ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ৪০ (২)
মারিয়াম ফুল
মেহেরের অবশ পা দুটো আর যেন এগোতে চাইছিল না। সিঁড়ির ঠান্ডা মেঝেতে খালি পা ছোঁয়াতেই এক হিমশীতল অনুভূতি তার মেরুদণ্ড বেয়ে ওপরে উঠে এলো। কিন্তু শারীরিক ঠান্ডার চেয়েও হাজার গুণ বেশি শীতল হয়ে গেছে তার ভেতরের আত্মাটা। তীব্র অপমানে, অপঘাতের চাদরে ঢাকা এই জীবনটা নিয়ে সে এখন কোথায় দাঁড়াবে?
এক পা, দু পা করে সে লিফটের দিকে না গিয়ে সিঁড়ি দিয়েই নিচে নামতে লাগল। তার মনে হচ্ছিল, এই চার দেয়ালের লিফটও এখন তাকে গ্রাস করতে আসবে। করিডোরের আবছা আলো-আঁধারিতে মেহেরের সাদা ওড়নাটা ঝড়ের বাতাসে উড়ছিল। প্রতিটা ধাপে তার মনে হচ্ছিল, গর্ভের সন্তানটি যেন ভেতর থেকে জিজ্ঞেস করছে—’মা, আমরা কোথায় যাচ্ছি?’ মেহেরের কাছে কোনো উত্তর নেই।
বিল্ডিংয়ের নিচতলায় পৌঁছাতেই তার চোখে পড়ল, দারোয়ান নিজের ছোট্ট রুমটায় গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন।বাইরে তখনো আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামছে, যেন প্রকৃতির সমস্ত কান্না আজ মেহেরের ওপর এসে আছড়ে পড়ছে। সে গেটের ওপাশে তাকাল—রাস্তাঘাট একদম জনমানবহীন, সুনসান নীরবতা গ্রাস করেছে পুরো ঢাকাকে।
মেহের এক মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়াল। বৃষ্টির বড় বড় ফোঁটা তার গায়ে এসে লাগতেই সে চোখ বন্ধ করে ফেলল। এই অচেনা শহরে, এই ভয়ঙ্কর দুর্যোগে, একজন আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা নারী খালি পায়ে, ওড়নাটা কোনোমতে গায়ে জড়িয়ে অন্ধকারের দিকে পা বাড়াল।পেছন থেকে গেটটা আগলে রাখা অ্যাপার্টমেন্টের দিকে মেহের একটিবার শেষ নজরও দিল না। সেখানে তার অধিকার ছিল না কোনোদিন, আজ রুদ্র সেটা প্রমাণ করে দিয়েছে।
বৃষ্টির পানিতে মেহেরের শরীর ভিজে একাকার হয়ে যাচ্ছে। পিচ্ছিল রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে সে দু-একবার প্রায় পড়ে যেতে নিচ্ছিল, কিন্তু প্রতিবারই এক অদৃশ্য শক্তিতে সে নিজের পেটটা আগলে ধরে সোজা হয়ে দাঁড়াচ্ছিল। তার চোখের পানি আর বৃষ্টির পানি একাকার হয়ে গেছে। মনের ভেতর কেবল একটা কথাই ঘুরপাক খাচ্ছিল—
মানুষ এতটা নিষ্ঠুর কী করে হয়? যে রুদ্রকে সে মনে মনে একটু একটু করে বিশ্বাস করতে শুরু করেছিল,সে আজ তাকে এভাবে অ্যাপার্টমেন্ট থেকে তাড়িয়ে দিল ?
কিছুদূর যাওয়ার পর মেহেরের মাথাটা কেমন যেন ঝিমঝিম করে উঠল। চারপাশের অন্ধকার আরও গাঢ় মনে হতে লাগল। বৃষ্টির তীব্র শব্দটা যেন দূর থেকে আসা কোনো হাহাকারের মতো শোনাল। পায়ের নিচে কোনো ধারালো পাথরের আঘাতে হয়তো কেটে গেছে, তীব্র একটা যন্ত্রণা সে অনুভব করল, কিন্তু সেই যন্ত্রণাকে ছাপিয়ে গেল তার তলপেটের একটা মোচড়।
ভয়ে মেহেরের নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসার উপক্রম হলো। সে রাস্তার ধারের একটি বন্ধ দোকানের সাটারের সামনে কোনোমতে দেয়াল ধরে দাঁড়িয়ে পড়ল। শরীর আর চলছে না, চোখ দুটো বুজে আসছে।
রুদ্র মেহেরকে ঘর থেকে বের করে দেওয়ার পর কেটে গেছে প্রায় একটা দীর্ঘ ঘণ্টা।
এতটা সময় রুদ্র সদর দরজার পাশেই, মেঝের ওপর একদম গুটিসুটি মেরে বসে ছিল। দুই হাঁটুর মাঝে মাথাটা গুঁজে ও যেভাবে বসে আছে, দূর থেকে দেখলে মনে হবে কোনো এক অপরাধের দায় মাথায় নিয়ে এক আসামি কাঠগড়ায় স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ওর পুরো শরীরটা তখনো একটা অবশ কাঁপুনিতে কাঁপছিল। বুকের ভেতরটা যেন ওলটপালট হয়ে যাচ্ছিল। এত বছর ধরে যে অতীতটাকে সে পৃথিবীর সমস্ত আলো থেকে আড়াল করে, বুকের সবচেয়ে গভীর অন্ধকারে চাপা দিয়ে রেখেছিল, আজ মেহেরের একটুখানি ছোঁয়া যেন সেই পুরোনো ক্ষতটাকে আবার জাগিয়ে তুলেছে। মনে হয়েছে, এতদিন যেই ব্যথাটাকে সময়ের স্তরে স্তরে চাপা দিয়ে রেখেছিল, মেহেরের একটুখানি স্পর্শেই সেই যন্ত্রণাগুলো আবার জেগে উঠেছে, যেন পুরোনো ক্ষতগুলো নতুন করে রক্তাক্ত হয়ে উঠেছে।
মেহেরের ওপর ও তখন প্রচণ্ড রেগে গিয়েছিল। কিন্তু কেনই বা রাগবে না? রুদ্র যখন নিজের মতো করে সবকিছু ভুলে একটু বাঁচতে চাইছে, তখনই অতীত এসে তপ্ত নিশ্বাস ফেলছে। আজ ওই ঘরের ছড়ানো খেলনা, দেয়ালের আঁকিবুঁকি আর বাচ্চার দোলনাটা দেখার পর রুদ্রর চোখের সামনে কেবল একটা অবয়ব ভেসে উঠেছিল। সেই ছোট্ট দুটো হাত… যে হাত দুটো একসময় পরম নিশ্চিন্তে ওর গলা জড়িয়ে ধরে আধো আধো গলায় ‘পা… পাপা.. পা.. পাপা.. ‘ বলে ডাকত! যাকে রুদ্র নিজের কোলে করে সারা বাড়ি মাথায় তুলে ঘুরত, তার অভাবটা আজ বড্ড বেশি করে বুকের ভেতর হাতুড়ি পিটিয়েছে। নিজের অজান্তেই এক তীব্র অপরাধবোধ এসে ওকে গ্রাস করল। ওর নিজের রক্ত… ওর কলিজার টুকরোটা আজ এই পৃথিবীতে নেই। কোনো এক অভিশপ্ত কালো রাত ওর জীবন থেকে এক নিমেষে সমস্ত সুখ, আনন্দ আর বিশ্বাস কেড়ে নিয়েছিল।
মেহেরকে ও প্রথম দিনই বারণ করেছিল না ওই ঘরের আশেপাশেও না আসতে? তবে মেহের কেন অবাধ্য হলো? কেন ওর নিষেধ অমান্য করে ওই রুমে ঢুকতে গেল?
ঠিক তখনই লিভিং রুমের দেয়ালে থাকা ঘড়িটায় টিকটিক শব্দ করে রাত ১১টা বাজল।
ধাতব সেই শব্দটায় রুদ্রর ভেতরের ঘোরটা এক ঝটকায় ভেঙে গেল। ও ধড়ফড় করে মেঝের ওপর সোজা হয়ে বসল। চারপাশের নিঝুম, খাঁ খাঁ অ্যাপার্টমেন্টটার দিকে তাকিয়ে ওর মাথার ভেতর যেন আকাশ ভেঙে পড়ল।
‘আমি… আমি এটা কী করলাম? মেহেরকে বের করে দিয়েছি? এই মাঝরাতে, এই দুর্যোগে?’
‘মেহের তো প্রেগন্যান্ট! যার শরীরে এই মুহূর্তে আরও একটা প্রাণ বড় হচ্ছে, তাকে আমি এভাবে ছুড়ে ফেলে দিলাম? হাউ ক্যান আই? ও…… ও যাবে কোথায়?’
রুদ্রর মুহূর্তেই মনে হলো ওর পায়ের তলার মাটি কেউ এক টানে সরিয়ে নিয়েছে। ওর হাত-পা অস্বাভাবিকভাবে কাঁপতে লাগল। এই নিশুতি রাতে, যখন ঝড়ের উন্মত্ততা চারপাশকে বারবার কাঁপিয়ে তুলছে, তখন মেহেরের আশ্রয় নেওয়ার মতো কোনো ছাদ নেই, ফিরে যাওয়ার মতো কোনো ঠিকানাও নেই।
রাগটা মাথা থেকে নামার সাথে সাথেই রুদ্রর ভেতরে এক তীব্র আত্মউপলব্ধি আর অনুশোচনা দলা পাকিয়ে উঠল। নিজের পুরুষত্ব আজ নিজের চোখেই বড় ঘৃণ্য আর ছোট মনে হলো—’আমি একটা পুরুষ হয়ে একজন অসহায়, গর্ভবতী নারীকে এভাবে ধাক্কা দিয়ে ঘর থেকে বের করে দিলাম !’
রুদ্র আর এক সেকেন্ডও সময় নষ্ট করল না। একটা ছাতা হাতে নিয়ে ও পাগলের মতো ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ল।
বিল্ডিংয়ের মেইন গেটের পাশে ছোট টুলটায় মাথা এলিয়ে দিয়ে তখন ও নাক ডেকে ঘুমোচ্ছিল দারোয়ান করিম। চারদিকের থমথমে মাঝরাতে সেই নাকের ডাক যেন আরও চড়া শোনাচ্ছিল। মেহেরকে কোথাও না পেয়ে রুদ্রর মাথার ভেতর তখন রগগুলো দপদপ করছে, বুকের ভেতর আছাড় খাচ্ছে এক তীব্র, ভয়ানক আতঙ্ক। দারোয়ানকে ওভাবে ঘুমোতে দেখে ওর ভেতরের সমস্ত রাগ আর জেদ এক মুহূর্তে গিয়ে আছড়ে পড়ল লোকটার ওপর।
রুদ্র এক ঝটকায় করিমের কাঁধ ধরে এমন জোরে ঝাঁকুনি দিল যে গভীর ঘুম থেকে চমকে উঠে লোকটা হকচকিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে গেল। চোখ কচলাতে কচলাতে কিছু বুঝে ওঠার আগেই রুদ্র গম্ভীর গলায় প্রশ্ন ছুড়ে দিল,
“একটু আগে কোনো মেয়েকে এই বিল্ডিং থেকে বের হতে দেখেছ?”
দারোয়ান ঘুমজড়ানো চোখ কচলাতে কচলাতে একবার রুদ্রর দিকে তাকাল। তারপর ধীরে মাথা নেড়ে জানাল, “না, স্যার।”
চোখ কচলাতে কচলাতে কিছু বুঝে ওঠার আগেই রুদ্র দারোয়ানের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। দুই হাতে করিমের শার্টের কলার খামচে ধরে এক ঝটকায় তাকে দেয়ালের সঙ্গে ঠেসে ধরল।
রাগে রুদ্রর চোয়াল শক্ত হয়ে আছে, চোখ দুটো রক্তিম। স্বভাবসুলভ কর্কশ আর জেদি কণ্ঠে গর্জে উঠল,
“ষোলো তলা একটা বিল্ডিংয়ের সিকিউরিটির দায়িত্বে আছ তুমি! আর ডিউটির সময় আরাম করে ঘুমোচ্ছ? একটা মেয়ে মাঝরাতে একা বিল্ডিং থেকে বের হয়ে গেল, আর তুমি টেরই পেলে না? তোমার দায়িত্বটা কী? চোখে কি বিক্রি করে খেয়েছ? নাকি বেতনটা শুধু ঘুমানোর জন্য নাও?”
করিম ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে আমতা আমতা করতে লাগল, “সাহেব… আমি… মানে…”
রুদ্র আর দারোয়ানের কোনো কথাই শুনল না। এই মুহূর্তে তার কাছে প্রতিটি সেকেন্ড মূল্যবান। সে যত দেরি করবে, মেহের তত দূরে চলে যাবে, আর বিপদের আশঙ্কাও তত বাড়বে। দারোয়ানের কলারটা এক ঝটকায় মুক্ত করে রুদ্র ঝড়ের বেগে বাইরের অন্ধকারের মাঝে বেরিয়ে গেল। বৃষ্টির তীব্র ঝাপটা এতক্ষণে কিছুটা কমে এসেছে, তবে পুরোপুরি থামেনি; টিপটিপ করে অবিরাম বৃষ্টি পড়েই চলেছে চারদিকে।
রাস্তার কাদামাখা পানি আর ঘুটঘুটে অন্ধকারের মধ্যে রুদ্র মেহেরকে খুঁজতে লাগল। দেখতে দেখতে একটা পুরো ঘণ্টা পার হয়ে গেল, কিন্তু মেহেরের কোনো চিহ্নও কোথাও নেই। চারপাশের এই সুনসান, ফাঁকা রাস্তায় মেহেরকে না পেয়ে রুদ্রর মনে হলো ওর মাথার রগগুলো বুঝি এবার ছিঁড়ে বেরিয়ে আসবে। ও আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না; রাস্তার এক কোণে কাদামাখা নোংরা পানির মাঝেই হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল।
নিজেকে আজ দ্বিতীয়বারের মতো জীবনের সবচেয়ে অসহায়, সবচেয়ে নিঃস্ব মানুষ বলে মনে হলো রুদ্রর। যেন ভাগ্য আবারও তার বুকের ভেতর থেকে সবচেয়ে প্রিয় জিনিসটা কেড়ে নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
“আই অ্যাম সরি মেহেরজান… আই অ্যাম সরি। আমি আর কখনো এমন করব না। প্লিজ ফিরে এসো…” রুদ্রর মনে হলো ওর বুকের একটা অংশ যেন চিরতরে খালি হয়ে গেছে। ও ওর ‘মিস অ্যারোফোবিয়া’কে কোথাও খুঁজে পাচ্ছে না।
“প্লিজ মিস অ্যারোফোবিয়া, কাম ব্যাক। তুমি যা বলবে আমি তা-ই শুনব। যেভাবে চলতে বলবে সেভাবেই চলব… আই অ্যাম লুজিং মাইসেলফ… আই অ্যাম লুজিং…” ও নিজের চুলে হাত খামচে ধরে একা একাই বিড়বিড় করতে লাগল।
হঠাৎ করেই রুদ্র মাথা তুলে একটু দূরের দিকে তাকাল। রাস্তার সোডিয়াম লাইটের আবছা হলদেটে আলো এসে পড়েছে একটি কালচে বেঞ্চের ওপর। সেখানে জড়োসড়ো হয়ে বসে আছে এক নারীমূর্তি। কালো হিজাবটা বৃষ্টিতে পুরোপুরি ভিজে মাথা আর কাঁধের সঙ্গে লেপ্টে গেছে। সাদা পোশাকের আভাস ভেজা হিজাবের ফাঁক গলে চোখে পড়লেও মুখটা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে না। এলোমেলো কিছু চুল কপালের পাশ দিয়ে নেমে এসে মুখের বেশিরভাগটাই আড়াল করে রেখেছে। দূরত্ব আর ঝিরিঝিরি বৃষ্টির পর্দা মিলিয়ে মুহূর্তের জন্য বোঝার উপায় নেই—সে কি সত্যিই সেই মানুষটা, নাকি রুদ্রর মরিয়া চোখের ভুল?
রুদ্রর বন্ধ হয়ে আসা নিশ্বাসটা যেন এক পলকে আবার ফিরে এলো। ও ধপ করে কাদা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে ধীর, কিন্তু ব্যাকুল পায়ে সেই বেঞ্চটার দিকে এগিয়ে গেল। বেঞ্চে বসা ওই মেয়েটার ওপর থেকে ও নিজের একটা পলকের জন্যও চোখ সরাল না, যেন চোখ সরালেই ও আবার হাওয়া হয়ে যাবে।
মেহের তখন অন্যমনস্ক হয়ে বেঞ্চে বসে নিঃশব্দে কাঁপছিল। ঝড়ের সঙ্গে মিশে থাকা বৃষ্টির ফোঁটাগুলো অবিরাম এসে ভিজিয়ে দিচ্ছিল ওকে। কিন্তু হঠাৎই মেহের টের পেল, মাথার ওপর থেকে বৃষ্টির ফোঁটাগুলো যেন এক নিমিষেই উধাও হয়ে গেছে।
কিছুটা বিস্মিত হয়ে মেহের ধীরে ধীরে মাথা তুলে তাকাল।পরের মুহূর্তেই ওর নিঃশ্বাস যেন বুকের ভেতর আটকে গেল।
মাথার ওপর নিঃশব্দে ধরা একটি কালো ছাতা। আর ঠিক সামনে, বৃষ্টি-ঝড়কে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে, পাথরের মূর্তির মতো অটল, কঠিন মুখে দাঁড়িয়ে আছেন স্বয়ং ‘ক্যাপ্টেন সাহেব’।
মেহেরের ভেতরের ঘুমিয়ে থাকা অপমান আর ক্ষোভটা রুদ্রকে দেখামাত্র আবার চাড়া দিয়ে উঠল। ও নিজের মুখটা যতটা সম্ভব শক্ত করে, চোখের পানি আড়াল করে বলে উঠল,
“অপমান কি একটু কম হয়েছে? তাই ….. আবার ফিরে এসেছেন? যা কিছু বাকি আছে, সেটাও এসে করে নিন!”
রুদ্রর চোখের হিংস্র দৃষ্টিটা ততক্ষণে পুরোপুরি মিলিয়ে গেছে। তার জায়গা দখল করেছে এক অদ্ভুত কোমলতা—যেখানে মিশে আছে অপরাধবোধ, আকুতি আর নিঃশব্দ অনুনয় ….সে মেহেরের কথার কোনো পাল্টা জবাব দিল না, শুধু নিচু স্বরে বলল, “চলো।”
“কোথায়?” মেহেরের গলার স্বর অভিমানে আর শীতে কাঁপছে।
“অ্যাপার্টমেন্টে।”
“ওটা তো আমার অ্যাপার্টমেন্ট নয়। কার ঘরে যাব আমি?”
রুদ্র একবার বুক ভরে নিশ্বাস নিয়ে বলল, “আমি জীবনে কোনোদিন কাউকে ‘প্লিজ’ বলিনি। আজ তোমাকে বলছি… চলো। বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে, তোমার ঠান্ডা লেগে যাবে।”
মেহের এবার আর নিজের কান্না ধরে রাখতে পারল না, ফুঁপিয়ে উঠে বলল, “তাতে আপনার কী? বৃষ্টি হচ্ছে তো ……আমি নিজের জন্য আছি। আপনি বোধহয় ভুলে যাচ্ছেন রুদ্র সাহেব, আপনি নিজে আমাকে ওখান থেকে গলা ধাক্কা দিয়ে বের করে দিয়েছেন! এখন আবার কোন অধিকারে ডাকতে এসেছেন?”
কথা বলতে বলতেই মেহের শীতে আর অপমানে থরথর করে কাঁপতে লাগল। এর মধ্যেই যেন আকাশের মেঘগুলো শান্ত হয়ে এলো, বৃষ্টির তীব্রতাও ধীরে ধীরে কমে আসতে লাগল।
রুদ্র আর কোনো কথা বাড়িয়ে সময় নষ্ট করতে চাইল না। ও নিজের গা থেকে ওর জ্যাকেটটা টেনে খুলে মেহেরের দিকে এগিয়ে দিল।
“লাগবে না আমার কোনো কিছু!”
বলে মেহের ঝট করে মুখ ফিরিয়ে নিল। “যখন ইচ্ছে হলো ঘর থেকে কুকুর-বেড়ালের মতো তাড়িয়ে দিলেন, আবার যখন ইচ্ছে হলো দয়া দেখাতে কাছে টেনে—”
মেহের নিজের ক্ষোভের সবটুকু কথা শেষ করার আগেই রুদ্র নিজে যেচে মেহেরের অনিচ্ছা সত্ত্বেও ওর কাঁধের ওপর জ্যাকেটটা শক্ত করে জড়িয়ে দিল। মেহেরের কোনো বাধাই ও পাত্তাই দিল না। তারপর মেহেরের ভেজা, ফ্যাকাশে চোখের দিকে তাকিয়ে রুদ্র খুব শান্ত গলায় বলল, “তুমি তোমার ভুলটা অন্তত স্বীকার করো যে, তোমার ওই রুমে যাওয়াটা একদম উচিত হয়নি?”
মেহের বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর রুদ্রর চোখের দিকে তাকিয়ে ও নিজের চোখের কোণের পানিটুকু ওড়না দিয়ে মুছল। আলতো করে, খুব ধীর গতিতে মাথা নাড়ল। অর্থাৎ—ও স্বীকার করছে, রুদ্রর নিষেধ অমান্য করে সেখানে যাওয়াটা ওর সত্যিই ভুল ছিল।
রুদ্র আলতো করে একটা স্বস্তির শ্বাস ফেলে বলল, “তাহলে ভুলে যাও সব। সব ভুল খাতা আজ কেটে দাও। এবার চলো আমার সাথে।”
মেহের ছোট করে, অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে রুদ্রর চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, “আমি ঐসব মেয়েদের মতো নই … যে যেখানে আমার তিলমাত্র সম্মান নেই, সেখানে আবার মাথা নিচু করে মুখ বুজে চলে যাব।”
মেহেরের এই আত্মসম্মানী জবাবটা শুনে রুদ্রর বুকটা ধক করে উঠল। তার চোখের সামনে বসে থাকা মেয়েটার দিকে তাকিয়ে তার ভেতরটা কেমন যেন হাহাকার করে উঠল। রুদ্র বিড়বিড় করে বলল…..
“ফিরে এসো… কারণ তোমাকে থামানোর মতো শব্দ আমার জানা নেই। শুধু এতটুকু জানি, তোমাকে ছাড়া এই নীরবতাটাও কেমন যেন অসম্পূর্ণ লাগে।”
রুদ্রর এই অতি মৃদু কণ্ঠের বিড়বিড়ানি মেহেরের কান পর্যন্ত পৌঁছাল না। তবে রুদ্রর চোখের দিকে তাকিয়ে ওর নিজের ভুলের অনুতাপটা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিল মেহের। মেহের ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,
“কিছু বললেন আপনি?”
রুদ্র চট করে নিজের ভেতরের আবেগটুকু সামলে নিয়ে আবার সেই চেনা গম্ভীর কণ্ঠে বলল, “না… কিছু বলিনি। তবে তুমি যদি নিজে থেকে সোজা পথে না আসো, তবে আমাকে অন্য কিছু করতে বাধ্য কোরো না।”
মেহের দমে না গিয়ে জেদের সুরে জিজ্ঞেস করল, “অন্য কী? মানে কী আপনার?”
“মানে… এই মাঝরাস্তায়, তোমাকে আমি নিজের কোলে তুলে নিয়ে যেতে বাধ্য হব।”
রুদ্রর মুখে এই কথা শুনে মেহেরের বুকটা ধক করে উঠল। এতদিনে রুদ্রর মনমর্জি ও খুব ভালো করেই জানে। এই লোকটা যা বলে, তা করতে এক সেকেন্ডও দ্বিধা করে না। রুদ্র চাইলে আসলেই যেকোনো মুহূর্তে মেহেরকে কোলে তুলে হাঁটতে শুরু করতে পারে। চারপাশের দুনিয়ার কোনো কিছুরই তখন সে পরোয়া করবে না। কে কী বলল, কে কী ভাবল, সেসব নিয়ে তার বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা থাকবে না।
মেহের একটু ভয়ার্ত চোখে এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখল, একটু দূরে দুই-তিনজন পথচারী ছাতা মাথায় দাঁড়িয়ে কৌতূহলী চোখে তাদের এই কাণ্ডকারখানা দেখছে। মেহের লোকলজ্জার ভয়ে একদম আড়ষ্ট হয়ে উঠল, অথচ রুদ্রর সেদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপই নেই। ও হাতের ছাতাটা একপাশে সরিয়ে মেহেরকে সত্যি সত্যিই কোলে তুলে নেওয়ার জন্য দু হাত বাড়িয়ে এক পা এগিয়ে এলো।
“এই! সরুন, সরুন! বললাম না যাব!!”
রুদ্র মেহেরের দিকে তাকিয়ে বলল,
“তুমি নিশ্চিত তো?”
মেহের ধীরে মাথা নাড়ল। হ্যাঁ, সে নিশ্চিত। রুদ্রর সঙ্গে যাবে।
রুদ্র কিছুক্ষণ মেহেরের চোখের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,
“আমি কি তোমাকে জোর করেছি?”
মেহের এবারও মাথা নাড়ল। না, রুদ্র তাকে জোর করেনি।
মেহেরের উত্তর দেখে রুদ্রর ঠোঁটের কোণে হালকা একটা বাঁকা হাসি ফুটে উঠল।
মেহের ভয়ার্ত আর তীব্র লজ্জিত গলায় রুদ্রর বাড়িয়ে দেওয়া হাত দুটো সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করল। রুদ্রর লোকলজ্জার ভয় না থাকতে পারে, কিন্তু মেহেরের তো আছে! এই মাঝরাস্তায় ও কোনো তামাশা তৈরি করতে চায় না। অনন্যোপায় হয়ে ও বেঞ্চের হাতল ধরে কোনোমতে নিজের ভারী শরীরটা নিয়ে উঠে দাঁড়াতে বাধ্য হলো।
বেঞ্চ ছেড়ে মেহের যখন উঠে দাঁড়াল, তখন শীতে আর তীব্র ক্লান্তিতে ওর শরীরটা কাঁপছিল। রুদ্র আর এক মুহূর্তও দেরি করল না। মেহেরের কোনো আপত্তি, কোনো অজুহাত শোনার মুডেই ও নেই। ছাতাটা মেহেরের মাথার ওপর শক্ত করে ধরে ….ও মেহেরকে অ্যাপার্টমেণ্টের দিকে হাঁটিয়ে নিয়ে চলল।
রুদ্র মেহেরকে কিছুটা এগিয়ে নিয়ে আসার পর মেহের খেয়াল করল, এখন আর আশেপাশে কেউ নেই। নির্জন রাস্তাটার দিকে তাকিয়ে হঠাৎ সে থেমে গেল।
মেহের বলল,
“আমি যাব না আপনার সাথে।”
রুদ্র যেন এমন কিছুই আশা করেছিল। মেহেরের দিকে তাকিয়ে তার ঠোঁটের কোণে হালকা বাঁকা হাসি ফুটে উঠল। তারপর মেহেরের হিজাবের একপাশ আলতো করে ধরে বলল,
“চলো।”
মেহের অবাক চোখে তাকিয়ে রইল।রুদ্র আবারও বলল,
“বলেছি চলো।”
মেহেরের চোখ দুটো গোল গোল হয়ে গেল। রুদ্র কখন থেকে তার হিজাব ধরে রেখেছে, সেটাই সে খেয়াল করেনি।
মেহের তাড়াতাড়ি বলল,
“ছাড়ুন… অসভ্য লোক, ছাড়ুন। আমি যাব না আপনার সাথে।”
রুদ্র ভ্রু তুলে তাকাল। তারপর মৃদু স্বরে বলল,”পাল্টি কার সাথে মারতে চাচ্ছো?”বলেই রুদ্র মেহেরকে কোলে তুলে নেওয়ার জন্য এগিয়ে গেল।
মেহের সঙ্গে সঙ্গে ঘাবড়ে গিয়ে বলল,
“আচ্ছা আচ্ছা, লাগবে না তোলার। আমি যাচ্ছি, যাচ্ছি।”
রুদ্র মৃদু হাসল। মেহেরের এই জেদ আর অভিমান যেন তার কাছে অদ্ভুত মায়াময় লাগছিল।
কিছুক্ষণ পর তারা অ্যাপার্টমেন্টে এসে পৌঁছাল….. দরজা খুলে যখন ওরা ভেতরে ঢুকল, তখন বসার ঘরের আলো-আঁধারিতে মেহেরের ওপর রুদ্রর চোখ পড়ল। মেহের সোফার পাশে এসে জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়াতেই রুদ্রর নজর গেল মেহেরের পায়ের দিকে। মেহেরের ফর্সা পায়ের পাতায় কালচে কাদার দাগ, আর বুড়ো আঙুলের পাশটা কেটে ফোঁটা ফোঁটা রক্ত বের হচ্ছে। রাস্তার কোনো ধারালো কাচ বা পাথরে কেটে গেছে, ও এতক্ষণ রাগের মাথায় টের পায়নি।
রুদ্রর কপাল কুঁচকে গেল। ও মেহেরের দিকে তাকিয়ে কোনো কথা না বলে, হুট করেই নিজের পরনের শার্টের বোতামগুলো একটা একটা করে খুলতে শুরু করল।
মেহের চোখ বড় বড় করে এক পা পিছিয়ে গেল। দুই হাত বুকের ওপর আড়াআড়ি করে ধরে ও তীব্র লজ্জায় চেঁচিয়ে উঠল, “ছি ছি! আপনি… আপনি এগুলো কী করছেন?
মেহেরের এমন ভয়ার্ত চেহারা দেখে রুদ্রর ঠোঁটের কোণে সামান্য একটুখানি দুষ্টুমির হাসি ফুটে উঠল। ও একটু মজা নেওয়ার ভঙ্গিতে বলল,
“কেন? কী করছি?দেখো, দেখো… না দেখলে পরে আফসোস করবে ?”
মেহেরের মুখটা লজ্জায় আর রাগে লাল হয়ে গেল। ও ঝট করে মুখ ফিরিয়ে নিতেই রুদ্র শার্টটা গা থেকে সম্পূর্ণ খুলে সোফার ওপর ছুঁড়ে মারল। শার্টের নিচে ওর পরনে একটা কালো রঙের স্যান্ডো গেঞ্জি। ও মেহেরের দিকে তাকিয়ে বলল, “ভেতরে আরেকটা স্যান্ডো গেঞ্জি আছে, চোখ খোল। ঠান্ডা যাতে না লাগে, তাই খুলে ফেলেছি। ”
মেহের এবার শার্টটার দিকে তাকিয়ে নিজের বোকামির জন্য মনে মনে প্রচণ্ড লজ্জিত হলো। রুদ্র ততক্ষণে নিজের ঘরের দিকে পা বাড়িয়েছে। যাওয়ার আগে বলল, “নিজের ঘরে গিয়ে আগে ভেজা কাপড়গুলো বদলে এসো। এই মাঝরাতে কোনো ডাক্তার পাব না অসুস্থ হয়ে পড়লে।”
মেহের ধীর পায়ে নিজের ঘরে গেল। আলমারি থেকে একটা শুকনো সুতির সালোয়ার-কামিজ নিয়ে বাথরুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে এলো। ভেজা চুলগুলো তোয়ালে দিয়ে কোনোমতে মুছে ও যখন ড্রয়িংরুমে ফিরে এলো, তখন দেখল রুদ্রও এর মধ্যে নিজের ভেজা ট্রাউজার আর স্যান্ডো গেঞ্জি বদলে একটা আরামদায়ক ক্যাজুয়াল টি-শার্ট আর ট্রাউজার পরে নিয়েছে। ও সোফায় বসে একটা ছোট ফার্স্ট এইড বক্স হাতে নিয়ে মেহেরের জন্য অপেক্ষা করছিল।
মেহেরকে আসতে দেখে ও বক্সটা টেবিলের ওপর এগিয়ে দিয়ে বলল, “এখানে বসো। ড্রেসিং করতে হবে।”
মেহের সোফায় বসতে গিয়ে যেমনই একটু নড়েচড়ে উঠতে গেল, অমনি ওর তলপেটে আর পায়ে একসাথে একটা তীব্র টান লাগল। “আহ্!” বলে ও ব্যথায় কঁকিয়ে উঠে আবার দাঁড়িয়ে পড়তে চাইল।
রুদ্র চট করে মেহেরের দিকে দু হাত বাড়িয়ে দিল। ওর চোখ দুটো মেহেরের মুখের ওপর স্থির হলো। বেশ কিছুক্ষণ ও মেহেরের ফ্যাকাশে, ক্লান্ত মুখের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। তারপর গম্ভীর স্বরে বলল, “Hold my hand.”
মেহের বড় বড় গোল গোল চোখ করে রুদ্রর দিকে তাকাল। ও নিজেকে কিছুটা গুটিয়ে নিয়ে প্রশ্ন করল, “কেন? আপনার হাত আমি কেন ধরব?”
রুদ্রর চোয়ালটা শক্ত হলো, ও আবার বলল, “বললাম তো, ধরো।”
মেহের এবার আর জেদ দেখাল না। রুদ্রর খালি হাতটার দিকে তাকিয়ে ও ইতস্তত করে নিজের কাঁপতে থাকা হাতটা বাড়িয়ে দিল, কিন্তু সরাসরি ওর হাতের তালু না ধরে, রুদ্রর টি-শার্টের হাতাটা শক্ত করে খামচে ধরল।
রুদ্র আলতো করে মেহেরকে সোফায় বসিয়ে দিল। খুব সাবধানে ওর পায়ের কাদাগুলো পরিষ্কার করে অ্যান্টিসেপটিক লাগিয়ে ব্যান্ডেজ বেঁধে দিল। পুরোটা সময় মেহের একদম চুপ করে রুদ্রর মুখের দিকে তাকিয়ে ওর ভেতরের অপরাধবোধটা বোঝার চেষ্টা করছিল।
ড্রেসিং শেষ করে রুদ্র ফার্স্ট এইড বক্সটা বন্ধ করল। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে মেহেরের দিকে তাকিয়ে বলল, “আমার সাথে এসো।”
মেহের উঠে দাঁড়িয়ে দেখল রুদ্র ওকে করিডোরের সেই শেষ মাথার ঘরটার দিকে নিয়ে যাচ্ছে—যে ঘরটা থেকে একটু আগে ওকে ওভাবে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। ঘরের দরজার সামনে আসতেই মেহেরের পা দুটো থমকে গেল। ও তীব্র দ্বিধা আর ইতস্তত নিয়ে বলল, “আমি… আমি এই ঘরে যাব না। আপনার পারমিশন নেই।”
রুদ্র দরজাটা পুরোপুরি ঠেলে খুলে ভেতরে ঢুকল। ঘরের হলুদ আলোটা তখনো জ্বলছে। রুদ্র মেহেরের দিকে ফিরে তাকিয়ে একপ্রকার আশ্বস্ত করার ভঙ্গিতে নরম গলায় বলল, “এখন পারমিশন আছে। ভেতরে এসো, মেহের।”
মেহের ধীর পায়ে ঘরের ভেতর পা রাখল। এবার আর ওর মনে কোনো ভয় ছিল না, বরং এক অদ্ভুত কৌতূহল কাজ করছিল। রুদ্র ওকে ঘরের ছোট ছোট ডিটেইলসগুলো দেখাতে লাগল। একটা দেয়ালে হাত দিয়ে বলল, “এই পেইন্টিংটা আমি নিজে দাঁড়িয়ে থেকে করিয়েছিলাম।” তারপর কাঠের শেলফে রাখা সারিবদ্ধ ছোট ছোট পুতুল আর একটা ছোট্ট খেলনা গাড়ি তুলে দেখিয়ে বলল, “এগুলো সব ওর পছন্দের খেলনা ছিল। ও এই দোলনাটায় ঘুমাতো।”
বলতে বলতে রুদ্রর গলার স্বর কিছুটা ভারী হয়ে এলো। রুদ্র টেবিলের ওপর থেকে সেই পুরনো ফটো অ্যালবামটা আবার নিজের হাতে তুলে নিল। মেহের আর নিজের ভেতরের প্রশ্নটা চেপে রাখতে পারল না। ও অ্যালবামের দিকে আঙুল নির্দেশ করে খুব মৃদু কণ্ঠে প্রশ্ন করল,
“এই বাচ্চাটা কে, রুদ্র? ”
রুদ্র অ্যালবামের প্রথম পাতায় থাকা সেই ফুটফুটে মিষ্টি মেয়েটার ছবির ওপর আলতো করে হাত বুলাল। ওর চোখ দুটো এক নিমেষে যেন কোনো এক অতল শূন্যতায় হারিয়ে গেল। ও মেহেরের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল—
ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ৪০
“আমা….আমার মেয়ে। ও আমার মেয়ে ছিল,মিস অ্যারোফোবিয়া ।”
রুদ্রর মুখের এই একটা বাক্যে মেহেরের পুরো পৃথিবীটা যেন স্তব্ধ হয়ে গেল। ও অবিশ্বাস্য চোখে রুদ্রর দিকে চেয়ে রইল। রুদ্রর অতীতে এমন একটা অধ্যায় আছে, ও একটা সন্তানের বাবা ছিল—সেটা মেহেরের কল্পনারও বাইরে ছিল।
