ভুলভাল অন্তরাল পর্ব ৩৬
মুশফিকা রহমান মৈথি
গাড়ি সোজা থামলো র্যাব-৬ ব্যাটেলিয়নের প্রশাসনিক ভবনের সামনে। চালক জোয়ানটি স্নিগ্ধকে উদ্দেশ্য করে বললো,
“স্যার চলে এসেছি!”
স্নিগ্ধ ইশারা করলো যেন শব্দ না করে। কারণ তার প্রশস্ত কাঁধে মাথা ঠেকিয়ে তার স্ত্রী ঘুমিয়ে আছে। সে ঘাড়টা ঘুরিয়ে একবার স্ত্রীকে ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকালো সে। এলোমেলো খোলা চুলগুলো মুখের উপর এসে ভীড়েছে। ক্লান্ত তৈলাক্ত মুখখানা সোডিয়ামের হলুদ আলোতে চকচক করছে। স্নিগ্ধ খুব আলতো হাতে কাঞ্চনের নরম চুলে হাত ঘোরালো। মোলায়েম স্বরে ডাকলো,
“হাড্ডি!”
দুবার ডাকতেই চোখ মেললো কাঞ্চন। তার চোখে মুখে বিমূঢ়তা। স্নিগ্ধ আস্তে করে বললো,
“চলে এসেছি!”
কাঞ্চনের মাথা তখন সজাগ হয় নি। ঘুমে ঢুলঢুল করছে। গা কাঁপছে। স্নিগ্ধ তার দিকে হাত বাড়িয়ে দিলো। স্নিগ্ধের দৃষ্টি এখন মোলায়েম। এই লোকের মুডসুইং আসলে ধরতে পারে না কাঞ্চন। কিছুক্ষণ পূর্বেও তার দৃষ্টি, মুখোভাব ছিলো অত্যন্ত ধাঁরালো, কঠিন। অথচ এখন সেই কাঠিন্য নেই। বরং উষ্ণতা খুঁজে পেলো সে। স্নিগ্ধের বাড়িয়ে থাকা হাত ধরে নামালো কাঞ্চন।
লবণচোরা সদরদপ্তরে বিষয়টা ইতোমধ্যে জানানো হয়েছে। অধিনায়ক থেকে এডি সরফরাজ পটনভী এবং স্ত্রীর থাকার ব্যবস্থা করার নির্দেশ এসেছে। তাদের মেডিকেল টেস্ট করানোর কথাও উল্লেখ আছে। ডাকাতগুলো বিপজ্জনক কম বোকা বেশি ছিলো সেটা তাদের জানা ছিলো না। ডিউটিরত অফিসারের উপর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। স্নিগ্ধদের গাড়ি টো করার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।
র্যাবের ব্যারাকে এই প্রথম কাঞ্চনের আগমণ। ঢুলুঢুলু চোখ নিয়ে সে দেখছে আশপাশটা। বাহির থেকে বহুবার ব্যাটালিয়নের সদরদপ্তরের মূল ফটক দেখেছে। অদেখা জিনিসের প্রতি মানুষের অবাধ্য আকর্ষণ থাকে। কাঞ্চনেরও সামরিক বাহিনীর এই ক্যাম্পগুলোর প্রতি নিরেট আকর্ষণ। কেন যেন ফোর্স কথাটাতেই তার টান বেশি। তাদের চালচলন, কাঠিন্য, দৃঢ়তা তাকে মুগ্ধ করে। হয়তো এই খাঁদহীন মুগ্ধতার কারণ স্নিগ্ধ ভাই। কাঞ্চনের এখনো মনে আছে, স্নিগ্ধ যখন প্রথম সেই কালো পোশাকটি প্রথম গায়ে দিয়েছিলো সে চোখ সরাতে পারছিলো না। পুলিশি কাট চুল। পোড়া চামড়ায় কালো পোশাকটি জ্বলজ্বল করছিলো। কেন যেন মনে হচ্ছিলো এই পোশাক, এই পেশা স্নিগ্ধ ভাইয়ের জন্যই। তার শানিত দৃষ্টি, ধাঁরালো চোয়াল শোভা বর্ধন করছিলো যেন। সেই সাথে যে রাতগুলোতে স্নিগ্ধভাই রক্তস্নাত হয়ে ফিরত তাকে বিভীষিকাময় লাগতো। যেন কোনো দানবের আবির্ভাব হয়েছে।
কাঞ্চন যখন মুগ্ধ নয়নে সব দেখছিলো ডিউটিরত অফিসার স্নিগ্ধকে গেস্ট রেস্ট হাউজের চাবি বুঝিয়ে দিচ্ছিলো। কাঞ্চনের মনে হলো সে কোনো ফাইভ স্টার হোটেলের কামরাতে এসেছে। এতোটাই গুছানো এবং পরিপাটি রুমটি। প্রয়োজনীয় সামগ্রী পৌছে দেওয়া হলো তাদের। স্নিগ্ধ শার্টটা খুললো। বিছানায় গা এলিয়ে দিলো সে। কাঞ্চনের উদ্দেশ্যে বললো,
“ফ্রেশ হয়ে আয়। কিছু কি লাগবে?”
কাঞ্চন মাথা দোলালো। তার কিছু লাগবে না। কি মনে করে তার ব্যাগে একটা টিশার্ট এবং একটা ট্রাউজার রেখেছিলো। এখন সেটা কাজে দিবে। সারাদিনের জার্নির পর এখন শরীর ভেঙ্গে আসছে ক্লান্তিতে। কম কি ধকল গেলো? স্নিগ্ধকে শুধালো,
“তুমি ফ্রেশ হবে না?”
“হু হব। তুই আয়। আমি একটু শুলাম।”
“ঘুমিও না, কিন্তু!”
গোসল সেরে এসে দেখলো স্নিগ্ধ উদাম পিঠখানা উলটে শুয়ে আছে। বালিশে মুখ গুঁজে রেখেছে। কাঞ্চন কাছে আসতেই দেখলো তার চোখ বন্ধ। উদাম পিঠটা ঘামে জবজব করছে। খুব ক্লান্ত লাগছে তাকে। কাঞ্চনের কি একটু মায়া করা উচিত ক্লান্ত মুখখানা দেখে। খাবার চলে আসবে এখনই। না খেয়ে ঘুমালে শরীর খারাপ হবে।
সে স্নিগ্ধের পাশে বসলো তার। চুল মুছে নি। পানি পড়ছে চুল থেকে। কিছুসময় সে স্থির চোখে তাকিয়ে রইলো স্বামীর দিকে। আনমনেই বাড়িয়ে দিলো হাতটা। স্নিগ্ধর রুক্ষ্ণ চুলের ভেতর হাত ঘুরালো। স্নিগ্ধ নড়লো না। তার চোখ এখনো বন্ধ।
আজকে একটা জন্মদিনও কাঁটলো কাঞ্চনের। জীবনের চিরস্মরণীয় জন্মদিন। এমন জন্মদিন আগে কি কেঁটেছে? না। বরাবরই সাদামাটা কোনোমতে একটা দিন কাটতো তার। জন্মদিন নামক অনুভূতির ছিঁটাফোঁটাও থাকতো না সেই দিনগুলোতে। আজকের দিনটা ভিন্ন ছিলো। অনেকগুলো বিক্ষিপ্ত ঘটনা ঘটেছে। কিছু ঘটনা মনে বাজেভাবে প্রভাবও ফেলেছে। তবে কেন যেন জন্মদিন জন্মদিন রেশটা ছিলো। ঢাকায় থাকলে কি এমন অভিনব জন্মদিন কাঁটতো? অবশ্যই না। ফলে আনমনেই হাসলো সে। এর মধ্যে দরজায় কড়া পড়লো। দ্রুত নিজের হাত গুটিয়ে নিয়ে কাঞ্চন উঠে দাঁড়ালো। ঠিক তখনই স্নিগ্ধ তার হাত টেনে ধরলো। ভারী স্বরে বললো,
“বস। আমি দেখছি।“
কাঞ্চন কিঞ্চিত ভ্যাবাচেকা খেলো। সে এতোটা সময় হাভাতের মতো তাকিয়ে ছিলো স্নিগ্ধর দিকে। ফলে খানিকটা বিব্রত হলো সে। নিশ্চয়ই এই কথাটা নিয়ে পরে খুঁচাবে স্নিগ্ধ। ফলে আপনাআপনি মাথায় একটা গাট্টা দিলো কাঞ্চন।
ক্লান্ত শরীরে শার্টটা গলিয়ে দরজা খুললো স্নিগ্ধ। DAD অফিসার দাঁড়িয়ে আছে তার সামনে। সে তাকে বিনয়ের সাথে বললো,
“স্যার, কিছু বলার ছিলো।“
“আই এম কামিং।“
ঘরে কথা বলার ইচ্ছে হলো না স্নিগ্ধের। অফিসার মাথা দুলিয়ে চলে গেলো। কাঞ্চনের চোখে মুখে বিস্ময়। স্নিগ্ধ তার দিকে তাকালো। মেয়েটা উৎসুক চোখে তাকিয়ে আছে। ভেজা চুল থেকে পানি পড়ে টিশার্টের গলা ভিজে গেছে। স্নিগ্ধ গাঢ় চোখে কিছুসময় চেয়ে রইলো তার দিকে। অতঃপর চোখ সরিয়ে নিলো। অন্যদিকে তাকিয়ে কাঞ্চনের উদ্দেশ্যে বললো,
“আমি একটু আসছি।“
কাঞ্চন বিস্ময় চাপা না রেখে শুধালো,
“কোথায় যাচ্ছো?”
“ওই ব্যান্ডিটদের রিপোর্ট করতে হবে।“
“ওদের না ধরিয়ে দিলে?”
“এখানেও কিছু ফর্মালিটিস আছে।“
কিছু একটা ভেবে কৌতুহলী স্বরে কাঞ্চন শুধালো,
“ওদের কি শাস্তি হবে?”
“হু নোজ!”
দায়সারা সংক্ষিপ্ত উত্তর দিলো স্নিগ্ধ। কাঞ্চন দীর্ঘশ্বাস ফেললো। স্নিগ্ধ চলে গেলো। যাবতীয় সব ফর্মালিটিস শেষ করে সে আসলো একঘন্টা পর। কাঞ্চন তখন অন্যমনস্ক হয়ে বসে রয়েছে। ভেজা চুল এখনো আগের মতোই। স্নিগ্ধ গামছাটা হাতে নিয়ে তার চুল মোছা শুরু করলো। কাঞ্চন এতোটাই অন্যমনস্ক ছিলো যে টের অবধি পায় নি স্নিগ্ধের পায়ের শব্দ। সে চমকে উঠতেই স্নিগ্ধ শুধালো,
“কি ভাবছিস?”
প্রশ্নে চোখ তুলে তাকালো সে। চোখে মুখে কেমন বিষন্নতা। স্নিগ্ধ ঘাড় বাকিয়ে শুধালো,
“কি হয়েছে?”
কাঞ্চন ঘুরলো তার দিকে। ঠোঁট কামড়ে শুধালো,
“আচ্ছা, ক্রিমিনালরা যদি শাস্তি পায় তখন তাদের পরিবারের কি হয়?”
“তুই এখনো তাদের নিয়ে চিন্তা করছিস?”
“আমার মুখের সামনে এখনো লোকটার চেহারা ভাসছে। মায়া হচ্ছে। ওর মেয়েটা অসুস্থ।“
ভনীতাহীন উত্তরের সাপেক্ষে স্নিগ্ধ দীর্ঘশ্বাস ফেললো। বসলো ঠিক কাঞ্চনের বিপরীতে। কাঞ্চনের পা পায়ে গোল্ডেন রঙের একটি পায়েল। স্নিগ্ধ তার পায়েলটা ছুলো আলতো করে। ঝুনঝুনি গুলো আলতো আঙ্গুলে নাড়াচাড়া করলো। একটু শব্দ হলো যেন। স্নিগ্ধ পা সরালো না। তার মনোযোগ এখন স্নিগ্ধের মুখোপানে। অধৈর্য্য হলো না। স্নিগ্ধ নির্লিপ্তভঙ্গিতে বলল,
“তারা আইনের চোখে দোষী। আইন তাদের যা শাস্তি দিবে তাদের সেটা মেনে নিতে হবে। এটাই তাদের নিয়তি। তাদের পরিবার নির্দোষ হলেও পাপী মরে সাত ঘর নিয়ে। সো আমাদের কিছুই করার নেই। জাস্ট বিকজ লোকটা দেখতে অসহায় দ্যাট ডাজেন্ট মিন দে আর ইনোসেন্ট।“
স্নিগ্ধর কথা লজিক্যাল। তাও সর্দারের মেয়েটার কথা ভেবে কাঞ্চনের মন তরল হয়ে যাচ্ছে। অসুস্থ মেয়েটার তো দোষ নেই। অথচ এখন তার চিকিৎসা হবে না। তার বাবার শাস্তি তাকে ভোগ করতেই হবে। স্নিগ্ধ আবারোও নির্বিকার স্বরে বললো,
“আর ভাবিস না। খাবার এসে পরবে। এসব ফাও চিন্তা না করে খেয়ে ঘুম দে। সকালে বাসায় একবার যেতে হবে। তারপর ঢাকা। পৃথুলার বিয়ে বোধ হয় পাকাপাকি হয়ে যাচ্ছে।“
“আমি ভাবা ছাড়তে পারছি না। কি করবো বলো? আমি তো আর তোমার মতো না।”
“আমি কেমন?”
ছোট করে শুধালো স্নিগ্ধ। কাঞ্চন পাটা সরাতে গেলো। স্নিগ্ধ খপ করে সেটা ধরে নিজের কাছে টেনে নিলো। আবারো শুধালো,
“আমি কেমন?”
“তুমি সিমেন্টের বস্তা। একেবারে হার্টলেস, ইমোশনলেস, ইগোয়িস্টিক, ম্যানুপুলেটিভ জার্ক।“
স্নিগ্ধর ঠোঁট হাসলো যেন। গআ এলিয়ে দিলো সে। ভারী স্বরে বললো,
“Yes, I am a HEARTLESS, EMOTIONLESS JERK. When you fight monsters, you become ONE.”
কাঞ্চন স্থির চোখে চাইলো স্নিগ্ধর দিকে। সে ভুলেই গিয়েছিলো লোকটা ঠিক কতগুলো এনকাউন্টার করেছে। একটা তো তার সামনেই করেছিলো। কাঞ্চন ভাষা হারিয়ে ফেললো যেন। এই লোকের কাছে ক্রিমিনাল শুধু ক্রিমিনাল। সেখানে সিমপ্যাথির জায়গা নেই। স্নিগ্ধ তার পায়েলটাতে আবারোও আঙ্গুল বুলাচ্ছে। রুক্ষ্ণ আঙ্গুলের স্পর্শে গায়ে শিরিশির করছে কাঞ্চনের। কিন্তু পা সরালে গেলেই লোকটা শক্ত করে ধরছে। স্নিগ্ধর চোখ এখনো তার পায়েই আবদ্ধ। সোনালি রঙের পায়েলটার দিকেই আঁটকে আছে চোখ আঁটকে গেছে যেন। সেটাকে হালকা নাড়াতে নাড়াতে ভারী স্বরে বলল,
“তোদের জেনারেশনের এই ঝামেলা। সিম্প্যাথি বেশী। খারাপ মানুষেরাও তোদের মস্তিষ্কে হিরোর জায়গা নিয়ে বসে আছে।”
“মোটেই না। আর তুমি দাদা-নানার মতো কথা বলছো কেন? এমন ভাব যেন আমার থেকে তুমি অনেক বড়!”
“অবশ্যই বড়, সাত বছর। আমি মিলেনিয়াল, তুই জেনজি!”
“তাতে খুব আলাদা হয়ে গেছি!”
“চিন্তাধারা আকাশ পাতাল পার্থক্য! ওই যে বললাম, তোরা বেশি ইমোশনাল।”
“কিভাবে শুনি?”
কাঞ্চন একটা হাটু ভাঁজ করে থুতনি ঠেকালো। তার মনোযোগ স্নিগ্ধতে নিবদ্ধ। স্নিগ্ধ হাসলো হালকা। কখনো তার সাথে ক্রিমিনাল সংক্রান্ত আলোচনা এ যাবৎ কেউ করেছে কি না মনে পড়ছে না। স্নিগ্ধ হেলান দিয়ে কাঞ্চনের পা টা টেনে নিজের বুকের উপর রাখলো। হিল পড়ে থাকায় তার পা টা ফুলে গেছে। বুড়ো আঙ্গুলে ঠসা পড়েছে। আলতো করে পায়েলটার সাথে খেলতে খেলতে নির্লিপ্ত স্বরে শুধালো,
“এই পায়েলটা কে দিয়েছে তোকে?”
“উফ কথা ঘুরিও না। আগে বল আমরা বেশি ইমোশনাল কি করে?“
“আগে বল, এটা কে দিয়েছে?”
কাঞ্চন গাল ফুলিয়ে তপ্ত নিঃশ্বাস ফেলে বলল,
“পৃথুলা। সেটা কি ইম্পোর্টেন্ট?”
স্নিগ্ধ উত্তর করলো না। হেসে আয়েশি ভঙ্গিতে বলল,
“আমার জন্য।“
“এবার কি আমার প্রশ্নের উত্তর দেওয়া যাবে?”
“ধর একটা ছেলে, যার একটা হ্যাপি ফ্যামিলি ছিলো। যখন বয়স বারো কি তেরো, একদিন কিছু দূর্বৃত্ত তার বাবাকে মেরে ফেলে। গলার নালি কেটে তার চোখের সামনে। সে খাটের নিচে লুকিয়ে থাকে প্রাণ বাঁচাতে। তার চোখের সামনে তার বড় বোনকে রে—প করে, তার গর্ভবতী মাকে রে–প করে তার চোখের সামনে তার গলা কেঁটে ফেলে। একরাতের মধ্যে সে হয়ে যায় অনাথ। বিশাল পৃথিবীতে একা। রক্তে ভাসছে ঘর। চারজন মানুষের মাত্র একজন বেঁচে আছে। তার স্থান হয় রেল স্টেশনে। ক্ষুধার জ্বালা আর দারিদ্র নামক অভিশাপকে দূর করতে সে নেয় কুলির কাজ। ধীরে ধীরে ছোট ছোট পকেটমারি, রেললাইনের রড চুরি, জাহাজের তেল চুরি, কয়লার বগির কয়লা চুরি ইত্যাদি শুরু করে যেন অর্থের অভাবে না পরতে হয়। সেই নেশা যখন গাঢ় হয় সে চাঁদাবাজি, ছিনতাই শুরু করে। ধীরে ধীরে একটা গ্যাং তৈরি করে। সরকারি, বেসরকারি বিভিন্ন মানুষের জায়গা দখল করে সেখানে বস্তি বানায়। সেই বস্তির লোকেরা তার সাঙ্গপাঙ্গ। কেউ তার বিরোধীতা করলে তাকেই রাম দার সম্মুখীন হতে হয়। সে একজন সিরিয়াল কিলার, র্যা*পিস্ট। কতকত মেয়েকে তার ভোগের শিকার করেছে হিসাব নেই। সাংবাদিক থেকে শুরু করে পুলিশ অফিসার যেই তার বিরোধিতা করেছে সে তাকে নৃশংস ভাবে খুন করে বস্তায় ভরে নদীতে ফেলে দিয়েছে। এমনকি নিজের বডিগার্ডের স্ত্রীকেও সে রে–প করেছে। সে আবার তার ওয়াইফকে খুব ভালোবাসে। তার গায়ে কখনো ফুলের টোকাও দেয় নি। ওয়াইফ তাকে এতোটাই ভালোবাসে সে তার বিরুদ্ধে কোন জবানবন্দি দেয় নি। তার মেয়ের মতে সে শ্রেষ্ঠ বাবা। এখন তুই বল তার জঘন্য, প্যাথেটিক ছেলেবেলা কিংবা তার পরিবারের প্রতি যত্ন কি তার বর্তমানের নৃশংসতাকে জাস্টিফাই করে? সিম্প্যাথি দেখাবি? তাকে যখন আমি নিজ হাতে শ্যুট করেছি, আমার কি তার প্রতি সিম্প্যাথি দেখানো উচিত ছিলো? আমি কি ভিলেন?”
কাঞ্চন উত্তর করতে পারল না। হয়তো উত্তর নেই। তার মাথাই কাজ করছে না। স্নিগ্ধ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে গম্ভীর স্বরে বলল,
“আমি যে ফিল্ডে আছি সেখানে ইমোশনের স্থান নেই। ইমোশন না দেখাতে না দেখাতে এটা জড়োবস্তু হয়ে গেছে। আমি নিজেও মানি আমি একটা পাথর। আমার কনফিডেন্স হয়তো তোর কাছে এরোগেন্স লাগে। আমিও ক্রিমিনালদের থেকে খুব আলাদা নই। যখন মিশনে থাকি আমিও একটা জীবন্ত দানবের থেকে কম কিছু নই। আমার অস্ত্র তখন রক্তপিপাশু। আমাকেও প্রাণ নিতে হয়। আমি যদি তাদের শ্যুট না করি দে উইল কিল মি। আমার খুনগুলো আমার প্রফেশন ডিফেন্ড করে। আমি যা করি সেটা আইনের দায়রায়। আই হ্যাভ টু ডু ইট, এন্ড ডু ইট। এখন তুই বল আমার মধ্যে দয়ামায়া থাকলে আমি কি ওই জঘন্য ক্রিমিনালদের শ্যুট করতে পারতাম? আমি এমন ইমোশনলেস ভাবে ট্রেইন্ড। আমার প্রিয় মানুষটার মাথায় বন্দুক ঠেকালেও আমাকে শান্ত থাকতে হবে। আমাকে নির্লিপ্ত থাকতে হবে। আই কান্ট শো মাই ইমোশন এন্ড আই ওন্ট। আই এম নট এন ওপেন বুক।”
কাঞ্চন ঘাড় হেলিয়ে হাটুতে মুখ ঠেঁকিয়ে বিষন্ন গলায় বলল,
“তুমি কেন এই জঘন্য প্রফেশনে গিয়েছো?”
প্রশ্নটার জন্য প্রস্তুত ছিলো না স্নিগ্ধ। এই অবধি কেউ তাকে কখনো জিজ্ঞেস করে নি কেন যে পুলিশে গিয়েছে। পটনভীদের অর্থ সম্পদ কম নয়। স্নিগ্ধ চাইলেই খুব সহজে ব্যবসায় বসতে পারতো। নানাজান এতে প্রসন্ন হতেন। অথচ সে পুলিশে চাকরি নিয়েছে। ক্রাইম, ক্রিমিনালের মধ্যে নিজের রুঢ় জীবনটাকে সাজিয়েছে। কৌতুকি স্বরে শুধালো,
“আমার ব্যাপারে আমার হাড্ডির কৌতুহল হচ্ছে তাহলে?”
“কৌতুহলটা পুরোনো। জিজ্ঞেস এখন করলাম। তখন সুযোগ ছিলো না।“
নিষ্পাপ স্বীকারোক্তি কাঞ্চনের। স্নিগ্ধ মেনে নিলো। তাই সেও ভনীতাহীন উত্তর দিলো,
“আই লাভ মাই প্রফেশন। আমার ভালো লাগে। আমার ভেতরেও একটা দানব আছে যে রক্ত ভালোবাসে।“
“তোমার সত্যি ভয় করে না এমন সাংঘাতিক মিশনে যেতে? যখন সাংঘাতিক ক্রিমিনালদের অগ্নিঅস্ত্রের সামনে দাঁড়াও, তোমার বুক কাঁপে না?”
স্নিগ্ধ কিছুসময় চুপ করে রইলো। মস্তিষ্কের পুঞ্জিত স্মৃতিগুলোকে টেলে দেখলো। কখনো মিশনে যাবার সময় তার হৃদয় কেঁপেছে? মনে পড়ছে না। বরং মিশনে যাবার সময় তার মধ্যে আলাদা মাদকতা কাজ করে। মৃত্যুকে তখন পরোয়া করে না সে। কাঞ্চনের পায়েলটার সাথে খেলতে খেলতে স্নিগ্ধ ভারী স্বরে বললো,
“সেভাবে কখনো ভাবি নি। তবে আমার মিশন তোর জন্য কিন্তু বরদান। বাই এনি চাঞ্চ আমি মরে গেলে তুই বেঁচে যাবি।”
কথাটা শুনতেই বুকটা কেন যেন কেঁপে উঠলো কাঞ্চনের। চিনচিনে ব্যথা হলো যেন। স্নিগ্ধকে শতবার খুন করবো বললেও স্নিগ্ধর মৃত্যুর কথাটায় বুকে কামড় পড়লো। মুখশ্রীতেও ধরা দিলো উৎকুণ্ঠা। ফলে নড়েচড়ে উঠলো সে। কঠিন স্বরে বললো,
“আজেবাজে কথা বলো না।“
“আজেবাজে কথা বলছি না কি? কতবার আমি আহত হয়েছি হিসেব আছে?“
কাঞ্চন নিজের পা টা ছাড়িয়ে নিলো কাঞ্চনের হাতের বলয় থেকে। শিরদাঁড়া সোজা করে বলল,
“তাহলে কে বলেছে এমন সাংঘাতিক মিশনে যেতে?”
“প্রফেশন ডিমান্ডস। টাকা বেশি। একটা আলাদা পৈশাচিক আনন্দ লাগে। তখন আমি অন্য বলয়ে থাকি। ইট ফিলস ডিফারেন্ট। ঢাকায় ফেরার পরও আমাকে নতুন একটা মিশনে দেওয়া হয়ে। হয়তো কয়েক দিন আমি বাড়িও ফিরতে পারবো না। আমাকে ফিল্ডে থাকতে হবে।“
“অতকিছু বুঝি না। মিশনে যাও না মঙ্গলগ্রহে তোমার বিষয়। কিন্তু আস্তো ফিরবা বাসায়।”
কাঞ্চনের স্বর খাঁদে নামলো। সে টিশার্টের কোনাটা দলামচা করছে। স্নিগ্ধ স্থির চোখে তার দিকে তাকিয়ে রইলো। খুব গাঢ় স্বরে বলল,
“তুই জানিস তুই কি বলছিস?”
“হ্যা জানি।“
ফিঁচেল হাসি উন্মোচিত হলো স্নিগ্ধের ঠোঁটে। কাঞ্চনের হাতটা খপ করে ধরে টেনে নিলো নিজের কাছে। কপালের উপর পরে থাকা ভেজা চুলগুলো আলতো হাতে সরিয়ে বলল,
“মরে গেলে বুঝি কষ্ট পাবি?”
কাঞ্চন চোখ নামিয়ে নিলো। হুট করে ভেতরটা অস্থির হয়ে গেলো। গলার স্বর আঁটকে আসছে তার। কেমন হাসফাঁস লাগছে। বুকের মধ্যখানে একটা অসহনীয় তীক্ষ্ণ ব্যথা হচ্ছে, যার কোনো কারণ নেই। ফলে দৃষ্টি সরিয়ে কেমন আদেশের সুরে বলল,
“মরলে আমাকে ডিভোর্স দিয়ে মর। তোমার বিধবা হব না আমি।“
স্নিগ্ধ তার কপালে কপাল ছুঁয়ে ভারী স্বরে বললো,
“ডোন্ট ওয়ারি আই উইল নট ডাই। মরলে তোকে নিয়েই মরবো।“
কাঞ্চন তার চোখে চোখ রেখে বললো,
“মনে থাকে যেন। আমার বর থাকাকালীন তোমার মরা নিষেধ।“
স্নিগ্ধ তার কানের লতিটা হালকা করে টোকা দিয়ে গাঢ় স্বরে বলল,
“হাউ সুইট, হাড্ডি। মানুষ ভাববে আমাদের মধ্যে না জানি কত প্রেম!“
“কেউ ভাববে না। বরং মানুষকে জিজ্ঞেস কর, বলবে উই আর নট মেইড ফর ইচ আদার।“
স্নিগ্ধ ধীর গলায় শুধালো,
“ওদের কথা বলছি না। তোরও সেটাই মনে হয়?”
কাঞ্চন কিছু সময় চুপ থেকে বলল,
“না, ইউ আর এন্ড উইল বি মাই মর্টাল এনিমি।“
স্নিগ্ধ তার কপালে চুমু আঁকলো। কেঁপে উঠলো কাঞ্চন রুক্ষ্ম ঠোঁটের স্পর্শে। ঘাড়ের পেছনে হাতটা গলিয়ে খুব ধীর স্বরে বলল,
“আই এম অবলাইজড।“
সকালে ব্যারাক ছাড়ার আগে অধিনায়কের সাথে দেখা করলো স্নিগ্ধ এবং কাঞ্চন। কাঞ্চনকে পরিচয় করিয়ে দিলো স্নিগ্ধ। কাঞ্চন জড়তা, লজ্জায় বুদ হচ্ছিলো। এতো উচ্চপর্যায়ের মানুষের সাথে এই প্রথম তার পরিচয় হচ্ছে। ফলে তার মধ্যে এক অদ্ভূত বিভ্রতবোধ কাজ করছে। অধিনায়ক ডিআইজি পলাশ সাহাকে খুব প্রসন্ন দেখালো। তিনি স্নিগ্ধর সাহসিকতার প্রশংসা করলেন। গতরাতে যে ডাকাত দল ধরা পরেছে, তাদের বহু মাস ধরে পুলিশ খুঁজছে। তাদের সন্ত্রাশে ওই রাস্তায় গাড়ির চলাচলই এখন আতঙ্কময় হয়ে উঠেছে। স্নিগ্ধ বেশ আত্মবিশ্বাসী গলায় বললো,
“ক্রেডিট গোজ টু মাই ওয়াইফ স্যার। দে ফল ফর হার এনোয়িং ইনোসেন্স।“
কাঞ্চন বাঁকা চোখে তাকালো স্নিগ্ধের দিকে। স্নিগ্ধ আড়চোখে তার দিকে তাকিয়ে মিচকে হেসে চোখ টিপ দিলো।
পটনভী মঞ্জিলে স্নিগ্ধরা পৌছালো রাত আটটার দিকে। পাঁচদিন পর কাঞ্চনের আগমন। অঞ্জনা এবং কাজিনমহলে তার আগমন শুভেচ্ছায় স্বাগতমের চেয়ে এক বিন্দু কম হলো না। স্নিগ্ধ পটনভী মঞ্জিলে আসতেই গিরগিটির মতো রঙ বদলে নিলো। আবার সেই কঠিন, নবাবীয়ানা ঘিরে ধরলো তাকে। নাক শিটকানো ভাবটা বজায় রেখে নিজের ঘরে চলে গেলো সে। এদিকে অঞ্জনা তার গলা জড়িয়ে প্রায় কাঁদো স্বরে বলল,
“তুই আস্তো আছিস? আমি তো ভাবছিলাম স্নিগ্ধ ভাই তোকে লবন, হলুদ আর বারকিউ সস মেরে শিক কাবাব বানিয়ে খেয়ে ফেলেছে। তুই সারভাইভ করলি কেমনে আম্মা?”
স্নিগ্ধ কেমন সেটা তো কাজিনমহলের অজানা নয়। এই মানুষটা শাস্তি দিতেই তাকে খুলনায় নিজে গিয়েছিলো। শাস্তি কতটুকু হয়েছে সেই হিসেব নেই। কিন্তু ঝগড়া দিনে দু থেকে চার বার হয়েছে। সেই কাহিনী কাজিনমহলকে জানানো যাবে না। তাই কাজিনমহলে চাপামাসির ঠাটবাট বজায় রাখতে কাঞ্চন চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ভাব মেরে বললো,
“ওই তো, বুদ্ধি থাকতে হয়। বুদ্ধি থাকলে সিংহের মুখেও পায়ে পা তুলে ভার্জিন মোহিতো খাওয়া যায়।”
পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলো রিদম। বাঁকা স্বরে নির্লিপ্ত ভাব মেরে বলল,
“শালা প্রাণআপের মতো চেহারা নিয়ে ভার্জিন মোহিতো খাইতে আসছে!”
কাঞ্চন কঠিন চোখে তাকালো রিদমের দিকে। পাঁচদিন আগেও তাকে মানুষের বাচ্চা লাগছিলো। আজকে মনে হচ্ছে দেবদাসও বুঝি তার কাছ থেকেই দীক্ষা নিয়ে দেবদাস হয়েছে। ফলে অঞ্জনাকে বললো,
“এই কলপাড়ের পাশে পড়ে থাকা ভাঙ্গা পাতিলের কি হইছে?”
উক্তিটা যেন তাকবিরের খুব ভালো লাগলো। রিদম সাথে সাথেই ক্ষিপ্র স্বরে স্বরে বললো,
“সম্মান দে, দুই বছরের বড় আমি!”
কাঞ্চন নিজেকে শুধরে নিলো। বিনয়ের সাথে বলল,
“আমাদের দুই বছরের বড় ভাইজানের কি হয়েছে?”
অঞ্জনা হাসি চেপে বলল,
“আমাদের ইয়ো ইয়ো হানি সিং এখন অরিজিৎ সিং হয়ে গেছেন। এই মাসের শেষে দেখবি চান্না মেরে আ গান গাচ্ছে!”
“চুপ কর। শাকচুন্নির ঘরে থাকতে থাকতে শাকচুন্নি ২.০ হয়ে গেছোস। ওই রাখি সাবান্তের জন্য আমি হব আরিজিৎ সিং? স্বপ্নে?”
কাঞ্চন ঘাড় ঘুরিয়ে পৃথুলাকে খুঁজলো। পৃথুলা ঘর থেকে বের হয় নি। অঞ্জনার দিকে তাকাতেই সে বলল,
“ওর মাথা ব্যথা করছে। রাতে জ্বরও এসেছিলো।“
“প্রেমের জ্বর?”
“না রে। ছ্যাকার জ্বর।“
রিদম শুনেও না শোনার ভাব ধরলো। পৃথুলার জ্বর এসেছে সে জানে। মেয়েটা নিশ্চয়ই কালকে রাতে ঠান্ডা পানিতে ভিজেছিলো। ফলে এখন জ্বর বাঁধিয়েছে। পৃথুলাকে রন্ধ্রে রন্ধ্রে চিনে সে। পৃথুলা কিসে শান্ত হয়, কিসে খুশি হয়, কিসে রাগে সবকিছুই তার জানা। পৃথুলা বরাবর খুব পসেসিভ। অঞ্জনা কিংবা কাঞ্চনকেও সে কখনো ভাগ করে নি। তাদেরকে কেউ উস্কাতে আসতে সে সিংহীর মতো আগলেছে। সানিয়া বরাবর কাঞ্চনকে অপছন্দ করে। তার সাথে ঝগড়া করে। সুযোগ খুঁজে কাঞ্চনকে অপদস্ত করার। একারণে সে পৃথুলার কাছে অনেকবার মারও খেয়েছে।
রিদমের প্রতি কখনো পৃথুলার এতোটা টান ছিলো না। সারাক্ষণ তার সাথে ঝগড়াই করেছে সে। খেলা থেকে যাবতীয় সবকিছুতেই পৃথুলার সাথে তার একবার না একবার বাগড়া বাধতোই। পৃথুলা পঁচাতো রিদমকে। আর রিদমও বেশ মজা পেতো তাকে খুঁচাতে, জ্বালাতে। পৃথুলাকে উত্যক্ত করার মধ্যে একটা পৈশাচিক আনন্দ খুঁজে পেত সে। হয়তো একারণেই ভেবেছিলো পৃথুলাকে জীবনসঙ্গী বানালে তার জীবনে বিনোদনের অভাব হবে না। পৃথুলা তাকে নিশ্চয়ই ভালোবাসবে না। ফলে তার উপর অধিকারবোধও থাকবে না। কারণ পৃথুলা শুধু তার বৃত্তের মানুষগুলোর প্রতিই অধিকারবোধ দেখায়।
রিদমও যে তার সেই বৃত্তের মধ্যে পড়ে যাবে বুঝতে পারে নি। যখন বুঝলো তখন পৃথুলার এই অধিকারবোধ কাঁটার মত তখন ছটফটিয়ে উঠলো রিদম। পৃথুলার অধিকারবোধকে সে দোষারোপ করে না। কখনোই করবে না। কারণ প্রতিটা মানুষ নিজস্ব একটা পৃথিবী চায়। তবে পৃথুলার ক্ষেত্রে সেই চাওয়াটা অন্যায় নয়। রিদম কি কখনো তার সেই পৃথিবী হতে পারতো? হয়তো পারতো? কিন্তু সে চায় নি। কারণ কারোর কাছে জবাবদিহি করার কোনো ইচ্ছে তার ছিলো না। গৎবাধা সম্পর্ক তার পছন্দ নয়। অথচ পৃথুলা একটা টিপিক্যাল গার্লফ্রেন্ড হয়ে উঠলো। অন্য মেয়েদের প্রতি তার ঈর্ষা, রিদমের প্রতি অধিকারবোধ প্রবল হয়ে উঠলো। পৃথুলার সন্দেহ দূর করাটা খুব কষ্টকর ছিলো না রিদমের জন্য। অথচ সে ইচ্ছে করেই করে নি। সে কখনোই কারোর কাছে বাঁধা পড়তে চায় না। সে মুক্ত থাকতে চায়।
অথচ কেন যেন পৃথুলা নামক নারীতে বারে বারে সে আঁটকাচ্ছে। বারবার মনটা তার জন্যই বিষন্ন হয়ে উঠছে। তার মস্তিষ্ক বারবার চাইছে যেন পৃথুলার বিয়েটা হয়ে যাক। এই অদৃশ্য শেকলটা ভাঙ্গুক। অথচ মনের ভেতর কোথাও না কোথাও তিক্ত যন্ত্রণা হচ্ছে। পারভেজ ছেলেটাকেও কেন যেন সহ্য হচ্ছে না। পৃথুলা যখন তার সাথে হাসছে রিদমের ঈর্ষা হচ্ছে। ইচ্ছে হচ্ছে পারভেজের দাঁত ভেঙ্গে দিতে। এতো হাসার কিছুই হয় নি, শালা ক্লোজাপের এড হচ্ছে নাকি। দাঁতও সুন্দর না। রিদম মন এবং মস্তিষ্কের এই দোটানায় ক্লান্ত। ইচ্ছে করছে ঘর ছেড়ে বান্দরবানে চলে যেতে। এতে করে শান্তি মিলবে অন্তত।
কাঞ্চনের সাথে পারভেজের দেখা হলো খাবার টেবিলে। ছেলেটাকে দেখেই কাঞ্চনের মনে একটা সন্দেহ জাগলো। অঞ্জনার দিকে তাকাতেই সে তার মনের কথা আঁচ করে ফেললো। অঞ্জনা ইশারায় বুঝালো,
“হ্যা, ঠিক ভাবছিস।“
খাওয়া শেষে স্নিগ্ধর ফোন বেজে উঠলো। সে কথা বলতে বলতে বেরিয়ে গেলো। তখন কাঞ্চন পারভেজের সাথে আনুষ্ঠানিকতার সাথে পরিচিত হলো। কাঞ্চন কি ভেবে শুধালো,
“আমাদের দেশ কেমন লাগলো?”
“মোটামুটি। একটু বোরিং।“
কাঞ্চন ভ্রু কুচকে শুধালো,
“বোরিং?”
“হ্যা, তেমন এক্সাইটিং কিছু নেই।“
“তাহলে রিদমের সাথে আপনাকে বের হতে হয়। এক্সাইটমেন্ট কত প্রকার সব বুঝিয়ে দিবে। কিরে পাতিল দুলাভাইকে দেশ দেখাস নি?“
পারভেজ দুলাভাই শব্দে লজ্জা পেলো। রিদম কঠিন চোখে কাঞ্চনের দিকে তাকালো। কাঞ্চন ভ্রু নাচালো। রিদম আস্তে করে পটনভী জেনারেশনের মিডল ফিঙ্গার দেখালো তাকে। পটনভী নিউ জেনারেশনের মিডল ফিঙ্গার দেখানোর নিয়ম আলাদা। যেন বড়রা কেউ টের না পায় সেকারণে তারা মিডল ফিঙ্গার বের না করে বুড়ো আঙুল এবং কনিষ্ঠ আঙুল বের করে। বাকি আঙ্গুল থাকে মুষ্টিবদ্ধ। তারপর সে হাতটা একটু দোলায়। কাঞ্চন তবুও থামলো না। সে মৃদু স্বরে বলল,
“ছিঃ ছিঃ আমাদের দুলাভাই কি না ঠিক মত আমাদের দেশ ই দেখলো না। লজ্জার ব্যাপার। শ্বশুরবাড়ি পছন্দ না হলে বিবাহ করবে কি করে?”
পৃথুলা এরমধ্যে নির্বিকার। জ্বরে মুখখানা শুকিয়ে গেছে। কাবু কাবু লাগছে তাকে। সারাদিন ঘর থেকে বের হয়ে নি। রিদমের সাথেও তার খাওয়ার টেবিলেই দেখা হলো। তার শুকনো মুখখানা দেখে রিদমের বুকে ব্যথা হলো যেন। কিন্তু কিছু বলতে পারলো না। গতকাল মেয়েটি তার উপর নিজের ক্ষোভ উগড়েছে। তার ক্ষোভের কারণটাও তার জানা। চাইলেই তাকে আটকাতে পারতো সে। কিন্তু আটকায় নি। কারণ সে জানে পৃথুলা তার প্রতি অধিকারবোধটা এখনো ছেড়ে দেয় নি। অথবা রিদম অজান্তেই সেই অধিকারের গাটছড়াটা পৃথুলার হাতে সপে দিয়েছে।
পৃথুলা অস্বাভাবিক রকম চুপচাপ। কাঞ্চনের সাথেও সে কথা বলে নি। নিজের মত দু লোকমা খেলো। তার মাথার ব্যথা বেরেছে। জ্বর হয়তো আবারো আসবে। কেমন শীত শীত করছে। খাওয়ার পর উঠে যাচ্ছিলো। ঠিক তখন ই পারভেজ তার হাত টেনে ধরলো। নরম স্বরে বলল,
“বস না!“
পৃথুলা নিজের হাত ছাড়ালো। বাধ্য হয়েই বসলো। রিদমের চোয়াল শক্ত হয়ে গেলো। পারভেজের এমন হুটহাট পৃথুলার হাত ধরাটা তার চোখে কেন যেন বিশ্রীভাবে বাঁধছে। কাঞ্চন আবার অঞ্জনার দিকে তাকালো। পারভেজ একদম পিকচার পার্ফেক্ট ভালো ছেলে। শান্ত, ভদ্র, স্মার্ট, হ্যান্ডসাম। কিন্তু কাঞ্চন কেন যেন তাকে ভালো ছেলের তকমাটা দিতে পারছে না। ছেলেটার মধ্যে কি জানে আছে যা খটকা লাগাচ্ছে। ধরতে পারছে না। তার চাহনিটা কেমন যেন। ফলে সেই বলে উঠলো,
“আপনার আগে কখনো রিলেশন ছিলো পারভেজ ভাই?”
পারভেজ অকপটে বললো,
“না। তেমন কাউকে পাই ই নি।“
“পৃথুলা কি আপনার তেমন কেউ?”
পারভেজ শুকনো হাসলো। পৃথুলার দিকে চেয়ে বলল,
“মনে তো হয়। তবুও আমি চাই আমাদের চেনাজানাটা খুব ভালো করে হোক।“
“বেশি চিনতে যেয়েন না। রাজহাস দূর থেকেই সুন্দর লাগে। কাছে আসলে ঠোঁকর দেয়।“
রিদম বিরবির করে বলল। পৃথুলা শুনতে পেলো তবুও। ফলে পারভেজের দিকে চেয়ে বলল,
“আমি খুব টক্সিক, পসেসিভ। নিজের জিনিসকে কারোর সাথে শেয়ার করার পছন্দ করি না। লয়ালটি আমার কাছে খুব বেশি জরুরি। আমার গোপনীয়তা পছন্দ না। অনেকের কাছে বিষয়টা বিরক্তিকর।“
“আমিও তোমার মত। আমাদের কি মিল দেখেছো।“
পারভেজের স্বর অতিরিক্ত মোলায়েম। রিদম আবার বলল,
“শালা রতনে রতন চিনে।“
বলেই উঠে দাঁড়ালো সে। এই পারভেজের লদালদা ভাব তার পছন্দ হচ্ছে না। পারভেজ পৃথুলার দিকে হাপুস নয়নে তাকিয়ে আছে। ইচ্ছে করছে শালার চোখ তুলে ফেলতে। কাঞ্চন ঘাড় বাকিয়ে অঞ্জনার কানে ফিসফিসিয়ে বলল,
“চোখে সামনে তো সিনেমা হচ্ছে।“
“তুই তো সিনেমার কিছু দেখিস ই নি। গতকাল থেকে আমরা সেটাই দেখছি। রিদম জ্বলছে। আর পৃথুলা জ্বালাচ্ছে। আমার পৃথুলা জ্বলছে। রিদম জ্বালাচ্ছে। ইচ্ছে করছে দুটো ঠুন্না মারি।“
“ওদের না ব্রেকাপ হয়ে গেছে! একে অপরকে দেখতে পারে না। কত কাহিনী!“
“কি জানি ভাই। তাশদীদ থাকলে ঠিক রিদমের কাধে গাট্টা দিয়ে ওকে সোজা করে ফেলত।“
কাঞ্চন বাঁকা চোখে তাকালো অঞ্জনার দিকে। কৌতুক করে শুধালো,
“তাশদীদ?”
অঞ্জনা চুপ হয়ে গেলো। কিছু হয় নি এমন একটা ভাব করলো সে। কাঞ্চন ফিসফিস করে বললো,
“মিস করছিস নাকি?”
অঞ্জনাও তাকে তাদের মত করে মিডল ফিঙ্গার দেখালো। সভা সেই রাতের মত মুলতবি হলো। পারভেজ অবশ্য পৃথুলাকে অনুরোধ করলো,
“ছাদে যাবে?”
পৃথুলা কোমল স্বরে বললো,
“আজ থাক। আমার মাথা ব্যথা করছে। ঘুমাবো একটু। ভালো লাগছে না।“
“কালকে বের হচ্ছি আমরা?”
“ভার্সিটিতে ক্লাস আছে।“
“ভার্সিটির পর?”
পৃথুলা ইতস্তত করলো। পারভেজের সাথে বের হতে তার ভালো লাগছে না। কিন্তু মায়ের কড়া আদেশ। বাবা এই বিয়েটা সামনের মাসের মধ্যেই দফারফা করতে চান। পৃথুলা জানে এটাই তার নিয়তি। তাই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“জানাবো তোমাকে।“
পারভেজের মুখে অসন্তোষ ফুটে উঠলো। রিদমের নজর এড়ালো না বিষয়টা। ফলে বলল,
“ব্রো, আমার সাথে বের হবে? অথেন্টিক বাংলাদেশ দেখাবো।“
পারভেজ না করতে চাইলো। কিন্তু রিদম বললো,
“আরে চলোই না। এমন ঘুরাবো যে তোমার ঘুরার শখ মিটে যাবে।“
পৃথুলা নিজ ঘরে যেতেই মাথাটা দুলে উঠলো। গায়ে ঘাম দিচ্ছে। সাথে সাথেই একজোড়া শক্ত হাত তার কোমড় চেপে ধরলো। রুক্ষ্ণ হাতের স্পর্শ পেতেই চমকে উঠলো সে। দূর্বল হাতে নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করলে কঠিন স্বর কানে বাঁধলো,
“তুই এতো বিরক্তিকর কেন?”
পৃথুলা শান্ত হয়ে গেলো। ঘাড় ঘুরিয়ে রিদমের শক্ত মুখখানা দেখতে পেলো। চোখে মুখে বিষন্নতা ছড়িয়ে পড়লো। দূর্বল স্বরে বলল,
“দোয়া কর, যেন তোর জীবন থেকে চলে যাই।“
পৃথুলার কথার উত্তর না দিয়ে পালটা তাকে শুধালো,
“ঔষধ খেয়েছিস?”
“আমাকে নিয়ে তোর চিন্তা করা লাগবে না।“
“তাহলে কি ঐ ভেড়া চিন্তা করবে?”
পৃথুলা নিজেকে ছাড়িয়ে নিলো। সিড়ির সিলিং ধরে কঠিন গলায় বলল,
“রিদম আমার জন্য তোর চিন্তা করা লাগবে না। আমার জন্য ভেড়া চিন্তা করুক বা গাধা সেটা তোর হেডেক না।“
“আচ্ছা, সত্যি করে বল তুই আমার সাথে এমন সিন্ড্রেলার সৎ মায়ের মতো আচারণ করিস কেন? ভেড়ার সামনে তো ঠিক ফেইরি গডমাদার হয়ে থাকিস।“
“কারণ ট্রু শেলফ। যা আমি শুধু আমার মানুষকে দেখাই। তোর কাছে আমি প্রিটেন্ড করি না। তুই কখনো আমাকে বুঝতে চাস নি। তোর সেই ইচ্ছেই ছিলো না। আমি বরাবরই ব্রোকেন রিদম। তুই আমাকে কথা দিয়েছিলি আমাকে গুছিয়ে নিবি।“
পৃথুলা দাঁড়ালো না। তার গলা ধরে এসেছে। আর কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলেই সে কেঁদে দিবে। রিদমের সামনে সে কাঁদতে চায় না।
মেঘহীন নীল আকাশ। রোদে চকচক করছে ধরনী। দিনটার সূচনাটাই ভিন্ন ভাবে হয়েছে। চোখ খুলতেই দেখলো স্নিগ্ধ ইউনিফর্ম পড়ছে। চোখ কচলাতে কচলাতে শুধালো,
“যাচ্ছো কোথায়?”
“আগামী দু সপ্তাহ সে বাড়ি ফিরবে না। তোর জন্য ঈদ।“
কাঞ্চন আসন দিয়ে বসলো। স্নিগ্ধকে দেখছে সে। স্নিগ্ধকে এই কালো পোশাকে খুবই চমৎকার দেখাচ্ছে। কাঁধের উপর জ্বলজ্বল করছে তার র্যাংকের চিহ্ন। মানতেই হবে সরফরাজ পটনভী সুদর্শন পুরুষ। কাঞ্চন ঘুমঘুম গলায় বললো,
ভুলভাল অন্তরাল পর্ব ৩৫
“খবরদার, আস্তো থাকবে।“
“এটা কি ওয়ার্নিং ছিলো?”
“যা মনে কর।“
কাঞ্চনকে ভার্সিটিতে স্নিগ্ধ নিজে পৌছে দিলো। ক্লাসে যেতেই তার ডাক পড়লো মিডিয়া স্ট্যাডিস এন্ড জার্নালিজম ডিপার্টমেন্টে…………
