যেই তুমি এলে পর্ব ৬
সিনথিয়া ইসলাম সীমা
কাইফাকে তার জন্য নির্ধারিত রুমে পৌঁছে দিয়ে গেল অর্শী। দোতলার মাঝারি আকারের একটি পরিপাটি কক্ষ। রুমের প্রতিটি জিনিস আগেই গুছিয়ে রেখেছেন অর্না বেগম। কাইফা প্রথমেই বোরকা খুলে ফ্রেশ হয়ে নিল। তারপর নিচে নেমে এল।
ড্রয়িংরুমের সোফায় তখন বসে আছেন অর্না বেগম, অর্শী আর রোহান। শুধু উপস্থিত নেই অর্শীর সঙ্গে আসা সেই অচেনা মেয়েটি অর্থাৎ রোশনী।
কাইফা চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে নিল।
“ মেয়েটা তো আমাদের সঙ্গেই ভেতরে ঢুকেছিল। হঠাৎ কোথায় গেল? ”
কাইফার মনের প্রশ্নটা বেশিক্ষণ অজানা রইল না। অর্না বেগমের কাছ থেকেই সে জানতে পারল মেয়েটির পরিচয়। আর সেই সঙ্গে জানল এমন একটি সত্য, যা এতদিন তার অজানাই ছিল। হুমায়রা জানলেও কখনো মেয়েকে বলেননি।
সত্যটা হলো—
মি. রিয়াজুল আহমেদ, অর্থাৎ অর্না বেগমের স্বামী এর আগেও একবার বিবাহ করেছিলেন। রোশনী সেই প্রথম স্ত্রীর মেয়ে। অর্নার সঙ্গে বিয়ের সময় রোশনীর বয়স ছিল মাত্র পাঁচ বছর।
বিয়ের আগেই সবকিছু জানত অর্না। কিন্তু মায়ের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে যাওয়ার সাহস ছিল না তার। নীরবে চোখের জল ফেলেই মেনে নিয়েছিল ভাগ্যকে। তখন তার বয়স মাত্র ষোলো।
অন্যদিকে অর্নার বাবা অসুস্থ হয়ে পড়ায় রেখা বেগম দ্রুত মেয়ের বিয়ে দিতে মরিয়া হয়ে ওঠেন। এমন সময় রিয়াজুল আহমেদের পক্ষ থেকে সম্বন্ধ আসে। তিনি ছিলেন বিত্তশালী ব্যবসায়ী। গুলশানে নিজস্ব বাড়ি, গাড়ি, প্রতিষ্ঠিত ব্যবসা—সবই ছিল। গ্রামের দিকেও ছিল বিস্তর জমিজমা।
সব দিক বিবেচনা করে রেখা বেগমের মনে হয়েছিল, এমন পাত্র আর হবে না। একমাত্র আপত্তির বিষয় ছিল—রিয়াজুলের বয়স অনেক বেশি এবং তার একটি মেয়ে রয়েছে। তবে সেটাকে তিনি গুরুত্বই দিলেন না। কারণ রোশনীর মা তিন বছর আগেই মারা গিয়েছিলেন।
শেষ পর্যন্ত অর্নার বিয়ে হয়ে গেল নিজের চেয়ে অনেক বড় একজন মানুষের সঙ্গে। তারপর থেকেই শুরু হলো তাদের সমঝোতার সংসার।
সব শুনে থম মেরে বসে রইল কাইফা। কিছুক্ষণ নীরবে খালামনির দিকে তাকিয়ে থেকে প্রশ্ন করল,
“ আংকেল তো বেশিরভাগ সময় বিদেশেই থাকেন। তাহলে আহমেদ ইন্ডাস্ট্রিয়াল এখন কে দেখাশোনা করে? রোশনী? ”
অর্না মাথা নেড়ে বললেন,
“ না। তোমার আংকেলের পার্সোনাল অ্যাসিস্ট্যান্ট। ”
“ ও… আচ্ছা। ”
এরপর অর্না উঠে দাঁড়ালেন।
“ এখন তো কিছুই খাওনি। রাতে কী খাবে বলো? ”
কাইফা মুচকি হেসে বলল,
“ আপনার যা ইচ্ছা, সেটাই রান্না করুন খালামনি। ”
অর্না কিছুক্ষণ ভ্রু কুঁচকে বোনের মেয়েটার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর হালকা হেসে বললেন,
“ একেবারে তোমার আম্মুর মতো হয়েছ তুমি! ”
প্রশংসাটা শুনে কাইফাও হেসে ফেলল।
“ আমার যেকোনো খাবার হলেই চলবে খালামনি। এত কষ্ট করবেন না। ”
অর্না স্নেহভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন,
“ আচ্ছা, তোমরা গল্প করো। আমি রান্নাঘরে যাই। কিছু দরকার হলে অর্শীকে বা আমাকে ডাকবে। ”
“ জি, খালামনি। ”
ডিনারের সময়, মুখোমুখি অবস্থায় বসে আছে কাইফা ও রোশনী। দুজনের মধ্যে তখনো কোনোরূপ কথাবার্তা হয়নি। পাশেই বসে আছে রোহান ও অর্শী। দুজনেই একের পর এক প্রশ্ন ছুঁড়ে যাচ্ছে কাইফাকে। সেও বিরক্তি হীন উত্তর দিচ্ছে।
“ আপি তুমি কতদিন থাকবে? ”
শিশুসুলভ কণ্ঠে প্রশ্ন টুকু করে কাইফার দিক তাকিয়ে রইল রোহান। পৃষ্ঠে ভেসে আসলো হাসিমাখা উত্তর,
“ আপি ইনশাআল্লাহ শনিবার অব্দি থাকব। ”
“ এতো অল্প দিন? ”
“ অল্প দিন কোথায় হলো? পুরো পাঁচদিন হবে! ”
“ তুমি এতো তাড়াতাড়ি যেও না আপি। আমি তোমাকে গাড়ি গেম শিখাব। দেখবে তুমি একেবারে টপ হবে তারপর একটা নিউ গাড়ি গিফ্ট পাবে। তখন সেই গাড়ি দিয়ে তুমি সহজেই বাসায় চলে যেতে পারবে। ”
বাচ্চাটির বলার ভঙ্গি ও কথাবার্তায় খানিকটা শব্দ করে হেসে ফেলল কাইফা। ওভাবেই মন রক্ষার্থে বলল,
“ আচ্ছা আপি শিখব নে। ”
“ শুনো আমি তোমাকে আরো….”
“ এই চুপ থাকবি তুই! সবসময় শুধু গেমের কথা! ”
কথার মাঝেই ধমকে উঠল অর্শী। ভাইকে থামিয়ে দিয়ে নিজে আবদার ছুঁড়ল,
“ আপি রাতে আমি তোমার সাথে থাকি? ”
“ হুম অবশ্যই। ”
কোনোরূপ দ্বিরুক্তি হীন সম্মতি পোষণ করল কাইফা। কিশোরীর চোখ মুখ উজ্জ্বল হলো। এর মাঝেই সেখানে খাবার নিয়ে উপস্থিত হলেন অর্না। সকলের দিক খাবার বাড়িয়ে দিয়ে বললেন,
“ অনেক হয়েছে কথা। এখন সবাই চুপচাপ খাও। আর আপিকেও খেতে দাও। পরে যত ইচ্ছা গল্প করা যাবে। ”
অর্নার কথায় সবাই চুপচাপ খাওয়ায় মনোযোগ দিল। ডাইনিং টেবিলজুড়ে নেমে এলো ক্ষণিকের নীরবতা। শুধু রোহানের হাতে থাকা ট্যাব থেকে ভেসে আসা গেমের শব্দ আর কাচের প্লেট-চামচের টুংটাং আওয়াজই সেই নীরবতা ভাঙছিল। অর্না একে একে সবার প্লেটে খাবার তুলে দিচ্ছিলেন। সবাইকে পরিবেশন শেষ করে তিনি আরেকটি প্লেটে যত্ন করে খাবার বেড়ে ঢাকনা দিয়ে ঢেকে পাশে সরিয়ে রাখলেন। দৃশ্যটা দেখে মনে হলো, বাড়ির আরেকজন সদস্যের জন্য খাবার আগেভাগেই তুলে রাখা হচ্ছে।
খাওয়া-দাওয়া শেষ করে নিজের রুমের উদ্দেশ্যে এগিয়ে যাচ্ছিল কাইফা। সিঁড়ি বেয়ে কয়েক ধাপ উঠতেই হঠাৎ পেছন থেকে ভেসে এলো এক গম্ভীর নারী কণ্ঠ—
“ হেই! ”
কাইফা থেমে পেছনে ফিরে তাকাল। রোশনীকে দেখেই খানিকটা বিস্মিত হলো সে।
রোশনী নির্লিপ্ত দৃষ্টিতে কাইফাকে পর্যবেক্ষণ করে সংক্ষিপ্ত স্বরে প্রশ্ন করল,
“ নেম? ”
কাইফা ভদ্রভাবে মুচকি হেসে উত্তর দিল,
“ কাইফা। আপনার নাম? ”
“ রোশনী। ইউ ক্যান কল মি রোশনী। কজ আমাদের বয়সের পার্থক্য প্রায় কাছাকাছিই হবে। ”
“ জ্বি আচ্ছা। নেক্সট টাইম থেকে রোশনী বলেই ডাকব। ”
রোশনীর বোধ হয় কাইফার আচরণ টুকু খানেক মনে ধরল। ঠোঁট জোড়া কিঞ্চিৎ প্রসারিত হলো রমণীর। বলল,
“ ওকে গুড নাইট। ”
“ হুম আল্লাহ হাফেজ। ”
নিজের কক্ষে ফিরে এলো কাইফা। সারাদিনের ভ্রমণে শরীরটা বেশ ক্লান্ত লাগছে। বিছানার পাশে রাখা ব্যাগ থেকে মোবাইলটা বের করতেই স্ক্রিনে চোখ পড়ল। কয়েক মিনিট আগেই হুমায়রা একটা মেসেজ পাঠিয়েছে—
“ খেয়ে নিয়েছ আম্মু? ”
মেয়েটার ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটে উঠল। আর দেরি না করে ভিডিও কল দিল সে। আসার পর এখনো কথা হয়নি। শুধু পৌঁছানোর পর অর্নার ফোন দিয়ে একটু কথা বলেছিল।
দুইবার রিং হতেই ওপাশে ভেসে উঠল হুমায়রার স্নিগ্ধ মুখ। পাশে বসে আছেন কৃশানও।
“ আসসালামু আলাইকুম। ”
“ ওয়া আলাইকুমুস সালাম। ”
একসাথেই জবাব দিলেন দুজন। হুমায়রা আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
“ ওখানে সব কেমন লাগছে? কোনো সমস্যা হয়না তো? ”
“ না আম্মু, আলহামদুলিল্লাহ। সবাই অনেক ভালো। খালামনি তো আমাকে একদম বসতেই দিচ্ছেন না। ”
“ ওখানে গিয়ে আবার বই নিয়ে বসে থেকো না। ”
মৃদু হেসে বলে উঠলেন কৃশান। একটু থেমে ফের বললেন,
“ দু’দিন ঘুরে বেড়াও, সবার সঙ্গে গল্প করো। ”
কাইফা হেসে ফেলল। উত্তরে বলল,
“ আচ্ছা বাবা। ”
“ খাওয়া হয়েছে? ”
“ হুম। খালামনি নিজের হাতে খাইয়েছেন। ”
কৃশান তৃপ্তির নিঃশ্বাস ফেললেন।
“ ভালো। আর শোনো, কোথাও একা একা যেও না। যেখানে দরকার হবে অর্শীকে নিয়ে যাবে। বুঝেছ? ”
“ জ্বি, বাবা। ”
হুমায়রা মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে নরম গলায় বললেন,
“ মন খারাপ লাগলে আমাকে সঙ্গে সঙ্গে কল করবে। নিজের বাড়ি ভেবে থাকবে, কিন্তু আমাদের কথাও ভুলে যেও না। ”
কাইফা মুচকি হেসে বলল,
“এক রাত না যেতেই তোমরা আমাকে মিস করা শুরু করে দিয়েছ? ”
মেয়ের কথায় কৃশান হেসে বললেন,
“ কেবল শুরু হয়নি। তুমি বাসা থেকে বের হওয়ার পর থেকেই শুরু হয়েছে। ”
কাইফার বুকটা হালকা উষ্ণ হয়ে উঠল। ওভাবেই বলল,
“ আমিও তোমাদের খুব মিস করছি। ”
“ আচ্ছা, এখন আর বেশি রাত জেগে থেকো না। ”
হুমায়রা বললেন,
“ এখন ঘুমাও, সকালে কথা হবে ইনশাআল্লাহ। ”
“ ইনশাআল্লাহ। ”
“ আল্লাহ হাফেজ, আম্মু। ”
“ আল্লাহ হাফেজ। ”
কল কেটে যেতেই কয়েক মুহূর্ত স্থির হয়ে রইল কাইফা। অচেনা বাড়িতেও বাবা-মায়ের কণ্ঠ যেন ওর চারপাশে এক অদৃশ্য নিরাপত্তার বলয় তৈরি করে দিল। গভীর একটা নিঃশ্বাস ফেলে মোবাইলটা বিছানার পাশে রেখে দিল সে। এরপর অর্শীর সঙ্গে কিছুক্ষণ গল্প করে শুয়ে পড়ল।
ঘড়ির কাঁটা টিকটিক করে রাত বারোটার উপরে পৌঁছেছে। নিস্তব্ধ নিরিবিলি রজনী, ধরিত্রী তলিয়ে আছে ঘুমের রাজ্যে। আহমেদ নিবাসের প্রতিটি কানায় কানায় তখন বিরাজ করছে এক অদ্ভুত নীরবতা। কোথাও কোনো সাড়াশব্দ নেই।
সহসা নিস্তব্ধতা চিরে কাইফার পাশে শুয়ে থাকা অর্শী ঘুমের মধ্যে হালকা ঘুঙিয়ে উঠে। অন্ধকার কামরায় কিছুক্ষণ এপাশ ওপাশ করে কাতর গলায় ডাকে,
“ কাইফা আপি?”
নামের মালকিন তখন ঘুমে মগ্ন। এক ডাকে কোনোরূপ সাড়া পাওয়া যায় না তার তরফ হতে। অর্শী দ্বিতীয়বার গলার জোর খানিকটা বাড়িয়ে ডাকে,
“ কাইফা আপি? ”
এ পর্যায়ে এসে খানেক নড়ে চড়ে উঠল কাইফা ঘুম ঘুম কণ্ঠে জবাব দিল,
“ হুম? ”
“ আপি আমি পানি খাব। পেটের ভিতর কেমন যেন জ্বালা পোড়া করছে। ঘুম আসছে না! ”
নিভু নিভু চোখে অর্শীর দিক তাকাল মেয়েটা। সময় নিয়ে অলসতা ছেড়ে উঠে বসল। সুইচ টিপে লাইট জ্বালালো। নরম গলায় জানতে চাইল,
“ বেশি খারাপ লাগছে? খালামনি কে ডেকে আনব? ”
“ না না অতটাও খারাপ লাগছে না। আম্মুকে ডাকার প্রয়োজন নেই। ”
“ আচ্ছা তুমি থাকো আপি পানি নিয়ে আসছি। ”
“ ফ্রিজের পানি এনো। ”
“ আচ্ছা। ”
ধীর পায়ে কক্ষ ছাড়ল কাইফা। চারপাশ তখন অন্ধকারে ডুবে আছে। শুধু রান্নাঘরের একটি বাল্বের ক্ষীণ আলো ড্রয়িংরুমের মেঝেতে ছড়িয়ে পড়েছে। সেই আলো অনুসরণ করেই রান্নাঘরে গিয়ে ফ্রিজ খুলে পানির বোতল নিল সে। অতঃপর ফিরে এলো কক্ষে। অর্শী তৃপ্তি নিয়ে পানি পান করল। পরপর নাল হয়ে শুয়ে পড়ল। এতক্ষণে বোধ হয় একটু শান্তি মিলেছে মেয়েটার।
“ এবার ভালো লাগছে? ”
ওর বন্ধ চোখের দিক তাকিয়ে প্রশ্ন ছুঁড়ল কাইফা। পৃষ্ঠে শুনতে পেল কিশোরীর সন্তুষ্টিময় গলা,
“ হুম এবার অনেকটা শান্তি লাগছে। ”
কাইফা কিঞ্চিৎ হাসে। পরপর রুমের লাইট নিভিয়ে ফের হাঁটা দেয় রান্নাঘরের উদ্দেশ্যে।
“ কোথায় যাচ্ছো আপি? ”
“ বোতল টা রাখতে, তুমি ঘুমাও আপি আসছি। ”
জায়গার জিনিস জায়গায় রাখা কাইফার অভ্যাস। আজকেও সেই অভ্যাসের বহির্ভূত হয়নি সে। বোতলটাকে ঠিকঠাক মতো ফ্রিজে রাখল। পরপর কক্ষের নিকট আসতেই বিভ্রান্তিতে পড়ে গেল। এতক্ষণ শুধু ওদের রুমের দরজাই খোলা ছিল। কিন্তু এখন পাশাপাশি দুটো রুমেরই দরজা খোলা। এ বাড়ির সবগুলো রুমই সারি আকারে। যার দরুন প্রথম প্রথম কোনো রূম আলাদা ভাবে নির্দিষ্ট করা খানিকটা জটিল। কাইফা ঘুম ঘুম চোখে দুটো রুম কিছুক্ষণ পর্যবেক্ষণ করল। মস্তিষ্কে চাপ দিতেই মনে পড়ল ওদের রুমের তো লাইট অফ ছিল। অতএব বিলম্ব না করে অন্ধকার কক্ষেই ঢুকে পড়ল সে। অভ্যাসবশত দরজা বন্ধ করে ভেতরের দিকে পা বাড়াল। অথচ কদম ফেলার মাঝেই—
হঠাৎ!
একটা শক্ত পোক্ত, পেশীবহুল হাত ওর সরু কণ্ঠনালী চেপে ধরল। অন্ধকার কক্ষটায় এহেন অপ্রত্যাশিত কাণ্ডে আঁতকে উঠল রমণী। শ্বাস যেন গলায় আটকে গেল। অত্যধিক ভয়ে ক্ষণিকের জন্য কেঁপে উঠল ওর তনু কায়া। পরক্ষণেই ভড়কানো চিত্তে সেই হাতটা ধরে নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করল। খুব কষ্টে উচ্চারণ করল,
“ ক…কে? কে আপনি? ”
নিস্তব্ধ কামরায় ওর নারী কণ্ঠটা প্রতিধ্বনিত হলো কিছুক্ষণ। পরপরই ধীরে ধীরে গলার ওপর চাপ কিছুটা শিথিল হলো। কাইফার মনে হচ্ছে আরেকটু হলে প্রাণ টাই যেন বেরিয়ে আসবে। মেয়েটা উতলা হয়ে উঠল নিজেকে ছাড়ানোর জন্য। তখনি ওর মুখের সামনে একটা ক্লিক শব্দের উত্তোলন হলো। চোখের সামনে ধরা দিল একটি জ্বলন্ত লাইটার। প্রথম দফায় তাপের সংস্পর্শে এসে চোখ বন্ধ করে নিল কাইফা। পরক্ষণেই ধীর গতিতে চোখের পাতা খুলল। ওমনিই এক জোড়া অনাকাঙ্ক্ষিত দৃষ্টির মিলনে পুরো বিদ্যুৎ শক খেয়ে গেল রমণী। বুক সুদ্ধ ধক করে উঠল। বিস্ফোরিত আঁখি যুগল কপাল ছুঁতে চাইল। দেহ জমে গিয়ে পুরো ফ্রিজে পরিণত হলো।
অন্যদিকে লাইটারের হলদে আলোয় একটি অতি অপ্রত্যাশিত, অকল্পনীয় মুখ দেখতেই রিক্তর দুনিয়া পুরো থমকে গেল। থমকাল ওর মস্তিস্ক। সে পাথর হয়ে তাকিয়ে রইল ঘুমটাবৃত মুখটির পানে। ওভাবে তাকিয়ে থাকার মাঝেই তার হাতে থাকা লাইটারটা এক সময় তপ্ত হয়ে উঠল। সেই তপ্ততা তার হাতকেও স্পর্শ করল। অথচ ছেলেটা ধ্যান হীন। এক পর্যায়ে বেখেয়ালি লাইটারের জ্বলন্ত আগুন হাতে লেগে যেতেই মানবের হুস ফিরল। তৎক্ষনাৎ লাইটার টা ছেড়ে দিল সে। আর সেটা গিয়ে পড়ল একদম কাইফার পায়ের আঙুলে। উত্তপ্ত বস্তুটা পা ছুঁতেই হালকা আর্তনাদ করে উঠল রমণী,
যেই তুমি এলে পর্ব ৫
“ আ…”
ততক্ষণে রুমের লাইট অন করে দিল রিক্ত। ঘরময় ছড়িয়ে পড়ল আলোর রেখা। দৃশ্যমান হলো তার দীর্ঘদেহী পুরুষ সত্তা। কাইফা ব্যথা ভুলে অবিশ্বাস্য নয়নে তাকিয়ে রইল সেদিকে। কাঁপা গলায় প্রশ্ন ছুঁড়ল,
“ আ..আপনি এখানে? ”
