Home যেই তুমি এলে যেই তুমি এলে পর্ব ৭

যেই তুমি এলে পর্ব ৭

যেই তুমি এলে পর্ব ৭
সিনথিয়া ইসলাম সীমা

কাইফার প্রশ্ন শুনে রিক্ত কয়েক সেকেন্ড কোনো উত্তর দিল না। শুধু স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল ওর দিকে। ছেলেটার চোখেমুখে স্পষ্ট বিস্ময়, অবিশ্বাস আর গভীরে চাপা এক অস্থিরতা। যেন দুবছর আগের হারিয়ে যাওয়া অতীত আচমকাই জীবন্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে তার সামনে।
সে কিয়ৎক্ষণ স্তব্ধ হয়ে রইল। অতঃপর অনুভূতিহীন কণ্ঠে শুধাল,
“ তুমি এখানে কী করছ? ”
কাইফা তখনো কাশতে কাশতে শ্বাস স্বাভাবিক করার চেষ্টা চালাচ্ছে। সময় নিয়ে সেও পাল্টা প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল,
“ আপনি এখানে কী করছেন, সেটা আগে বলুন? ”
রিক্তর ভ্রূ যুগল কুঁচকে গেল। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ রমণীর অস্থির মুখখানা নিরীক্ষণ করে গম্ভীর স্বরে বলল,
“ একে তো বিনা অনুমতিতে আমার রুমে ঢুকেছ, তার ওপর আমাকেই প্রশ্ন করছ? ”

কাইফা চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে নিল। মুহূর্তেই বুঝে গেল– সে ভুল কক্ষে চলে এসেছে। এটা তার রুম নয়।
কিন্তু…
রিক্ত এখানে কী করছে?
আহমেদ পরিবারের সঙ্গে তার সম্পর্ক কী?
ভাবনার মাঝেই হঠাৎ বিদ্যুতের মতো মনে পড়ল মানুষটার পুরো নাম–
রাইয়ান আহমেদ রিক্ত!
তাহলে… উনি কি এই আহমেদ পরিবারেরই একজন?
কিন্তু খালামনি তো একবারও তার সম্পর্কে কিছু বলেননি!
একটার পর একটা প্রশ্ন মাথার ভেতর ঘূর্ণিঝড় তুলতে লাগল। যেন মস্তিষ্কের প্রতিটি কোণে জট বেঁধে যাচ্ছে।
ঠিক তখনই বাইরে থেকে ভেসে এলো অর্শীর পরিচিত কণ্ঠ,
“ কাইফা আপি? ”

হঠাৎ সেই ডাক শুনে চমকে উঠল কাইফা। তৎক্ষনাৎ দরজার পানে তাকাল সে। তখনি এগিয়ে গিয়ে মূল লাইটটা নিভিয়ে দিল রিক্ত।
মুহূর্তেই অন্ধকারে ডুবে গেল পুরো ঘর।
কাইফা বিস্মিত হয়ে বলল,
“ লাইট কেন নিভা…”
কথা শেষ হওয়ার আগেই ঘরের কোণে জ্বলে উঠল ডিমলাইট। মৃদু হলদে আলোয় রিক্তর দীর্ঘদেহী ছায়াটা ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো।
একেবারে কাইফার সামনে এসে থামল সে।
দুজনের মাঝখানে তখন মাত্র কয়েক ইঞ্চি দূরত্ব।
মানুষটা সামান্য ঝুঁকে নিচু স্বরে বলল,

“ শ্… একদম শব্দ করবে না। ”
অকারণেই কাইফার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
ঠোঁট যেন আপনাতেই বন্ধ হয়ে গেল।
স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটার দিকে।
দুবছর আগেও এই মানুষটার এতটা কাছাকাছি এসেছিল সে।
সেদিন তার ভেতরে ছিল শুধু ভয়… ঘৃণা… অস্বস্তি।
কিন্তু আজ…
আজ কেন যেন অনুভূতিটা অন্যরকম।
এতটা কাছে দাঁড়িয়ে থাকা পুরুষটাকে দেখে বুকের ভেতর অচেনা এক কম্পন ছড়িয়ে পড়ছে।
কেন?
শুধু কি এই জন্য… যে মানুষটা তার উধাও হয়ে যাওয়া স্বামী?
নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে আরও কোনো অজানা কারণ?
রমণীর ভাবনার মাঝেই ভেসে এলো মানবের অনিহা মাখা কণ্ঠ,

“ আমি চাই না, আমার সঙ্গে তোমাকে কেউ দেখুক। ”
বাক্যটুকু কর্ণপাত হতেই কাইফার অনুভূতিরা শূন্য হয়ে গেল। অদৃশ্য কোনো কাঁটা যেন নিঃশব্দে এসে বিঁধল হৃদয়ের গভীরে।
এদিকে বাইরে দাঁড়িয়ে অর্শী আরও দু-তিনবার ডাকল,
“ কাইফা আপি? ”
কোনো উত্তর না পেয়ে শেষ পর্যন্ত পায়ের শব্দ দূরে মিলিয়ে গেল।
বাইরের পরিবেশ পুরোপুরি নিস্তব্ধ হতেই কাইফা ধীরে ধীরে মুখ খুলল,
“ আপনি তাহলে এখানেই থাকেন? ”
রিক্ত সংক্ষিপ্ত উত্তর দিল,
“ হুম। এটাই আমার বাড়ি। ”
কাইফা কয়েক মুহূর্ত থেমে আবার প্রশ্ন করল,
“ খালামনি আপনার কী হন? ”

রিক্ত ওর দিকে কিছুক্ষণ নির্বাক তাকিয়ে রইল। পরপর শান্ত অথচ নির্বিকার স্গলায় জবাব দিল,
“ সেটা তোমার খালামনিকেই জিজ্ঞেস করো। এখন এখান থেকে যাও। ”
কথা শেষ করেই দরজার লক খুলে দিল সে।
কিন্তু কাইফা তখনও নড়ল না।
স্থির চোখে তাকিয়ে রইল রিক্তর দিকে।
মাথার ভেতর শত শত প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে তার।
রিক্ত এবার চোখের ইশারায় বেরিয়ে যেতে বলল।
রমণী আর কোনো কথা বলল না। ধীর পায়ে দরজা পেরিয়ে বেরিয়ে গেল।
করিডোর দিয়ে নিজের রুমের দিকে হাঁটতে হাঁটতে বারবার মনে হচ্ছিল–এটা কি সত্যিই বাস্তব, নাকি সে এখনো কোনো দুঃস্বপ্নের ভেতর হাঁটছে?
ওর পায়ের শব্দ একসময় মিলিয়ে যেতেই রিক্ত ধীরে ধীরে দরজাটা বন্ধ করল।
খট করে লক লাগিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
এক হাত চুলের ভেতর চালিয়ে বিরক্ত গলায় বিড়বিড় করে বলল,
“ ঝামেলা যত্তসব! ”
আসলে এতক্ষণ সে ছাদে ছিল। একটু আগে শুধু পানি খাওয়ার জন্য নিজের রুমে ফিরেছিল। তাই দরজাটাও লক করা হয়নি।
কক্ষে কারও উপস্থিতি টের পেয়েই বহুদিনের অভ্যাসবশত এক মুহূর্ত দেরি না করে গলা চেপে ধরেছিল।
সে ভেবেছিল– হয়তো বাইরের কোনো লোক।
কেনোনা..
এই বাড়িতে দিনের বেলাতেও কেউ তার রুমে ঢোকার সাহস পায় না।

“আপি, এতক্ষণ কোথায় ছিলে তুমি?”
অর্শীর কণ্ঠে ধ্যান ভাঙল কাইফার। আনমনা ভাবটা মুহূর্তেই আড়াল করে সে সামনে তাকাল। শান্ত গলায় উত্তর দিল,
“নিচেই ছিলাম।”
“এতক্ষণ কী করছিলে? আমি তো কতক্ষণ ধরে ডাকলাম!”
“হয়তো শুনতে পাইনি। তুমি এখনো ঘুমাওনি কেন?”
অর্শী বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে নিজের টি-শার্টটা ঠিক করতে করতে বলল,
“জামা পরে ঘুম আসছিল না। তাই একটা টি-শার্ট পরে নিলাম।”
কাইফার দৃষ্টি একবার অর্শীর পোশাকের দিকে গিয়ে থামল। কালো রঙের ঢিলেঢালা টি-শার্ট পরে বেশ স্বস্তিতেই দাঁড়িয়ে আছে মেয়েটা। সেটা লক্ষ্য করতেই অর্শী হেসে বলল,
“তোমার লাগবে? চাইলে একটা এনে দিই। টি-শার্ট পরে ঘুমাতে অনেক আরাম লাগে।”
কাইফা মৃদু হেসে মাথা নাড়ল।
“না আপি, আমি এসব পরি না।”

“কেন? একবার পরে দেখো না, অনেক কমফোর্ট ফিল করবে।”
কাইফার হাসিটা এবার একটু গম্ভীরতায় রূপ নিল।
“কমফোর্টের বিষয়টা অস্বীকার করছি না। কিন্তু আমার ব্যক্তিগতভাবে এসব পোশাক ভালো লাগে না। আমার মতে, একজন নারীর প্রকৃত সৌন্দর্য তার শালীনতায়। আর সেই শালীনতাকে দীর্ঘ ও পরিপূর্ণ পোশাকই বেশি সুন্দরভাবে ধারণ করে। তাই আমি এমন পোশাকই পরতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি।”
অর্শী কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল,
“তাহলে টি-শার্ট পরা কি ঠিক না? এখন তো প্রায় সব মেয়েই পরে।”
কাইফা কিছুক্ষণ নীরব থেকে শান্ত স্বরে বলল,
“মানুষ যা করছে, সেটাই যে সবসময় সঠিক হবে–এমন তো নয়। রাসূলুল্লাহ (সা:) পুরুষদের মধ্যে যারা নারীর বেশ ধারণ করে এবং নারীদের মধ্যে যারা পুরুষের বেশ ধারণ করে, তাদের প্রতি লানত (অভিসম্পাত) করেছেন।”
— সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৮৮৫
অর্শী কয়েক মুহূর্ত নিশ্চুপ হয়ে রইল। মনে হলো বিষয়টা নিয়ে আগে কখনো এভাবে ভাবেনি সে। খানিকটা ইতস্তত করে বলল,

“আমি তো এসব জানতামই না আপি। ছোটবেলা থেকেই অভ্যাস হয়ে গেছে। আম্মুও কিছু বলেনি কখনো।”
কাইফা মৃদু হেসে জবাব দিল,
“সবকিছু না জানা দোষের নয় আপি। জানার পর সঠিকটা গ্রহণ করার চেষ্টা করাটাই গুরুত্বপূর্ণ। আমরা সবাই প্রতিনিয়ত শিখছি। আমিও শিখছি।”
অর্শী কৌতূহলী দৃষ্টিতে কাইফার দিকে তাকিয়ে বলল,
“ তুমি এত সুন্দর করে এসব কথা বলো কীভাবে? ”
কাইফা লজ্জা মিশ্রিত হাসল।
“ সুন্দর করে বলছি কিনা জানি না। তবে মাদ্রাসায় পড়তে পড়তে একটা জিনিস শিখেছি—যে জ্ঞান নিজের জীবনে আমল করা যায় না, সে জ্ঞানের পূর্ণতা থাকে না। তাই আগে নিজেকে বদলানোর চেষ্টা করি, তারপর অন্যকে বলি। ”
অর্শী ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল।

“ আজ থেকে আমিও চেষ্টা করব আপি। অন্তত বাসায় থাকলেও ঢিলেঢালা জামা পরব। তুমি পরে আমাকে এসব আরও শিখিয়ে দিও, প্লিজ। ”
কাইফার মুখে তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল।
“ ইনশাআল্লাহ। তবে এখন আর কথা নয়। অনেক রাত হয়েছে। কাল সকালেই উঠতে হবে। ”
“ আচ্ছা আপি, শুভরাত্রি। ”
“ আল্লাহ হাফেজ। ”
দু’জনেই নিজ নিজ জায়গায় শুয়ে পড়ল। কাইফা একবার ভাবল অর্শীকে রিক্তর ব্যাপারে জিজ্ঞেস করবে। কিন্তু পরক্ষণেই দ্বিধাদ্বন্দ্বে কাটিয়ে মত পাল্টে ফেলল।
কিছুক্ষণের মধ্যেই অর্শীর শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিক হয়ে এলো। কিন্তু কাইফার চোখে ঘুমের লেশমাত্র নেই। অন্ধকার ছাদের দিকে তাকিয়ে বারবার ভেসে উঠছে এক জোড়া তীক্ষ্ণ দৃষ্টি, গলা চেপে ধরা শক্ত হাত আর সেই শীতল কণ্ঠ,
“ আমি চাই না, আমার সঙ্গে তোমাকে কেউ দেখুক। ”
কথাটা মনে পড়তেই বুকের ভেতরটা আবারও কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠল। নিজের অজান্তেই দীর্ঘশ্বাস ফেলল কাইফা। তারপর চোখ বন্ধ করে ধীরে ধীরে ঘুমের দেশে হারিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করল।

বিছানায় সটান দেহে শুয়ে আছে রিক্ত।
কক্ষজুড়ে নিস্তব্ধতা, বাইরে ঝিঁঝিঁ পোকার ক্ষীণ ডাক, ভেতরে দেয়ালে ঝোলানো ঘড়ির টিকটিক শব্দ–এ দুটো ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই।
মানুষটা সেই কখন থেকেই চোখ বুঁজে আছে। যেন কিছু একটা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলতে চাইছে। পরক্ষণেই ব্যর্থ হয়ে বিছানা ছাড়ল সে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে এগিয়ে গেল টেবিলের দিকে।
টেবিলের ওপর রাখা মোবাইলটা হাতে তুলে নিল। স্ক্রিন অন করল। কিছুক্ষণ নির্বিকার দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। কল লিস্ট খুলল, আবার বন্ধ করল। কোনো নম্বরে কল করল না, কোনো মেসেজও নয়।
হঠাৎই বিরক্তি নিয়ে মোবাইলটা টেবিলের ওপর ছুড়ে রাখল।
পকেট থেকে সিগারেট বের করে ঠোঁটে গুঁজল। লাইটারের আগুন জ্বলে উঠতেই মুহূর্তের জন্য আলো ছড়িয়ে পড়ল ওর কঠিন মুখশ্রীতে। প্রথম ধোঁয়াটা ধীরে ধীরে ছেড়ে শীতল কণ্ঠে বিড়বিড় করে বলল,

“ দুই বছর পরও ভুল রুমেই ঢুকতে হলো? ”
কথাটা কাইফাকে উদ্দেশ্য করে বলা, নাকি নিজের ভাগ্যকেই ব্যঙ্গ করা–বোঝার উপায় নেই।
পরক্ষণেই মানবের ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক চিলতে তাচ্ছিল্যের হাসি।
“ যত দূরে থাকো… ততই ভালো। ”
নিজের বলা কথাটাতেই যেন ইতি টানল সে। সামনে রাখা কয়েকটি ফাইল খুলে মনোযোগ দেওয়ার চেষ্টা করল। পাতার পর পাতা উল্টাচ্ছে, কিন্তু চোখের সামনে থাকা অক্ষরগুলো যেন অর্থহীন লাগছে।
মাত্র কয়েক মিনিটও পেরোয়নি।
অজান্তেই তার দৃষ্টি আবার গিয়ে থামল টেবিলে পড়ে থাকা মোবাইলটার ওপর।
এক অদৃশ্য টানে ফোনটা হাতে তুলে নিল সে।
কভারের স্বচ্ছ অংশের নিচে চাপা পড়ে আছে ছোট্ট গোলাপি পার্লের তৈরি একটি ডেকোরেটিভ ফ্লাওয়ার হিজাব পিন।
রিক্ত কিছুক্ষণ নির্বাক তাকিয়ে রইল সেটার দিকে।
সেই বিকেলের কথাটা মনে পড়ে গেল।
যেদিন তার ফুপি ঋষিতা আহমেদ পিনটা হাতে দিয়ে বলেছিলেন,

“ বউ তো রাখতে পারলে না, অন্তত বউয়ের একটা স্মৃতি সঙ্গে রাখো। ”
তখনও সে কথাটা উড়িয়ে দিয়েছিল।
আজও ঠোঁট বাঁকিয়ে তাচ্ছিল্য ভরা হাসল।
“ বউয়ের স্মৃতি? হোয়াট আ ননসেন্স! ”
তবু অদ্ভুত ব্যাপার–
এই দুই বছরে কতবার যে ভেবেছে পিনটা ফেলে দেবে, তার হিসাব নেই।
প্রতিবারই ফোনের কভার খুলেছে…
আঙুলের ডগায় তুলে নিয়েছে ছোট্ট বস্তুটাকে…
কিন্তু শেষ মুহূর্তে আবার আগের জায়গাতেই রেখে দিয়েছে।
আজও তার ব্যতিক্রম হলো না।
রিক্ত আঙুলের ডগা দিয়ে একবার আলতো করে পিনটার উপর স্পর্শ করল। সঙ্গে সঙ্গেই যেন নিজের এই আচরণে বিরক্ত হয়ে উঠল। দ্রুত কভারটা চেপে দিয়ে ফোনটাকে উল্টো করে টেবিলের ওপর রেখে দিল।
নিজেকেই কঠিন গলায় ধমক দিল,

“ ফোকাস, রিক্ত। অতীতের কোনো স্মৃতি তোর জীবনের অংশ নয়।অনুভূতি, সম্পর্ক, সংসার–এসবও নয়। ”
নিজেকে সেই কথাটাই আবার মনে করিয়ে দিয়ে রিক্ত দ্বিতীয়বার ফাইলটা হাতে তুলে নিল।
এবার আর চোখ সরাল না।
কিন্তু কক্ষের নিস্তব্ধতা জানিয়ে দিল–মস্তিষ্ক কাজে ফিরলেও, মনের এক কোণে অদৃশ্য হয়ে থাকা সেই গোলাপি হিজাব পিনটা এখনো নিশ্চুপে নিজের অস্তিত্বের জানান দিয়ে যাচ্ছে।

ধরণীজুড়ে ফজরের আজানের সুমধুর ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হতেই ঘুম থেকে উঠে পড়ল কাইফা। পা দুটো মাটিতে রাখতেই ক্ষণিকের জন্য মাথাটা ঝিমঝিম করে উঠল। সারারাত নির্ঘুম কাটানোর ফলেই বোধ হয় এমনটা হয়েছে। রাতভর এপাশ-ওপাশ করেও এক ফোঁটা ঘুম চোখে আসেনি তার।
মেয়েটা কয়েকবার চোখ ডলে মাথা ঝাঁকিয়ে নিজেকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করল। অতঃপর এগিয়ে গিয়ে ঘরের লাইট জ্বালিয়ে ধীর পায়ে ওয়াশরুমের দিকে গেল। ওযু শেষে একাগ্রচিত্তে ফজরের সালাত আদায় করল।
এদিকে ঘরের মৃদু শব্দ আর লাইটের আলোয় ঘুম ভেঙে গেল অর্শীর। আধখোলা চোখে সে জায়নামাজে বসে থাকা কাইফার দিকে কিছুক্ষণ নীরবে তাকিয়ে রইল।
সালাত শেষ করে কাইফা জায়নামাজ গুছিয়ে রাখল। তারপর মুচকি হেসে কিশোরীর দিকে তাকিয়ে সালাম দিল,

“আসসালামু আলাইকুম।”
অর্শী ঘুমজড়ানো কণ্ঠে জবাব দিল,
“ওয়া আলাইকুমুস সালাম।”
জবাব দিয়েই আরমোড়া ভেঙে উঠে বসল সে। কাইফাও এসে ওর পাশে বসল। কয়েক মুহূর্ত নীরব থাকার পর কৌতূহলী গলায় প্রশ্ন করল,
“অর্শী, এ বাড়িতে কি তোমরা ছাড়া আর কেউ থাকে না?”
অর্শী বিস্মিত হয়ে বলল,
“আছে তো, কেন আপি?”
“না… এমনিতেই বললাম। বাড়িটাকে কেন জানি খুব নিস্তব্ধ লাগে। তাই ভাবছিলাম, আর কে কে আছেন?”
অর্শী হালকা হেসে উত্তর দিল,
“ আমার ফুপি আছেন। তবে তিনি শ্বশুরবাড়িতে থাকেন। আর একজন আছেন–রিক্ত ভাইয়া। উনিও এই বাড়িতেই থাকেন। তবে বেশিরভাগ সময়ই ঘরের বাইরে থাকেন। ”
কাইফার বুকটা অজান্তেই ধক করে উঠল। তবু মুখে স্বাভাবিক ভাব বজায় রেখে জিজ্ঞেস করল,

যেই তুমি এলে পর্ব ৬

“ খালামনি উনার ব্যাপারে কিছু বললেন না? উনি আবার কে? ”
অর্শী একদম স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল,
“রিক্ত… রাইয়ান আহমেদ রিক্ত।”

যেই তুমি এলে পর্ব ৮