মৌটুসী পর্ব ৩৮
ঋতস্বিনী মাহবিশ
দুপুর গড়িয়ে লাঞ্চের সময়ও পার হওয়ার উপক্রম। লাঞ্চের জন্য অফিসেই ক্যান্টিন ব্যবস্থা আছে। স্টাফদের দুপুরের খাবার ক্যারি করতে হয় না, এখানকার ক্যান্টিন থেকেই খেতে পারে।
মৌটুসী ডেস্কে বসে তখনও কম্পিউটারে কাজ করে চলেছে। অন্যদের তুলনায় তার আঙুলের গতি একটু ধীর। স্বাভাবিকই। এর আগে নিয়মিত এতটা টাইপিং করার অভ্যাস ছিল না তার। মাত্র এক মাসে হাত আর কতটাই-বা সড়গড় হবে! তাই মাঝেমধ্যে থেমে থেমে অক্ষর খুঁজে নিয়ে আবার টাইপ করতে হচ্ছে।
তখনই হাসিব সাহেব এসে ডেস্কের পাশে দাঁড়ালেন।
— “মিস মৌটুসী, লাঞ্চ করবেন না? চলুন করে আসি!”
কম্পিউটারের স্ক্রিন থেকে চোখ না সরিয়েই মৌ বলল,
— “কাজ তো শেষ হয়নি হাসিব সাহেব। আপনি নাহয় চলে যান। আমি শেষ করে আসছি।”
— “আচ্ছা, সমস্যা নেই। আমি বসছি, আপনার শেষ হোক। একা একা খেতে ভালো লাগে না। সবাই তো লাঞ্চ করে নিয়েছে। আজকে শুধু আপনি আর আমিই বাকি।”
মৌটুসী আর আপত্তি করল না। কাজটা দ্রুত শেষ করার জন্য এবার আঙুলের গতি একটু বাড়িয়ে দিল। কয়েক মিনিটের মধ্যেই ফাইলটা সেভ করে কম্পিউটারটা লক করল সে।
তারপর হাসিব সাহেবকে ডেকে নিয়ে দুজন অফিসের ক্যান্টিনের দিকে চলে গেল।
সেই সময়ই বোরাক ফোনে কথা বলতে বলতে অফিসে ঢুকল। আজ চার দিন পর এই অফিসে পা রাখল সে। কটা দিন তার হাফ ছাড়ারও জো ছিল না। কানে ফোন চেপে নিজের কেবিনের দিকে হাঁটছে বোরাক—কপাল কুঁচকে আছে, কণ্ঠেও চাপা বিরক্তি। কেবিনে ঢুকে হাইড্রোলিক চেয়ারটাতে বসে পড়ল সে।
চেয়ারে হেলান দিয়ে সামান্য দুলতে দুলতে ফোনের ওপাশের মানুষটির কথা শুনছিল বোরাক। হঠাৎ অন্যমনস্কভাবেই চোখ চলে গেল ডেস্কের ডান পাশের সিসিটিভি মনিটরগুলোর দিকে।
একটা ফুটেজে তার চোখ আটকে গেল। ক্যান্টিনের টেবিলে মুখোমুখি বসে আছে মৌটুসী আর হাসিব সাহেব।
দুজনের সামনে খাবারের প্লেট। কথা বলতে বলতে হাসছে তারা। হাসিব সাহেব কিছু একটা বলতেই মৌটুসী স্বতঃস্ফূর্ত খিলখিলিয়ে হেসে উঠল। কী সেই হাসির তোড়! খাবার মুখে হাসতে হাসতে বিষম খাওয়ার জোগাড়। হাসিব সাহেবও মুচকি হেসে সাথেই পানি এগিয়ে দিল।
দৃশ্যটা এমনই লাগছিল—যেন কোনো সুখী দম্পতি নিজেদের সংসারের ডাইনিং টেবিলে বসে হাসতে হাসতে দুপুরের খাবার সারছে। আহা, কী মোহাব্বত!
বোরাকের ডান হাতের আঙুলগুলো চেয়ারের হাতলে থেমে গেল। ফোনের ওপাশ থেকে তখনও কেউ কথা বলে চলেছে। বোরাক দ্রুত সংক্ষিপ্তভাবে কথার ইতি টেনে কল কেটে দিল। ফোনটা হাতে নিয়েই কিছুক্ষণ নিশ্চুপ বসে রইল সে। দৃষ্টি স্থির হয়ে আছে সিসিটিভি মনিটরের ওপর।
ভেতরের জেলাসি সত্তাটা যেন সুযোগ পেয়ে ঠোঁট বাঁকিয়ে টিপ্পনী কাটল—
‘দেখ, দেখ! অন্য পুরুষের সান্নিধ্যে থেকে কেমন মন-প্রাণ খুলে হাসছে! তোর সঙ্গে থাকলে কখনো এভাবে হেসেছে? যত সব গাম্ভীর্য, যত সিরিয়াসনেস—সব যেন তোর সামনে এলেই উথলে ওঠে!’
বোরাক ভ্রূ কুঁচকে এসব অবান্তর ভাবনা সরিয়ে দিতে চাইল। ঘটনাটা স্বাভাবিক। সহকর্মীদের মাঝে এমন সখ্যতায় অস্বাভাবিকতার কিছু নেই। মন খুলে হাসাটাও একজনের ব্যক্তি স্বাধীনতা।
তবে এসব যুক্তিতর্কে ইর্ষান্বিত মনটাকে বোঝানো গেল না। বরং তার চোয়াল আরও শক্ত হয়ে উঠল।
মনিটরের পর্দায় মৌটুসীর প্রাণবন্ত হাসির দৃশ্যটা যেন বিষাক্ত তীর হয়ে এসে সরাসরি বুকে বিঁধছে। অথচ এই হাসিটাই তো দেখতে সে মরিয়া হয়ে থাকে। কতভাবে কত কিছু করেছে—শুধু মেয়েটাকে মন খুলে হাসতে দেখবে বলে। আর আজকে সেই হাসিটাই অসহ্য ঠেকছে।
পরিশেষে, পুরুষমন ভীষণভাবে ইর্ষায় জর্জরিত। প্রিয় নারীর স্বাচ্ছন্দ্য, হাসি কিংবা আনন্দের কারণ হিসেবে নিজের জায়গাটুকুতে অন্য কোনো পুরুষকে দেখতে তার ভারী আপত্তি।
তখনই দরজায় নক হলো। হাতে কফির কাপ নিয়ে এক স্টাফ দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। বোরাক মুহূর্তেই নিজেকে সামলে সোজা হয়ে বসল। সেই সঙ্গে রিমোট চেপে মনিটরটাও অফ করে দিল।
— “এসো।”
স্টাফ ভেতরে এসে সালাম দিয়ে কফির কাপটা টেবিলের ওপর রেখে মৃদু স্বরে বলল,
— “স্যার, আর কিছু লাগবে আপনার?”
বোরাক গম্ভীর মুখে ছোট্ট করে বলল,
— “না।”
স্টাফটি ঘুরে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। প্রায় বেরিয়ে যাওয়ার মুহূর্তে বোরাক আবার ডাকল—
— “আলম ভাই!”
— “জি, স্যার।”
— “মিস মৌকে আমার কেবিনে আসতে বলবেন।”
— “ওকে, স্যার।” মাথা নেড়ে স্টাফ বেরিয়ে গেল।
লাঞ্চ শেষ করে ডেস্কে ফিরে বসতে না বসতেই সেই স্টাফ এসে মৌটুসীকে বলল,
— “মৌ ম্যাডাম, বোরাক স্যার আপনাকে কেবিনে ডেকেছেন।”
মৌটুসী একটু অবাক হয়ে তাকাল। বলল,
— “আচ্ছা। আমি যাচ্ছি।”
স্টাফ চলে গেলে মৌটুসী বোতল থেকে কয়েক ঢোক জল খেল। তারপর অজান্তেই ঠোঁটের কোণে সূক্ষ্ম হাসি ফুটে উঠল।
এসেছেন তাহলে! গত কয়েকটা দিন দেখা হয়নি তাঁদের। বীরকেও স্কুলে নিয়ে আসছেন না, অফিসেও দেখা যায়নি। মনে হয় ভীষণ ব্যস্ত ছিলেন!
এইসব ভাবতে ভাবতেই চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল মৌটুসী। ধীর পায়ে বোরাকের কেবিনের দিকে এগিয়ে গেল।
কেবিনের সামনে এসে দাঁড়িয়ে কাঁচের দরজাটা ঠেলে মিষ্টি স্বরে ডেকে বলল,
— “আসতে পারি, স্যার?”
ভেতরে বোরাক কম্পিউটার স্ক্রিনে তাকিয়ে, হাতে কফির কাপ। দরজার দিকে না তাকিয়েই মৌয়ের অনুমতির প্রেক্ষিতে কাটকাট নির্লিপ্ত কণ্ঠে বলে উঠল—
— “অপেক্ষা করুন।”
বোরাকের এই নির্লিপ্ততায় মৌয়ের হাস্যোজ্জ্বল মুখটা চুপসে গেল যেন। বোরাকের এমন আচরণ পছন্দ না হলেও সে আর কিছু না বলে দরজার হাতল থেকে হাত সরিয়ে নিল। এরপর পাশের দেওয়ালের দিকে সরে দাঁড়িয়ে চুপচাপ অপেক্ষা করতে লাগল। তখনই করিডোর দিয়ে আসতে আসতে ম্যানেজার মকবুল সাহেব তাকে সেখানে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে থেমে গেলেন।
— “কী ব্যাপার, মিস মৌ? এখানে দাঁড়িয়ে আছেন যে?”
মৌটুসী মৃদু হেসে বলল,
— “বোরাক স্যার অপেক্ষা করতে বলেছেন।”
মকবুল সাহেব আর কিছু বললেন না। শুধু মাথা নেড়ে দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন।
তারপর ভেতরে ঢোকার জন্য দরজায় দুবার নক করতেই ভেতর থেকে বোরাকের অনুমতি ভেসে এল।
মকবুল সাহেব দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে গেলেন। মৌটুসী তখনও দরজার পাশেই দাঁড়িয়ে রইল। অকারণে বুকের ভেতরটা কেমন একটা অস্বস্তি করছে।
কিছুক্ষণ পর দরজা খুলে মকবুল সাহেব বেরিয়ে এলেন। মৌটুসীর দিকে তাকিয়ে বললেন,
— “মিস মৌ, বোরাক স্যার আপনাকে ভেতরে যেতে বলেছেন।”
মৌটুসী মৃদু মাথা নেড়ে ভেতরে ঢুকল। বোরাক কম্পিউটারের সামনে বসে কিছু একটা দেখছিল। মৌটুসী ঢোকার কয়েক সেকেন্ড পর মাথা তুলে তার দিকে তাকাল। কপালে ভাঁজ, চোখেমুখে কঠিন বিরক্তি।
বোরাকের তো মন চাইছে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটাকে ইচ্ছেমতো ঝাড়তে। কানের লতি টেনে জিজ্ঞেস করতে, অন্য পুরুষের সাথে এত রসের সখ্যতা করার সাহস সে পায় কোত্থেকে? এখন যদি বোরাক তার ওই সুন্দর ঠোঁট দুটো সেলাই করে দেয়? ওই ঠোঁট দুটো অক্ষত রেখে কী লাভ, যদি সেগুলোর হাসি দেখার সৌভাগ্য তারই না হয়? অন্যথায় সুধার মতো মিষ্টি সেই হাসি তার চোখের সামনে থেকেও অন্য কেউ পান করে!
বোরাককে এভাবে শক্ত চোখে নিজের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে মৌটুসী শেষ পর্যন্ত ইতস্তত করে ডেকে উঠল,
— “মিস্টার বোরাক?”
বোরাক একটুখানি নড়ে বসল। তবে ভেতরের অস্থিরতাটা বাইরে বেরিয়ে আসতে পারল না। বরং চাপা রাগে যথাসম্ভব গম্ভীর হয়ে উঠল চিত্ত। নির্লিপ্ত রুক্ষ গলায় বলল,
— “পাঁচ নম্বর ফাইলটা রেডি হয়েছে, মৌটুসী?”
কিছুটা দ্বিধা নিয়ে মৌটুসী উত্তর দিল,
— “না। একটু বাকি আছে।”
— “ওকে। কালকের মধ্যেই বাকি অংশটা কমপ্লিট করে ফেলবে। আমি কাল আসব না। মকবুল সাহেবের কাছে সাবমিট করবে।”
মৌটুসী কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর ধীরে মাথা নেড়ে বলল,
— “জি।”
বোরাক আর কোনো কথা বলল না। চোখ নামিয়ে আবার কম্পিউটারের স্ক্রিনে মনোযোগ দিল। মনে মনে শপথ কাটল, এটাই শেষ ছাড়, এরপর কখনো দুজনকে একসাথে রসের আলাপ করতে দেখলে দুজনেরই চাকরি নট করে দেবে বোরাক।
মৌটুসী কয়েক সেকেন্ড নিঃশব্দে তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর কোনো কথা না বাড়িয়ে ধীর পায়ে ঘুরে কেবিন থেকে বেরিয়ে গেল। ডেস্কে ফিরে এসে চেয়ারটায় বসতেই অদ্ভুত একটা অস্বস্তি তাকে ঘিরে ধরল।
বোরাকের গম্ভীর স্বভাবের সঙ্গে সে পরিচিত। কিন্তু তার সঙ্গে এমন অনুভূতিহীন রুক্ষ গলায় কথা বলা—এটা একেবারেই নতুন। অফিসের সবার সঙ্গে বোরাক গম্ভীর হলেও তার কাছে কখনোই নয়। তাহলে আজ হঠাৎ কী হলো? শুধুই কি আজ? কয়েক দিন ধরেই তো তাকে এড়িয়ে চলছে, দেখা-সাক্ষাৎ নেই, কথাবার্তা নেই। এসবের লক্ষণ কী?
পরক্ষণেই নিজের ভাবনার প্রতি নিজেই বিরক্ত হলো মৌ। তাচ্ছিল্য হাসল। সে-ই বা এত গভীরতা নিয়ে ভাবছে কেন? বোরাকের সঙ্গে তার সম্পর্কই বা কতটুকু? কোনো নাম দেওয়া সম্পর্ক নেই, কোনো প্রতিশ্রুতি নেই, এমনকি দুজনের মধ্যে স্পষ্ট কোনো অনুভূতির কথাও নেই। কিছুদিনের পরিচয়, কিছু যত্ন, কিছু খেয়াল রাখা, কিছু অনুচ্চারিত মুহূর্ত আর কিছু কিছু অনুভব—এই তো!
তাহলে হঠাৎ তার নির্লিপ্ত আচরণের অর্থ খুঁজতে বসতে হবে কেন? নিজেকে শক্ত করতে চাইল মৌটুসী। বোঝাল নিজেকে, সে স্ট্রং, এতটা বিগলিত হওয়া মানায় না তাকে। অনুভূতির ফুলঝুরি ছেড়ে বাস্তবতা মেনে নেওয়াটাই তার মূল দায়িত্ব।
সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত হয়েছে মোটামুটি। বিছানার ওপর বালিশে হেলান দিয়ে সামনে বই মেলে বসে আছে মৌটুসী। মাঝেমধ্যে ঠোঁট নেড়ে নেড়ে, আবার কখনো সশব্দেই ঝরঝর করে পড়ে যাচ্ছে। পড়ালেখা তো আর জীবনের পিছু ছাড়ার নয়। কয়েকটা সরকারি চাকরির সার্কুলার প্রকাশিত হয়েছে। সেদিকেই এখন মনোযোগ দিতে হবে তাকে। এই চাকরি দিয়ে তো আর সারা জীবন চলবে না। আপাতত বিপদের সময় পাশে দাঁড়িয়ে আহারের সংস্থান করে দিচ্ছে—সেই কৃতজ্ঞতা মেটানোর মতো নয়। তবে নিজের পায়ে আরও শক্ত করে দাঁড়াতে হলে তাকে পড়াশোনাটা চালিয়েই যেতে হবে। আরও আত্মনির্ভর হতে হবে তাকে।
অন্যদিকে চড়ুইয়ের পড়া অনেক আগেই শেষ। তার বই-খাতা গুছিয়ে একপাশে রেখে সে বিছানার ওপর উপুড় হয়ে শুয়ে আছে। দুই কনুইয়ের ওপর ভর দিয়ে মৌয়ের ফোনটার একবার পাওয়ার অন করছে, আবার অফ করছে। তার মূল আকর্ষণ অবশ্য ফোনটা নয়—লক স্ক্রিনের ছবিটা।
সেখানে ছয় মাসের ছোট্ট চড়ুই চিৎ হয়ে শুয়ে আছে। মাথায় খাড়া খাড়া শিংয়ের মতো চারখানা ঝুঁটি—দুটো এপাশে, দুটো ওপাশে। মুখটা আস্ত রসগোল্লার মতো ঠাসা গোলগাল। মার্বেলের গুটির মতো চোখদুটো সরাসরি মায়ের ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে, দুই পাটি ফোকলা দাঁত বের করে প্রাণখোলা হাসিতে মত্ত সে।
চড়ুই নিজের সেই ছবিই গভীর মনোযোগে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে। এবার হঠাৎ করেই সে উঠে বসল। তারপর বিছানা থেকে নেমে ড্রেসিং টেবিলের কাছে ছুটে গেল। সেখান থেকে একটা চিরুনি আর চারটে ছোট রাবার ব্যান্ড নিয়ে আবার দৌড়ে এসে মৌটুসীর সামনে দাঁড়াল। দুহাতে চিরুনি আর রাবারগুলো এগিয়ে দিয়ে বলল,
— “মাম্মা, আমার মাথায় চারটা ঝুঁটি করে দাও।”
মৌটুসী বই থেকে চোখ তুলে মেয়ের দিকে তাকাল।
— “কী করে দেব?”
চড়ুই ফোনটার দিকে ইশারা করল, তারপর হাত দিয়ে নিজের মাথা দেখিয়ে বলল,
— “ওই যে ছোটবেলার ছবির মতো এখানে চারটা খাড়া খাড়া ঝুঁটি করে দাও।”
— “কিন্তু এখন তো তোমার চুল বড় হয়ে গেছে, মাম্মা। আগের মতো খাড়া খাড়া ঝুঁটি হবে না।”
চড়ুই নাছোড়বান্দার মতো মাথা নাড়ল।
— “হবে। তুমি করে দাও!”
মেয়ের জেদে আর না করল না মৌটুসী। বইটা বন্ধ করে একপাশে রাখল। তারপর চড়ুইকে নিজের সামনে বসিয়ে চুলগুলো ভালো করে আঁচড়ে চার ভাগ করে চারটে ঝুঁটি বেঁধে দিল।
অবশ্য ছোটবেলার ছবির মতো সেগুলো আর খাড়া হয়ে রইল না। চুল বড় হয়ে যাওয়ায় চারটে ঝুঁটিই মাথার চারপাশ থেকে নরমভাবে পেছনের দিকে ঝুলে পড়ল।
তবু চড়ুইয়ের আনন্দে কমতি নেই। ঝুঁটি বাঁধা শেষ হতেই সে একলাফে বিছানা থেকে নেমে ড্রেসিং টেবিলের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। আয়নায় নিজের মাথাটা এদিক-অদিক ঘুরিয়ে চারটে ঝুঁটি ভালো করে দেখে নিল। তারপর ড্রেসিং টেবিলের ওপর ঝুড়ি থেকে রংবেরঙের কতগুলো ছোট ছোট ক্লিপ বের করে খুব মনোযোগ দিয়ে ঝুঁটিগুলোর আশপাশে বসিয়ে দিল সেগুলো।
এরপরও যেন তার সাজগোজে শেষ হলো না। বেবি পাউডারের কৌটাটা খুলে দুই হাতে বেশ খানিকটা পাউডার নিল সে। তারপর কোনো রকম হিসেব না করেই সারা মুখে এবড়োখেবড়ো করে মাখতে লাগল। গাল, নাক, থুতনি—সব জায়গাতেই পাউডারের সাদা আস্তরণ!
সবশেষে ড্রেসিং টেবিলের ওপর থেকে টুকটুকে লাল বেবি লিপবামটা তুলে নিয়ে ঠোঁট দুটোতে ভালো করে ঘষে নিল।
নিজের মতো করে সাজগোজ শেষ হতেই আয়নার সামনে একটু পেছনে সরে দাঁড়াল চড়ুই। কয়েক মুহূর্ত মুগ্ধ চোখে নিজের প্রতিবিম্ব দেখে গালভরা হাসিতে ছোট্ট মুখটা উজ্জ্বল হয়ে উঠল তার।
তারপর চট করে ঘুরে মাম্মার দিকে তাকিয়ে জলজল চোখে জিজ্ঞেস করল,
— “মাম্মা দেখো! আমি আরও সাজুগুজু করেছি। আমাকে অনেক সুন্দর লাগছে, তাই না?”
মৌটুসী এতক্ষণ মেয়ের সকল কাণ্ড লক্ষ করেও বাধা দেয়নি, মন চায়নি। মেয়েটা নিজের মতো একটু খেলছে, খেলুক না! তাকে তার মতো ছেড়ে দিয়ে নিজের পড়ায় ডুব দিয়েছিল। এবারে চড়ুইয়ের ডাক শুনে মাথা তুলে ওর দিকে তাকাল। মিষ্টি করে হেসে বলল,
— “হ্যাঁ মা। অনেক বেশি সুন্দর লাগছে আমার চড়ুই পাখিকে। এক্কেবারে ফেইরি প্রিন্সেস, কুট্টুস পাখি!”
বলেই ঠোঁট গোল করে মেয়ের দিকে ফ্লাইং কিস ছুঁড়ল মৌ।
চড়ুই এবার চঞ্চল পায়ে ড্রেসিং টেবিলের সামনে থেকে এক দৌড়ে বিছানার কাছে চলে এল। সেখানে রাখা ফোনটা তুলে বাড়িয়ে দিয়ে আবদার করল,
— “তাহলে পাপাকে ফোন দাও। সুন্দর চড়ুই পাখিকে একটু দেখাই!”
মৌটুসী ফোনটার দিকে তাকাল। কিছু বলতে যাওয়ার আগেই আশ্চর্যজনকভাবে স্ক্রিনটা জ্বলে উঠল। ভেসে উঠল বোরাকের ছবি।
চড়ুই এক মুহূর্ত তাকিয়ে থেকেই আনন্দে চিৎকার করে উঠল,
— “আহ্! পাপা ফোন দিয়েছে! পাপা!”
মৌটুসী ফোনের স্ক্রিনে একবার তাকিয়ে কলটা রিসিভ করে মেয়ের দিকে ধরল। ওপাশ থেকে বোরাকের মুখ ভেসে উঠতেই চড়ুই ক্যামেরার সামনে একটু ঢং করে দাঁড়িয়ে উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলল,
— “পাপা দেখো! আমি একা একা সাজুগুজু করেছি। আমাকে সুন্দর লাগছে?”
স্ক্রিনের ওপাশে বোরাক একটু ভাবুক ভঙ্গিতে বলল,
— “তাই তো বলছি, আজকের আকাশে চাঁদ কেন নেই?”
— “আকাশে চাঁদ নেই? কেন পাপা?” কৌতূহলী চোখে জানালা দিয়ে একটু বাইরে চেয়ে প্রশ্ন করল চড়ুই।
— “আমার স্পেরোর সৌন্দর্য দেখে তো আকাশের চাঁদ লজ্জায় মুখ লুকিয়ে ফেলেছে, মামনি! কী সাংঘাতিক সুন্দর লাগছে আমার মাকে, সয়ং চাঁদও যে লজ্জা পেয়ে যাচ্ছে! এই রূপবতী মেয়েকে আমি কোথায় লুকিয়ে রাখি?”
পাপার মুখে এমন অভিনব প্রশংসা শুনে ছোট্ট চড়ুইয়ের গাল দুটো লজ্জায় টুকটুকে হয়ে উঠল যেন। সঙ্গে সঙ্গে ঢং করে দুই হাত দিয়ে মুখ ঢেকে সরে গেল সে।
মেয়ের লজ্জা পাওয়া দেখে বোরাক ওপাশে শব্দ করে হেসে উঠল। এরপর মৌকে ডেকে উঠল—
— “এই মৌটুসী পাখি?”
মৌটুসী বাধ্য হয়ে ফোস করে একটা শ্বাস টেনে ফোনটা নিজের দিকে ঘোরাল।
সাথেই সঙ্গে বোরাক চটপটে স্বরে বলে উঠল—
— “এই, তোমার ছেলে খেতে চাইছে না। তাকে কি করবে করো।”
মৌটুসী ভ্রূ কুঁচকে স্ক্রিনের দিকে তাকাল।
বোরাকের প্রশস্ত বুকে হেলান দিয়ে তার কোলের ওপর বসে আছে বীর। বাবার বুকের সঙ্গে মাথা ঠেকিয়ে একদম নিরীহ মুখ করে ফোনের দিকেই তাকিয়ে আছে সে। মৌটুসী ছেলের দিকে তাকিয়ে বলল,
— “কেন বাবা? না খেলে বীর বড় হবে কী করে? চড়ুই পাখি যে তাহলে তোমার আগেই বড় হয়ে যাবে বাবা!”
বীর বাবার বুক থেকে মাথা তুলে একটু এগিয়ে এসে আহ্লাদী গলায় বলল,
— “বীলেল খেতে মন চায় না, মাম্মা!”
— “কেন বাবা? খেতে হবে তো সোনা। অল্প অল্প করে খাও। আচ্ছা, ভাগ করে করে খাবে? এক লোকমা বীরের ভাগ, এক লোকমা চড়ুই পাখির ভাগ, এক লোকমা টাইটানের ভাগ—এভাবে?”
— “তাহলে বীল তোমাল হাতে ভাগ কলে কলে খাবে।”
— “মাম্মা কালকে খাইয়ে দেবে বাবা। আজকে পাপার হাতেই খাও! এখন তো রাত হয়ে গেছে।”
— “না, বীল আজকেই মাম্মার হাতে খাবে। না হলে খাবেই না।”
ওর এমন জেদ ধরা কথায় কিছুটা ভ্যাবাচাকা খেয়ে গেল মৌটুসী। এখন রাত বাজে প্রায় নয়টা। এক মুহূর্ত দ্বিধায় থেকে সে বোরাকের দিকে তাকাল—
— “মিস্টার বোরাক……”
— “হুম!”
— “বীরকে নিয়ে এখন আসতে পারবেন?”
— “যেতে বলছ?”
মৌটুসী ঠোঁট কামড়ে ছোট্ট করে মাথা নাড়ল।
— “হুম… বলছিলাম। বাচ্চাটা সারারাত না খেয়ে থাকবে?”
— “বলছ যখন, না গিয়ে উপায় আছে? আচ্ছা রাখো, আসছি।”
মেঘ না চাইতে জল পাওয়ার মতো করেই কথাটা বলেই কল কাটল বোরাক। এরপর বীরের মুখে টুপাটুপ কয়েকটা চুমু বসিয়ে দিল। “ব্রাভো কলিজা! ফাটিয়ে দিয়েছে আমার ছেলে।”
বাবার উচ্ছ্বসিত প্রশংসায় বীর খিলখিলিয়ে হেসে উঠল। তারপর দুহাত দিয়ে বোরাকের গলা জড়িয়ে ধরে সেও পাল্টা চুমু এঁকে দিল বাবার পুরো মুখজুড়ে।
বোরাক হেসে ছেলের নাকের ডগায় নিজের নাক ঠেকিয়ে বলল,
— “চলো বাবা, এখন মাম্মার কাছে যাব আমরা।”
— “চলো পাপা!” সঙ্গে সঙ্গে উচ্ছ্বাসে মাথা দোলাল বীর।
বোরাক ছেলেকে কোলে নিয়ে গাড়ির চাবি নিতে দোতলার দিকে উঠতে লাগল। সিঁড়ি ভাঙতে ভাঙতেই আপনমনে ছেলের সঙ্গে গল্প করতে লাগল—
— “আমার বাবাটা তাড়াতাড়ি বড় হয়ে যাও। তারপর পাপাও তোমার প্রেমে এভাবেই উইংসম্যান হয়ে সাহায্য করব। ঠিক আছে?”
মৌটুসী পর্ব ৩৭
বীর কী বুঝল কে জানে! তবুও বাবার মুখের দিকে গোল গোল চোখে তাকিয়ে উপর নিচ মাথা দুলিয়ে সায় দিল।
বোরাক মুচকি হেসে আবার বলল,
— “আমরা বাবা-ছেলে সবচেয়ে ভালো বন্ধু হব। পাপাকে কলিজা সব জানাবে, পাপাও তাকে জানাবে। আমাদের সিক্রেটগুলো আমরা কাউকে বলব না, মাম্মাকেও না।”
