Home রুহআবিষ্ট তুমি রুহআবিষ্ট তুমি পর্ব ১৩ (২)

রুহআবিষ্ট তুমি পর্ব ১৩ (২)

রুহআবিষ্ট তুমি পর্ব ১৩ (২)
অধরা মিনহা

— এতো সাহস দেখিয়ে নিচে গেছো কেন?
রুমে ঢুকেই ইফরাদ দরজাটা লাগিয়ে আনতারার কাছে এসে আনতারার হাতটা টেনে কথাটা বলে। আনতারা তখন মাত্র নিকাব খুলছিলো হঠাৎ টান খেয়ে সে ফিরে তাকায় ইফরাদের দিকে। ইফরাদের মুখ ছিল একদম স্বাভাবিক। রাগের কোনো চিহ্ন নেই।
আনতারা কিছুক্ষণ ইফরাদের দিকে তাকিয়ে হালকা মুচকি হাসে। তারপর মুখটা একটু সামনে এগিয়ে বলে,

— আপনি ছিলেন তাই!
ইফরাদ চোখ সামান্য কুঁচকে যায়। এক পাশের ভ্রু সামান্য তুলে বলে,
— ভয় করেনি?
আনতারার শান্ত নরম হেসে বলে,
— আপনি ছিলেন তো, ভয় হবে কেন? আর তাছাড়া আমি অন্যায় করিনি।
— তোমার আর আমাদের চিন্তাধারা ভিন্ন। তা ধরতে গেলে তুমি ভুল। তারপরও এতো সাহস?
আনতারা শান্ত স্বরে বলে,
— চিন্তাধারা ভিন্ন হলে কি হবে? রব, ধর্ম তো অভিন্ন! আর যে দেহে আল্লাহর ভয় থাকে সেই দেহে আর কারোর জন্য ভয় না থাকাই স্বাভাবিক।
— তুমি আল্লাহকে ভয় কর, নিজের মতো থাকো, আনতারা। বাকিদের বিষয়ে কথা বলার প্রয়োজন নেই। রাইনা কিংবা বাকিরা যা ইচ্ছে করুক! তুমি কথা বলবে না ওদের বিষয়ে! কিংবা কাউকে কিছু বুঝাতে যাবে না।
— একজন মুসলিম হিসেবে আমার দায়িত্ব অন্য মুসলিমকে খারাপ, ভালো সম্পর্কে অবগত করা। আর তাছাড়া আমি যদি অন্যায়কে অন্যায় না বলি তাহলে হাশরের ময়দানে যখন আল্লাহ আমাকে এই বিষয়ে প্রশ্ন করবেন তখন আমি কি বলবো?
ইফরাদ এবার কিছুটা দৃঢ় গলায় বলে,

— আমি তোমার হাসবেন্ড। তোমাকে মানা করেছি। আমার আদেশ অমান্য করবে?
আনতারা দৃষ্টি নিচে নামিয়ে ফেলে। মাথাটা হেলে যায়। ধীরে ধীরে মাথা দুইদিকে নেড়ে ‘না’ বোঝায়। তারপর আস্তে করে বলে,
— আপনাকে আমি অনেক সম্মান করি। আপনি আমার স্বামী। আপনার আদেশ আমি কখনো অমান্য করবো না। স্বামীর আনুগত্য থাকাও একটা ইবাদত। যে নারীর উপর তার স্বামী অসন্তুষ্ট সে নারীর উপর স্বয়ং আল্লাহ অসন্তুষ্ট। আমি চাই না আল্লাহ আমার উপর অসন্তুষ্ট হোক।
ইফরাদ আনতারার এমন শান্তভাবে মেনে নেওয়া, কথা শুনে একটু থমকে যায়। চিন্তায় পড়ে যায় আনতারা কষ্ট পেয়েছে কিনা। হয়তো সে বেশি কঠিনভাবে বলে ফেলেছে। এসব ভাবনাই তার ভেতরে ঘুরতে থাকে আর তার কণ্ঠের জেদটা ধীরে ধীরে কমে আসে। ইফরাদ নরম গলায় কেবল বলে,

— হুম।
কিছুক্ষণ দুজন চুপ থাকে। ইফরাদ স্থির চোখে আনতারার দিকে তাকিয়ে থাকে। আনতারা হঠাৎ চুপ হয়ে যাওয়ায় ইফরাদের বুকের ভেতর অস্বস্তি তৈরি হয়। হঠাৎ আনতারা নরম স্বরে বলে ওঠে,
— কিন্তু আপনার কাছে অনুরোধ আপনারা ইরাইনা আপুকে আবার সেই বিধর্মী, জাহান্নামের পথে ডাকবেন না।
আনতারার চোখে অনুরোধ। ভীষণ কাতর একটা চাওয়া।
ইফরাদের মনে একটু স্বস্তি আসে। আনতারা অন্তত কথা বলছে, চুপ করে নেই। আনতারাকে একদম চুপ করিয়ে দিতে চায় না ইফরাদ। তাই গলার স্বর একটু নামিয়ে বলে,
— আনতারা, মাম্মা পাপা যেভাবে ইচ্ছে সেভাবে ইরাইনাকে লাইফ লিড করাক। আমি বাধা দিতে চাই না।
আনতারা আহত দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে,
— একটু আগে নিচে আমার বলা কথাগুলো কি একটুও আপনার হৃদয়ে বাড়ি দেয়নি? নাকি আপনি বিশ্বাসী না আখিরাত নিয়ে?
ইফরাদ কিছু বলতে যাবে কিন্তু তার আগেই আনতারা তাকে থামিয়ে দেয়। ছলছল চোখে বলে,
— দয়া করে বলবেন না আপনি বিশ্বাসী না। আপনি যে কাফের হয়ে যাবেন, এটা আমি সহ্য করতে পারবো না।
ইফরাদের এসব কথা ভালো লাগছে না বরং ভেতরে ভেতরে বিরক্ত লাগছে তার। কিন্তু কিছু বলতেও পারছে না। আনতারা যদি কষ্ট পায়? তাই মুখটা একটু অন্যদিকে ঘুরিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে স্বাভাবিক গলায় বলে,

— না, আমি আখিরাত বিশ্বাস করি।
আনতারা একটু সামনে এগিয়ে এসে আবার বলে,
— তাহলে কেন আপনি আমার কথাগুলো বুঝতে চাচ্ছেন না? এই যে মেয়েরা রাস্তাঘাটে বেপর্দা হয়ে চলছে না? সেই প্রতিটা মেয়ের আত্মা জাহান্নামের আগুনে জ্বলছে। যেটা আমাদের নবী ১৪ শো বছর আগেই দেখেছেন। বেপর্দা নারীগুলো যখন মারা যাবে, তখন হাশরের ময়দানে আল্লাহ তাদের প্রশ্ন করবেন, আমি কি তোমাদের পর্দা করার বিধান দেইনি? তাহলে কেন তোমরা বেপর্দা হয়ে ঘুরে বেড়িয়েছিলে! তখন আপনার বোন, মা, কি উত্তরটা দিবে বলুন তো?
কথাগুলো বলতে বলতে আনতারার গলা শুকিয়ে আসে। সে জিহ্বা দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে একটা ঢোক গিলে নেয়। ইফরাদ চুপ করে সব শুনতে থাকে। এই কথাগুলো অন্য কারো মনে নাড়া দিলেও ইফরাদের ভেতরে তেমন কোনো পরিবর্তন আসে না। সত্যি বলতে এসব নিয়ে তার খুব একটা মাথাব্যথাও নেই। তবুও সে আপাতত এই পরিস্থিতিটা এড়িয়ে যেতে পারছে না। তাই স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই বলে,

— পর্দা করা, হিজাব পরা যার যার ব্যক্তিগত ইচ্ছা। এটা কাউকে ফোর্স করা যায় না। আর তাছাড়া একজন মানুষের ইমান পোশাক দিয়ে জাজ করা উচিত না।
আনতারা সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্ন করে,
— বেপর্দা হয়ে চলা যদি ব্যক্তিগত স্বাধীনতা হয়, তাহলে পর্দা করে চলাতে কেন আপনারা সবাই এর বিরোধিতা করেন?
ইফরাদ একটু ভ্রু কুঁচকে বলে,
— প্রফেশন বলতে একটা কথা আছে, ইউ নো? আমরা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করি। এখানে কি বোরখা পরে মেয়েরা কাজ করতে পারবে? সেখানে কাজ হবে?
আনতারা কাঁপা কন্ঠে বলে,

— এই কাজ এতো জরুরি? বেপর্দা হয়ে চলে আপনার মা-বোন অন্য পুরুষের চোখের খোরাক হচ্ছে। আপনি এটা কিভাবে সহ্য করেন? আপনার বোনকে নিয়ে কোনো পুরুষ খারাপ কিছু ভাবুক, তাদের শরীর নিয়ে অশ্লীল কল্পনা করুক, এসব আপনি কিভাবে সহ্য করেন?আপনার গয়রত কি মাটিতে মিশে গেছে?
ইফরাদ ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করে,
— গয়রত কি?
আনতারা এক মুহূর্ত থেমে বলে,

— গয়রত? একবার এক ইহুদি তার উটকে মেরে ফেলতে যাচ্ছিলো তখন আরেক ইহুদি বললো, এটা না মেরে বিক্রি করে দিতে, তাতে অর্থও পাবে। তখন সেই ইহুদি বললো, যে উটে আমার স্ত্রী বসেছে সেই উটে অন্য কেউ বসবে এটা আমি সহ্য করতে পারবো না। এটাকেই বলে গয়রত। সে একজন ইহুদি অথচ কত গয়রতবান। আর আপনি মুসলিম হয়ে আপনার মা-বোনকে রাস্তায় বিলিয়ে দিচ্ছেন? আপনার গয়রত কোথায়? একটা আদর্শ নারী সবসময় একজন গয়রতবান পুরুষ চায়। আমিও চাই একজন গয়রতবান পুরুষ।
কথাগুলো বলেই আনতারা চুপ হয়ে যায়। তার চোখে পানি জমে উঠে। মাথা নিচু হয়ে আসে। কথা বলতে বলতে সে কেঁদে ফেলেছে। ইফরাদের এমন ঠান্ডা মনোভাব তার সহ্য হচ্ছে না। সে কিছুতেই মানতে পারছে না, ইফরাদ এত সহজভাবে বিষয়টা মেনে নিচ্ছে।
ইফরাদ আনতারাকে কাঁদতে দেখে বিরক্ত আর অস্বস্তিতে পড়ে যায়। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজেকে শান্ত করে বলে,

— ওকে, কুল আনতারা। থামো। আমার লেট হচ্ছে।
আনতারা নিজেকে থামানোর চেষ্টা করে। ইফরাদ চলে যেতে ঘুরতেই পেছন থেকে আনতারা তার হাতটা ধরে ফেলে। ইফরাদ ফিরে তাকায়। দেখে আনতারা তার হাত ধরে চোখভরা পানি নিয়ে তাকিয়ে আছে। সেই দৃষ্টিতে গভীর প্রত্যাশা। ইফরাদ প্রশ্নসূচক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে।
আনতারা কাঁপা কণ্ঠে আস্তে করে বলে,
— আপনি এই হারাম পেশা ছেড়ে চলে আসুন না।
কথাটা শুনতেই ইফরাদের মুখে স্পষ্ট বিরক্তি নেমে আসে। আনতারার কথাটা তার একদমই ভালো লাগেনি। সে তার এত কষ্টে গড়া ক্যারিয়ার ছেড়ে দেবে? যে ক্যারিয়ারের জন্য সে বছরের পর বছর পরিশ্রম করেছে, যে নাম-ডাক আজ তাকে এই জায়গায় নিয়ে এসেছে, সব কি সে এমনিই ছেড়ে দেবে? বাংলাদেশের সুপারস্টার সে। যাকে নিয়ে ডিরেক্টরদের আগ্রহের শেষ নেই। যার নামের পেছনে সবাই ছুটে। যার সব সিনেমাই বলতে গেলে হিট। একটা পর্যন্ত ফ্লপ হয়নি। যার সাথে কাজ করলে নতুন অভিনেতা- অভিনেত্রীরা ও পরিচিতি পায়। এত বড় সাফল্য, এই বিলাসবহুল লাইফ সে কিনা ছেড়ে দেবে?
ইফরাদ নিজের হাতটা আনতারার কাছ থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে শক্ত গলায় বলে,

— দিস ইজ টু মাচ। আমি রাইনা না যে তোমার কথায় আমার ক্যারিয়ার ছেড়ে দিবো।
আনতারা কান্নাভেজা গলায় বলে,
— আপনি তো রাইনা আপুর থেকেও আপন আমার। আমার জীবনে আল্লাহ আর নবীর পরে সর্বপ্রথম স্থান আপনার। আমি আপনার স্ত্রী। আমার কথা কি ফেলনা?
ইফরাদ ঠান্ডা গলায় উত্তর দেয়,
— সবার সামনে জোর গলায় বউ বললেও তুমি জানো তোমার আর আমার মধ্যে হাসবেন্ড ওয়াইফের সম্পর্ক নেই। আমি এখনো তোমাকে সেই জায়গা দিইনি। আমার লাইফে সবার আগে ক্যারিয়ার। আর তুমি এখনো এমন কেউ হওনি যার জন্য আমি আমার এত বড় অপর্চুনিটি ছাড়বো!
কথাটা শুনে আনতারা চুপ হয়ে ইফরাদের দিকে তাকিয়ে থাকে। কথাটার আঘাতে আর কিছু বলতে দেয় না রুহ।
ইফরাদের আবারো শক্ত গলায় বলল,

— এখন থেকে তুমি আমার থেকে ডিস্টেন্স মেইনটেইন করবে!
কথাটা বলে ইফরাদ আর এক মুহূর্তও দাঁড়ায় না। রুম থেকে বেরিয়ে যায়। আনতারা কিছুক্ষণ সেই দিকে তাকিয়ে থাকে। ইফরাদের কথাগুলো তার ভেতরে ব্যথা তৈরি করে। যদিও সে জানে কথাটা পুরোপুরি মিথ্যা না।ইফরাদ এখনো তাকে স্ত্রীর পূর্ণ অধিকার দেয়নি। হয়তো একদিন দেবে। সেসবে সময় লাগবে। কিন্তু বিশ্বাস আছে।ইফরাদের মাঝে মাঝে ছোট ছোট যত্ন আর আচরণে স্পষ্ট বোঝা যায় ইফরাদ বদলাচ্ছে। ধীরে ধীরে। তবে এই বিষয়টা নিয়ে আনতারার তেমন কষ্ট লাগে না। সবচেয়ে বেশি কষ্ট লেগেছে, ইফরাদ দুনিয়ার এই মোহ, এই চাকচিক্যকেই সব মনে করছে এইজন্য।
কবে ইফরাদের ভেতরে হেদায়েত আসবে? আল্লাহ কি তাকে সেই সুযোগ দেবেন? আনতারার মন বলে, আল্লাহ চাইলে অবশ্যই দিবেন। আর যদি না দেন, তাহলে সে চাইবে। কারণ আল্লাহ কারো ডাক ফেরান না। প্রয়োজনে সে সারাজীবন সিজদায় পড়ে থাকবে, তবুও ইফরাদের হেদায়েতের জন্য দোয়া থামাবে না। কারণ সে ইফরাদকে শুধু দুনিয়ায় না আখিরাতেও চায়। সে তাকে ভালোবেসে ফেলেছে। কে না চায় ভালোবাসার মানুষটাকে অনন্তকালের জন্য নিজের পাশে রাখতে?
আনতারা আর বেশি ভাবনায় থাকে না। দুই হাত দিয়ে মুখটা মুছে নেয়। একটু আগে কান্নার কারণে চোখের পানি এখনো হালকা লেগে আছে। আনতারা মুখটা দুহাত দিয়ে মুছে পরিষ্কার করে দরজাটা লাগিয়ে বোরখা ও হিজাব খুলে ফেলে। তারপর সেগুলো আলমারিতে রেখে বেডের কাছে আসতেই দরজায় নক পড়ে।

— কে?
ওপাশ থেকে উত্তর আসে,
— আমি রাইনা।
— খুলি।
আনতারা গিয়ে দরজা খুলতেই দেখে ইরাইনা দাঁড়িয়ে আছে। পরনে এখনো বোরখা। আনতারাকে দেখেই সে নিকাব সরিয়ে মুখ উন্মুক্ত করে। হালকা সাজে, ঠোঁটে নুড লিপস্টিকে ইরাইনাকে খুব সুন্দর ও মায়াবী লাগছে।ইরাইনা আনতারার লাল হয়ে থাকা মুখ দেখে মনে করে, নিশ্চয়ই কিছু হয়েছে। হয়তো ইফরাদের সাথে ঝগড়া বা বকুনি খেয়েছে। ইরাইনা উদ্বিগ্ন হয়ে বলে,
— কি হয়েছে আনতারা? তোমাকে এমন দেখাচ্ছে কেন? ব্রো কিছু বলেছে?
আনতারা শান্তভাবে বলে,

— না, উনি কিছু বলেননি আমাকে।
— তাহলে তোমার চেহারা এমন লাল হয়ে আছে কেন?
— বোরখা-নিকাব পড়ে থাকার কারণে গরমে মুখ লাল হয়ে গেছে।
ইরাইনা সন্দিহান দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে,
— সত্যি?
আনতারা হালকা মাথা নেড়ে বলে,
— হুম। ভেতরে আসুন।
ইরাইনা ভেতরে এসে দরজাটা লাগিয়ে দেয়। তারপর দুজনে বেডে এসে বসে। বসে ইরাইনা নরম গলায় বলে,
— সরি আনতারা। আই’ম রিয়েলি সরি আনতারা।
আনতারা শান্ত চোখে ইরাইনার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে,
— ক্ষমা চাইছেন কেন?
— আমার জন্য সবাই তোমার সাথে মিসবিহেভ করেছে। অকারণে কথা শুনতে হয়েছে তোমাকে।
ইরাইনা কন্ঠে ছিলো অপরাধবোধ। আনতারা শান্তভাবে মাথা নাড়িয়ে বলে,

— এমন কিছুই হয়নি। ওনারা গুরুজন, বলতেই পারে। তাছাড়া ওসব কথায় আমি কিছু মনে করিনি। একসাথে থাকতে গেলে অনেক কিছুই হয়।
ইরাইনা আবারো অনুনয়ের সুরে বলে,
— তারপরও সরি।
আনতারা মৃদু হেসে বলে,
— আপনি অকারণেই মন খারাপ করছেন আপু। এসব সামান্য ব্যাপার।
ইরাইনা কিছুটা চিন্তিত হয়ে আবার জিজ্ঞেস করে,
— আচ্ছা ব্রো তোমাকে কিছু বলেছে আমার ব্যাপারে? রেগে আছে তোমার উপর?
আনতারা একটু আগের সবকিছু গোপন করে। বেশ স্বাভাবিক মুখেই বলে,
— না, উনি কিছুই বলেননি। আর দেখে মনেও হলো না রেগে আছেন।
ইরাইনা একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বলে,
— আমি অনেক ভয় পাচ্ছিলাম, ভেবেছি ব্রো তোমার সাথে ঝামেলা করবে।
আনতারা নরম স্বরে বলে,

— আপনার ভাই ইদানীং আমার সাথে খারাপ ব্যবহার করেন না। বরং অনেক শান্তভাবে কথা বলেন।
ইরাইনা একটু হেসে বলে,
— ইউ মিন ভাইয়া চেঞ্জ হচ্ছে?
আনতারা মাথা নেড়ে বলে,
— হুম, অনেকটাই।
ইরাইনা হালকা খুশি হয়ে বলে,
— দেখবে আরো চেঞ্জ হবে। তোমাকে ভালোবাসবে তোমার মনের মতো হবে।
আনতারা হালকা হাসি দিয়ে বলে,
— আল্লাহ চাইলে পাথরে ফুল ফোটান, সেখানে এটা তো আপনার ভাইয়ের মন। ইনশাআল্লাহ, আপনার ভাইয়ের মনেও প্রেমের ফুল ফুটবে আমার নামে।
ইরাইনা মজা করে বলে,
— অলরেডি ফুল ফুটে গেছে। দেখো না বউয়ের পক্ষ নেয় কিভাবে।
আনতারা একটু মন খারাপ করে বলে,

— পক্ষ নেয় ঠিক আছে। কিন্তু ওনার এমন রাগারাগি করা আমার ভালো লাগে না। আমি চাই না ওনার কথায় ওনার মা-বাবা কষ্ট পাক।
ইরাইনা দৃঢ় গলায় বলে,
— মাঝে মাঝে উচিত কথা বলতে হয়, তাতে সামনের মানুষ কষ্ট পেলেও। তাছাড়া ব্রো ঠিক করেছে। এখানে যদি ব্রো চুপ থেকে তোমার অপমান সহ্য করতো, তাহলে আমি ব্রোয়ের সাথে রাগ করতাম। মা দামী ঠিক আছে, কিন্তু বউয়েরও মূল্য আছে। সেখানে মাম্মা ভুল ছিল।
— তবুও আপনাদের মা হয়।
— মা হলেও আমি অন্যায় সহ্য করতে পারি না। অন্যায় আমার কাছের মানুষ করলেও আমি সেটাকে অন্যায়ই বলি। আমার মা তোমার সাথে খারাপ ব্যবহার করেছে বলে আমি সেটার প্রতিবাদ করবো না বা চুপ থাকবো, এমন না।
আনতারা হঠাৎই হালকা বিস্ময় আর প্রশংসা মিশ্রিত গলায় বলে,

— জানেন আপু? আজকে আপনার ইসলামের হয়ে থাকাটা যে আমার কত ভালো লেগেছে।
ইরাইনা এবার নরম হাসে। হাসিটাই সামান্য কষ্টও ছিলো।
— জীবনে না জেনে অনেক গুনাহ করেছি। কিন্তু এখন যত কিছুই হোক, আর গুনাহের পথে ফিরবো না। তাতে যদি সবার বিরুদ্ধে যেতে হয়, যাবো।
— এই তো, এভাবেই সাহস রাখবেন। আল্লাহর পথে থাকবেন। তারপর যদি পুরো দুনিয়া আপনার বিপক্ষে চলে যায়, তাও কিছু করতে পারবে না। কারণ আল্লাহ আপনার সাথে আছেন। যার সাথে আল্লাহ আছেন, তার দুনিয়ায় কেউ না থাকলেও হবে।
ইরাইনা হালকা মাথা নেড়ে বলে,
— হুম, দোয়া করো আমার জন্য।
আনতারা হালকা হেসে বলে,

— দোয়া করি আল্লাহ যেন আপনাকে সবসময় ইসলামের পথে রাখে।
— হুম।
আনতারা হঠাৎ ইরাইনাকে উপর নিচ দেখে বলে,
— আপনি অফিসে যাবেন না?
ইরাইনার তখন খেয়াল হয় লেইট হয়ে যাচ্ছে। তাড়াহুড়ো করে বলে,
— হ্যাঁ, আমি এসেছিলাম তোমাকে দেখতে। পাপা অফিস চলে গেছে।
বলেই দ্রুত উঠে দাঁড়িয়ে বলে,
— আমার লেট হয়ে যাবে। গেলাম।
আনতারা হালকা স্বরে বলে,
— আল্লাহ হাফেজ।
ইরাইনা একইভাবে উত্তর দেয়,
— আল্লাহ হাফেজ।

বাজে তখন সন্ধ্যা সাড়ে আটটা। ইফরাদ একটু আগেই বাসায় ফিরেছে। রুমে এসে সে শুয়ে শুয়ে ফোন টিপছে। হঠাৎ খেয়াল করে রুমটা অনেক ঠান্ডা হয়ে গেছে।কমফোর্টার গায়ে থাকলেও ঠান্ডাটা পুরোপুরি কাটছে না।
কিন্তু ইফরাদের মন নিজের দিকে নেই। বরং আনতারার কথা মনে পড়ে। সে আনতারার দিকে তাকিয়ে দেখে, আনতারা মাটিতে জায়নামাজ বিছিয়ে নামাজ পড়ছে। আনতারার গায়ে কোনো কমফোর্টার নেই। নিশ্চয়ই আনতারার আরো বেশি শীত লাগছে।
এসব মাথায় আসতেই ইফরাদ মোবাইলটা পাশে রেখে উঠে বসে। শরীর একটু টেনে নিয়ে এসির রিমোট হাতে নেয়। এবং এসির তাপমাত্রা কমিয়ে দেয়। তারপর আবার চুপচাপ তাকিয়ে থাকে আনতারার দিকে। আনতারা তখন মোনাজাতে ব্যস্ত। মোনাজাত শেষ হতেই ইফরাদ আবার মোবাইল হাতে নিয়ে আধশোয়া হয়ে বসে। ফোনের স্ক্রিন দেখতে দেখতে জিজ্ঞেস করে,

— এতোক্ষণ ধরে মোনাজাতে কি চেয়েছো?
আনতারা শান্তভাবে বলে,
— সকলের সুস্থতা চেয়েছি। আল্লাহ রব্বুল আলামীনের নিয়ামত চেয়েছি। দয়া চেয়েছি। জান্নাত চেয়েছি।
একটু থেমে হালকা লজ্জায় লাল হয়ে বলে,
— আর জান্নাতে আপনাকেও চেয়েছি!
ইফরাদ ফোন থেকে চোখ তুলে আনতারার দিকে তাকায়। বাঁকা হেসে বলে,
— আগে দুনিয়াতে তোমার হয়ে নেই মাই জানা, তারপর না হয় জান্নাতের জন্য চেও!
— দুনিয়াতে তো সামিল হয়েই গেছি আপনার সাথে। এখন বাকিটা জীবন আর জান্নাতের জন্য চাই।
ইফরাদ এবার একটু গম্ভীর গলায় বলে,
— শুনো, তোমাকে আমি অপমানিত হতে দেই না, কারণ তুমি এখন আমার বউ। মন থেকে মেনে না নেই, কিন্তু লিগালি তুমি আমার বউ। এখন তোমাকে অপমান করা মানে আমাকেই করা! আর ইফরাদ রিদান চৌধুরীকে অপমান করার সাহস বা যোগ্যতা দুটোর একটাও কারোর নেই।
আনতারা হালকা হাসি দিয়ে বলে,

— এই যে এখন এইটুকু পরোয়া করছেন না? ইনশাআল্লাহ কিছুদিন পর ভালোও বাসবেন! আমার ভরসা আছে আমার আল্লাহর উপর!
ইফরাদ সঙ্গে সঙ্গে বলে,
— আমি তোমাকে ভালোবাসবো? এটা অসম্ভব আনতারা।
— আপনাকে আমি কার কাছে চাইছি জানেন? মহান রবের কাছে। মানুষ বলে অসম্ভব আর আমার রব বলেন কুন ফায়া কুন।
— তুমি বোধ হয় জানো না, দুইজনের মোনাজাত এক হলে তবেই কবুল হয়। তুমি আমাকে চাইলেও আমি তো তোমাকে চাইছি না।
— মহান রব চাইলে আপনিও চাইতে কতক্ষণ?
— হচ্ছে না আনতারা।
— ইনশাআল্লাহ, আল্লাহ আমাকে একটা সুখের পূর্ণ সংসার দিবেন।
ইফরাদ মোবাইল থেকে দৃষ্টি সরিয়ে ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করে,
— পূর্ণ মানে? তুমি কি বাচ্চাকাচ্চার কথা বলছো?
আনতারা মুচকি হেসে বলে,

— আমি পূর্ণতা চাইছি। আল্লাহ বাকিটা বুঝে আমাকে দিয়ে দিবেন। আমি আল্লাহর অবুঝ বান্দা, নিজের ভালো খারাপ সব বুঝি না। আল্লাহ যদি নিজে ভেবে আমাকে পূর্ণতা দান করেন, তাহলে আমার জীবনে আর কোনো অপূর্ণতা থাকবে না।
ইফরাদ আর কিছু বলে না। তার ইচ্ছে করে না কথাটা আর বাড়াতে। সে আবার ফোনে মন দেয়। আনতারা উঠে দাঁড়িয়ে আবার নামাজের নিয়ত করে। নামাজ শেষ হলে জায়নামাজে বসে তসবিহ পড়তে থাকে। এদিকে ইফরাদ কিছুক্ষণ ফোন চালানোর পর আর ভালে লাগছে না ফোন চালাতে। ইন্টারেস্টিং কিছু পাচ্ছে না ফোনে। সেজন্য ভাবে গান শুনবে। গান শুনলে ভালো লাগবে ভেবে সে এয়ারপড কানে লাগিয়ে শুয়ে পড়ে। চোখ বন্ধ করে বাম হাত মাথার নিচে রেখে গান শুনতে থাকে। এয়ারপডে গান বাজছে,

— Muntazair hain yaar ke
Hain deewane pyaar ke
Phir bhi tum ko chahoon har dafa
Aalam e tanhayi hai
Teri yaad aayi hai
Us pe sitam hum huye khafa
জায়নামাজে বসে থাকা আনতারা তাকিয়ে দেখে, ইফরাদ হয়তো ঘুমিয়ে যাচ্ছে। না খেয়েই শুয়ে পড়েছে। এটা ভেবেই আনতারার মায়া লাগে। এতবড় রাত অথচ না খেয়ে ঘুমিয়ে যাচ্ছে? আনতারা তসবিহ হাতে নিয়েই উঠে এসে আলতো করে ইফরাদের পাশে বসে। তসবিহ ঘোরাতে থাকে। তসবিহ থামার জায়গা এখনো আসেনি। একসময় তসবিহ থামার জায়গা এলে আনতারা তসবিহ পড়া থামিয়ে নরম গলায় ডাকে ইফরাদকে,

— শুনছেন?
কোনো সাড়া আসে না। আনতারা আবার ডাকে,
— শুনছেন?
তবুও নড়াচড়া নেই। এবার আনতারা ইফরাদের মাথার নিচে রাখা হাতটা আলতো ছুঁয়ে আবার ডাকে,
— এই শুনছেন?
গান আর এয়ারপডে ডুবে থাকা অবস্থায় হঠাৎ স্পর্শ লাগতেই ইফরাদ চোখ খুলে ফেলে। তাকিয়ে দেখে আনতারা। ইফরাদ জিজ্ঞেস করে,
— কি?
ইফরাদ তাকিয়েছে দেখে আনতারা বলে,
— আপনি কি ঘুমিয়ে যাচ্ছেন?
কানে এয়ারপড থাকায় ইফরাদ শুনতে না পায় না। সে ডান কান থেকে এয়ারপড খুলে আবার জিজ্ঞেস করে,

— কি?
এতক্ষণে আনতারা খেয়াল করে যে ইফরাদের কানে এয়ারপড ছিল। তখন আনতারা আবার জিজ্ঞেস করে,
— আপনি কি কাজ করছিলেন?
— না।
— ওহ।
— কোনো কাজ আছে?
— না।
ইফরাদ আবার এয়ারপড কানে দিতে যাচ্ছিল। ঠিক তখনি আনতারা হালকা কৌতূহল নিয়ে বলে উঠে,
— এটা কানে লাগিয়ে কি করছেন?
ইফরাদ এয়ারপড কানে লাগিয়ে ফেলায় আনতারার কথা শুনতে পায় না। তাই আবার খুলে জিজ্ঞেস করে,

— কিছু বলেছো?
আনতারা আবার বলে,
— হুম। কি করছেন?
ইফরাদ শান্ত গলায় বলে,
— গান শুনছি।
আনতারা হালকা স্বরে বলে,
— ওহ।
— হুম।
বলে ইফরাদ আবার এয়ারপড কানে লাগিয়ে চোখ বন্ধ করে গান শুনতে থাকে। কিছুক্ষণ পর আনতারা আবার জিজ্ঞেস করে,
— গান কেন শুনছেন?
এবারও এয়ারপড কানে থাকায় ইফরাদ কিছুই শুনতে পায় না। আর চোখও বন্ধ ছিল ইফরাদের। আনতারা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। ঠোঁট চেপে ভাবে, বারবার ডাক দেওয়ায় কি বিরক্ত হবে? তারপরও আবার ডাক দেয়। তবে এবার আর মুখে কিছু না বলে আলতো করে ইফরাদের হাতটা নাড়ে। এতে ইফরাদ বিরক্ত হয়ে চোখ খুলে তাকায়। তারপর এয়ারপড খুলে বলে,

— আবার কি হয়েছে?
— গান শুনছেন কেন?
ইফরাদ হালকা বিরক্তি নিয়ে বলে,
— গান মানুষ কেন শুনে মাই জানা?
আনতারা সরাসরি জিজ্ঞেস করে,
— কেন শুনে?
ইফরাদ শ্বাস ফেলে বলে,
— রিল্যাক্স ফিল করার জন্য। বেটার ফিল করার জন্য। মুড ভালো করার জন্য। তুমি কখনো গান শুনোনি?
— না।
ইফরাদ তখন একটা এয়ারপড এগিয়ে দিয়ে বলে,
— নাও শুনে দেখো। একদম রিফ্রেশিং লাগবে। সব ক্লান্তি দূর হয়ে যাবে। মন খারাপ থাকলে ভালো হয়ে যাবে।
আনতারা সঙ্গে সঙ্গে না করে দেয়,

— প্রয়োজন নেই। গান শোনা হারাম। এসব হারাম শুনলে আপনার মন ভালো হয় হয়তো। কিন্তু আমার কুরআন তিলাওয়াত আর নাশিদ শুনলে মন ভালো হয়।
ইফরাদ ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করে,
— নাশিদও তো গানের মতো। তাহলে নাশিদ হালাল আর গান হারাম কেন?
আনতারা বেশ শান্ত গলায়ই বলে,
— নাশিদ হচ্ছে আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করা। এতে বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার নেই, যেটা অন্তরের কলবকে মেরে ফেলতে পারে। নাশিদে যিনার দিকে ঝুঁকে পড়ার ঝুঁকি নেই। এতে আল্লাহর প্রতি প্রেম প্রকাশ পায়। আর গানে বিবাহ বহির্ভূত প্রেমিক-প্রেমিকার প্রেম প্রকাশ পায়, যেটা সম্পূর্ণ হারাম। নাশিদে ইমান ক্ষতিগ্রস্ত হয় না। আর গান অনেকটা মদের মতো, মানুষের অন্তরের তাকওয়া ধীরে ধীরে নষ্ট করে দেয়। নিয়মিত গান শুনলে অন্তর থেকে ইমান ও তাকওয়া মুছে যায়।
ইফরাদ এবার উঠে বসে। বাম কান থেকেও এয়ারপড খুলে ফেলে। তারপর বলে,

— ওকে, একটা নাশিদ গেয়ে শোনাও।
আনতারা অবাক হয়ে বলে,
— আমি?
ইফরাদ স্বাভাবিকভাবেই বলে,
— হুম। পারো না তুমি? জীবনে তো অনেক নাশিদ শুনেছো, তাই না? শুনি আমিও নাশিদ কেমন?
— আচ্ছা।
আনতারা নাশিদ গাওয়ার প্রস্তুতি নেয়। হাতে থাকা তসবিহটা রেখে নিজের থ্রি-পিস ঠিক করে নেয়। একটু অস্বস্তি লাগে তার। নাশিদ সে অনেক শুনেছে, নিজে একা গেয়েছেও, কিন্তু কারোর সামনে কখনো গায়নি। তারপর আনতারা ধীরে ধীরে নাশিদ গাইতে শুরু করে,
— আসসুবহু বাদা মিন তা-য়াল আতিহী,ওয়াল্লাইলু দাজা মিওয়াফরাতিহী।হ্যায় নুরে সাহার চেহেরে ছে তেরে,অর শব কি রওনক জুলফো ছে ।।
কানজুল কারামি মাওলান নিয়ামী,হাদিল উমামী লে শারিয়াতিহী।নেয়ামাত কা খাজিনা হ্যায় মাওলা,গাঞ্জিনায়ে রেহমাত হ্যায় আকাঁ।

গাওয়া শেষ হতেই ইফরাদ ফোনে থাকা রেকর্ডিং বন্ধ করে দেয়। আনতারা একবার চোখ তুলে ইফরাদের দিকে তাকায়। বুঝতে চায়, কেমন হলো। কেমন লেগেছে ইফরাদের কাছে? কিন্তু ইফরাদের মুখে অভিব্যক্তি দেখে কিছুই বুঝতে পারে না। আনতারা মনে মনে ভাবতে থাকে, সে কি খারাপ গেয়েছে? ইফরাদ এমন চুপ হয়ে আছে কেন? অস্বস্তি নিয়ে চুপ করে থাকে। অন্যদিকে ইফরাদ এখনো স্থির। আনতারার কণ্ঠে নাশিদ শুনে সে থমকে গেছে। এতো মধুর কণ্ঠ! এই প্রথম সে এমন কিছু অনুভব করল। প্রতিটা লাইন তাকে অদ্ভুতভাবে শান্ত করে দিচ্ছিলো। ইফরাদ বুঝতে পারে, এতদিন সে যেটাকে শান্তি ভেবেছিল, সেটা আসলে কোনো শান্তি ছিল না।
আজকের এই অনুভূতিটা আলাদা। অনেক গভীর, অনেক প্রশান্ত। ইফরাদ ভেতরটায় অজান্তেই স্বস্তি অনুভব করে। ইফরাদ চুপচাপ থাকায় আনতারা নিজেই আবার বলে,

— গান শুনবেন না ইফরাদ। এসব হারাম। যারা গান শোনে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তায়ালা তাদের কানে গরম গলিত শিশা ঢালবেন।
ইফরাদ এখনো অন্য জগতে। সে আনতারার কণ্ঠের সেই নাশিদে ডুবে আছে। ধীরে ধীরে বাস্তবে ফিরে আনতারার দিকে তাকায় কিন্তু কিছুই বলে না। ঠিক তখনি আনতারার ফোন বেজে ওঠে। ইফরাদ ফোনটা তুলে রিসিভ করে কথা বলে। ওপাশের কথা শুনতে পায় না আনতারা। আনতারা কেবল ইফরাদকে বলতে শুনে, আচ্ছা। তারপর ইফরাদ ফোন কেটে দেয়। আনতারা কৌতূহলী চোখে তাকিয়ে থাকে। সেটা বুঝে ইফরাদ বিছানা থেকে নামতে নামতে বলে,

— আমি বাইরে যাচ্ছি। আসতে লেট হবে।
আনতারা নরম গলায় জিজ্ঞেস করে,
— বেশি দেরি হবে?
— হুম।
আনতারা একটু অবাক হয়ে বলে,
— একটু আগেই তো আসলেন।
— একটু আগে কাজে ছিলাম। আর এখন ফ্রেন্ডদের সাথে আড্ডা দিবো।
আনতারা একটু থেমে জিজ্ঞেস করে,
— কেমন ফ্রেন্ড?
ইফরাদ বুঝতে পারে, আনতারা আসলে জানতে চাচ্ছে তারা ছেলে না মেয়ে। তবুও ইফরাদ সেটা ধরা না দিয়ে হালকা মজা করেই বলে,

— অবশ্যই ক্লোজ ফ্রেন্ড। সেজন্যই তো রাতে যাচ্ছি।
কথাটা শুনে আনতারার মুখটা একটু ছোট হয়ে যায়। সে আর কিছু বলে না, চুপ হয়ে যায়। ইফরাদ আলমারি থেকে কাপড় বের করতে থাকে। কাপড় বের করার পর ওয়াশরুমে গিয়ে চেঞ্জ করে আসে। ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে দেখে আনতারা এখনো আগের মতোই বসে আছে। আনতারা একবার ইফরাদের দিকে তাকায়। ইফরাদ ইচ্ছে করেই আনতারাকে উপেক্ষা করে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। চুল হাত দিয়ে ঠিক করে, শরীরে পারফিউম স্প্রে করে। তারপর ঘুরে রুম থেকে বের হতে নিলে আনতারা আর চুপ থাকতে পারে না। জিজ্ঞেস করেই ফেলে,
— সেখানে কি মেয়েরা আছে?
ইফরাদ থেমে যায়। পেছনে ঘুরে তাকায়। দেখে আনতারার চোখেমুখে স্পষ্ট ঈর্ষা। এটা দেখে ইফরাদ বেশ মজা পায়। সে বুঝতে পারে, আনতারা আসলে জেলাস। ইচ্ছে করে আনতারাকে একটু আরো রিঅ্যাক্ট করাতে।

— আমার ফ্রেন্ড সার্কেলে ছেলে মেয়ে সবাই আছে।
কথাটা এমনভাবে বলে যেন স্বাভাবিকই। যাতে আনতারা বুঝতে না পারে সে ইচ্ছে করে বলছে। কিন্তু কথাটা শুনে আনতারার মুখটা থমথমে হয়ে যায়। তবুও নিজেকে সামলে নিয়ে জিজ্ঞেস করে,
— মেয়েগুলোও বন্ধু?
— যেহেতু আমার সার্কেলের, সেহেতু ফ্রেন্ডই।
— ওহ।
— হুম। রাতে খেয়ে নিও। গেলাম।
বলেই দরজার দিকে এগোয়। রুম থেকে বের হওয়ার আগে আরেকবার আনতারাকে দেখে। আনতারা কিছু বলে কিনা। কিন্তু আনতারা চুপ থাকে। পরে ইফরাদ কোনো কথা না পেয়ে বেরিয়ে যায়। দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দের সাথে সাথে রুম নিস্তব্ধ হয়ে যায়। আনতারা একদৃষ্টিতে সামনে তাকিয়ে থাকে। সামনে রাখা তসবিহটার দিকে তার দৃষ্টি স্থির। হঠাৎই এক ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ে তসবিহের উপর। কিছু সেকেন্ড পর সে ডুকরে কেঁদে ওঠে। ভেতরের কষ্টে ভেঙে পড়ে।
বুকটা ভারী হয়ে উঠে। ইফরাদ এত রাতে অন্য মেয়েদের সাথে যাচ্ছে এটাই সে মেনে নিতে পারছে না। আনতারার মনে হয়, সে স্ত্রী হয়েও সেই জায়গাটা পাচ্ছে না। অন্য মেয়েরা তার স্বামীর জীবনে আলাদা গুরুত্ব পাচ্ছে। অথচ সে পাশে থেকেও অনেক দূরে। সে জানে, ইফরাদ এখনো তাকে পুরোপুরি স্ত্রী হিসেবে মানতে পারেনি। কিন্তু তবুও তাকে অবহেলা করে অন্য মেয়েকে গুরুত্ব দেওয়াটা তার সহ্য হচ্ছে না। সে বসে বসে কাঁদতে থাকে।

প্রতিদিন আনতারা প্রায় নয়টার দিকে খাবার খেয়ে নেয়। তারপর ঘুমিয়ে পড়ে। যদিও এই বাসায় আসার পর মাঝে মাঝে জেগে থাকতে হয় অনেক দেরী পর্যন্ত। কিন্তু আগে নিজের বাসায় থাকলে এশার নামাজ পড়ে খেয়ে ঘুমিয়ে যেত, এটা তার অভ্যাস ছিলো নবীর সুন্নত মেনে। ঠিক সেই সময় দরজায় নক পড়ে। কান্না হঠাৎ থেমে যায়। আনতারা কাঁপা গলায় আওয়াজ দেয়। ওপাশ থেকে শাহানারা জানায় খাবার নিয়ে এসেছে। আনতারা দ্রুত চোখ-মুখ মুছে নিজেকে সামলে নেয়। শাহানারাকে ভেতরে আসতে বলে। আনতারা মুখটা অন্যদিকে ফিরিয়ে নেয়, যাতে চেহারা দেখতে না পারে। চেহারা দেখলে বুঝে যাবে কান্না করেছে।
শাহানারা খাবার রেখে চলে গেলে আনতারা উঠে দরজা লাগায়। তারপর লাইট অফ করে বিছানায় এসে শুয়ে পড়ে। কমফোর্টার টেনে গায়ে জড়িয়ে নেয়। তারপর কমফোর্টারের ভেতরেই আবার কাঁদতে থাকে শব্দ করে।
কাঁদতে কাঁদতেই একসময় আনতারার চোখ লেগে আসে। আনতারা ঘুমিয়ে পড়ে।

রাত তখন সাড়ে তিনটা। ইফরাদ চাবি দিয়ে দরজার লক খুলে ভেতরে ঢোকে। ঘরে ঢুকেই দেখে রুম অন্ধকার। অর্থাৎ আনতারা ঘুমিয়ে গেছে। সে পকেট থেকে ফোন বের করে লাইট জ্বালায়। কিন্তু রুমের লাইট জ্বালায় না, কারণ আনতারার ঘুম ভেঙে যেতে পারে। মোবাইল হাতে নিয়েই দরজার কাছে দাঁড়িয়ে পায়ের জুতা খুলে ফেলে। বুট জুতা হওয়ায় শব্দ হতে পারে, তাই খুব সাবধানে কাজটা করে।
তারপর আস্তে আস্তে ভেতরে এগিয়ে যায়।
তখনি তার চোখ পড়ে সাইড টেবিলে রাখা ঢেকে রাখা খাবারের উপর। সে এগিয়ে গিয়ে ঢাকনা তোলে। দেখে খাবার একদম অক্ষত, একটুও খাওয়া হয়নি। ইফরাদ অবাক হয়। বুঝার চেষ্টা করে, এটা কার জন্য রাখা? আনতারা কি খায়নি? নাকি তার জন্য রেখেছে? প্রশ্নগুলো মাথায় ঘুরতে থাকে। এবার ইফরাদ বিছানার দিকে হালকা ঝুঁকে। কমফোর্টারের নিচে থাকা আনতারার দিকে তাকিয়ে ধীরে ধীরে কমফোর্টারটা একটু সরায়।

ঠিক তখনি ফোনের হালকা আলোয় তার চোখে পড়ে আনতারার মুখ। চোখ-মুখ ফোলা, নাক লাল হয়ে আছে। ঠোঁটগুলে লাল হয়ে শুকিয়ে আছে। ইফরাদ বুঝতে পারে আনতারা কান্না করেছে। ইফরাদের ভ্রু কুঁচকে যায়। সে আর কিছু না বলে চুপচাপ রুম থেকে বেরিয়ে নিচে কিচেনে যায়। সেখানে গিয়ে শাহানারাকে দেখতে পায়। তাকে দেখেই প্রশ্ন করে,
— রুমে কার খাবার রাখা?
শাহানারা সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দেয়,
— রুমে তো আনতারা ম্যামের খাবার দিয়ে এসেছিলাম। ওনি খাননি?
ইফরাদ কোনো উত্তর দেয় না। কিন্তু তার বুঝতে বাকি থাকে না, আনতারা খায়নি। কিন্তু আনতারা কান্না কেন করেছে? কেউ কিছু বলেছে? শার্লিন ইমরোজ কিছু বলেছে সে চলে যাওয়ার পর? এসব ভেবেই আবার জিজ্ঞেস করে,

— আমি যাওয়ার পর আনতারাকে কেউ কিছু বলেছে?
শাহানারা শান্তভাবে বলে,
— কই না তো। আপনি যাওয়ার পর তো আনতারা ম্যাম রুম থেকেই বের হননি।
— মাম্মা গিয়েছিলো রুমে?
— না।
ইফরাদের এমন মনে সন্দেহ হয়, সম্ভবত তার কোনো কথাতেই আনতারা কষ্ট পেয়েছে। তাই কেঁদেছে আর খায়ওনি। ইফরাদ এবার শাহানারাকে গম্ভীর গলায় বলে,
— আচ্ছা, রুমে এসে খাবারগুলো নিয়ে ওভেনে গরম করে দাও।
শাহানারা বলে,
— আচ্ছা স্যার।
ইফরাদ আবার রুমে ফিরে আসে। লাইট জ্বালিয়ে দেয়। পেছন পেছন শাহানারা আসে। ইফরাদ তাকে খাবার নিয়ে যেতে বলে। সে খাবার নিয়ে চলে যায়। ইফরাদ নিজের সাদা শার্টের হাতা ভাঁজ করে নেয়। তারপর ওয়াশরুমে গিয়ে হাত ধুয়ে আসে। বের হয়ে হাত মুখ মুছে আনতারার পাশে এসে দাঁড়ায়। আস্তে করে ডাকে,

— আনতারা? এই আনতারা? শুনছো?
কিন্তু অনেকক্ষণ কেঁদে ঘুমানোর কারণে ঘুমটা গভীর ছিল। কোনো সাড়া আসে না আনতারার থেকে। ইফরাদ আবার ডাকে,
— এই আনতারা? উঠো না?
এবার আনতারা একটু নড়ে ওঠে। একটু একটু করে তাকায়। চোখ কুঁচকে উঠে। ধীরে ধীরে চোখ পুরোপুরি খুলে বুঝতে পারে সামনে ইফরাদ। ঘুমের ঘোরে সে উঠে বসতেই হঠাৎই তার মনে পড়ে, সে কাঁদতে কাঁদতে ইফরাদের জন্যই ঘুমিয়ে পড়েছিল। এটা মনে পড়তেই আবার তীব্র অভিমান এসে জমে মনে। সঙ্গে সঙ্গে সে আবার শুয়ে পড়ে, চোখ বন্ধ করে নেয়। ইফরাদ সিউর হয়ে যায় আনতারা তাহলে তার উপরই অভিমান করে আছে। ইফরাদ কিছু না বলে নিজের বাম হাতটা আনতারার পিঠের নিচে ঢুকিয়ে হালকা জোরে টেনে বসিয়ে দেয় আনতারাকে। আনতারা চমকে ওঠে। সঙ্গে সঙ্গে ভ্রু কুঁচকে সরু চোখে তাকায়।
ইফরাদ শান্ত গলায় বলে,

— যাও, চোখে-মুখে পানি দিয়ে আসো।
আনতারা চোখ সরিয়ে মাথা নিচু করে বলে,
— ঘুমাবো আমি।
— আগে খাবে।
— ক্ষিদে নেই আমার।
— তারপরও খেতে হবে।
— খাবো না আমি।
বলে আনতারা আবার শুয়ে পড়তে যায়। কিন্তু ইফরাদ দুই হাতে আনতারাকে ধরে ফেলে, শুতে দেয় না।
আনতারা নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে বলে,
— ছাড়ুন।
ইফরাদ শান্তভাবেই বলে,

— যাও চোখে-মুখে পানি দিয়ে আসো।
আনতারা বিরক্ত আর অভিমান মিশিয়ে বলে,
— এসব করছেন কেন আপনি?
ইফরাদ শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করে,
— খাওনি কেন তুমি? বলেছিলাম না খেয়ে নিতে?
— ক্ষিদে লাগেনি তাই।
ইফরাদ হাতের ঘড়িতে সময় দেখে বলে,
— এখন বাজে তিনটা সতেরো। এখনো ক্ষিদে লাগেনি?
— না।
তাদের কথা চলার মাঝেই শাহানারা খাবার গরম করে নিয়ে আসে। খাবার রেখে সে চলে যায়। ইফরাদ তখন উঠে পাশ থেকে একটা চেয়ার নিয়ে আসে। আনতারার সামনে বসে প্লেট হাতে নেয়। ভাত মেখে নিতে নিতে বলে,

— খাইয়ে দিবো আমি। তারপর খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ো।
বলতে বলতেই সে ভাত মেখে ফেলে। আনতারা কোনো উত্তর দেয় না। চুপ করে বসে থাকে, নড়েও না। একদম অটল। ইফরাদ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে, তারপর খুব নরম গলায় বলে,
— আনতারা, ভাত মেখে বসে আছি।
আনতারা বলে,
— তো খেয়ে নিন না।
— তোমাকে নিয়ে খাবো বলে বসে আছি।
— আমি না খেলে কি হবে?
ইফরাদ একটু থেমে কন্ঠস্বর নামিয়ে বলে,
— তুমি না খেলে ক্ষতিটা নিশ্চয়ই আমারই হবে। নয়ত রাত তিনটায় এতক্ষণ ধরে বসে তোমাকে সাধছি কেন?
আনতারা আর কিছু বলে না। ইফরাদ আবার বলে,
— যাও।

ইফরাদের কথাটা শুনে এবার আর আনতারা চুপ করে থাকতে পারে না। সে ধীরে ধীরে বিছানা থেকে নেমে ওয়াশরুমে যায়। ইফরাদ চুপচাপ বসে থাকে। এক মিনিট পরই আনতারা মুখ ধুয়ে ফিরে আসে। এসে ইফরাদের সামনে বসে। ইফরাদ এক লোকমা তুলে আনতারার মুখের সামনে ধরে। আনতারা তাকিয়ে থাকে ইফরাদের দিকে। ইফরাদ চোখের ইশারায় বুঝায়, খাও। আনতারা ধীরে ধীরে লোকমাটা মুখে নেয়। চিবোতে থাকে, কিন্তু গিলতে কষ্ট হয়। গলায় আটকে থাকা কষ্টটার কারণে খাবার নামতেই চাচ্ছে না।
আনতারার মনে এখনো ঘুরছে, ইফরাদ তার মেয়ে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতে গেছে। ইফরাদ একদম শান্ত চোখে আনতারার দিকে তাকিয়ে থাকে। মাথায় তার প্রশ্ন ঘুরছে, আনতারা কেন কেঁদেছে? কি কারণে এতো গাঢ় অভিমান? শেষে আর চেপে রাখতে পারে না, ইফরাদ নরম গলায় জিজ্ঞেস করেই ফেলে,

— কেঁদে ঘুমিয়েছো?
আনতারা অভিমানী গলায় নিচু স্বরে বলে,
— না।
ইফরাদ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। আনতারার দিকে তাকিয়ে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে। আনতারার মুখে এখনো স্পষ্ট অভিমান। ইফরাদ শান্ত গলায় বলে,
— কি হয়েছে আনতারা? বলো আমাকে?
আনতারা লোকমা চিবোনো থামিয়ে দেয়। নিচু করে রাখা চোখ তুলে ইফরাদের দিকে তাকায়। তারপর আস্তে করে জিজ্ঞেস করে,
— আপনার মেয়ে বন্ধুগুলো খুব কাছের আপনার?
কথাটার মধ্যে চাপা কষ্টটা স্পষ্ট। এতক্ষণ ধরে জমে থাকা অভিমানটা একসাথে বের হয়ে এসেছে। কথাটা জিজ্ঞেস করতে গিয়ে আনতারার চোখ হালকা চিকচিক করে ওঠে, কিন্তু সে দ্রুত সেটা আড়াল করতে চায়। ইফরাদ বুঝতে পারে বিষয়টা কি নিয়ে। তবে এটা বুঝতে পেরে একটু থমকে যায়। বাইরে যাওয়ার আগে মজা করে আনতারাকে জ্বালানোর জন্যই এসব বলেছিল, এটা এত দূর গড়াবে, সে ভাবেনি। আনতারা যে কষ্ট পেয়ে খায়ওনি, এটা ভেবে খারাপ লাগে।
ইফরাদ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,

— আমি রাতে আমার একটা ছেলে ফ্রেন্ডের বাসায় পার্টিতে গিয়েছিলাম। কোনো মেয়ে ফ্রেন্ডের সাথে আড্ডা দেইনি।
আনতারা একটু অবাক হয়ে মাথা তোলে কিন্তু পরক্ষণেই আবার নিচু করে ফেলে। তার বিশ্বাস হয় না। মনে করে, ইফরাদ কেবল রাগ ভাঙানোর জন্য মিথ্যে বলছে। আনতারা চুপ করে আছে দেখে ইফরাদ বুঝে যায় আনতারা তাকে বিশ্বাস করছে না। সে প্লেটটা এক হাতে ধরে হালকা উঠে দাঁড়িয়ে বাম হাত দিয়ে পকেট থেকে ফোন বের করে আনতারার দিকে এগিয়ে দেয়।
— এই নাও। আমার ফোনে আয়ুষ একটা নাম্বার আছে কিংবা রোশান। কল দিয়ে জিজ্ঞেস করো আমি ওখানে কাদের সাথে ছিলাম।
আনতারা তবুও অনাগ্রহ দেখায়। ইফরাদ আবার বলে,
— আচ্ছা আমিই কল করে তোমাকে শুনাচ্ছি।
বলেই সে ফোন আনলক করে ডায়ালে গিয়ে কল লাগাতে নিবে তখনি আনতারা ভার গলায় বলে উঠে,

— লাগবে না প্রমাণ আমার।
ইফরাদ চোখ সরু করে তাকায়। তারপর বলে,
— এই নিরবতার হরতাল মানা যাচ্ছে না। তার চেয়ে প্রমাণ পেয়ে আগের মতো হও।
আনতারা আগের মতোই উত্তর দেয়,
— আগের মতো হবো আবার কি? আমি তো আগের মতোই আছি।
ইফরাদ ভ্রু কুঁচকে বলে,
— তুমি এতো চুপ করে থাকো অন্যসময়?
আনতারা সঙ্গে সঙ্গে বলে,

— তাহলে আমি বেশি কথা বলি? অবশ্যই বলিই তো। শুধু আমিই তো বলি। আপনার তো সময় নেই আমার সাথে কথা বলার। আপনার সব সময় ফ্রেন্ড আর বাকিসব কিছুর জন্য।
শেষের কথাটা আনতারা তাচ্ছিল্য মিশিয়ে বলে। ইফরাদ যথেষ্ট শান্ত থেকে ধীর গলায় বলে,
— এতক্ষণ আমি কার সাথে কথা বলছি? ভুতের সাথে? না ভুত না, আমি একটা বোকা মেয়ের সাথে কথা বলছি। আচ্ছা থাকো।
বলে ইফরাদ প্লেটটা সাইড টেবিলে রেখে ওয়াশরুমে চলে যায়। ইফরাদের এমন ব্যবহারে আনতারা আবারো কষ্ট পায়। ইফরাদ তার উপর বিরক্ত হচ্ছে? চোখ আবার ভিজে আসে আনতারার। সে কান্না চেপে শুয়ে পড়তে যায়, ঠিক তখনি ইফরাদ ওয়াশরুম থেকে বের হয়। এসেই হঠাৎ করে আনতারাকে কোলে তুলে নেয়। সবকিছু এত দ্রুত হয় যে আনতারা কিছুই বুঝে উঠতে পারে না। ইফরাদ আনতারাকে কোলে নিয়ে বিছানায় বসে নিজের বাম পায়ের উরুতে বসায়। তারপর আবার প্লেটটা হাতে নেয়। লোকমা মাখাতে মাখাতে নরম গলায় বলে,

— সবকিছুর জন্য সরি। যা করেছি আর যা করি নাই এবং যেগুলো জানিও না, সেসব কিছুর জন্য সরি। আর আজকে সারারাত ঘুমাবো না, কথা বলবো। এখন অন্তত হরতাল ভাঙো?
এক মুহূর্ত আগে যে মেয়েটা কষ্টে অভিমানে কাঁদবে এমন অবস্থায় ছিল, সে এখন লজ্জায় পড়ে গেছে। কোলে বসে এমন পরিস্থিতিতে পুরোপুরি অপ্রস্তুত। গালদুটো লাল হয়ে ওঠে। কিন্তু খারাপ লাগে না বরং মনে হয় অভিমানটা আস্তে আস্তে গলে যাচ্ছে। ভেতরে ভেতরে অনুভব করে তার নিরব হরতাল ভেঙে গেছে। তার খুব ইচ্ছে করে এই মুহূর্তে ইফরাদের বুকে মিশে যেতে। একদম আদুরে হয়ে যেতে। লজ্জায় আনতারার মুখটা আরো লাল হয়ে যায়। যেটা ইফরাদ খেয়াল করে বুঝে ফেলে, বরফ গলছে।
ইফরাদ আনতারার মুখে আবার লোকমা তুলে দেয়। এবার আনতারা বাধ্য মেয়ের মতো লোকমাটা মুখে নেয়। খাবার চিবোতে চিবোতে বলে,

— আপনি খান না?
ইফরাদ ভ্রু উঁচিয়ে হালকা খোঁচা মেরে জিজ্ঞেস করে,
— রাগ তাহলে ভেঙেছে?
আনতারা লজ্জা পেয়ে বলে,
— আমি রাগ করেছিলাম না।
— উমমমমমম! দেখেছি আমি। কে রাগ করে ছিলো না।
বলে ইফরাদ নিজেও খেতে শুরু করে। সাথে সাথে আনতারাকেও খাওয়াতে থাকে। আনতারা চার পাঁচ লোকমা খেয়ে থেমে যায় আর খেতে চায় না। কিন্তু ইফরাদ জোর করে তাকে খাওয়ায়। খাওয়া শেষ হলেও আনতারা ইফরাদের কোলে বসেই থাকে। প্লেট হাতে নিয়েই ইফরাদ বসে থাকে, তবে সেদিকে আনতারার খেয়ালই নেই। হঠাৎ করে ইফরাদ মজা করে বলে,
— কোলে করে নিয়ে গিয়ে ওয়াশরুমে হাত ধুবো?
কথাটা শুনে আনতারার খেয়াল হয়, সে তো এখনো ইফরাদের কোলে বসে আছে, আর ইফরাদ এখনো এঁটো হাতে বসে আছে। ইফরাদ হাত ধুতে যাবে। আনতারা দ্রুত মাথা নাড়িয়ে না সূচক ইশারা করে কোল থেকে নেমে পড়ে। লজ্জায় তার মাথা নিচু হয়ে যায়, আর আঙুল দিয়ে আরেক আঙুল খুঁটতে থাকে।
ইফরাদ প্লেটটা সাইড টেবিলে রাখতে রাখতে দুষ্টামি করে বলে,

— হাত ধুয়ে এসে আবার কোলে নিচ্ছি।
আনতারা লজ্জায় গুটিয়ে যায়। মাথা নিচু করে থাকে।
ইফরাদ মনে মনে বেশ মজা পায়। আনতারাকে লজ্জা দিতে, জ্বালাতে তার ভালোই লাগে। রাতে বাইরে যাওয়ার সময়ও তো ইচ্ছে করেই ওসব বলে আনতারাকে জ্বালিয়েছিল। কিন্তু বোকা মেয়ে সেগুলো সিরিয়াসভাবে নিয়ে কেঁদেকেটে একাকার। ইফরাদ ওয়াশরুমে হাত ধুতে চলে গেলে, আনতারা তাড়াতাড়ি করে পানি খেয়ে বেডে এসে শুয়ে পড়ে। যাতে ইফরাদ ফিরে এসে আর তাকে লজ্জা দিতে না পারে। ইফরাদ হাত ধুয়ে ফিরে এসে দেখে আনতারা শুয়ে আছে।
সে গ্লাসে পানি ঢালতে ঢালতে আবার টিজ করে বলে,
— কি হলো শুয়ে পড়লে কেন? কোলে উঠবে না? কথা বলবে না?
আনতারা কমফোর্টার দিয়ে মুখ ঢেকে শুয়ে থাকে। নিচু স্বরেই বলে,

— শুয়ে পরুন, রাত হয়েছে।
— এখন শুয়ে পড়লে আবার কালকে হরতাল করে বসে থাকবে। রাতে কথা বলিনি, কোলে নেইনি।
আনতারার লজ্জায় মুখ গরম হয়ে যায়। সে কমফোর্টারের ভেতর থেকেই বলে,
— আল্লাহ দোহাই, ঘুমিয়ে পড়ুন। আর আমাকেও ঘুমাতে দিন। রাত হয়েছে অনেক।
ইফরাদ ভ্রু তুলে জিজ্ঞেস করে,
— গ্যারান্টি দিচ্ছো হরতাল করবে না?
আনতারা কিছুক্ষণ চুপ থেকে ধীরে বলে,
— না।
ইফরাদ মুচকি হেসে বলে,
— আচ্ছা।
তার এসব দুষ্টুমি আনতারার সাথে করতে ভালোই লাগে। ইফরাদ লাইট অফ করে এসে শুয়ে পড়ে। কিন্তু বালিশে মাথা রাখতেই বুঝতে পারে বালিশ ভিজে আছে।
ইফরাদ সঙ্গে সঙ্গে উঠে বসে বলে,

— বালিশ একদম ভিজিয়ে ফেলেছো। এটা আবার ইচ্ছে করে করোনি তো? আমাকে শাস্তি দেওয়ার জন্য?
আসলে আনতারা কান্না করতে করতে ইফরাদের বালিশেই ঘুমিয়ে পড়েছিল, তাই ভিজে গেছে। আনতারা কমফোর্টার থেকে মুখ বের করে মিনমিন করে বলে,
— তাহলে আমার বালিশটা নিয়ে নিন?
ইফরাদ আবার শুয়ে পড়ে বলে,
— থাক। পারবো আমি এটায় ঘুমাতে।

এরপর দুজনেই চুপ থাকে। কিছুক্ষণ পর ইফরাদ ঘুমিয়ে পড়ে। ইফরাদ ঘুমিয়ে যাওয়ার পর আনতারা খুব সাবধানে উঠে বসে। সে এতক্ষণ অপেক্ষা করছিল, ইফরাদ ঘুমালে তবেই উঠবে। কারণ ইফরাদের সামনে সে কখনো তাহাজ্জুদ পড়ে না। এমনকি কারো সামনেই না। ছোটবেলা থেকেই সে এই নামাজটা গোপনে পড়ে আসছে। এটা তার একান্ত আল্লাহর সাথে সম্পর্কের ইবাদত, যা কেউ জানে না। সে খুব সাবধানে ওয়াশরুমে গিয়ে অজু করে আসে। তারপর জায়নামাজ বিছিয়ে দাঁড়িয়ে যায়। দুই রাকাআত করে মোট আট রাকাআত তাহাজ্জুদ নামাজ পড়ে। সময় খুব বেশি নেই, কারণ একটু পরেই ফজরের আজান হয়ে যাবে।

অন্যদিন সে আরো আগেই ওঠে, কিন্তু আজ কান্নার কারণে দেরি হয়ে গেছে। নামাজ শেষ করে আনতারা দুই হাত তুলে দীর্ঘ সময় ধরে মোনাজাত করে। মোনাজাতের মাঝেই ফজরের আজান শুরু হয়। আনতারা মোনাজাত শেষ করে আবার নামাজে দাঁড়িয়ে যায়। দুই রাকাআত সুন্নত, তারপর দুই রাকাআত ফরজ আদায় করে। নামাজ শেষে বসে তসবিহ পড়তে থাকে, ৩৩ বার সুবহানাল্লাহ, ৩৩ বার আলহামদুলিল্লাহ, ৩৪ বার আল্লাহু আকবার। তারপর একবার আয়াতুল কুরসি পড়া শেষে জায়নামাজ ছেড়ে বেডে ইফরাদের পাশে এসে বসে। সূরা ফাতিহা একবার এবং সূরা ইখলাস তিনবার তিলাওয়াত করে সামান্য ঝুঁকে ইফরাদের মুখ ও বুকে ফুঁ দেয়। কাজটা খুবই সতর্কের সাথে করে যেন ইফরাদের ঘুম না ছুটে। ফুঁ দেওয়া শেষে বেড থেকে নেমে বারান্দার কাঁচের সামনে থাকা পর্দাটা সরিয়ে দেয়। ফলে সকালের আলো সারা রুমে রুমে ছড়িয়ে পড়ে।
তারপর বুকস্ট্যান্ড থেকে কুরআন শরীফ নিয়ে পড়তে বসে। কিছুক্ষণ কুরআন পড়ার পর কুরআন আবার যথাস্থানে রেখে দেয়। জায়নামাজ ভাঁজ করে তুলে রাখে।

রুহআবিষ্ট তুমি পর্ব ১৩

এরপর চুপচাপ এসে আবার বিছানায় শুয়ে পড়ে, ইফরাদের পাশে, বাম দিকে। ইফরাদ তখনো ঘুমিয়ে আছে, মুখটা তার দিকে ঘোরানো। আনতারা শুয়ে শুয়ে তাকে দেখতে থাকে। আর মিটমিট করে হাসতে থাকে। একটু আগে ইফরাদের কথাগুলো আর দুষ্টামিগুলোই হাসির কারণ। চেয়ে থাকতে থাকতে একসময় আনতারার চোখও লেগে আসে।

রুহআবিষ্ট তুমি পর্ব ১৪