তুমি আমার শেষবেলা পর্ব ১৯
নীতি জাহিদ
বাচ্চার চি ৎ কা র, ট্যাপের পানির আওয়াজ,রান্নাঘরের বাসন নাড়ার শব্দ,কানের কাছে অনেক মানুষের গল্প।আত্মীয় স্বজনের ভিড়ে ঘুমাতে পারেনি সারা রাত,এখন মাথা টা ম্যাজ ম্যাজ করছে। বিয়ে বাড়ি মানেই ঝামেলা।সারা রাত ধরে বিকাশের সাথে ফোনে কথা বলে মোনা প্রচন্ড তিতিবিরক্ত। না চাইতেও বিকাশের দিকে মন দিচ্ছে। কয়েকটা দিন রাতে ঘুম হচ্ছে না। এমন সময় মায়া এসে তাড়া দিলো উঠে নাস্তা খেতে। মায়া নিজ হাতে খাইয়ে দিলো নাস্তা। কিছুক্ষন পর ওকে একটা হলুদ শাড়ি পরিয়ে দিলো মায়া। মোনা চুপচাপ সব নিরীক্ষা করছে। ওর খুব হাসি পাচ্ছে। মনে হচ্ছে সবাই মিলে তোড় জোড় করে কুরবানী দিবে আজ। আজকের পর ভুলে যাবে কয়েকদিনের জন্য একটা ছায়া ছিলো ওর সাথে। আজ আর নেই। এটাই সত্যি অন্ধকারে ছায়া ও ছেড়ে চলে যায়। অসহ্য ম*র*ন যন্ত্রণা সহ্য করেছে মোনা। আজ হয়তো মানসিক ভাবে নিজেকে নিজেই মৃ*ত ঘোষনা করবে। মিনহাজ রুমে ঢুকলো। মেয়ের দিকে তাকিয়ে ইষৎ হেসে মেয়ের পাশে বসলো। বাবার দিকে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে মোনা বললো,
‘ তোমার অনেক ক*ষ্ট তাই না বাবা, আমি চলে গেলে তুমি নিশ্চিন্ত হবে আমি জানি। এত চিন্তা করোনা। তোমার মেয়ের কাছে তোমার হাসি মুখটা সবার আগে।’
‘ আম্মা আপনি ভালো থাকবেন বিকাশের সাথে।’
‘ জ্বি বাবা।’
মিনহাজ চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই মোনা বললো,
‘ বাবা ইমরান সাহেবকে বলো আমার শেষ ইচ্ছা উনার কাছে যেন আজকে উপস্থিত থাকে। উনি অসুস্থ আমি জানি তাও যদি আসতো ভালো লাগতো।’
‘হু’
মিনহাজ ত্রস্ত পায়ে বেরিয়ে গেলো।
মিনহাজের ফোন পেয়ে মন আরো অ/শা/ন্ত হয়ে উঠেছে। খাবার টেবিলে টুংটাং আওয়াজটা সবার কানে লাগছে। ইশতিয়াক,তুশি,ইশান,সোহান একে অন্যের দিকে তাকাচ্ছে। ইমরান একবার চামচ নাড়ছে তো অন্য বার আওয়াজ করছে। কি করছে ও।
‘ পাপা, কি করছো বাচ্চাদের মত। খাচ্ছো না কেনো?’
আচমকা ছেলের কথা শুনে মিষ্টি হাসি দিয়ে বললো,
‘ বাবা খেতে ইচ্ছে করছে না,তোমরা খেয়ে নাও।’
‘ ভাইয়া তুমি তো কিছুই খেলে না,আপা বললো ডাক্তার বলেছে সময়মত খেতে।’
‘ ইশতিয়াক আই হ্যাভ ডান।ইউ ক্যারি অন’
ইশতিয়াক ভাইয়ের মুখের উপর কথা বলা শিখেনি তাই আর জোর করতে পারলো না। ইমরান এখনো ছোট ভাইকে ছেলের মতো স্নেহ করে। ইশতিয়াক এর ভরসার,শ্রদ্ধার একমাত্র মানুষ ইমরান। ভাই কুয়োয় ঝাঁ/প দিতে বললে ও বলবে ঠিক আছে ভাই। বাবা-মাকে হারানোর পর ভাই সমস্ত দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে মানুষ করেছে ইশতিয়াককে। ফিরতি প্রশ্ন করা শিখেনি ভাই কে। ইশান প্রায়ই বলে তার পাপা-চাচ্চুর সম্পর্ক ওর বন্ধুরা দেখে প্রশংসা করে। আইরিন হাসে। শত কষ্টে ও ইমরানকে কখনো দেখেনি ভাইকে অভাব বুঝিয়েছে। ইশতিয়াকের পুলিশ একাডেমিতে র্যাংক পরায় ইমরান। এওয়ার্ড ডেডিকেট করে ইমরানকে। সে চায় তার ভাই এই সম্মানটা পাক। ইশতিয়াককে ট্রেইনিং এর জন্য,মিশনে প্রায় দেশের বাইরে যেতে হয়। ইমরানের ভাষ্যমতে ইশতিয়াক ইমরানের গর্ব। পুলিশে জবটা মহৎ জব যদি দায়িত্ব পালনে অবহেলা না করে।
ইমরান উঠে রুমে এসে ফ্রেশ হয়ে তৈরি হয়ে নিলো। অফিস যাবে। বাড়িতে বসে থাকলে দম আটকে আসবে।
বসার ঘর আজ মেহমানে ভরা। ঘরোয়া আয়োজন এরপর ও মিনহাজের বন্ধু, আত্মীয় স্বজন সবাই আছে। লাল বেনারসি পরিহিত মোনার আর বুঝতে বাকি নেই বিয়েটা বাবা দিয়েই দিবে। চয়ন বসে ফোন চালাচ্ছে। অনেক গুলো মেসেজ সে ইমরানকে দিয়েছে। কিন্তু কোনো উত্তর আসেনি। বান্ধবীর অগোচরে চয়ন নিজেই কেঁদে দিয়েছে এই দূ/র্দ/শা দেখে।নিজের চোখের পানি আড়ালে রেখেছে যেন মোনা কষ্ট না পায়। আইরিন এসে মোনার পাশে বসলো। মায়া ,তুশি,সালমা সবাই আছে। আইরিন মোনার আঙ্গুলে ইমরানের দেওয়া রিং পরিয়ে দিলো। মাথায় হাত রেখে বললো,
‘ সুখী হও। এটা তোমার জন্য ছোট্ট উপহার।’
‘বাহ ডায়মন্ডের রিং, কিন্তু আপা অনামিকাতে লাগালেন যে,বিকাশ লাগাবে ওখানে।’
‘ কি যে বলো সালমা। এখন এসব মানে নাকি। আমার মনে হলো এই রিংটা মোনার এই আঙ্গুলে ভালো লাগবে তাই লাগিয়ে দিলাম। খারাপ লাগলে খুলে ফেলো।’
‘ না না ঠিক আছে। আমার সমস্যা নেই।’
মায়া নিগূঢ় দৃষ্টিতে চেয়ে আছে। মোনার হাতে রিংটা জ্বলজ্বল করছে।
বসার ঘরে মেহমানরা সব বসে আছে বিয়ে পড়িয়ে খাবে তারা। ইমরান সোফার এক পাশে বসে আছে। মিনহাজ আজ ইমরানের সাথে কথা বলছেনা। নয়ন যা বলার বলছে। এদের দুজনের মনোমালিন্যের কারণ তার পুরোটাই জানা। সেদিন হাসপাতালে ইমরান মিনহাজকে সব খুলে বলেছিলো।এরপর থেকে তাদের মধ্যে দূরত্ব চলে এসেছে। কাজী বিয়ে পড়ানোর মুহুর্তে ইমরানের একটা কল আসলে ইমরান উঠে গিয়ে ফোন রিসিভ করে। আকস্মিকভাবে ইমরান গর্জন করে উঠে,
‘এই বিয়ে হবে না,বিয়ে বন্ধ করো।’
মিনহাজ সাথে সাথে প্রতিবাদ করে উঠে,
‘কেনো হবে না, কি চাচ্ছিস তুই?’
‘শোনো মিনহাজ ভাই, বিকাশ মোনার জন্য পারফেক্ট না।তুমি ওর আরো ভালো বিয়ে দিতে পারবে।’
‘একদম চুপ থাক তুই…
কথা শেষ করতে পারেনি ভেতর থেকে একটা মেয়ে মোনাকে টেনে নিয়ে আসলো সবার সামনে। মেয়েটা বিকাশের ফ্রেন্ড। ইমরান মোনাকে ধরতে যাবে।বাঁধা দিলো মিনহাজ। কাজী মিনহাজের ধমকে মোনাকে বলছে কবুল বলতে।
ইমরান চেঁচিয়ে উঠলো,
‘ আহাম্মকের মতো কাজ করো না থামো, বিকাশ প্রকাশের ভাই। মেয়েকে কেনো জাহান্নামে ঠেলে দিচ্ছো?’
বিকাশের বাবা তৎক্ষনাৎ বলে উঠলো,
‘আপনি প্রকাশকে কিভাবে চেনেন। ও তো আমার বড় ছেলে।’
অকস্মাৎ পুরো বাড়ি কাঁপিয়ে গুলির আওয়াজ। হতচকিত, বিস্মিত, ভীতসন্ত্রস্ত সবাই। নয়ন দৌঁড়ে এসে ইমরানকে ধরলো। আইরিন চিৎকার দিয়ে উঠলো। গুলিটা ইমরানের বাম হাতের বাহুতে লেগেছে। ইমরান ব্যাথায় চোখ মুখ খিঁচে দাঁড়িয়ে রইলো। বিকাশের হাতে রিভলবার টা দেখে আঁতকে উঠলো সবাই। ইমরানের দুই গার্ড বিকাশকে ধরে রেখেছে। ইমরান খারাপ কিছু ঘটবে জেনেছিলো,তাই ওদের রেডি থাকার নির্দেশ দিয়েছিলো।
মিনহাজ অস্ফুটস্বরে বললো,
‘বি কা শশ….’
‘ হ্যাঁ আমি, আমার এত দিনের সাজানো প্ল্যানে পানি ঢালতে এসেছিস। ইমরান তোকে তো আমি ছাড়বোনা। তুই আমার ভাইয়ের সাথে যা করেছিস তোকে তো ছাড়বোনা। আমার ভাই এর আত্মা শান্তি পাবে না। বাবা এই সেই ইমরান যার জন্য ভাইয়া আ/ত্ম/হ/ত্যা করেছে।ওই ভাইয়াকে বুয়েট থেকে লজ্জা দিয়ে বের করে দিয়েছে।’
‘উহু লজ্জা দিয়ে বিতাড়িত করিনি, মেয়েদের সম্মান হরণ করে প্রতি রাতে বিছানায় মেয়ে নিয়ে তাদের জীবন ন*ষ্ট করার অপরাধে পিটিয়ে অর্ধ-ন/গ্ন করে তারপর ঘাড়
ধা/ক্কা দিয়ে বিতাড়িত করেছি।আরো কিছু শুনতে চাও।’
‘তোকে তো আমি সবার সামনে বি/ব/স্ত্র করবো’
ইমরান এখনো শান্ত, হাত থেকে র*ক্ত যাচ্ছে গলগল করে।মোনার কানে হাত। মিনহাজের দিকে তাকিয়ে দেখে ওর চোখে পানি, প্রকাশের সাথে প্রথম পরিচয়টা হয়েছিলো মিনহাজের জন্য। ইমরান বার বার বারণ করার পর ও মিনহাজ ভালো সম্পর্ক রেখেছিলো ওর সাথে। ইমরান মাথা কাত করে মিনহাজকে প্রশ্ন ছুড়লো,
‘ চোখের পানি কার জন্য মিনহাজ ভাই? ইমরান না মেয়ে?’
বিকাশের বাবা তেড়ে এসে ইমরানকে ধরতে যাবে নয়ন এসে জোরে একটা থাপ্পড় মারে,
‘শালা তুই ও তো কম না। তোর ও রেকর্ড খারাপ। মেয়ে পাচারের ব্যবসা তোর ও আছে। পোলা দুইটারেও বানাইছিস শয়তানের আখড়া নিজেও একটা শয়তান। আমি তোর সম্পর্কে অনেক শুনছি কিন্তু চোখে দেখি নাই। ইশ আরেকটু হলে তো মেয়েটার জীবনই শেষ হতে যাচ্ছিলো।’
আত্মীয়রা ভয়েই সিঁটিয়ে গিয়েছে।
বিকাশ মিনহাজকে বললো, ‘মিনহাজ আংকেল আপনার মেয়ে তো সুগার বেবি হয়ে গেলো। এত বয়সের একজনের সাথে কি সুন্দর লুকিয়ে লুকিয়ে প্রেম করে গেলো, অথচ কেউ টেরই পেলোনা। তোকে তোর মোনার সামনেই বস্ত্রহীন করবো আমি ইমরানের বাচ্চা। ছাড়বোনা। তুই আমার ভাইকে মে/রেছিস।’
কথাটা যেন পুরো ড্রইং রুমে বাঁজ পড়ার মতো হলো। ইমরান-মোনা প্রেম করেছে। ইমরানের চোয়াল শক্ত হয়ে এলো। ভরা মসলিসে মোনার অপমানটা হোক ও কখনো চায় নি। মেয়েটাকে নিয়ে এখন কথা চালাচালি, কূটকাচালি সব হবে। এই মেয়ে মুখ দেখাতে কষ্ট হয়ে যাবে বাইরে।
ইমরানের ইশারা পেয়েই গাড়ির ড্রাইভার, গার্ড দুজন সহ আরো তিনজন ছেলে এসে হাজির। বাড়ি থেকে বের করে ওদের নিয়ে যাচ্ছে টেনে-হিঁচড়ে। বিকাশ যেতে যেতে গলা ফাটিয়ে বলছে,
তুমি আমার শেষবেলা পর্ব ১৮
‘ আমি এসে তোকে দেখে নিব ইমরান, সাথে তোর কচি প্রেমিকাকে। ‘
মামুন সাহেব শাসিয়ে বলে উঠলো,
‘ খবরদার বিকাশ মুখ সামলে কথা বলো নিজে দুশ্চরিত্র হয়ে আমার নাতনীর গায়ে কলঙ্ক লাগাবেনা একদম’
‘জিজ্ঞেস করুন আপনাদের অতি সম্মানের ইমরানকে এবং নাতনীকে।’
মায়া নিষ্পলক চেয়ে আছে মোনার দিকে।
আস্তে আস্তে বিকাশের স্বর ক্ষীন হয়ে আসলো ততক্ষনের ওদের সরিয়ে ফেলা হয়েছে। আত্নীয়স্বজন সবাই চলে যাচ্ছে ঘনিষ্ঠ আত্নীয় ছাড়া।
