Home Born to be villains Born to be villains part 32

Born to be villains part 32

Born to be villains part 32
মিথুবুড়ি

শিউরে তোলা তীব্র হুংকার তুলে একটি বাজপাখি উড়ে গেল ওয়াশিংটন হোটেলের ওপর দিয়ে। থমথমে, হিমশীতল শহরের বুক চিরে একই সময়ে শহরে প্রবেশ করল দুটি শিকারি দল। নির্দিষ্ট শিকারের উদ্দেশ্যে ভিন্ন দুই গন্তব্যে দ্রুত ছুটে চলল তারা৷ একদল রওনা হলো সিসিলোর দিকে, অন্য দলের কতগুলো গাড়ি এসে থামল সরাসরি ওয়াশিংটন হোটেলের সামনে।
ছয়তলার সুবিশাল তিন কক্ষবিশিষ্ট অ্যাপার্টমেন্টে ইবরাত তখন একাই ছিল। ভেতরের পরিবেশ নিস্তব্ধ। বিছানায় বসে দাঁত দিয়ে নখ কাটতে কাটতে সে খেলা দেখছিল। খেলার খ-ও বোঝে না সে। স্রেফ ন্যাসোর দেখাদেখি দেখা। প্রিয় মানুষের পছন্দের জিনিসকে ভালোবেসে যদি তার কিছুটা কাছে যাওয়া যায়, এই ভাবা আরকি!

হাতের নখ কাটা শেষ করে ইবরাত এবার পায়ের নখে দাঁত বসাল। বালিশের পাশে রাখা মোবাইলে তখন লাউভ স্ট্রিম চলছিল। দাঁত দিয়ে নখ কাটার সঙ্গে গভীর মনোযোগে খেলা দেখছিল সে। বল যখন যে দলের পায়ে যাচ্ছিল, সে সেই দলের জয়ের জন্যই দোয়া করছিল। পা টেনে মুখের কাছে আনতে গিয়ে দু-একবার দুমড়ে-মুচড়ে চিৎ হয়েও পড়েছে।
হঠাৎ অচেনা একটি মেয়ে সরাসরি তার বেডরুমে ঢুকে পড়ল। হাই হিলের ঠুংকর ঠুংকর শব্দে চমকে উঠে মুখ তুলে তাকাল ইবরাত। দেখল মেয়েট ঠোঁটের কোণে মাপা, কৃত্রিম হাসি ঝুলিয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে। মেয়েটির পরনে নামমাত্র পোশাক, যা সম্ভবত কেবল স্তনের বোঁটা ঢেকে রাখার জন্যই পরা। চেহারায় একধরনের তীক্ষ্ণ ভাব রয়েছে। বব-কাট চুলের ধারালো ঝলকে সেই তীক্ষ্ণতাকে আরও বেশি উগ্র দেখাচ্ছে।
মেয়ে হওয়া সত্ত্বেও এমন পোশাক দেখে ইবরাতের ভীষণ অস্বস্তি হলো। লজ্জায় সে সঙ্গে সঙ্গে দৃষ্টি সরিয়ে নিল। অস্বস্তি কাটাতে বিছানা থেকে চট করে একটি সাদা স্কার্ফ তুলে নিজেকে ঢেকে সোজা হয়ে দাঁড়াল।
ইবরাত আবারও চোখ তুলে তাকাল। মেয়েটির দৃষ্টি অত্যন্ত ক্ষুরধার, যেন স্কেলের দৃষ্টি দিয়ে ইবরাতকে মেপে নিচ্ছে সে। গাঢ় লালচে-খয়েরি লিপস্টিকে রাঙানো ঠোঁটের কোণে জমে থাকা সেই কুৎসিত হাসিতে ইবরাতের গা গুলিয়ে উঠল। তার পক্ষে বেশি সময় মেয়েটির দিকে তাকিয়ে থাকা সম্ভব হলো না। চোখ ফিরিয়ে নিয়ে ইবরাত সামনের দিকে তাকাতেই দেখতে পেল অ্যাপার্টমেন্টের মূল দরজাটি হাঁ করে খোলা পড়ে আছে।
“আপনি ভেতরে এলেন কীভাবে? কে আপনি?”

তাসার ঠোঁটের এককোণে ভেসে উঠল লাস্যময়ী হাসি। সে অত্যন্ত সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে ইবরাতকে আপাদমস্তক মেপে নিল। দৃশ্যত তার চেহারায় অসন্তোষ ফুটে উঠল। ঠোঁট উল্টে অপ্রসন্ন মুখে তাসা বলে উঠল,
“সো ইয়্যু আর দ্যাট গার্ল! যার জন্য স্টারবয় নিজের সাম্রাজ্য ত্যাগ করে ফেরারি হয়েছে?”
তাসা এক পা এগিয়ে আসতেই ইবরাত ভয়ে শুকনো ঢোক গিলে পিছিয়ে গেল। মেয়েটাকে তার মোটেই সুবিধার মনে হচ্ছে না। কাঁপা গলায় ইবরাত বলল,
“কে… কে আপনি? এভাবে এগিয়ে আসছেন কেন? আমি কিন্তু উনাকে ডাকব!”
ইবরাত ন্যাসোকে বোঝাল। ন্যাসে আর লুকাস চার তলার অ্যাপার্টমেন্টে রয়েছে। রিচার্ড আর এলিজাবেথ গিয়েছে লং ড্রাইবে।

ইবরাতের কথা শুনে তাসা উপহাসের সাথে হেসে উঠল,“কাকে ডাকবে? স্টারবয়কে? ওকে ফাইন, ডাকো! গো এহেড, ডাকো তাকে! তার জন্যই তো সাতসমুদ্র পেরিয়ে এলাম।” পরমুহূর্তেই মুখ বিকৃত করে ব্যক্তিগত আক্রোশে চিৎকার করে উঠল তাসা, “অলওয়েজ টেস্ট আর হাই স্ট্যান্ডার্ডের কথা বলে আমাকে এড়িয়ে গেল! শেষে কিনা এমন কুৎসিত একটা মেয়ের জন্য সব ছাড়তেও তার দ্বিধা হলো না? দ্যাট ফাকিং মনস্টার রিজেক্টেড মি অ্যান্ড সোফিয়া, জাস্ট বিকজ অব ইয়্যু, আগলি গার্ল!”
ইবরাত ইংরেজিতে বেশ কাঁচা, তা ছাড়া কথার মারপ্যাঁচও সে ভালো বোঝে না। তাসা কাকে ইঙ্গিত করে ইংরেজিতে কী বলল, তার কিছুই সে স্পষ্ট বুঝল না। তবে সে এটুকু ধরে নিল, যে মেয়েটা ন্যাসোকে উদ্দেশ্য করেই কথাগুলো বলছে এবং সম্ভবত তাকে গালি দিচ্ছে।
তাসা তার উন্মুক্ত স্ত নের ভাঁজ থেকে একটি ছোট্ট, ধারালো ছু রি বের করে আনল। তারপর যে-ই না সে ইবরাতকে আক্রমণ করতে উদ্যত হলো, অমনি শান্ত, ভীতু স্বভাবের মেয়েটা যেন ফুলকির মতো জ্বলে উঠল! ছুরির ভয় কোথায় যেন উবে গেল। ভালোবাসার মানুষের অপমান সহ্য করতে না পেরে সে ঝাঁপিয়ে পড়ল তাসার ওপর।

“শাঁকচুন্নির বংশধর! নটির জন্ম, আমার হটিবয়-কে তুই স্টারবয় বলছিস? শালীর বাচ্চা, তোর চুল টেনে আজ আমি ব্ল্যাক নুডলস রান্না করব।”
একেবারে রণমূর্তি ধারণ করে গর্জন তুলে ইবরাত ছুটে গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে তাসার চুল শক্ত করে টেনে ধরল। এমন অতর্কিত আর ঝোড়ো আক্রমণে তাসার হাত থেকে ছিটকে পড়ে গেল ছু রি টি। তবে নিরস্ত হলেও তাসা দমে যাওয়ার পাত্রী সে অন্তর নয়। সে-ও শক্ত করে চেপে ধরল ইবরাতের গলা। শুরু হয়ে গেল দুজনের মধ্যে তুমুল ধস্তাধস্তি। কেউই কাউকে এক চুল ছাড় দিতে রাজি না।

রাতের ইন্দোনেশিয়া রূপকথার ক্যানভাসের মতোই মহিমান্বিত। স্বপ্নের মতো সুন্দর। উন্মুক্ত জানালা দিয়ে আসা হিমেল বাতাস রাতের শীতলতাকে আরও প্রগাঢ় করে তুলছিল। হাইওয়ে ধরে ছুটে চলা দ্রুতগতির গাড়ির স্ট্রিংয়ে রিচার্ডের শক্ত হাত। তার থমথমে মুখশ্রীর গম্ভীরতা যেন চারপাশের আবহাওয়াকেও ভারী করে তুলে। পাশের সিটে বসে থাকা এলিজাবেথের মন তখন প্রকৃতির সাথে একাত্ম। উইন্ডো দিয়ে এক হাত বাইরে বাড়িয়ে দিয়ে সে চোখ বুঁজে সতেজ বাতাসের স্পর্শ উপভোগ করছিল। তার অন্য হাতটি সিটের ওপর অলসভাবে পড়ে ছিল। তবে অলসভাবে পড়ে থাকলেও অবহেলায় ছিল না মোটেও। রিচার্ড সুতীব্র
অধিকারবোধ নিয়ে নিজের কনিষ্ঠ আঙুলের সাথে পেঁচিয়ে ধরে রেখেছিল এলিজাবেথের কনিষ্ঠ আঙুলটি। অপর হাতে নিপুণভাবে সামলাচ্ছিল স্টিয়ারিং। এটা তাদের সম্পর্কের নতুন ছবি নয়। রিচার্ড এভাবেই সবসময় এক হাতে গাড়ি ড্রাইভ করে, আর অন্য হাত দিয়ে অদৃশ্য অনুভূতির সাথে আঁকড়ে ধরে রাখে এলিজাবেথকে।
এলিজাবেথ একবার তাদের যুক্ত আঙুল দুটির দিকে তাকাল, তারপর নজর ঘুরিয়ে নিল রিচার্ডের রুক্ষ, শক্ত চোয়ালের দিকে। লোকটার এই অতিরিক্ত গম্ভীর ভাবটি এই মুহূর্তে তার মোটেও মনপছন্দ হলো না। সে কিছুটা দুষ্টুমির ছলেই আলতো করে আঙুলটা সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করল। কিন্তু রিচার্ড তক্ষণি নিজের কামড় আরও শক্ত করল। আঙুলের বাঁধন তীব্রতর হতে এলিজাবেথ মৃদু ব্যথায় কুঁকড়ে উঠল। কুণ্ঠিত চোখে রিচার্ডের দিকে তাকাতেই মিলল রিচার্ডের কড়া শাসনপূর্ণ দৃষ্টি।

“লাগছে।”
“লাগুক।”
“এভাবে কতদিন আঁকড়ে ধরে রাখবেন?”
“মৃত্যু পর্যন্ত।”
কথাটি কোনো রকম আবেগ না দেখিয়ে, নিরাসক্ত মুখে বলা হলেও এর গভীরতা গভীরভাবে গিয়ে ছুঁয়ে গেল এলিজাবেথের হৃদয়। পুলকে ভরে উঠল তার মন। ঘাড় সামান্য কাত করে একগুঁয়ে চোখে সে চেয়ে রইল রিচার্ডের টানটান চোয়ালের দিকে। লোকটার রুক্ষ চওড়া চিবুকটাকে আজ ভীষণ রকম আকর্ষণীয় লাগছে। এটা কি শুধুই সাধারণ গম্ভীরতা, নাকি এর মধ্যে লুকিয়ে আছে তীব্র ব্যাকুলতা? গম্ভীরতার উত্তর খুঁজতে গিয়ে এলিজাবেথ বারবার পথ হারাল। শেষমেশ কেবল মুগ্ধ হয়েই দেখতে লাগল এক হাতে অত্যন্ত দক্ষতায় গাড়ি চালিয়ে যাওয়া মানুষটিকে।
আবেশের ঘোরে এলিজাবেথ ঠোঁট বাড়িয়ে ছুঁয়ে দিতে চাইল রিচার্ডের রুক্ষ, কামানো দাড়িবিহীন চিবুকটা। কিন্তু পুরুষটার আকাঙ্ক্ষা যে ছিল এর চেয়েও অনেক বেশি তীব্র। এলিজাবেথ যখুনি রিচার্ডের গালে ঠোঁট ছোঁয়াতে যাবে, ঠিক সেই মুহূর্তে রিচার্ড আচমকা মুখ ঘুরিয়ে নিল। মুহূর্তের ব্যবধানে ঠোঁট দুটির মুখোমুখি সংঘর্ষ ঘটল। আর সেই মৃদু আঘাতের স্ফুলিঙ্গে যেন লোকটার ভেতরের সুপ্ত পুরুষালি কামনা আগ্নেয়গিরির মতো জেগে উঠল, আত্মনিয়ন্ত্রণের শক্ত বাঁধনে ফাটল ধরল।

রিচার্ড ক্ষিপ্র গতিতে এলিজাবেথের নরম ঠোঁটের ভাঁজে নিজের ঠোঁট সঁপে দিল। এক হাতে শক্ত বাঁধনে পেঁচিয়ে ধরল তার কোমর, তারপর হেঁচকা টানে এলিজাবেথকে এনে বসিয়ে দিল নিজের কোলজুড়ে। এলিজাবেথের ঠোঁটে রাজত্ব কায়েম করতে করতে এবার সে বিক্রমে রমণীর কায়ার ভাঁজে ভাঁজে নিজের ক্ষমতা বিস্তার শুরু করল।
এমন সময় পাশ দিয়ে ছুটে যাওয়া একটি গাড়িতে থাকা কিছু উঠতি বয়সের তরুণ জানালার ফাঁক দিয়ে এই উত্তপ্ত দৃশ্য দেখে উচ্চশব্দে শিস বাজিয়ে তালি দিয়ে উঠল। লজ্জায় এলিজাবেথ আষ্টেপৃষ্টে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ল, নিজের ঠোঁট চেপে ধরে সরে আসতে চাইলে রিচার্ড নখ বসিয়ে দেয় এলিজাবেথের কোমরের নরম ত্বকে। এলিজাবেথের গলায় জমে ওঠা মৃদু আর্তনাদটুকুও বের হওয়ার সুযোগ পেল না, তার আগেই বেপরোয়া পুরুষটি আবারও তার ঠোঁটে গভীর থেকে গভীরে ডুব দিল।
একহাতে সুইচে চাপ দিয়ে গাড়ির গ্লাস তুলে দিল রিচার্ড। তার হাতের উন্মাদনার সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়তে লাগল গাড়ির গতি। এরপর রিচার্ড এলিজাবেথকে এমন তৃষ্ণার্ত ব্যাকুলতায় চুমু দিতে লাগল, যেন সে এর আগে কখনো এলিজাবেথকে ছুঁয়েও দেখেনি।

কালো রঙের বিএমডব্লিউ গাড়িটি হিংস্র ব্ল্যাক প্যান্থারের মতো শিকারির গতিতে ছুটে গেল হাইওয়ে ধরে। আর হাইওয়ের একপাশে দাঁড়িয়ে থাকা প্রকৃত শিকারি প্রলুব্ধ দৃষ্টিতে প্রত্যক্ষ দেখল সেই দৃশ্য। রাস্তার ধারে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে ছিল একটি Kawasaki Ninja H2R বাইক এবং একটি বিলাসবহুল Rolls-Royce। গাড়ির ভেতর বসে ছিল নিক। চোখে তার সুপারহিরো মাস্ক। বাইকে বসা সুরাকার বুকের ওপর দু-হাত ভাঁজ করে স্থির দৃষ্টিতে দেখল, রিচার্ডের গাড়িটি কতটা উন্মাদ গতিতে তাদের পাশ দিয়ে বেরিয়ে গেল। সে ধীরেসুস্থে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল নিকের দিকে। নিক আগে থেকেই তাকিয়ে ছিল তার দিকে।
সুরাকার অনর্থক নিজের ঘাড় মটকাতে মটকাতে হালকা চাটুকারিতার সুরে বলল,
“আজকের খেলাটা নাহয় তুমিই খেলো, ব্যাটম্যান! ঘাড়টা এখনো তেমন সুবিধার লাগছে না। আরেকটু বিশ্রামের প্রয়োজন। মৃত্যু দিও না, তবে মৃত্যুর মুখ থেকে ঘুরিয়ে আনো।”
নিক ঠোঁটের কোনায় সামান্য হাসি ফুটিয়ে তুলল৷ তবে মুখে কোনো কথা বলল না। হ্যাজেল রঙের তীক্ষ্ণ চোখের দিকে তাকিয়ে বাঁকা হেসে চোখ টিপ মারল। পরমুহূর্তেই গাড়ির অ্যাক্সিলারেটরে চাপ দিয়ে ইঞ্জিনে গর্জন তুলে চোখের পলকে ধুলো উড়িয়ে গাড়িটি ঝড়ের গতিতে ছুটে বের হয়ে গেল। সেদিকে চেয়ে সুরাকারের ঠোঁটে ফুটে উঠল বাঁকা হাসি।

গাড়ির ভেতর এলিজাবেথ ক্লান্ত হাতে নিচ থেকে ইনারওয়্যার তুলে নিয়ে গায়ে জড়িয়ে নিল। তারপর নিচের সুইচে চাপ দিতেই ঢালু হয়ে থাকা সিটটি আবার সোজা হয়ে গেল। ক্লান্তিতে সে গা এলিয়ে দিল সিটে। এসি চালিত গাড়ির ভেতরের হিমেল বাতাসের মাঝেও তার গোলাপের পাপড়ির মতো ফোলা ফোলা ঠোঁটের ওপর জমেছে বাষ্পের মতো ঘামের বিন্দু।
রিচার্ড একপলক এলিজাবেথের দিকে তাকিয়ে কৃত্রিম হাসল। একহাতে ড্রাইভিং সামলানোর পাশাপাশি অন্য হাতে সে শার্টের বোতামগুলো আটেঁ নিচ্ছিল। বোতাম লাগানো শেষ হওয়ামাত্রই সে হঠাৎ এলিজাবেথের পাখির পালকের মতো নরম, শুভ্র পা দুটো একটানে তুলে এনে রাখল নিজের উরুর ওপর। আলতো ও এলোমেলো ছোঁয়ায় পায়ে হাত বোলাতে বোলাতে সে চুমু খেল এলিজাবেথের পায়ের পাতায়।
শিউরে উঠল এলিজাবেথ। নরম নারীকায়ার প্রতিটা শিরা-উপশিরায় যেন বিদ্যুতের তরঙ্গ খেলে গেল। সে চোখ তুলে তাকাল রিচার্ডের অ্যাডামস অ্যাপেলের দিকে। ঘামে ভেজা কণ্ঠমণি গভীর ঢোক গেলার কারণে খুব স্পষ্ট হয়ে ওঠা-নামা করছিল। রিচার্ড সেই উথালপাথাল কণ্ঠমণি দেখার সাথে সাথে এলিজাবেথ নিজেও অনৈচ্ছিকভাবে শুকনো ঢোক গিলল। কাঁপা কাঁপা গলায় বলে উঠল,

“ডোন্ট ট্রাই টু সিডিউস মি, ওকে?”
রিচার্ড এলিজাবেথের কথা শুনে তার দিকে না তাকিয়েই ঠোঁট বাঁকিয়ে একফালি চতুর হাসি দিল। এই উপেক্ষায় এলিজাবেথ খানিকটা অপমান বোধ করল। অভিমানে গা ফুলিয়ে জানালা দিয়ে বাইরের দিকে দৃষ্টি ঘুরিয়ে নিল সে।
হঠাৎ প্রচণ্ড জোরে ব্রেক কষল রিচার্ড । এলিজাবেথ আকস্মিকতায় চমকে ওঠার সুযোগটুকুও পেল না। গাড়ি থামিয়ে মুহূর্তের মধ্যে সে হিংস্র পশুর মতো ঝুঁকে পড়ল এলিজাবেথের ওপর। হেঁচকা একটানে ছিঁড়ে ফেলল শার্টের সামনের তিনটি বোতাম। উন্মুক্ত হয়ে পড়ল ঢেউখেলানো সুগঠিত বুক। রিচার্ড বুকের অনাবৃত ভাঁজটির দিকে তাকাতেই এলিজাবেথ আবারো শুকনো ঢোক গিলল।
রিচার্ড কতটা কাছাকাছি এসে ঝুঁকে পড়ল যে, তার তপ্ত নিঃশ্বাস সরাসরি এসে আঁচড়ে পড়ছিল এলিজাবেথের ঠোঁটের ওপর। রিচার্ড ভ্রু উঁচায়, ঠোঁট বাঁকায়, হাস্কি স্বরে হিসহিসিয়ে বলে,
“আই অ্যাম নট ট্রাইং টু সিডিউস ইয়্যু… উড ইয়্যু লাইক মি টু সিডিউস ইয়্যু, মাই ফা কিং ডার্ক রেড?”
ভয়ে এলিজাবেথ ঠোঁট জোড়া থরথর করে কেঁপে উঠল। সে তোতলাতে তোতলাতে বলল,

“নো… নো! ইট’স পেইন!”
গাড়ির ভেতরের অসহ্যকর থমথমে নীরবতা ভেঙে রিচার্ড ঠোঁটের কোণে ক্রুর হাসি ফুটিয়ে দূরে সরে এলো। ইঞ্জিনের কর্কশ গর্জন তুলে স্টিয়ারিংয়ে হাত রাখল।এলিজাবেথ ততক্ষণে সিটের একদম কোণায় লেপ্টে গিয়ে বসেছে।
হঠাৎ পেছন থেকে উল্কার বেগে এসে একটি গাড়ি সজোরে সটান ধাক্কা মারল রিচার্ডের বিএমডব্লিউর পেছনে। সিটবেল্ট না থাকায় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রোজের দেহটা সামনের ড্যাশবোর্ডের দিকে ছিটকে গেল। অবধারিত মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে এলিজাবেথের চোখের সামনে সব অন্ধকার হয়ে আসার মুহূর্তে, একটি ইস্পাত-কঠিন হাত গ্রেনেডের মতো ছিটকে এসে তার কপালের সামনে ঢাল হয়ে দাঁড়াল! খরখরে চামড়ার স্পর্শ লাগল কপালে। এলিজাবেথ মুখ তুলে থরথর করে কাঁপতে থাকা চোখে সামনে তাকাল। রিচার্ডের চওড়া, শক্ত হাতটা এখনো তার কপালের সামনে ঢাল হয়ে আছে।
ধপ! ধপ… একইভাবে পরপর কয়েকটা সজোর আঘাত হানল পেছনের গাড়িটি। সিটের সঙ্গে এলিজাবেথের শরীরটা এক হাতে শক্ত করে চেপে ধরল রিচার্ড,অন্য হাতে স্পিড বাড়িয়ে প্রথমেই পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করল। ভয়ে দুমড়েমুচড়ে যাওয়া কন্ঠে এলিজাবেথ ফুঁপিয়ে উঠল,

“মি:কায়নাত, এসব কি হচ্ছে?”
রিচার্ডের রগ ফোলা চোয়াল তখন গ্রানাইট পাথরের মতো শক্ত। সমুদ্র-নীল দু’চোখে প্রলয়ের রুদ্ররূপ, যেন আস্ত একটা মহাসমুদ্র ধ্বংসের আগুনে জ্বলছে! রিয়ার-ভিউ মিররে একটি রোলস রয়েলস ফুটে উঠল। গাড়ির কাঁচ কালো থাকায় চালকের অবয়ব অস্পষ্ট।
ঠাস, ঠাস…হঠাৎ পেছন থেকে বুলেট এসে রিয়ার-ভিউ মিররটা চুরমার করে দিল। বুলেট এবার বৃষ্টির মতো ঝরে পড়ছে সেই রোলস রয়েলস থেকে। গাড়িটা বারবার আড়ালে লুকিয়ে নিখুঁত নিশানায় ফায়ার করে চলেছে, সামনে আসছে না কিছুতেই।
রিচার্ডের চোখের তারা থেকে তখন আগুনের স্ফুলিঙ্গ ঠিকরে বের হচ্ছে। স্টিয়ারিং হুইলটা দানবীয় শক্তিতে চেপে ধরল সে। কৌশল খাটিয়ে পেছনের গাড়িটাকে পিষে ফেলার ছক কষল, কিন্তু অন্য গাড়ির চালকটি অসম্ভব চতুর৷ প্রতিটা চাল ধরে ফেলছে নিমেষে। ড্যাশবোর্ডের ভেতরে রাখা রিভলবারটার দিকে বারবার হাত চলে যাচ্ছে রিচার্ডের, যেন চম্বুকের মতো টানছে তাকে। গর্জন দিয়ে ভেতরের র ক্ত পিপা সু ক্ষিপ্ত প শু জেগে উঠছে একটু পরপর! কিন্তু পাশে আতঙ্কে জমে যাওয়া এলিজাবেথকে দেখে নিজের সেই দানবীয় ক্রোধকে কোনোরকমে চাবুক মেরে থামিয়ে রাখে সে। গতিই এখন একমাত্র বাঁচবার পথ। ড্যাশবোর্ডে অ্যাক্সিলারেটর চেপে ধরল রিচার্ড।

রাস্তার বুকে টায়ারের নির্মম ঘর্ষণে আগুনের ফুলকি আর ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ে চারপাশে। স্পিডোমিটারের কাঁটা চোখের পলকে ৪০০ কিমি/ঘণ্টার সীমানা অতিক্রম করে গেল! অথচ পেছনের সেই শ য় তা নটাকে পেছনে ফেলা যাচ্ছে না। চোখের পলকে হাইওয়ের শত শত গাড়িকে দু’পাশে ডানে-বামে ছুড়ে ফেলে রোলস রয়েলসটি সা পের মতো এঁকেবেঁকে সামনে চলে আসছে। এসে ফের ধাক্কা মারছে, বু লেট বর্ষণ করছে!
এবার শুরু হলো জীবন-ম রণ রেস। মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে দুই প্রতিভাবান চালকের হাই-স্পিড স্নায়ুযুদ্ধ। কেউ কারো চেয়ে এক চুল কম নয়। ছোটবেলা থেকেই দুজনেই স্পোর্টস কার চালিয়ে অভ্যস্থ। কিন্তু তফাত এক জায়গায় রিচার্ড বেশ কয়েক বছর ধরে রিয়েল-টাইম রেসিং থেকে দূরে, আর অন্য গাড়ির চালক নিক একজন দুর্ধর্ষ প্রফেশনাল কার রেসার! নিকের স্কিল এইমুহূর্তে অসম্ভব নিখুঁত এবং মারাত্মক।
চাপা ক্ষোভে রিচার্ডের সমস্ত আক্রোশ গিয়ে পড়ল গাড়ির ওপর। হিংস্র গর্জনে সমস্ত শক্তি দিয়ে আঘাত করল স্টিয়ারিং হুইলের ওপর।

নিক দমার পাত্র নয়। তবে রিচার্ডকে কোনোভাবেই কায়দায় আনতে না পেরে সে আরও বেপরোয়া হয়ে উঠল। তাদের গাড়ি দুটি তখন একটি বিশাল নদীর ওপর ঝুলন্ত ব্রিজের ওপর। পাগলের মতো নিক তার রোলস রয়েলস দিয়ে বারবার রিচার্ডের বিএমডব্লিউতে সাইড-হিট করতে লাগল। উদ্দেশ্য গাড়ি সহ রিচার্ডকে ঝুলন্ত ব্রিজ থেকে ১০০ ফুট নিচে গড়িয়ে ফেলা!
বিএমডব্লিউ গাড়িটি বারবার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সজোরে ধাক্কা খেতে লাগল ব্রিজের ভারী লোহার রেলিংয়ে। ধাতুর সঙ্গে ধাতুর তীব্র সংঘর্ষে চারপাশ জুড়ে বারুদের মতো আগুনের স্ফুলিঙ্গ ছড়িয়ে পড়তে লাগল বাতাস জুড়ে।
এলিজাবেথের মৃদু আর্তনাদ হাই-স্পিড চালিত গাড়ির বিকট শোরগোলের মাঝেও রিচার্ডের কানে গিয়ে পৌঁছাল,
“মি কায়নাত, আমার খুব ভয় করছে!”

ওই শেষ! রিচার্ডের ধৈর্যের বাঁধ এবার পুরোপুরি ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। ড্যাশবোর্ডের ঢাকনা দুমড়ে খুলে রিভলবারটা এক হ্যাঁচকায় বের করে আনল সে। এরপর কোনো পরোয়া না করে চারশো কিলোমিটার গতির চলন্ত গাড়ি থেকে বাজপাখির মতো শরীরটা অর্ধেকের বেশি বের করে সোজা ওপেন ফায়ারে চলে গেল!
কিন্তু ওপাশে থাকা চালকটিও তো সাধারণ কেউ নয়, সাক্ষাৎ শয়তান নিক! ব্যাটম্যান! অত্যন্ত ধূর্ত আর বেপরোয়া সে। রিচার্ডকে এভাবে ওপেন ফায়ার করতে দেখে সে গাড়ি নিয়ে বিএমডব্লিউর ছায়ায় চলে গেল। দিক বদল করে অন্য পাশে গিয়ে আবারও বুলেট বর্ষণ করতে শুরু করল। রিচার্ড ক্ষিপ্র চিতার মতো ছাদ ডিঙিয়ে গাড়ির অন্য পাশে লাফিয়ে যেতে উদ্যত হলো, কিন্তু পরক্ষণেই থমকে গেল। পাগলের মতো চলতে থাকা গাড়িকে এভাবে একা রেখে দিলে যেকোনো মুহুর্তেব্রিজ থেকে নিচে ছিটকে পড়বে তারা।
সে শরীর গাড়ির ভেতর ঢুকিয়ে স্টিয়ারিংয়ের দিকে হাত বাড়াতে যাবে, এমন সময় ঘটে গেল এক অবিশ্বাস্য ঘটনা। ভয়ে জমে যাওয়া এলিজাবেথ হঠাৎ করেই এক বুক সাহস সঞ্চয় করে সামনে এগিয়ে এলো৷ নরম দুটি হাতে শক্ত করে চেপে ধরল স্টিয়ারিং হুইল৷ রোজের পুরো মুখে আতঙ্কের ছাপ স্পষ্ট হলেও, চোখের মণিতে তখন উপচে পড়ছে অদম্য আত্মবিশ্বাস। শুকনো ঢোক গিলে সে এরিদের চোখের দিকে তাকাল। মাথা সামান্য নাড়িয়ে দৃঢ় কন্ঠে বলল,

“আই ক্যান হ্যান্ডেল!”
রিচার্ডের নীল চোখ দু’টো মুহূর্তের জন্য এলিজাবেথের চোখে স্থির হলো। সে একটু শ্যাডো এনে জিজ্ঞেস করল,
“আর ইয়্যু শিওর?”
এলিজাবেথ মাথা নাড়ল। রিচার্ড নজর দিল স্টিয়ারিং চেপে ধরা এলিজাবেথের হাত দুটোর দিকে। স্পিডোমিটারের কাঁটা তখনো পাগলের মতো কাঁপছে, চারপাশের বাতাসের গতির তীব্রতায় কান পাতা দায়, অথচ এলিজাবেথের হাত দুটো কম্পন নেই। রিচার্ডের ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল মারাত্মক বাঁকা হাসি। তার ভেতরের র ক্ত পি পাসু প শুটা এবার পূর্ণ রূপে জেগে উঠল!
সে চোখের পলকে গাড়ির সানরুফ দিয়ে চিতার মতো লাফিয়ে একদম ছাদে গিয়ে দাঁড়াল। বাতাসের ঝাপটা আর তীব্র গতিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে দুই হাতে অস্ত্র উঁচিয়ে শুরু করল বুলেটের তাণ্ডব। আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে রিচার্ডের বুলেট যেন বৃষ্টির মতো বিদ্ধ হতে লাগল রোলস রয়েলসের উইন্ডশিল্ড আর বডিতে। রিচার্ডকে এভাবে মৃত্যুর পরোয়া না করে সাক্ষাৎ মহাকালের মতো ছাদে দাঁড়িয়ে শু ট করতে দেখে নিকের কপালেও ঘাম দেখা দিল। নিক ধীরে ধীরে পেছনের দিকে সরতে বাধ্য হলো। নিকের পিছিয়ে যাওয়া দেখে রিচার্ডের ঠোঁটে ভেসে উঠল বিজয়ের হিংস্র হাসি। ফায়ারিং থামিয়ে সে চটজলদি সানরুফ দিয়ে ড্রাইভিং সিটে এসে বসল। রিচার্ডকে অক্ষত অবস্থায় সিটে ফিরতে দেখে রোজ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে নিজের সিটে ফিরে গেল। কিন্তু স্বস্তি কয়েক সেকেন্ডের বেশি টিকল না।

ডান-বাম, সামনে-পেছনে— চারদিক থেকে চিলতে সময়ের ব্যবধানে চারটি বিশাল কন্টেইনার ট্রাক এসে ঘেরাও করে ফেলল বিএমডব্লিউটিকে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই ঝড়ের গতিতে ট্রাকগুলো থেকে নেমে এলো একদল কালো মুখোশধারী লোক। সবার হাতে পাওয়ার ড্রিল মেশিন। বিদ্যুৎগতিতে ড্রিল দিয়ে গাড়ির ধাতব শরীর ছিদ্র করে লক বসিয়ে দিল তারা, যাতে ভেতর থেকে দরজার লক কোনোভাবেই খোলা না যায়। সবকিছু ঘটল চোখের পলকে। স্তম্ভিত হয়ে যাওয়া এলিজাবেথ আতঙ্কে হিম হয়ে আসা চোখে রিচার্ডের দিকে তাকাল। অথচ রিচার্ড তখন স্থির, নির্ভাবুক। তার সমুদ্র-নীল চোখের দৃষ্টি ট্রাকের ফাঁক গলে অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা বাইক চালকের হ্যাজেল রঙের চোখে বিদ্ধ হয়ে আছে। হেলমেটের ভেতর থেকে উঁকি দিয়ে আছে হ্যাজেল রঙা দু’টো চোখ!
গাড়ির প্রতিটি দরজা চিরতরে সিল করে দেওয়ার পর কন্টেইনার ট্রাকগুলো ঠিক যেভাবে এসেছিল, সেভাবেই বাতাসের বেগে মিলিয়ে গেল। ঘটনার আকস্মিকতায় হতভম্ব ভাব কাটানোর আগেই পেছন থেকে সশব্দে ছুটে এলো আরেকটা ভারী ট্রাক। প্রচণ্ড এক ধাক্কায় বিএমডব্লিউটাকে গুঁড়িয়ে দিয়ে ফেলে দিল ব্রিজের নিচে। মুহূর্তের মধ্যে কালচে পানির অতলে তলিয়ে গেল গাড়িটি।

ধাক্কাধাক্কির একপর্যায়ে দুজন গিয়ে পৌঁছাল ট্যারেসে। শক্তি আর কৌশলে তাসা ইবরাতের চেয়ে এগিয়ে। মুহূর্তের মধ্যে সে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে ইবরাতের গলা চেপে ধরল। চেপে ধরা অবস্থাতেই টেনেহিঁচড়ে ওকে নিয়ে গেল ট্যারেসের একদম কিনারে। তারপর দাঁতে দাঁত চেপে সর্বশক্তি দিয়ে ইবরাতকে ছুড়ে ফেলল নিচে।
হঠাৎ নিজেকে শূন্যে ভাসতে দেখে ইবরাতের নিঃশ্বাস আটকে এলো। অদ্ভুত হালকা অনুভূতি ছেয়ে ফেলল পুরো শরীরজুড়ে। জীবনের অন্তিম মুহূর্তে মানসপটে শেষবারের মতো ভেসে উঠল এক জোড়া পরিচিত বাদামি চোখ—যে চোখের মুগ্ধ দৃষ্টি এই জন্মে তার আর কখনো পাওয়া হলো না। বুকচাপা এই আফসোসটুকু নিয়েই মৃত্যুর প্রতীক্ষায় সে চোখ দুটি বন্ধ করল।
তিরিক্ষি মেজাজে ওয়াশরুম থেকে হাতে ফোন নিয়ে বেরিয়ে এলো ন্যাসো। একহাতে ফোনে খেলা দেখছিল, অন্যহাতে তোয়ালে দিয়ে মুছছিল ভেজা চুল। কপালে বিরক্তির রেখা স্পষ্ট হয়ে আছে। বোঝাই যাচ্ছে, আজকের ম্যাচটা মোটেও তার মনপূত হচ্ছে না। কাছেই কাউচে হাত রেখে পুশআপ দিচ্ছিল লুকাস। ন্যাসো তোয়ালেটা বিছানায় রেখে ট্যারেসের দিকে পা বাড়াতেই বিপক্ষ দল গোল করে বসল। রাগে-ক্ষোভে ন্যাসো ফোনটা আছাড় মারল মেঝেতে। লুকাস একঝলক তার দিকে তাকিয়ে বাঁকা হেসে আবার পুশআপে মনোযোগ দিল।

নিজের চুল খামচে ধরে পরপর কয়েকবার গভীর শ্বাস নিয়ে রাগ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছিল ন্যাসো। এমন সময় হঠাৎ তার নজর গেল ট্যারেসের কিনারের দিকে। তার বাদামি চোখজোড়া বিস্ফোরিত হলো! স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা কিংবা দ্বিধা করার এক সেকেন্ড সময়ও নিল না শরীর। ন্যাসো বিদ্যুৎবেগে ছুটে গিয়ে ট্যারেস থেকে ঝাপিয়ে পড়ল। শূন্যেই সে ইবরাতকে নিজের বুকে টেনে নিল, সাপের মতো পেঁচিয়ে ধরে দু’হাতে আগলে রাখল তার মাথাটি নিজের বুকে,যেন সমস্ত আঘাত তার নিজের ওপর দিয়েই যায়।
পরের কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই তাদের শরীর প্রচণ্ড শক্তিতে এসে পড়ল মাটিতে। ভীষণ জোরে ঝাঁকুনি খেল দু’টো শরীর। ইবরাত তো ধ্রুব সত্য বলেই ধরে নিয়েছিল, আজই তার জীবনের শেষ দিন। কিন্তু অলৌকিকভাবে শরীরের কোথাও কোনো আঘাত না পেয়ে সে আস্তে করে চোখ খুলল, বুক ভরে শ্বাস নিল। ওকে আগলে রেখেই সোজা হয়ে দাঁড়াল ন্যাসো।
ইবরাত শিউরে উঠল। রসগোল্লার মতো বড় বড় চোখে তাকাল ন্যাসোর দিকে। তার মানে… সে বেঁচে আছে? এই কাঠখোট্টা, পানসে লোকটা নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তাকে বাঁচাল? এত ওপর থেকে লাফ দিল!
ওপর থেকে লাফিয়ে পড়ল লুকাসও। চটজলদি শরীরের ভারসাম্য সামলে নিয়ে সে ছুটে এলো ন্যাসোর দিকে। উদ্বেগ নিয়ে জিজ্ঞেস করল,

“হেই, ঠিক আছ?”
“আপনার কপাল দিয়ে তো র ক্ত পড়ছে!”
ন্যাসোর কানের পাশ দিয়ে, চুলের ভেতর থেকে রক্ত গড়িয়ে নিচে নামছে। দৃশ্যটা দেখে দু’হাতে মুখ চেপে ধরে ফুঁপিয়ে উঠল ইবরাত। অথচ নিজের ক্ষত কিংবা ইবরাতের কান্না, কোনোটাতেই বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ নেই ন্যাসোর। সে গুরুগম্ভীর আর তীক্ষ্ণ গোয়েন্দাদৃষ্টিতে তাকাল ওপরের ট্যারেসের দিকে। তার দেখাদেখি লুকাসও ওপরে তাকল। মুহূর্তের মধ্যে দুজনের চিবুক শক্ত হয়ে উঠল।
ট্যারেসের কিনারায় দাঁড়িয়ে ঠোঁটের কোণে শয়তানি হাসি ঝুলিয়ে তাদের দিকে তাকিয়ে আছে তাসা। তাসার পাশে দাঁড়াল ওগ্রু। তাকে দেখে চমকে উঠল লুকাস। দাঁতে দাঁত চেপে বিড়বিড় করে উঠল,
“ব্রাজিলিয়ান সাইকো!”
নিচে তাদের দিকে তাকিয়ে পিয়ার্সিং করা জিভটা বের করে জঘন্য হাসি দিল ওগ্রু,”বিফোর ওয়ার, হ্যাভ সাম প্রোটিন,” বলতে বলতেই সে কামড়ে ধরল তাসার ঠোঁট। খামচে ধরল ফোলা ফোলা স্ত ন। সবার সামনেই অত্যন্ত কুরুচিকরভাবে লিপ্ত হলো কামনায়।
এমন নোংরা দৃশ্য দেখে ইবরাতের গা গুলিয়ে এলো। সে মুখ চেপে ধরে ওয়াক করে উঠল। ন্যাসোর হাত দুটো মুষ্টিবদ্ধ হয়ে আসে। দাঁত কিড়মিড়ির শব্দ হয়! সে হেঁচকা একটানে ইবরাতকে কাছে টেনে একহাতে ঢেকে দিল তার চোখ।
হঠাৎ চারপাশ থেকে একঝাঁক বুট পরা ভারি পায়ের আওয়াজ ভেসে এলো। শব্দটা ন্যাসো বা লুকাসের অচেনা নয়। লুকাস রক্তচক্ষু মেলে তাকাল ন্যাসোর দিকে। বিস্ময় আর আতঙ্কের মিশেলে বলে উঠল,

“ড্রাগন সোলজার, ন্যাসো!”
বলতে বলতে সে প্যান্টের পেছন থেকে দুটো রিভলবার বের করে একটা ছুঁড়ে দিল ন্যাসোর দিকে। ন্যাসো অত্যন্ত দক্ষতায় শূন্যেই ক্যাচ করে নেয় অস্ত্রটি। ভারি বুটের আওয়াজগুলো ক্রমশ কাছে আসছে, তীব্র হচ্ছে। ইবরাত সেই শব্দে আতঙ্কে থরথর করে কাঁপতে শুরু করে। লুকাস প্রস্তুতি নিয়ে অ্যাটাকে যাবে, এমন সময় তার হাতঘড়িতে অ্যালার্ম বেজে উঠল। এক মুহূর্ত আগের হিংস্রতায় ভরা চোখগুলোতে হঠাৎ-ই স্পষ্ট ভয় ফুটে উঠল। লুকাস আতঙ্কিত কণ্ঠে ন্যাসোকে বলল,
“বস বিপদে পড়েছে, ন্যাসো!”
ন্যাসো মোটেও অবাক হলো না। সে ঠিকই বুঝে গেছে ফাদার তাদের লোকেশন পেয়ে গেছে। আর এরা সবাই ফাদারের নির্দেশেই এখানে হামলা চালিয়েছে। সে ঠাণ্ডা মাথায় রিভলবারের সেফটি লক আনলক করতে করতে লুকাসের দিকে তাকিয়ে দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
“আমি এইদিকটা সামলে নিচ্ছি। তুমি বসের কাছে যাও। গো ফাস্ট।”
লুকাস আর একমুহূর্তও দাঁড়াল না, ঝড়ের বেগে ছুটে বেরিয়ে গেল। ন্যাসো একবার চোখ তুলে তাকাল ভয়ে কাঁপতে থাকা ইবরাতের দিকে। মেয়েটি এমনিতেই মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে এসেছে। আতঙ্কের ছাপ এখনও পুরোপুরি কাটেনি ওর মুখ থেকে। আর এখন এখানে যে ধ্বংসলীলা শুরু হতে যাচ্ছে, তার তীব্রতা সহ্য করা এর পক্ষে অসম্ভব!

চিন্তাভাবনায় মাত্র কয়েক সেকেন্ড সময় নিল ন্যাসো। অকস্মাৎ সে ইবরাতের গলা থেকে স্কার্ফটা টেনে নিয়ে নিজের মাথার ক্ষতস্থানে শক্ত করে পেঁচিয়ে নিল। তারপর, একদম আচমকাই ইবরাতকে বিস্ময়ের চূড়ায় পৌঁছে দিয়ে ন্যাসোর বলশালী হাত দুটো চেপে বসল ইবরাতের কোমরে। সে ইবরাতকে শূন্যে তুলে এনে নিজের কোলঘেঁষে আটকে ফেলল। আকস্মিক ধাক্কায় ইবরাতের পা দুটো ছুটে গিয়ে ন্যাসোর কোমর পেঁচিয়ে ধরল, কিন্তু দু’হাত গলা জড়িয়ে ধরার মতো সময় পেল না। ন্যাসোর আকস্মিক মোচড়ে ইবরাতের শরীরের ওপরের অংশটা এক মুহূর্তে উল্টে নিচের দিকে ঝুলে পড়ল। এলোমেলো চুলগুলো ছুঁয়ে গেল মাটিকে!
ঠিক কয়েক সেকেন্ডের খেলা! বিদ্যুৎগতির চেয়েও দ্রুতবেগে ন্যাসো একহাতে গায়ের হুডিটা খুলে ফেলল। তারপর ইবরাতের হাত আঁকড়ে ধরে হেঁচকা টানে ওকে আবার ওপরে সোজা করে তুলল। ন্যাসোর সেই টানে তুলে নেওয়ার মুহূর্তে ইবরাতের ঠোঁট জোড়া এসে ঠেকেছিল তার উন্মুক্ত, সুঠাম বুকে। সেই মুহুর্তে ইবরাত নিজের ঠোঁটে জিভ বুলিয়ে অত্যন্ত সুস্বাদু ভঙ্গিতে বিড়বিড় করে উঠল,
“লোভনীয়!”
ন্যাসো সে কথায় কান না দিয়ে হুডিটা দিয়ে ইবরাতের নাজুক শরীরটাকে নিজের সাথে শক্ত করে পেঁচিয়ে বাঁধল। তারপর মাথার ওপর হুডটা তুলে দিয়ে সামনে দিয়ে টেনে ইবরাতের চোখ-মুখ একদম ঢেকে দিল, যেন বাইরের কোনো বীভৎসতা তাকে ছুঁতে না পারে। অতঃপর ইবরাতের মাথাটা নিজের কাঁধে শক্ত করে চেপে ধরে, অন্যহাতে রিভলবারটা বাগিয়ে নিয়ে ন্যাসো ফিরে গেল তার চিরচেনা, ভয়ঙ্কর রূপটিতে।

গাড়ির ভেতর এলিজাবেথের নিশ্বাস ফুরিয়ে আসছে, অক্সিজেনের অভাবে ধীরে ধীরে ফ্যাকাসে হয়ে যাচ্ছে তার গোলাপের মতো উজ্জ্বল ত্বক। ওদিকে রিচার্ডের ট্যাটু আঁকা হাতের গোড়ালি ততক্ষণে থেঁতলে রক্তাক্ত, ক্ষত-বিক্ষত! তা সত্ত্বেও বিএমডব্লিউর বুলেটপ্রুফ কাচ ভাঙা সম্ভব হচ্ছে না।
গাড়ির ভেতরের প্রকোষ্ঠে পানি ততক্ষণে কানায় কানায় পূর্ণ। ড্রিল মেশিন দিয়ে দরজাগুলো বাইরে থেকে লক করে দেওয়া হয়েছে, ফলে খোলার কোনো পথ নেই। এখন বাঁচার একমাত্র উপায় উইন্ডো ভাঙা। কিন্তু বিএমডব্লিউর বুলেট রেজিস্ট্যান্ট গ্লাস ভাঙা কি অতই সহজ? ইতিমধ্যে রিচার্ডের হাতের গোড়ালি থেঁতলে হাড়-মাংস বেরিয়ে গেছে, রক্তে থৈ থৈ করছে গাড়ির ভেতরের নীলচে পানি। জোগান ফুরিয়ে আসছে অক্সিজেনের।
রিচার্ড ব্যাকুল হয়ে ফিরে তাকাল এলিজাবেথের দিকে। এলিজাবেথের নিস্তেজ শরীরটা সিটের ওপর এলিয়ে পড়েছে। রিচার্ড ধেয়ে গিয়ে ওর চোখ, মুখ আর গাল ছুঁয়ে দেখল। কোনো সাড়াশব্দ নেই! মুহূর্তের মধ্যে রিচার্ডের বুকের ভেতরটা যেন খালি হয়ে এলো, যেন কেউ তার শরীরের সমস্ত শক্তি এক নিমিষেই শুষে নিয়েছে। নিজের অস্তিত্বকে বাজি রেখে সে নিজের মুখের শেষ শ্বাসটুকু এলিজাবেথের মুখে দেওয়ার চেষ্টা করল।
হঠাৎ-ই তার চোখ গেল নিচে, এলিজাবেথের পায়ের হাই হিলের দিকে। জুতোটা কুড়িয়ে নিল রিচার্ড। তারপর হিলের সুচালো তীক্ষ্ণ অংশটা দিয়ে পাগলের মতো আঘাত করতে লাগল কাঁচে। ঘন ঘন আঘাতের একপর্যায়ে শক্ত কাঁচের গায়ে সূক্ষ্ম ফাটল দেখা দিল। আশার আলো ঝিলিক দিয়ে উঠল রিচার্ডের চোখে। খানিকটা পিছিয়ে এসে শরীরের সমস্ত শক্তি একবিন্দুতে এনে সজোরে লাথি বসাল কাঁচের ওপর। মড়মড় শব্দে চুরমার হয়ে ভেঙে পড়ল অবাধ্য কাঁচটা।

নদীর ওপর ব্রিজের রেলিংয়ে পা ঝুলিয়ে বসে আছে এক যুবক। তার কোলে একটি কালো রঙের গিটার। গিটারের তারে টুংটাং সুর তোলার সাথে একদৃষ্টিতে সে দেখে যাচ্ছে এক রক্তাপ্লুত বেপরোয়া প্রেমিক কীভাবে মৃত্যুর মুখ থেকে তুলে আনা তার প্রেয়সীকে আঁকড়ে ধরে পাড়ের দিকে সাঁতরে চলেছে।
দৃশ্যটা দেখে সুরকারের ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল পৈশাচিক হাসি। অনুভূতির কোনো রেখাপাত দেখা গেল না তার নিসংকোচ মুখে। হঠাৎ তার দৃষ্টি গেল ওপরে, নদীর জলের ঠিক ওপরটায় ছটফট করে চক্কর কেটে যাচ্ছে এক ডানাভাঙা বাজপাখি, যা হয়তো তার মালিকেরই খোঁজ করছে ব্যাকুলভাবে। বাজপাখিটার এই ছটফটানি দেখে সুরাকারের ব্ল্যাক পাইথন-এর কথা মনে পড়ে গেল। এক পলকের জন্য পৈশাচিক চোখ দুটোয় যেন কোনো পুরনো যন্ত্রণার ছাপ ফুটে উঠেই মিলিয়ে গেল।
ঘাড় কাত করে সরু চোখে ওপরের দিকে তাকাল সে। ধীরে ধীরে নড়ে উঠল তার শীতল ঠোঁট,
“নেক্সট টার্গেট তুই।”
বিকট অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল সে। খানিকবাদেই সেই হাসি রূপ নিল হাড়হিম করা পিশাচের হাসিতে।

এলিজাবেথের নিস্তেজ, রক্তশূন্য শরীরটা টেনে নিয়ে সাঁতরে পাড়ে এসে পৌঁছাল রিচার্ড। হাঁপাতে হাঁপাতে সে কূলে উঠতেই ব্ল্যাকহক ছুটে এসে সশব্দে চেপে বসল মালিকের কাঁধে। ধারালো তীক্ষ্ণ ঠোঁট দিয়ে মালিকের ভেজা চুল থেকে শেওলা সরিয়ে দিতে আকুল হয়ে উঠল সে।
অথচ রিচার্ডের সেসবের দিকে বিন্দুমাত্র খেয়াল নেই। শঙ্কিত ও উত্তেজিত মস্তিষ্কে এই প্রশ্নটাও এলো না—ব্ল্যাকহক এখানে কীভাবে এলো, জল-স্থলের এই অচেনা নরকে তাকে খুঁজেই বা পেল কীভাবে! অন্য সব ভাবনা দূরে ঠেলে সে এলিজাবেথের নাক চেপে ধরে নিজের ঠোঁট এলিজাবেথের ঠোঁটে রেখে CPR দিতে শুরু করল। আকুলতায় এলিজাবেথের ভেজা বুকে কান রাখল রিচার্ড… বুকটা ধুকপুক করছে, ধীর গতিতে হলেও হার্টবিট চলছে! রিচার্ড স্বস্তির শ্বাস ফেলল। অতিরিক্ত ভয় আর অক্সিজেনের অভাবে জ্ঞান হারিয়েছে মেয়েটা।
হঠাৎ করেই যেন রিচার্ডের মাথায় বিদ্যুৎ খেলে গেল। মনে পড়ে গেল ডায়েরিটার কথা। সেই ডায়েরি—যা তাদের হাজারো স্মৃতি আর অনুভূতির লালিত এক সিন্দুক। ওটা তো এখনো ডুবে যাওয়া গাড়ির ভেতরই থেকে গেছে! এবার রিচার্ড মুখ তুলে তাকাল ব্ল্যাকহকের দিকে। অস্থিরতায় ভেতরটা দুমড়েমুচড়ে উঠলেও দীর্ঘ চিন্তা করার সময় ছিল না।
গম্ভীর এবং ভারী কণ্ঠে সে আদেশ দিল,”ব্ল্যাকহক, প্রটেক্ট হার।”
বিলম্ব না করে রিচার্ড আবারও ঝাঁপিয়ে পড়ল হিমশীতল নদীর পানিতে। রিচার্ড ভালো করেই জানে, যার ওপর সে এলিজাবেথের সুরক্ষার দায়িত্ব দিয়ে যাচ্ছে, সে বেঁচে থাকতে কোনো শত্রু এলিজাবেথের ছায়াও মাড়াতে পারবে না। কেউ তাকে স্পর্শ করতে এলে ব্ল্যাকহকের ধারালো ঠোঁট আর নখের আঁচড়ে ক্ষত-বিক্ষত হয়ে যাবে।

কিন্তু রিচার্ড আবার নদীতে তলিয়ে যেতেই অস্থির হয়ে উঠল ব্ল্যাকহক। বোবা প্রাণীটা যেন আক্ষরিক অর্থেই দিশেহারা হয়ে পড়ল৷ একপাশে মালিকের কড়া নির্দেশ, অন্যপাশে ভালোবাসার মালিককেই হারিয়ে ফেলার তীব্র আশঙ্কা। ভালোবাসার টানাটানি আর দায়িত্বের দ্বন্দ্বে সে স্থির হতে পারছে না। ক্ষণে ক্ষণে ডানা ঝাপটে ডানাভাঙা পাখির মতো নদীর ওপর গিয়ে এলোমেলো চক্কর কাটছে, পরক্ষণেই আবার ডানা মেলে ফিরে আসছে নিস্তেজ এলিজাবেথের পাশে। কখনো বা নিজের অসহায় আক্রোশে পাড়ের ছোট ছোট পাথর ঠোঁটে চেপে ছুড়ে মারছে পানিতে।
সময় গড়িয়ে যেতে থাকে, নদীর স্রোতে মিনিটগুলো যেন একেকটা দীর্ঘ যুগ হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু রিচার্ড আর ভেসে ওঠে না। ধীরে ধীরে ব্ল্যাকহকের হিংস্র, ধারালো চোখ দুটো থেকে তেজ মুছে গিয়ে ফাঁকা হাহাকার ফুটে উঠতে লাগল…
ঠিক সেই মুহুর্তে জিও-লোকেশন ট্র্যাক করে দুর্ঘটনাস্থলে ধুলো উড়িয়ে ছুটে এলো লুকাস। কিন্তু পাড়ে এলিজাবেথকে এভাবে একা, নিস্তেজ অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে থমকে দাঁড়াল সে। বুকের ভেতর অদ্ভুত শূন্যতা অনুভব করল। উপরে দিশেহারা অবস্থায় উড়তে থাকা ব্ল্যাকহকের দিকে তাকিয়ে উত্তেজিত কণ্ঠে সে চেঁচিয়ে উঠল,

“আমার বস কোথায়?!”
বোবা, হিংস্র প্রাণীটা তো আর ভাষা দিয়ে উত্তর দিতে পারে না! সে শুধু হাহাকার নিয়ে নদীর ওপর ক্ষ্যাপার মতো পাক খেতে লাগল, আর বারবার পানির দিকে ডুব দেওয়ার চেষ্টা করল। লুকাসের আর বুঝতে বিন্দুমাত্র বাকি রইল না। আর এক মুহূর্ত কালক্ষেপণ না করে কোটটা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে সে ঝাঁপিয়ে পড়ল প্রমত্তা নদীতে।
ওদিকে পানির তলদেশে রিচার্ড গাড়ি থেকে কাঙ্ক্ষিত ডায়েরিটা উদ্ধার করে কেবলই উপরের দিকে সাঁতরে আসছিল, তখুনি থোকা বিষাক্ত জলজ লতাপাতা আষ্টেপৃষ্ঠে পেঁচিয়ে ধরল তার পা। রিচার্ড দ্রুত ডায়েরিটা নিজের ওয়েস্ট কোটের ভেতর সুরক্ষিত জায়গায় গুজে নিল। তারপর কিছুটা নিচে নেমে এসে চেষ্টা করল পা থেকে লতাগুলো ছাড়িয়ে নেওয়ার। কিন্তু অবাধ্য লতাগুলো যেন জ্যান্ত কোনো পিশাচের মতো তার পা দুটোকে শৃঙ্খলিত করে ফেলেছে!
এদিকে ফুসফুসে জমে থাকা শেষ বাতাসটুকু ফুরিয়ে এসেছে। রিচার্ডের অলক্ষ্যেই দমবন্ধ করা পানির তীব্র ঝাপটা ঢুকতে শুরু করেছে ফুসফুসে। শরীরের সমস্ত শক্তি একে একে শেষ প্রান্তে এসে ঠেকেছে, চোখ দুটো ঝাপসা হয়ে আসছে। একপর্যায়ে চেতনার সূক্ষ্ম সুতোটা আলগা হয়ে এলো, রিচার্ডের শরীরটা তলিয়ে যেতে লাগল নদীর অতল তলে। হাত ভেসে উঠল পানির ওপরের দিকে…
সেই অন্তিম মুহূর্তে, হঠাৎ পানির নিচ থেকে একটা শক্ত, দাপুটে হাত খপ করে ধরে ফেলল রিচার্ডের ডুবতে থাকা হাতখানা। ঘোলাটে বালিমাখা পানির অন্ধকার চিরে ভেসে উঠল একটি কৃষ্ণবর্ণের মুখ।

মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে ন্যাসো আর ওগ্রু। দু’জোড়া চোখে কেবল আগুন আর ক্ষোভের লেলিহান শিখা। ন্যাসোর শরীরের সাথে এখনো বাঁধনে জড়িয়ে আছে ইবরাত। তবে কিছুক্ষণ আগের তাণ্ডব আর বিকট গোলাগুলির শব্দে ভয়ে জ্ঞান হারিয়ে ইবরাত ঢলে পড়েছে ন্যাসোর চওড়া কাঁধে।
আজকের এই আক্রমণের কোনো গভীর উদ্দেশ্য ছিল না। এটা ছিল কেবলই ফাঁকা আওয়াজ আর প্রচ্ছন্ন হুঁশিয়ারি। আক্রমণের শুরুতেই ন্যাসো তা বুঝে গিয়েছিল। তাও সে এক চুল পিছিয়ে আসেনি, সমান তালে চালিয়ে গেছে পাল্টা গোলাগুলি। তবে রক্তক্ষরণ হলেও সৌভাগ্যবশত প্রাণহানি ঘটেনি কারও।
ওগ্রু ন্যাসোর প্রস্তরখচিত কঠিন চিবুকের দিকে তাকিয়ে বিদঘুটে শয়তানি হাসি দিল। হাসলেও তার কণ্ঠ গলে বেরিয়ে এলো গম্ভীর আদেশ,
“গো ব্যাক টু ইতালি। ইট’স অ্যান অর্ডার।”
ন্যাসোর উত্তরের অপেক্ষাটুকুও করল না সে। তাসাকে ইশারা করে গাড়ির দিকে এগিয়ে গেল। তাসা আরও একবার লালসা মাখা চোখে তাকাল ন্যাসোর উন্মুক্ত, বলিষ্ঠ শরীরের দিকে। সেই অতৃপ্ত দৃষ্টির তীব্রতায় ন্যাসোর নিজেরই অদ্ভুত অস্বস্তি অনুভব হলো। সামান্য নড়েচড়ে উঠল সে। তা দেখে তাসা ঠোঁট কামড়ে হেসে গাড়ির দিকে পা বাড়াল।
গাড়িতে উঠতে গিয়েও হঠাৎ থমকে দাঁড়াল তাসা। দূর অন্ধকারে একটি ছায়ামূর্তি হেঁটে যেতে দেখে সে দৌড়ে গেল সেদিকে। পেছন থেকে চিৎকার করে ডেকে উঠল,

“রিচার্ড!”
কিন্তু ছায়ামূর্তি থামল না। কাঁধে গিটার ঝুলানো, মাথায় হুড তোলা মানবটি কোনোপ্রকার প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে এমনভাবে হেঁটে চলে গেল, যেন ডাকটা তার কান অব্দি পৌঁছায়ইনি। অথচ তাসা বেশ গলার জোর দিয়েই ডেকেছিল!
তাসা খুব অবাক হলো। বিস্ময় নিয়ে পেছন ঘুরতেই সে যেন ভূত দেখার মতো শিউরে উঠল। হোটেলের প্রধান ফটক চিরে হেঁটে আসছে রিচার্ড। তার ভেজা কোলে অচেতন এলিজাবেথ। রিচার্ডের পাশে লুকাস, সে-ও রিচার্ডের মতোই কাকভেজা। রিচার্ডের চওড়া কাঁধের ওপর দিয়ে উচাটন হয়ে উড়ে আসছে ব্ল্যাকহক। এখন তাকে আগের মতোই হিংস্র আর আত্মঘাতী দেখাচ্ছে।
রিচার্ডের ভারী পদশব্দ এসে থামল সরাসরি ন্যাসোর মুখোমুখি। ন্যাসোর কোলে অবচেতনে ঢলে পড়া ইবরাতকে দেখে লুকাসের তো চোখ কোটর থেকে বেরিয়ে আসার জোগাড়! সে অবাক হয়ে মুখ বাড়িয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে ন্যাসো আর মেয়েটির অবস্থা দেখতে লাগল।
ন্যাসোকে কোনো প্রকার প্রশ্ন বা শব্দ উচ্চারণের সুযোগ না দিয়ে, ভেসে এলো রিচার্ডের বরফশীতল রাশভারী কণ্ঠ,
“সাইকো ইজ ব্যাক। ইট’স টাইম টু ব্যাক ইতালি।”

ইতালি, রোম শহর।
সমুদ্রের বুকে ভেসে থাকা বিশাল একটি নির্জন দ্বীপ, যার চারদিকে শুধু থৈথৈ নীল জলরাশি। আর ঠিক সেই দ্বীপের মধ্যভাগে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে একটি কুচকুচে কালো রঙের বিশাল ম্যানশন। হুবহু দুর্গের মতো তার গড়ন। আকাশ থেকে পাখির চোখে দেখলে মনে হবে, অগাধ জলরাশির মাঝে যেন একটি পাতালপুরী জেগে উঠেছে। হেলিকপ্টারটি যতই নিচের দিকে নামতে শুরু করে, এলিজাবেথের বিস্ময়ের ঘোর ততই বাড়তে থাকে। কল্পনার চেয়েও বহুগুণ বিশাল এই ম্যানশনটি।
সাধারণত ম্যানশনের সামনে বিশাল ঝরনা দেখা যায়, কিন্তু এখানে দেখা গেল ভিন্ন দৃশ্য। ম্যানশনের প্রবেশদ্বারে শোভা পাচ্ছে সুবিশাল একটি ড্রাগনের মূর্তি। যার মুখটি উঁচিয়ে আছে আকাশের দিকে। প্রতি মুহূর্তের বিরতিতে ড্রাগনের হাঁ করা মুখ থেকে বেরিয়ে আসছে আগুনের লেলহান শিখা,যেন আগন্তুক কোনো শত্রুকে আগেই সতর্ক করে দিচ্ছে।
সামনের বিস্তৃত লনটি দুটি ভাগে বিভক্ত। একপাশে ব্যক্তিগত হেলিপ্যাড, আর অন্যপাশে বিশাল সুইমিং পুল। পুলের সামনের অংশে একদল সশস্ত্র বাহিনী হাতে মারণাস্ত্র নিয়ে কঠোর প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। এরা সবাই ড্রাগন সোলজার।
হেলিকপ্টার থেকে নামতেই এলিজাবেথের দৃষ্টি গিয়ে আটকে গেল হেলিপ্যাডের পাশের দুই তলা বিশিষ্ট একটি চ্যাপ্টা ভবনের ওপর। পুরো ভবনটি সারি সারি বিলাসবহুল গাড়িতে ঠাসা! এলিজাবেথ একটু হতবাক হয়ে ভাবল, সমুদ্রের মাঝখানের এই বিচ্ছিন্ন দ্বীপে এত বড় গাড়ির শোরুম দেওয়ার মানে কী?

“দিস ইজন্ট আ শোরুম; ইটস মাই পার্সোনাল
গ্যারাজ, হানি।”
এলিজাবেথের বিভ্রান্ত চোখের দিকে তাকিয়ে গর্ভের সাথে কথাটি আওড়ে উঠল রিচার্ড। শিহরণ জেগে উঠল এলিজাবেথের শরীরে, বিস্ময়ভরা চোখে তাকাল রিচার্ডের দিকে। রিচার্ড আর তার দিকে দৃষ্টি দিল না। চারিদিকে কালো পোশাক পরিহিত অসংখ্য সশস্ত্র গার্ড দেখে ভয়ে নিজেকে একটু গুটিয়ে আনল এলিজাবেথ। রমণীর অকুতোভয়ী মনের অবস্থা বুঝতে পেরে রিচার্ড শক্ত করে নিজের আঙুলের ভাঁজে এলিজাবেথের আঙুলগুলো পেঁচিয়ে নিল। তারপর সরাসরি ম্যানশনের প্রধান ফটকের দিকে নিয়ে গেল।
রিচার্ড ফটকের সামনে পা রাখতেই ভেতর থেকে একজন ফিমেল স্টাফ দ্রুত এগিয়ে এলো। তার হাতে একটি কাঁচের ট্রে। সেই ট্রে-তে রাখা বিশ্বের সবচেয়ে দামি ২৪ ক্যারেট সোনা দিয়ে তৈরি ‘Acqua di Cristallo Tributo a Modigliani’ পানির বোতল—যার মূল্য প্রায় ৬০ হাজার মার্কিন ডলার! নারী স্টাফটি ট্রে নিচে রেখে রিচার্ডের সামনে দুই হাঁটু মুড়ে বসে পড়ল। এলিজাবেথ কৌতূহল আর সংকোচ নিয়ে দেখছিল সে কী করতে যাচ্ছে। তাকে অবাক করে দিয়ে স্টাফটি রিচার্ডের পায়ের জুতো খুলে বোতল থেকে আইসল্যান্ডের হিমবাহের শীতল পানি দিয়ে খুব যত্ন করে তার পা ধুইয়ে দিল।
এলিজাবেথের চোখ দুটো বিস্ময়ে ছানাবড়া হয়ে গেল। একটা মানুষ কতটা বিলাসী আর পরাক্রমশালী হলে পায়ের জুতো খোলা ও পা ধোওয়ার জন্যও লোক রাখতে পারে!
স্টাফটি রিচার্ডের পা ধুইয়ে দেওয়ার পর যখুনি এলিজাবেথের পায়ে হাত দিতে গেল, অমনি রিচার্ড গলায় বারণ করে উঠল,

“উঁহু!”
বারণ শুনে স্টাফটি ভয়ে কেঁপে উঠল। তৎক্ষণাৎ নতজানু হয়ে পিছিয়ে গেল। স্টাফ সরে যেতেই রিচার্ড হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল এলিজাবেথের পায়ের কাছে। তারপর সন্তর্পণে তার পা দু’টো হাতে তুলে নিল। একে একে হিল জোড়া খুলে আইসল্যান্ডের সেই হিমবাহের পানি দিয়ে আলতো করে ধুইয়ে দিল এলিজাবেথের পা দুটো।
রিচার্ড মাথা তুলল। এলিজাবেথের বিহ্বল দৃষ্টির দিকে তাকিয়ে বাঁকা হেসে দাম্ভিক স্বরে বলল,
“আমি মালিক, তুমি মাল—অবশ্যই আমার। রাজ্য আমার হলেও মালিকানা তোমার। ওয়েলকাম প্রিন্সেস।”
এলিজাবেথের হাত ধরে ম্যানশনের ভেতরে পা বাড়াল সে৷ ভেতরে যতই এগোতে লাগল,ততই বিস্ময়ের নতুন নতুন পারদ উন্মোচিত হতে লাগল এলিজাবেথের সামনে। ম্যানশনের বাইরের রং যেমন কুচকুচে কালো, তেমনি ভেতরের দেয়াল থেকে শুরু করে প্রতিটি আসবাবপত্রই গাঢ় কালো রঙের। শুধু জানালার পর্দা, চেয়ার, সোফা, কাইচের কুশন আর সিঁড়ির ধাপে ধাপে বিছিয়ে রাখা কার্পেটগুলো রক্তিম লাল।
হঠাৎ করেই ঝোড়ো হাওয়ার মতো একটি মেয়ে ছুটে এসে আছড়ে পড়ল রিচার্ডের বুকে। জড়িয়ে ধরে মিহি গলায় আকুল হয়ে আওড়ালো,

Born to be villains part 31

“আই মিসড ইয়্যু সো মাচ, হাসবেন্ড!”
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এলিজাবেথের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। ঠোঁট দুটো থরথর করে কাঁপতে শুরু করল। বুকের ভেতর দম আটকে এলো। নিঃশ্বাস নিতেও যেন ভুলে গেল।
তবে কি এটাই সেই ধ্রুব সত্য, যা থেকে রিচার্ড তাকে এতদিন আড়াল করে রেখেছিল? এটাই কি সেই বাস্তব, যা থেকে সে এতদিন পালিয়ে বাঁচতে চেয়েছিল?

Born to be villains part 33

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here