Home র‌ইলো প্রেমের নিমন্ত্রণ র‌ইলো প্রেমের নিমন্ত্রণ পর্ব ৯

র‌ইলো প্রেমের নিমন্ত্রণ পর্ব ৯

র‌ইলো প্রেমের নিমন্ত্রণ পর্ব ৯
ইয়ুশরা রিমু

নিজের রুমে ফিরে দরজাটা ভেতর থেকে লাগিয়ে দিতেই বেলা যেন আর নিজেকে সামলে রাখতে পারলো না।দরজার সঙ্গে পিঠ ঠেকিয়ে কয়েক মুহূর্ত স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল সে। বুকের ভেতরটা এখনও সমান তালে কাঁপছে। মনে হচ্ছিলো, একটু আগের ঘটনাটা সত্যিই ঘটেছে, নাকি সে কোনো স্বপ্ন দেখে এসেছে! ধীরে ধীরে ওড়নার এক কোণ তুলে নাকের কাছে আনতেই আবারও ভেসে এলো সেই পরিচিত, মা’দকতাময় সুবাস। চোখ দুটো অজান্তেই বন্ধ হয়ে গেলো।ঠোঁটের কোণে নরম একটা হাসি ফুটিয়ে বলে,
—এতটুকু একটা পারফিউম।অথচ আমার পুরো দিনটাই বদলে দিল!
আয়নার সামনে গিয়ে নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকাতেই লজ্জায় আবার গাল দুটো লাল হয়ে উঠলো। নিজের মুখের দিকে আঙুল তুলে বিড়বিড় করে বলল,

— বেলা তুই শেষ! একদম শেষ! মানুষটার সামনে দাঁড়িয়ে “হিটলার বেটা” পর্যন্ত বলে চলে এসেছিস! আল্লাহ! উনি এখন আমাকে কী ভাবছেন?
মুহূর্তখানেক পরই আবার নিজের কথাতেই হেসে ফেলল সে,
—কিন্তু লোকটা রাগও তো করলেন না!
সেই মুহূর্তে তার মনে পড়ে গেল সায়রের শান্ত চোখ দুটো, ওড়নার ওপর নিজের হাতে পারফিউম স্প্রে করে দেওয়া, আর শেষে নামাজের কথা মনে করিয়ে দেওয়া।হঠাৎ করেই বেলার চোখের দৃষ্টি কোমল হয়ে এলো।খুব আস্তে বললো,
—মানুষটা আসলে এতটাও খারাপ না যতোটা আমি ভাবি।
তারপর আবার দ্রুত মাথা নেড়ে নিজেকেই ধমক দিল,
— না না! বেশি ভাববি না। একদম বেশি ভাববি না।
কিন্তু হৃদয় কি আর এসব কথা শোনে?ওড়নাটা আলতো করে ভাঁজ করে বুকে জড়িয়ে ধরল সে।আজ এই সুবাসটা যেন শুধু কোনো পারফিউমের ঘ্রাণ নয়।এর সঙ্গে জড়িয়ে গেছে এক টুকরো স্মৃতি, একটুখানি যত্ন, আর অদ্ভুত এক প্রশান্তি।
অন্যদিকে ঠিক কিছুক্ষণ পরেই সায়র, বিহান, বাশার খান আর সারোয়ার খান একসঙ্গে মসজিদের উদ্দেশে বেরিয়ে গেলেন।জুমার দিনের পরিবেশটাই যেন আলাদা। রাস্তাজুড়ে মানুষজন পরিচ্ছন্ন পোশাকে মসজিদের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

নামাজ শেষে বাড়ি ফিরতে ফিরতেই দুপুর গড়িয়ে গেলো।ডাইনিং টেবিলে সবাই একসঙ্গে বসে খাওয়া-দাওয়া শেষ করলো। খাওয়ার ফাঁকেই রাতের আয়োজন নিয়ে শুরু হয়ে গেলো নতুন আলোচনা।বাশার খান বললেন,
—সন্ধ্যার আগেই ছাদটা পুরো সাজিয়ে ফেলতে হবে। লাইটগুলো ঠিকমতো লাগিয়েছ কি না, সেটা আগে দেখে নিও।
বিহান মুখে পানির গ্লাস তুলে বললো,
— ওই দায়িত্ব আমার। তবে আজকে একটা জিনিস অবশ্যই থাকবে।
সারোয়ার খান হেসে জিজ্ঞেস করলেন,
— আবার কী?
বিহান চোখ টিপে বললো,

— ছাদের একপাশে বড় করে আর্জেন্টিনার পতাকা টাঙাবো। নিচে নীল-সাদা বেলুন থাকবে। তারপর সায়রের দিকে তাকিয়ে বলে, তবে একটা কথা আগেই বলে রাখছি, আজ ব্রাজিল সমর্থকদের জন্য কোনো বিশেষ সুবিধা নেই। চাইলে আলাদা কর্নারে বসে খেলা দেখতে পারো!
কথাটা বলতেই সবাই হেসে উঠলো।
নাজনীন সুলতানা মাথা নেড়ে বললেন,
— তোদের ফুটবল নিয়ে পাগলামি কোনোদিন কমবে না।
বাশার খানও মৃদু হেসে বললেন,
— শুধু পতাকা টাঙিয়ে থেমো না। সুন্দর করে পুরো ছাদ সাজাও।
বিহান হাত তুলে বললো,
— বস! সব দায়িত্ব আমার।
খাওয়া শেষ করেই বাড়ির ছেলেরা কেউ লাইট ঝুলাতে ব্যস্ত হয়ে গেলো কেউ সাউন্ড সিস্টেম ঠিক করছে, কেউ টেবিল-চেয়ার গুছিয়ে রাখছে। পুরো বাড়িটা যেন আজ উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে।
এদিকে বেলা ইচ্ছে করেই নিচে নামছে না।বারান্দা থেকে একবার নিচে তাকিয়ে দেখলো, সায়রও অন্য সবার সঙ্গে কাজ করছে।মুহূর্তের মধ্যেই তার বুক ধড়ফড় করে উঠলো।

— না ।আজকে ওনার সামনে আর যাওয়া যাবে না।
সকালের ঘটনাটা মনে পড়তেই বেলা দুই হাতে নিজের মুখ ঢেকে ফেলে বলে উঠে,
— ইয়া আল্লাহ্! আমি এসব কী বলে ফেললাম। নিশ্চয়ই লোকটা আমাকে নি’র্লজ্জ, বে’হায়া ভাবছে।
তাই সারা বিকেলই বেলা ইচ্ছে করে কখনও রান্নাঘরে, কখনও নিজের রুমে, কখনও ছাদের অন্য পাশে ঘুরে বেড়াতে লাগলো ।‌শুধু যেন সায়রের সামনে না পড়তে হয়।আর দূর থেকে যখনই সায়রকে দেখতে পেত, সঙ্গে সঙ্গে অন্যদিকে সরে যেত।এই লুকোচুরি অবশ্য সায়রের চোখ এড়ালো না।দু-একবার সে লক্ষ্য করলো, বেলা তাকে দেখেই পথ বদলে ফেলছে। সায়রের ভ্রু সামান্য কুঁচকে গেল মনে মনে বলল,
—সকাল পর্যন্ত তো বেশ সাহস ছিলো। এখন আবার পালাচ্ছিস কেন ইডিয়েট?

বিকেলের আলো তখন ধীরে ধীরে নরম হয়ে আসছে। পশ্চিম আকাশে সূর্যটা যেন সোনালি আভা ছড়িয়ে বিদায় নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। বাড়ির সামনের বাগানের ফুলগুলো হালকা বাতাসে দুলছে, আর পুরো বাড়িজুড়ে চলছে সন্ধ্যার আয়োজনের শেষ মুহূর্তের ব্যস্ততা। কেউ ছাদে রঙিন লাইট ঝুলাচ্ছে, কেউ টেবিল সাজাচ্ছে, আবার কেউ রান্নাঘরে একের পর এক খাবারের প্রস্তুতি নিচ্ছে। উৎসবের আমেজে চারপাশ মুখর হয়ে উঠলেও বেলার মনটা যেন বারবার একটাই অপেক্ষায় আটকে ছিলো।
—আজ ইরা আসবে।
সকাল থেকেই অন্তত দশবার ফোন করে জিজ্ঞেস করেছে,
—কোথায়? বের হয়েছিস? আর কতক্ষণ লাগবে?
প্রতিবারই ইরা হেসে একই উত্তর দিয়েছে,
—ধৈর্য ধর। পৌঁছে যাবো।

কিন্তু ধৈর্য ধরার ক্ষমতা কোনো কালেই ছিলো না। কখনো বারান্দায় দাঁড়িয়ে রাস্তার দিকে তাকাচ্ছে, কখনো গেটের কাছে এসে উঁকি দিচ্ছে, আবার কখনো নিজের ফোনের স্ক্রিন অন করে সময় দেখছে। প্রতি পাঁচ মিনিট পরপরই মনে হচ্ছে এই বুঝি এসে গেলো!
ঠিক তখনই বাড়ির সামনে এসে ধীরে ধীরে একটি রিকশা এসে থামলো। শব্দ কানে আসতেই বেলার বুকের ভেতরটা আনন্দে লাফিয়ে উঠলো। সে প্রায় দৌড়ে বারান্দায় এসে নিচে তাকালো। রিকশা থেকে নামলো ইরা।হালকা আকাশি রঙের সালোয়ার-কামিজ, সাদা ওড়না, কাঁধ ছুঁয়ে থাকা খোলা চুলগুলো বাতাসে আলতো করে উড়ে উঠছে। মুখে খুব হালকা সাজ, ঠোঁটে স্বাভাবিক একটুকরো হাসি। হাতে ছোট্ট একটি গিফট ব্যাগ, আর চোখে সেই চিরচেনা প্রাণবন্ত উচ্ছ্বাস।গাড়ি থেকে নেমেই চারপাশে একবার তাকিয়ে পরিচিত দুষ্টুমি মাখা গলায় ডাক দিলো,

—বেলাআআ! কোথায় রে তুই?
ইরার ডাক শুনে উপরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা বেলার আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা করতে ইচ্ছে করলো না।ইরাআআ! বলেই সে প্রায় ছুটে নিচে নেমে এলো। সিঁড়ি বেয়ে নামার সময় দু-একবার নাজনীন সুলতানা সাবধানে নামতে বললেও আজ সেসব শোনার সময় তার নেই।গেটের কাছে পৌঁছাতেই দুজনে‌ইএকসঙ্গে দৌড়ে এসে শক্ত করে একে অপরকে জড়িয়ে ধরলো।
—উফ! অবশেষে এলি!
— না এসে উপায় ছিলো? তোর ফোনে তো আমার কান ঝালাপালা হয়ে গেছে!
বেলা ঠোঁট ফুলিয়ে বলল,
— মিথ্যা বলিস না। আমি মাত্র দশ-বারোবার ফোন দিয়েছি।
ইরা হো হো করে হেসে উঠে,
— মাত্র? আমার কললিস্ট দেখলে তুই নিজেই ভয় পেয়ে যাবি।
বেলাও হেসে ফেললো। অনেকক্ষণ পর তার হাসিটা এতটা স্বতঃস্ফূর্ত, এতটা প্রাণখোলা লাগছিলো। সকাল থেকে বুকের ভেতরে জমে থাকা সব লজ্জা, অস্বস্তি আর অকারণ ধুকপুকানির ভিড়ে এই একটি পরিচিত মুখ যেন মুহূর্তেই তাকে আগের সেই চঞ্চল বেলায় ফিরিয়ে আনলো।
ঠিক তখনই ছাদে সাজসজ্জার জন্য বড় একটা কার্টন হাতে নিয়ে ভেতরে ঢুকছিল বিহান।হঠাৎ সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ইরাকে দেখে থেমে গেলো।ইরাও অবাক হয়ে তাকালো।
বিহান হালকা হেসে বললো,

— ওহ! নতুন অতিথি এসে গেছে বুঝি বেলা?
ইরা ভদ্রভাবে সালাম দিয়ে বললো,
— আসসালামু আলাইকুম ভাইয়া।
—ওয়ালাইকুমুস সালাম।
বিহান মুচকি হেসে বললো,
— আপনিই তাহলে সেই বিখ্যাত ইরা! যার গল্প আমি গত দুই ঘন্টা ধরে অন্তত পঞ্চাশবার শুনেছি।
বেলা সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করল,
— এই! অত বাড়িয়ে বলবে না ভাইয়া।
বিহান ভান করে গম্ভীর মুখে বললো,
— আমি কিন্তু সত্যিই বলছি। আপনার বান্ধবী আপনাকে এমনভাবে বর্ণনা করেছে, মনে হচ্ছিল কোনো রাষ্ট্রদূত আসছে।
ইরা হেসে বললো,
—তাই নাকি?
— অবশ্যই। এখন আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে বর্ণনার অর্ধেকও বলেনি।
বেলা চোখ রাঙিয়ে বলল,
— বিহান ভাই, তুমি না…
— আচ্ছা আচ্ছা, আর বলছি না। তোরা গল্প কর। আমি যাই। না হলে আবার আজকের সাজসজ্জা শেষ করতে পারবো না।
ইরা তখন কৌতূহলী চোখে বেলার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বললো,
—আচ্ছা এবাড়িতে সবাই এমন মজার মানুষ? শুধু একজনই কি গম্ভীর নাকি?
বেলা কিছু না বলে শুধু মাথা নিচু করে মৃদু হেসে ফেললো।

বিকেলের শেষ আলো ধীরে ধীরে মিলিয়ে যেতেই পুরো ছাদ যেন রঙিন আলোর ঝলকানিতে নতুন এক রূপ ধারণ করল। চারপাশে নীল-সাদা ফেয়ারি লাইটের সারি বাতাসের দোলায় টিমটিম করে জ্বলছে। একপাশে বড় করে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে আর্জেন্টিনার পতাকা। তার নিচে একই রঙের বেলুন দিয়ে সুন্দর করে সাজানো হয়েছে ছোট্ট একটি কর্নার। মাঝখানে গোল টেবিলগুলোতে সাদা কাপড় বিছিয়ে রাখা হয়েছে, চারদিকে সারি করে রাখা চেয়ার। ছাদের এক কোণে মৃদু ভলিউমে বাজছে পুরোনো বাংলা গানের সুর, আর রান্নাঘর থেকে ভেসে আসা রোস্ট আর বিরিয়ানির মন মাতানো ঘ্রাণ । শুধু বারবিকিউ করা হবে ছাদে। ইরা ছাদে পা রাখতেই দু’হাত ছড়িয়ে চারপাশে তাকিয়ে মুগ্ধ হয়ে বললো,

—ওয়াও! এত সুন্দর করে সাজিয়েছিস? ছবিতে দেখলেও বিশ্বাস করতাম না। ভাবতাম তুই ইডিট করে পাঠিয়েছিস।
বেলা গর্বিত মুখে বলল,
— সব বিহান ভাইয়ের আইডিয়া। সকাল থেকে সবাই মিলে কত কষ্ট করেছে জানিস?
তারপর আর দুজনকে ধরে রাখা গেলো না।কখনো তারা বেলুন নিয়ে দুজন ঝগড়া করছে , কখনো ছাদের একপাশে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছে, কখনো আবার নিচে দাঁড়িয়ে থাকা বিহানকে উদ্দেশ্য করে অকারণে হাসাহাসি করছে। ইরা মাঝেমধ্যে বেলাকে ইচ্ছে করেই ধাক্কা দিচ্ছে, আর বেলা ভান করে রেগে তার পেছনে ছুটছে।
বিহান দূর থেকে মাথা নেড়ে হেসে বললো,
— তোদের দুজনের হাসির শব্দে সারা ঢাকা শহরের মানুষ চলে আসবে। এতো বেশি লোকের খাবারের আয়োজন করিনি আমরা। তাই শব্দ কম করে ভেটকা।
ইরা সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিলো,

—এখন তো মাএ শুরু করেছি । আমরা একসঙ্গে হলে কতো কথা যে বলি আপনি নিজেও বিরক্ত হয়ে যাবেন।
কথাটা শুনে আশপাশে দাঁড়িয়ে থাকা সবাই হেসে উঠলো।বেলাও হাসছিলো। তার হাসিটা নির্ভার, এতটা স্বতঃস্ফূর্ত ছিলো।।কিন্তু সেই হাসিটা বেশিক্ষণ টিকলো না।ঠিক তখনই নিচে গাড়ি থামার শব্দ ভেসে এলো। কেন জানি, তার সুখের মুহূর্তগুলো যেন তার জীবনে বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় না।তার সুখের মুহূর্ত পন্ড করতে বাড়ির গেইট খুলে প্রবেশ করলো রুপসা। রুপসাকে দেখার সঙ্গে সঙ্গেই বেলার মুখের হাসিটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায়।মুহূর্তের মধ্যে তার ভেতরের সমস্ত উচ্ছ্বাস যেন কোথায় হারিয়ে গেলো।
ইরা অবাক হয়ে লক্ষ্য করলো, কয়েক সেকেন্ড আগেও যে মেয়েটা হাসতে হাসতে কথা বলছিল, সে হঠাৎ করেই অস্বাভাবিক চুপ হয়ে গেছে।ইরা নিচু গলায় জিজ্ঞেস করলো,

—কী হলো? হঠাৎ এমন চুপ করে গেলি কেন?
বেলা কোনো উত্তর দিলো না।
শুধু স্থির চোখে সিঁড়ির দিকে তাকিয়ে রইলো ।
রুপসা ধীরে ধীরে ছাদে উঠে এলো। সবার সঙ্গে হাসিমুখে কুশল বিনিময় করলো। বড়দের সালাম করলো, মমতাজ বেগমের পাশে গিয়ে কিছুক্ষণ গল্প করলো, তারপর সায়রের দিকেও এগিয়ে গেলো।বেলার ভেতরটা হঠাৎ অদ্ভুত এক বিরক্তিতে ভরে উঠলো। সে মুখে এক রাশ বিরক্তি টেনে মিনমিনেয়ে বলে,
— এই শালী আবার এইখানে আসছে কেন?
ইরা গল্প করতে করতেই হঠাৎ কৌতূহলী দৃষ্টিতে চারপাশে তাকিয়ে নিচু স্বরে বলল,
—আচ্ছা, ওই মেয়েটা কে? সবাইকে বেশ আপন করে কথা বলছে দেখছি।
বেলা যেদিকে তাকিয়ে ছিল, সেদিকেই চোখ রেখেই উত্তর দিল,

— ও রুপসা।
— আত্মীয় তোদের?
— আমাদের না। দূর সম্পর্কের আত্মীয় সায়র ভাইদের আবার কলেজ ফ্রেন্ড ছিলো দুজনে।
শেষ কথাটা বলতে গিয়েই বেলার গলাটা অদ্ভুতভাবে ভারী হয়ে গেলো।ইরা বিষয়টা খেয়াল করলেও কিছু বললো না। শুধু আবার একবার রুপসার দিকে তাকিয়ে দেখলো, মেয়েটা হাসিমুখে সবার সঙ্গে গল্প করছে। কয়েক মুহূর্ত পর সে আবার স্বাভাবিক কৌতূহলেই জিজ্ঞেস করল,
— দেখতে তো বেশ ভদ্রই লাগছে। তুই এমন মুখ গোমড়া করে আছিস কেন?
বেলা এবার ঠোঁট ফুলিয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে বলে,
—- ওকে আমার একদম ভালো লাগে না।
— কেন?
কিছুক্ষণ চুপ করে রইল বেলা। এরপর বেলা বিরক্ত গলায় বললো,
—আচ্ছা, একটা সাধারণ পারিবারিক অনুষ্ঠানেও ওনার আসতেই হলো?
ইরা অবাক হয়ে তাকিয়ে বলে,

— কার?
— ওই যে রুপসা কু’টনির!
কথাটা বলেই আবার মুখ ফিরিয়ে নিলো বেলা।মনে মনে একের পর এক প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে লাগলো,
—তাহলে কি সায়র ভাই নিজেই ওনাকে নিমন্ত্রণ করেছেন?কী দরকার ছিল এই ডংগিটাকে ইনভাইট করার?
নিজেরই অজান্তে বুকের ভেতর কেমন একটা তীব্র অস্বস্তি জমে উঠতে লাগলো।দৃষ্টি বারবার দূরে দাঁড়িয়ে থাকা সায়র রুপসার দিকে চলে যাচ্ছে, অথচ সে জোর করেই অন্যদিকে তাকিয়ে থাকার চেষ্টা করছে।কিন্তু মন কি আর কারও কথা শোনে?ছাদের একপাশে দাঁড়িয়ে থাকা বেলা যতই নিজের মনকে অন্যদিকে ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করুক না কেন, তার চোখ যেন বারবার অবাধ্য হয়ে একই দৃশ্যের দিকেই ফিরে যাচ্ছিলো। একটু দূরে দাঁড়িয়ে সায়র খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে রুপসার সঙ্গে কথা বলছে। তবুও বেলার চোখে সেই দৃশ্যটুকুই যেন বারবার এসে বিঁধতে লাগলো।
রুপসা কিছু একটা বলতেই সায়রের ঠোঁটের কোণে হালকা একটা হাসি ফুটে উঠলো। খুব বড় কোনো হাসি নয়, কিন্তু এতটুকুই যথেষ্ট ছিল বেলার বুকের ভেতরটা হঠাৎ করে মোচড় দিয়ে ওঠার জন্য।সে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলো।তারপর খুব ধীরে নিজের দৃষ্টি সরিয়ে নিলো।অদ্ভুত এক ভার জমতে লাগলো বুকের ভেতরে।মনে মনে বিড়বিড় করে বললো,

— আমার সঙ্গে তো কখনো এভাবে কথা বলেন না।
কথাটা মনে আসতেই একের পর এক স্মৃতি মাথার ভেতর ভিড় করতে লাগলো। যখনই সে সায়রের সামনে যায়, মানুষটা হয় তাকে পড়াশোনার কথা বলে, নয়তো দুষ্টুমি কমাতে বলে, নয়তো গম্ভীর মুখে দু-চারটা কথা শুনিয়ে দেয়। তার মুখে হাসি দেখাই যেন বিরল।কিন্তু সেই একই মানুষটাকে রুপসার সঙ্গে এত সহজ, এত স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে দেখে বেলার বুকের ভেতরটা হঠাৎ করেই শূন্য হয়ে গেলো।সে ঠোঁট কা’মড়ে অন্যদিকে তাকানোর চেষ্টা করে।নিজেকে আর সামলাতে না পেরে সে ছাদের একেবারে নির্জন কোণায় গিয়ে দাঁড়ালো। দূরে সন্ধ্যার আকাশে একে একে তারা দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে, কিন্তু তার চোখে যেন চারপাশের কোনো সৌন্দর্যই ধরা পড়ছে না।শুধু বুকের ভেতরটা ভারী হয়ে আসছে।খুব আস্তে নিজের মনকেই প্রশ্ন করলো,

—তোর এত কষ্ট হচ্ছে কেন, বেলা?তুই কে সায়র ভাইয়ের?কেউ না তুই ওনার।একদম কেউ না।তাহলে এত অধিকারবোধ কেন?
চোখ দুটো হঠাৎ করেই জ্বা’লা করতে লাগলো।সকালের ঘটনাগুলো একে একে মনে পড়ে গেল।নিজের লজ্জা ভুলে সায়রের রুমে চলে যাওয়া।পারফিউম চুরি করে ব্যবহার করতে গিয়ে ধরা পড়া। আর সবশেষেদরজার কাছে দাঁড়িয়ে এক নিঃশ্বাসে বলে ফেলা ভালোলাগার কথা।
কথাগুলো মনে পড়তেই ল’জ্জায়, অপমানে আর অনুশোচনায় নিজেরই মুখটা নিচু হয়ে গেলো।সে দু’চোখ শক্ত করে বন্ধ করলো।মনে হচ্ছিল, ইচ্ছে করলেই যদি ওই কয়েকটা মুহূর্ত মুছে ফেলা যেত!নিজেকেই তীব্র ধমক দিয়ে মনে মনে বললো,

—কী ভেবেছিলি তুই? উনি তোকে নিয়ে আলাদা করে কিছু ভাবেন?একটু ভালো ব্যবহার করলেই তুই নিজের সীমা ভুলে গেলি।হয়তো উনাদের সম্পর্কটাই এমন যেখানে হাসিমুখে কথা বলা যায়। আর আমার জন্য আছে শুধু বকা, ধমক আর ‘ইডিয়েট’ শব্দটা।
এক দীর্ঘশ্বাস নিঃশব্দে বেরিয়ে এল তার বুকের ভেতর থেকে।পরের মুহূর্তেই নিজের চোখের কোণে জমে ওঠা পানিটা দ্রুত মুছে ফেললো।না।আর না।আজকের পর আর কখনো না।আজ সে নিজের সবচেয়ে বড় ভুলটা বুঝতে পেরেছে।নিজের মনে মনে দৃঢ় একটা প্রতিজ্ঞা করে ফেললো সে।আজকের পর আর কখনো সায়রের সামনে এমন বেহায়ার মতো আচরণ করবে না।আর কখনো নিজের অনুভূতিগুলোকে মুখ ফসকে বেরিয়ে আসতে দেবে না।আর কখনো এমন কোনো কথা বলবে না, যেটা শুনে মানুষটা তাকে হালকা ভাবে।সে নিজের দুই হাত শক্ত করে মুঠো করে ফেললো।মনে মনে দৃঢ় কণ্ঠে বললো,

র‌ইলো প্রেমের নিমন্ত্রণ পর্ব ৮

— শুনে রাখ বেলা। আজ থেকে সব শেষ। তুই আর কোনোদিন এই মানুষটার সামনে নিজের অনুভূতি নিয়ে দাঁড়াবি না।যতই ভালো লাগুক, যতই কষ্ট হোক, সবকিছু নিজের ভেতরেই চাপা রাখবি।আজ বুঝেছি।এই লোকটার সামনে এতটা বে’হায়া হয়ে যাওয়াটাই ছিল ওর জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল।

র‌ইলো প্রেমের নিমন্ত্রণ পর্ব ১০

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here