার মেয়ে আমার বোঝা, শালা?”
“চ্যাত্তাছস ক্যান মৌ? তোর কথাতে এমনই প্রকাশ পাচ্ছে!”
“এই জন্যই তুই একটা নাদান, অপরিপক্ক। আমার মাইয়ার বাপ হবার অযোগ্য। এবার বুঝলি তোকে রিজেক্ট করার কারন?”
বিচলিত হয়ে উঠল আলিফ,
“এভাবে বলিস না প্লিজ! আমি তো তোর কথার পরিপেক্ষিতে এমনই বললাম।”
মৌটুসী কোলের উপর থেকে টোট ব্যগটা ঘাড়ে তুলে উঠবার প্রস্তুতি নিল, “উঠতে হবে আমাকে, দেরি হয়ে যাচ্ছে।”।”
”মৌ, তুই কি তোর সিদ্ধান্তে অনড়ই থাকবি?”
”হান্ড্রেড পার্সেন্ট।”
”আমি যদি এখন ভালো একটা চাকরি পেয়ে যাই, তাও?”
”তাও।”
আলিফের মলিনতা উপেক্ষা করে উঠে দাঁড়াল মৌটুসী। যাওয়ার আগে এবার বেশ নরম স্বরে বলল,
”আমার কথায় মন খারাপ করিস না। তুই জানিস আমি একটু মুখের উপরই বলে দিই। যাইহোক, তোর বর্তমান অবস্থাতে তোকে অবজ্ঞা করছি না, ভালো স্টুডেন্ট তুই। অনেক দূর এগিয়ে যাবি। জীবন তো কেবল শুরু তোর। অযথায় মিছে মরিচিকার পেছনে না ছুটে ফোকাস কর তাতে। বিয়ে করবি একসময়, সন্তান আসবে ঘরে, নিজের সন্তান। তখন দেখবি পৃথিবীর সব মায়া তুচ্ছ তার কাছে। আজ ছোট ছোট কিছু সুখের হাতছানিতে বড় বড় সুখগুলো মিস করে যাস না। আসি। ভালো করে পড়।”
আলিফ এবার পকেট থেকে দুটো চকলেট এগিয়ে দিয়ে বলল, “চড়ুই পাখিকে দিস।”
মৌটুসী হাতে নিল সেগুলো। কিছু না বলে, কোনো পিছুটান না রেখে অন্ধকার রাস্তা ধরে নিজ গন্তব্যের দিকে একা হেঁটে চলল সে। পেছনে পড়ে রইল আলিফ, বাস্তবতার কাছে হেরে যাওয়া এক প্রেমিক পুরুষ।
গ্যারেজ থেকে বাইকটা বের করে তা স্টার্ট দিল মৌটুসী। ইঞ্জিনের মৃদু গর্জনে রাতের স্তব্ধতা খানিকটা কেঁপে উঠল যেন। কুয়াশার পাতলা চাদর ভেদ করে বাইকের হেডলাইটের আলো সামনের অন্ধকার রাস্তাটাকে চিরে এগিয়ে চলল। গন্তব্য তার এখন কেবল একটা বাড়িই নয়, তার পিছুটান, নাড়ির টান—তার চড়ুই পাখি।
চলতি পথে অবচেতন মনে একবার ভাবল সে, আলিফকে জীবনসঙ্গী হিসেবে পেলে মন্দ হতো না। তারা হয়তো একটা টোনাটুনির ছোট্ট সংসার পাততে পারত। কিন্তু সেই ছোট পরিসরের সংসারে চড়ুইয়ের জায়গা হয়তো নিশ্চিত হতো না। একজন জীবনসঙ্গী হিসেবে আলিফ হয়তো ভালোই হতো, কিন্তু ‘বাবা’ হিসেবে সে চড়ুইয়ের জন্য যথেষ্ট কি? নাহ! কী অবলীলায় বলে দিল সে, ‘চড়ুইকে তার বাপের কাছে পাঠিয়ে দে, সব সমস্যা সমাধান হয়ে যাবে।’ কিন্তু এটা আদৌ এজীবনে সম্ভব মৌয়ের কাছে?
আলিফের মানসিকতা তো কেবল এখনো একটা পাগলাটো প্রেমিকের মতোই, আবেগের জোয়ারে ভাসছে। কিন্তু মৌটুসীর জীবনটা অনেক আগেই বাস্তবতার কঠিন পাথরে শানিত হয়েছে। সে এখন কেবল একজন মেয়ে নয়, একজন মা সে। তাই তার জীবনে এখন কেবল প্রেমিক নয়, বরং একজন দায়িত্ববান পুরুষ প্রয়োজন। এমন এক জোড়া হাত, যা বিপদের দিনে শক্ত করে তার হাতটা ধরে রাখতে পারবে, যা আস্থার আশ্রয় হয়ে দাঁড়াবে। তার চাই একটা মানসিক সঙ্গী; সর্বোপরি, সেই সাথে তাকে অবশ্যই হতে হবে আর্থিক সঙ্গীও।
যে ছেলে এখনো নিজের সমস্যাটুকু সামলাতে না পেরে মৌটুসীর কাছে ছুটে আসে, সামান্য বিষয়েও ভেঙে পড়ে, সে মৌটুসীকে সাহস দেবে কীভাবে? যে নিজেকেই এখনো গুছিয়ে উঠতে পারেনি, সে চড়ুইয়ের মতো একটা ছোট্ট প্রাণের ভার বইবে কী করে? আর সব কথার মোট কথা, যার সাথে ঘর বাঁধতে মন সায় দেয় না, তার দিকে পা বাড়ানোর কোনো মানেই হয় না।
মৌটুসীদের বাড়ির গলিটা একটু সরু, তাই যথাসম্ভব ধীরগতিতেই স্কুটি চালিয়ে এগিয়ে চলেছে মৌ। এদিকে তার আগে আগে গলি ধরে নীতিও তাদের বাড়ির দিকে হেঁটে এগোচ্ছে। মৌটুসী তাকে পাস করে যাওয়ার সময় নীতি ডেকে উঠল, “মৌটুসী, দাঁড়া!”
মৌ স্কুটির ব্রেক চেপে থামল, চোখে-মুখে বিরক্তির ছাপ। নীতি দ্রুত হেঁটে এসে স্কুটির সামনে দাঁড়িয়ে রাস্তা আটকে দিল। মৌটুসী হেলমেটের ভাইজারটা উপরে তুলে বিরক্তিময় গলায় বলল, “কী সমস্যা নীতি আপু? মাঝপথে এভাবে থামতে বললে কেন?”
নীতির চেহারা রণমূর্তি। আগুন ঝরছে যেন। সে দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “সমস্যা আমার? নাকি সমস্যা তোর?”
মৌটুসী দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করল। শীতল গলায় বলল, “কী বলতে চাইছ সরাসরি বলো, আর না হয় রাস্তা ছাড়ো। তোমার মতো অঢেল সময় নেই আমার।”
”দুটো কথা শোনার সময় নেই, কিন্তু বড়লোক ব্যাটার আবেগকে মালা গেঁথে গলায় ঝুলানোর সময় ঠিকই আছে, তাই তো?”
মৌটুসী স্থির দৃষ্টিতে তাকাল, চোয়াল শক্ত করে বলল, “কাকে নিয়ে কী বলছ নীতি আপু? বলার আগে নিজের ভাষা ঠিক করো!”
”আমি ভাষা ঠিক করব! তোর চরিত্র ঠিক আছে? বড়লোক দেখলেই জিহ্বা দিয়ে লোল পড়ে, তাই তো? গলায় ঝুলে যেতে ইচ্ছে করে!”
”স্টপ ইয়োর ফাকিং মাউথ!” চিৎকার করে উঠল মৌ। হাত দুটো রাগে থরথর করে কাঁপছে তার, হ্যান্ডেলটা এত জোরে চেপে ধরেছে যে আঙুলের করগুলো রক্তহীন ফ্যাকাশে হয়ে উঠেছে।
কিন্তু নীতি মৌয়ের এই কঠোর অভিব্যক্তির কোনো তোয়াক্কা করল না, বিষোদ্গার করে চলল সে, “আহা, কত মধুর ডাক—’পাপা’! এতই যখন মেয়ের ইমোশনের ভান্ডার, তখন বিয়ে করে একটা নতুন বাপ তুলে দিচ্ছিস না কেন তাকে? নিজে ফায়দা করতে না পেরে মেয়েকে পিছে লাগিয়ে দিয়েছিস! ভালোই ছোটবেলা থেকে ট্রেনিং করিয়ে নিচ্ছিস…”
নীতি চলতি বাক্যটি শেষ করতে পারল না। তার আগেই মৌটুসী নিয়ন্ত্রণ হারাল। নিজেকে নিয়ে হাজারটা কথা হোক, সে সহ্য করে নেবে। কিন্তু তার চড়ুইকে নিয়ে করা একটা বাজে ইঙ্গিতও সে কোনোভাবেই বরদাস্ত করবে না।
’ঠাস!’
বাতাসে হাত ঘোরার শব্দ হতেই নীতির মুখটা একদিকে বেঁকে গেল। টাল সামলাতে না পেরে ধপাস করে মাটিতে পড়ে গেল সে। এবং ওঠার আগেই মৌটুসী স্কুটি থেকে নেমে এসে ওর সামনে ঝুঁকে বসল। দুই হাতে নীতির চুলের মুঠি শক্ত করে চেপে ধরে মৌটুসী দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “আমার মেয়েকে আমি ট্রেনিং দেব নাকি বাপ দেব, তা সম্পূর্ণ আমার ব্যাপার। তুই মাঝখানে নাক গলানোর কে, দুর্নীতি? কোন সাহসে আমাকে আর আমার মেয়েকে নিয়ে কথা বলিস? তোর কলিজাটা খুলে মেপে দেখব?”
নীতি যন্ত্রণায় ককিয়ে উঠল। তবুও ক্রোধ আর আক্রোশ থেকে মৌটুসীর ওপর পাল্টা আঘাত করতে হাত তুলতে ভুলল না। কিন্তু দক্ষ মৌটুসীর সাথে পেরে উঠল না। উঠার কথাও নয়। ছোটবেলা থেকেই এই মেয়ে মারামারি আর চুলোচুলিতে পিএইচডি প্রাপ্ত কি-না! নীতির হাত বন্দী হলেও মুখ নয়। বিন্দুমাত্র বিচলিত না হয়ে রক্তচক্ষু নিয়ে তাকিয়ে দাঁত খিঁচিয়ে বলতে লাগল সে,
”কী ভেবেছিস মা-মেয়ে মিলে দুই দিনের মায়ার জালে ফাঁসালেই বেরাককে পেয়ে যাবি? নিজের স্ট্যাটাস, কোয়ালিটি দেখেছিস কখনো? তোর মতো মেয়েরা জোর হলে তার বেড পার্টনার হতে পারবে, লাইফ পার্টনার না। দুদিন উল্টে-পাল্টে ইউজ করেই টিস্যু পেপারের মতো ছুড়ে দিবে ডাস্টবিনে। তখন কী করবি?”
মৌটুসী চোয়াল শক্ত করেই মৃদু হাসল। নীতির চুলের মুঠোয় হাতটা আরও দৃঢ় হয়ে বসল তার। একজন মায়ের কণ্ঠে অদম্য তেজ আর গর্ব ঝরতে লাগল, “শোন দুর্নীতি! আমি মৌ, আমি মা! তোর মতো সস্তা ন’টি নই আমি। ছুড়ে দেওয়া তো দূর, এই আমাকে ব্যবহার করার সুযোগটাই পাবে না কেউ, নো ওয়ান ক্যান! আর হ্যাঁ, এক বালতি শুভ কামনা তোর জন্য। খুব শীঘ্রই বীরের মা হয়ে নিজের বারোভাতারি লক্ষে পৌঁছে যা।”
নীতির হাতটা সজোরে ঝটকিয়ে দিয়ে উঠে দাঁড়াল মৌ। হেলমেটটা হাতে তুলে নিয়ে ঝাড়া দিয়ে ধুলো ঝেড়ে ফেলল। তারপর আর কোন দিকে না তাকিয়েই স্কুটিতে উঠে টান দিল সামনের দিকে।
নীতি আস্তে ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে সাইড ব্যাগটা কাঁধে তুলে নিল। আক্রোশ মাখা চোখে মৌটুসীর যাওয়ার দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে উঠল, “আজকে যা করলি তার জন্য বড় পস্তাতে হবে তোকে মৌটুসী।”
চড়ুই আজ একটু ভয়ে ভয়ে আছে। এসেছে পর্যন্ত মাম্মা তার খুব রেগে আছে। একটুতেই মাথা গরম হয়ে যাচ্ছে। যদিও এখন পর্যন্ত সে সরাসরি চড়ুইয়ের ওপর রাগ দেখায়নি, কিন্তু মায়ের এই চাপা ও গম্ভীর উত্তেজনা ছোট্ট চড়ুইয়ের মনে এক অদৃশ্য ভয়ের দেয়াল তুলে দিয়েছে।
মৌটুসী ব্যস্ত হাতে বিছানার ওপর গাদা করে রাখা কাপড়গুলো একে একে ভাঁজ করছে। মুখটা ফ্যাকাশে, চোখের কোণায় জমা ক্লান্তি ও অশান্তির ছাপ স্পষ্ট। চড়ুই এতক্ষণ নানা-নানির ঘরে ছিল। সেখান থেকে দৌড়ে এসে দরজায় দাঁড়িয়ে মায়ের ভাবসাব পর্যবেক্ষণ করে নিল। এরপর গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে টেবিলের উপর থেকে মৌয়ের ফোনটা নিয়ে ওর সামনে গিয়ে দাঁড়াল। মৃদু স্বরে বলল, “মাম্মা একটু পাপাকে কল দিবে? কথা বলি!”
মৌটুসী কাপড় ভাঁজ করতে করতেই নির্লিপ্ত গলায় বলল, “চড়ুই পাখি, কাজ করছি আমি। বিরক্ত করো না, সরো।”
চড়ুই এবার হাতের ফোনটা মায়ের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, “আচ্ছা, আগে একটু পাপাকে কল দিয়ে দাও!”
মৌটুসীর ধৈর্যের বাঁধ ভাঙল যেন। হাত থেকে অর্ধেক ভাঁজ করা কাপড়টা বিছানায় ছুড়ে ফেলে সে খপ করে মেয়ের দুই বাহু আলতো চেপে ধরল। তারপর যেন কোনো উন্মাদের মতো চিৎকার করে বলে উঠল, “এই কে তোমার পাপা? কে? ওই লোক তোমাকে জন্ম দিয়েছে, নাকি তোমার ডায়পার চেঞ্জ করেছে কোনোদিন? এই কালকে কোত্থেকে এক অজানা কেউ উড়ে এসে বসেছে তোমার জীবনে, তাও মাত্র দুদিনের জন্য! তারপর ঠিকই হারিয়ে যাবে, তার টিকিটাও খুঁজে পাবে না তুমি। একটা অতিথি পাখির জন্য এত দরদ কেন তোমার? এত আবেগ কোথায় পাও? সম্পর্কের কী বোঝো তুমি? আমাকে কেন এত পোড়াচ্ছ?”
মৌটুসীর চিৎকারে পাশের ঘর থেকে লাল বানু বেগম হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলেন। মেয়ের হাত থেকে নাতিকে ছাড়িয়ে নিয়ে ধমক দিয়ে উঠলেন ভদ্রমহিলা, “মৌ, কী হইতাছে এইহানে? পাগল হইলি? এইটুকুন একটা বাচ্চার লগে কেউ এমনে করে কথা কয়?”
এরপর ফুঁপিয়ে ওঠা চড়ুইকে জড়িয়ে ধরে আদর করতে লাগলেন, “বুবু আমার! নানুভাই, নয় কিচ্ছু হয় নাই।”
ছোট্ট চড়ুই মায়ের জটিল কথাগুলোর আগামাথা কিছুই বুঝতে পারল না। সে শুধু বুঝল, মাম্মা অনেক উঁচু গলায় তাকে বকা দিয়েছে। এই অভাবনীয় ধমকেই ডুকরে কেঁদে দিল সে। আস্তে আস্তে কান্নার শব্দ আরও উচ্চতর হয়ে উঠল। নানিমনিকে জড়িয়ে ধরে ক্রন্দনরত স্বরেই অভিযোগ জানাল, “নানিমনি, মাম্মা বকা দিয়েছে!”
লাল বানু বেগম চড়ুইয়ের পিঠে হাত বুলিয়ে আদুরী গলায় সান্ত্বনা দিতে লাগলেন, “আমিও দিছি নানু। আম্মারে বইকা দিছি। আরও বকমু। তুমি কাইন্দো না পাখি আমার!”
মৌটুসী অসহায় দৃষ্টিতে মেয়ের দিকে তাকিয়ে আছে। এবার কপাল চেপে ধপ করে বিছানার ওপর বসে পড়ল। কিছুক্ষণ একইভাবে বসে থাকার পর উঠে মেয়ের কাছে চলে গেল। চড়ুই সোফায় লাল বানু বেগমের কোলে বসে ছিল, উচ্চশব্দের কান্নাটা যদিও থেমেছে, কিন্তু থেকে থেকে ফুঁপিয়ে উঠছে। মৌ মায়ের কাছ থেকে মেয়েকে নিজের কাছে টেনে নিয়ে নিজের ওড়না দিয়ে চোখ-নাকের পানি মুছে দিল, এরপর বুকে জড়িয়ে নিয়ে আদুরী গলায় বলতে লাগল, “মা, আমার মা! আমার কিউটি পাই, লক্ষ্মীটি! আমার সেনাবাচ্চা। আমার আম্মাজান।”
চড়ুই চোখ ডলে অভিমানী গলায় বলল, “আমি তোমার মা হবো না। আমাকে বকা দিয়েছ তুমি।”
”মাম্মা সরি, খুব সরি। আর বকা দিব না, একটুও না। মাম্মা তার চড়ুই পাখিকে কত্ত ভালোবাসে! এসো ঘুমাব আমরা।”
মৌ চড়ুইকে কোলে নিয়ে বিছানায় চলে গেল। শরীর থেকে ওড়না, সোয়েটার সব খুলে রেখে মেয়েকে বুকের সাথে শক্ত করে জড়িয়ে নিয়ে শুয়ে পড়ল। “ঘুমাও কলিজা।”
চড়ুইও এবার বাধ্য মেয়ের মতো তার সবচেয়ে প্রিয় বুকটাতে আরামে মুখ গুঁজে চোখ বুজে নিল। মৌটুসী চোখ নামিয়ে মেয়ের নিষ্পাপ সরল মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে ওর মাথায় আলতো হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। অথচ তখন তার মাতৃ মনের ভেতর চলছে এক নিরন্তর নীরব আর্তনাদ,
”মাম্মাকে রাগাও কেন মা? মাম্মার মানা শোনো না কেন? অবুঝ তুমি, তো বুঝতে পারছ না, তুমি যে পথে হাঁটছ তা আসলে চোরাবালির পথ। উপর থেকে সুন্দর সমতল দেখালেও, তার নিচে লুকিয়ে আছে মরণ ফাঁদ। আবেগের বশে সেই অতল সমুদ্রে ডুবে মরবার জন্য এত উতলা কেন তুমি? আমার চড়ুই পাখি, তুমি না বুঝেই আমাকেও হাত ধরে সেই ফাঁদে টেনে নিচ্ছ। অথচ তোমার মাম্মা এতটাও শক্তিশালী নয়, একবার পা পিছলে গেলে তোমাকে নিয়ে ভেসে ভেসে কিনারায় ফিরে আসার সাধ্য আমার নেই।”
এক ফোঁটা তপ্ত অশ্রু রমণীর চোখের কার্নিশ বেয়ে বালিশে গড়াল। আরেক ফোঁটা গড়াতে যাবে, তার আগেই মৌ হাত তুলে আঙুলের ডগায় উঠিয়ে নিল অশ্রুবিন্দুটি। নিজেকে সামলে নিয়ে আবারও মেয়েকে বুঝিয়ে বলতে চাইল,
মৌটুসী পর্ব ২২
”তোমার মাম্মা উনার স্ট্যাটাসের নয় সোনা। একই পৃথিবীতে বাস করলেও তাদের আর আমাদের জগৎ সম্পূর্ণ আলাদা। তারা আমাদের জন্য মরীচিকা; যাদের হয়তো খুব কাছ থেকে দেখা যায়, অনুভব করা যায়, কিন্তু আঁকড়ে ধরে সারাজীবন বাঁচা যায় না।”
