Home প্রিয় প্রণয়িনী ২ প্রিয় প্রণয়িনী ২ পর্ব ৬৯

প্রিয় প্রণয়িনী ২ পর্ব ৬৯

প্রিয় প্রণয়িনী ২ পর্ব ৬৯
জান্নাত নুসরাত

পশ্চিম আকাশের হলুদাভ সূর্য ডুবে যাচ্ছে। তার তেরছা রশ্মি তবুও এসে পড়ছে থাই গ্লাসের সামনে। পাতলা পর্দা ভেদ করে এসে টাইলসে খেলাধুলা করছে নিজের মতো। অলস সন্ধ্যায় ইসরাত শুয়ে আছে বিছানায়। শুয়ে শুয়ে আলসী ভঙ্গিতে সেসব দেখছে। সময় অতিবাহিত করার কোনো উপায় নেই। কারোর সাথে কোনো কথা আদান প্রদান করা তার ধাতে নেই। দুনিয়া উলটে যাক, সে মরে যাক, তবুও টু শব্দটি করবে না এই বিষয়ে। নাছির সাহেব বলেছিলেন ছোটবেলায় তাদের,’যাই করো কখনো নিজের কষ্ট কাউকে বলবে না। সুখ, আনন্দ ভাগাভাগি করে নিবে, কিন্তু দুঃখ নিজের ভেতর চেপে রাখবে, দেখবে সব এক সময় ফুরিয়ে গেছে।’
সে দেখেছে দুঃখ, কষ্ট, হতাশা সব ফুরিয়ে গেছে। প্রায় দু-যুগ কাটার পর স্বাভাবিক সম্পর্কে বাবা চাচারা এসেছেন। আরশ নুসরাতের মনো-মালিন্য ফুরিয়ে গেছে৷ তার দুঃখও ফুরিয়ে যাবে একসময়, না হয় সে নিজেই নিঃশেষ হয়ে যাবে৷ সমস্যা কী? মরে গেলে এই লোহার খাঁচা থেকে মুক্তি পাবে। জায়িন নামক বদ্ধ উম্মাদের হাত থেকে রেহাই পাবে।

ইসরাত শুয়ে শুয়ে ভাবল জীবনের সেই রঙিন দিনগুলো। যখন তারা ভাই বোনরা সুখেই ছিল। আরশ, জায়িন, হেলাল, লিপি নামক কেউ থেকেও যেন ছিল না। আবার যদি সেই সময়টাতে ফিরে যাওয়া যেতো, ইসস!
চোখ স্থির তখনো মেঝের দিকে ছিল। উপরে তুলে তাকাল জানালার দিকে৷ তুষারপাত এ বছর এখনো হয়নি। হয়তো শীতকালে হবে। বাসার সামনের উঁচু চেরিব্লসম গাছটা হতে ফুল ঝড়ে পড়ছে। উড়ে যাচ্ছে নিঃস্বাধীন। সে ও এমন উড়তে পারলে ভালোই হতো। এই বন্দী জীবন থেকে মুক্তি পেত। তার ভাবনার মধ্যেই রুমের দরজায় শব্দ হলো। উঠে বসতে যাবে গলার স্বর ভেসে এলো,”শুয়ে থাকুন, উঠতে হবে না।
ইসরাত শুয়ে পড়ল। সারাদিন ভ্যাটকি মাছের মতোই শুয়ে থাকে। বাড়ির সবার সাথে কথা হয়। যেদিন প্রথম নুসরাত জানতে পারল বোনজি আসছে খুশিতে পাগল হয়ে গিয়েছিল। ইরহামের গলা ধরে প্রায় ঝুলে গেছিল। ইসরাত সেটা দেখে হাসছিল। তার বুক ভার কমে গিয়েছিল। এর পরপরই একটা ঘটনা ঘটল। সেদিন রাতে তার একাউন্টে দশ লক্ষ টাকা ট্রান্সফার হলো। নুসরাত এত টাকা কাউকে কখনো দেয় না। সে টাকার বিষয়ে খুবই হিসেবি। সবার কাছ থেকে চেয়ে চেয়ে টাকা নিবে তবুও নিজের টাকাগুলো খরচ করবে না। টাকা যেখানে সে সেখানেই। সেই নুসরাত নাকি তাকে টাকা দিয়েছে, তা ও এত বড় এমাউন্টের, আশ্চর্য হতে ভুলে গেল সে। সাথে ছোট্ট একটা মেসেজ। একপ্রকার চিরকুট বলা যায়,’অভিনন্দন! আমি কতটা খুশি তোকে বলে বোঝাতে পারব না, ইসরাত৷ আমি পৃথিবীর সব থেকে ভালো ফুপ্পি, আওব থেকে ভালো খালা, সব থেকে ভালো চাচি হবো।’

কথাগুলো ভাবতে ভাবতেই তার হাসি ফুটল মুখে৷ জায়িন হয়তো খেয়াল করল তা। গায়ের শার্ট খুলতে খুলতে জিজ্ঞেস করল,”কিছু হয়েছে? হাসছেন যে?
ইসরাত মাথা নাড়াল দু-পাশে, তবুও তার হাসি মিটল না। তৃষ্ণাত কাকের ন্যায় জায়িন সেদিকে তাকিয়ে রইল। তার বোকা ইসরাত আর আগের মতো হাসে না। তার সাথে কথা বলে না। হ্যাঁ, না তে জবাব দেয় সবকিছুর। দোষ তো সবই তার। সে যদি জোর জবরদস্তি না করত তাহলে এমন হতো? হতো না। সেখানে একটা কিন্তু থেকেই যায়, জোরজবরদস্তি না করলেও তো আসত না মেয়েটা তার সাথে। যদি ওমন পদ্ধতি ব্যবহার না করত, আসত কী মেয়েটা? এজন্যই তো ও এমন করেছে। জায়িন বিছানার দিকে পা বাড়িয়ে আবারো তা পিছিয়ে নিল। সে কাছে গেলেই বমি করে আজকাল। তার নাকি পেট গোলায় জায়িনের গায়ের সুগন্ধিতে। তাই একদম ফ্রেশ হয়ে এসে বসল ইসরাতের পাশে। পেটটা দিন দিন উঁচু হচ্ছে। শরীর স্বাভাবিকের তুলনায় রোগা হয়ে যাওয়ায় পেটটা বেশিই বোঝা যায়৷ জায়িন হাত বাড়িয়ে ছুঁয়ে দিল তার মুখ। ইসরাত বিরক্ত হলো। সে সব সময় তার স্পর্শে বিরক্তই হয়। কখনো লজ্জার বা ভালো লাগার ছাপ ফুটে ওঠে না। তবুও সে হাত সরাল না। অনেকক্ষণ ঠেকিয়ে রেখে দিল। গালে শব্দ করে চুমু খেল। হাত বাড়াল পেটের দিকে। বলল,”শরীর ভালো আপনার? বমি হয়েছে আজ আর?
কথার উত্তর দিতে চাইল না ইসরাত, তাই চোখ বুজে নিল। জায়িন তখনো তার পাশে বসে আছে। চেয়ে আছে ড্যাবড্যাব করে। এত কী দেখে তার মুখে ইসরাত ভেবে পায় না। বিরক্ত লাগে না, বিরক্তি ধরে যাওয়ার কথা তো ছিল তার উপর, তা হলে ক্যাবলাক্যান্ত এর মতো এখনো কী দেখে? বিরক্ত হয়ে চোখ মেলে তাকাল। বলল,”চোখ সরান৷

“কেন?
থেমে থেমে জবাব দিল,“অস্বস্তি হচ্ছে। আমি বিরক্ত বোধ করছি। এভাবে কারোর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে হয় না।
“তাকালে সমস্যা কী?
“ ঘুরিয়ে প্যাঁচিয়ে এক কথা বারবার বলতে ইচ্ছে হয় না, জায়িন…
জায়িন তাকে থামিয়ে দিল। বলল,”কী বললেন আবার বলুন?
তিরিক্ষি মেজাজে জবাব দিল সে,“বলেছি ঘুরিয়ে প্যাঁচিয়ে একটা কথা বারবার বলতে ইচ্ছে হয় না।
“না ওইটা না, শেষেরটা কী বললেন?
গা ছাড়া ভাবে বলল,“জায়িন বলেছি।
জায়িন উজ্জ্বল চোখ তাকিয়ে আবদার করল,”আবারো ডাকবেন, জায়িন?
ইসরাতের ভ্রু কুঞ্চিত হলো। অস্বাভাবিক চোখে তাকিয়ে থাকল সামনের লোকটার দিকে। পাগল নাকি উম্মাদ বলবে এই লোককে? সে ভেবে পায় না। দীর্ঘ শ্বাস ভেতরে লুকিয়ে বলল,”শুনুন জায়িন, কথা বলতে ইচ্ছে হচ্ছে না। পরে কথা বলি?

জায়িন মাথা দোলাল। বসে রইল অবিচল ইসরাতের পাশে, গালে হাত ঠেকিয়ে। মেয়েটা বিরক্তির চূড়ায় পৌঁছোল। তবে আর বাক্য ব্যয় করল না। আর কত বলবে এভাবে না তাকাতে? হাহ্… ইসরাত আর কিচ্ছু বলবে না, সে চুপ হয়ে যাবে। তার সেই সিদ্ধান্ত অটল হয়ে গেল, এরপর থেকে সে চুপ হয়ে গেল। এক আকাশসম অভিমান চেপে থাকল তার বুকের মধ্যে। দুনিয়ার প্রতি। নিজের ভাগ্যের প্রতি। লোকটা কেন এভাবে বদলাল? কেন এমন হয়ে গেল? ইসরাত আগের সেই জায়িনকে বারবার খুঁজতে থাকল তার মধ্যে, কিন্তু তাকে যেন কোথাও খুঁজে পেল না। নমনীয়, শান্ত স্বভাবের লোকটা কোথাও নেই! এই জায়িনের ভেতর থেকে উধাও হয়ে গেছে। ব্যক্তি জায়িন আর এই জায়িনের মধ্যে ভীষণ তফাৎ। এত অভিমান কাকে দেখাবে ইসরাত? দুনিয়ার কেউ নেই। খা খা শূণ্যতা চারিদিকে৷ একা একা বাসায় পড়ে থাকায় মানসিকভাবে ভেঙে পড়তে শুরু করল সে। সময় যতো গড়াতে লাগল ততোই যেন চোখের নিচে ছাপ পড়ল। মনের শান্তিগুলো দুল্যিসাৎ হয়ে গেছে তার। একসময় নিজের অভিযোগ, অভিমান, রাগ ক্ষোভ, দুঃখ, হতাশা, দো-জাহানের মালিকের কাছে বলতে শুরু করল। নামাজে বসলে তা এক ফোটা জলের মাধ্যমে গড়িয়ে পড়তে লাগল জায়নামাজে। সারাদিন কোনো কাজ না থাকায় পড়ে থাকতে লাগল জায়নামাজের মধ্যে৷

নুসরাত ইসরাতকে কল দিলেও সে কল ধরল না। কপাল কুঞ্চিত করে তাকিয়ে রইল মোবাইলের দিকে অনেকক্ষণ। আহান তার শ্বশুড় বাড়ি গিয়েছে। বোন জামাইকে এক প্রকার বগলদাবা করে আহসান হাসান নিয়ে গেছেন। ইরহাম সৌরভি চট্টগ্রাম বেড়াতে গেছে৷ বেড়াতে গিয়েছে বললে ভুল হবে হানিমুনে গিয়েছে। সাথে ও বাড়ির শোহেব সাহেব, ঝর্ণা বেগম, সুফি খাতুন ও গিয়েছেন। রুহিনী বেগম সোহেদ সাহেবকে নিয়ে যেতে চাইছিলেন তারা মানা করে দিয়েছে। বলেছে তোমরা সবাই গিয়ে পিকনিক করে আসো। হানিমুন কম পিকনিক বেশিই মনে হচ্ছে এটা৷ নুসরাত ভাবনা চিন্তার মধ্যে বের হলো বাড়ি থেকে। খালি খালি লাগছে সবকিছু৷ দায়িত্বের চাপে পৃষ্ট সবাই। জীবনটা পানসে হয়ে আছে। মাথায় ওড়না প্যাঁচানো ছিল তাই ভাবল একবার পারিবারিক কবরস্থান থেকে ঘুরে আসবে। হেঁটে এগিয়ে গেল সেদিকে। লোহার গেট ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করতেই শীতল বাতাস ছুঁয়ে দিয়ে গেল তাকে৷ নুসরাত তপ্ত শ্বাস ফেলল৷ একদিন এই মাটির নিচে তাকেও যেতে হবে৷

এক পা দু-পা করে যত এগিয়ে গেল সবার কবর দৃষ্টিগোচর হলো। দূর থেকেই নিজের নামের কবরটা দেখতেই কী হলো তার, চোখ ঝাপসা হয়ে আসলো। নামের ফলকে এখনো নুসরাত নাছিরের নামটা লেগে আছে। রুবার জায়গায় হয়তো তার জায়গা হতো সেদিন। কী বোকামি করেছিল নুসরাত! নিজের বোকামির কথা ভেবেই হেসে ফেলল। মৃন্ময় তুষার এর সাথে দেখা হলে ভালো হতো৷ লোকটা কোনো খোঁজ খবর নেই। খবর নিতে হবে। ইসরাতের বিয়েটা যদি মৃন্ময়ের সাথে হয়ে যেত তাহলে কেমন হতো? ভাবনাগুলো একপাশে ফেলে গিয়ে মাটির মধ্যে বসল সে৷ ফুলের গাছ লাগিয়ে ছিল আহান আর ইরহাম। সুগন্ধি ছড়াচ্ছে চারিদিকে। নুসরাত একদলা মাটি হাতে তুলে নিল। তাকিয়ে রইল সেদিকে নির্মিশেষ নয়নে। মৃন্ময় তুষারের কথা আবারো মাথায় নাড়া দিল। কী আশ্চর্য, লোকটার কথা শুধু মনে পড়ছে কেন? একবার যোগাযোগ করবে নাকি? এখান থেকে গিয়ে যোগাযোগ করবে ভাবল। তার সেই ভাবনা তবুও মৃন্ময়কে মস্তিষ্ক থেকে বের করতে পারল না। নিরিবিলি বসে থাকতে থাকতে অনেক ঘটনা মনে পড়ল। নুসরাত যখন টের পেল লোকটা ইসরাতকে পছন্দ করে তখন সরাসরি তাকে জিজ্ঞেস করে বসল। এতে থতমত খেয়ে গিয়েছিল ভীষণ। অস্বীকার করতে চাইলেও, সে বুঝি বুঝি বলে হেসে উঠল। মৃন্ময় তাকে হুশিয়ারি দিয়ে বলেছিল,’ভালো হচ্ছে না, বলে দিচ্ছি, মিসেস নুসরাত!’

নুসরাত সেই কথার জবাবে হো হো করে হেসে গড়াগড়ি খেয়েছিল। ভদ্রলোকের বাবা তাকে পছন্দ করেছিলেন কারণ উনার স্ত্রী রঙটা চাপা ছিল। চাপা রঙের মেয়েদের দেখলেই বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে বসেন তিনি। মৃন্ময়কে নুসরাত শুধিয়েছিল,”কবে থেকে পছন্দ করেন ইসরাতকে?
লোকটা কথার উত্তর না দিয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল। মৃদু স্বরে বলে ওঠল,”সেটা জেনে আপনার লাভ কী?
সেটাই তো, জেনে তার লাভ কী? তাই আর জোরজবরদস্তি করেনি৷ শুধু জিজ্ঞেস করল,”আপনি ইসরাতকে প্রথম যেদিন দেখেছিলেন সেদিন নাকি থমকে গিয়েছিলেন?
“আপনি জানলেন কীভাবে বিষয়টা?
“মমো বলেছিল।
“ মমো কে?
“সেটা না জানলেও আপনার চলবে, এবার বলুন কেন থমকে গিয়েছিলেন?
মৃন্ময় হয়তো উত্তর দিত না, নুসরাতের ড্যাবড্যাব করে তাকানোতে বাধ্য হলো একপ্রকার। তিরস্কারের সহিত বলল,”আপনি খুবই বিরক্তিকর প্রাণি!

“ জানি আমি!
“সাথে ইন্টারেস্টিং প্রাণি!
“কীভাবে?
“এই যে আমি আপনাকে যথেষ্ট পরিমাণ ইগনোর করার চেষ্টা করছি তারপরও আপনার কথার আকর্ষণ বোধটুকু সরাতে পারছি না। আপনি নিজের দিকে মানুষকে আকর্ষণ করতে পারেন, সেই ক্ষমতা আছে।
নুসরাত বিগলিত হেসে বলল,”থ্যাংক ইউ৷ যাই হোক, কথা ঘোরানোর চেষ্টা করছেন, এত তাড়াতাড়ি আমি ঘুরছি না। এবার বলুন কেন থমকে গিয়েছিলেন?
“মানুষ সুন্দর জিনিস দেখলে থমকে যায়৷
নুসরাত কাঁধ ঝাঁকাল। ভ্রু নাচিয়ে শুধাল,”ইসরাতকে আপনার এত ভালো লেগেছে? হু হু?
“উনার চেহারা মানুষকে অ্যাট্রাক্ট করে খুব। আমি অবাক হয়ে গিয়েছিলাম এত সুন্দর একজন মানুষ যে সিলেটে আছে তা দেখে। উনাকে আপনারা চাইলে চলচিত্রে দিতেই পারতেন। উনি এতটাই সুন্দর ছিলেন যে আমি পাঁচ মিনিটের জন্য থমকে গিয়েছিলাম। আমার জাগতিক জ্ঞান উধাও হয়ে গিয়েছিল।
নুসরাত হাসল। বলল,”আমাকে এমন আজ পর্যন্ত কেউ বলল না।
মৃন্ময় তার দিকে তাকাতেই নুসরাত পা চালিয়ে চলে যেতে যেতে বলল,”হয়েছে, এখন অদ্ভুত চোখে তাকাতে হবে না।
ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল। থেমে বলল,” আশ্চর্য… চোখ সরান। চোখ সরাচ্ছেন না কেন?
হেসে ফেলল কথাগুলো ভেবে। কল আসছে। নুসরাত ধরল না৷ বাজতে বাজতে কেটে গেল। আবারো কল আসলো আবারো কেটে গেল। তৃতীয় বারের কলে নুসরাত শেষ মুহুর্তে ধরল,”আসসালামু আলাইকুম!

“ওয়ালাইকুমুস সালাম! তাড়াতাড়ি এ বাড়িতে আয় তো!
“ কোন বাড়িতে?
“সৈয়দ বাড়িতে।
ছোট্ট করে উত্তর দিল নুসরাত,” আসছি!
আসছি বলে সে উধাও। চার পাঁচ ঘন্টা কেটে যাওয়ার পর সন্ধ্যার দিকে এসে হাজির হলো সৈয়দ বাড়িতে। আরশ তখনো তার অপেক্ষায় বসে ছিল। গায়ে আঁটসাঁট কালো রঙের শার্ট। দুটো বোতাম খুলে রাখা। সোফার উপর বসে আছে৷ পায়ের উপর পা তুলে। নুসরাত এগিয়ে গেল। বাড়িটায় পিনপতন নীরবতা। তার পায়ের শব্দ তার কানেই বাজছে৷ অবাক চোখে কিছুক্ষণ আশপাশ দেখল। আরশ সোফার উপর বসে কিছু একটা করছে। নুসরাত অবাক কন্ঠে জিজ্ঞেস করল,”বাড়ির সবাই কোথায়?
“সবাই বলতে এক্সেক্ট কাকে কাকে খোঁজছিস?
“ ছোট আম্মু, আর ছোট চাচ্চুকে।
আরশের চোখ তখনো ল্যাপটপের দিকে। নুসরাতকে এগিয়ে আসতে দেখে তড়াক করে সাটার বন্দ করে দিল। নুসরাতের ভ্রু কুঁচকে গেল নিমেষেই। গা ঘেঁষে বসতে বসতে জানতে চাইল,’’কী লুকাচ্ছেন?
“সিকরেইট!

কথা শেষ করে তার সামনে আসা দু-গাছি চুল সরিয়ে দিল। বলল,”জিজ্ঞেস করলি না যে কেন ডেকে পাঠালাম?
নুসরাত ভ্রু কুটি করল। বলল,”হ্যাঁ, বলুন কেন ডেকে পাঠিয়েছেন?
পকেট থেকে সাদা পাথরের একট রিং বের করল আরশ। নুসরাতের বাঁ-হাতের তর্জনী আঙুলে পরিয়ে দিতে গিয়ে থেমে গেল। সেখানে সাধারণ একটা রিং জায়গা দখল করে আছে। হাত উল্টেপাল্টে দেখার পূর্বেই নুসরাত মুঠো করে নিল। বলল,”এত দেখার কী আছে? রিং এটা!
তীক্ষ্ণ কন্ঠে বলল,’”বিশেষ কিছু মনে হচ্ছে। উল্টো পাশ দেখি।
নুসরাত হাতের মুঠো আরো শক্ত করল। বলল,”দেখার প্রয়োজন নেই।
আরশ মাথা দোলাল। জিভ দিয়ে গাল ঠেলে বলল,”আমি বিষয়ক কিছু আছে, তাই না?
“আজিব, আপনি বিষয়ক হবে কেন?
আরশ গেল না তার সাথে বাকবিতণ্ডিতায়। বলল,”এই রিংটা খুলে ফেল।
খট করে উত্তর দিল,”না!
ভদ্র লোকের মতো ব্যবহার করল আজ আরশ। জোরাজোরি করল না। বলল,”সমস্যা নেই, ডান হাত দিয়ে দেয় তা হলে।

নুসরাত ভ্রু কুটি করে এগিয়ে দিল ডান হাত। আরশের এত ভালো মানুষি সে নিতে পারছে না। এত ভালো লোক হলো কীভাবে? ডান হাতে ঠান্ডা স্পর্শ পেতেই তাকাল সেদিকে। সাদা পাথরের মাঝারি আকৃতির একটি রিং। চোখের সামনে হাত তুলে একবার দেখল। বলল,”ভালো লাগছে, তাই না?
আরশ হু করে জবাব দিল। নুসরাত তার মুখের সামনে বারবার রিংটা নিয়ে দেখল। গদগদ কন্ঠে আবারো বলল,”ভীষণ ভালো লাগছে, তাই না?
আরশ মাথা দোলাল তার কথায় বারবার। গ্রীবা বাঁকিয়ে ঝুঁকে আসতেই নুসরাত সরে গেল দূরে। আরশ তার উন্মুক্ত কাঁধের দিকে তাকিয়ে রইল। কালো রঙের অফ সোল্ডার লং স্লিভ টপ ছিল নুসরাতের পরণে। সে ইশারা করল,”এটা কখন পরেছিস?
“এখানে আসার আগে শাওয়ার নিয়ে পরেছি।
“এটা আর পরবি না।
নুসরাত ভ্রু বাঁকাল। আরশ ক্রিম রঙের হাই ওয়েস্ট মিডি স্কার্টটার দিকে ইশারা করে বলল,”কাঁধ, পা সব দেখা যায় এমন কাপড় পরবি না। বাহিরে বের হওয়ার সময় তো একদম না।
অবাক কন্ঠস্বর নুসরাতের প্রতিধ্বনি হলো,“তাহলে কী পরব?

“যা ইচ্ছে পরিস, এগুলা না৷
নুসরাত কথা ঘোরানোর চেষ্টা করল,”ওহ বললেন না যে, ওরা কোথায়?
“কারা কোথায়?
“ ছোট আম্মু, চাচ্চু?
“ডেটে গিয়েছেন।
নুসরাত উঠে দাঁড়াল। বলল,” আসি তাহলে আমি?
“কোথায় যাচ্ছিস তুই?
“ বাড়িতে!
“বোস, কথা আছে।
বিনা বাক্য ব্যয়ে সে বসল। জিজ্ঞেস করল,”কী?
“পালাই পালাই করছিস কেন?
“ পালাচ্ছি কোথায়?
“তাহলে যাওয়ার জন্য একদম রেডি হয়ে বসে আছিস কেন?
“আশ্চর্য, যাব না বাড়িতে।
“যাবি পরে, বসে থাক।
আরশ ঘড়ির দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে বসে রইল। নুসরাতের দিকে গ্রীবা বাঁকাতেই সে বলল,”দূরে, দূরে সরে বসুন।
খসখসে কন্ঠে আরশ জিজ্ঞেস করল,“তোর সমস্যা কী? কাছে বসলে কী হবে?
“কাছে বসা যাবে না। দূরে বসুন। অকাজ করে ফেলতে পারেন আপনি।
আরশ সরে বসল। বিড়বিড় করে বলল,” একদিনের জন্য তুই আমার কথা শুনলে আমি তোকে দিয়ে কী কী করাতাম তা তুই ভাবতে পারবি না।
নুসরাত শোনে ফেলল। বলল,”কী করতেন?

“আগে একদিনের জন্য আমার কথা শোন, তারপর দেখ।
নুসরাত বলল,”আচ্ছা, শোনব।
ভ্রু উচিয়ে শুধাল,“কোনদিন?
“উমমম.. আজকে?
“আজকে? তাহলে ওয়াদা কর! কথার খেলাফ করা যাবে না কিন্তু, নুসরাত।
“ আমি ওয়াদার বিষয়ে পাক্কা, ওয়াদা।
আরশের বাড়িয়ে দেওয়া হাত স্পর্শ করল নুসরাত। আরশ জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে নিয়ে বলল,“তাহলে একদিনের জন্য, আই মিন চব্বিশ ঘন্টার জন্য আমার কথা শুনবি তুই?
নুসরাত মাথা দোলাল। সাধারণ ভাবেই বলল,”একদিন, একদিনের জন্য আমি আপনার সব কথা শুনব। আপনি যা বলবেন তাই করব।
আরশ তাকাল তার দিকে। চোখা নয়নে তাকিয়ে নিয়ে আবার জিজ্ঞেস করল,” আমি যা বলব তাই করবি?
নুসরাতের পাহাড়ের মতো অটল কন্ঠ,”হ্যাঁ!
আরশ হাসল। জিভ দিয়ে গাল ঠেলে বলল,”তাহলে কাজটা চুমু দেওয়া থেকে শুরু করা যাক?
কথাটা শেষ হতেই চোখ দুটো বড় বড় হয়ে গেল নুসরাতের। সে বলল,”আমি তো ওই বিষয় নিয়ে বলিনি। এসব কী?
আরশ হাত বাড়িয়ে তাকে স্পর্শ করার আগেই সে সামান্য সরে গেল।

“শুধু হ্যাঁ হবে আমার কথায়, কোনো না নেই। রুমে চল!
“রুমে কেন?
“ সেটা রুমে গেলেই বুঝতে পারবি।
আরশ আরেকটু আগাতেই নুসরাত সোফা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে গেল তড়াক করে৷ উপরের করিডোর নিরবতা বিরাজমান। কেউ না থাকার জন্য নুসরাতের উঠে দাঁড়িয়ে পিছিয়ে যাওয়ার শব্দ ধুপধাপ হলো। আরশ নিজেও উঠে দাঁড়াল। নুসরাত দু-পাশে মাথা দুলিয়ে বলল,”এটা চিটিং, আপনি বাটপারি করছেন, আমি ভেবেছি…
“হ্যাঁ, তুমি কী ভেবেছিলে?
সাদা টাইলসে পা ফেলে আরশ এগিয়ে গেল। নুসরাতের চোখ তার পায়ের দিকে গেল একবারের জন্য। ফরসা পা জোড়ায় রক্ত জমাট বাঁধতে দেখল সে। তার কথা কানে যেতেই মুখ তুলে তাকাল। ভরকানো চেহারা প্রতিচ্ছবি হলো আরশের সামনে বলল,”আপনি তুমিতে যাচ্ছেন কেন?
“বিশেষ মুহুর্তে বিশেষ ভাবে ডাকছি, প্রিসিয়াস!
“আরশ…”

বাকিটুকু শেষ করতে পারল না, আরশ তাকে থামিয়ে দিল। বলল,”ওয়াদাবদ্ধ তুমি, আমি যা বলব, যা করতে বলব সবকিছুতে হ্যাঁ বলতে হবে। টুয়েন্টি ফোর হাওয়ার্স এর জন্য, হ্যাঁ বলতে হবে। মাত্র পাঁচ মিনিট হয়েছে ওয়াদাবদ্ধ হওয়ার৷
নুসরাতের চোখ কোটর ছেড়ে বেরিয়ে আসলো। সেখানে অসহায়ত্ব ভর করল। ভয়ে হোক, আতঙ্কে হোক পিছিয়ে গেল৷ তার গলার আওয়াজ প্রতিধ্বনি হলো,”আপনি এমন করতে পারেন না, আরশ ভাই!
আরশ হাসল। নুসরাতের চোখের মধ্যে তাকে দানবের মতো ঠেকল। সে সদর দরজার দিকে ছুটল। ধুপধাপ করে। দৌড়ের সাথে স্কার্টটা ও উড়ল। পেছন থেকে আরশের হাসির শব্দ ভেসে আসছে। তার সাথে গুঞ্জন উঠল,”আই’ল চেইস ইউ, এন ইউ’ল রান অ্যাওয়ে ফ্রম মি। হাও নাইস!
আরশের কথা সে কানেই ঢোকাল না ঝড়ের গতিতে ছুটল, তার সেই ছোটার মধ্যেই শূন্যে ভাসল। পা দুটো ঝুলে রইল। চোখ নিচে যেতেই স্তম্ভিত হলো সে। একহাতে তাকে আঁকড়ে ধরে রেখেছে লোকটা। তার পা দুটো মেঝেতে স্পর্শ করছে না। নুসরাত চ্যাঁচাল,”আপনি এমন করতে পারেন না। আমাকে দিয়ে ওয়াদা করিয়েছেন এজন্য? আপনি বা ট পা র, ল ম্প ট..
নুসরাতের চ্যাঁচানোর মধ্যেই সদর দরজা আটকে দিল আরশ। বলল,”শান্ত হও!
নুসরাত শান্ত হলো না, আরো বেশি বাড়ল তার হাত পা ছোঁড়া। আরশ তাকে শান্ত করার চেষ্টা বাদ দিয়ে কাঁধে তুলে নিল। মেয়েটার অর্ধেক শরীর ঝুলে রইল আরশের পিঠের দিকে। সে উল্টে থেকে বলল,”আমি আপনাকে গলা টিপে মেরে ফেলব।

“আচ্চা!
“ আপনি একটা খ বি স!
“ওকে!
মেয়েটার কন্ঠস্বরে অসহায়ত্ব। চোখ দুটো নমনীয় হয়ে আসলো,”আপনি এমন করছেন কেন?
“ কেমন করছি?
উত্তর দেওয়ার সুযোগ হয়ে উঠল না, নুসরাতের লাফালাফিতে। অদ্ভুত কর্মকান্ডে নিজেই উল্টে গেল৷ চোখ দুটো কুঁচকে গলা ফেঁড়ে চ্যাঁচিয়ে উঠল সে। ধড়াম করে পড়ার আগেই তার পা ধরে টেনে নিল আরশ। বলল,”শান্ত হতে বলেছি না?
“আপনি আমাকে ছেড়ে দিন, আমি শান্ত হয়ে যাব।
“ বাচ্চাদের মতো আচরণ করছ তুমি?
“ফাস্টে আপনি আমাকে তুমি করা বলা বন্দ করুন। অস্বাভাবিক লাগছে।
আরশ তার কথায় কোনো মাথা ব্যথা প্রকাশ করল না। সিঁড়ি ভেঙে উপরে উঠে গেল। ধুপধাপ শব্দ যতো বাড়ল নুসরাতের ছুটে যাওয়ার প্রবণতা ততো বাড়ল। অসহায় কন্ঠে বিড়বিড় করতে শোনা গেল,”আপনি এমন করতে পারেন না, আরশ ভাই।

আরশ তাকে বিছানার উপর ফেলে দিল। দরজার নব ঘুরিয়ে লক করে দিতে দিতে হাসল। হাসির শব্দের সাথে প্রতিধ্বনি হলো কিছু বাক্য,”আমি সব করতে পারি। তুমি যা যা ভাবতে পারো না, তা তা আমি করতে পারি৷… বারবার ভুলে যাও কেন, হু, ইউ আর মাই ওয়াইফ, লিগ্যাল ওয়েডেড ওয়াইফ। বোঝো কিছু?
নুসরাত কানেই তুলল না সেসব। উঠে দাঁড়াল লাফ মেরে। বলল,”আমি ক্যারাটে জানি। কাছে এসে দেখুন, ঘাড় ভেঙে রেখে দিব।
“আমি ও জানি!
কপাল কুঞ্চিত করে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল মেয়েটা। বলল,”এসব পাপ কাজ করতে নেই, আরশ ভাই।
আরশ না চাইতেও হেসে ফেলল আবার,”তোমার অসহায় কন্ঠ শুনতে ভালো লাগছে।
“আপনি পাগল?
“ পাগলাগারদ থেকে ঘুরে এসেছি। তাহলে কী আমি? বলো তুমি?

আরশকে এগিয়ে আসতে দেখেই নুসরাত দু-লাফে বেডের শেষের দিকে চলে গেল। সঙ্গে সঙ্গে মড়মড় করে শব্দ হলো। নুসরাত আতঙ্কিত মুখে একবার দেখল বিছানাকে একবার দেখল আরশকে। ধড়াম করে শব্দ হতেই খাটের একপাশ ভেঙে পড়ল, যে পাশে নুসরাত দাঁড়িয়ে ছিল। সরে যাওয়ার আগেই ভাঙা অংশের সাথে নিজেও পড়ে গেল৷ ঘাড়ে ব্যথা পেল। চ্যাঁচিয়ে উঠল,”ভেঙে গেল কীভাবে?
“বেডে উঠে লাফালাফি করছো ব্যাঙের মতো আর ভাবছো টিকে থাকবে?

নুসরাতকে টেনে তুলে নিল সেখান থেকে আরশ। পাজো কোলে তুলে নিয়ে আগাল অন্যরুমের দিকে। নুসরাত বলল,”খাট ভেঙে গেছে দেখছেন। আজকে আমাদের ভেতর কিছু হোক খাট ও চাচ্ছে না। আমি চলে যাই তাহলে?
তার আর চলে যাওয়া হলো না। আরশের কোল থেকে হাজার চেষ্টা করে ছুটে পালাতে পারল না। শার্ট খুলে ছুঁড়ে মারে দূরে। দু-একটা বোতাম মেঝেতে পড়ে শব্দ হয়। বাহির থেকে মৃদু আলো এসে রুমে পড়ছে। সেই আলোয় দেখা যায় বিছানায় মেয়েটাকে সহ ঝাপিয়ে পড়েছে আরশ। শক্ত বুকের নিচে পিষে ফেলে নিমেষেই। হাত-পা ছোঁড়া তখনো চলছে তার। অবাধ্য স্পর্শরা কাভু করতে চাইল নুসরাতকে, তবুও সে ছটফট করল, ছুটে পালানোর চেষ্টা চালাল শেষ পর্যন্ত। তার সেই বৃথা চেষ্টা দেখে আরশ হেলাল শুধুই হাসল। খাঁমচি, ধাক্কা, কিল মেরে দূরে সরাতে চাইল শীর্ণ হাতগুলো, তাও চলে গেল আরশের এক হাতের মুঠোয়।। শক্ত করে আঁকড়ে ধরল। ভারী শরীরের নিচে তার শ্বাস-প্রশ্বাস ঘন হলো। হা করে শ্বাস ফেলে আওড়াল,”আমি আর কখনো আপনাকে বিশ্বাস করব না।

সেই কথা রুমের চার দেয়ালে বারি খেয়ে মিলিয়ে যায়। আরশ তার সংবেদনশীল উন্মুক্ত কাঁধে দাঁত বসায়। হায়েনার মতো অবিরত চলতে থাকা দুটো ঠোঁট নিজের ওষ্ঠের ভাঁজে মিলিয়ে নেয়। নুসরাত না চাইতেও ফুঁপিয়ে উঠে। ক্ষোভে মুখ লাল হয়। আরশের নাকে ইচ্ছেমতো কয়েকটা মারার আকাঙ্ক্ষা জাগ্রত হয়, তা মাঝপথেই জলাঞ্জলি দিতে হয়। আরশ প্রেয়সীর রাগে, ক্ষোভে, ফুলেফেপে ওঠা মুখ দু-হাতের অঞ্জলিতেআঁকড়ে ধরে। শুধায়,”আফসোস হচ্ছে?
তার চোখ বেয়ে এক ফোটা জল গড়িয়ে পড়ল। কাঁদো কাঁদো স্বর ভাসল,”ভীষণ, ভীষণ আফসোস হচ্ছে। আমি আপনাকে খু*ন করব। দু-হাতে গলা টি’পে মে’রে ফেলব।
আরশ নুসরাতের কথা হেসে ফেলে। হো হো করে।গা দোলে উঠছে তার হাসির তালে। ফিসফিসানো স্বর প্রতিধ্বনি হলো পুরো রুমে,”আমার কষ্ট বোঝো তুমি? ঊনিশটা বছর তুমি সময় পেয়েছ। ঊনিশ বছরে কত দিন হয়, কত সপ্তাহ হয়, কত মাস হয় বোঝো? বলো, বোঝো? বোকার মতো আচরণ করছ তুমি, সুইটহার্ট।
নুসরাতের চোখের পানি মুছে দিলো হাতের তালু দিয়ে আরশ। মেয়েটার গলার স্বর ভঙুর,”তো কী বুঝব? আপনাকে দেখলেই কাছে আসো জান, কাছে আসো না, বলব?

আরশ সে কথার উত্তর দিল না। চুলে হাত বুলিয়ে দিল। হাত-পা ছোঁড়া বন্দ হয়েছে অনেকক্ষণ আগে। চুপচাপ বুকের নিচে পড়ে আছে এখন। কিন্তু পিঠে খামচি দেওয়া অব্যাহত আছে। ইচ্ছে মতো খামচি বসিয়ে শোধ তুলছে। সময় নিল কিছু একটা বলার জন্য। ঢোক গিলে বলল,”আপনি আমাকে ম্যানুপুলেট করেছেন। আফসোস হচ্ছে, আপনার কথায় আসলাম কীভাবে আমি? আপনি সুযোগ সন্ধানী, আরশ ভাই! যেই সুযোগ পেয়েছেন, ওমনি ঝাপিয়ে পড়েছেন।
আরশ নরম হাতে তার ঘাড় চেপে মুখটা তুলে নিয়ে নরম চুমু ঠোঁটের কোণে বসাল। রুদ্ধশ্বাসে চুমু খেয়ে তার নাকে নাক স্পর্শ করল। নরম কন্ঠে আওড়াল,”নুসরাত নাছির, বেশি বেশি আফসোস করো। এই আফসোস আমাকে ঘিরে করো। আমাকে ঘিরে তোমার সব কিছু আমি ভীষণ পছন্দ করি। আফসোস, চিৎকার, কান্না,আমি ভীষণ পছন্দ করি। আমার কষ্টের একাংশ তুমিও অনুভব করো, আমি কেন একা অনুভব করব?

প্রিয় প্রণয়িনী ২ পর্ব ৬৮

নুসরাত চোখ মেলে তাকাল যখন তখন ভীষণ সুন্দর একজোড়া চোখের সাথে তার দৃষ্টি মিলল। ঘনপল্লবে ঘেরা চোখ দুটোর পানে তাকিয়ে থাকতে থাকতে তার চোখ বেয়ে এক ফোটা জল গড়িয়ে পড়ল। সে জিজ্ঞেস করতে চেয়ে ছিল কী এমন কষ্ট অনুভব করেছে আরশ, সেই কথা আর জিজ্ঞেস করতে পারল না। লালাভ বর্ণ ধারণ করা চোখগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকা শেষ হতেই চোখ বন্দ করে ফেলল। হাত তুলে ঢেকে দিল আরশেরও চোখ। ফিসফিস করে বলল,”আফসোস করব, কষ্টের একাংশ অনুভব করব, তবুও এভাবে তাকিয়ে থাকতে হবে না। চোখ বন্দ করুন।

প্রিয় প্রণয়িনী ২ পর্ব ৭০