Home জাহানারা জাহানারা পর্ব ৯১

জাহানারা পর্ব ৯১

জাহানারা পর্ব ৯১
জান্নাত মুন

বাগানে এহেন অপ্রত্যাশিত দৃশ্যখানা দেখে সহসা আমার অক্ষিযুগল ঝাপসা হয়ে এলো। এই তো সুদূরে নাবিলা চৌধুরী এবং ইতির কবরের পাশে দু’হাত মেলে ধরে জমিনে চিত হয়ে শুয়ে আছে একটা বিশালদেহী অবয়ব। কবরের পাশেই ঝলঝল করছে কৃত্রিম হলদেটে নিয়ন আলো। আর সেই রুগ্ণ আলোটুকুর দিয়েই কবরের চারপাশটা মৃদু দৃশ্যমান। তাতেই আমার বিন্দুমাত্র অসুবিধা হয়নি অবয়বটা কার তা বুঝতে। আমি স্তব্ধ হয়ে, নিস্প্রভ নয়নে সেদিকেই তাকিয়ে রইলাম ক্ষীণকাল। আমার বুকের ভেতর কিছু একটা যেন খা’মছে ধরেছে। বিধায় হঠাৎ দম নিতে বড্ড কষ্ট হচ্ছে।

“ভাউ, ভাউ!” শিশুসুলভ নয়নে আমার দিকে তাকিয়ে কোমল গলায় ডেকে উঠল ব্রুনো। তার গলার আওয়াজ কর্ণপাত হতেই সংবিতে ফিরলাম। সহসা ভেতরে আটকে রাখা নিশ্বাস ভারী হয়ে বেরিয়ে এলো৷ ব্রুনো আমার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে। আমি আর এক মূহুর্তও কালক্ষেপণ না করে ব্যালকনি থেকে প্রস্থান করলাম। পিছনে ব্রুনোও আমার পিছু নিল।
চৌধুরী বাড়ির ত্রিসীমা জুড়ে ক্লান্তিহীন, অবিরাম পাহারা দিচ্ছে শতাধিক সশ’স্ত্রধারী নাইট গার্ডরা। তবে বাড়ির পিছনের এই দিকটা বেশ নীরব আর ছিমছাম। কিছুদিন ধরে এদিকটায় কারোরই আনাগোনা নেই বললেই চলে। কেবল নিয়মমাফিক একদল গার্ডের ভারী বুটের আওয়াজ সুনির্দিষ্ট সময় পর পর এই নিস্তব্ধতার চাদরখানি ছি’ন্নভিন্ন করে দিয়ে যায়।

আকাশে ঝলমলে চাঁদের রূপালী আভা, যার মৃদু আলোয় চারপাশের অন্ধকারটুকু আলতো করে দৃশ্যমান। বাগানে পা রাখতেই তীব্রভাবে নাসারন্ধ্রে এসে হানা দিচ্ছে বাহারি ফল-ফুলের চমৎকার সব মিষ্টি সুঘ্রাণ। আমি দ্রুত কদমে পা ফেলে এগিয়ে যাচ্ছি। আমার গা ঘেঁষে সমান তালে এগোচ্ছে ব্রুনো। নিস্পন্দ জমিনে ঝরে পড়া শুষ্ক পাতাগুলোর ওপর আমার প্রতিটি পদক্ষেপ আছড়ে পড়তেই মড়মড় শব্দে এক অদ্ভুত সুর উঠছে। রাতের এই নিশ্ছিদ্র নিস্তব্ধতার বুকে সেই সামান্য আওয়াজটুকুই আমার কর্ণদারে সীসার মতো ভারী ঠেকছে।
বাগানে আজ জোনাকি পোকার মেলা বসেছে যেন। তারা নিবিড় গাছগাছালির আঁধার মাখা ফাঁকফোকড়ে ডানা মেলে উড়ন্ত স্বর্ণালোক ছড়াচ্ছে। ওদিকে রজনী ঘন হওয়ার সাথে সাথে নিশাচরদের গুঞ্জনও গাঢ় হয়ে উঠছে। এমনিতে আমার অন্তরে ভ’য়ডরের কোনো অস্তিত্ব ছিল না। কিন্তু গত কয়েকটা মাস ধরে মনের গহীনে এক অদৃশ্য ভয়ের বি’ষা’ক্ত বীজ দানা বেঁধেছে। একলা একলা এমন নিশুত রাতে বাগানে পরিভ্রমণ করার মতো মনোবল আজ আমার অবলুপ্ত। নেহাৎ পাশেই চুপটি করে আমার পায়ের সাথে তাল মিলিয়ে ব্রুনোটা এগোচ্ছে বলে মনে ভয় এসে হানা দিতে পারে নি।

হাঁটতে হাঁটতে অবশেষে বাগানের শেষ প্রান্তে এসে থমকাল আমার পা-যুগল। এই তো সুদূরেই দেখা যাচ্ছে চৌধুরীদের গোরস্থান। সদ্য দেওয়া কবর দু’খানা দৃশ্যমান। মা বোনের কবরের পাশে এখনো নিথর হয়ে শুয়ে আছে প্রতাপশালী মাফিয়া বস। অনন্ত নীলিমার পানে তার স্থির দৃষ্টি এখনো অনড়। দৃশ্যটা দেখামাত্রই আমার বুকের ভেতরটা ভীষণ ভারী হয়ে এলো, অবরুদ্ধ হয়ে এল কণ্ঠনালি। চোখদুটো খুব জ্বা’লা করছে। এই বুঝি নোনা জলে টইটম্বুর হয়ে পরবে। কিন্তু কেন এই আকুলতা? মাফিয়া বসের আজ এই বেহাল দশার জন্য! কিন্তু এক সময় তো আমিই চাইতাম এই দুর্ধর্ষ লোকটা ভেঙে চূ’র্ণবি’চূর্ণ হোক, ধ্বং’স হোক তার পাপের সাম্রাজ্য, ধূলিসাৎ হোক তার সকল অহমিকা। আমি তো তাকে খুব ঘৃ’ণা করতাম। সেজন্য বারংবার করেছি প্রত্যাখ্যান। কিন্তু এখনকার অনুভূতিগুলো! এখন কেন এই লোকটার দিকে তাকালেই বুকের বাঁ পাজরে দহন অনুভূত হয়! এই লোকটার চুপ থাকা কেন আমাকে অস্থির করে তুলে!

মনের অজান্তে আসা প্রশ্নগুলোর আজও কোনো উত্তর মিলল না। ইতোমধ্যে চোখদুটো ঝাপসা হয়ে গেছে। পলক ঝাপটালেই বুঝি বারিবর্ষণ হবে৷ হঠাৎ মাথায় আলগাভাবে ঝুলে থাকা ওড়নার আঁচলে টান পড়তেই আমার মোহগ্রস্ত হুঁশ ফিরে এলো। দৃষ্টি নত করতেই নজরে পড়ল ব্রুনোকে। বাচা আমার ওড়নার প্রান্তভাগ কামড়ে ধরে টানছে। আমি তাকাতেই মৃদু আওয়াজে ডেকে উঠল।
মনিবের নীরবতা থেকে অনেক কিছুই বোধহয় এই বোবা প্রাণীটা অনুধাবন করতে পেরেছে। আর সেই কারণেই দেখো, কেমন ফ্যালফ্যাল করে আড়ষ্ট চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। অব্যাকুল নয়নে নীরবে যেন কিছু একটা বলতে চাইছে। আমি নিঃসংকোচে হাত বাড়িয়ে ব্রুনোর মাথায় আদুরে পরশ বুলিয়ে দিলাম। সঙ্গে সঙ্গে সে আমার পা ঘেঁষে বসে পড়ল। ব্রুনোর এমন নিঃশর্ত আনুগত্য দেখে এই ঘোর অমানিশাতেও আমার অধরে আনমনে এক চিলতে ম্লান হাসির রেখা ফুটে উঠল।

অতঃপর সমস্ত মনোযোগ গুটিয়ে নিয়ে দৃষ্টিটা আবার সামনের দিকে স্থির করলাম। ইফান এখনো অনড়। এভাবে শূন্য আকাশের বুকে অপলক তাকিয়ে লোকটা আসলে কী খুঁজছে! কৌতুহলবশত সেদিকে দৃষ্টি ঘুরালাম। বিস্তৃত আকাশের অতল বুকে লক্ষ-কোটি তারার মেলা আর একাকী নিঃসঙ্গ পূর্ণিমার চাঁদ ছাড়া আর কিছুই নজরে পড়ল না। ভ্রুকুটি করে ফের জমিনে লেপ্টে থাকা লোকটার পানে তাকালাম। লোকটা কি আজ আমার উপস্থিত ঠাহর করতে পারছে না! ভাবতে গিয়েই টনক নড়ল আমার। আশেপাশে দৃষ্টি ঘুরাতেই খেয়াল হলো এই মধ্যরাতে বাগানের শেষ প্রান্তে কবরস্থানের সামনে আমি একাকী দাঁড়িয়ে। এক লহমায় নিশ্বাস ভেতরে আটকে গেল। মেরুদণ্ড বেয়ে এক হিমশীতল স্রোত বয়ে গেল যেন। চোখদুটো প্রসারিত হয়ে উঠল ভ’য় আর অভিশঙ্কায়। এতক্ষণে অবশ মস্তিষ্ক যেন তার কার্যক্ষমতা ফিরে পেল। ইফানের বুকে যতই কষ্টের পাহাড় জমুক, সে কখনোই পৃথিবীর বুকে এভাবে নিজের দুর্বলতার বহিঃপ্রকাশ করবে না! তবে কি সামনে কবরের পাশে শুয়ে থাকা লোকটা ইফান নয়! কোনো বহুরূপী প্রেতাত্মা!

নিশ্বাস ভারী হয়ে আসল আমার। এত বড় ভুল আমি কি করে করলাম! আমার তো রাতবিরেতে বাড়ি থেকে বের হওয়ার নিষেধ আছে। আম্মুকে বলেছিলাম আমার উপর দাদির কালাজাদু করার কথা। যার কবলে পড়ে কতই না পা’গলামি করেছি। এমনকি নিজের পেটের নিষ্পাপ সন্তানটাকেও শেষ করে ফেলেছিলাম। সব জেনে তারপরই আম্মু ও বড় আম্মু দু’জনেই কবিরাজের পিছনে ছুটেছেন। কবিরাজ সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে আমি যেন একা চলাফেরা না করি। এতে নাকি সমস্যা হতে পারে। এসব অনুচিন্তন হতেই এক অবর্ণনীয় আতংকে আমার কপালে ঘাম ছুটতে লাগল। হায় খোদা, এখন কি হবে!
আমি বেখেয়ালি এক পা পিছিয়ে পরলাম। তক্ষুনি অতিপরিচিত পুরুষালী ভরাট কণ্ঠস্বর আমার কর্ণকুহরে আ’ঘাত করল,

–“জারা!”
আমি সহসা শুকনো ঢোক গিললাম। এদিকে মনিবের গলা শুনতেই ব্রুনো লাফিয়ে ওঠে দাঁড়াল। খুশিতে বাজখাঁই কণ্ঠে ডেকে উঠল,“ভাউ ভাউ!”
আমি সাহস করে আওড়ালাম,“ই..ইফান তুমি!”
ইফান দীর্ঘশ্বাস আড়াল করে ক্ষীণ গলায় প্রত্যুত্তর করল,
–“হুম। এত রাতে ঘর থেকে একা একা বের হতে গেলে কেন?”
এতক্ষণে হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম আমি। খুব কসরত করে শুকনো ঢোক গিলে জিহ্বা দিয়ে অধর ভিজিয়ে নিলাম। অতঃপর ওড়নার আচল দিয়ে কপালের ঘামটুকু মুছে ধীর পায়ে এগিয়ে গেলাম। ব্রুনোও দু’কদম এগেলো। কিন্তু কাছে আসল না। এক অদ্ভুত সম্ভ্রম নিয়ে কিছুটা দূরেই জমিনে বসে পড়ল। তার অনুগত দৃষ্টি অপলকভাবে নিজের মনিবের পানে নিবদ্ধ। আমি ইফানের সন্নিকটে পৌঁছাতেই তাকে শুধালাম,

–“আগে বল তুমি এতরাতে এখানে এভাবে শুয়ে আছ কেন?”
চারপাশে নৈঃশব্দ্য। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলাম ইফানের উত্তর শুনার জন্য। কিন্তু তার অবিনাশী নীরবতা ভেঙে কোনো প্রতুত্তর এলো না। আমার গলা আগের চেয়ে দ্বিগুণ ধরে এসেছে। একটু আশকারা পেলেই বোধহয় অবুঝ শিশুর ন্যায় ফুপিয়ে ওঠব। আমি ইফানের পাশে বসে পড়লাম। ওর বুকের ওপর হাত রেখে ভগ্ন গলায় ফের শুধালাম,
–“কি হলো! বল কি হয়েছে তোমার?”
ইফানের বুকে বিচরণ করা আমার হাতটা আচানক সে খপ করে ধরে তার বুকের সাথেই চেপে ধরল। অতঃপর এতক্ষণে আকাশের থেকে দৃষ্টি সরিয়ে আমার দিকে তাকাল। হাত বাড়িয়ে আমার চোখের কুনিশ মুছে ভরাট নিচু কণ্ঠে আওড়াল,
–“আমিও বুঝতে পারছি না কি হয়েছে আমার!”
এইটুকু বলে ইফান থামল। অতঃপর দৃষ্টি তার বুকের দিকে ঘুরিয়ে ফের বলে উঠল,“তবে এখানে বোধহয় খুব জটিল সমস্যা হয়েছে। ভীষণ পেইন হয়। মনে হয় ভেতরের যন্ত্রটা এখানে আর নেই। সবটা জুড়েই শূন্যতা। এটা কোন রোগের লক্ষ্মণ, জারা?”

আমি প্রত্যুত্তর করতে পারলাম না। শুধু বুকের ভেতর অস্থিরতা অনুভব করতে পারছি। ইফান দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে আমার কোলে মাথা রাখল। আবারও আনমনে সেই নক্ষত্রখচিত অবিনশ্বর নক্ষত্রমণ্ডলের পানে চেয়ে বি’ষাদমাখা কণ্ঠে বলে উঠল,
–“আমার সাথে এগুলো কি হচ্ছে জারা? কেন হচ্ছে? মা’রা যাওয়ার কথা তো আমার ছিল। তাও আবার বি’ভৎসভাবে। তাহলে এভাবে কেন আমার বদলে আমার কাছের মানুষগুলো বিদায় নিল!”
আমি লোকটার মাথার উষ্কখুষ্ক অলকগুচ্ছের ভাজে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে নিচু গলায় আওড়ালাম,“এটা যে প্রকৃতির নিয়ম। কে কখন দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করবে তা আগে থেকেই বিধির লেখা ছিল। সবাইকেই বিদায় নিতে হবে। কেউ আগে, তো কেউ পরে।”

ইফান এক মূহুর্ত চুপ হয়ে গেল। হাত বাড়িয়ে একে একে মা-বোনের কবর স্পর্শ করল। পরিশ্রান্ত ধীর কণ্ঠে বলে উঠলো,“এখন আমার খুব আফসোস হয় জারা। খুব আফসোস হয় কেন আমার জীবনটা আর সবার মতো হলো না! কেনই বা পরিবার থাকতেও তাদের সাথে আমার এত দূরত্ব! তুমি জানো আমি পণ করেছিলাম কখনোই নিজ পরিবারের সাথে যোগাযোগ করব না। এই পৃথিবীতে আমি ছাড়া আমার আর কেউ নেই। কিন্তু! কিন্তু আমার গন্তব্যহীন জীবনে সব এলোমেলো হয়ে গেল যেদিন এই মরুময় জীবনে বসন্তের মতো তুমি এলে। তোমাকে যেকোনো মূল্যে পেতে মরিয়া হয়ে উঠলাম। তারপর শুধুমাত্র তোমার জন্য এই বাড়িতে আসা। এসে দেখলাম ভরা একটা পরিবার। বিষয়টা মোটেও ভালো লাগেনি আমার। তারমধ্যে এক পিচ্চি মেয়ে আড়ালে লুকিয়ে বারবার উঁকিঝুঁকি দিয়ে আমাকে দেখছিল। বেশ বি’রক্ত হচ্ছিলাম আমি। দাদি মেয়েটাকে ধরে আমার সামনে নিয়ে আসল। প্রথমবার জানলাম আমার বোনও আছে একটা। তখন আমার মধ্যে কোনো অনুভূতি কাজ করে নি। শুধু বি’রক্তবোধ করলাম।

শুরুর দিকে বোন নামক পিচ্চি মেয়েটা আমার থেকে দূরে দূরে থাকত। শুধু আড়ালে উঁকিঝুঁকি দিয়ে ফ্যালফ্যাল করে দেখত। কদিন পরই দাদাভাই দাদাভাই বলে মুখে ফ্যানা তুলতে লাগল। আমি সেদিকে তাকিয়ে দেখারও প্রয়োজনবোধ করতাম না। একদিন তো সে আমার পথ আটকে দাঁড়াল। আলতো করে আমার হাতের কনিষ্ঠা আঙুল ধরার স্পর্ধাও দেখাল। আমি চোখ সরু করে তাকাতেই বলে উঠলো তাকে পিকনিকে নিয়ে যেতে। স্কুলে সকলে প্রতিবার যায়। কিন্তু কখনো তাকে বাসা থেকে যাওয়ার পারমিশন দেওয়া হয় না। ইতির কথায় বেশ বিরক্তবোধ করলাম। সপাটে জবাব দিয়েছিলাম, পারব না।”

বলার পথিমধ্যে হঠাৎ থমকে গেল ইফান। আমার চোখে চোখ রেখে কাতর গলায় বলে উঠল,“কেন আমি সেদিন না করেছিলাম জারা? কেন রাজি হলাম না! আমি ওকে মানা করে দিয়েছিলাম ঠিকই। কিন্তু পরে কেন যেন নিজের সিদ্ধান্তের উপর ভীষণ রাগ হয়েছিল। ওর জন্য অনেক শপিং পাঠিয়েছিলাম। তখন মেয়েটার মন খারাপ সব উবে গিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু তুমি জান সেদিনের পর মেয়েটা আর কোনোদিন আমার কাছে বায়না ধরেনি।
কেন ধরেনি জারা? কেন ধরেনি? আমি খারাপ বলে? আমি সত্যিই কি ভাই হওয়ার যোগ্য না!”
শ্লেষাত্মক হাসল ইফান। দৃষ্টি ঘুরিয়ে বোনের কবরের পানে তাকাল। ঝলঝল নয়নে শুধু দেখেই গেল কয়েক মূহুর্ত। অতঃপর নিস্তব্ধতার বুকে পল্লবিত নীরস গলায় আওড়াল,
–“আজ আমার খুব বেশি আফসোস হচ্ছে জারা। এই আফসোস এই জীবনে আমার আর পিছু ছাড়বে না। আমি পারলাম না আমার নিষ্পাপ বোনটাকে প্রটেক্ট করতে। আর না পারলাম সন্তান হয়ে মা’কে আগলে রাখতে!”

মাফিয়া বসের সহজ স্বীকারোক্তিগুলো শুনে আমি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলাম না। বিধায় তার ইস্পাতের ন্যায় দৃঢ় বক্ষপিঞ্জরে মাথা গুঁজে ফুঁপিয়ে উঠলাম। দু’হাতে খামচে ধরলাম তার পরিধেয় টিশার্টখানা। আমার এহেন আকস্মিক আচরণে ইফান থমকাল। এতক্ষণে যেন তার ভ্রম ছুটল। মনের অজান্তে যে সে কি-না কি সব বলে দিয়েছে ভেবেই আড়ষ্ট হল। বিভ্রান্ত হয়ে খুব কসরত করে ঢোক গিলল। কম্পিত হল তার পুরুষালি অ্যাডামস অ্যাপল। অতঃপর তার কাঠিন্য বুকে ফুপিয়ে কাঁদতে থাকা তুলোর ন্যায় কোমল মেয়েলী কম্পিত দেহটার দিকে পুনঃদৃষ্টি রাখল। দু’হাত দিয়ে আগলে ধরল সে। আমার কান্না শুনে ব্যগ্র ব্রুনো বাজখাঁই কণ্ঠে ডেকে চলেছে অনবরত। ইফান নিজেকে ধাতস্থ করে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলে উঠল,
–“এই পাগলি কাঁদছ কেন? অনেক রাত হয়েছে। এবার ঘরে চল।”

আমি আরও দ্বিগুন ফুপিয়ে ওঠলাম। আরও আষ্টেপৃষ্টে ইফানকে জড়িয়ে ধরে সিক্ত গলায় আওড়ালাম,“আমার ধৈর্যশক্তি এখন শূন্য ইফান। আর সহ্য হচ্ছে না কিছু। দোহায় লাগি লক্ষীটি তুমি এভাবে ভেঙে পরো না। তুমি দুর্বল হয়ে পড়লে আমি কি করে সব সামলাব বল!”
ইফান আরও শক্ত করে দু’হাতে আমার দেহখানা আগলে ধরল। অধরযুগল প্রসারিত করে সান্ত্বনার সুরে বলল,“ধুর বোকা মেয়ে, আমার কিচ্ছু হয় নি। আমি ঠিক আছি।”
–“তুৃমি ঠিক নেই। আমি জানি তুমি ঠিক নেই। তোমার ভেতরে ক’ষ্টের পাহাড় জমে আছে। তুমি প্রকাশ কর না। আমি এখন বুঝি তোমায়। আমারও এখন খুব আফসোস হয় কেন আগে তোমায় বুঝলাম না। কেনই বা একটু বুঝার চেষ্টা করলাম না। তাহলে আমার সন্তান দুটোকে আমি হারাতাম না। আজ আমি নিঃসন্তান থাকতাম না।”

আমার সন্তান দুটোর কথা মনে হলেই বুক ফেটে কান্না আসে। নিজেকে ধরে রাখতে পারি না। এই নশ্বর দুনিয়ার সব কিছুর প্রতি অভিমান আর অভিযোগ জন্মে। ঘৃ’ণা হয় নিজের প্রতি, নিজের ভাগ্যের প্রতি। তাই এই মূহুর্তে আমার কান্নার বেগ বাড়ল। ইফান আমার পিঠে হাত বুলিয়ে দিল। মাথায় আশ্বাসের পরশ দিতে দিতে তরল গলায় আওড়াল,
–“সরি!”
আমি নাক টেনে অশ্রুসিক্ত নয়নে লোকটার ধূসর বাদামী নেত্রের পানে তাকালাম। সিক্ত গলায় শুধালাম,“সরি কেন বলছ? সরি তো আমি তোমায় বলব। আমার জন্যই তো এতকিছু হচ্ছে। আমি না থাকলে এতকিছু হতো না। সেদিন আমি ম’রে গেলেই ভালো হতো, এখন এতকিছু ঘটতোও না।”

আমার বাক্য শেষ হতে না হতেই ইফান আচানক আমার চোয়াল থা’বা মেরে ধরল। সহসা থতমত খেয়ে কান্না ভুলে গেলাম। এক দৃষ্টিতে চেয়ে রইলাম লোকটার পানে। ইফানের চোয়াল ইতোমধ্যে ধা’রালো অ’স্ত্রের ন্যায় শক্ত হয়ে এসেছে। আমি কিছু বুঝে ওঠার আগেই সে হিসহিসিয়ে জানান দিল,
–“খবরদার এই ম’রা শব্দটা আর কোনোদিন উচ্চারণ করবি না। এই অভিশপ্ত জীবনে তুই ছাড়া এখন আমার আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। তোর জন্য পৃথিবী ধ্বং’স করার ক্ষমতা রাখলেও, তোকে হারানোর ক্ষমতা আমার নেই। অন্যথায় তোর কিছু হওয়ার আগে আমারই ম’রণ হোক।”
ইফানের চাপা হুং’কারে কিছুটা ঘাবড়ালাম। ভীতি হরিণীর ন্যায় ভীরু নেত্রে ইফানের ক্ষুব্ধ ধূসর বাদামী তারায় চেয়ে রইলাম। লোকটা ভারী অদ্ভুত! কখনো মরীচিকার ন্যায় গূঢ়। এইতো কিছুক্ষণ আগেও কত নিরূদ্বেগ ছিল। আর এইটুকু কথায় এতটা ক্ষিপ্ত হয়ে গেল! আমি আর তাঁকে রা’গালাম না। বরং আচমকা ওর গলা জড়িয়ে ধরলাম। তার ঘাড়ে মুখ গুঁজে নাক টেনে তরল গলায় বলে উঠলাম,

–“তুমি শান্ত হও। আমি আর বলব না।”
আমার কোমল কণ্ঠে নিমিষেই হিমবাহের ন্যায় গলে পড়ল ইফানের সমস্ত পুঞ্জীভূত ক্ষো’ভ। সে চোখ বন্ধ করে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। ফের দু’হাতে আমার দেহখানা আগলে ধরল। পরিশ্রান্ত গলায় বলে উঠল,
–“আর কখনো বলো না, বুকে লাগে।”
হাতের ইশারায় বুকের বাঁ পাশে আঙুল তাক করে দেখিয়ে বলল,“এই, এইখানে। এবার কান্না থামাও।”

আমি কোনো প্রত্যুত্তর করলাম না। আমি এখনো নিঃশব্দে ফুপিয়ে যাচ্ছি। ফলে আমার সুডৌল মেয়েলী বক্ষ ক্ষণে ক্ষণে কম্পিত হচ্ছে। আমার হেঁচকি তুলার শব্দে ইফান ভ্রুকুটি করল। তাই জোর করে আমার মাথা উপরে তুলল। রোষাবেশে আমি চোখ বন্ধ করে নিলাম। ইফান কিছুক্ষণ পলকহীন আমার মুখাবয়বে চেয়ে রইল। নাকের জাল চোখের জলে সব একাকার। তারউপর এলোমেলো হয়ে লেপ্টে আছে বাবরি চুলগুলো। ইফান যত্ন নিয়ে এলোমেলো চুলগুলো আমার কানে গুঁজে দিল। অতঃপর চোখের কুণিশ মুছে দিতে দিতে বিদ্রূপমাখা কণ্ঠে আওড়াল,
–“এত বড় মেয়ে এখনো নাক দিয়ে হিঙ্গি পড়ে!”

তড়িৎ গতিতে চোখ মেলে তাকালাম। ইফান আমার দৃষ্টি উপেক্ষা করল। এদিকে অপ’মানবোধ করে রা’গে ফুঁসছি। ইফান নিজ উদ্যোগে আমার নাকের পানি মুছে দিল। এখনো পলকহীন আমি তার দিকে তাকিয়ে। ইফান আড়চোখে আমার ক্রো’ধে লাল হওয়া মুখাবয়ব পরখ করল। অতঃপর উপরের দাঁত কপাটি দিয়ে নিচের অধর কামড়ে দৃষ্টি অন্যদিকে ঘুরিয়ে নিল। আমিও ঝুকে একনাগাড়ে তার চেহারার পানে চেয়ে রইলাম। এবারও ইফান আমাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে ফের আরেক পাশে দৃষ্টি সরিয়ে নিল। আমিও নাছোড়বান্দার মতো ফের সেইদিকে ফিরে তাঁর চেহারার উপর ঝুঁকে এক দৃষ্টিতে চেয়ে রইলাম। একমুহূর্ত যেতে না যেতে সকল নৈঃশব্দ্য ভেদ করে ইফান ফিক করে হেসে উঠল। তৎক্ষনাৎ রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে আমি ওর বুকে একনাগাড়ে কিল বসাতে বসাতে আওড়ালাম,

–“কু’ত্তা!”
আমি সত্যি সত্যি রেগে গেছি বুঝতে পেরে ইফান আমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে পিঠ চাপড়ে শান্ত হতে বলল। আমি গাল ফুলিয়ে চুপটি করে ওর বক্ষে মিশে রইলাম। রাতের গভীরতা আরও বেড়ে গেল। ঝিঁঝিপোকাড়া অবিশ্রান্ত ডেকে চলছে। ওদিকে ব্রুনো একটা ফড়িংয়ের পিছু ছুটতে ব্যতিব্যস্ত। বেটা ফড়িংটাকে না ধরা অব্ধি বোধহয় দমবে না। এদিকে বাগানের জমিনের নরম ঘাসের উপর চিত হয়ে নিজের এক হাতের উপর মাথা রেখে শুয়ে আছে ইফান। তার আরেক বাহুর উপর মাথা রেখে পাশেই শুয়ে আমি। আমাদের দৃষ্টি আকাশের নীলিমায় সীমাবদ্ধ। ইফান ক্লান্তিহীন সেই দিগন্তের পানে চেয়ে। আমিও একইভাবে চেয়ে রইলাম। আকাশের পানে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই আমার মনে হাজারো স্মৃতিরা মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। কত কি যে ভাবলাম! তারপর ক্লান্ত হয়ে চোখ বুঝলাম। ইফানেরও নীলিমার উপর থেকে দৃষ্টি সরল। অতঃপর তার নীলাঞ্জনার শরৎ-এর কাশফুলের ন্যায় শুভ্র, স্নিগ্ধ মুখাবয়বখানা দেখেই রাতের প্রতিটি প্রহর নিদ্রাহীন পার হয়ে গেল। অথচ সে-সবে মাফিয়া বসের বিন্দুমাত্র খেয়ালই হলো না।

কেরানীগঞ্জ।।
চতুর্দিকে ভারী নিস্তব্ধতা। রাতের চতুর্থ প্রহর চলছে। বুড়িগঙ্গা নদীর পাড়ে আপনমনে বসে আছে জিতু ভাইয়া। পূর্ণিমার চাঁদের আলোয় দৃশ্যমান তার বিশালদেহী অবয়ব। দখিনা দমকা হাওয়ার বেগে তার অযত্নে বেড়ে ওঠা উষ্কখুষ্ক চুলগুলো চোখেমুখে আঁচড়ে পড়ছে। সেই সাথে দেহে জড়ানো অভার সাইজ শার্টখানা অবেলায় দেহেই দোল খাচ্ছে। আশেপাশে কোথাও থেকে ব্যাঙের ঘ্যাঙর ঘ্যাঙর ডাক শুনা যাচ্ছে। আবার সূদুর থেকে শেয়ালের হাঁকও ভেসে আসছে। এদিকে বেখেয়ালি যুবকের সেসবে কোনো খেয়াল নেই। তার নিস্প্রভ দৃষ্টি গঙ্গার স্বচ্ছ পানিতে। সেখানের টলমটলে পানিতে ঝলসানো পূর্ণিমার চাঁদের চমৎকার প্রতিচ্ছবি ভেসে ওঠেছে। বেশ দূর হতে এক ঝলক টিমটিমে আলোর আভা দেখা যাচ্ছে। বোধহয় নিশুত রাতের মাঝিরা নৌকা বেয়ে চলেছে। তবে সেসবের প্রতি কোনো নজর নেই এই যুবকের। তার চোখেমুখে এক বৈরাগী উদাসীপনা। যেন দুনিয়ার যায় হয়ে যাক না কেন তাতে তার কিছু আসে যায় না।

আজ এতগুলো দিন পেরিয়ে গেল ইতি আর নাবিলা চৌধুরী আমাদের মধ্যে নেই। না চাইলেও আমরা বাস্তবতাকে গ্রহণ করেছি। কিন্তু জিতু ভাইয়া পারে নি। সেদিন সারারাত উন্মাদের মতো নিজ বুকে ইতিকে আঁকড়ে ধরে রেখেছিল জিতু ভাইয়া। ভোর প্রহরে সিআইডি টিম গিয়ে ইতির নিথর দেহখানা নিয়ে যায়। সেই মূহুর্তে জিতু ভাইয়ার আহাজারি সহ্য করার মতো ছিল না। সে কিছুতেই ইতির দেহকে নিজ বুক থেকে নিয়ে যেতে দিচ্ছিল না। সকলে জো’রজবরদস্তি করে ইতির থেকে আলাদা করেছিল। কিন্তু মন থেকে আজও কেউ জিতু ভাইয়ার লজ্জাবতীকে আলাদা করতে পারে নি। ছন্নছাড়া, বাঁধনহারা এক যাযাবরের মতো সারাদিনরাত মাঠেঘাটে, নিরিবিলি স্থানে উদাস হয়ে বসে থাকে। আজও তাই। রাত যে শেষ হলো বলে তার কোনো হুঁশ নেই এই যুবকের।

সময়ের কাঁটা তার নিজস্ব অমোঘ গতিতে এগিয়ে চলেছে। জিতু ভাইয়া এখনো নিজ স্থান থেকে অনড়। অলস ভঙ্গিমায় হাতজোড়া দু পায়ের হাঁটুর ওপর ঝুলিয়ে রেখেছে। ধীরে ধীরে তীব্র নিদ্রার ঘোরে তার ক্লান্ত চোখ জোড়া বুজে আসছে। এই কদিনে তার সময়ে অসময়ে অজস্র ভ্রম হয়েছে। মনে হয় এই তো তার লজ্জাবতী তার কাছেই। প্রতিবারের মতো এবারও জিতু ভাইয়ার ভ্রম হলো, একটা কোমল হাত তার কাঁধ স্পর্শ করেছে। সে দৃষ্টি ঘুরিয়ে পাশে দেখল। পূর্ণিমার আলোয় নজরে আসল ইতিকে। যে কিনা লাল টকটকে শাড়ি পরে পাশেই বসে আছে। রাঙা অধর জুরে লাজুক হাসি মাখা। জিতু ভাইয়ার অধরযুগল প্রসারিত হলো। ক্লান্তিহীন নয়ন জোড়া অপলক চেয়ে রইল সেই রূপবতীর মায়াবী চোখের তারায়।

জাহানারা পর্ব ৯০ (২)

জিতু ভাইয়া কল্পনার সাগরে নিমজ্জিত। সে সহাস্যে মাথা রাখল সেই অপরূপার কোলে। অবচেতন যুবক ঘোরে স্মিত হাসছে। কি চমৎকার মায়াবী সেই হাসি। সে কিছু বিড়বিড় করে অস্ফুটে আওড়ে যাচ্ছে। যেন সেই অপরূপার সাথেই কথোপকথনে মত্ত। অতঃপর একসময় সে চুপ হয়ে গেল। ঘুমের ঘোরেই তার অধরকোণে স্মিত হাসি লেপ্টে রইল। বিভ্রমের এই মায়াজালে ডুবে থাকার জন্য সে বুঝতেই পারল না সে কারো কোলে নয় বরং মাথার নিচে দু’হাত রেখে অবুঝ শিশুর ন্যায় গুটিসুটি হয়ে ঘাসের উপরই ঘুমিয়ে পড়েছে।

জাহানারা পর্ব ৯২