Home ক্যাপ্টেন সাহেব ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ৪১

ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ৪১

ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ৪১
মারিয়াম ফুল

রুদ্র জানালার বাইরের ঝিরিঝিরি বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘ, তপ্ত শ্বাস ফেলল। তার বুকের ভেতর থেকে যেন এক যুগান্তরের জমাট বাঁধা পাথর নড়ে উঠল। ঘরের টিমটিমে আলোয় তার চোখের কোণের জল চকচক করে উঠছে। সে আবার বলতে শুরু করল,
ইউএসএ থেকে যখন আমরা সবাই একসঙ্গে দেশে ফিরলাম, তখন খুশির যেন কোনো সীমাই ছিল না। ভাবির মুখজুড়ে সেদিন এমন এক প্রশান্তি আর আনন্দের ছাপ ছিল, যা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। কিন্তু সেই আনন্দের আয়ু যে এতটা ক্ষণস্থায়ী হবে, তা কে-ই বা জানত? ওই দুর্ঘটনার পর সেদিন রাতে ভাবির অস্তিত্ব বলতে আর কিছুই অবশিষ্ট ছিল না, মেহের। জ্বলন্ত গাড়ির বিস্ফোরণের সেই বিকট শব্দটা আজও আমার কানে বাজে।

ভাইয়া আর অনাবিয়াকে নিজের হাতে কবরের অন্ধকারে শুইয়ে দিয়ে যখন বাড়ি ফিরলাম, তখন পুরো বাড়িটা যেন প্রাণহীন হয়ে পড়ে ছিল। দুই দিন আগেও যে বাড়িটায় একটা বাচ্চার হাসি-কান্নার শব্দ ভেসে আসত, আজ সেখানে আর কিছুই নেই।চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠছিল—এই তো সেদিন, দাদির পাশে বসে আমি আর ভাইয়া দু’জন মিলে দাদিকে কত জ্বালাচ্ছিলাম,ভাবিকে নিয়ে মজা করছিলাম। খাবার টেবিলে সবাই একসঙ্গে বসে আমরা খাচ্ছিলাম, হাসছিলাম, গল্প করছিলাম।অথচ আজ… আর কিছুই হবে না। কিছুই না।

চারিদিকে মানুষের ফিসফিসানি, স্বজনদের সান্ত্বনা সবকিছু আমার কানে তখন অর্থহীন কোলাহল মনে হচ্ছিল। ভাইয়া আর ভাবির মৃত্যুর পর মা যেন একেবারে ভেঙে পড়ল। এত বড় শোক যেন তাঁর শরীর আর মন কোনোটাই আর সইতে পারছিল না ।
আমি শূন্য মস্তিষ্কে, অবশ পায়ে ভাইয়ার ঘরের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। ঘরটা তখনো অন্ধকার। দরজাটা আলতো করে ধাক্কা দিতেই ভেতরে যা দেখলাম… তা দেখে আমার বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল।
পুরো ঘরটা সাজানো ছিল, মেহের। ভাবি নিজের হাতে সবকিছু গুছিয়ে রেখেছিলেন। দেওয়ালে বেলুন, টেবিলের ওপর রাখা ছোট্ট একটা চিরকুট। ভাবি চেয়েছিল, রাতে ভাইয়া বাড়ি ফিরলে নিজের প্রেগন্যান্সির খবরটা জানিয়ে সারপ্রাইজ দেবে। তাদের জীবনে আর একটা ছোট্ট প্রাণ আসতে চলেছিল….
সেদিন দুপুরে জরুরি কাজে ভাইয়া হঠাৎ বাড়িতে এসেছিল। বাড়ির সার্ভেন্টরা পরে আমাকে জানায়। ঘরে ঢুকেই সে বুঝে গিয়েছিল—সে আবারও বাবা হতে চলেছে। ভাবো তো, এই খবরটা যদি সে ভাবির মুখ থেকে শুনতে পারত, তাহলে সে কত খুশি?

আমার আনুবুড়ির খেলনার গাড়িটা মেঝেতে পড়ে ছিল। ওর ছোট্ট ছোট্ট কাপড় সোফার ওপর ছিল, আর ওর দোলনাটা ঘরের এক কোণে খালি পড়ে ছিল। কিন্তু আমার আনুবুড়িটা আর ছিল না।
যে ছোট্ট অতিথিটা আসার কথা ছিল, সে পৃথিবীর আলো দেখার আগেই মায়ের গর্ভেই হারিয়ে গিয়েছিল। এক মুহূর্তে সব শেষ হয়ে গিয়েছিল, মেহের। সবাই চলে গিয়েছিল… শুধু আমি বেঁচে ছিলাম।
সবকিছুর জন্য আমি নিজে দায়ী, আমার একরোখা, জেদি স্বভাব… আমার ভুল সিদ্ধান্ত… এগুলোই যেন আমার কাছ থেকে সবকিছু কেড়ে নিয়েছিল।আমি খুনি, মেহের… চারটা নিষ্পাপ প্রাণের খুনি ।
রুদ্র দুই হাতে নিজের মাথাটা চেপে ধরে মেঝেতে বসে পড়ল। ওর চওড়া কাঁধ দুটো যন্ত্রণায় কাঁপছিল। মেহের কোনো কথা বলতে পারল না, রুদ্রর এই আত্মদহন নিজের বুকের ভেতর অনুভব করতে পারছিল সে ।
রুদ্র আবার বলতে শুরু করলো, ভাইয়ার রুম থেকে বের হয়ে যখন মায়ের রুমের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম, দরজার পাশ থেকেই মায়ের অসহায় অবস্থাটা দেখতে পাচ্ছিলাম। মাকে ওই অবস্থায় দেখে আমার আর সাহস হচ্ছিল না ঘরের ভেতরে পা রাখতে। মনে হচ্ছিল, একবার ভেতরে ঢুকলেই হয়তো নিজেকে আর সামলাতে পারব না। মা চিৎকার করে বাবাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছিল,

‘হামজা! আমার ছেলেটাকে এনে দাও! আমার অনাবিয়াকে এনে দাও… আমার নাতনিকে এনে দাও! আমার বুকটা ফেটে যাচ্ছে, হামজা! আমি তো আল্লাহর কাছে কোনোদিন কিছু চাইনি।আর কিছু চাইবোও না, শুধু আমার ছেলে মেয়েদের ফিরিয়ে দাও।
কেন ও ওই পাহাড়ি রাস্তায় গাড়ি নিয়ে গেল? কে নিয়ে গিয়েছিল ওদের? কেন ওদের দেশে আসতে বললে? আমার সব কেড়ে নিল আল্লাহ! সেদিন গাড়িটা কে চালাচ্ছিল, হামজা? বলো হামজা, বলো।
যে আমার সন্তানদের কেড়ে নিয়েছে, আল্লাহ তারও ভালো করবে না! আমার বুক যেভাবে খালি হয়েছে, তার বুকও যেন এভাবেই খালি হয়!’

মায়ের মুখ থেকে নিজের জন্য অভিশাপ শুনে আমার পায়ের তলার মাটি সরে গিয়েছিল । মা তখনো জানতো না যে সেদিন স্টিয়ারিংয়ে আমি ছিলাম। মায়ের ধারণা ছিল হয়তো, কোনো ড্রাইভারে গাড়ি চালাচ্ছিল। মা বাবার শার্টের কলার চেপে ধরে বারবার পাগলের মতো ঝাঁকাচ্ছিলেন আর বলছিলেন,
‘বলো হামজা, কে গাড়ি চালাচ্ছিল? কে আমার সন্তানদের মারল? নাম বলো তার ‘
মায়ের আহাজারি আর বুক কাঁপানো অভিশাপ শুনে আমি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারছিলাম না। আমার মনে হচ্ছিল, সত্যিটা লুকিয়ে আমি আর এক সেকেন্ডও বেঁচে থাকতে পারব না। আমি মাকে গিয়ে সব সত্যি বলে দেব। আমিই ড্রাইভিং সিটে ছিলাম, আমার জেদই ওদের কেড়ে নিয়েছে!
আমি যখন দেয়াল ধরে ধরে কাঁপা পায়ে মায়ের রুমের দিকে এগোচ্ছিলাম, বাবা আমাকে দেখতে পেয়ে মায়ের হাত ছেড়ে তাড়াহুড়ো করে উঠে দাঁড়াল… আমি দরজার কাছে পৌঁছাতেই বাবা দ্রুত এগিয়ে আমার কাছে এলো । আমার হাতটা শক্ত করে আঁকড়ে ধরে চাপা গলায় বলে উঠলো ,
‘রুদ্র! তোমার সাথে আমার জরুরি কথা আছে। হাসপাতালের কিছু ফর্মালিটিজ এখনো বাকি। আমার সাথে এসো।’বাবা আমাকে এক প্রকার জোর করে আমাকে আমার রুমে টেনে নিয়ে এসেছিল । সেখানে আসতেই আমি বাবাকে ধরে কেঁদে উঠলাম,

‘বাবা… আমি মাকে সব সত্যি বলে দেব। ওদিনের দুর্ঘটনায় ড্রাইভিং সিটে আমি ছিলাম। আমার জেদের জন্য সব হয়েছে। এই কষ্ট আর সহ্য করতে পারছি না বাবা…
বাবা আমাকে আরও শক্ত করে নিজের বুকে টেনে নিলেন। মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে কাঁপা গলায় বললেন,
‘না রুদ্র! পাগলামি করো না! তুমি কি চাও তোমার মা সারাজীবন তোমাকে ঘৃণা করুক? সারাজীবন নিজের চোখের সামনে নিজের ছোট ছেলেকে খুনি হিসেবে দেখুক?’
আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম। বুকের ভেতরটা যেন কেউ মুঠো করে চেপে ধরল। এই অপরাধবোধ বুকে নিয়ে আমি সারাজীবন কীভাবে বাঁচব বাবা?

‘রুদ্র, ইটস অ্যান অ্যাক্সিডেন্ট! ওটা একটা দুর্ঘটনা ছিল! এতে তোমার কোনো হাত ছিল না….’
‘ছিল বাবা, ছিল! আমিই জোর করে ওদের ওই পাহাড়ি রাস্তায় নিয়ে গিয়েছিলাম। ভাইয়া-ভাবি তো যেতে চায়নি, অনাবিয়ার কান্নার দোহাই দিয়ে ওরা বাড়ি ফিরতে চেয়েছিল! আমি কেন জেদ করলাম বাবা? আমাকে মায়ের কাছে অপরাধ স্বীকার করতে দাও…’
বাবা আর কোনো কথা শুনলেন না। তাঁর সমস্ত কঠোরতা মুহূর্তেই ভেঙে পড়ল। আমাকে শক্ত করে নিজের বুকের সঙ্গে জড়িয়ে ধরলেন। তাঁর প্রশস্ত বুকটা তখন অবাধ্য কান্নায় কাঁপছিল। আমার কানের কাছে মুখ এনে ভাঙা গলায় ফিসফিস করে বললেন,

তোমার দুঃখ আমার চেয়ে বেশি না, রুদ্র। তুমি তোমার ভাইকে হারিয়েছ, আর আমি… আমি এই দুই হাতে আমার ছেলেকে বড় করে, সেই দুই হাতেই তাকে শেষবারের মতো কবরে শুইয়ে দিয়ে এসেছি। একজন বাবার জন্য এর চেয়ে বড় অসহায়ত্ব, এর চেয়ে বড় শাস্তি আর কী হতে পারে বলো ?
আমি আমার এক সন্তানকে হারিয়েছি। সেই শূন্যতা আজও আমাকে তাড়া করে বেড়ায়। আমি আর সেই শূন্যতা বাড়াতে চাই না রুদ্র। আমি আর আমার কোনো সন্তানকে হারাতে চাই না।
‘বাবা…’ আমার গলা দিয়ে শুধু এই একটা শব্দই অবরুদ্ধ হয়ে বের হলো।
‘হলাম না হয় তোমার মায়ের কাছে আমি অপরাধী। সত্যিটা না বলে হয়তো সারাজীবন সেই পাপের বোঝা বয়ে বেড়াতে হবে আমাকে। তবু আমার এই কোলটা খালি করে দিও না, রুদ্র।
তোমার মা যদি জানতে পারে সেদিন গাড়িটা তুমি চালাচ্ছিলে, ও এটা কোনোদিন মেনে নিতে পারবে না। হয়তো সারাজীবনের জন্য তোমার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে। আমি সেটা দেখতে পারব না, বাবা।
আমি এক সন্তানকে হারিয়েছি। আর আরেকটা সন্তানকে হারানোর সাহস আমার নেই। তাই বলছি, তুমি এখনই ইউএসএ চলে যাও। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সব ঠিক হয়ে যাবে। একদিন না একদিন সত্যিটাও হয়তো সহ্য করার শক্তি সবার হবে… কিন্তু এখন না।

‘বাবা…’
‘সময় সব শান্ত করে দেবে। তোমার মা-ও একসময় নিজেকে মানিয়ে নেবে। এমন কিছু করো না যাতে আমরা তোমাকে চিরতরে হারিয়ে ফেলি। কথা দাও আমাকে !’
বাবার সেই চোখের জল আর আকুতি আমি উপেক্ষা করতে পারিনি, মিস অ্যারোফোবিয়া। আমি সেদিন বাবাকে কথা দিয়েছিলাম। তারপর এক প্রকার জীবন্ত লাশে হয়ে আবার ইউএসএ-তে ফিরে গেলাম। বাবা বলেছিলেন সময় নাকি সব ঠিক করে দেবে… অথচ দেখো, দীর্ঘ আট বছর পার হয়ে গেছে, আজো কোনো কিছু ঠিক হয়নি, আজো রাতে চোখ বন্ধ করলে আমি আমার ভাইয়ের রক্তাক্ত নিথর দেহটা দেখি, আমার মেয়ের সেই নিস্প্রাণ হাসিমুখটা দেখি। ওরা আমার স্বপ্নে এসে আমায় ডেকে বলে—কেন বাঁচলে তুমি, পাপা?”
রুদ্র একটা দীর্ঘ শ্বাস ফেলল,
“বাবা চায় আমি তোমার সাথে সংসার করি, আমার একটা নতুন পরিবার হোক। কিন্তু তুমিই বলো, মেহের… অন্যের সাজানো সংসারকে ধ্বংস করে দিয়ে নিজের সুখের ঘর বানানো যায়? আমার এখন ভীষণ ভয় করে, মিস অ্যারোফোবিয়া… যদি আবার আমার খুব আপন কেউ আমাকে এভাবে মাঝরাস্তায় একা ফেলে চলে যায়? সেই কষ্ট সহ্য করার মতো এক বিন্দু শক্তিও রাইহাম চৌধুরী রুদ্রর বুকে আর অবশিষ্ট নেই। তাই… তাই আজ পর্যন্ত কাউকেই আর নিজের খুব কাছে আসতে দিইনি।”

রুদ্রর পুরো অতীতটা শুনে মেহেরের ভেতরের সমস্ত অনুভূতি যেন দুমড়ে-মুচড়ে গেল। ওর চোখ দিয়ে অবাধ্য ধারায় অশ্রু ঝরছিল। ও নিজের দুই হাতে মুখ চেপে ধরে হেঁচকি তুলে কাঁদতে লাগল। রুদ্র মেহেরের দিকে তাকিয়ে এক ম্লান হাসল,
“উনিশ বছর বয়সে আশি বছরের এক নিঃস্ব বৃদ্ধের মতো বেঁচে থাকাটা যে কতটা নরকযন্ত্রণা, তা কেউ বুঝবে না, মেহের। নিজেকে ব্যস্ত রাখার জন্য, কত কী-ই না করলাম… মদ, জুয়া, রেসিং—সবকিছুতে নিজেকে ডুবিয়ে রাখলাম। তুমি হয়তো ভাবো, এই রাইহাম চৌধুরী রুদ্র সব কাজে এত নিখুঁত কেন? কীভাবে সব এত পারফেক্টলি সামলায়? আসলে কপালের কাছে হেরে গিয়ে আমি পৃথিবীর বাকি সব কিছুকে নিজের মুঠোয় করতে চেয়েছিলাম। মনের ভেতর সবসময় একটা তীব্র আতঙ্ক কাজ করত,যদি কেউ কোনোদিন জেনে ফেলে? যদি কেউ আঙুল তুলে বলে—
রাইহাম চৌধুরী রুদ্র নিজের ভাইকে খুনি ?”

তাই নিজেকে এতটাই নিখুঁত, এতটাই কঠোর বানানোর নেশায় মেতে উঠলাম, যাতে কেউ আমার দিকে তাকিয়ে আমার ভেতরের ভাঙাচোরা মানুষটাকে দেখতে না পায়। কেউ কোনোদিন আমাকে কোনো প্রশ্ন করতে না পারে… যে আমার ভুলের কারণে আমার ভাই মারা গেছে।
মেহের জোরে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের চোখের জল মুছে নিল। তার কান্না এখন কিছুটা শান্ত হয়েছে, কিন্তু মনের ভেতরের ঝড়টা যেন আরও তীব্র হয়ে উঠেছে।
“আপনি আর আমি আসলে একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ, ক্যাপ্টেন সাহেব। আমি আপনার মতোই আমার জীবনের সবচেয়ে প্রিয় মানুষকে হারিয়েছি…
অন্তু…
অন্তু ছিল আমার বাঁচবার একমাত্র কারণ,তাকে ভালোবাসার কারণেই আমার চোখের সামনে তার মৃত্যু হয়েছিল। আমার আপন ভাই আমার ভালোবাসার মানুষটাকে কেড়ে নিয়েছিল, আর আমি সেদিন আপনার মতো কিছু করতে পারিনি। অসহায় হয়ে শুধু দেখেছিলাম… একে একে আমার ভাই আমার অন্তু’র পিঠে ছুরি চালাচ্ছিল।
কিন্তু আমাদের দুজনের মধ্যে পার্থক্যটা জানেন?

“আপনি সবকিছু হারিয়ে নিজের ভেতরের বিশ্বাসটাকেও হারিয়ে ফেলেছেন, ক্যাপ্টেন সাহেব… এমনকি আল্লাহর ওপর ভরসাটাও হারিয়ে গেছে আপনার। আর আমি? আমি আমার জীবনের সবচেয়ে প্রিয় মানুষটাকে হারিয়েও একমাত্র আল্লাহকেই পেয়েছি। সব হারানোর পর বুঝেছি, একমাত্র তিনিই আছেন, যিনি কখনো ছেড়ে যান না। দুনিয়াতে কেউ কারো জন্য আসে না, সবাই নিজের জন্যই আসে। দুনিয়া সুখের জন্য বানানো হয়নি… আল্লাহ যাদের সবচেয়ে বেশি ভালোবাসেন, তাদের পরীক্ষাও তত বেশি নেন।
জীবনে যদি কখনো আবার এমন কোনো কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হন, ক্যাপ্টেন সাহেব… তখন অন্তত একবার নিজের মনের দরজায় কড়া নেড়ে দেখবেন। নিজের অহংকার আর কষ্টটুকু সরিয়ে একবার সেই মহান আল্লাহর কাছে মন থেকে চাইবেন। দেখবেন, শূন্য হাতও কখনো কখনো পূর্ণ হয়ে যায়। কারণ তাঁর দরবার থেকে কেউ কখনো খালি হাতে ফিরে আসে না।
আপনার ভাই আর ভাবী এই পৃথিবীতে যতটুকু সময়ের জন্য এসেছিলেন, ততটুকু সময়ই আল্লাহ তাঁদের জন্য নির্ধারণ করেছিলেন। তাঁদের চলে যাওয়ার পেছনে আপনি শুধু একটি মাধ্যম ছিলেন, কোনো অপরাধী নন। যার চলে যাওয়া আল্লাহর হুকুমে লেখা ছিল, তার জন্য নিজেকে খুনি ভেবে আর কতদিন নিজের জীবনটাকে শাস্তি দেবেন, ক্যাপ্টেন সাহেব?
মেহের একটু থামল।

“আমি কষ্টের সাথে কষ্টের তুলনা করব না। কারণ যার হারায়, সেই বোঝে সেই শূন্যতা কতখানি ভারী। তবে আমি আপনার জন্য দোয়া করব।যে অপরাধবোধ আর যন্ত্রণা আপনাকে প্রতিটা রাত পুড়িয়ে দিচ্ছে, আল্লাহ যেন তা দূর করে দেন। আপনি দয়া করে আল্লাহর পথে ফিরে আসুন। তাঁর কাছে নিজেকে সঁপে দিন। তিনি যেন আপনাকে সঠিক পথ দেখান, হেদায়েত দান করেন।এই মহাবিশ্বে যা কিছু ঘটে, তার সবকিছুর পেছনে ওনার কোনো না কোনো পরিকল্পনা থাকে। আমরা মানুষরা বড় দুর্বল, .. সব সহ্য করার শক্তি আমাদের দেওয়া হয়নি, কিন্তু ওনার কাছে চাইলে উনি মনের ভেতরের জ্বলন্ত চিতাটাও শান্ত করে দিতে পারেন।”
মেহেরের মুখে আবার হেদায়েতের কথা শুনে রুদ্রর ভ্রু কুঁচকে গেল। কথাগুলো তার মনে বিরক্তির জন্ম দিল। হেদায়েত, আল্লাহর পথে ফিরে আসা এসব কথা শুনতে এখন তার একদমই ভালো লাগছিল না।
তবে মেহেরকে কিছু বলার মতো ইচ্ছা বা মানসিকতা কোনোটাই ছিল না রুদ্রর। তাই চুপচাপ বসে রইল, মাথা নিচু করে। অনিচ্ছা সত্ত্বেও এতক্ষণ ধরে মেহেরের কথাগুলো শুনে গেল।
হঠাৎ মেহেরের মনে হলো, অনেকক্ষণ ধরে মেঝেতে হাঁটু গেড়ে বসে থাকার কারণে ওর পা দুটো একদম অবশ হয়ে গেছে, ও নড়াচড়া করতে পারছে না। সোজা হয়ে দাঁড়াতে গিয়েও ব্যথায় ওর মুখটা কুঁচকে গেল।
মেহের রুদ্রর দিকে তাকিয়ে নিচু গলায় বলল,

“আমায় একটু তুলুন না… পা দুটো একদম অবশ হয়ে গেছে, একা উঠতে পারছি না।”
রুদ্র যেন আবার নিজের পুরোনো রূপে ফিরে এলো। মুখে সেই আগের রুক্ষতা, কথায় সেই ব্যঙ্গ।
“হাতির মতো কাউকে তো তুলতে পারব না…”
মেহের তো শুধু চেয়েছিল রুদ্র নিজের গুমোট ভাব থেকে বের হয়ে আসুক। কিন্তু উল্টো রুদ্র তাকেই “হাতি” বলে বসলো! রুদ্রের কথাটা কানে যেতেই মেহেরের মুখটা মুহূর্তেই মলিন হয়ে গেল। অভিমানে ঠোঁট ফুলিয়ে ফেলল সে। কিছুক্ষণ চুপচাপ রুদ্রের দিকে তাকিয়ে রইল, কিন্তু রুদ্রের মুখে তখনও সেই নির্লিপ্ত ভাব।তারপর মেহের নিজের মুখ বাঁকিয়ে নিজেই উঠে দাঁড়াল।
“আমি হাতি হলে আপনি… আপনি কী তাহলে?”
“আমি হাতির মুখ বলি, হাজব্যান্ড।”মেহের রুদ্রের কথা শুনে রাগ করার চেষ্টা করল, কিন্তু ব্যর্থ হলো। রুদ্রের দিকে তাকিয়ে হু হু করে হেসে উঠল সে। মেহেরের হাসি দেখে রুদ্রের মুখেও অজান্তেই হাসি ফুটে উঠল।
হঠাৎ করেই মেহের নিজের হাতটা রুদ্রের দিকে বাড়িয়ে দিল। ঠোঁটের কোণে এক চিলতে দ্বিধা মেশানো হাসি ফুটিয়ে বলল,

“ফ্রেন্ড?”
রুদ্র মেহেরের বাড়িয়ে দেওয়া হাতটার দিকে তাকিয়ে হালকা ভ্রু তুলল। মেহের তাকে নিজে থেকে হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে, তাও আবার বন্ধুত্বের জন্য? রুদ্রের ঠোঁটের কোণে একটা রহস্যময় বাঁকা হাসি ফুটে উঠল। সে একটু রসিকতার সুরে বলল,
“ফ্রেন্ড… হুম… সামথিং সামথিং…”
মেহের আলতো করে হেসে মাথা নাড়ল। রুদ্রের ইঙ্গিত বুঝতে পেরে ওর গাল দুটো ক্ষণিকের জন্য একটু লাল হয়ে উঠল। “নাথিং… নাথিং।”
রুদ্র এবার মেহেরের চোখের দিকে সরাসরি তাকাল। চোখের কোণে দুষ্টুমির ঝিলিক ফুটিয়ে মুচকি হেসে বলল,
“আমার প্রেমে পড়েছ নাকি , অ্যারোফোবিয়া?”
“অসভ্য লোক! আমি কেন আপনার প্রেমে পড়ব? বয়েই গেছে!”
“তাহলে ভালো।” রুদ্র বেশ ক্যাজুয়াল ভঙ্গিতে বলল।
মেহের ভ্রু কুঁচকে তাকাল, “ভালো মানে?”
“না, মানে আমি ভাবছিলাম… এতক্ষণ ধরে একমনে আমার দিকেই কেন তাকিয়ে ছিলে!”
মেহেরের চুরি ধরা পড়ে যাওয়ার মতো অবস্থা হলো। ও চোখ এড়িয়ে তড়িঘড়ি বলল, “আমি… আমি মোটেও আপনার দিকে তাকাইনি।”

“ও? তাই নাকি? তাহলে আমি ভুল দেখেছি?”
“হ্যাঁ, ভুলই দেখেছেন। আপনার চোখের ডাক্তার দেখানো উচিত।”
রুদ্র মেহেরের এমন ছেলেমানুষি ডিফেন্স দেখে মনে মনে হাসল। এবার সে নিজেই নিজের চওড়া, হাতটা মেহেরের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে ফিসফিস করে বলে উঠল
“জানো, আমার সঙ্গে হাত মেলানোটা কিন্তু একটু রিস্কি।”
মেহের চোখ কপালে তুলে জিজ্ঞেস করল, “কেন?”
“একবার আমার সাথে ফ্রেন্ডশিপ করলে মানুষ সহজে ছাড়তে চায় না। মায়ায় পড়ে যায়।”
মেহের এবার নিজের চোখ দুটো ছোট ছোট করে রুদ্রের দিকে তাকিয়ে বলল “নিজেকে এত স্পেশাল ভাবেন কেন বলুন তো?”
“আমি ভাবি না। আমার অতীত অভিজ্ঞতা বলে।”

মেহের রুদ্রের বাড়িয়ে দেওয়া হাতে নিজের হাতটা ছোঁয়ালো। কিন্তু পরক্ষণেই এক ঝটকায় হাতটা আলতো করে ঝাঁকিয়ে ছেড়ে দিল। নাক কুঁচকে বলল, “দুঃখিত, ক্যাপ্টেন সাহেব। আপনার ওই অভিজ্ঞতার দীর্ঘ তালিকায় আমি অন্তত যোগ হচ্ছি না। আর তা ছাড়া, আমি কিন্তু আপনার ওপর ভীষণ রাগ করেছি।”
রুদ্র বেশ উপভোগ করছিল মেহেরের এই ছোট ছোট মান-অভিমানের পালা। সে জানে, মেহেরের এই রাগ, এই অভিমান সবই আসলে তাকে একটু হাসানোর জন্য, তার মনটা ভালো করার জন্য। রুদ্র আবার বসা থেকে উঠে দাঁড়াল। চোখ ছোট ছোট করে মেহেরের দিকে তাকিয়ে বলল,
“তাই নাকি, ম্যাডাম? তাহলে কি রাগটাও আমাকেই ভাঙাতে হবে?”
মেহের একটু গুমর নিয়ে তাকাল। রুদ্র জিজ্ঞেস করল, “আচ্ছা, বলো কী করলে তোমার এই রাগ ভাঙবে?”
মেহের এক মুহূর্তও সময় নষ্ট করল না। যেন এই সুযোগেরই অপেক্ষায় ছিল ও। চোখ দুটো হঠাৎ আনন্দে চকচক করে উঠল তার। আর এক মুহূর্ত দেরি না করে চট করে বলে উঠল,

“আইসক্রিম খাব।”
রুদ্রের মুখের হাসিটা চট করে মিলিয়ে গেল। সে অবিশ্বাস্য চোখে প্রথমে মেহেরের দিকে, তারপর জানালার বাইরে তাকাল। কাঁচের ওপারে তখন ঝমঝম করে তুমুল বৃষ্টি পড়ছে। রাতের ঠাণ্ডা হাওয়া চারপাশ কাঁপিয়ে দিচ্ছে। রুদ্র দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকাল, ঘড়ির কাঁটা তখন রাত একটা ছুঁয়েছে।
“এই ঠান্ডায়? বাইরে বৃষ্টি… তার ওপর রাত একটা!”
মেহের নির্বিকার ভঙ্গিতে কাঁধ ঝাঁকাল।”আমি কিছু জানি না। আইসক্রিম খাব মানে খাবই।” মেহের নাছোড়বান্দা, সে আইসক্রিম খাবেই। আর কিছু শুনতে বা মানতে সে একদম প্রস্তুত নয়।
রুদ্র হেসে মাথা নাড়ল। “ওকে, মিসেস অ্যারোফোবিয়া…”সে নিজের ডান হাতটা মেহেরের দিকে বাড়িয়ে দিল।

ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ৪০ (৩)

“Hold my hand.”
“কেন?”
রুদ্র একচিলতে হাসল।”কারণ তোমার হাত ধরে হাঁটার একটা অজুহাত পেয়েছি। অজুহাতটা নষ্ট করতে চাই না।”

ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ৪২