যেই তুমি এলে পর্ব ৫
সিনথিয়া ইসলাম সীমা
সময় চির বহমান। কোনো পিছুটানহীন স্রোতের মতো বয়ে চলে সে, পেছনে ফেলে যায় অগণিত স্মৃতি। দেখতে দেখতে কেটে গেছে দুটি বছর। অথচ কিছু স্মৃতি সময়ের স্রোতেও ভেসে যায় না- নীরবে হৃদয়ের গভীরে রয়ে যায়।
মির্জা নিবাসের দেয়াল গুলো যেন আজ অনেকটাই রঙচটা হয়ে গেছে। দুবছর আগের সেই রঙিন ভাবটা আর নেই। তবে ভিতরের খুনসুঁটি তে বাড়িটা যেন সর্বদাই প্রাণবন্ত হয়ে থাকে। তার কোনো পরিবর্তন নেই।
দাওরায়ে হাদিসের সেমিস্টার পরীক্ষা দিয়ে অনেকদিন পর আজ বাড়িতে এসেছে কাইফা। কৃশান নিজেই গিয়ে মেয়েকে নিয়ে এসেছে। যদিও কাইফা বলেছে- সে একাই আসতে পারবে। তবে তার কথা আমলে নেয়া হয়নি। দুই বছর আগের সেই ঘটনাটা যেন আজও মির্জা পরিবারের মনে অদৃশ্য আতঙ্ক হয়ে বেঁচে আছে। তাই কাইফাকে নিয়ে তাদের সতর্কতা আগের চেয়ে দ্বিগুণ।
কাইফা বাড়িতে প্রবেশ করা মাত্রই সকলের উদ্দেশ্যে সালাম চুকল। পরপর ছুটে এসে জড়িয়ে ধরল জননীকে। তৃষ্ণার্থ গলায় ডাকল,
“ আম্মু! ”
হুমায়রার মুখে হাসি ফুটল। দুহাতে আগলে নিল মেয়ের ছোট্ট দেহ খানা।
“ হুম মা! কি অবস্থা তোমার? পরীক্ষা কেমন হলো? ”
মাকে ছেড়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল কাইফা। সাবলীল গলায় জবাব দিল,
“ আলহামদুলিল্লাহ ভালো। ”
পৃষ্ঠে ভেসে আসে হুমায়রার স্নেহ মাখা কণ্ঠ,
“ আচ্ছা যাও এখন ফ্রেশ হয়ে আসো। ”
ইয়াসমিন বেগম সোফায় বসে ছিলেন। ছেলে বউয়ের সাথে তিনিও তাল মিলিয়ে বললেন,
“ হ্যাঁ তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হয়ে আয় তোর সাথে দাদির অনেক জরুরি কথা আছে। ”
“ কি জরুরি কথা দাদি? খুব গরজিয়াস কিছু নাকি? ”
নাতনির শেষ কথায় হেসে ফেললেন বৃদ্ধা। এক কালে ছেলের মুখে শুনে এসেছেন এই শব্দটা। এখন তার মেয়েও একই শব্দ পুনরাবৃত্তি করা শুরু করেছে। ইয়াসমিন বেগম হাসিমুখে জবাব দিলেন,
“ হ্যাঁ, গরজিয়াস কথা। তুই তাড়াতাড়ি আয় তারপর বলব নে সবকিছু। ”
“ আচ্ছা তুমি জাস্ট এক মিনিট অপেক্ষা করো। আমি পাঁচ মিনিটেই আসছি। ”
রমণীর পদযুগল কক্ষের দিক ছুটে। সকলে তাকিয়ে থাকে ছুটে চলা সেই ঊনবিংশীর পানে। কাইফা স্বভাবের ক্ষেত্রে হুমায়রার পুরো বিপরীত। হুমায়রা যেমন ছোট থেকেই সর্বদা শান্ত শিষ্ট, নির্জীব হয়ে থেকেছে তার মেয়ে ঠিক ততটাই চঞ্চল, প্রাণবন্ত ও জেদি হয়েছে। কিছুটা বাবার মতো। অবশ্য হুমায়রার জীবনের নির্মম ভিন্নতার কারণেই সে ওরকম হয়ে উঠেছিল। তবে তার মেয়ের জীবনে ওসবের কোনো প্রভাব নেই। সর্বদা পরিবারের আহ্লাদ ও ভালোবাসাতেই পরিপূর্ণ সে। আর ওর প্রাণবন্ত স্বভাবে পরিপূর্ণ মির্জা নিবাস।
ফ্রেশ হয়ে যতটা হাসিমুখে কাইফা দাদির নিকট এসেছিল ঠিক ততটাই চুপসে গেছে দাদির কথা শুনে। মেয়েটার মনের চার দেয়ালে বারংবার বারি খেতে লাগল একটাই শব্দ “ বিয়ে ”। ওর বিয়ে? হ্যাঁ ইয়াসমিন বেগম তো সেটাই বললেন। কিছুদিন পর তার পরিচিত কারা নাকি কাইফাকে দেখতে আসবে। এরপর পছন্দ হলেই বিয়ে।
রমণীর ক্ষীণ দেহটা ক্ষণিকের জন্য অনড় হয়ে থাকে। হুট করেই মনে পড়ে-
“ ওর তো বিয়ে হয়েই গেছে…! ”
এই একটি বাক্যতেই থেমে গেল মেয়েটা। পরক্ষণেই বুকের ভেতরটা হু হু করে উঠল। যে বিয়ের কোনো স্বীকৃতি নেই, কোনো পরিচয় নেই- সেই বন্ধনই আজ নতুন করে তার পথ আটকে দাঁড়িয়েছে। সেই চেনা কিংবা পুরোটাই অচেনা পুরুষের সাথে যে আজও বাঁধা পড়ে আছে সে। সেখান থেকে ছুটকারা না পেয়ে কীভাবে নতুন বন্ধনে আবদ্ধ হবে কাইফা? এ যে ইসলামে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ও অবৈধ। এ অবৈধ কাজ তো কখনোই করতে পারবে না সে। কিন্তু এভাবে কতদিন চলবে? আদৌ কি কোনোদিন রিক্তর সাথে পুনরায় সাক্ষাৎ হবে তার। যেখানে গত হয়ে যাওয়া দিনগুলোতে মানুষটা পুরোপুরি উধাও ছিল। সেখানে কীভাবে তাকে খুঁজে পাবে কাইফা?
“ কিরে কি ভাবছিস এতো? ”
ভাবান্তর হলো রমণীর। নড়ে চড়ে উঠল খানেক। তৎক্ষনাৎ দাদির দিক তাকিয়ে জানাল,
“ কিছু না। ”
ইয়াসমিন বেগম লক্ষ্য করলেন নাতনির চেহারাটা কেমন আঁধার হয়ে গেছে। তিনি নিজের মতো অনেককিছু আন্দাজ করলেন। অতঃপর আশ্বস্ত করে বললেন,
“ ভয় পাসনা। ছেলে একেবারে সুপাত্র। তোর বাবাও পছন্দ করেছে। এখন তোর পছন্দ হলেই হলো। বাবার উপর তো ভরসা আছে তাইনা? ”
পৃষ্ঠে ভেসে আসলো কাইফার অত্যধিক শান্ত স্বর,
“ হুম। ”
পরপরই মেয়েটা বসা থেকে উঠে পড়ল। কক্ষের উদ্দেশ্যে পা বাড়িয়ে বলল,
“ আচ্ছা আমি এখন রুমে যাই। ”
হুমায়রা এতক্ষণ দাদি নাতনির সব কথাই শুনেছে। এমনকি মেয়ের রিয়েকশনও দেখেছে আড়চোখে। কাইফা চলে যেতেই সে শাশুড়ির নিকট এগিয়ে এসে বলল,
“ আম্মু এতো তাড়াতাড়ি ওকে এসব বলার কি দরকার ছিল? কিছুদিন পরেই জানানো যেত। ”
“ শুনো আগে থেকে সবকিছু জানিয়ে রাখা ভালো! এতে মনের ভিতরের সকল দ্বিধা বুঝে ওঠার সময় পাবে ও। আর নিজের কোনো মতামত থাকলেও ভেবে চিন্তে জানাতে পারবে। ”
কথাটা যুক্তিসঙ্গত লাগল হুমায়রার নিকট। অতএব আর কথা বাড়াল না সে।
সকালের কোলাহল থেমে গিয়ে ধরণীতে নেমে এলো দুপুরের নির্জনতা। ব্যস্ত শহর তখন তলিয়ে আছে ক্লান্তিতে।
বিছানায় শুয়ে শুয়ে উর্দু সাহিত্যের বই পড়ছে কাইফা। উর্দু সাহিত্য পড়তে ভীষণ ভালোবাসে সে। বিশেষ করে মির্জা গালিবের গজল ও কবিতা তার সবচেয়ে প্রিয়। বুকশেলফে বিভিন্ন ইসলামিক বই, হাদিসের কিতাব আর উর্দু সাহিত্যের সংকলন মিলিয়ে যেন রুমের মধ্যেই ছোট্ট একটা লাইব্রেরিই গড়ে উঠেছে তার। যে লাইব্রেরির এক কোণায় থাকা ছোট্ট বেডটাতে নিজের মতো দিন কাটায় এ বাড়ির সবচেয়ে আদরের কন্যা। রুমের করিডোর থেকে আসা ঠান্ডা হাওয়া ও ফুলের সুবাসে যেন রমণীর দিনগুলো আরো স্বর্গীয় হয়ে ওঠে।
“ কাইফা? ”
অকস্মাৎ সুপরিচিত নারী কণ্ঠটায় বইয়ের ভাঁজ থেকে মুখ তুলে তাকাল কাইফা। সামনের ব্যক্তির উদ্দেশ্যে মুচকি হাসি উপহার দিয়ে বলল,
“ ভিতরে এসো আম্মু। ”
হুমায়রা ধীর পায়ে এগিয়ে এলো। বসলো এসে মেয়ের পাশে। বিয়ের কথাটা জানার পর থেকেই কাইফার মধ্যে কেমন যেন একটা আনমনা ভাব দেখা যাচ্ছে। হুমায়রা কিয়ৎক্ষণ গভীর দৃষ্টিতে মেয়ের দিক চেয়ে থেকে প্রশ্ন করল,
“ তোমার কি মন খারাপ? ”
“ না তো! ”
তড়িৎ মাথা ঝাকিয়ে না সূচক জবাব দিল কাইফা। কিন্তু ভিতরে ভিতরে একটা ভয় কাজ করল।
“ শুনো আম্মু বিয়ে নিয়ে কোনো কথা থাকলে নির্দ্বিধায় জানাবে। সময় তো আছেই অযথা এসব নিয়ে বেশি মাথা ঘামাবে না। ”
কাইফা মনযোগ দিয়ে হুমায়রার কথাগুলো শুনল। পরপর হুট করেই মায়ের কোলে মাথা এলিয়ে দিল। কিছুক্ষণ নীরব থেকে প্রশ্ন ছুঁড়ল,
“ তোমার কাছে বিয়ে সংসার মানে কি আম্মু? ”
“ এক কথায় বলতে গেলে- বিয়ে মানে পবিত্রতা আর সংসার মানে ধৈর্য্য। ”
“ কিন্তু আমার যে ধৈর্য্য নেই! ”
মেয়ের কথায় মৃদু হেসে ফেলে হুমায়রা। ওভাবেই বলে,
“ তাহলে কি আছে? বাবার মতো জেদ? ”
“ হুম। ”
“ তো জেদ টাই ধরে রাখবে। তবে সেটা সংসার টেকানোর ক্ষেত্রে। ”
পৃষ্ঠে কোনোরূপ সাড়া শব্দ করল না কাইফা। চুপটি করে রইল মায়ের কোলে। এর মাঝেই হুমায়রার হাতে থাকা ফোনটা বেজে উঠল। স্ক্রিনে পরিচিত নাম্বারটা দেখতেই হাসিমুখে কল রিসিভ করল হুমায়রা। ওপাশ থেকে ভেসে এলো রিনরিনে নারী কণ্ঠ,
“ আসসালামু আলাইকুম, কেমন আছো হুমায়রা আপু? ”
“ ওয়া আলাইকুমুস সালাম। এইতো আলহামদুলিল্লাহ ভালো। তোর কি অবস্থ বনু? ”
“ খবরাবর পরে আগে বলো শুক্রবারে তোমরা আসছ কিনা? ”
জোর গলায় বলে উঠল অর্না(মামাতো বোন)। অর্নার এক মেয়ে এক ছেলে। আগামী শুক্রবার তার ছ’বছরের ছেলের খৎনা উপলক্ষে তাদের বাড়িতে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হবে। সেখানে পুরো মির্জা পরিবারকে আরো আগেই অর্থাৎ সপ্তাহের প্রথম দিকেই ইনভাইট করা হয়েছে। কিন্তু বরাবরের মতোই সেই ইনভাইট গ্রহণ করেনি হুমায়রা। কেননা কৃশান তাকে কখনো কোনো অনুষ্ঠান তো দূর ঘর থেকেই বেরোতে দেয়না।
“ আমিতো আগেই বললাম আপু যেতে পারব না। ”
পৃষ্ঠে মুখ কালো করে ফেলে ওপাশের নারী। ওভাবেই বলে,
“ কাইফা কি মাদ্রাসায়? ”
“ না আজকে বাসায় এসেছে। ”
“ তাহলে কাইফাকে পাঠাও। তুমি এই অব্দি সবসময় মাদ্রাসার বাহানা দিয়ে মেয়েটাকে এখানে আসতে দাওনি। এবার কোনো বাহানা শুনছি না আমি। ”
হুমায়রা কিয়ৎক্ষণ চুপ থেকে কাইফার পানে তাকায়। ভ্রূ নাচিয়ে জানতে চায় মেয়ের অভিব্যক্তি। কাইফা দ্বিধায় পড়ে যায়। বিয়ের কথাটা শুনার পর থেকে ওর মনটা কেমন যেন ছটফট ছটফট লাগছে। কিছুদিনের জন্য কোথাও বেড়াতে গেলে বোধ হয় ভালোই হবে। আর এমনিতেও খলামনির বাড়িতে কখনো যাওয়া হয়নি তার। সুতরাং ভেবে চিন্তে হ্যাঁ সূচক ভঙ্গিতে মাথা নাড়াল সে।
“ আচ্ছা দেখি তোর দুলাভাইয়ের সাথে কথা বলে কি বলে। ”
“ এক্ষুণি গিয়ে কথা বলো তুমি। আমি কাল সকালেই গাড়ি পাঠাব ওকে নিয়ে আসার জন্য। ”
“ আগামীকালই! ”
“ হ্যাঁ, তুমি দ্বিরুক্তি করলে ভালো হবে না কিন্তু! ”
“ আচ্ছা আচ্ছা দেখছি আমি। ”
আরো কিছুক্ষণ কথা চলল দুবোনের মধ্যে। এরপর কল কেটে হুমায়রা মেয়ের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন ছুঁড়ল,
“ তুমি কি সত্যিই যেতে চাও? ”
“ হুম, আর ওখানে তো কোনো পুরুষ মানুষ নেই। আংকেল তো বিদেশেই তাইনা? ”
“ হুম তাই তো জানি। আচ্ছা আমি তোমার আব্বুর সাথে কথা বলে দেখছি। ”
রাতে কৃশানের কাছে কাইফার যাওয়া নিয়ে কথা তুলে হুমায়রা। ওমনিই নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে মানব। কিছুদিনের জন্য তার মেয়ে বাসায় এসেছে এর মাঝেই আবার কোথাও যাবে? তবে পরক্ষণেই স্ত্রীর থেকে মেয়ের যাওযার ইচ্ছা শুনে কিছুটা দমে গেল সে। অতঃপর শেষ মেষ সম্মতি প্রধান করল। বাবার সম্মতি পেয়ে খুশি হলো কাইফা। প্রয়োজনীয় সব জিনিসপত্র গোছগাছ করে নিল।
সকাল দশটার দিকে অর্নার বাড়ি থেকে গাড়ি পাঠানো হলো। সাথে আসলো কাইফার তেরো বছরের খালাতো বোন অর্শী ও তার সাথে আরেকটা অচেনা মেয়ে। অর্শী গিয়ে কাইফাকে নিয়ে আসে। আর সেই মেয়ে পুরোটা সময় গাড়িতেই থাকে। কাইফা নিজের সমবয়সী সেই অচেনা রমণীকে দেখতেই খানেক দ্বিধায় পড়ে যায়। অর্শীকে এর আগে সরাসরি না দেখলেও মায়ের ফোনে তার ছবি দেখেছিল। কিন্তু এই মেয়েটা আবার কে? মনের ভিতরে অগণিত প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে থাকে মেয়েটার। তবে সামনা সামনি কোনোরূপ প্রশ্ন করেনা। চুপচাপ চলে গন্তব্যে। এক পর্যায়ে এসে পৌঁছায় কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যস্থলে। গাড়ি থেকে নামতেই বাড়ির নেম প্লেটে নজর যায়। সেখানে গুটিগুটি অক্ষরে লিখা
-“আহমেদ নিবাস ”
যেই তুমি এলে পর্ব ৪
কাইফা এক মুহূর্ত থমকে দাঁড়াল। কেন যেন নামটা পড়তেই বুকের ভেতর অকারণ একটা অস্বস্তি জন্ম নিল। অথচ কারণটা সে নিজেও জানে না। ধীর পায়ে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করল সে।
