রুহআবিষ্ট তুমি পর্ব ১৪ (২)
অধরা মিনহা
বেলা এখন সন্ধ্যা। শেখ বাড়ির ড্রয়িংরুমে সোফার ওপর পা তুলে পাশাপাশি বসে ফোন চালাতে ব্যস্ত রাবেয়া মল্লিকা আর আনাবি। ফোন স্ক্রল করতে করতেই হঠাৎ আনাবির সামনে একটা ডায়মন্ডের ইয়ার রিংয়ের ছবি ভেসে উঠে। এক নজর দেখেই সেটা তার ভীষণ পছন্দ হয়ে গেল। পাশেই বসে থাকা রাবেয়া মল্লিকার দিকে ফোনটা বাড়িয়ে দিয়ে বলে,
— আম্মু, আমার ডায়মন্ডের ইয়ার রিং লাগবে। এটা আমার অনেক পছন্দ হয়েছে। ছবিটা তোমাকে পাঠিয়ে দিচ্ছি। তুমি আব্বুকে দিয়ে এনে দিও।
রাবেয়া মল্লিকা নিজের ফোন থেকে চোখ সরিয়ে আনাবির ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকালেন। ডায়মন্ডের ইয়ার রিং জোড়া একবার দেখে তেমন কোনো আগ্রহ দেখালেন না। আবার নিজের ফোনের দিকে চোখ ফিরিয়ে নিয়ে বলেন,
— ডায়মন্ড দিয়ে কী হবে? ওগুলো কি বিক্রি করা যায় নাকি? স্বর্ণ কিন। বিপদের সময় কাজে লাগবে।
কথাটা শুনে আনাবির বিরক্ত লাগে। মানুষ কি শখের জিনিস কিনে বিক্রি করার জন্য? আর মানুষ টাকা উপার্জনই বা কেন করে? নিজের শখ-আহ্লাদ পূরণ করার জন্যই তো! কিন্তু শখ পূরণ করতে গিয়েও যদি বারবার শুধু টাকার হিসাবই করতে হয়, তাহলে সেটা কতটা বিরক্তিকর! আনাবি দুইদিকে মাথা নেড়ে বলে,
— না, আমার ডায়মন্ডই লাগবে। স্বর্ণ তো তোমার যথেষ্ট আছে। সেগুলো তো আমারই। আর এখন তো আনতারাও নেই। ওর মার স্বর্ণগুলোও তো আমারই!
কথাটা শুনেই রাবেয়া মল্লিকার মুখটা কুঁচকে গেল। বিরক্ত গলায় বলেন,
— ওই আপদের নাম মুখে আনিস না। আল্লাহ আমাদের ওই নষ্টটার কাছ থেকে মুক্তি দিয়েছে।
আনাবি কপাল কুঁচকে ভাবতে ভাবতে নলে,
— আচ্ছা আম্মু, এই আনতারাটা কোথায় গেছে বলো তো?
রাবেয়া মল্লিকা ঠোঁট বাঁকিয়ে বলেন,
— আমি কি করে জানব? দেখিস, গোপনে গোপনে ঠিকই কোনো ভাতার জুটিয়ে রেখেছিল। হয়তো এখন তার কাছেই আছে।
আনাবি অনিশ্চিত গলায় বলে,
— কী জানি!
রাবেয়া মল্লিকা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন,
— উনিশটা বছর সংসার করার পর আজ একটু শান্তি পেলাম। কী জ্বালিয়েছে, কী পুড়িয়েছে শয়তানটা!
এ কথা শুনে আনাবি মায়ের দিকে চোখ সরু করে তাকিয়ে বলে,
— মিথ্যা বলছ কেন? উল্টো তুমি উনিশটা বছর আনতারাকে জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে কাজ করিয়ে খাঁটিয়ে মেরেছো!
কথাটা শুনেই রাবেয়া মল্লিকা তেতে উঠেন।
— তুই কি আমার মেয়েই? অবশ্য তোর শরীরে তো তোর বাপেরই রক্ত! এই রক্তেই দোষ আছে। এই রক্তের মানুষের জন্য যতই করি না কেন, শেষে ঘুরে ফিরে আমিই খারাপ হয়ে যাই। বুঝবি, বুঝবি! একদিন ঠিকই বুঝবি মা কি জিনিস! দেখিস না? আনতারার মা নেই, তাই ওর খোঁজ নেওয়ারও কেউ নেই। বাপরা এসব মনে রাখে না, বুঝেছিস? আমি মরে গেলে তোর বাপ তৃতীয় বিয়েও করে ফেলত! আর তারপর তুই লাথি উষ্ঠা খেয়ে থাকবি সৎমার!
আনাবি বিরক্ত হয়ে বলে,
— হয়েছে আম্মু। মাফ করো। আর বলব না।
কিন্তু রাবেয়া মল্লিকার রাগ কমেনি। তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে বসে থাকেন। মনের ভেতরটা আরো বেশি জ্বলে উঠেছে। এই মেয়ের জন্যই তো তিনি এত কিছু করেছেন। অথচ সেই মেয়েই আজ তাকে শুনিয়ে দিলো কথায় কথায় সে খারাপ? তার কি আর কোনো মেয়ে আছে? সত্যিই, সন্তান বড় হয়ে গেলে মা-বাবার ত্যাগের কথা আর মনে রাখে না।
আনাবি আর কোনো কথা না বলে আবার ফোনে মন দেয়।ঠিক তখনি কলিংবেল বেজে উঠে। রাবেয়া মল্লিকা ভারী গলায় বলেন,
— যা, দরজাটা খুলে আয়।
আনাবি বিরক্ত হয়ে বলে,
— মানুষ আসার আর সময় পায় না? বিরক্তিকর! একটু শান্তি মতো বসতেও পারি না।
সঙ্গে সঙ্গে রাবেয়া মল্লিকা একটু আগের কথারই শোধ তুললেন।
— সারাদিন করিসটাই বা কী? কোনো কাজই তো করিস না। এখন একটু দরজা খুলতে গিয়েই তোর শান্তি নষ্ট হয়ে গেল?
আনাবি আর এই কথার পাল্টা জবাব দেয় না। এমনিতেই একটু আগে কথা বাড়িয়ে মাকে আরো রাগিয়ে দিয়েছে।
এখন আবার কথা বাড়ানোর কোনো মানে হয় না। নইলে হয়তো কাল সন্ধ্যার আগ পর্যন্ত রাবেয়া মল্লিকার চিৎকার চেচামেচি থামানো যাবে না। আনাবি গিয়ে দরজা খুলে। দরজা খুলতেই সামনের মানুষটাকে দেখে থমকে যায়। চোখ বড় বড় হয়ে গেল, মুখও হা হয়ে রইল। এই মুহুর্তে তাকে আশা করেনি। আনাবির অবস্থা দেখে সামনের ছেলেটা হেসে বলে,
— কী হলো? হা করে তাকিয়ে আছিস কেন? খুশি হসনি?
আনাবির বুক ধকধক করতে লাগল। চিন্তিত গলায় বলে,
— তুমি….কখন এলে?
ছেলেটা হেসেই উত্তর দেয়,
— আজকেই। এখন ভেতরে ঢুকতে দিবি? বাকি কথা ভেতরে এসে বলতে দে?
ওদিকে রাবেয়া মল্লিকার কৌতূহল হয় কে এসেছে জানার। তাই গলা ছেড়ে জিজ্ঞেস করেন,
— কে এসেছে?
আনাবি কোনো উত্তর দেয় না। ভয় আর অস্বস্তি মিশ্রিত মুখে ধীরে ধীরে সরে দাঁড়ায় দরজার সামনে থেকে। ছেলেটা ভেতরে ঢুকে মুচকি হেসে দাঁড়াতেই রাবেয়া মল্লিকা তাকিয়ে চমকে উঠেন। সাথে সাথে বসা থেকে দাড়িয়ে পড়েন।
— সাদমান! তুই কবে এসেছিস?
এদিকে আনাবি প্রাণপণ চেষ্টা করছে নিজেকে স্বাভাবিক রাখার। কিন্তু বুঝতে পারছে একটু পরেই পরিবেশ আর স্বাভাবিক থাকবে না। আনাবি দরজা বন্ধ করে এসে সাদমানের থেকে দূরে গিয়ে দাড়ায়। সাদমান একবার আনাবির দিকে তাকায় আবার রাবেয়া মল্লিকার দিকে।
তারপর ভ্রু কুঁচকে বলে,
— তোমরা কি খুশি হওনি আমি আসাতে?
কথাটা শুনে রাবেয়া মল্লিকা জোর করে হাসলেন। দ্রুত এগিয়ে গিয়ে সাদমানের দুই গাল ধরে আদর করে বলেন,
— খুশি হব না আমার বাপ আসাতে? আমার বাপটাকে পাঁচ বছর পর দেখছি!
আনাবিও জোর করে হাসি ফুটিয়ে বলে,
— আসলে আমরা শকড! না বলে হঠাৎ জার্মানি থেকে চলে আসলে?
রাবেয়া মল্লিকাও অবাক হয়ে বলেন,
— হ্যাঁ, আপাও তো আমাকে জানায়নি তুই এসেছিস!
সাদমান হেসে বলে,
— আম্মুও জানতো না। বিকেলের দিকে বাংলাদেশে এসেছি। তারপর আম্মুকে মানা করেছিলাম জানাতে। তোমাকে সারপ্রাইজ দেব বলে।
রাবেয়া মল্লিকা হেসে আনাবির দিকে তাকিয়ে বলেন,
— দেখেছিস? ছেলে কত পাজি!
আনাবি হেসে বলে
— আম্মু, ভাইয়াকে বসাও না।
— হ্যাঁ, আয় বস।
রাবেয়া মল্লিকা সাদমানকে নিয়ে এসে সোফায় বসায়। এরপর আনাবি আর তিনিও এসে পাশে বসেন। সাদমান রাবেয়া মল্লিকাকে জিজ্ঞেস করেন,
— আঙ্কেল কোথায়?
— উনি ব্যবসার কাজে একটু ইন্ডিয়া গেছেন।
— ওহ আর বাকিরা কোথায়?
কথাটা বলেই চারদিকে চোখ বুলাতে থাকে। যদি মনের মানুষটার এক ঝলক দেখ মিলে। যদিও কখনো সেই সুযোগ পায়নি। প্রশ্নটা রাবেয়া মল্লিকা বুঝলেও না বোঝার ভান করে বলেন,
— আর কে থাকবে?
সাদমান এবার লজ্জা পেয়ে হালকা করে ঘাড় চুলকে আনাবির দিকে তাকিয়ে বলে,
— আনতারা?
আনাবি দুইদিকে মাথা নেড়ে বলে,
— নেই।
সাদমান অবাক হয়ে হয়। পরক্ষণেই হালকা হেসে বলে,
— নেই মানে? কোথাও গেছে?
রাবেয়া মল্লিকা ঠোঁট বাঁকিয়ে বলেন,
— চলে গেছে। মুখপুড়িটা আমাদের মুখ কালো করে!
সাদমানের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
— মানে? কী বলছো, খালামনি? কোথায় চলে গেছে আনতারা?
রাবেয়া মল্লিকা দীর্ঘশ্বাস ফেলে দুঃখী মুখ করে বলেন,
— সে অনেক লম্বা কথা। তোকে কী বলব!
— প্লিজ, বলো খালামনি।
রাবেয়া মল্লিকা বিরক্ত গলায় বলেন,
— উপরে উপরে ফরেজগার সাজলেও ভেতরে একটা নষ্ট মেয়ে ছিল! ওই নষ্টটার কারণে আমাদের মান-সম্মান কিছুই রইল না।
সাদমান ভ্রু কুঁচকে কিছুটা জোরেই বলে,
— গালি দিচ্ছ কেন?
— গালি দেওয়ার মতো কাজই করেছে! তুইও দিবি, আগে শোন।
— প্লিজ, তাড়াতাড়ি বলো।
রাবেয়া মল্লিকা বলতে শুরু করেন,
— এই তো বিশ দিন আগে আনাবির আব্বু হঠাৎ করে আনাবির বিয়ে ঠিক করে তার বন্ধুর ছেলের সঙ্গে। তো বিয়ের আগের রাতে আনাবির বন্ধুরা একটা পার্টি রেখেছিল। এটা যেন কী নাম…
আনাবি বলে,
— ব্যাচেলর পার্টি।
— হ্যাঁ, ওইটাই। তো আমি কি আর আনাবিকে একা পাঠাব? ভাবলাম, আনতারাকে সঙ্গে দিই। বড় বোন যাচ্ছে, দেখেশুনে রাখবে। কিন্তু ওই নষ্ট মেয়েটা কী করলো জানিস?
সাদমান উৎকণ্ঠিত হয়ে বলে
— কী করেছে?
রাবেয়া মল্লিকা নাটকীয় ভঙ্গিতে বলেন,
— সেদিন আনাবিকে রেখে সেখান থেকে আমাদের দেশের হিরো ইফরাদের সঙ্গে…
সাদমান মাঝখানেই বলে,
— কি?!
— ওই ছেলের সঙ্গে লাইন করে রুমে চলে গেছে সেদিন রাতে। পরদিন সাংবাদিকরা হোটেলে দুজনকে একসঙ্গে ধরে ফেলে। কী বিশ্রী ঘটনা! তারপর প্রতিবেশীরা আমাদের নিয়ে যা নয় তাই বলে। এসব সহ্য করতে না পেরে ওই নষ্টাটাকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছি। কিন্তু বের করে দিলেই কি সব শেষ? আমার মেয়ের জীবনটাই তো নষ্ট হয়ে গেল! ওর এসব কাজের জন্য আনাবির বিয়েটাও ভেঙে গেছে। নিহালের পরিবার বিয়ে ভেঙে দিয়েছে।
কথা শেষ করেই রাবেয়া মল্লিকা মিথ্যা কান্নার অভিনয় শুরু করেন। অন্যদিকে সাদমান পাথর হয়ে বসে রইল। সে নিজের কানকেই বিশ্বাস করতে পারছে না। এসব সে কি শুনছে? মুহূর্তের মধ্যে তার ভেতরটা ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। পাঁচ বছর পর দেশে এসেছে সে। আর সেই আসার সবচেয়ে বড় কারণ ছিল আনতারা। তাকে হালালভাবে নিজের জীবনের সঙ্গী করার জন্যই ফিরে এসেছে। আনতারার কথা সে নিজের পরিবারকেও জানিয়েছিল। শুধু তাই না, তার খালামনি আর আনাবিও বিষয়টা জানত। এখন শুধু আনুষ্ঠানিকভাবে বিয়ে করাটাই বাকি ছিল।
কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে সাদমান নিজেকে শক্ত করে।
সে আনতারাকে চেনে। আনতারা সবসময় পরপুরুষের কাছ থেকে পর্দা করে চলেছে। কখনো কোনো পরপুরুষের সামনে যায়নি। এমনকি তার এই বাড়িতে নিয়মিত আসা-যাওয়া থাকলেও, আনতারা কখনো তার সামনে আসেনি। সবসময় পর্দা বজায় রেখেছে। তাই সাদমানও কোনোদিন আনতারাকে দেখেনি। শুধু আজ থেকে দশ বছর আগে একবার, সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত একটা ঘটনার কারণে, এক ঝলকের জন্য আনতারাকে দেখেছিল। তখন আনতারার বয়স ছিল মাত্র বারো বছর। এরপর আর কোনোদিন আনতারাকে দেখার সুযোগ হয়নি।
আনতারা এখন প্রাপ্তবয়স্ক হলেও, আনতারা দেখতে কেমন সেটাও জানে না এমনকি পরিণত বয়সে আনতারার ছায়াটুকুও দেখেনি সাদমান। তবু সেই দশ বছর আগের এক ঝলকের দেখাতেই বারো বছরের সেই মেয়েটার বুঝদার স্বভাব, পর্দাশীলতা আর ব্যক্তিত্ব সাদমানকে গভীরভাবে মুগ্ধ করেছিল। ঠিক সেদিন থেকেই আনতারার প্রতি তার মনে জন্ম নিয়েছিল এক গভীর শ্রদ্ধা ও সম্মান। আনতারা সাদমানের জীবনের একমাত্র নারী, যাকে সে সবচেয়ে বেশি সম্মান করে। এমনকি যতটা সম্মান সে আনতারাকে করে, ততটা সে নিজের মাকেও করে না।
তার দৃঢ় বিশ্বাস, আনতারা এমন কাজ কখনোই করতে পারে না। তাকে ফাঁসানো হয়েছে। কিন্তু কে ফাঁসাল? খালামনি? আনাবি? নাকি অন্যকেউ? সে একবার রাবেয়া মল্লিকার দিকে তাকায়, আবার আনাবির দিকে। সে খুব ভালো করেই জানে, এই দুজন কখনোই আনতারাকে সহ্য করতে পারত না। তার সন্দেহ আরো দৃঢ় হলো। নিশ্চয়ই ওরাই আনতারাকে ফাঁসিয়েছে। হঠাৎ সাদমান উঠে দাঁড়ায়। তার চোখ-মুখ শক্ত হয়ে গেছে। দৃঢ় কণ্ঠে বলে,
— আনতারা এমন মেয়ে না। দুশ্চরিত্রতা তো না-ই! ওর ওপর মিথ্যা অভিযোগ দেওয়া হয়েছে।
রাবেয়া মল্লিকা সঙ্গে সঙ্গে বলেন,
— আমরা নিজের চোখে দেখেছি। শুধু আমরা না, পুরো সমাজ দেখেছে!
সাদমান বিন্দুমাত্র বিচলিত হলো না। আগের মতোই দৃঢ় গলায় বলে,
— নিজের চোখে দেখলেও আমি বিশ্বাস করব না। আনতারার ওপর আমার এতটাই বিশ্বাস আছে।
রাবেয়া মল্লিকার কথাটা সহ্য হলো না। রাগ আরো বেড়ে গেলো আনতারার উপর।
— ওকে সবাই এত অন্ধভাবে বিশ্বাস করে বলেই আজ এসব করতে পেরেছে।
এই কথায় কোনো জবাব দেয় না সাদমান। উল্টো সরাসরি প্রশ্ন করে,
— আনতারা কোথায় আছে?
রাবেয়া মল্লিকা দৃষ্টি ঘুরিয়ে মুখটা ভার করে বলেন,
— ওসব আমরা জানি না।
সাদমান এবার ক্ষোভে ফেটে পড়ে,
— জানো না? একটা মেয়ে মানুষকে তোমরা বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছ! তোমরা জানো না, বাংলাদেশটা মেয়েদের জন্য কতটা নিরাপদ না? তাছাড়া আনতারার তো তোমাদের ছাড়া আর কেউ নেই। ও কোথায় আছে? কী অবস্থায় আছে?
রাবেয়া মল্লিকা নির্বিকারভাবে বলেন,
— যেমন কর্ম করেছে, তেমন হালেই থাকবে।
সাদমান শক্ত গলায় বলে,
— আমি আনতারাকে খুঁজে বের করবেই। যেভাবেই হোক। আর আনতারাকে নিজের স্ত্রীও বানাবো!
কথাটা শুনতেই রাবেয়া মল্লিকার ভ্রু কুঁচকে উঠে। বিরক্তি কপালে জমা নেয়। সাদমান আর আনতারার বিয়েতে তিনি একদমই রাজি না। ওনার এত আদরের বোনের ছেলের সাথে নিজের সতিনের মেয়ের বিয়ে দিবেন? ওনার বোনের সম্পত্তি কম নাকি? তার উপর সাদমানেরও কম টাকা না। সে জাপানে থাকে। পেশায় হার্ট সার্জন। বিয়ে করে নির্ঘাত আনতারাকেও নিয়ে যাবে। ওনার শত্রু বিদেশে গিয়ে সুখি থাকবে? এতো সুখ আনতারা কপালে থাকতে দিবেন না। কখনোই না।
সাদমান দৃঢ় কণ্ঠে বলে,
— আমি আনতারাকে খুঁজে বের করবই। যেভাবেই হোক। আর আনতারাকেই নিজের স্ত্রী বানাবো!
কথাটা শুনতেই রাবেয়া মল্লিকার ভ্রু কুঁচকে গেল। বিরক্তির ছাপ স্পষ্ট হয়ে উঠে ওনার মুখে। সাদমান আর আনতারার বিয়েতে তিনি কোনোভাবেই রাজি না। নিজের এত আদরের বোনের ছেলের সঙ্গে তিনি কি না নিজের সতিনের মেয়ের বিয়ে দেবেন? এটা তিনি কিছুতেই মেনে নিতে পারেন না। তার ওপর তার বোনের সম্পদেরও কোনো অভাব নেই। আর সাদমান নিজেও কম প্রতিষ্ঠিত না। সে জাপানে থাকে এবং পেশায় একজন হার্ট সার্জন।
বিয়ে হলে নিশ্চিতভাবেই আনতারাকেও নিজের সঙ্গে জাপানে নিয়ে যাবে। তার শত্রু বিদেশে গিয়ে সুখে-শান্তিতে সংসার করবে। এটা তিনি কিছুতেই হতে দেবেন না।
এত সুখ আনতারার কপালে তিনি কখনোই জুটতে দেবেন না। কখনোই না।
অফিস শেষ করে চৌধুরী বাড়িতে ফিরে ইফরাদ। লিভিং রুমে থেমে দাঁড়িয়ে সাফিনকে বলে,
— তুমি লিভিং রুমে বসো। আমি ফ্রেশ হয়ে আসছি।
সাফিন মাথা নেড়ে লিভিং রুমের সোফায় গিয়ে বসে। আর ইফরাদ সোজা নিজের রুমের দিকে চলে যায়। রুমে ঢুকতেই দেখে, আনতারা মাত্রই ওযু করে ওয়াশরুম থেকে বের হয়েছে।
ইফরাদকে দেখেই সে সালাম দেয়,
— আসসালামু আলাইকুম।
সালামটা শুনতেই ইফরাদের মনে পড়ে গেল আজকের অফিসের ঘটনা। আজ পুরো অফিসকে সে সালামের উত্তর দিয়ে অবাক করে দিয়েছিল। সাথে নিজেও যে বিব্রত হয়েছিলো। সাথে মেঘলার বলা কথাটাও মনে পড়ে গেল। ইফরাদ সেসব সাইডে রেখে আনতারার সালামের জবাব দেয়,
— ওয়ালাইকুমুস সালাম।
আনতারা এগিয়ে গিয়ে এক গ্লাস পানি ঢেলে ইফরাদের হাতে দিয়ে বলে,
— নিন, বিসমিল্লাহ বলে বসে খান।
ইফরাদ গ্লাসটা হাতে নিয়ে আনতারার কথামতো বিসমিল্লাহ বলে পানিটুকু খেয়ে গ্লাসটা আবার আনতারার হাতে ফিরিয়ে দেয়। আনতারা গ্লাসটা রেখে মাথার ওড়নাটা ঠিক করতে করতে আয়নার সামনে এসে দাঁড়ায়। নামাজ পড়ার জন্য ওড়নাটাই সুন্দর করে হিজাবের মতো বেঁধে নেয়, যাতে শরীর, হাত আর চুল ভালোভাবে ঢেকে যায়।
সেদিকে তাকিয়ে ইফরাদ জিজ্ঞেস করে,
— নামাজের জন্য আলাদা হিজাব নেই তোমার?
হিজাব বাঁধতে বাঁধতেই আনতারা ইফরাদের দিকে তাকিয়ে বলে,
— খিমারের কথা বলছেন?
ইফরাদ একটু ভেবে বলে,
— ওটাকে খিমার বলে? হয়তো খিমারই। নেই তোমার?
প্রশ্নটা করেই ইফরাদের হঠাৎ মনে পড়ে আনতারার থাকবে কীভাবে? সে কি কখনো আনতারার জন্য খিমার কিনে এনেছে? নাকি আনতারা একা কোথাও শপিং করতে গেছে, যে নিজেই কিনে আনবে?
আনতারা শান্ত গলায় বলে,
— না, খিমার নেই। ওড়না দিয়েই নামাজ পড়ি।
ইফরাদ মাথা নেড়ে বলে,
— হুম। মনে পড়েছে।
আনতারা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে,
— কি মনে পড়েছে?
— কিছু না।
আনতারা আর কিছু বলে না।
ওড়না দিয়ে হিজাব বাঁধা শেষ করে জায়নামাজ তুলে মেঝেতে বিছাতে বিছাতে বলে,
— আপনি পোশাক পাল্টে হাত-মুখ ধুয়ে আসুন। এর মধ্যে আমি নামাজটা পড়ে নিই। তারপর নাস্তা এনে দিচ্ছি।
ইফরাদ দাঁড়িয়ে নিজের শার্ট খুলতে খুলতে বলে,
— গ্রিক ইয়োগার্ট আর গ্রিন টি এনো। আর হ্যাঁ, গ্রিক ইয়োগার্ট উইথ ব্লুবেরিজ, স্ট্রবেরিজ অ্যান্ড আলমন্ডস।
আনতারা একটু অবাক হয়ে বলে,
— এটা কী?
ইফরাদ স্বাভাবিক গলায় বলে,
— তুমি মেইডদের বললেই বানিয়ে দেবে।
আনতারা মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়। তারপর নামাজে দাঁড়িয়ে পড়ে। ইফরাদ কাভার্ড থেকে কাপড় বের করে ওয়াশরুমে ঢুকে পড়ে। প্রায় ত্রিশ মিনিট কেটে গেল।আনতারা নামাজ পড়ে দোয়া-দরুদ পড়া শেষ। এখনো ইফরাদ ওয়াশরুম থেকে বের হয়নি। আনতারা উঠে জায়নামাজ তুলে ভাজ করে আয়নার সামনে এসে ওড়নাটা আবার সুন্দর করে হিজাবের মতো বেঁধে মুখটা ঢাকে। তারপর রুম থেকে বেরিয়ে যায়। নিচে নেমে সোজা রান্নাঘরের দিকে চলে আসে।
চৌধুরী বাড়ির কিচেন বেশ আধুনিক আর পরিপাটি। পুরো কিচেনজুড়ে সাদা রঙের থিম। দরজার ডান পাশের পুরো দেয়ালজুড়ে সারি সারি সাদা কেবিনেট। সেই কেবিনেটের মাঝামাঝি অংশে আধুনিক চুলা বসানো। ঠিক ওপরে ধোঁয়া বের হওয়ার জন্য একটি স্টাইলিশ হুড। চুলার ডান পাশে কাউন্টারের ওপর রাখা একটা স্টিলের চপিং বোর্ড।
আর বাম পাশের কেবিনেটের ওপর রাখা একটা মাইক্রোওয়েভ। রান্নাঘরের মাঝখানে বড় একটা সাদা কিচেন আইল্যান্ড। এর মাঝখানেই থালা-বাসন ধোয়ার সিঙ্ক আর পানির কল লাগানো। আইল্যান্ডের সামনে পাশাপাশি রাখা তিনটা কালো রঙের উঁচু স্টুল। আর ঠিক ওপরে ছাদ থেকে ঝুলছে দুটি কাঁচের ঝাড়বাতি।
শাহানারা তখন কিচেনে ছিল। আনতারাকে দেখেই এগিয়ে এসে বলে,
— কিছু লাগবে, ম্যাম?
আনতারা বলে,
— জি। উনি গ্রিক ইয়োগার্ট আর গ্রিন টি খেতে চাইছেন। আর গ্রিক ইয়োগার্টে ব্লুবেরি, স্ট্রবেরি আর কাঠবাদাম দিতে বলেছেন।
শাহানারা সঙ্গে সঙ্গে বলে,
— এক্ষুনি বানিয়ে দিচ্ছি।
— আচ্ছা।
আনতারা সেখানেই দাঁড়িয়ে রইল।
শাহানারা বলে,
— ম্যাম, আমি বানিয়ে রুমে গিয়ে দিয়ে আসব।
— আমি গ্রিক ইয়োগার্টটা বানানো শিখতে চাই।
শাহানারা মুচকি হেসে বলে,
— ওহ, আচ্ছা।
বলে শাহানারা ফ্রিজ থেকে গ্রিক ইয়োগার্ট, ব্লুবেরি আর স্ট্রবেরি বের করে এনে সাদা কিচেন আইল্যান্ডের ওপর রাখে। তারপর একটা বাটি, একটা চামচ আর কাঠবাদাম আনার জন্য কেবিনেটের দিকে গেল। এই ফাঁকে আনতারা টেবিলের ওপর রাখা গ্রিক ইয়োগার্টের কাপটা হাতে নেয়।
কাপটা ছিল Siggi’s ব্র্যান্ডের। এদিকে শাহানারা বাটি, চামচ আর কাঠবাদাম নিয়ে ফিরে আসে। তারপর চপিং বোর্ড আর ছুরি নিয়ে দ্রুত দক্ষ হাতে ব্লুবেরি, স্ট্রবেরি আর কাঠবাদাম কেটে ফেলে। কাজের গতি দেখেই বোঝা যায়, সে বেশ অভিজ্ঞ।
সব কাটা হয়ে গেলে Siggi’s ব্যান্ডের গ্রিক ইয়োগার্টের কাপের ঢাকনা খুলে পুরো ইয়োগার্টটা একটা বাটিতে ঢালে। তারপর কিছু ব্লুবেরি আর স্ট্রবেরি মিশিয়ে নেয়। এরপর আবার ওপর থেকে বাকি ব্লুবেরি, স্ট্রবেরি আর কাটা কাঠবাদাম ছড়িয়ে দেয়। শেষে একটা চামচও বাটির মধ্যে রেখে দেয়।
আনতারা কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করে,
— আর কিছু দেবেন না?
শাহানারা মাথা নেড়ে বলে,
— না।
এর মধ্যেই আরেকজন মেইড গ্রিন টি তৈরি করে ফেলেছে। শাহানারা একটা ট্রেতে গ্রিক ইয়োগার্ট আর গ্রিন টি সাজিয়ে আনতারার হাতে তুলে দেয়। আনতারা ট্রেটা নিয়ে উপরে নিজের রুমে চলে এল। রুমের দরজা খুলতেই দেখে, ইফরাদ শুধু ট্রাউজার পরে খালি গায়ে বিছানায় বসে আছে। ভেজা শরীর তোয়ালে দিয়ে মুছছে।আনতারা চুপচাপ গিয়ে ট্রেটা টেবিলের ওপর রেখে দেয়।
ইফরাদ আনতারাকে পুরোপুরি পরোখ করে বলে,
— বাড়িতে মেল মেইড থাকায় তোমার বাড়ির ভেতরে চলাফেরা করতে অনেক সমস্যা হয়, তাই না?
আনতারা আস্তে করে উত্তর দেয়,
— সামান্য।
আসলে আনতারা যে মুখ ঢেকে রেখেছে সেটা দেখে ইফরাদ এই কথা বলে। ইফরাদ বুঝতে পেরেছে বাড়িতে মেইল মেইড থাকাটা আনতারার জন্য অস্বস্তিকর। এর জন্য অনেক অসুবিধা হয় আনতারার। ইফরাদ কিছু একটা ভাবতে ভাবতেই তোয়ালে দিয়ে চুল মুছছে।
আনতারা এসে ইফরাদের পাশে বসে নরম গলায় জিজ্ঞেস করে,
— দুপুরে কি খেয়েছিলেন?
ইফরাদ একবার নজর আনতারাকে দেখে আবার সামনে তাকিয়ে বলে,
— কিছুই খাইনি।
— কেন? খুব কাজের মধ্যে ছিলেন?
ইফরাদ কয়েক মুহূর্ত আনতারার দিকে তাকিয়ে রইল। কি বলবে সে? কি করেছে সারাদিন? আসলে তো আজ সে কোনো কাজই করতে পারেনি। সেসব আড়াল করে তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,
— এমনিই খেতে ইচ্ছে করেনি। আর আজ কোনো কাজই করতে পারিনি।
আনতারা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে,
— কেন? কিছু হয়েছে?
ইফরাদ আনমনে বলে,
— কী জানি!
আনতারা আর বিষয়টা নিয়ে কিছু বলে না। ইফরাদ উঠে তোয়ালেটা রাখতে যাবে, তখনি আনতারা হাত বাড়িয়ে বলে
— দিন আমাকে। আমি রেখে দিচ্ছি।
ইফরাদ তোয়ালেটা আনতার হাতে দিয়ে দেয়। আনতারা সেটা জায়গায় রেখে আবার এসে আগের জায়গায় বসে।
ইফরাদ টেবিল থেকে গ্রিক ইয়োগার্টের বাটিটা হাতে নেয়। তখন আনতারা উদ্বিগ্ন গলায় বলে,
— সারাদিন কিছু খাননি। শুধু এটা খেয়ে থাকতে পারবেন?
ইফরাদ চামচ দিয়ে গ্রিক ইয়োগার্ট, ফল আর বাদাম মেশাতে মেশাতে বলে,
— এটাতে অনেক প্রোটিন।
আনতারা কৌতূহলী হয়ে বলে,
— এসব খেতে কষ্ট হয় না?
— কেন?
— এগুলো খেতে মজা লাগে?
ইফরাদ এক চামচ গ্রিক ইয়োগার্ট তুলে আনতারার মুখের সামনে ধরে বলে,
— খেয়ে দেখো।
আনতারা মুখ সরিয়ে নিয়ে বলে,
— না, দেখতেই মনে হচ্ছে মজা হবে না।
ইফরাদ হালকা হেসে বলে,
— স্বামী বিষ দিলে বিষও খেতে হয়। আর এটা তো সামান্য গ্রিক ইয়োগার্ট। নাও, একটু টেস্ট করে দেখো।
আনতারা শেষ পর্যন্ত চামচ থেকে অল্প একটু গ্রিক ইয়োগার্ট মুখে নেয়। মুখে দিয়েই তার ধারণা বদলে গেল। সে যেমনটা ভেবেছিল, ঠিক তেমন না। স্বাদটা খারাপও না, আবার অতিরিক্ত ভালোও না। মোটের ওপর বেশ খাওয়ার মতো। ইফরাদ চামচে থাকা বাকি অংশটা নিজেই মুখে দিয়ে জিজ্ঞেস করে,
— কেমন?
আনতারা ইফরাদের দিকে তাকিয়ে রইল। এই মানুষটাই তো সেদিন তার হাতে ভাত খাওয়ার আগে জিজ্ঞেস করেছিল, সে হাত স্যানিটাইজ করেছে কি না। এত খুঁতখুঁতে স্বভাবের মানুষটা আজ কোনো অস্বস্তি বা দ্বিধা ছাড়াই তার মুখ ছোঁয়া একই চামচের বাকি অংশ নিজের মুখে তুলে নিল? ব্যাপারটা আনতারার কাছে ভালোলাগে। আনতারা মৃদু হেসে বলে,
— খারাপ না।
ইফরাদ আবার আরেক চামচ তুলে আনতারার মুখের সামনে ধরে। এবার আনতারা দুষ্টুমি করে বলেই ফেলে,
— আজ যে আমার ঠোঁট স্যানিটাইজ না করেই আমার এঁটো খাবারটা মুখে নিয়ে নিলেন?
ইফরাদ স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই আনতারাকে গ্রিক ইয়োগার্ট খাওয়াতে খাওয়াতে বলে,
— ট্রাস্ট মি, ঠোঁটে আমার ঘৃণা লাগে না। স্যানিটাইজ ছাড়াই খেতে পারব।
আনতারা গ্রিক ইয়োগার্ট মুখে নিয়ে অবাক হয়ে বলে,
— কী খেতে পারবেন?
চামচে এবারো আনতারার ছোঁয়া লাগা সামান্য ইয়োগার্ট রয়ে গিয়েছে। ইফরাদ দুষ্টু হেসে সেই অংশটুকু নিজের মুখে দিয়ে বলে,
— গ্রিক ইয়োগার্টের কথাই বলছিলাম, মাই জান।
— ওহ।
ইফরাদ বাঁকা হেসে বলে,
— আর তুমি যেটা ভাবছ, সেটাও।
আনতারা থতমত খেয়ে গেল।
— আমি কী ভাবছি?
ইফরাদ শুধু বাঁকা হাসি নিয়ে আনতারার দিকে তাকিয়ে রইল। সেই দৃষ্টি দেখেই আনতারার গাল লাল হয়ে উঠে।
তার মানে, সে যা ভেবেছে, ইফরাদ সেটা বুঝে ফেলেছে?ভাবতেই লজ্জায় আনতারার মাথা নিচু হয়ে গেল।
ইফরাদ হেসে বলে,
— এতটুকু কথাই সহ্য করতে পারো না, আবার বউয়ের অধিকার দেখাও? আমি যদি স্বামীর পুরো ফর্মে আসি, তাহলে তো তোমাকে খুঁজেই পাওয়া যাবে না।
আনতারা লজ্জায় বলে,
— কীসব বলছেন!
ইফরাদ দুষ্টুমি ভরা গলায় বলে,
— স্বামীর পুরো ফর্মে এলে শুধু বলবো না, প্র্যাকটিক্যালিও করব। আর শুধু করবই না, অনেক বেশি করব।
আনতারা অবাক হয়ে বলে,
— কী?
ইফরাদ চোখ মেরে বলে,
— স্বামীর জ্বালাতন!
এবার আনতারা আর লজ্জা সামলাতে না পেরে উঠে চলে যেতে উদ্যত হয় তখনি ইফরাদ দ্রুত আনতারাী হাতটা ধরে ফেলে। আনতারা থমকে দাঁড়িয়ে গেল। একদম স্থির। একটু নড়লও না।
ইফরাদ নরম গলায় বলে,
— খেয়ে যাও।
আনতারা পেছনে না ফিরেই মাথা নিচু করে বলে,
— আর খাব না। আপনি খান।
— লাস্ট ওয়ান।
বলেই ইফরাদ আলতো করে আনতারার হাত ধরে আবার আগের জায়গায় বসিয়ে দেয়। তারপর আবার এক চামচ গ্রিক ইয়োগার্ট মুখের সামনে ধরে। আনতারা একবার চোখ তুলে ইফরাদের দিকে তাকায়। চোখে চোখ পড়তেই মুহূর্তের মধ্যে আবার চোখ নামিয়ে ফেলে। লজ্জায় আনতারার মুখ আরো লাল হয়ে উঠেছে।
ইফরাদ সেটা দেখে মনে মনে হাসে। তারপর বলে,
— খাও।
আনতারা এবার চুপচাপ খাবারটা মুখে নেয়। ইফরাদ চামচটা বাটিতে রাখতেই আনতারা দ্রুত উঠে দাঁড়ায়। তার ভীষণ লজ্জা লাগছে। ইফরাদের পাশে বসে থাকতে পারবে না। এবার আর ইফরাদ তাকে আটকায় না। সে বুঝতে পেরেছে, আনতারাকে অনেকখানি লজ্জায দিয়ে ফেলেছে। আর আশ্চর্যের বিষয়, আনতারাকে লজ্জা পেতে দেখলে ইফরাদের ভালো লাগে। সে নিজেও জানে না কেন কিন্তু আনতারার সঙ্গে কাটানো এই ছোট ছোট দুষ্টুমিষ্টি মুহূর্তগুলো তার ভীষণ ভালো লাগে। মনের ভেতর অদ্ভুত এক শান্তি আর আনন্দ কাজ করে।
ইফরাদ আবার গ্রিক ইয়োগার্ট খেতে শুরু করে। এদিকে আনতারা বাইরে থেকে পরে আসা ইফরাদের শার্ট আর প্যান্ট তুলে নিয়ে ওয়াশরুমে গিয়ে রেখে আসে। তারপর জুতাগুলো গুছিয়ে রাখতে নিলে ইফরাদ বলে উঠে,
— তোমাকে আমার জুতা ধরতে হবে না। আমি নিজেই রেখে দেব।
কথাটা শুনেই আনতারার মনে পড়ে গেল তাদের বিয়ের প্রথম রাতের কথা। সেদিন নেশাগ্রস্ত অবস্থায় ইফরাদ তাকে নিজের পা থেকে জুতা খুলে দিতে বলেছিল।এমনকি বলেছিল, তার জায়গা নাকি ইফরাদের পায়ের কাছেই। সেদিন কত তিরস্কার, কত অপমানই না শুনতে হয়েছিল তাকে। আর আজ…। কয়েক দিনের ব্যবধানে সেই মানুষটাই তাকে জুতা ধরতে নিষেধ করছে। কত বড় পরিবর্তন! মনে মনে আনতারা অনুভব করে, তার দোয়াগুলো ধীরে ধীরে কবুল হচ্ছে। ইফরাদ সত্যিই বদলাচ্ছে।
জুতার জোড়া হাতে নিয়ে আনতারা শান্ত গলায় বলে,
— স্বামীর জুতা ধরলে স্ত্রী ছোট হয়ে যায় না। বরং আপনার কাজ করতে আমার ভালোই লাগে। আপনি আমার মানুষ। আপনার কাজের ভাগও আমি কাউকে দেবো না।
ইফরাদ চিবোনো থামিয়ে এক মুহূর্তের জন্য তাকিয়ে রইল আনতারার দিকে। এই মুহূর্তে তার ভেতরে এক অদ্ভুত খারাপ লাগা কাজ করে। কেন খারাপ লাগছে, সে নিজেও ঠিক বুঝে উঠতে পারল না। কিন্তু তার মনে হলো, আনতারার সঙ্গে সে অনেক খারাপ ব্যবহার করেছে। অসংখ্যবার অসম্মান করেছে। তবুও এই মেয়েটা কখনো তাকে পাল্টা অসম্মান করেনি। বরং সব সময়ই তাকে সম্মানের সাথেই কথা বলেছে। নিজের ব্যবহারে কখনোই তাকে ছোট করেনি। ইফরাদের মন স্বীকার করে আনতারার ব্যবহার সত্যিই আলাদা। খুবই ধৈর্যশীল আর বুঝদার একটা মানুষ। এমন একজন মানুষ পাশে থাকলে জীবনটা অনেক সুন্দর আর শান্তিময় হবে। কথাটা ভাবতেই অজান্তেই ঠোঁটে এক মৃদু হাসি ধরা দেয়।
ইফরাদ আবার চামচে করে গ্রিক ইয়োগার্ট তুলে মুখে নেয় এবং শান্তভাবে খেতে থাকে। খাওয়া শেষ করে টিস্যু দিয়ে মুখ ও হাত মুছে সেটা ডাস্টবিনে ফেলে দেয়। আনতারা আলমারি থেকে একটা টি-শার্ট এনে ইফরাদের হাতে দেয়।
— নিন, পরে নিন। তারপর শুয়ে থাকুন। একটু বিশ্রাম নিন।
ইফরাদ টি-শার্টটা নিয়ে দাঁড়ায় এবং পরতে পরতে বলে,
— শুয়ে থাকার সুযোগ আপাতত নেই। নিচে সাফিন অপেক্ষা করছে।
আনতারা ছোট করে বলে,
— ওহ।
— হুম, আমি যাচ্ছি নিচে।
— আচ্ছা।
এরপর ইফরাদ রুম থেকে বেরিয়ে গেল। নিচে লিভিং রুমে এসে দেখে, সাফিন নাস্তা করছে। কফি আর কেক দেওয়া হয়েছে, সে এখন কেক খাচ্ছে। ইফরাদকে দেখেই সাফিন সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়ায়। তা দেখে ইফরাদ বাধা দেয়,
— দাঁড়াতে হবে না, বসো।
সাফিন আবার বসে পড়ে। ইফরাদ সিঙ্গেল সোফাটায় গিয়ে বসে, যেটা সামনে বাম পাশে রাখা ছিল।
কাজের জন্য সাফিন কেকটা অর্ধেক খেয়ে রেখে দিতে গেলে ইফরাদ বলে,
— তুমি ট্যাবটা আমাকে দিয়ে খাও। অফারটা আমি দেখছি।
সাফিন ট্যাব বের করে অফারটা বের করে ট্যাবটা ইফরাদের হাতে দেয়। তারপর পাশে দাঁড়িয়ে রইল। তা দেখে ইফরাদ বলে,
— যাও। তুমি খাও। আমি দেখছি।
সাফিন আবার গিয়ে বসে খেতে লাগল। ইফরাদ গ্রিন টি-তে চুমুক দিতে দিতে স্লাইডগুলো দেখতে ও পড়তে লাগল। এদিকে সাফিন কফি খেতে খেতে ইফরাদের পাশে এসে দাড়ালো। কিছুক্ষণ পর ইফরাদ ট্যাবটা সাফিনকে দিয়ে বলে,
— Looks good. Have legal do a final review, then proceed with the signing.
সাফিন কফির মগটা রেখে ট্যাবটা হাতে নেয়।
— ওকে স্যার।
ইফরাদ উঠে দাঁড়ায়। সাফিন তিনটা ফাইল, যেগুলো ইরাইনা দিয়েছিল, সেগুলো ইফরাদের হাতে দিয়ে বলে,
— এই নিন স্যার, ফাইলগুলো।
ইফরাদ ফাইলগুলো নেয়। সাফিব এবার অনুমতি নেয় যাওয়ার।
— আচ্ছা স্যার, আসি তাহলে।
ইফরাদ মাথা নেড়ে সম্মতি দেয়। সাফিন চলে গেল। ইফরাদ ফাইলগুলো নিয়ে নিজের রুমে ফিরে এল। রুমে ঢুকেই দেখে, আনতারা নেই। তার চোখ গেল টেবিলের দিকে, সেখানে বাটি আর ট্রে নেই। মানে আনতারা সেগুলো রাখতে গেছে। ইফরাদ ফাইলগুলো বেডের ওপর রেখে আধশোয়া হয়ে বসে একটা ফাইল হাতে নেয়। গভীর মনোযোগ দিয়ে পড়তে শুরু করে। কিছুক্ষণ পর আনতারা ফিরে আসে। সে বাটিটা রেখে এসেছে। রুমে ঢুকে দেখে, ইফরাদ ফাইল পড়ছে। বুঝতে পারে ইফরাদ অফিসের কাজে ব্যস্ত।
ইফরাদ একবার আনতারার দিকে তাকায়, তারপর আবার ফাইলে মন দেয়। আনতারা ভাবে, যেহেতু এখন তার কোনো কাজ নেই, সেও একটু বই পড়ে নেয়। সে বুকশেলফ থেকে তাফসীর ইবনে কাসীর বের করে চেয়ারে বসে মনোযোগ দিয়ে কুরআনের আয়াতের ব্যাখ্যা পড়তে শুরু করে। সময় কেটে গেল প্রায় দেড় ঘণ্টা। ফাইল পড়া শেষ করে ইফরাদ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।টানা বসে থাকার কারণে তার ঘাড়ে হালকা ব্যথা শুরু হয়েছে। ইফরাদ এদিক-সেদিক ঘাড় ঘুরিয়ে আরাম করার চেষ্টা করে। ব্যথা কিছুটা কমতেই আনতারার দিকে তাকায়। দেখে, আনতারা এখনো চুপচাপ বসে বই পড়ছে।
রুহআবিষ্ট তুমি পর্ব ১৪
ইফরাদের আর দ্বিতীয় ফাইল বা তৃতীয় ফাইল পড়ার ধৈর্য রইল না। আজ এমনিতেই তার কাজে মন বসছিল না।তবুও এতক্ষণ জোর করে মনকে টেনে কাজ করেছে। কিন্তু এখন আর পারছে না। সে ফাইলটা বেডের পাশে রেখে দেয়। তারপর এয়ারপড বক্স খুলে দুই কানে এয়ারপড লাগাল। এবং যে জিনিসটা শুনতে তার ব্যাকুল, সেটাই অন করে। এয়ারপডে ভেসে উঠে সেই পরিচিত রেকর্ডিংয়ের সুর। এই জিনিসটাই এখন তার দরকার ছিল, ক্লান্তি দূর করার মতো একমাত্র শান্তি। এদিকে আনতারা বই পড়তে পড়তে হঠাৎ চোখ পড়প ইফরাদের দিকে। দেখে, ইফরাদ আধশোয়া হয়ে চোখ বন্ধ করে এয়ারপডে কিছু শুনছে। আনতারা ধরে নেয়, ইফরাদ আবার গানই শুনছে। এমনটা তো ইফরাদ প্রায়ই করে। আনতারা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার বইয়ে মন দেয় এবং মনে মনে বলে,
— জেদী লোক একটা! এত বোঝানোর পরও সেই গানই! আমার থেকেও গান বেশি জরুরি! থাকুক জরুরি নিয়ে।
