Home রুহআবিষ্ট তুমি রুহআবিষ্ট তুমি পর্ব ১২

রুহআবিষ্ট তুমি পর্ব ১২

রুহআবিষ্ট তুমি পর্ব ১২
অধরা মিনহা

রাত তখন আটটা ছুঁইছুঁই। অফিস থেকে সবে বাসায় ফিরেছে ইফরাদ। সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে সে নিজের রুমে না গিয়ে সরাসরি গিয়ে দাঁড়ায় ইরাইনার রুমের দরজার সামনে। অফিসে আজ তার পাপার কাছ থেকে শুনেছে, ইরাইনা গতকাল অফিসে যায়নি। আর আজ তো সে নিজেই দেখেছে, ইরাইনা অফিসে আসেনি। বিষয়টা তাকে ভীষণ ভাবাচ্ছে। কারণ ইরাইনা এমন মেয়ে না। সে অসম্ভব কর্মঠ। সবকিছুর আগে কাজকে গুরুত্ব দেয়। কাজের চেয়ে বেশি মূল্য সে কখনো অন্য কিছুকে দেয়নি। চৌধুরী গ্রুপের জন্য সবচেয়ে বেশি পরিশ্রম করেছে ইরাইনাই। অসুস্থ শরীর নিয়েও অফিসে গিয়ে কাজ করেছে।

কিন্তু সেই মেয়েটাই টানা দুই দিন অফিসে যায়নি। শুধু তাই না, গত তিন দিন ধরে নিজের রুম থেকেও বের হয়নি। এটাও ইখতিয়ার চৌধুরীর কাছ থেকেই জেনেছে ইফরাদ।
তাই আজ অফিস থেকে ফিরেই সে এসেছে ইরাইনার কাছে। তার মনে হচ্ছে, ইরাইনার নিশ্চয়ই কিছু একটা হয়েছে। নয়তো সে কখনো এমন করতো না। নিজেকে এভাবে ঘরে বন্দী রাখার মানুষ ইরাইনা না। ইরাইনা সবসময়ই খুব শক্ত মনের মেয়ে। সাধারণত যেখানে ব্রেকআপের পর মেয়েরা ভেঙে পড়ে, কান্নাকাটি করে, ডিপ্রেশনে চলে যায়, সেখানে পর্যন্ত ইরাইনা একফোঁটা কান্নাও করেনি। এতটাই শক্ত ছিল সে। সেই মেয়েটার হঠাৎ কী হলো, যে নিজেকে তিন দিনের জন্য রুমে বন্ধ করে রেখেছে?
ইফরাদ দরজায় নক দেয়। একবার, দুইবার তারপর আরও কয়েকবার। কিন্তু ভেতর থেকে কোনো সাড়া আসে না। যেন দরজার ওপাশে থাকা মানুষটার কানে শব্দগুলো পৌঁছাচ্ছেই না। ইফরাদ এবার একটু ঝুঁকে নরম গলায় ডাকে,

— রাইনা? আমি….তোমার ব্রো। দরজাটা খোলো।
তবুও নীরবতা। কোনো শব্দ নেই, আসে না উত্তর। ইফরাদ আবার দরজায় নক করে। এবার আগের চেয়ে একটু জোরেই।
— রাইনা , আই নো ইউ আর লিসেনিং টু মি। প্লিজ, ওপেন দ্য ডোর।
কিছু সময় অতিবাহিত হওয়ার পর ভেতর থেকে ভেসে আসে ইরাইনার কাতর কণ্ঠ,
— আমি একা থাকতে চাই।
ইরাইনার কণ্ঠ শুনে ইফরাদ খানিকটা স্বস্তি পায়। সে শান্ত স্বরে তাড়াতাড়ি বলে ওঠে,
— থেকো তুমি একা….বাট গিভ মি ফাইভ মিনিট।
এরপর আর কোনো উত্তর আসে না। ইফরাদ অপেক্ষা করতে থাকে ইরাইনার দরজা খোলার। কিছুক্ষণ পর দরজা খুলে যায়। দরজা খোলার শব্দে নিচের দিকে তাকিয়ে থাকা ইফরাদ মাথা তুলে তাকায়। সামনে দাঁড়িয়ে আছে ইরাইনা। তাকে দেখে ইফরাদের বুকটা মোচড় দিয়ে ওঠে। ইরাইনার চোখের নিচে কালচে দাগ পড়ে গেছে। মুখটা ক্লান্ত আর নিস্তেজ। ঠোঁট শুকিয়ে আছে। ত্বকের উজ্জ্বলতা হারিয়ে গেছে। চুলগুলো এলোমেলো, যেন অনেকদিন ঠিকমতো নিজের যত্ন নেয়নি। শরীরটাও ভীষণ দুর্বল লাগছে। এই মেয়েটা তাদের দুই ভাইয়ের প্রাণ। কত আদরের একমাত্র বোন! অথচ হঠাৎ তার এমন অবস্থা!
ইফরাদ দ্রুত এগিয়ে গিয়ে ইরাইনার গালে হাত রাখে।বিচলিত কণ্ঠে বলে,

— কী হয়েছে রাইনা? তোমার এমন অবস্থা কেন?
ইরাইনা ফ্যাকাশে মুখে দুইদিকে মাথা নাড়ে।
— কিছু হয়নি।
ইফরাদ সঙ্গে সঙ্গে তীক্ষ্ণ স্বরে বলে ওঠে,
— কিছু হয়নি মানে? কিছু না হলে তোমার এই অবস্থা কেন? আর তিন দিন ধরে নিজেকে রুমে বন্দী করে রেখেছো কেন? প্লিজ, ব্রোকে বলো।
ইরাইনা ফাঁকা দৃষ্টিতে ইফরাদের দিকে তাকিয়ে ভাঙা গলায় বলে,
— আমি পাগল হয়ে যাবো… আমি চিন্তায় পাগল হয়ে যাবো। আমি বোধহয় মরেই যাবো।
বোনের এমন রুদ্ধ কণ্ঠ শুনে ইফরাদের আত্মা কেঁপে ওঠে। সে তাড়াতাড়ি করে ইরাইনার মাথাটা নিজের বুকে চেপে ধরে দৃঢ় অথচ কোমল বলে,
— তোমার কিছু হবে না। আমি কিছু হতে দিবো না, ব্রো। তুমি আমাকে বলো, কী হয়েছে? কী নিয়ে এত ডিপ্রেসড তুমি?
ইরাইনা ইফরাদের বুকে মাথা রেখেই চাপা স্বরে বলে ওঠে,

— তুমি বুঝবে না।
ইফরাদ ইরাইনার চুলে হাত বুলিয়ে আরও নরম গলায় বলে,
— আমি বুঝার চেষ্টা করবো। আমার বোনের কষ্ট আমি সহ্য করতে পারবো না। বলো আমাকে?
ইরাইনা নীরব হয়ে থাকে। ইফরাদ অপেক্ষায় তাকিয়ে থাকে, কোনো উত্তর পাওয়ার আশায়। হঠাৎ ইরাইনা ইফরাদের বুক থেকে মাথা তুলে তাকিয়ে বলে,
— তুমি একটু আনতারাকে পাঠাবে? আমি একটু ওর সাথে কথা বলবো।
ইফরাদ অবাক হয়, তার ভ্রু জোড়া হালকা বাঁকা হয়ে যায়।
তার মুখ থেকে আপনা-আপনি বেরিয়ে আসে,
— হোয়াট?
তারপর থেমে আবার জিজ্ঞেস করে,
— আনতারাকে কেন? ও কী করবে?
ইরাইনা এবার আরও ব্যাকুল হয়ে উঠে। কণ্ঠটা প্রায় মিনতির মতো শোনায়,
— তুমি একটু আনতারাকে পাঠাও না, প্লিজ?
ইফরাদ কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল ইরাইনার দিকে। ইরাইনার চোখজোড়ায় স্পষ্ট ভেসে উঠেছে ব্যাকুলতা আর গভীর এক আকুতি। ইফরাদ হালকা দীর্ঘশ্বাস ফেলে রাজি হয়,

— ওকে। কিন্তু তুমি আগে শান্ত হয়ে বসো।
ইরাইনা আর কিছু বলে না। ইফরাদ ইরাইনাকে ধরে এনে বেডে বসায়। তারপর গ্লাসে পানি এনে ইরাইনার হাতে দেয়। ইরাইনা ধীরে ধীরে পানিটা খায়। এরপর গ্লাসটা ইফরাদকে দিয়ে বলে,
— আনতারাকে পাঠাও। আমি আনতারার সাথে কথা বলবো।
— আচ্ছা, পাঠাচ্ছি আনতারাকে।
ইরাইনার রুম থেকে বেরিয়ে আসে ইফরাদ। দরজা ঠেলে নিজের রুমে ঢুকতেই দেখে, আনতারা নামাজ পড়ছে। এশারের নামাজ। দুই রাকাআত সুন্নত নামাজের শেষ বৈঠকে বসে তাশাহহুদ, দরুদ আর দোয়া পড়ছিলো আনতারা। ইফরাদ গিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে নামাজরত আনতারার পাশেই। বাইরে থেকে ইফরাদকে স্বাভাবিক দেখালেও ভেতরে ভেতরে ভীষণ অস্থির। বোনকে ওই অবস্থায় দেখার পর থেকে তার মন একটুও শান্ত হচ্ছে না।
আনতারা দোয়া শেষ করে সালাম ফিরিয়ে ইফরাদের দিকে তাকায়।
ইফরাদ জোরে একটা শ্বাস ফেলে নিজের অস্থিরতা কিছুটা সামলে নেয়। তারপর শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করে,

— ইফতার দিয়ে গেছিলো? করেছো ইফতার?
আনতারা মাথা নেড়ে বলে,
— জি, করেছি। আপনি বলে গিয়েছিলেন ইফতার রুমে দিয়ে যাওয়ার কথা?
— হুম। নামাজ শেষ?
— না, তিন রাকাআত বিতর নামাজ বাকি।
— আচ্ছা, একটু নামাজটা পড়ে শেষ করো।
আনতারা শান্ত স্বরে বলে,
— নামাজ আমি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য পড়ছি। নামাজে ধীরস্থিরতা আর খুশু থাকা খুব গুরুত্বপূর্ণ। তাড়াহুড়ো করে নামাজ হয় না।
ইফরাদ তাড়াহুড়ো করে বলে,
— একটু কাজ আছে।
আনতারা এবারও আগের মতোই শান্তভাবে উত্তর দেয়,

— কাজের চেয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টি বেশি জরুরি, ইফরাদ। আপনি বসুন, আমি নামাজটা পড়ে তারপর আপনার কথা শুনছি।
কথা শেষ করেই আনতারা আবার দাঁড়িয়ে নিয়ত করে নামাজ শুরু করে। ইফরাদ দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে থাকে।
আনতারা স্বাভাবিকভাবেই ধীরে, শান্তভাবে এবং মনোযোগ দিয়ে নামাজ পড়ছে। কিন্তু এই মুহূর্তে ইফরাদের ভেতরের অস্থিরতা ইফরাদকে নাড়িয়ে দিচ্ছে। ধৈর্য ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। আনতারা যখন তাশাহহুদে বসে, তখন ইফরাদ ভাবে, এবার হয়তো নামাজ শেষ হবে। এখন সালাম ফিরাবে। কিন্তু না। আনতারা সালাম না ফিরিয়ে আবার দাঁড়িয়ে যায় এবং দোয়া পড়তে থাকে।
এবার আর ইফরাদের আর দাঁড়িয়ে থাকা ধৈর্য রয় না। তার বিরক্ত লাগে। মনে হয়, আনতারা এত ধীরে ধীরে নামাজ পড়ছে যেন নামাজের কোনো শেষ নেই। সে তো দেখছেই যে ইফরাদ অপেক্ষা করছে। একটু দ্রুত নামাজ পড়ে নিলেই বা কী হতো? শেষমেশ ইফরাদ গিয়ে বেডের পায়ের দিকের অটোমান বেঞ্চে বসে পড়ে। সামনের দিকে ঝুঁকে বসে আঙুলগুলো ইন্টারলক করে রাখে। তার মুখে স্পষ্ট দুশ্চিন্তা আর বিরক্তির ছাপ। কিছুক্ষণ পর আনতারা নামাজ শেষ করে সালাম ফিরায়। তারপর ইফরাদের দিকে তাকিয়ে শান্তভাবে বলে,

— এখন বলুন, কী বলতে চাচ্ছিলেন?
ইফরাদ তাকায় আনতারার দিকে। চোয়াল শক্ত করে বলে,
— নামাজটা একটু তাড়াতাড়ি পড়ে নিলে কী হতো? একবেলা একটু দ্রুত নামাজ পড়লে তো কোনো ক্ষতি হতো না।
আনতারা এবার গম্ভীর স্বরে বলে,
— নামাজটাকে এত সাধারণভাবে নিচ্ছেন কেন? নামাজ কি সাধারণ কিছু? আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করার বিষয়টা কি সাধারণ?
একটু থেমে আবার বলে,
— তাছাড়া এমন অনেক মানুষ আছে, যারা কোনোমতে তাড়াহুড়ো করে নামাজ পড়ে। আল্লাহ তাদের নামাজ তাদের মুখেই ছুড়ে মারেন। বলেন, লাগবে না আমার তোমার নামাজ। নাউজুবিল্লাহ। তাই সবসময় ধীরস্থির হয়ে নামাজ পড়তে হয়।
ইফরাদ আর কথা বাড়ায় না। এমনিতেই বোনকে ওই অবস্থায় দেখার পর থেকে তার ভেতরের অস্থিরতা থামছে না। ইফরাদ চিন্তিত গলায় বলে,
— আচ্ছা, তুমি একটু রাইনার কাছে যাও তো। দেখো ওর কী হয়েছে।
আনতারা একটু অবাক হয়। জিজ্ঞেস করে,

— কিছু হয়েছে ইরাইনা আপুর?
— কী জানি! কিছুই বুঝতে পারছি না। তিন দিন ধরে নিজেকে রুমে বন্দী করে রেখেছে। আজ বাসায় ফিরে অনেক বলে-কয়ে দরজা খুলালাম। তারপর দেখি রাইনার অবস্থা দেখার মতো না। একদম পাগলের মতো হয়ে গেছে। বুঝতে পারছি না, ওর কী হয়েছে। ওর মতো স্ট্রং মেয়ে হঠাৎ এভাবে ভেঙে পড়লো কেন! আমি জিজ্ঞেস করাতে বললো তোমাকে পাঠাতে।
ইফরাদের কথা শুনে আনতারার মুখেও দুশ্চিন্তার ছাপ নেমে আসে। তিন দিন ধরে ঘরবন্দী? মানে, সেদিন আনতারার সাথে কথা বলার পর থেকেই ইরাইনা আর রুম থেকে বের হয়নি? আর আজ ইফরাদ তাকে ভেঙে পড়া অবস্থায় দেখেছে? তাহলে কি সেদিনের কথাগুলোরই প্রভাব পড়েছে? ইরাইনার কথা ভেবে আনতারা প্রচণ্ড উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। সে জায়নামাজ থেকে উঠে দাঁড়ায়। তারপর জায়নামাজটা ভাঁজ করে অটোমান বেঞ্চে অর্থাৎ ইফরাদের পাশে রাখে। তারপর ইফরাদের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলে,

— আচ্ছা ঠিক আছে, আমি গিয়ে দেখে আসছি কী হয়েছে।
ইফরাদ উদ্বিগ্ন মুখে মাথা নেড়ে বলে,
— হুম, তাড়াতাড়ি জেনে এসে আমাকে জানাও।
আনতারা আশ্বাসভরা কণ্ঠে বলে,
— আচ্ছা। আপনি দুশ্চিন্তা করবেন না। আল্লাহ যা করেন, ভালো’র জন্যই করেন।
আনতারার এই কথায় ইফরাদ আবার বিরক্ত হয়। আল্লাহ যা করেন ভালোর জন্যই করেন, কথাটা সে জানে। কিন্তু এখানে ভালোটা কোথায়? তার বোনের এভাবে ভেঙে পড়া অবস্থা কি ভালো কিছু? ইফরাদের মেজাজ আবারও খারাপ হয়ে যায়। আল্লাহভীরু হওয়া ভালো, কিন্তু এতটাও বাড়াবাড়ি না। তবুও নিজেকে সংযত রাখে। এখন রাগারাগির সময় না। সবচেয়ে জরুরি হলো, ইরাইনার কী হয়েছে সেটা জানা। তাই আর প্রতিত্তোরে কিছু বলে না।
আনতারা ওড়নার একপাশ টেনে মুখ ঢেকে নেয়। হাতে তসবিহ নিয়েই রুম থেকে বের হয়ে আসে।
তারপর গিয়ে দাঁড়ায় ইরাইনার রুমের সামনে। দরজাটা খোলাই। আনতারা আস্তে করে দরজা ঠেলে ভেতরে ঢোকে। দেখে, ইরাইনা বেডের উপর বসে আছে।একদৃষ্টিতে ফ্লোরের দিকে তাকিয়ে। ইরাইনাকে খুব বিষণ্ন আর চিন্তামগ্ন লাগছে। তার চোখের দৃষ্টি আর মুখের অভিব্যক্তিতে স্পষ্ট একাকীত্বের ছাপ। রুমে ঢুকেই আনতারা সালাম দেয়,

— আসসালামু আলাইকুম।
ইরাইনা এতক্ষণ বুঝতেই পারেনি যে কেউ রুমে ঢুকেছে। সালামের শব্দ শুনে দরজার দিকে তাকায়। আনতারাকে দেখে। মনের অবস্থা যতই খারাপ হোক, সালামের গুরুত্ব তার মাথায় ঠিকই আসে। তাই ধীর গলায় উত্তর দেয়,
— ওয়ালাইকুমুস সালাম।
আনতারা দীর্ঘশ্বাস ফেলে দরজাটা লাগিয়ে দেয়। তারপর এসে ইরাইনার পাশে বসে নরম গলায় জিজ্ঞেস করে,
— আপনার এই অবস্থা কেন?
ইরাইনা ক্লান্ত কণ্ঠে বলে,
— আমি চিন্তায় পাগল হয়ে যাচ্ছি, আনতারা।
আনতারা আবারো শান্ত গলায় প্রশ্ন করে,
— কিসের চিন্তা?
এবার ইরাইনার গলায় কান্না জমে ওঠে। সে ভাঙা স্বরে বলে,

— আমার চোখে শুধু কবর ভাসে। সেই কবরের আজাব। তখনই আমার বুক ভয়েতে কেঁপে ওঠে। আমি একা কিভাবে কবরে থাকবো? প্রতিনিয়ত এই প্রশ্নটাই মন আর মস্তিষ্কে ঘুরপাক খাচ্ছে।
আনতারা ফোঁস করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। সে বুঝতে পারে, ইরাইনার এমন ভেঙে পড়ার কারণ আসলে সেদিন রাতের কথাগুলোই। সেই কথাগুলোই তাকে শান্ত হতে দিচ্ছে না। আখিরাত আর মৃত্যুর পরের ভয়াবহ চিন্তাই ইরাইনার মন-মস্তিষ্ককে চেপে ধরেছে। আনতারা গভীর একটা শ্বাস নিয়ে বলে,
— কবর মুমিনদের জন্য ভয়ংকর না। বরং নেককার মুমিনের জন্য কবর হয়ে ওঠে শান্তি ও প্রশান্তির স্থান।সেখানে তার জন্য জান্নাতের একটা দরজা খুলে দেওয়া হয়, যার মাধ্যমে সে জান্নাতের সৌরভ ও স্বস্তির অনুভূতি লাভ করে। তার কবরকে তখন প্রশস্ত ও শান্ত বাগানের মতো করে দেওয়া হয়।
আনতারা একটু থামে। ইরাইনা গভীর আগ্রহ নিয়ে আনতারার দিকে তাকিয়ে আছে পরের কথাগুলো শুনার অপেক্ষায়। আনতারা ঠোঁট সামান্য ভিজিয়ে নিয়ে আবার বলতে থাকে,

— কবর ভয়ংকর হয়ে ওঠে ফাসিক, মুশরিক ও কাফিরদের জন্য। তাদের কবরের সঙ্গে জাহান্নামের একটা দরজা খুলে দেওয়া হবে, যার মধ্য দিয়ে সেখানে পৌঁছাবে জাহান্নামের উত্তাপ ও দহনকারী। সেখানে বিষাক্ত সাপ ও পোকামাকড়ের শাস্তি থাকবে। এমনকি সেদিন মাটিও তার ন্যায্য হিসাব আদায় করবে।
ইরাইনা বিস্মিত হয়ে তাকায়।
— মাটির আবার কিসের হিসাব?
— আমরা এই মাটির উপর চলাফেরা করি, থাকি। এতে মাটির উপর চাপ পড়ে। আমরা বুঝতে পারি না, কিন্তু মাটিরও প্রাণ আছে। মাটিও ব্যথা পায়। আমরা মারা যাওয়ার পর যখন কবরে রাখা হবে, তখন মাটি সেই শোধ তুলবে। যদি কেউ নেককার বান্দা হয়, তাহলে সে এই চাপ থেকে মুক্তি পাবে। মাটি তাকে ছেড়ে দিবে। কিন্তু যদি গুনাহগার বান্দা হয়, তাহলে সেদিন মাটি শোধ তুলবে।
কথা বলতে বলতে আনতারার বুকটা ভার হয়ে এলো। এসব কথা মনে হলেই তার মনেও ভয় জাগে। সে যতই আল্লাহর ইবাদতে নিজেকে মশগুল রাখুক না কেন, অজান্তেই তো কত ভুল আর গুনাহ হয়ে যায়। সেই গুনাহগুলোর শাস্তি না জানি কত ভয়ংকর হতে পারে! ভয়ের মিশেলে আনতারার গলার স্বর নিচু হয়ে আসে,

— হাদিসে বর্ণনা আছে, মাটি এত জোরে চাপ দিবে যে এক পাশের হাড় অন্য পাশে চলে যাবে। অর্থাৎ দুই দিক থেকে এমন চাপ দেওয়া হবে যে এক দিকের হাড় অন্য দিকে সরে যাবে। সেদিন মাটি সব শোধ নিয়ে নিবে।
আনতারা কথা শেষ করতেই ইরাইনা যেন আরও দিশেহারা হয়ে পড়ে। গত তিন দিন ধরে সে কবরের সাপ-বিচ্ছুর শাস্তির কথা ভেবে আতঙ্কে ছিল। আর এখন নতুন আরেক শাস্তির কথা শুনে যেন তার ভেতরের সব শক্তি ভেঙে যায়। শেষ পর্যন্ত আর নিজেকে সামলাতে পারে না ইরাইনা। কেঁদে বলে উঠে,
— আমি এসব জানতাম না। আমি কিভাবে বাঁচবো এসব থেকে? আমি তো নেককার বান্দা না। আমি আল্লাহর গুনাহগার বান্দা।
— কিন্তু বান্দা তো আপনি আল্লাহরই। তওবা করে ফিরে আসুন আল্লাহর কাছে।
ইরাইনা চোখ তুলে তাকায়। আনতারা ভরসাময় দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়। ইরাইনা কাঁপা গলায় বলে,
— তুমি জানো না, আমি কত গুনাহ করেছি। কত পাপের বোঝা বয়ে বেড়াচ্ছি। জীবনে কতবার বেপর্দাভাবে চলেছি। কখনোই নিজেকে আড়াল করে রাখিনি…
ইরাইনার পুরো কথা শেষ হওয়ার আগেই আনতারা ইরাইনার বাম হাতটা শক্ত করে ধরে নরম স্বরে বলে,

— আপনি যা করেছেন, তা অতীতের কথা। এখন আপনি তওবা করে ফিরে আসুন। মহান আল্লাহর ক্ষমার চেয়ে কি আপনার গুনাহ বড়? নিশ্চয়ই না। তাই আল্লাহর কাছে তওবা করুন। ইনশাআল্লাহ, মহান আল্লাহ আপনাকে ক্ষমা করে দিবেন।
ইরাইনা অসহায় কণ্ঠে বলে,
— তুমি বুঝতে পারছো না, আনতারা। আমি কতগুলো পাপ করেছি।
— আপনার মন কি বলছে? আপনার আর মাফ নেই?
ইরাইনা মাথা নিচু করে আস্তে করে বলে,
— হ্যাঁ। আমি জীবনে অনেক গুনাহ করেছি। এত গুনাহের আর মাফ নেই। আল্লাহ হয়তো আমাকে ঘৃণা করেন।
আনতারা সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়িয়ে বলে,

— ওটা আপনার মন বলছে না। ওটা শয়তান বলছে। কারণ সে চায় না আপনি আল্লাহর পথে ফিরে আসুন। আল্লাহ আপনাকে ঘৃণা করছেন না বরং ফিরে আসার জন্য ডাকছেন। কারণ আল্লাহর কাছে আপনার গুনাহ বড় না, আপনার ফিরে আসাটাই বড়।
ইরাইনা মাথা তুলে অসহায় চোখে আনতারার দিকে তাকিয়ে বলে,
— সত্যি তো, আনতারা?
আনতারা নরম গলায় বলে,
— একটা হাদিস শুনবেন? তাহলেই আপনার মনে শয়তানের তৈরি করা ধোঁয়াশাটা মুহূর্তেই মিলিয়ে যাবে।
— বলো। শুনতে চাই আমি। মনটা যদি একটু শান্ত হয়।
— আল্লাহ তাআলা মহানবী (সা.)-কে বলেছেন, হে নবী, আপনার উম্মত যদি আকাশসমান গুনাহও করে, তারপরও যদি সত্যিকার অর্থে তওবা করে ফিরে আসে, তাহলে আমি আল্লাহ তার সব গুনাহ মাফ করে দিবো। শুধু মাফই করবো না, বরং তার সব গুনাহকে সওয়াবে পরিণত করে দিবো।
কথা শেষ করে আনতারা একটু থামে। তারপর গভীর স্বরে বলে,

— আপনি ভাগ্যবান। কারণ হেদায়েতের বাণী আপনার কাছে এসে পৌঁছেছে। আপনি এটা কেন দেখছেন না? দুনিয়াতে কত মানুষ হেদায়েতের বাণী না পেয়েই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছে। কিন্তু আপনি পেয়েছেন। অর্থাৎ আল্লাহ আপনাকে সুযোগ দিয়েছেন। আল্লাহ আপনাকে বলছেন, তার পথে ফিরে আসতে।
ইরাইনা আনতারার দিকে তাকিয়ে রইল দ্বিধাভরা চোখে। তার ভেতরে অস্থিরতার ঝড় বইছে। কিছুই বুঝতে পারছে না, কোনো সিদ্ধান্তও নিতে পারছে না।
আনতারা নরম স্বরে বলে,
— আপনার ভেতরে যে অনুতপ্ততা এসেছে, সেটাই হেদায়েতের প্রথম আলো। মনে আছে, আমি কী বলেছিলাম? যে ব্যক্তি পাপ করে অনুতপ্ত হয় না, তার অন্তরে ঈমান নেই। কিন্তু আপনার মধ্যে তো অনুতপ্ততা জেগেছে। মানে, আপনার ভেতরে ঈমান ফিরে আসছে।
ইরাইনা চুপ করে রইল। তার মন দোটানায় ভুগছে। বারবার দ্বিধায় পড়ে যাচ্ছে সে। তবুও মনের গভীর থেকে একটুকরো আশা তাকে বলছে, আনতারার কথাগুলো বিশ্বাস করতে। হয়তো এখনো সময় আছে ফিরে আসার। যত সময় নষ্ট হওয়ার হয়েছে, হয়েছে এখন আর দেরি না করে আল্লাহর কাছে ফিরে এসে ক্ষমা চেয়ে নেওয়াটা হয়ত ভালো হবে। তার জন্য মঙ্গলজনক হবে। ইরাইনার ভাবনার মাঝেই আনতারা বলে উঠে,

— এখন আর নিজের নফসকে জিততে দেবেন না। তওবা করে আল্লাহর দিকে ফিরে আসুন।
ইরাইনা তাকিয়ে দেখে আনতারা তার দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। আনতারার চোখে ছিল প্রত্যাশা মেশানো এক গভীর আশা। সে খুব করে চাইছিল, ইরাইনা যেন হিদায়তের পথে ফিরে আসে। তার এতক্ষণ ধরে বোঝানো যেন ব্যর্থ না হয়। ইরাইনা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। নিজের মনের সঙ্গে দীর্ঘ এক লড়াইয়ের পর অবশেষে সিদ্ধান্ত নেয়। ধীর কণ্ঠে বলে,
— আচ্ছা, ঠিক আছে। আমি তওবা করতে চাই।
ইরাইনার কথা শুনে আনতারার মুখে সঙ্গে সঙ্গেই স্বস্তির হাসি ফুটে উঠে। মুহূর্তেই মনটা আনন্দে ভরে গেল। অবশেষে ইরাইনা রাজি হয়েছে।
আনতারা মৃদু হেসে বলে,

— ঠিক আছে। আপনি আগে গোসল করে ওযু করে আসুন।
ইরাইনা একটু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে,
— গোসল করতে হবে?
আনতারা মৃদু হাসি দিয়ে বলে,
— মনে করুন, আজ থেকে আপনার জীবনের নতুন শুরু। আগের সবকিছু গোসলের পানির সাথে ধুয়ে ফেলে আসুন।
ইরাইনা মাথা নাড়ে।
— আচ্ছা, আমি গোসল করে আসছি।
বলেই ইরাইনা উঠে গিয়ে কাভার্ড খুলে। তখনি পেছন থেকে আনতারা বলে ওঠে,
— গোসল করে থ্রি-পিস পরবেন।
ইরাইনা হালকা স্বরে বলে,

— হুম। আমি আর ছেলেদের পোশাক পরবো না।
তারপর একটা থ্রি-পিস নিয়ে ইরাইনা ওয়াশরুমে ঢুকে পড়ে। আনতারা আবার হাতে থাকা তসবিহটা আঙুলের সাহায্যে ঘুরাতে লাগল। ঠোঁট নড়ছে ধীরে ধীরে৷ নিঃশব্দে দোয়া পড়ছে। প্রায় বিশ মিনিট পর ইরাইনা ওয়াশরুম থেকে বের হয়। বের হয়েই টাওয়াল দিয়ে মুখ মুছতে নেয়। তখনি আনতারা বলে ওঠে,
— ওযুর পানি মুছবেন না।
ইরাইনা অবাক হয়ে তাকায়।
— হুম?
আনতারা শান্ত কণ্ঠে বলে,
— যখন একজন মুমিন ওযু করে হাত, মুখ, পা ধোয় তখন সেই অঙ্গগুলোর মাধ্যমে করা গুনাহ ঝরে যায়। এমনকি পানির ফোঁটার সাথে সাথে, শেষ ফোঁটা পর্যন্ত। সেজন্য কখনো ওযুর পানি মুছবেন না।
ইরাইনা আর মুখ মুছে না। শুধু চুলগুলো ভালোভাবে মুছে টাওয়ালটা রেখে দেয়। আনতারা বেড থেকে থ্রি-পিসের ওড়নাটা তুলে নেয়। তারপর ইরাইনার কাছে এসে খুব সুন্দর করে ইরাইনার চুল ঢেকে হিজাব বেঁধে দেয়। এরপর জিজ্ঞেস করে,

— রুমে জায়নামাজ আছে?
ইরাইনা একটু ভেবে বলে,
— আছে হয়তো। অনেক আগে একবার কাভার্ডে দেখেছিলাম।
— আচ্ছা, খুঁজে নিয়ে আসুন।
ইরাইনা গিয়ে কাভার্ড খুলে অনেকক্ষণ খুঁজে অবশেষে জায়নামাজ বের করে আনে। তারপর সেটা আনতারার হাতে দেয়। আনতারা জায়নামাজটা মাটিতে বিছাতে শুরু করে। তখন ইরাইনা বলে,
— জায়নামাজটা মাটিতে না বিছিয়ে বেডে বিছাই?
আনতারা জায়নামাজ বিছাতে বিছাতেই বলে,

— বিছানা নরম হওয়ায় অনেক সময় সিজদাহ ঠিকভাবে স্থির হয় না। শক্ত আর স্থির জায়গায় নামাজ পড়া ভালো।
বলেই আনতারা মাথা তুলে ইরাইনার দিকে তাকিয়ে কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞেস করে,
— আপনার কি মাটিতে বসতে সমস্যা হবে?
ইরাইনা মাথা নাড়ে।
— না, কোনো সমস্যা নেই। মাটিতে যেহেতু ভালো, তাহলে এখানেই থাকুক।
— আপনি জায়নামাজে বসুন।
ইরাইনা গিয়ে জায়নামাজে বসে পড়ে। আর আনতারা খালি ফ্লোরেই ইরাইনার পাশে বসে। তারপর শান্তভাবে বলতে শুরু করে,

— তওবা করার তিনটা শর্ত আছে।
প্রথম শর্ত: কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হওয়া।
দ্বিতীয় শর্ত: গুনাহ ছেড়ে দেওয়া।
আর তৃতীয় শর্ত: পুনরায় সেই গুনাহ না করার দৃঢ় সংকল্প করা।
তারপর ইরাইনার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে,
— আপনি কি মন থেকে এই তিনটা শর্ত মেনে নিতে রাজি?
ইরাইনা অনুতাপ আর দৃঢ়তার মিশ্র অনুভূতি নিয়ে কাঁপা গলায় নরম স্বরে বলে,
— হ্যাঁ। আমি মন থেকে বলছি, আমি অনুতপ্ত। সব গুনাহ ছেড়ে দিবো। আর পুনরায় না করার দৃঢ় সংকল্প করছি।
আনতারা শান্তভাবে ইরাইনার দিকে তাকিয়ে বলে,
— আলহামদুলিল্লাহ। এখন সাইয়্যিদুল ইস্তিগফার পড়বেন। সাইয়্যিদুল ইস্তিগফার হলো ক্ষমা প্রার্থনার সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ আর গুরুত্বপূর্ণ দোয়াগুলোর একটা। একে ইস্তিগফারের সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ দোয়া বলা হয়। কারণ তওবার মূল বিষয়গুলো এই দোয়ায় একসাথে রয়েছে।আমি দোয়াটা বলছি, সাথে অর্থও বলছি। আপনি অর্থটা অনুভব করে মন থেকে বলবেন। তওবা মানে শুধু মুখস্থ দোয়া পড়া না। বরং মন থেকে বলা আর বিশ্বাস করা।
ইরাইনা ধীরে মাথা নাড়ে।

— আচ্ছা।
আনতারা দোয়াটা পড়তে শুরু করে,
— আল্লাহুম্মা আনতা রাব্বি লা ইলাহা ইল্লা আনতা, খালাকতানি ওয়া আনা আব্দুকা, ওয়া আনা আলা আহদিকা ওয়া ওয়াদিকা মাসতাত্বাতু, আউযু বিকা মিন শাররি মা সানা‘তু, আবু’উ লাকা বিনি‘মাতিকা আলাইয়া, ওয়া আবু’উ বিজাম্বি, ফাগফিরলি, ফা-ইন্নাহু লা ইয়াগফিরুয যুনুবা ইল্লা আনতা।
তারপর দোয়ার অর্থ বলতে থাকে,
— হে আল্লাহ! তুমি আমার রব। তুমি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। তুমি আমাকে সৃষ্টি করেছ এবং আমি তোমার বান্দা। আমি আমার সাধ্য অনুযায়ী তোমার ওয়াদা ও অঙ্গীকারের ওপর আছি। আমি আমার কৃতকর্মের অনিষ্ট থেকে তোমার আশ্রয় চাই। আমি তোমার নেয়ামতের স্বীকৃতি দিচ্ছি এবং আমার গুনাহেরও স্বীকৃতি দিচ্ছি। তাই আমাকে ক্ষমা করো। কারণ তুমি ছাড়া আর কেউ গুনাহ ক্ষমা করতে পারে না।
ইরাইনা চোখ বন্ধ করে। তার চোখ বেয়ে টুপটুপ করে জল গড়িয়ে পড়ে। সে ধীরে ধীরে দোয়াটা পড়তে শুরু করে,

— আল্লাহুম্মা আনতা রাব্বি লা ইলাহা ইল্লা আনতা, খালাকতানি ওয়া আনা আব্দুকা, ওয়া আনা আলা আহদিকা ওয়া ওয়াদিকা মাসতাত্বাতু, আউযু বিকা মিন শাররি মা সানা‘তু, আবু’উ লাকা বিনি‘মাতিকা আলাইয়া, ওয়া আবু’উ বিজাম্বি, ফাগফিরলি, ফা-ইন্নাহু লা ইয়াগফিরুয যুনুবা ইল্লা আনতা।
দোয়া শেষ হতেই আনতারা নরম স্বরে বলে,
— এবার আপনি আল্লাহর দরবারে হাত তুলে সত্যিকার অর্থে অনুতপ্ত হয়ে মাফ চেয়ে নিন।
ইরাইনা চোখ খুলে ভাঙা কণ্ঠে বলে,
— কী বলবো? কীভাবে মাফ চাইবো? আল্লাহ কি আমার তওবা শুনবেন?
আনতারা শান্ত গলায় বলে,
— আপনি যে আল্লাহকে মনে করছেন, আল্লাহও আপনাকে মনে করছেন। আর কেউ যদি মন থেকে আল্লাহকে ডাকে, আল্লাহ সেই বান্দার ডাক ফেরান না। মন থেকে ডাকুন। মন খুলে আল্লাহর কাছে মাফ চান।
ইরাইনা গভীর শ্বাস নেয়। ভেতরের অনুতাপ আর অশান্ত মন নিয়ে নিজেকে গুছিয়ে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে প্রস্তুত হয়। তারপর দুই হাত তুলে মোনাজাত ধরে। চোখ বন্ধ করে মনে মনে বলতে শুরু করে,

— আল্লাহ আমি জানি, আপনাকে আল্লাহ বলে ডাকার পবিত্র জবান হয়তো আমি হারিয়ে ফেলেছি। আপনার কাছে ক্ষমা চাওয়ার জন্য যে দুটো হাত তুলেছি, সেই হাতের পবিত্রতাও আমি রক্ষা করতে পারিনি। এটা আমার ব্যর্থতা।
ইরাইনার কণ্ঠ আরও কেঁপে ওঠে।
— আমার গুনাহ হয়তো পাহাড় না, আসমান পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। তবুও আমি আপনার দরবারে হাজির হয়েছি। কারণ আমি শুনেছি, আমার গুনাহের বিশালতার চেয়েও আপনার রহমতের বিশালতা হাজার গুণ বেশি। আর আমার মন বলছে, আপনি আমাকে আপনার পথে ডাকছেন।
কথাগুলো বলতে বলতেই ইরাইনার চোখ থেকে অনবরত জল ঝরতে থাকে। সে আর নিজেকে সামলাতে পারে না। বুক ভেঙে কান্না আসে। আল্লাহর কাছে কথা বলতে বলতে মন খুলে কাঁদতে থাকে। একসময় ফুঁপিয়ে উঠে বলে,

— আপনি আমাকে আপনার পথে কবুল করে নিন। আমাকে হেদায়েত দিন। আপনি আমাকে ফিরিয়ে দিবেন না। আমি এক ভিক্ষুক, যে আপনার কাছে ক্ষমা, দয়া আর হেদায়েত ভিক্ষা চাইছে। এই ভিক্ষুককে ফিরিয়ে দিবেন না। আমাকে কবুল করে নিন আপনার পথে।
কথা শেষ করে ইরাইনা মোনাজাত নামিয়ে নেয়। তার পুরো মুখ কান্নায় ভিজে গেছে। মোনাজাত শেষে সে আনতারার দিকে তাকায়। দেখে, আনতারার চোখেও জল। তবে ঠোঁটের কোণে জ্বলজ্বল করছে একটুখানি হাসি।
ইরাইনা নাক টেনে ভ্রু উঁচু করে ইশারায় জিজ্ঞেস করে,
— কী?
আনতারা আবেগমাখা গলায় বলে,

— আপনি জানেন, আপনি অনেক ভাগ্যবান? আল্লাহ আপনাকে এমন দুটো চোখ দিয়েছেন, যেই চোখ থেকে আল্লাহর জন্য জল বের হয়েছে। সবাই কিন্তু আল্লাহর জন্য কাঁদার মতো চোখ পায় না। আল্লাহ সবাইকে তার জন্য কাঁদার সুযোগও দেন না। অনেকের কাছ থেকে এই সুযোগটুকুও কেড়ে নেন।
আনতারা কথা শেষ করতেই ইরাইনার চোখ আবার ভিজে ওঠে। সে কান্নাভেজা গলায় বলে,
— আল্লাহ আমার তওবা আর চোখের জল কবুল করুন।
আনতারা মৃদু হাসে।
— ইনশাআল্লাহ, করবেন। আমি আরেকটা জিকির করছি, আমার সাথে সাথে বলবেন।
ইরাইনা মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানায়। আনতারা জিকির শুরু করে,
— আস্তাগফিরুল্লাহা লি কুল্লি ধান্বিন ওয়া আতুবু ইলাইহি, লা হাওলা ওয়া লা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহিল আলিয়্যিল আযীম। তওবা ইয়া আল্লাহ, তওবা ইয়া আল্লাহ, তওবা ইয়া আল্লাহ, তওবা ইয়া রব্বি। লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাঃ।
ইরাইনা মনোযোগ দিয়ে সাথে সাথে বলে,

— আস্তাগফিরুল্লাহা লি কুল্লি ধান্বিন ওয়া আতুবু ইলাইহি, লা হাওলা ওয়া লা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহিল আলিয়্যিল আযীম। তওবা ইয়া আল্লাহ, তওবা ইয়া আল্লাহ, তওবা ইয়া আল্লাহ, তওবা ইয়া রব্বি। লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাঃ।
জিকির শেষ করে আনতারা হাসি দিয়ে বলে,
— ইনশাআল্লাহ আপনার পেছনের সব গুনাহ মাফ হয়ে গেছে। মহান আল্লাহ মাফ করে দিয়েছেন। এই জিকিরটা অনেক শক্তিশালী।
ইরাইনার চোখে হালকা আশা জ্বলে ওঠে।
— সত্যি?
আনতারা আগের মতোই হাসি দিয়ে উত্তর দেয়,
— একদম সত্য।
ইরাইনার মন কিছুটা হালকা হয়ে আসে। তার মন বিশ্বাস করতে শুরু করে যে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দিয়েছেন।
আনতারা বলে,

— এবার এশারের নামাজটা পড়ে নিন। আজ থেকেই ইবাদত শুরু করুন।
— আচ্ছা।
— নামাজ পড়তে পারেন?
ইরাইনা একটু দ্বিধা নিয়ে বলে,
— নামাজ কিভাবে পড়তে হয় জানি, কিন্তু কখন কোন সূরা পড়তে হয় জানি না। আর সূরাও মুখস্থ নেই। ওয়েট, মোবাইল থেকে দেখে এখনই শিখে নিচ্ছি।
আনতারা শান্তভাবে বলে,
— আচ্ছা, আপনার যেভাবে সহজ হয় সেভাবেই করুন।
ইরাইনা মোবাইল বের করে সূরা খুঁজে শিখতে শুরু করে। পাশে বসে আনতারা ইরাইনাকে দেখে। ইরাইনা একে একে সূরা ফাতিহা, সূরা ইখলাস, সূরা কুনুত, তাশাহহুদ, দরুদ আর ইস্তিগফার শিখে নেয়। এরপর মোবাইল রেখে উঠে দাঁড়াতেই আনতারা অবাক হয়ে বলে,

— সূরা শিখা শেষ?
— হ্যাঁ, এখন নামাজের জন্য সব সূরা শিখে ফেলেছি।
— আরেকটা দোয়া বাকি আছে তো।
— আর কোন দোয়া? সবই তো শিখলাম, নামাজে যেগুলো লাগে।
— আপনি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দোয়াটাই শিখেননি।
ইরাইনা কৌতূহল নিয়ে বলে,
— কোন দোয়া? আমি জানি না তো।
আনতারা নরম গলায় বলে,
— আগে শুনুন, কেউ যখন আমাদের নবীর নাম উচ্চারণ করবে, তখন মনে মনে ‘সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম’ পড়বেন। এতে সওয়াব পাবেন।
ইরাইনা মাথা নাড়িয়ে বলে,

— আচ্ছা।
আনতারা আবার বলে,
— এবার শুনুন, রাসুলুল্লাহ সাঃ বলেছেন, চারটি জিনিস থেকে পানাহ না চেয়ে যেন আমরা নামাজ শেষ না করি।
আনতারা যখন নবীর নাম উচ্চারণ করে তখন ইরাইনা মনে মনে ‘সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম’ পড়ে নেয়। কথা শেষ হতেই ইরাইনা জিজ্ঞেস করে,
— কোন চারটা জিনিস?
— জাহান্নামের শাস্তি, কবরের শাস্তি, জীবন ও মৃত্যুর ফিতনা, আর দাজ্জালের ফিতনা থেকে।
ইরাইনা হালকা শ্বাস নিয়ে বলে,
— ওহ, আমি তো জানতাম না। দোয়াটাও জানি না।
— আচ্ছা, আমি বলছি। শিখে নিন।
বলেই আনতারা দোয়া পড়তে শুরু করে,
— আল্লাহুম্মা ইন্নি আউযু বিকা মিন আযাবি জাহান্নাম,
ওয়া মিন আযাবিল কবর,
ওয়া মিন ফিতনাতিল মাহইয়া ওয়াল মামাত,
ওয়া মিন শাররি ফিতনাতিল মাসীহিদ দাজ্জাল।
এই দোয়ার অর্থ: হে আল্লাহ! আমি জাহান্নামের শাস্তি, কবরের শাস্তি, জীবন ও মৃত্যুর ফিতনা এবং দাজ্জালের ফিতনার অনিষ্ট থেকে আপনার আশ্রয় চাই।
তারপর আনতারা বলে,

— এই দোয়াটা পড়ে সালাম ফিরিয়ে নিবেন।
ইরাইনা মনোযোগ দিয়ে দোয়াটা মুখস্থ করে নেয়। তারপর এশারের নামাজ পড়ে। নামাজ শেষ করার পর ইরাইনার মন ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে আসে। অজান্তেই তার ভেতরে এক ধরনের খুশি অনুভূত হয়, যার কারণ সে নিজেও বুঝতে পারে না। কিন্তু ঠোঁটের কোণে একটা ছোট্ট হাসি ঠিকই লেগে থাকে। এটাই যে নামাজের এক নীরব নিয়ামত, মনটা ধীরে ধীরে হালকা হয়ে যায়, আর চারপাশটা অজান্তেই স্নিগ্ধ লাগতে শুরু করে।
ইরাইনা নামাজ শেষ করতেই আনতারা শান্তভাবে বলে,
— এখন থেকে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়বেন। আর বাইরে গেলে হাত, মুখ, ঘাড়, গলা, চুল সব ঢেকে হিজাব পরে বের হবেন। এমনভাবে হিজাব পরবেন যেন চুল, ঘাড়, গলা কিছুই দেখা না যায়।
ইরাইনা কিছুটা দ্বিধা নিয়ে বলে,

— কিন্তু আমার মাইগ্রেনের সমস্যা আছে। সামান্য ওড়না দিলেই মাথা ব্যথা শুরু হয়। আমি হিজাব পরবো কিভাবে? আর বাইরে বের হবোই বা কিভাবে? মাথা ব্যথা করবে তো।
আনতারা ইরাইনার দিকে তাকিয়ে থাকে। ইরাইনার চোখে স্পষ্ট দ্বিধা আর অস্বস্তি। আনতারা বুঝতে পারে, ইরাইনা এখনো দুনিয়ার কষ্টকেই বড় করে দেখছে। আখিরাতের ভয়াবহতা তার মনকে পুরোপুরি স্পর্শ করেনি। সে পর্দা করতে চায় না এমন না বরং মাইগ্রেনের সমস্যাকেই বড় বাধা ভাবছে।
আনতারা চোখ সরিয়ে হাতে থাকা তসবিহ ধীরে ধীরে ঘুরাতে ঘুরাতে বলে,

— জানেন, কিয়ামতের পর যখন সবাইকে আবার জীবিত করা হবে, হাশরের ময়দানে একসাথে জড়ো করা হবে, তখন সূর্য থাকবে একদম মাথার খুব কাছাকাছি। হাদিসে এসেছে, হাশরের ময়দানে সূর্য মানুষের মাথার উপর এক মাইল দূরে থাকবে। সূর্যের তাপ হবে ভয়াবহ, দুনিয়ার গরমের সাথে যার কোনো তুলনাই নেই। সেদিন মানুষ তাদের আমল অনুযায়ী ঘামের মধ্যে ডুবে থাকবে। কারো ঘাম গোড়ালি পর্যন্ত, কারো কোমর পর্যন্ত, কারো মুখ পর্যন্ত উঠে যাবে। সেদিন কোনো ছায়া থাকবে না, কোনো বাতাস থাকবে না, কোনো আশ্রয়ও থাকবে না। শুধু আল্লাহ যাদের বিশেষ ছায়া দেবেন, তারাই রক্ষা পাবে।
ইরাইনা চুপচাপ শুনছে। শুধু শুনছে না বরং গভীরভাবে ভাবছে। কথাগুলোর ভেতরে ডুবে যাচ্ছে। আনতারা এবার স্থির দৃষ্টিতে ইরাইনার দিকে তাকিয়ে বলে,

— ধরুন, হাশরের ময়দানে সূর্য আমাদের মাথার মাত্র এক মাইল উপরে। আর এখন পৃথিবী থেকে সূর্যের দূরত্ব প্রায় ৯৩ মিলিয়ন মাইল। যদি ৯৩ মিলিয়ন মাইল দূরের সূর্যের তাপ আমরা সহ্য করতে না পারি, তাহলে এক মাইল দূরের সূর্যের আগুন কীভাবে সহ্য করবো?
আনতারা একটু থেমে আবার বলে,
— এখন বলুন, কোনটা ভালো? দুনিয়ার সামান্য কষ্ট, নাকি আখিরাতের ভয়াবহ দীর্ঘ কষ্ট? আজ হয়তো মাইগ্রেনের কথা বলে বেঁচে যাচ্ছেন, কিন্তু আখিরাতে তো কোনো অজুহাত কাজ করবে না। সেখানে আল্লাহর সামনে মাইগ্রেন বলার সুযোগও থাকবে না। আখিরাত এমন একটা জায়গা যেখানে থাকবে না কোনো অজুহাত। দুনিয়ায় যা করবেন, তারই ফল পাবেন।
আনতারার কথাগুলো ইরাইনার চোখের সামনে ভাসতে থাকে। একটু আগে যে মনটা শান্ত হয়েছিল, মুহূর্তেই আবার অস্থির হয়ে ওঠে। মুখে চিন্তার ছাপ পড়ে যায়। তার মনে হয়, আখিরাত এত কঠিন কেন? সে তো এত কিছু আগে জানতোই না। আখিরাতের কথা মনে হলেই তার বুক কেঁপে ওঠে। আনতারার আগের কথাগুলোও আবার মনে পড়ে যায়, এখন নতুন করে আরও ভয় যোগ হয়। যত বেশি শুনছে, তত বেশি ভয় বাড়ছে।
আনতারা আবার শান্তভাবে বলে,

— এখন যদি আমরা গরম, কষ্ট, সবকিছুর পরোয়া না করে আল্লাহর ইবাদত ও বিধিনিষেধ মেনে চলি, তাহলে আল্লাহ হাশরের ময়দানে আমাদের তার আরশের ছায়ায় রাখবেন। এখন বলুন, সেই তীব্র গরম থেকে বাঁচতে যদি আল্লাহর আরশের ছায়া পাওয়া যায়, তাহলে দুনিয়ার এইটুকু কষ্ট কি আমরা সহ্য করতে পারি না? আর উপায়ই বা কী না করে?
ইরাইনা চুপচাপ ভাবনায় ডুবে আছে। কথাগুলো যেন বুকে হাতুড়ি মারছে। আখিরাতের সেই কঠিন শাস্তির কথা ভেবে তার বুক কেঁপে উঠে। যেখানে দুনিয়ার গরমই সহ্য করতে পারে না, সেখানে আখিরাতের তীব্রতা কীভাবে সহ্য করবে? আজ হয়তো মাইগ্রেনের সমস্যার অজুহাতে সে কিছুটা ছাড় পাচ্ছে কিংবা এড়িয়ে যাচ্ছে, কিন্তু এটা কোনো ছাড় না বরং এই অবহেলা কিংবা এড়িয়ে যাওয়ার শাস্তি জমে আখিরাতের জন্য সঞ্চিত হয়ে যাচ্ছে। এতটুকু ভাবতেই ইরাইনার কপালে আবার বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে উঠে, শ্বাস ভারী হয়ে এলো ভয়ে। ঠিক তখনি আনতারা দৃঢ় কণ্ঠে বলে উঠে,

— আজ যদি আমরা এই কষ্ট সহ্য না করি, তাহলে হাশরের ময়দানে কষ্ট সহ্য করতে হবে। তখন আল্লাহর আরশের ছায়া পাওয়া যাবে না। তাই দুনিয়ার এই মাইগ্রেনের কারণে আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করবেন না। বরং এই কষ্ট নিয়েও যদি পর্দা ঠিকভাবে পালন করেন, তাহলে আখিরাতে এর জন্য পুরস্কার পাবেন।
ইরাইনা ধীরে ধীরে নিজের ভেতর শক্তি সঞ্চয় করে। সে সিদ্ধান্ত নেয় যাই হোক, সে পর্দা করবে। মাইগ্রেন থাকলেও সে আর বেপর্দা থাকবে না। কারণ এই দুনিয়ার সামান্য কষ্ট না মানলে আখিরাতের কষ্ট আরও ভয়াবহ হবে। বরং এখন কষ্ট করে নেবে, আখিরাতে শান্তি পাবে।
ইরাইনা গভীর শ্বাস নিয়ে দৃঢ় গলায় বলে,
— আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, আমি আল্লাহর আদেশ-নিষেধ মেনে চলবো। আমার যতই কষ্ট হোক, আমি আর আল্লাহর নিষেধ অমান্য করবো না। যদি কোনো ভুল করি, আমাকে শুধরে দিও তুমি।
— ইনশাআল্লাহ। আল্লাহ আপনার সিদ্ধান্ত অটুট রাখুন। আল্লাহর ভয়ে বা সন্তুষ্টির জন্য যদি আপনি দুনিয়াতে কিছু ত্যাগ করেন, তার চেয়ে হাজার গুণ বেশি আপনি আখিরাতে ফিরে পাবেন।
ইরাইনা ধীরে বলে,

— হুম।
কিছুক্ষণ নিরবতা থাকে। ইরাইনা হঠাৎ নীরবতা ভেঙে জিজ্ঞেস করে,
— আচ্ছা, আমি শাওয়ার নিয়ে বের হওয়ার সময় দেখলাম তুমি তসবিহতে কী যেন পড়ছিলে?
আনতারা শান্তভাবে উত্তর দেয়,
— একটা শক্তিশালী তাহলীলের জিকির পড়ছিলাম। এই জিকিরটা ১০০ বার পড়লে ১০ জন গোলাম আযাদ করার সওয়াব পাওয়া যায়, ১০০ নেকি লেখা হয়, আর ১০০ গুনাহ মাফ হয়ে যায়। শুধু তাই না, সারাদিন শয়তান থেকে হেফাজতে থাকা যায়। ওই দিন আপনার চেয়ে উত্তম আমল কেউ করতে পারবে না, তবে যে এর চেয়ে বেশি পড়বে সে ছাড়া। এই কালিমা ও তাওহীদের জিকির কিয়ামতের দিন মিজানের সবচেয়ে ভারী আমলগুলোর মধ্যে থাকবে।
ইরাইনা কৌতূহল নিয়ে বলে,

— আমাকে বলো। আমিও পড়বো। জীবনে অনেক গুনাহ করেছি, এবার একটু সওয়াব কামাই।
আনতারা বলতে থাকো,
— লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারীকা লাহু, লাহুল মুলকু ওয়া লাহুল হামদু, ওয়া হুয়া আলা কুল্লি শাইয়িন কাদীর।
এর অর্থ হলো : আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য ইলাহ নেই। তিনি একক, তাঁর কোনো শরীক নেই। রাজত্ব তাঁরই, সমস্ত প্রশংসা তাঁরই, এবং তিনি সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান।
আনতারা আবার বলে,
— এই কালিমা ও তাওহীদের জিকির কিয়ামতের দিন মিজানের সবচেয়ে ভারী আমলগুলোর মধ্যে থাকবে। আর এই তাওহীদের স্বীকৃতি যদি হৃদয় থেকে বলা হয় এবং এর ওপর আমল করা হয়, তাহলে জান্নাতের পথ সহজ হয়ে যায়।
ইরাইনা তাড়াতাড়ি বলে,
— তোমার তসবিহটা আমাকে দাও? আমি জিকিরটা পড়ি?
আনতারা তসবিহটা ইরাইনাকে দিয়ে বলে,

— এই নিন। আপনি তসবিহ ঘুরান। আমিও আপনার সাথে পড়ি। অকারণে বসে না থেকে দোয়া দরুদ পড়ি, সময়টা কাজে লাগাই।
তারপর দুজনেই তসবিহ ঘুরিয়ে জিহ্বা নেড়ে জিকির শুরু করে। ইরাইনা মনোযোগ দিয়ে পড়তে থাকে, আর আনতারাও তার সাথে সাথে জিকির করে। প্রায় বিশ মিনিট ধরে দুজনেই তাহলীলের জিকির পড়ে, প্রায় পাঁচশো বার। তারপর ইরাইনা থেমে বলে,
— আজকে এতটুকুই। কালকে আবার পড়বো।
আনতারা নরম গলায় বলে,
— প্রতিদিন সকালে, বিকেলে, সন্ধ্যায় আর রাতে পড়বেন।
ইরাইনা মাথা নাড়িয়ে বলে,
— হুম। এখন আসো, বেডে বসি। তুমি অনেকক্ষণ ধরে মাটিতে বসে আছো।
— সমস্যা নেই।
— সমস্যা না হোক, তবুও চলো বেডে বসে কথা বলি।
আনতারা হালকা মাথা নাড়িয়ে বলে,
— আচ্ছা, চলুন।
এরপর দুজনেই উঠে দাঁড়ায়। ইরাইনা জায়নামাজ ভাঁজ করে বেডের একপাশে রেখে দেয়। তারপর দুজনেই বেডে বসে।
ইরাইনা কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞেস করে,

— আমি তো তোমার সম্পর্কে কিছুই জানি না। তোমার পরিবারে কে কে আছে?
— আমার পরিবারে আমার আব্বুজান, মা আর আমার বোন আছে।
ইরাইনা আরো বেশি কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞেস করে,
— তারাও কি অনেক ইসলামিক?
আনতারা শান্তভাবে বলে,
— না, তারা এতটা ধার্মিক না।
ইরাইনা অবাক হয়ে বলে,
— ওহ। তাহলে তুমি যে এতটা ধার্মিক?
আনতারা একটু থেমে দৃষ্টি নত করে বলে,
— আমার আম্মু অনেক ধার্মিক ছিলেন। আমি যখন আমার আম্মুর পেটে ছিলাম, তখন আম্মুর ইচ্ছে ছিল আমাকে মাদ্রাসায় পড়াবেন অর্থাৎ সম্পূর্ণ ইসলামের পথে বড় করবেন। কিন্তু আমাকে জন্ম দিতে গিয়ে আম্মু মারা যায়, তাই সেই ইচ্ছাটা আর পূরণ করতে পারেননি।
ইরাইনা চমকে গিয়ে বলে,

— মারা গেছেন? তাহলে একটু আগে বললে মা আছে। সৎ মা?
আনতারা নিচু স্বরে বলে,
— জি।
ইরাইনা আবার জিজ্ঞেস করে,
— ওহ। তাহলে তুমি সৎ মায়ের কাছে বড় হয়েছো?
— না, আমি বড় হয়েছি আমার দাদীজানের কাছে। আম্মু মারা যাওয়ার পর দাদীজানই আমাকে আদর-যত্ন করে বড় করেছেন।
ইরাইনা কৌতূহলী হয়ে ভ্রু সামান্য কুঁচকে জিজ্ঞেস করে,
— তোমার বাবা তোমাকে ভালোবাসতেন না?
— বাসতেন তো।
— তাহলে তুমি যে বললে দাদীর কাছে বড় হয়েছো?
আনতারা হালকা হেসে বলে,

— আসলে আব্বুজান ব্যবসার কাজে বাইরে বাইরে থাকতেন। তাই আমি বড় হয়েছি দাদীজানের কাছেই। কিন্তু আব্বুজানও আমাকে অনেক ভালোবাসতেন।
ইরাইনা মাথা নাড়িয়ে বলে,
— আচ্ছা বুঝেছি। কিন্তু তোমার পরিবার যেহেতু এতটা ইসলামিক না, তাহলে তুমি এত আল্লাহপ্রেমী হলে কীভাবে?
আনতারা কিছুক্ষণ চুপ থেকে শান্তভাবে বলতে শুরু করে,
— আমার যখন চার বছর, তখন আব্বুজান আমাকে জেনারেল লাইনের পড়াশোনায় ভর্তি করান। তবে আমার দাদীজান আমার আম্মুকে খুব ভালোবাসতেন। তিনি আম্মুর ইচ্ছেটা কখনো অপূর্ণ রাখতে চাননি।
আনতারার চোখে ভেসে উঠছে তার শৈশবের স্মৃতি। সে বলতে শুরু করে,

— আমি আমার দাদীজানের কাছ থেকেই জানতে পারি আমার আম্মুর সেই ইচ্ছেটার কথা। তখন আমার বয়স ছিল মাত্র নয় বছর। এরপর থেকেই আমি আম্মুর সেই ইচ্ছেটা পূরণের জন্য আব্বুকে বারবার অনুরোধ করতে থাকি, যেন আমাকে মাদ্রাসায় ভর্তি করা হয়। তবে আব্বু রাজি ছিলেন না। কারণ আব্বু আমাকে মাদ্রাসায় পড়াতে চাইতেন না। আব্বুর কাছে দুনিয়াবি শিক্ষাটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিলো। আমার অনেক অনুরোধের পর সাথে দাদীজানের বুঝানোর পর শেষ পর্যন্ত আব্বু রাজি হন। কিন্তু মাদ্রাসায় পড়ার জন্য না। বরং আব্বু বাসায় একজন মাদ্রাসা শিক্ষিকা রাখেন। এরপর আমি কুরআন শরীফ মুখস্থ করা শুরু করি। আল্লাহর রহমতে, মাত্র এক বছরের মধ্যেই আমি পুরো কুরআন মুখস্থ করে ফেলি। কিন্তু তখন শুধু কুরআন মুখস্থ করেই থেমে যাইনি, ধর্ম আমার হৃদয়ে গভীরভাবে গেঁথে যায়। আমার ভেতরে ধর্মের প্রতি এক গভীর টান তৈরি হয়। এরপর আর শুধু আম্মুর ইচ্ছেপূরণ না, বরং আল্লাহর ভালোবাসায় আমি সবকিছু করতে শুরু করি।
ইরাইনা মনোযোগ দিয়ে এতক্ষণ সব কথা শুনছিল। আনতারা কিছুক্ষণ চুপ থেকে হালকা নিচু গলায় আবার বলতে শুরু করে,

— আমার যখন ১১ বছর, তখন আমার দাদীজান মারা যান। তখন আমি খুব কষ্ট পেয়েছিলাম। যিনি আমাকে সবচেয়ে বেশি স্নেহ করতেন, যত্ন নিতেন, তিনি আমাকে ছেড়ে চলে গেলেন। তবে আল্লাহ আমার পাশে ছিলেন। এর এক বছর পর অর্থাৎ ক্লাস এইটে উঠে আমি আবার আব্বুকে অনেক অনুরোধ করি আর শেষ পর্যন্ত বাড়ির পাশের একটা মহিলা মাদ্রাসায় ভর্তি হই।
— ওহ! তাহলে তুমি এইটের পর আর পড়াশোনা করোনি?
আনতারা হেসে বলে,
— না, পড়েছি তো। আমি একসাথে মাদ্রাসা আর স্কুলে পড়তাম। আব্বুর শর্ত ছিল, দুটো একসাথে করতে পারলে ঠিক আছে, না হলে শুধু জেনারেল লাইনে পড়তে হবে। আমি সেই শর্ত মেনেই দুটোই চালিয়ে গেছি। আর এখন আমি অনার্স সেকেন্ড ইয়ারে পড়ছি।

— বুঝেছি।
বলেই ইরাইনা একটা বালিশ কোলে টেনে নিয়ে কনুইয়ের ভর দিয়ে সামান্য ঝুঁকে আনতারার দিকে তাকায়। কৌতূহলী গলায় জিজ্ঞেস করে,
— আচ্ছা, তোমার ড্রিম কী?
আনতারা একদম সরলভাবে উত্তর দেয়,
— জান্নাতে যাওয়া।
ইরাইনা হেসে ফেলে। সে আসলে জানতে চাইছিল, আনতারা জীবনে কী হতে চায় অর্থাৎ তার ড্রিম জব কী। যেহেতু আনতারা জেনারেল লাইনে পড়াশোনা করেছে, তাই তারও নিশ্চয়ই কোনো স্বপ্নের পেশা আছে। হাসি থামিয়ে দিলেও ইরাইনার ঠোঁটের কোনে একটুকরো হাসি লেগে রইল। সে আবার কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞেস করে,
— মানে, তোমার ড্রিম জব কী? কখনো ইচ্ছে হয়নি ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার বা অন্য কিছু হওয়ার?
আনতারা মুচকি হেসে বলে,

— যার মনে একবার আল্লাহর তৈরি জান্নাতের লোভ ঢুকে যায়, দুনিয়ার কোনো কিছু আর তাকে টানতে পারে না। আমাকে তো পারেইনি। জান্নাতে যাওয়ার লোভ আমার এতটাই যে দুনিয়ার কোনো কিছুতেই আমি আর মন দিতে পারিনি। আমার শুধু ইচ্ছে, জান্নাতের অতিথি আপ্যায়ন পাওয়া, মহান রবকে দেখা, যিনি আমার হাজার হাজার গুনাহ মাফ করে দিয়েছেন, প্রতিনিয়ত গুনাহ করার পরও যিনি আমার থেকে নিয়ামত বন্ধ করেননি। আর আমার নবীকে দেখা, যিনি আমাকে না দেখেও কিয়ামতের ময়দানে আমার জন্য সুপারিশ করবেন।
ইরাইনা ধীরে জিজ্ঞেস করে,

— শুধুই জান্নাতে যাওয়া? এছাড়া আর কোনো ইচ্ছে নেই?
আনতারা হালকা শ্বাস নিয়ে বলে,
— আছে তো। সৃষ্টিকর্তাকে দেখার ইচ্ছে। যার দৃষ্টি এত সুন্দর, না জানি তিনি কত সুন্দর!
আনতারা এবার আবেগভরা কণ্ঠে বলে,
— একটু ভাবুন তো, যিনি এত কিছু সৃষ্টি করেছেন, এত রহমত আর নিয়ামত দিচ্ছেন, তাকে কি আপনার দেখতে ইচ্ছে করে না? আমার তো ভীষণ ইচ্ছে করে।
আনতারা চোখ ভিজে আসে। ধরে আসা গলায় বলে,
— যখন আমার মনে আল্লাহকে দেখার ইচ্ছে হয়, তখন বুকটা কেমন যেন কেঁপে ওঠে। চোখে পানি চলে আসে। তখন মনে হয়, আমি যেন ছোট বাচ্চার মতো আল্লাহর কাছে বায়না করে, জান্নাতে একবার তাকে দেখার সুযোগ চেয়ে নেই।
ইরাইনা নরম গলায় বলে,

— তোমার এসব কথা শুনলে ভেতরটা নাড়িয়ে ওঠে। সবকিছু গভীরভাবে ভাবতে ইচ্ছে করে। তখন মনে হয়, সব ছেড়ে শুধু আল্লাহকেই ডাকি।
আনতারা হালকা হাসি দিয়ে বলে,
— আপনি নিয়মিত নামাজ পড়ুন, কুরআন পড়ুন, আর আল্লাহর দেওয়া আদেশ-নিষেধ মেনে চলুন। ধীরে ধীরে দেখবেন, আপনি এতে আসক্ত হয়ে গেছেন। তখন আর ইবাদত ছাড়তে মন চাইবে না। গুনাহও করতে মন চাইবে না।
ইরাইনা একটা দীঘশ্বাস ফেলে ধীরে বলে,
— তাই যেন হয়।
আনতারা মাথা নাড়ে। ইরাইনা আবার জিজ্ঞেস করে,
— আখিরাতের ইচ্ছে তো জানলাম। কিন্তু তোমার জীবনের সবচেয়ে বড় দুনিয়াবি ইচ্ছে কী?
আনতারা একটা গভীর শ্বাস নিয়ে বলে,

— একবার শুধু জীবনে কাবা শরিফ ছুঁতে চাই। পবিত্র কাবায় কপাল ঠেকিয়ে চোখের পানি ফেলে আল্লাহর ঘরের কাছে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে সঁপে দিতে চাই।
কথাটা শুনতেই ইরাইনার মুখে এক ধরনের প্রশান্তি ছড়িয়ে পড়ে। সে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল সামনের সেই মায়াবী মুখটার দিকে। যেমন নিষ্পাপ আনতারার চেহারা, তেমনি নিষ্পাপ তার ভেতরের ইচ্ছেটাও। ইরাইনার মনে ভেসে উঠে এক অদ্ভুত ভাবনা, সে যদি আনতারার মতো করে গভীরভাবে রবকে, ধর্মকে, আর নবীকে ভালোবাসতে পারত! ইশ, কেন যেন সে তা পারে না। এই আফসোসটা তার ভেতরে চুপচাপ থেকে গেল।
সে শান্ত প্রশান্ত ভরা গলায় বলে,

রুহআবিষ্ট তুমি পর্ব ১১

— আল্লাহ তোমার ইচ্ছে কবুল করুক। আমিন।
আনতারা হালকা হাসি দিয়ে বলে,
— সুম্মা আমিন।

রুহআবিষ্ট তুমি পর্ব ১২ (২)