Home স্নিগ্ধবিষ স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৬৮

স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৬৮

স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৬৮
সানজিদা আক্তার মুন্নী

দুপুরের হেলে পড়া সোনালি রোদ এতক্ষণে উঠোনের শিউলিতলার ছায়াকে দীর্ঘ করে পুকুরপাড় অবধি টেনে নিয়ে গেছে। বাতাসে ভাসছে কাঁঠালচাঁপার মিষ্টি ঘ্রাণ। দূরে কোথাও একটানা ডাকছে একটি ঘুঘু, তার এই বিরামহীন সুর মধ্যদুপুরের আলস্যকে আরও গাঢ় করে তুলছিল। ঠিক সেই মুহূর্তে বাড়ির চৌকাঠ মাড়িয়ে তৌসির প্রবেশ করে ভেতরে। তার পেছনে গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে আসে কালো বোরকায় আপাদমস্তক মোড়ানো সাজানো ঐ নতুন বউ। তার মুখমণ্ডল ঢাকা নিশ্ছিদ্র নিকাবে, দৃষ্টির জন্য সামান্য ফাঁক রাখা। তৌসিরের লুঙ্গির কোণ এক হাতে অবহেলায় গোঁজা, অনাবৃত তামাটে বুকের ওপর দুপুরের রোদ গলে পড়ছে। ঠোঁটের কোণে দুষ্টুমির একচিলতে বাঁকা হাসি, চোখে বিজয়ী বীরের উদ্ধত দীপ্তি। ঠিক যুদ্ধজয়ী কোনো সেনাপতি লুণ্ঠিত ধন নিয়ে ঘরে ফিরলে ঠিক যেমন দেখায়, তাকে হুবহু তেমনই দেখাচ্ছে এখন। লুঙ্গির কোণ দুই হাতে তুলে নিয়ে সামনে এগোতে এগোতে সে হাঁক ছাড়ে, তার পিছনে নাযেমরা আসছে তৌসির হাঁক ছেড়ে বলে, “বিবিজান, আম্মা! তোমরা কোথায়? তাড়াতাড়ি আসো।”
ওর এই ডাক শুনে রান্নাঘরের ভেজা দরজা ঠেলে বেরিয়ে আসেন ওর মা, আঁচলে হাত মুছতে মুছতে। মেজো চাচি বেরিয়ে আসেন পানের বাটা হাতে, তার ঠোঁটে এখনও লাল দাগ। বিবিজান আসেন ধীর পায়ে, মুখে বিরক্তির সঙ্গে মেশানো কৌতূহল।

ঠিক সেই মুহূর্তেই দোতলার কাঠের সিঁড়ির পুরোনো ধাপগুলো একে একে পার হয়ে নিচে নামছিল নাজহা। ঘরের ভেতর থেকে চুঁইয়ে আসা তির্যক আলোয় তার সাদা ওড়নার প্রান্ত হাওয়ায় দুলছে প্রজাপতির পাখনার মতো। তার এলোমেলো লালচে কালো চুলের কয়েকটি গোছা কপালে এসে পড়েছে, ঘামে ভেজা ললাটে সেঁটে আছে আলগা কেশরাশি। তৌসিরের এই হাঁকডাক রোজকার জলভাত, তাই প্রথম দিকে সে খুব একটা খেয়াল করেনি। কিন্তু সিঁড়ির একদম শেষ ধাপে পা রাখতেই সামনের দৃশ্যে তার প্রানবন্ত দুটি চোখ নিমিষেই পাথরে পরিণত হয়। কালো বোরকায় আবৃত এক অপরিচিত অবয়ব এবং তার ছায়ায় দাঁড়িয়ে থাকা তৌসির কে দেখে।
ওদিকে বিবিজান আর তৌসিরের মা প্রায় সমস্বরে বলে ওঠেন,” কী হয়েছে?”
তৌসির পেছনের বোরকা পরা বউয়ের দিকে হাত বাড়িয়ে দেখায়। বুকটা তার আরও ফুলে ওঠে, ঠোঁটের হাসিটা তার চওড়া হয়। সে সগর্বে ঘোষণা করে, “বিবিজান, আমি আরেকটা বিয়ে করেছি! আমার বউ তো আমাকে তেমন পাত্তাটাত্তা দেয় না, তাই আরেকখানা বিয়ে করলাম।”
কথাটা ঘরের বাতাসে থমকে থাকে খানিকক্ষণ। এ ঘোষনা শুনে বাড়ির সবার মুখ থেকে ভাষা খসে পড়ে মাটিতে। ঠিক তখনই পাশ থেকে রুদ্র এক তীক্ষ্ণ ফোড়ন কাটে, “বোরকার ভেতরে নতুন ভাবি অনেক সুন্দর আছেন। নাজহা ভাবির চেয়েও সুন্দর।”

কথাগুলো নাজহার বুকে ধারালো ছুরির ফলার মতো এসে বিঁধে যায়। এই ফলাটা একটু একটু করে ভেতরে ঢুকতে থাকে, আর তা কেটে ছিঁড়ে ফেলে তার কোমল কলিজাখানা। সিঁড়ির শেষ ধাপ থেকে মেঝেতে আর এক পাও বাড়াতে পারে না সে। নাজহার কাছে নিজের শরীরটা হঠাৎ তার কাছে অচেনা ঠেকে, এই শরীর, এই পা কিংবা এই চোখ তার নিজের বলে মনে হয় না। তার হাত পায়ের রক্ত ধীরে ধীরে হিম হয়ে আসে,তার আঙুলের ডগায় ঝিঁঝিঁ পোকার মতো অসাড়তা ছেয়ে যায়। তার চোখের সামনের চেনা ঘর চেনা মানুষগুলো সব কেমন ঘোলাটে হতে থাকে, মনে হচ্ছে চারপাশের পৃথিবীর ওপর কে একটা ধূসর পর্দা টেনে দিচ্ছে।নাজহার কানের ভেতর একটি বাক্যই বাজতে থাকে, প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে ফিরে আসে, “আমি বিয়ে করেছি!”

তার সমস্ত পৃথিবী এই একটি বাক্যের চারপাশে ঘুরপাক খেতে শুরু করে। তার এই ভাঙাচোরা, এলোমেলো, তবুও নিজের বলে আঁকড়ে ধরা সংসার, যেটাকে সে জোড়াতালি দিয়ে চলার শক্তি খুঁজত রোজ, সেটাও কি আজ ফুরিয়ে গেল? এই একটি আশা ছিল যাকে ঘিরে তার সমস্ত অস্তিত্বের অক্ষে ঘূর্ণন চলত সেই অক্ষটা হঠাৎ ভেঙে পড়ে। শেষ চেষ্টায় সে মেঝেতে পা রাখতে চায়, কিন্তু শরীর আর আজ্ঞা মানে না। একটা নিঃশব্দ, ভারী শব্দে সিঁড়ির শেষ ধাপে লুটিয়ে পড়ে নাজহা। তার এলোখোলা চুল ছড়িয়ে যায় মেঝেতে, ওড়নার আঁচল লুটায় মাটিতে। তার ছোট্ট পৃথিবীটা এতক্ষণে অন্ধকারে ডুবে গেছে। নাজহা জ্ঞান হারিয়ে ফেলে।

বিবিজান তখন রাগে জ্বলছেন। পায়ের চটি খুলে হাতে নিয়ে তৌসিরের দিকে তেড়ে যাচ্ছিলেন। কিন্তু ঠিক তার আগেই এই ভারী পতনের শব্দ এসে আঘাত করে সবার কানে। তৌসিরের বুকের ভেতরটা মনে হয় কেউ এক শীতল হাতে চেপে ধরেছে। নিমিষেই তার প্রাণটা উড়ে যায়। মা আর মেজো চাচি ব্যতিব্যস্ত হয়ে ছুটে যান সিঁড়ির দিকে। তৌসিরও পাগলের মতো দৌড়ে যায়। তার চোখের কোণে আচমকা জেগে ওঠা এক তীব্র ভয় নিয়ে সে ঝাঁপিয়ে পড়ে।
নাজহার নিথর শরীরটাকে সে এক টানে বুকের সাথে চেপে ধরে। ওর মাথা তার কাঁধে এলিয়ে পড়ে, ঠান্ডা কপাল ছুঁয়ে যায় তার উষ্ণ গলার নিচটা। কাঁপা কাঁপা হাতে সে নাজহার গালে হাত রাখে, আলতো করে ঝাঁকায়, “এই নাজহা! কী হয়েছে তোর? আমরা তো মজা করছিলাম, বিয়ে করিনি! এই নাজহা!”
তৌসির রুদ্রদের দিকে তাকিয়ে বিরক্ত গলায় বলে ওঠে, “বিবিজান, আমি কিছু জানি না! এই বাইন**রা বোরকা পরিয়ে বউ সাজিয়ে এই নাটক করছে। তুমি ওদের জুতা দিয়ে মারো।”
বিবিজান এতক্ষণে সব আঁচ করে ফেলেছেন। হাতের চটিজোড়া বাগিয়ে ধরে তিনি রুদ্রদের দিকে এক পা এগোতেই একেকজন প্রাণ হাতে নিয়ে চোঁ চাঁ দৌড়ে পালায় উঠোন পার হয়ে।
তৌসির আলগোছে দুই হাতে তুলে নেয় নাজহাকে। ঠিক কাচের তৈরি কোনো ভঙ্গুর পুতুলের মতো, সামান্য বেশি চাপ দিলেই ভেঙে যাবে। নাজহার শরীরের উষ্ণতা তার বুকের ভেতর সেঁধিয়ে যায়, আর তার নিজের বুকের ধুকপুকানি নাজহার কানের কাছে বেজে চলে যুদ্ধের ডঙ্কার মতো। তৌসিরের মা এবার ছেলের দিকে জ্বলন্ত চোখে তাকিয়ে ধমকে ওঠেন, “তুই আর মানুষ হবি না? তিন বাচ্চার বাপ হয়ে গেছিস, এখনো তোকে আমার জুতো দিয়ে পিটিয়ে মানুষ করতে হবে?”

মায়ের রক্তচক্ষুর সামনে তৌসির অপরাধীর মতো মাথা নিচু করে ফেলে। আমতা আমতা সুরে বলে, “আর এরকম হবে না আম্মা।”
কথা না বাড়িয়ে তৌসির তড়িঘড়ি করে নাজহাকে এনে সোফায় শুইয়ে দেয়। ওর মেজো চাচি ছুটে যান, এক গ্লাস ঠান্ডা পানি এনে দেন। তৌসির আঁজলা ভরে সেই পানির ঝাপটা দিতে থাকে নাজহার চোখেমুখে। একবার, দুইবার, তিনবার। ঠান্ডা পানির ফোঁটাগুলো তার কপাল বেয়ে চুইয়ে পড়ে গলার নিচে, ভিজিয়ে দেয় সাদা ওড়নার প্রান্ত।
কিছুক্ষণ পর নাজহার ঘন কালো পাপড়িতে ঢাকা কালচে সবুজ নয়না জোড়া ধীরে ধীরে খুলে যায়। প্রথমে তার চোখের পাতা কাঁপে, তারপর ঠোঁট, তারপর সমস্ত শরীর। ঘোলা দৃষ্টিতে সে চারপাশে তাকায়। কিন্তু মুহূর্তেই মাথার ভেতর ঘণ্টা বাজার মতো সব মনে পড়ে যায়। এক ঝটকায় উঠে বসে সে। ভেতরে ভেতরে সেই একই হাতুড়ি বাজে, সব শেষ, সব শেষ। তৌসিরের মা মমতাভরা হাতে ওর পাশে এসে বসেন। এলোমেলো চুলে স্নেহের হাত বুলিয়ে দিতে দিতে নরম গলায় বলেন, “তুমি চিন্তা করো না মা, তৌসির বিয়ে করেনি। এই অমানুষটা নাটক করছিল, এই দেখো বোরকা পরানো ওটা একটা ছেলে।”

কথাগুলো ধীরে ধীরে নাজহার মগজের অন্ধকার কোণে পৌঁছায়। সে কাঁপা কাঁপা দৃষ্টিতে একবার পাশে বসে থাকা তৌসিরের দিকে তাকায়। তারপর তার দৃষ্টি ঘুরে যায় সেই বোরকা পরা ছেলেটির দিকে। ঠিকই তো, একটু ভালো করে দেখলেই বোঝা যায়, কালো কাপড়ের নিচ থেকে বেরিয়ে থাকা পুরুষালি পায়ের গড়ন, বড়সড় জুতো এবং নিকাবের আড়ালে লুকানো চওড়া কাঁধ।
কিন্তু তবু তার গোলাপি ঠোঁটজোড়া সমানে থরথর করে কাঁপছে। সব সত্যি জানার পরও কলিজাটা এখনো ধকধক করে লাফাচ্ছে।তার বুকের ভেতরের এই ঝড়টা থামতেই চাচ্ছে না। ভয়ের এক শীতল স্রোত এখনো তার শিরদাঁড়া বেয়ে নেমে যাচ্ছে। সে আরেকবার এদিক ওদিক তাকায়। তার জিহ্বাটা তালুতে সেঁটে আছে, গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। ভাঙা ভাঙা গলায় ছোট্ট করে বলে ওঠে, “ওহ, আচ্ছা। আচ্ছা, এক গ্লাস পানি হবে?”

এ শুনে সামনে রাখা কাচের জগ থেকে তৌসির প্রায় ছোঁ মেরে এক গ্লাস পানি ঢালে। গ্লাসটা তার হাতে সামান্য কাঁপে। নাজহার হাতে সেটা তুলে দিতে গিয়ে তাদের আঙুলগুলো ক্ষণিকের জন্য ছুঁয়ে যায়, এক তপ্ত স্পর্শের মাঝে লুকিয়ে থাকে এক অনুচ্চারিত ক্ষমাপ্রার্থনা। নাজহা কাঁপা হাতে গ্লাসটা নেয়। এক ঢোকেই ঢকঢক করে পুরোটা পানি গলায় ঢেলে দেয়। ভেতরের সমস্ত আগুন সে এই এক গ্লাস পানি দিয়ে নিভিয়ে দিতে চায়। পানিটুকু শেষ করে ফ্যাকাসে মুখে সবার দিকে একবার তাকায় সে, তারপর ক্ষীণ স্বরে বলে, “আমি ঠিক আছি।”
এই বলে সে আর এক মুহূর্তও দেরি করে না। তড়িঘড়ি উঠে দাঁড়িয়ে রুমের দিকে পা বাড়ায়। তার পায়ের নিচে মেঝেটা এখনো একটু একটু কাঁপছে, কিন্তু সে কাউকে বুঝতে দেয় না।
ঘরে এসে ব্যালকনির খোলা দরজার পাশে নাজহা চুপচাপ দাঁড়িয়ে পড়ে, তার দুই হাত আঁকড়ে ধরে আছে দরজার কাঠের ফ্রেম। বাইরের ঠান্ডা হাওয়া এসে তার এলোমেলো চুলগুলো নিয়ে খেলা করছে, কপালের সামনে এসে পড়া চুলের গোছা তার ভেজা চোখের পাতায় লেপ্টে যাচ্ছে। নাজহার মন চাইছে রাগে, অভিমানে, যন্ত্রণায় কলিজা ফাটিয়ে চিৎকার করে কাঁদতে। কিন্তু গলার কাছে দলা পাকিয়ে থাকা কান্নাটুকু বেরোতে পারছে না, শুধু নিঃশব্দে চোখ দুটো ভরে ওঠছে টলটলে জলে। এক ফোঁটা, দু-ফোঁটা করে সেই জল গড়িয়ে পড়ে তার ফরসা গাল বেয়ে,তা থুতনির নিচে এসে ঝুলে থাকে কিছুক্ষণ, তারপর টুপ করে খসে পড়ে মেঝেতে। কিন্তু সে টের পায় না। তার সমস্ত চেতনা এখন এক জায়গায় নিবদ্ধ, আর তা হলো তৌসির।

তৌসিরের ওপর নিজের অধিকার সে বিন্দুমাত্র ছাড়তে রাজি নয়। এই মানুষটিকে সে অন্য কারো হতে দেবে, এমন চিন্তা করাও তার পক্ষে অসম্ভব। সে যতই ঘৃণার করুক, রাগের বশবর্তী হয়ে বারবার বলুক, আপনি আমার কেউ না, নিজের ভেতরের লুকায়িত সত্যটি তার খুব ভালো করেই জানা। তৌসিরের পাশে অন্য কোনো নারীর উপস্থিতি কল্পনা করতেই তার বুকের গহিনে এক তীব্র যন্ত্রণার সৃষ্টি হয়, মনে হয় কেউ নির্দয়ভাবে তার হৃৎপিণ্ডটা নিংড়ে নিচ্ছে।
ক্ষোভে, উন্মাদনায় আর বুকচেরা অভিমানে নাজহার সর্বাঙ্গ থরথর করে কাঁপতে থাকে। অন্তরের গভীরে ঈর্ষার দাবানল দাউদাউ করে জ্বলে ওঠে, যার উত্তাপে সে নিজেই প্রতিনিয়ত দগ্ধ হয়। তবু তৌসিরকে সে কিছুতেই হাতছাড়া করবে না। কোন সাহসে অন্য কোনো নারী এসে তার এত বছরের অপেক্ষার ফল অবলীলায় ছিনিয়ে নেবে?
তার দীর্ঘদিনের রক্তক্ষরণ, না-বলা ত্যাগ, পাহাড়সমান অভিমান আর রাতের পর রাত বালিশ ভিজিয়ে নিঃশব্দে গুমরে কাঁদার কি কোনোই হিসাব নেই? এতকিছুর পরও যখন সে নিজে তৌসিরের বুকে মাথা রেখে স্বপ্নের সংসার গড়তে পারল না, তখন অচেনা অন্য একজন সেই সংসারের চাবি নিজের আঁচলে বাঁধবে? এই অবিচার সে কোনোমতেই মেনে নেবে না।

তৌসিরের প্রশস্ত বুকের কাঙ্ক্ষিত উষ্ণতা, চেনা হাতের নেশাধরানো স্পর্শ, চোখের ওই পাগল-করা দুষ্টু চাহনি, গম্ভীর কণ্ঠস্বরের প্রতিটি প্রতিধ্বনি এবং গায়ের মাতাল করা সুবাসের ওপর জন্মজন্মান্তরের দাবি একান্তই নাজহার। নিভৃত রাতের নিবিড় মিলনে তৌসিরের সযত্ন চুম্বনের অধিকার শুধুই তার। নিস্তব্ধ প্রহরে বলিষ্ঠ হাতের ছোঁয়া যখন নাজহার সমস্ত শরীরে ভালোবাসার শিহরণ জাগিয়ে যায়, সেই মোহময় মুহূর্তগুলোর একমাত্র উত্তরাধিকারী সে নিজেই।
তৌসিরের অকৃত্রিম যত্ন পাওয়া, তার প্রতিটি সুখের তৃষ্ণা মেটানোর জন্য সারারাত উষ্ণ দেহের নিচে নিজেকে সঁপে দিয়ে আচ্ছাদিত থাকা, এসব নাজহার জীবনের সবচেয়ে আরাধ্য প্রাপ্তি। তৌসিরের সেই আদিম উন্মাদনায় নিজেকে বিলিয়ে দেওয়ার মাঝেই সে নিজের পূর্ণতা খুঁজে পায়। ক্লান্ত পুরুষটি যখন সমস্ত প্রশান্তি নিয়ে নাজহার বুকে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়ে, সেই নির্ভরতার আশ্রয়ে অন্য কারো ভাগ বসানোর বিন্দুমাত্র সুযোগ নেই।
তৌসিরের এলোমেলো চুল, রাগলে কপালে ফুটে ওঠা বলিরেখা, ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা অবাধ্য হাসি, এমনকি নিশ্বাসের প্রতিটি স্পন্দনে মিশে আছে নিশ্চিতভাবে নাজহার অস্তিত্ব। অন্য কোনো নারী ওই চোখে চোখ রাখবে, অন্য কেউ ওই বুকে অধিকার ফলাবে, এই চিন্তাটাই তার শিরায় শিরায় প্রাণঘাতী বিষের মতো ছড়িয়ে পড়ে। নিজের শেষ নিশ্বাসটুকু থাকতে সে ভালোবাসার মানুষকে হাতছাড়া হতে দেবে না। প্রয়োজনে নিজে ধ্বংস হয়ে যাবে, চারপাশ ছারখার করে দেবে, তবুও তৌসির অনন্তকাল তার হয়েই থাকবে। মরে গেলেও এই অবিচল সিদ্ধান্তের কোনো পরিবর্তন হবে না।

ঠিক তখনই পেছনে ধীর, মৃদু পায়ের শব্দ শোনা যায়। তৌসির নিঃশব্দে ঘরে প্রবেশ করে। দরজা ঠেলার হালকা ক্যাঁচ শব্দ পেয়েই নাজহার শরীরটা প্রবলভাবে কেঁপে ওঠে। সে তড়িঘড়ি করে ওড়নার আঁচল তুলে দ্রুত চোখ মুছে নেয়, কেউ যাতে তার এই দুর্বলতার মুহূর্তটা দেখে না ফেলে। চোখের কোণে জমে থাকা জলটুকু মুছে সে বুকের ভেতরটাকে পাথরের মতো শক্ত করে নেওয়ার চেষ্টা করে।
তৌসির নিঃশব্দে এগিয়ে এসে নাজহার ঠিক পেছনে দাঁড়ায়। এত কাছে যে, তার উষ্ণ নিঃশ্বাস নাজহার ঘাড়ের কাছের ছোট ছোট চুলগুলোকে কাঁপিয়ে দেয়। তৌসিরের গায়ের সেই চেনা ঘ্রাণ এসে আঘাত করে তার ইন্দ্রিয়ে। কিন্তু সে ঘুরে তাকায় না। তৌসির কিছুক্ষণ চুপ থাকে, তারপর ক্ষীণ, অনুতপ্ত গলায় ধীরে ধীরে বলে ওঠে,
“নাজহা, ঐটা ওরা আমারে দিয়া করাইছে। এক মাস ধইরা এটার জন্য পইড়া ছিল, আমি নিজে থাইকা করি নাই।”
কথাটা শুনে নাজহার বুকের ভেতরটা আরো একবার মোচড় দিয়ে ওঠে। কিন্তু সে তৌসিরের দিকে ফিরেও তাকায় না। সে সামনের দিকে, দূরের আকাশের বুকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। তারপর কণ্ঠে সমস্ত অভিমান আর তীক্ষ্ণতা ঢেলে বলে ওঠে,

“ওরা করিয়েছে, না আপনি করেছেন? আগে থেকে প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছেন, কয়দিন পর তো এটাই করবেন!”
তৌসির ধীরে ধীরে এগিয়ে নাজহার একদম পাশে এসে দাঁড়ায়। কাঁধে কাঁধ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে সে ঘাড় কাত করে নাজহার দিকে তাকায়। তার ঠোঁটের কোণে ফুটে ওঠে সেই চেনা দুষ্টু হাসি। তৌসির নিচু, ফিসফিসে গলায় বলে,
“কস তো আমি তোর কেউ না, তাইলে জ্ঞান ফিট খাইয়া পড়ছিলি ক্যান?”
তার কথাটা নিমিষেই নাজহার লুকিয়ে রাখা সত্যিটাকে টেনে বের করে আনে। সে মুহূর্তেই ধরা পড়ে যায়। কান দুটো গরম হয়ে ওঠে রাগে। কিন্তু সে সেটা প্রকাশ করতে দেয় না। দ্রুত তৌসিরের পাশ থেকে সরে যেতে যেতে কণ্ঠে জোর এনে বলে ওঠে,

“ওটা হঠাৎ করে শক খেলে এরকম হয়! এতটুকু জ্ঞান নেই নাকি? আবার ওষুধের কোম্পানি চালায়!”
তার কণ্ঠে ঝাঁঝ, কিন্তু ভেতরে কাঁপন। সে দ্রুত ঘরের মাঝখানের দিকে সরে যেতে চায়, তৌসিরের কাছ থেকে দূরে গেলেই নিজেকে বাঁচাতে পারবে ভেবে।কিন্তু তৌসির এবার আর কোনো সুযোগ দেয় না। এক পা এগিয়ে এসে সে শক্ত হাতে নাজহার কোমল বাহু চেপে ধরে, এক টানে ঘুরিয়ে নিজের সামনে দাঁড় করায়। নাজহা প্রায় হুমড়ি খেয়ে তৌসিরের বুকের ওপর পড়তে পড়তে সামলে নেয় নিজেকে। তৌসির দেখতে পায়, নাজহার কালচে সবুজ চোখ দুটো এখনো টলমল করছে, চোখের পাতার কোণে জমে আছে না-বলা অভিমানের বিন্দু বিন্দু জল। তার ভেজা চোখের পাতাগুলো দেখতে ঠিক শিশিরভেজা প্রজাপতির ডানার মতো লাগছে।

তৌসির নিঃশব্দে একদৃষ্টে তার এই চোখের গভীরে তাকিয়ে থাকে। তার নিজের চোখেও অব্যক্ত কিছু একটা কেঁপে ওঠে, কষ্ট, ভালোবাসা, অনুশোচনা, সব একসাথে। তারপর ধীরে ধীরে দুই হাত তুলে সে নাজহার দুই গালে আলতো করে হাত রাখে। তার হাতের উষ্ণতায় নাজহার ঠান্ডা গাল দুটো ধীরে ধীরে গরম হতে থাকে। বুড়ো আঙুল দিয়ে অতি সাবধানে চোখের কোণের পানি মুছে দিতে দিতে তৌসির গাঢ়, ভাঙা গলায় বলে,
“আমারে হারানোর ভয়ে জ্ঞান হারাইছিলি, এইটা স্বীকার করস না ক্যান? চিন্তা করিস না, আমার ভাগ তোর কাউকে দিতে হইব না। আমি একান্তই তোর, পুরাটা তোর। এই তৌসির শুধু তোর নামে লেখা।”
কথাগুলো কোনো মহৌষধের চেয়েও বেশি কাজ করে। নাজহার বুকের ভেতরের এই দাউদাউ আগুনটা এক পলকে নিভে যায় এটা শুনে। কিন্তু সে মুখে সেটা প্রকাশ করবে না, কিছুতেই না। অভিমানের ঘৃনার পাহাড় এখনো তার ভেতরে দাঁড়িয়ে আছে।
কথা শেষ হতে না হতেই তৌসির নাজহাকে এক টানে নিজের বুকের কাছে টেনে নেয়। ঝুঁকে পড়ে সে নাজহার গোলাপি ঠোঁটে ঠোঁট ছোঁয়াতে যায়। ঠিক সেই মুহূর্তে, নিঃশ্বাসের দূরত্বে থাকা অবস্থায়, নাজহা তড়িঘড়ি করে হাত তুলে তৌসিরের ঠোঁটে চাপা দিয়ে কণ্ঠে কাঠিন্য এনে বলে,

“আমার ঠোঁট সরকারি নয় যে, আপনার যখন মন চাইবে চুমু খাবেন! খাওয়ার শখ থাকলে বিয়ে করে বউ এনে ঐ বউকে খান।”
তৌসিরের চোখে এক ঝলক আগুন খেলে যায়। সে ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ঝুলিয়ে এক হাতে নাজহার লালচে কালো চুলের পেছনের অংশে আঙুল ডুবিয়ে দেয়, শক্ত করে চেপে ধরে চুলের গোছা। অন্য হাত দিয়ে অতি সাবধানে নাজহার নরম হাতটা নিজের ঠোঁট থেকে সরিয়ে নেয়। তারপর এই হাতের তালুতে ঠোঁট ছুঁইয়ে গাঢ় স্বরে বলে,
“তোর ঠোঁট সরকারি নয় কারণ এটা একান্তই আমার। আর আমি আমার জিনিসে ঠোঁট ছোঁয়াবো, এতে তোর সমস্যা কী? বিয়ার শখ জাগলে নিশ্চয়ই বিয়া করমু, তবে করলে আবার তোরেই করমু।”
এই বলে তৌসির আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা করে না। ঝুঁকে পড়ে সে নাজহার ঠোঁটে গভীর, দীর্ঘ, তৃষ্ণার্ত এক চুমু এঁকে দেয়। চোখ বুজে সে দীর্ঘদিনের জমানো সমস্ত না-বলা কথা, সমস্ত অপেক্ষা, সবটুকু উজাড় করে ঢেলে দিতে চায় এই একটি চুমুতে।

নাজহা প্রথমে হকচকিয়ে যায়। তারপর দুই হাতে তৌসিরের কাঁধে ধাক্কা দেয়, ছাড়াতে চেষ্টা করে। কিন্তু তৌসির নাছোড়বান্দা সে থামে না। উল্টে আরো গভীরে হারিয়ে যায়। নাজহার নরম গালে, ফরসা গলার ভাঁজে, গোলাপি থুতনিতে, চওড়া কপালে, ছোট্ট নাকের ডগায়, একে একে সারা নাজহার মুখে চুমুর বৃষ্টি নামিয়ে দেয় সে। তার প্রতিটি চুমুতে লেখা আছে একটি করে অঙ্গীকার, “তুই আমার, শুধুই আমার।”
কিন্তু তৌসিরের সদ্য না-কামানো খোঁচা খোঁচা দাঁড়ির রুক্ষ স্পর্শে নাজহার কোমল, ফুলের পাপড়ির মতো গালে জ্বালা ধরে যায়। লাল হয়ে ওঠে তার ফরসা চামড়া। এবার সে দুই হাতে সর্বশক্তি দিয়ে ধাক্কা দিয়ে তৌসিরকে নিজের কাছ থেকে সরিয়ে দেয়। ভ্রু কুঁচকে রাগি গলায় বলে,

“এই খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি নিয়ে আমার কাছে আসতে না করছিলাম না? বলেছিলাম না, ছেঁকা লাগে?”
তৌসির হাসে। তার এই হাসিতে কোনো অভিমান নেই, আছে শুধু দুষ্টুমি আর অন্তরের গভীর থেকে উঠে আসা এক অকৃত্রিম ভালোবাসা। সে দুই হাত বাড়িয়ে নাজহার সরু কোমর পেঁচিয়ে ধরে, এক টানে আবারও নিজের সাথে মিশিয়ে নেয়। ওদের মধ্যে দূরত্ব বলতে এখন শুধু নিঃশ্বাসের সামান্য পথটুকু। তৌসির মুখটা নাজহার মুখের একদম কাছে এনে, তার কপালের সাথে নিজের কপাল ঠেকিয়ে চোখ বুজে নিচু, গাঢ় স্বরে জিজ্ঞেস করে,
“রাগ কমছে?”
তার নিঃশ্বাস এসে পড়ে নাজহার ঠোঁটের ওপর। তার এই উষ্ণতায় নাজহার সমস্ত শরীর কেঁপে ওঠে। কিন্তু সে হার মানবে না। মুখটা ঘুরিয়ে নিয়ে, তৌসিরের হাত সরানোর মিথ্যে চেষ্টা করতে করতে সে ঠোঁট উল্টে বলে,
“আমি রাগ করিনি। আপনি একটা কেন, একশোটা বিয়ে করুন! এতে আমার কিচ্ছু যায় আসে না।”
কিন্তু তার কণ্ঠের কাঁপন, তার চোখের কোণে আবার জমতে থাকা জল, সব প্রমাণ করে দেয় যে সে মিথ্যে বলছে। তৌসির সেটা বুঝতে পারে। সে নাজহার চোখের দিকে স্থির, গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ। তারপর ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে ফুটে ওঠে সেই চেনা বাঁকা, দুষ্টু হাসি নিয়ে নিচু গলায় সে বলে,

“করে ফেলমু বিয়া? সত্যি করে ফেলমু? বল, করমু?”
নাজহা গোঁ ধরেই বসে থাকে। মুখটা আরো একটু ঘুরিয়ে, চোখ নামিয়ে ঝাঁঝালো গলায় জবাব দেয়,
“করে ফেলুন, যান! আমাকে জিজ্ঞেস করছেন কেন? যান, এখনই যান!”
তৌসির এবার নাজহার মুখোমুখি হয়ে দাঁড়ায়। এক হাত দিয়ে সে অতি সাবধানে নাজহার থুতনি ধরে মুখটা ওপরের দিকে তোলে, যাতে সে চোখে চোখ রাখতে বাধ্য হয়। তার ঠোঁটে ফুটে ওঠে দুষ্টুমি আর মায়ার এক অনবদ্য মিশ্রণে গড়া এক হাসি। নাজহার নাকের ডগায় নিজের নাকের ডগা আলতো করে ছোঁয়াতে ছোঁয়াতে, ফিসফিসে গলায় সে বলে,
“তিন-তিনটা বাচ্চা নিয়া বউ সাজতে তোর কষ্ট হইবো, নয়তো বিয়া আবার তোরে করাই যায়! মন্দ তো কিছু না। কী কস, রাজি?”

কথাটা কানে যেতেই নাজহার চোখ দুটো বড় বড় হয়ে যায়। মুহূর্তেই তার ফরসা গাল দুটো টুকটুকে লাল হয়ে ওঠে, লজ্জায়, অভিমানে, আর গোপনে লুকিয়ে থাকা এক টুকরো খুশিতে। কান দুটোও গরম হয়ে ওঠে। সে মুখে কিছু বলার ভাষা খুঁজে পায় না। শুধু ঠোঁট কামড়ে ধরে, তৌসিরের চওড়া বুকে একটা হালকা কিল বসিয়ে দিয়ে বলে,
“অসভ্য! বেহায়া কোথাকার! ছাড়ুন আমাকে!”
কিন্তু তৌসির ছাড়ে না। উল্টে হেসে ওঠে নিঃশব্দে, তার সেই বুক-কাঁপানো হাসিতে গোটা ঘর ভরে যায়। নাজহাকে দুই হাতে বুকের মাঝে আরো শক্ত করে চেপে ধরে সে। থুতনিটা নাজহার মাথার ওপরে রেখে চোখ বুজে ফেলে, এই এক মুহূর্তকে, এই একটি রাতকে, এই একটি নাজহাকে চিরকালের জন্য নিজের বুকের ভেতরে বন্দি করে রাখতে চায় সে। বাইরে চাঁদ ততক্ষণে মেঘের আড়ালে সরে গেছে, ঘরের ভেতরের ম্লান আলো আরো ফিকে হয়ে এসেছে। কিন্তু নাজহার বুকের ভেতর তখন হাজারটা প্রদীপ একসাথে জ্বলে উঠছে। সে চোখ বুজে ফেলে, তৌসিরের বুকের ওমে নিজেকে সঁপে দেয়, এই বুকটাই তার একমাত্র ঠিকানা, এই মানুষটাই তার একমাত্র সত্য।

এ বলে তৌসির নাজহার ঠোঁটের দিকে এগিয়ে আসে তৌসিরের ঠোঁট তখন প্রায় ছুঁই-ছুঁই দূরত্বে নাজহার ঠোঁটের কাছে। তার উষ্ণ নিঃশ্বাসের ছোঁয়ায় নাজহার গালের নরম রোঁয়াগুলো শিরশির করে ওঠে,তার বুকের ভেতরে হৃৎপিণ্ডটা হঠাৎ তাল হারিয়ে ফেলে। ঠিক সেই মুহূর্তে, যখন সময়টা থমকে যেতে যাচ্ছিল, যখন দুজনের মধ্যেকার দূরত্বটা মিলিয়ে যাওয়ার অপেক্ষায়, ঠিক তখনই বিছানার ওপাশ থেকে ভেসে আসে তুরাবের কচি গলার কান্না। এই কান্নাটা ভরদুপুরে হঠাৎ গায়ে ঠান্ডা জল ছুঁড়ে মারার মতো অনুভূতি তৈরি করে। দুজনেই থতমত খেয়ে যায়।
নাজহা চট করে নিজেকে ছাড়িয়ে নেয় তৌসিরের বাহুবন্ধন থেকে। সে ওড়নার আঁচলটা কাঁধে টেনে নিতে নিতে চাপা গলায় বলে ওঠে, “নাটক করতে হবে না, ছাড়ুন। ওকে এখন না খাওয়ালে ও বাকিদেরও জাগিয়ে দেবে।”
কথা শেষ করেই সে বিছানার দিকে পা বাড়ায়। ছোট্ট তুরাবকে খুব সাবধানে দুই হাতের আঁজলায় তুলে নিয়ে সে ধীর পায়ে সোফার কাছে ফিরে আসে, আস্তে করে বসে পড়ে গদির নরম বুকে।

মায়ের বুকের চেনা ঘ্রাণ নাকে পেয়েই তুরাব ঠোঁট নাড়িয়ে মুখ দিয়ে দুধ খুঁজতে থাকে। তার ছোট্ট গোলাপি মুঠি বারবার নাজহার বুকের কাপড় আঁকড়ে ধরার চেষ্টা করে, ঠিক মনে হচ্ছে মায়ের বুকেই তার পৃথিবীর একমাত্র আশ্রয়। নাজহা ড্রেসের চেইন খুলে তুরাবের মুখে দুধ তুলে দেয়। সঙ্গে সঙ্গেই কান্না থেমে যায়, নেমে আসে ঝড়ের পরের নিস্তব্ধতা। চপ-চপ শব্দ তুলে তুরাব তৃপ্তির সঙ্গে দুধ টানতে থাকে, তার ছোট্ট নাকের ডগা ঘামে চিকচিক করে ওঠে হালকা হলুদ আলোয়।
তৌসির শব্দ না করে এগিয়ে আসে। মেঝেতে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে নাজহার সামনে। তার চোখদুটোয় এখন একধরনের বিহ্বলতা, মা আর সন্তানের এই দৃশ্যটা তার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে পবিত্র ছবি। তুরাবের চুলে আলতো হাত বুলিয়ে দিতে দিতে সে চাপা গলায় বলে, “আমার এই পোলাডা একটু আমার মতোই হইছে, দেখছোস?” এ কথা বলেই সে ঝুঁকে পড়ে তুরাবের নরম কপালে আলতো এক চুমু এঁকে দেয়। তার দাড়ির খোঁচায় তুরাব একটু নড়ে ওঠে, তবু সে দুধ ছাড়ে না।

নাজহা আড়চোখে তাকিয়ে ঠোঁট বাঁকিয়ে বলে, “দেখতে আমার মতো হলেও স্বভাব আপনার, তিনটার মধ্যেই আছে। কোনো কমতি নেই। আপনি যেমন, ঠিক তেমনই হয়েছে।”
তৌসির দুষ্টুমি ভরা চোখে হেসে ওঠে। তার চোখের কোণে ছোট ছোট ভাঁজ পড়ে। ধীরে ধীরে সে নাজহার বুকের অন্য পাশে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে ফিসফিসিয়ে বলে, “তা হইব না? আমারই তো ভেতর থেকে গেছে!”
নাজহার চোখ পলকেই জ্বলে ওঠে। রাগে নাকের পাটা ফুলে ওঠে। সে তৌসিরের চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে চাপা কণ্ঠে হিসহিসিয়ে বলে, “হাত সরান বলছি! ভালো লাগছে না এসব।”
কিন্তু তৌসির শোনার পাত্র নয়। সে আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে, একেবারে নেশাগ্রস্তের মতো। তুরাবের মাথায় একের পর এক চুমু খেতে খেতে সে নাজহার বুকের একপাশে মুখ গুঁজে দেয়। তার দাড়ির খোঁচা লাগে নাজহার নরম চামড়ায়, শিরশিরে এক অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ে সারা শরীরে। নাজহা নিরুপায় হয়ে পা দিয়ে হালকা করে তৌসিরের পেটে ধাক্কা দিয়ে চাপা স্বরে ধমকে ওঠে, “শয়তান কোথাকার! লজ্জা করে না বাচ্চাদের সামনে এমন করতে?”
তৌসির একটু সরে বসে অসহায় মুখ করে বলে, “আমি কী করলাম? ওরাই তো আমার জায়গায় ভাগ বসিয়েছে।”
নাজহা দাঁত চেপে তুরাবকে বুক থেকে সরিয়ে নেয়, ড্রেসের চেইন লাগাতে লাগাতে ঝাঁঝালো গলায় বলে, “আপনি সরুন আমার চোখের সামনে থেকে। আপনাকে দেখতে ইচ্ছে করছে না।”
এ কথা বলে তুরাবকে সে তৌসিরের কোলে তুলে দিয়ে বিছানার দিকে পা বাড়ায়। ততক্ষণে তৌশি ছোট্ট চোখ পিটপিট করে জেগে উঠেছে, মায়ের গন্ধ পেয়ে সে ঠোঁট নাড়াচ্ছে, মনের ভাব প্রকাশ করতে চাইছে অথচ ভাষা নেই মুখে। তৌসির তুরাবকে দুই হাতে শূন্যে তুলে ধরে সোফায় মাথা হেলান দেয়। ছাদের দিকে তাকিয়ে সে বিড়বিড় করে বলে, “তোরা কবে বড় হবি রে বাবারা? আর তোদের মা কবে আমার লগে একটু ভালো আচরণ করব?” তার কণ্ঠে ফুটে ওঠে এক আদুরে অভিমান।

ছোট্ট তুরাবের নীলচে চোখে এক টুকরো আকাশ ঝিলিক দিয়ে যায়। তার ঠোঁটের কোণে এখনো দুধের সাদা ফোঁটা লেগে আছে, ঠিক কোনো শিল্পীর অসাবধানী তুলির ছোঁয়ার মতো। হঠাৎ সে ফোকলা মুখে হেসে ওঠে, এই হাসিতে সারা ঘর আলোকিত হয়ে যায়। তার হাসি দেখে তৌসিরও শব্দ করে হেসে ফেলে, তুরাবকে বুকের সঙ্গে জড়িয়ে ধরে তার নরম গালে চুমু এঁকে দেয়। বাবার বুকের এই উষ্ণতায় তুরাব চোখ বন্ধ করে ফেলে, এইটুকুই তার পৃথিবী।
এতক্ষণে ওদিকে নাওয়াবও জেগে গিয়ে ছোট্ট হাত-পা ছোড়াছুড়ি শুরু করে দিয়েছে। বিছানার চাদরের ওপর তার ছোট্ট পাগুলো এলোমেলো নাচছে। নাজহা এখন তৌশিকে খাওয়াচ্ছে। সে গলা উঁচিয়ে তৌসিরকে ডাকে, “এদিকে আসুন। তুরাবকে আমার পাশে রেখে নাওয়াবকে কোলে নিন।”
তৌসির বাধ্য স্বামীর মতো উঠে এসে নাজহার পাশে বসে। তুরাবকে খুব যত্ন করে নাজহার সামনে শুইয়ে দিয়ে নাওয়াবাকে দুই হাতে তুলে নেয় সে। নবাব বাবার কোলে এসেই একটু শান্ত হয়, তবু তার চোখদুটো ঘুরে ফিরে মায়ের দিকেই ছুটে যায়। তৌশির খাওয়া শেষ হলে নাজহা তাকে পাশে শুইয়ে নাওয়াবাকে কোলে নিতে নিতে বলে, “ওদের ডায়াপার বদলে নিন। ভেজা কাপড়ে থাকলে ঠান্ডা লেগে যাবে।”

তৌসির বাধ্য ছেলের মতো মাথা নাড়ে। সে তৌশি আর তুরাবের ডায়াপার পাল্টে দেয়, ভেজা ছোট্ট নরম তোয়ালে দিয়ে ওদের কোমল গা যত্ন করে মুছে দেয়। তারপর গায়ে হালকা করে বেবি লোশন মাখিয়ে নতুন ডায়াপার পরিয়ে দেয়। ঘরে ছড়িয়ে পড়ে বেবি লোশনের মিষ্টি গন্ধ, দুধ, তুলো আর নবজাতকের এই অনন্য সুবাস যা কোনো ভাষায় বর্ণনা করা যায় না। নাজহা তার কাজ দেখতে দেখতে বলে, “মেয়েকে পাতলা একটা ফ্রক পরান, আপনি যে এনেছিলেন ঐ কালো ফ্রকটা। আর ছেলেকে পাতলা ফতুয়া।”
তৌসির মাথা নেড়ে ঝুড়ির কাছে গিয়ে যত্ন করে ভাঁজ করা কালো ফ্রকটা আর নরম সুতির ফতুয়া বের করে আনে। কাপড়ের ভাঁজে ভাঁজে এখনো ন্যাপথলিনের হালকা গন্ধ লেগে আছে। এরপর তুরাব আর তৌশিকে সেগুলো পরিয়ে দেয় সে।

এদিকে নাওয়াব একবার দুধ টানছে, তো আরেকবার চোখ ঘুরিয়ে বাবার দিকে তাকাচ্ছে, বাবাকে না দেখলে তার পেট ভরবে না। নাজহা আদুরে গলায় বলে, “খেয়ে নাও বাবা, তোমার বাবা এখানেই আছে, কোথাও যাচ্ছে না।”
তারপর সে তৌসিরের দিকে তাকিয়ে বলে, “এখানে বসুন। বসে ওর পায়ে হাত রাখুন, নয়তো ও খাবে না।”
তৌসির মুচকি হেসে ওঠে। তার সন্তানরা তো তাকে বলতে পাগল! তার বুকের ভেতরটা নিবিড় মমতায় ভরে যায়, তৈরি হয় এক অচেনা উষ্ণতা যা শুধু বাবা হওয়ার পরই টের পাওয়া যায়। সে বসে নাওয়াবের ছোট্ট গোলাপি পায়ে আলতো হাত রাখে। সঙ্গে সঙ্গেই নাওয়াবা আশ্বস্ত হয়ে শান্তিতে দুধ টানতে থাকে, তার ছোট্ট আঙুলগুলো বাবার আঙুল আঁকড়ে ধরে।
তৌসির এবার তুরাব আর তৌশির দিকে তাকায়। কালো ফ্রকে তৌশিকে ঠিক একটা জ্যান্ত পুতুল লাগছে, তার গোলাপি গাল, ছোট্ট নাক, আর ঘুমঘুম নীলেচ চোখ মিলিয়ে মনে হচ্ছে কোনো শিল্পীর নিখুঁত সৃষ্টি। পাশে নীল ফতুয়া পরা তুরাব ছোট্ট এক শাহজাদা, রাজকীয় ভঙ্গিতে হাত-পা ছড়িয়ে শুয়ে আছে। নিজের অজান্তেই তৌসিরের মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসে, “মাশাআল্লাহ!”

দুজনের থেকে চোখ ফেরানো মুশকিল। বারবার মন চাচ্ছে ঝুঁকে পড়ে ওদের নরম গালে চুমু খেতে, বুকে জড়িয়ে ধরতে। তৌসিরের চোখ ভিজে ওঠে। কতগুলো রাত সে নির্ঘুম কাটিয়েছে, কতগুলো দিন সে অন্ধকারে হেঁটেছে, কত অপমান কত কষ্ট কত লানতী আর অসম্মান বুকে চেপে বেঁচে থেকেছে, আজ এই মুহূর্তে সব মূল্যহীন মনে হচ্ছে । আল্লাহ তার জীবনের সব কষ্টের বিনিময়ে তাকে নাজহাকে দিয়েছেন, আর দিয়েছেন এই তিনটি নিষ্পাপ মুখ। এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর কী হতে পারে?
নাওয়াবের খাওয়া শেষ হলে নাজহা তাকে তৌসিরের কোলে তুলে দেয়। ড্রেসের চেইন লাগাতে লাগাতে সে বলে, “ওকেও কাপড় পরিয়ে দিন। আমি নিচে গিয়ে কিছু খেয়ে আসি।”
কথাটা শুনে তৌসির নাজহার দিকে অসহায় চোখে তাকিয়ে থাকে। নাজহা তার এই তাকানো দেখে বিছানা থেকে নামতে গিয়েও থমকে যায়। ভ্রু কুঁচকে বলে, “কী হয়েছে? এভাবে তাকাচ্ছেন কেন?”
তৌসির ঠোঁট উল্টে বলে, “ওদের দিলি, আমাকে দিবি না?”
নাজহা কথাটা শুনে দাঁত কিড়মিড় করে ওঠে,”আপনি আমার হাতের মার খেয়ে মরতে না চাইলে নিজের মুখটা বন্ধ রাখুন। আর সহ্য হচ্ছে না এসব!”
তৌসির অবাক হওয়ার ভান করে বড় বড় চোখ করে বলে, “ক্যান? আমি খারাপ কিছু কইছি? আমারও তো একটা হক আছে! আমাকে আমারটা করতে দে!”

এ কথা বলে সে ঠোঁটের কোণে দুষ্টু এক শয়তানি হাসি ঝুলিয়ে রাখে। নাজহা আর কথা না বাড়িয়ে তৌসিরকে হালকা ঠেলে দিয়ে দ্রুত পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে। পিছনে ফেলে যায় তার হাসিমুখের তৌসির আর তিন নিষ্পাপ প্রাণকে। তৌসির তার তিন ছেলেমেয়েকে নিয়ে বিভোর হয়ে পড়ে, বাইরের পৃথিবীর সব হিসেব নিকেশ এই মুহূর্তে তার কাছে অচল এবং অপ্রাসঙ্গিক। এই ঘরটুকুই তার সমগ্র ব্রহ্মাণ্ড, এই তিনটে ছোট্ট প্রাণই তার সমস্ত সম্পদ।
নিচে নেমে নাজহা সোজা রান্নাঘরের দিকে পা বাড়ায়। রান্নাঘরে এসে প্লেটে খাবার নেওয়ার সময় বাড়ির সবাই তাকে ঘিরে ধরে। কেউ জিজ্ঞেস করে সে ঠিক আছে কিনা, কেউ জানতে চায় শরীর দুর্বল লাগছে কিনা, আবার কেউ শুধু মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। নাজহা মৃদু হেসে সবাইকে আশ্বস্ত করে জানায় যে সে একদম ঠিক আছে।
রান্নাঘরের এক কোণে বিবিজান কাঠের পিঁড়িতে বসে সেদ্ধ করা কোয়েল পাখির ডিমের খোসা ছাড়াচ্ছিলেন। নাজহাকে দেখতে পেয়ে তিনি চোখ ছোট করে খোঁচা মেরে বলে ওঠেন, “এমনে তো বলে জামাইয়ের দরকার নাই, আর জামাই আরেক বউ নিয়া আসলে ঠিকই ফিট খাইয়া পড়ে যায়!”
কথাটা বলে তিনি সাত-আটটা খোসা ছাড়ানো ধবধবে সাদা ডিম মুঠো করে নাজহার প্লেটে তুলে দিয়ে বলেন, “নে, এই ডিমগুলো খাস। শরীরে জোর আসবো।”

খেয়াল করেন তিনি নাজহা শুধু আলু ভাজি দিয়ে ভাত মাখাচ্ছে, মাছের দিকে হাতই দিচ্ছে না। বিবিজান কপালে ভাঁজ ফেলে নাজহার হাত থেকে চামচ কেড়ে নেন। বড় দুটো সোনালি ভাজা পুঁটি মাছ নাজহার প্লেটে তুলে দিতে দিতে গম্ভীর গলায় বলেন, “এখন বেশি বেশি করে খাবি। তিনটা বাচ্চা তোর এই খাওয়ার ওপরই চলব। এত অল্প খেলে কেমনে হইবো, ক?”
নাজহা মাথা নেড়ে চুপচাপ খেতে শুরু করে। বিবিজানকে সে ভীষণ ঘৃণা করে কিন্তু এটাও অস্বীকার করার উপায় নেই যে এই কঠিন মহিলাটি তার খাওয়া-দাওয়ার খুব খেয়াল রাখেন। কখন কী খাবে, কী খাবে না, কী খেলে বাচ্চাদের শরীর ভালো থাকবে, কোন সময়ে কোন খাবারটা প্রয়োজন, সবদিকেই তাঁর তীক্ষ্ণ নজর সর্বক্ষণ পাহারা দিয়ে চলে, ঠিক এক পাহারাদারের মতো।

স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৬৭

মানুষের সম্পর্কগুলো বোধহয় এমনই, ঘৃণা আর ভালোবাসা, অভিমান আর মায়া, পুরনো ক্ষত আর নতুন যত্ন সবকিছু মিলেমিশে একাকার হয়ে থাকে। কোনটা যে সত্যি, কোনটা যে মিথ্যা, তা বোঝা বড়ই দুষ্কর। নাজহা ভাতের গ্রাসটা মুখে তুলতে তুলতে আনমনে জানালার বাইরে তাকায়।

স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৬৮ (২)