ডাকপ্রিয়র চিঠি শেষ পর্ব
রিক্তা ইসলাম মায়া
আজ বৃহস্পতিবার! বাংলায় ১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২২ বঙ্গাব্দ। ইংরেজিতে মে মাসের ৩০ তারিখ রোজ বৃহস্পতিবার। নূরজাহান প্রচণ্ড মাথা ব্যথা নিয়ে পরীক্ষা হল থেকে বেরিয়ে হাসানকে দেখতে পেল কলেজ গেইটের সামনে লাঠি হাতে দাঁড়িয়ে। নূরজাহানের কালো বোরখা পরিহিত গেইট থেকে বেরিয়ে হাসানের মুখোমুখি হয়ে হাসানকে পরীক্ষার ফাইনটার দিয়ে বলে…
‘ আমাকে একটু পানি দেন আব্বা, খুব ক্লান্ত লাগছে।
হাসান নূরজাহানের জন্য পানির বোতলের সাথে আরও কিছু হাবিজাবি খাবার কিনে কলেজের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল। নূরজাহানকে ক্লান্ত আর অসুস্থ দেখে হাসান খানিকটা উদ্বিগ্ন হয়ে নূরজাহানকে পানির বোতলটা দিয়ে ব্যস্ত কণ্ঠে বলে…
‘ আম্মা আপনের কি অসুখ লাগতাছে? লন ডাক্তারের কাছে যাই?
নূরজাহান হাসান থেকে পানির বোতল নিয়ে দেয়ালের পাশ ঘেঁষে দাঁড়ায়। সেখানে থেকে সরাসরি কেউ নূরজাহানের মুখ দেখতে পাবে না তেমন করে দেয়াল মুখী হয়ে নেকাব উপরে তুলে মুখে পানি ছিটিয়ে নেকাব টেনে হাসানকে ফের পানির বোতলটা দিয়ে বলে…
‘ ডাক্তার লাগবে না আব্বা। আমি ঠিক আছি। এমনই একটু মাথা ঘোরাচ্ছে। বাসায় গিয়ে রেস্ট নিলে ঠিক হয়ে যাবে।
হাসান মলিন মুখে চিন্তিত স্বরে বলে…
‘ কয়ডা দিন ধইরা দেখতাছি আপনেরে কেমন অসুখ অসুখ লাগতাছে আম্মা। খালি কন মাথা ঘুরাই। ঠিক মতো খাইবারও পারেন না দিন দিন শুকাই যাইতাছেন। আপনের কিচ্ছু হইলে আমার কলিজাডা পোড়ে আম্মা সহ্য হয় না আপনের অসুখ-বিসুখ। আপনে আমার অনেক শখের মাইয়া। আমার সোহাগী চাঁন।
নূরজাহান নেকাবের আড়ালে হাসানের মলিন মুখটা দেখে। নূরজাহানের জন্য হাসানের এই দুনিয়া উজাড় করা ভালোবাসাই শাহানা পছন্দ করে না বলে, শাহানা আজও নূরজাহানকে আপন করতে পারেনি। সবসময় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে গেছে। হাসানের ভালোবাসার জন্যই শাহানা সবসময় নূরজাহানের সঙ্গে অদৃশ্য লড়াই করে গেছে। নূরজাহান চাপা স্বরে বলে….
‘ আমার কিছু হয়নি আব্বা আমি ঠিক আছি। আপনি আমাকে আর এত ভালোবাসবেন না আব্বা। আপনার আমার প্রতি এতো ভালোবাসা যদি কাল হয়ে দাঁড়ায় আমার ভয় হয়।
হাসান হেসে ফেলে। নূরজাহানের মাথায় স্নেহের হাত বুলিয়ে বলে….
‘ আপনের আব্বা যতদিন বাইচ্ছা আছে ততদিন রোদে ছায়া আর বৃষ্টিতে ছাতা হয়ে আপনের হেফাজত করব আম্মা। ভয় পাইয়েন না। আপনের আব্বা শইলে অনেক শক্ত আম্মা। এখনো লাঠি লইয়া মাঠে নামলে দশডা পুরুষরে এক লগেই রাখবার পারমু।
আজ সকাল থেকেই আকাশটা মেঘলাচ্ছন্ন। গুমোর গুমোর শব্দে আকাশে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। আকাশ ফাটা গর্জনে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। পরীক্ষার হল থেকে ছাত্র ছাত্রীরা বেরিয়ে দ্রুত রিকশা অটো কিংবা সিএনজিতে উঠে গন্তব্যে ছুটছে। হাসান নূরজাহানকে নিয়ে রশিদের অটোরিকশায় উঠে সিকদার বাড়িতে পৌঁছায়। আজ সাজিদের গায়ের হলুদ। বাড়িতে তেমন আয়োজন নেই ঘরোয়া বিয়ের পরিবেশ। স্টেজ, বিয়ের গেইট কিছুই করা হয়নি বৃষ্টির জন্য। ঘরোয়া বিয়ে তাই আয়োজনের তাড়া নেই। তবে কয়েকজন করে মেহমান এসেছে সিকদার বাড়িতে। মাজিদের বয়স্ক শ্বশুর শাশুড়ী এসেছে বাড়িতে। হাসানের বড় ভাই ফরিদ মৃত। বড় ভাইয়ের বউ কুসুম ও তার ছোট ছেলে সিয়াম এসেছে সাজিদের বিয়েতে, তারা দু’দিন বিয়ে বাড়িতেই থাকবে। এই ঝড় বৃষ্টিতে আলেহা আসতে পারছে না বলে মান্নাকে পাঠানো হয়েছে আলেহার শ্বশুর বাড়িতে আলেহাকে আনতে। বৃষ্টির কারণে মান্নাও আলেহার শ্বশুর বাড়িতে আটকা পড়েছে। তারানূরের বড় মেয়ে হাফেজা মৃত হওয়ায় হাফেজার স্বামী সাদিক আর তাঁর দুই মেয়ে পুষ্পা, ইকরা এসেছে নানা বাড়ির বিয়েতে। পুষ্পা বিবাহিত, তিন বছরের একটা ছেলে সন্তান আছে। পুষ্পার স্বামী ইকবালও এসেছে। ইকরা আশনূরের বয়সী। সে আশনূরের সঙ্গেই পড়াশোনা করছে। যুবতী মেয়ে হওয়ায় সাদিক মেয়েকে নিজের সাথে নিয়ে এসেছে সৎ মায়ের ঘরে না রেখে এসে। হাসান নূরজাহানকে পাঠিয়ে সে রশিদের সঙ্গে কিসের যেন কথা বলছে রিকশায় বসে। নূরজাহান বারান্দায় পা রাখতেই বসার ঘরে শাহানার উচ্চ স্বরের চিল্লাচিল্লি শুনতে পায়। বসার ঘরে তারানূর ফুলবানুর সঙ্গে হাফেজার স্বামী সাদিকও বসে। শাহানার জা কুসুমও বসার ঘরের বৈঠকে বসে শাহানার তর্ক শুনছে। কুসুমের ছোট ছেলে সিয়াম মান্নার সময় বয়সী সতেরো বছরের ছেলে সেও সবার সাথে উপস্থিত। শাহানা তারানূরকে তিরস্কারের কণ্ঠে বলছে…
‘ হুগল কিছুতে আপনেগো মা পোলার মর্জি আর চলবো না। আমি মাইনা লইমু না। আমার এত কইরা মানা করার পরও আপনেগোর সাহসে কেমনে দিলো আমার আশনূরের বিয়া মাসুদ মাস্টারের পোলার লগে ঠিক করার? আমি মানা কইছিলাম আমারে ঠেঙ্গাইয়া আমার আশনূরের বিয়া ঠিক কইরেন না। হেরপরও আপনেরা কেউ আমার কথার দাম দেন নাই। আমি আপনেগো কাউরে মাফ করমু না আম্মা। আমার আশনূরের বিয়া গরিব ঘরে দিয়া আপনেগোর আদুরের নূরজাহান বড় ঘরে সুখের সংসার করব আমি শাহানা বাইচ্ছা থাকতে হেইডা কোনোদিন হইবার দিমু না।
তারানূরের বড় মেয়ে হাফেজার স্বামী সাদিক বয়োজ্যেষ্ঠ। সে সকালে এসেছে থেকে শাহানার আশনূরের বিয়ে নিয়ে অসন্তুষ্টি আর নারাজগির বয়ান শুনছে। আজ যে সাজিদের গায়ের হলুদ সেটার মান পযন্ত রক্ষা করছেন না তিনি, অন্যান্য দিনের তুলনায় আজ নাকি শাহানা একটু কমই চিল্লাচিল্লি করছেন বাড়িতে। এই কথাটা তারানূরের কাছ থেকেই শুনেছেন সাদিক। সাজিদের বিয়ে ঘরোয়া ভাবে হলেও নিকটতম আত্মীয়দের দাওয়াত করেছে হাসান। যাদের অনেকেই বৃষ্টির কারণে আসতে পারছে না। এখন বাড়িতে মেহমান ডেকে তাদের সামনে হাঙ্গামা করাটা বেমানান দৃষ্টিকটু দেখাচ্ছে। সাদিক বসার ঘরে শাশুড়ীর খাটের কিনারায় বসে শাহানার কথার বিরোধ করে বলে…
‘ যার জোড়া যেনে আছে, হেই হেনেই যাইব ভাবি। উপরে আল্লাহ আছে তিনি হগলের জোড়া বানাইয়াই পাঠাইছে। আশনূরের জোড়া যদি মাসুদ মাস্টারের পোলার লগে থাইকা থাহে তাইলে আমাগো আশনূরের বিয়া হেইখানেই হইব। অন্যরে দোষ দিয়া লাভ নাই ভাবী। হুনছি আমাগো আশনূরের মতামতেই নাকি এই বিয়া ঠিক করছে হাসান ভাই তাইলে আপনে হুদাই সবাইরে দোষী ক্যান করতেছেন। আপনের মাইয়াই তো এই বিয়াতে রাজি আছে। হেই যদি এই বিয়া করবার চায় তাইলে হাসান ভাইয়ের দোষ কি? আসল কথা হইল, আপনের সতীনের মাইয়া নূরজাহান কেমনে ভালা ঘরে বিয়া হইছে হেই হিংসায় আপনে আশনূরের জীবনডাও এহোন নষ্ট করবার চাইতাছেন।
সাদিকের কথায় শাহানা তিলমিলিয়ে উঠে। এই সাদিক শুরু থেকেই হাসানের পক্ষে সবসময় কথা বলতো। যোয়ান কালেও যখন হাসানের আয়েশার সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল তখনও এই সাদিক হাসানের পক্ষ নিয়ে কথা বলতো। আজও তাই। শাহানা রাগে ফুসফুস করে বলে…
‘ আপনে কি বুঝবেন সন্তানের মর্ম? বড় আপা মরার একডা বছরও পার হয় নাই আরেকটা বিয়া কইরা সংসারের সৎ মা ঢুকাইছেন পোলা মাইয়া জন্য। আপনে তো ঠিকই বউ পাইছেন তয় এতিম মাইয়া পোলাপান আর মা পাইলো না। যে নিজে পোলাপানের জীবন নষ্ট কইরা বইয়া আছে হেই আবার আমার সন্তানের ভালা মন্দের জ্ঞান দেওয়া সাজে না।
শাহানার কথায় সাদিক বেশ অপমানিত বোধ করে। তারানূর রাগে তিলমিলিয়ে উঠে কর্কশ কণ্ঠে শাহানাকে বলে…
‘ খবরদার বড় বউ, মুখ সামলাইয়া কথা কইবা। সাদিক তোমার জামাইর বড় হয়। হাফজা মরার পর সাদিকরে আমরা বিয়া করাইছি এইখানে তুমি কওনের কেডা? রোজ রোজ অশান্তি না করলে তোমার চলে না? তোমার মনে এত বিষ ক্যান? আইজ সাজিদের গায়ে হলুদ। আল্লাহ ওয়াস্তে আইজ ক্ষ্যামা দেও তুমি।
অপমানের রাগে ক্ষোভে শাহানা চলে যায়। থমথমে ঘরে নূরজাহান প্রবেশ করে। এতক্ষণ বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল শাহানার সামনে ঘরে ঢোকার সাহস পায়নি। থানচিতে আসলে নূরজাহান সেই আগের মতোই শাহানার ভয়ে সিটিয়ে থাকে। নূরজাহান সাদিক, কুসুমসহ মাজিদের শশুর শাশুড়ী উপস্থিত সবাইকে সালাম দেয়। থমথমে পরিবেশে কোনো কথা না বাড়িয়ে চুপচাপ চলে যায়। নূরজাহানের পিছনে ইকরা উঠে নূরজাহানের ঘরে যায়। হাসানকে দেখা যায় কাক ভেজা হয়ে বসার ঘরে তার কিছুক্ষণ পরেই উপস্থিত হতে। সে রশিদের ভাড়া মিটিয়ে কথা বলাতে খানিকটা দেরি হয় সেজন্য সে শাহানার কথাবার্তা শুনেনি। শুনলেও হয়তো চুপ থাকতো। আশনূর মায়ের প্রতি নারাজ থেকেই এতদিন কথা বলেনি। তৌহিদের সঙ্গে বিয়ে ঠিক হওয়ার পর থেকে কথা বলে। কয়েকদিন পর বিয়ে হয়ে আশনূর শশুর বাড়ি চলে যাবে, সেজন্য মায়ের সঙ্গে মনোমালিন্যতা দূরে ফেলে টুকটাক কথা বলে। কিন্তু শাহানা আশনূরের বিয়ে তৌহিদের সঙ্গে দিবে না বলে বেঁকে আছে। এই খবরটা যদি তৌহিদ শুনতে পায় তাহলে কষ্ট পাবে। দুজনের পছন্দের বিয়ে। এই কথাটা ঘরের সবাই জানে এমনকি শাহানাও জানে তারপরও শাহানা আশনূরের বিয়ে ভাঙতে চাচ্ছে নূরজাহানের বরাবরি ঘরে বিয়ে দেওয়ার জন্য। আশনূর উদাস হয়ে নূরজাহানের ঘরে বসে। নূরজাহান ঘরে ঢুকে নেকাব খোলে। আশনূর কেন উদাস সেটা নূরজাহান জিজ্ঞাসা করে না। নূরজাহান জানে আশনূর মায়ের কথায় কষ্ট পেয়েছে। নূরজাহান বলে…
‘ বুবু তৌহিদ ভাইয়ের বাড়ি থেকে কি আজ মানুষ আসবে? আব্বা তো বলল তোমার শ্বশুর বাড়িতে নাকি দাওয়াত করেছে সাজিদ ভাইয়ের বিয়ের জন্য।
নূরজাহানের পিছনে ইকরাও এসে আশনূরের পাশাপাশি বিছানায় পা ঝুলিয়ে বসেছে। আশনূর ইকরার সামনে মন খারাপ ধরে না রেখে স্বাভাবিক কণ্ঠে বলে…
‘ হুম আব্বা দাওয়াত করেছে তবে এই বৃষ্টির মাঝে ওরা কেউ আসবে না বললো। তৌহিদ ভাই এসেছে কিছুক্ষণ আগেই। সাজিদ ভাই আর আহাদের সঙ্গে বউয়ের বাজার করতে গেছে চট্টগ্রাম শহরে।
নূরজাহান হাতের ফাইনার পড়ার টেবিলের উপর রাখে। কালো বোরখাটা খোলে চেয়ারের উপর মেলে দিয়ে আশনূরের দিকে তাকিয়ে বলে…
‘ আম্মা তৌহিদ ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলেছে বুবু?
‘ না, বলেনি।
‘ তৌহিদ ভাই মাইন্ড করেছে ব্যাপারটা?
‘করেছে হয়তো। আমি জানি না।
‘ তোমার সাথে কথা হয়নি তৌহিদ ভাইয়ের?
‘ হয়েছে।
‘ তাহলে?
‘ তৌহিদ ভাই জানে আম্মা এই বিয়েতে রাজি না। সেজন্য উনি বলেছেন বিয়ের পর আম্মার মন মতো জামাতা হওয়ার চেষ্টা করবেন।
নূরজাহান চুপ থাকে। ইকরা লাজুক প্রকৃতির মেয়ে। সে ভয়ে ভয়ে বলে…
‘ আশনূর বুবু তুমি বড় মামীকে বলে দিও আমি আহাদ ভাইকে বিয়ে করতে পারব না।
আশনূর নূরজাহান দুজনেই তৎক্ষণাৎ তাকায় ইকরার দিকে। কথাটা বলে ইকরা অস্বস্তি বোধ করছে বোনদের সামনে। আহাদের জন্য ইকরাকে বউ করতে চায় এই কথাটা অনেক বছর আগেই হয়েছিল। আজ সকালেও শাহানা বলেছিল সাজিদের বিয়ের পরপর আহাদের বিয়েটা দিয়ে দিবে ইকরা সঙ্গে এই বছর। সবাই রাজি। সাদিক শাহানার ব্যবহারে অসন্তুষ্ট সেজন্য সে প্রথমে রাজি ছিল না কিন্তু হাসান আর তারানূরের কথায় রাজি হয়েছিল কয়েক বছর আগেই। সবচেয়ে বড় ব্যাপার হচ্ছে শাহানা যাদের পছন্দ করে তাদের খুব আদর করে যেমন ইকরাকে শাহানা মন থেকেই পছন্দ করে বিধায় শাহানা আহাদের জন্য ইকরার বিয়ের প্রস্তাবটা রাখে। আর এটা সবাই জানে। আশনূর বলে….
‘ হঠাৎ তোর আবার কি হলো? বিয়ে করবি না কেন? কাউকে পছন্দ করিস নাকি?
ইকরা মাথা নাড়িয়ে অসম্মতি দেয়। আশনূর বলে…
‘ তাহলে বিয়ে করবি না কেন বলছিস?
‘আমার বড় মামীকে ভয় লাগে।
‘ এজন্য বিয়ে করবি না বলছিস?
ইকরা মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দিয়ে বলে…
‘ হুম! বড় মামী আব্বাকে অপমান করলে আমার কষ্ট লাগে বুবু। আম্মা মারা যাওয়ার পর আব্বা আমাদের দুবোনকে কখনো কষ্ট দেয়নি। আমার আব্বা ভালো মানুষ।
ইকরা আশনূরের সমবয়সী হলেও আশনূর ইকরা থেকে পাঁচ মাসের বড়। তবে ইকরা নূরজাহানের বড়। ইকরা মেয়েটা অনেকটাই সহজ সরল সেজন্য শাহানা আহাদের বউ করতে চায় ইকরাকে। এতে ইকরা বৃদ্ধ বয়সে শাহানার সেবাযত্ন করবে এমনটা ধারণা শাহানার। ইকরাকে যেভাবে বলা হয় ইকরা সেভাবেই চলে। নূরজাহান শাহানার হয়ে সাফাই দিয়ে বলে….
‘ আম্মাও খারাপ মানুষ না ইকরা আপু। আম্মা পরিস্থিতির স্বীকার সেজন্য উনি সবাইকে রাগ দেখায়। তবে আমরা সবাই মিলে যদি একটা মানুষকে সামলাতে না পারি তাহলে তো হবে না আপু। আম্মা আর যায় হোক তোমাকে কিন্তু অনেক পছন্দ করে আপু, তুমি এই সংসারে বউ হয়ে আসলে অনেক ভালো থাকবে।
ইকরা নূরজাহানের কথা মেনে নেয়। দুপুর গড়িয়ে বিকাল হলো কিন্তু দিনের পরিবর্তন হলো না। মনে হচ্ছে ঝড়ের তোপ বেড়েছে। এই ঝড় বৃষ্টিতে ভিজে সাজিদ আহাদ তৌহিদ তিনজন মিলে বউয়ের বাজার করে নিয়ে এসেছে। তিনজন ফ্রেশ হয়ে খেতে বসেছে। নদী সবাইকে খেতে দিয়েছে। মাজিদ দৌড়াদৌড়ি করছে গ্রামের কারা কারা বরযাত্রী যাবে সেই মানুষদের বিয়ের দাওয়াত দিতে। মান্নাকে পাঠানোর পরও আলেহা মান্নাকে নিয়ে আসতে পারেনি, ওরা কাল সকালে আসবে যেভাবেই হোক। শাহানার সঙ্গে হাতে হাতে কাজ করছে, শেফালি, কুসুম, নদী, আশনূর, ইকরা। সিয়াম মাজিদের দুই ছেলে নুহাশ তুতুলকে নিয়ে বসার ঘরে খেলছে। বিয়ে বাড়িতে কত কাজ। কাজ ফেলে কি আর ঘরে বসে থাকা যায়? হাসান বৃষ্টির মাঝে বেরিয়েছিল বাজারে। ঘরের জন্য বাজার সদাই কিনে কাক ভেজা হয়ে সন্ধ্যায় ঘরে ঢুকে। শেফালী বাজার গুলো রান্না ঘরে নিয়ে যায়। শাহানা দুপুর থেকে কারও সাথে কথা বলছে না ব্যাপারটা হাসান লক্ষ করেছে। হাসান আলনা থেকে একটা গামছা নিয়ে ভেজা মাথা মুছতে মুছতে বসে মায়ের পাশে। বসার ঘরের একপাশে খাট রয়েছে সেটাতে তারানূর ঘুমায়। তারানূরের পাশে আজ ফুলবানুও বসে পান চিবোচ্ছে। হাসান বলে…
‘ মনডার ভিত্তরে কেমনতরে জানি আগুন জ্বলতাছে আম্মা। কোনো কিচ্ছুতে শান্তি পাইতাছি না। মনে হইতাছে কোনো অঘটন ঘটব।
‘ ক্যান কি হইছে বাপ?
‘ জানি না আম্মা। তয় নূরজাহান বাইত্তে আইলে চিন্তায় থাহি। শাহানা আবার কোনো ক্ষতি কইরা বহে মাইয়াডার।
‘ কিচ্ছু হইব না চিন্তা করিস না। আমরা আছি না তোর মাইয়ার লাইগা। এতডি মাইনসের সামনে দিয়া শাহানা নূরজাহানের কিছু করবার পারব না।
‘ আমার শাহানারে বিশ্বাস নাই আম্মা। শাহানা নিজের জিদে হোগল কিছু ধ্বংস করবারও পারে। আমি শুধু আমার মাইয়া নূরজাহানের সহিসালামত দেখবার চাই।
তুতুল কাঁদছে। নদী রান্নাঘরে কাজে ব্যস্ত থাকায় শাহানা এসেছিল তুতুলকে কোলে নিতে। কিন্তু দরজার সামনে দাঁড়িয়ে হাসান তারানূরের কথা শুনেও শাহানা কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায়নি। শুধু স্বামী শাশুড়ীর দিকে নীরব দৃষ্টিতে তাকিয়ে তুতুলকে কোলে নিয়ে চলে যায়। হাসান তারানূর ফুলবানু হঠাৎ শাহানার উপস্থিতিতে ভয় পেয়েছিল। এই বুঝি শাহানা হাসানের কথা শুনে ঘরে আবারও চিল্লাচিল্লি হাঙ্গামা করবে কিন্তু তার কিছু না করায় সবাই স্বস্তির শ্বাস ফেলে। ফুলবানু পান চিবোতে চিবোতে হাসানকে বলে….
‘ নূরজাহানের শ্বশুর বাইত থেইক্কা কেউ আইব না হাসান?
‘ না খালা মনে হয় না কেউ আইব। নূরজাহানের চাচাতো ননদের বিয়া গেছে কয়দিন আগে। আইজ নাকি হেগো বাড়িতেই অনুষ্ঠান, নতুন বর বউ আইছে ফি-যাত্রীতে হের লাইগা নূরজাহানের শ্বশুর বাইত থেইক্কা কেউ আইব না তয় জামাই কইছে জামাই আইব আইজ রাতে। সন্ধ্যায় ঢাকা থেইক্কা রওয়ানা হইলে শেষ রাইতে আইয়া পৌঁছাব এইখানে।
এশারের নামাজের জন্য অযু করতে গিয়ে নূরজাহান জ্ঞান হারিয়ে কলপাড়ে পড়ে যায়। নূরজাহানের সাথে ইকরা থাকায় সে চিল্লাচিল্লি করে সবাইকে ডাকে। বাইরে বৃষ্টি কমেছে কিছুটা কিন্তু পুরোপুরি থামেনি। বৃষ্টি বাদলের দিন হওয়ায় রাতের অন্ধকার বেশ। সন্ধ্যা রাতেই নিশি রাতের মতো অন্ধকার চারপাশে। সবাই নূরজাহানকে নিয়ে হৈচৈ করছে। নূরজাহানকে ধরাধরি করে ঘরে বিছানায় শুয়ানো হয়। নূরজাহান অজ্ঞান। হাসান চিল্লাচিল্লি করছে। আশনূর নদী শত কাজ ফেলেও নূরজাহানের মাথায় পানি ঢালছে। নদী কুসুম পুষ্পা ওরা সবাই মিলে সাজিদকে গায়ে হলুদের গোসল করানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিল এর মাঝেই নূরজাহান জ্ঞান হারায়। হাসান দ্রুত রশিদকে কল করে অটো নিয়ে আসতে বলে। গ্রামের বাজারে রাত দশটার পরপরই দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায়। আর বৃষ্টি বাদলের দিন হলে সন্ধ্যার পরপরই দোকান ফার্মেসী সব বন্ধ হয়ে যায়। এই গ্রামের হাসপাতাল নেই নূরজাহানকে নিয়ে থানচি সদর হাসপাতালে যেতে হবে। নূরজাহানের গায়ে একটা বাসন্তী রঙের শাড়ি ছিল। সাজিদের বিয়ে উপলক্ষে সবাইকে একই রঙের শাড়ী সাজিদই গিফট করেছে। মেয়েরা সবাই বাসন্তী রঙের শাড়ি পরে। নূরজাহানের অবস্থা দেখে হাসান সেই অবস্থায় নূরজাহানকে কোলে নিয়ে রশিদের অটোরিকশায় উঠে বসে। হাসানের সঙ্গে সাদিক, পুষ্পার জামাই ইকবালও যেতে চেয়েছিল কিন্তু বিয়ে বাড়ি হওয়ায় হাসান কাউকে সঙ্গে নেয়নি। হাসান নূরজাহানকে ডাক্তার দেখিয়ে কিছুক্ষণের মধ্যে ফিরে আসবে বলে নূরজাহানকে নিয়ে তাড়াহুড়োয় একাই বেরিয়ে যায়, নূরজাহানকে বোরখাটা পরার সুযোগও দেয়নি। নূরজাহানের মাথায় পানি দেওয়ায় ভিজা চুলের পানিতে নূরজাহানের শরীর ভিজে একাকার। হাসান নূরজাহানের কাঁধ জড়িয়ে নূরজাহানের মাথাটা বুকে চেপে ধরে রেখেছে। হাসান বারবার রশিদকে তাড়া দিচ্ছে হাসপাতালে নিয়ে যেতে। এই রাতে হাসান নূরজাহানকে থানচির সদর হাসপাতালে ভর্তি করায়। নূরজাহানের ভিন্ন পরীক্ষা নিরীক্ষা টেস্ট শেষে রিপোর্টে বের হয় নূরজাহান তিন মাসের অন্তঃসত্ত্বা। নূরজাহান পুরোপুরি তিন মাসের অন্তঃসত্ত্বা নয় কয়েক দিন কম আছে হয়তো।
নূরজাহান প্রেগন্যান্ট খবরটা শুনে হাসান প্রথমে স্তব্ধ তব্দা খেয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিল। তবে সেটা বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। প্রথমবার নানা হবার খুশিতে হাসপাতালের মাঝেই সেকি উচ্ছ্বাস হাসানের। যে ডাক্তার নূরজাহানের প্রেগন্যান্সির খবরটা দেয় হাসান খুশিতে সেই ডাক্তারকেই জড়িয়ে ধরে। তারপর সবার আগে ফোন দেয় মারিদকে। মারিদ গাড়িতে ছিল সে থানচির জন্য রওয়ানা দিয়েছে আরও ঘণ্টা তিনেক আগেই। এতক্ষণে সে ঢাকার বাহিরে চলে এসেছে। এমন সময় হাসান কল দিয়ে জানায় সে বাবা হবে। বাবা হবার অনুভূতি ব্যক্ত করার মতো নয়। হাসানের কথা শুনে মারিদের মনে হয়েছিল সে নিঃশ্বাসের অভাব বোধ করছে এক মূহুর্তের জন্য। বেশ কিছুক্ষণ গাড়ির সিটে সে থমকে বসে থাকে তারপর নূরজাহানের ফোনে কল করে। নূরজাহানের ফোনটা বন্ধ। হাসান বলেছিল নূরজাহানকে নিয়ে তিনি এই রাতে হাসপাতালে আছেন। মারিদ অস্থির উত্তেজিত ভঙ্গিতে ঘড়িতে সময় দেখে রাত ১১:৪৫ মিনিট। এত রাতে হাসান এখনো নূরজাহানকে নিয়ে হাসপাতালে আছেন। হসপিটালের সবকিছুর ফরমালিটি শেষ করে বাসায় ফিরতে ফিরতে হাসানদের রাত দুটোও বাজতে পারে।
এতো রাতে গ্রামের রাস্তা দিয়ে যাওয়াটাও রিস্ক। মারিদ হাসানকে কল করে বলে আজ রাতটা ওরা হাসপাতালে থেকে কাল সকালে বাড়ি ফিরে যেতে। এতো রাতে নূরজাহানকে নিয়ে পাহাড়ি রাস্তা দিয়ে যাওয়াটা সেইফ না। কিন্তু হাসান মারিদের কথা শুনেনি। হাসানের বাড়িতে বিয়ে। শাহানা এমনি নূরজাহানের উপর রেগে আছে। এই রাতে বাবা হয়ে হাসান যদি সাজিদের বিয়েতে উপস্থিত না থাকে তাহলে শাহানা এই কথাটার খোঁচা সারাজীবন হাসানকে দিবে সাথে কাল সকালে হাঙ্গামাও করবে এই নিয়ে যে ছেলের বিয়েতে হাসান মেয়েকে নিয়ে পরেছিল সারারাত হসপিটালের। নূরজাহানের প্রেগ্ন্যাসির খবরটা হাসান বাড়িতে কেউকে ফোন করে জানায়নি। হাসান নূরজাহানকে নিয়ে বাড়ি ফিরে একেবারে সবাইকে দিবে। হাসান যেমন নূরজাহানের জন্য খুশি হয়েছে, তেমননি হাসান সবার খুশি নিজের চোখে দেখতে চাই বলে হাসান সিদ্ধান্ত নেয় সে বাড়ি ফিরে সবাইকে একত্রে জানাবে, সাথে নানা হবার খুশিতে কালই গ্রামের মসজিদে একমন মিষ্টি দিবে। হাসানের আনন্দ উচ্ছাস হাসি মুখটা দেখার মতোন। নূরজাহান বাবার আনন্দ হাসি মুখটা দেখে বারবার মাথা নুইয়ে নিচ্ছে লজ্জায়।
হাসান মারিদের কথা উপেক্ষা করেই নূরজাহানকে নিয়ে রাতের একটা পাঁচ মিনিটে রওয়ানা হয়। দূর্বলতার জন্য নূরজাহানকে ঘন্টা তিনেকের মতো সময় ধরে সেলাইন করা হয়েছিল বলে হসপিটালের সকল ফর্মালিটি শেষ করতে করতে তাদের রাত হয়ে যায়। এখন নূরজাহান খানিকটা সুস্থ তবে শরীরে দুর্বলতা কাজ করছে। ডাক্তার বলেছে কয়েকদিন টানা রেস্ট নিতে।
প্রচলিত প্রবাদে আছে, অন্যের জন্য গর্ত খুঁড়লে, সে গর্তে নিজেকেই পড়তে হয়। শাহানার ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা খানিকটা এমনই। সতীনের মেয়ের অমঙ্গল চাইতে গিয়ে নিজেদের অমঙ্গল ডেকে আনে শাহানা। রাত দুটোর ঘরে! টিনের চালে ঝুমঝুম বৃষ্টি পড়ছে মুষল ধারে। বেশ রাত হওয়ায় প্রায় সকলেই ঘুমিয়ে পড়েছে। সাজিদকে মেহেদী ইকরা আশনূর দুজনে মিলে পড়িয়ে দিয়েছে। এই আধাঘণ্টা হলো সেও গিয়ে তার ঘরে শুয়েছে। আহাদের ঘরে তৌহিদ ঘুমিয়েছে। নূরজাহানের ঘরে আপাতত আশনূর ইকরা শুয়েছে। ঝড় বৃষ্টির রাত তার ওপর কারেন্ট না থাকায় সকলে একঘরে উপরে নিচে মিলিয়ে বিছানা পেতে শুয়েছে। বসার ঘরের জমিনে লম্বা বিছানা পেতে তাতে সবাইকে থাকতে দেওয়া হয়েছে। শেফালী ভাতঘরে শুয়েছে মাজিদের বউয়ের সঙ্গে তুতুলকে নিয়ে। মাজিদের ঘরে পুষ্পার জামাই ইকবাল আর সাদিক তিনজন শুয়েছে একত্রে। ঘরের সবাই গভীর নিদ্রায় ঘুমে। হাসান এখনো নূরজাহানকে নিয়ে বাড়ি ফেরেনি সেজন্য তারানূর চিন্তিত ভঙ্গিতে বিছানায় বসে। মনটা কু ডাকছে। অস্বস্তিতে হাত পা জ্বালাপোড়া করছে উনার। ঘরের এক কোণে হারিকেনের টিমটিমে আলো জ্বলছে। ঘরে বিদ্যুৎ নেই সেই রাত এগারোটার পর থেকেই। ঝড় বৃষ্টির রাত হওয়ায় সবাই ভেবেছে নরমালি যেমন বড় বৃষ্টিতে কারেন্ট চলে যায়, আজও বোধহয় তাই হয়েছে। অথচ খুব ভালো করে খেয়াল করলে দেখা যেত পুরো গ্রামে কারেন্ট আছে শুধু সিকদার বাড়ি ছাড়া। থানচি এলাকাটা পর্বতময় এলাকা হওয়ায় এখানে তেমন ঘনবসতি নেই বললেই চলে। বেশ খানিকটা দূরে দূরে ঘর বাড়ির দেখা পাওয়া যায়। সিকদার বাড়ির আশেপাশেও তেমন বাড়িঘর না থাকায় তাঁরাও বুঝতে পারেনি কি কারণে সিকদার বাড়িতে বিদ্যুৎ নেই সেটা।
এই নিশি রাতে হঠাৎ নিশাচর পাখি ডাকছে। কি ভয়ানক সেই ডাক। তারানূরের শরীরে পশম দাঁড়িয়ে যায়। তারানূর বিড়বিড় করে দরুদ পাঠ করছে। এই বৃষ্টির রাতে পাখিটা কোন গাছে বসে ডাকছে কে জানে? তারানূরের মনে হচ্ছে পাখিটা উনার মাথার উপর বসে ডাকছে কোথাও। পাখির ডাকটা খুব নিকটে মনে হতেই তারানূর টিনের চালের সিলিংয়ের উপর তাকাতেই উনি চমকে উঠেন ভয়ে। নিশাচর পাখি ঘরের ভিতরে ডাকছে। এই পাখি কারও বাড়ি আঙিনায় ডাকলে সেই বাড়িতে কারও না কারও মৃত্যু হয় অথচ আজ নিশাচর পাখি উনাদের বাড়িতে নয় সোজা ঘরের ভিতর ঢুকে সবার মাথার উপর ডাকছে। কি ভয়ানক ভয়ংকর ব্যাপার। তারানূর একজন সাহসী মহিলা হয়েও আজ নিশাচর পাখিটাকে দেখে তিনি ভীষণ ভয় পেয়েছেন। ভয়ে এই ঝড় বৃষ্টির রাতেও তিনি ঘামছেন। হাসান নূরজাহানকে নিয়ে এখনো বাড়ি ফেরেনি ওদের কোনো বিপদ হয়েছে কিনা সেই ভয়ে তিনি ব্যাকুল হয়ে উঠলেন। সিলিং থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নিচে শুয়ে থাকা সবগুলো মানুষের দিকে তাকালেন। তারানূর ব্যাকুলতায় উঠে দাঁড়ালেন, পাশ থেকে লাঠি নিয়ে নিশাচর পাখিটাকে তাড়াতে চাইলে পাখি উড়ে অন্য সিলিংয়ে বসে ডাকে তারপরও পাখিটাকে তারানূর কিছুতেই তাড়াতে পারছেন না।
তারানূর বিড়বিড় করে আল্লাহকে ডাকছেন। আজকের মতো অস্থির আর দুশ্চিন্তা কখনো উনার হয়নি। এর আগে একবার স্বামীর মৃত্যুতে তারানূরের এমনই অস্থির উত্তেজনা ভিতরে কাজ করেছিল। ঠিক এমনভাবে নিশাচর পাখিও ডেকেছিল এক সপ্তাহ পর্যন্ত বাড়ির দক্ষিণের কড়ই গাছের ডালে বসে। তারানূরের স্বামী ফজল সিকদার যেদিন মারা গিয়েছিলেন সেদিন পর থেকে আর নিশাচর পাখিটাকও দেখা যায়নি। কিন্তু আজকের মতো কখনো এমন হয়নি যে নিশাচর পাখি ঘরের ভিতর ঢুকে সবার মাথার উপর বসে এমন ভয়ংকর ভাবে ডাকছে। তারানূর অস্থির উত্তেজনায় ঘর জুড়ে পায়চারি করে। ঝুমঝুম বৃষ্টিতে শাহানা মাথায় ছাতা ধরে ঘরের পিছনের দরজা খুলে বেরিয়ে যায়। কলপাড় দিয়ে গিয়ে পৌঁছায় গেইটের সামনে। হাসান মাস খানিক আগে সিকদার বাড়ির চারপাশের টিনের বেড়া তুলে ইটের দেয়াল দিয়ে লোহার একটা গেইট বানিয়েছিল। সেই গেইটে ধুমধুম শব্দ হচ্ছে। শাহানা আতঙ্কিত ভঙ্গিতে পিছনে তাকিয়ে দেখে গেইটের শব্দে বাড়ির কেউ জেগে গেছে কিনা। নিস্তব্ধ নীরবতা দেখে শাহানা দ্রুত হাতে গেইটের দরজা খুলে দিতেই কালো মুখোশধারী কতগুলো লোক দেখা গেল বাইরে তলোয়ার হাতে দাঁড়িয়ে থাকতে। শাহানা গোনার সময় পেল না কতগুলো লোক এখানে, এর আগেই গমগমে আওয়াজে বলল কেউ…
‘ এই বুড়ী সর।
শাহানাকে ধাক্কা দিয়ে সামনের লোকটা প্রবেশ করতে চাইলে শাহানা গেইটের সামনে শক্তভাবে দাঁড়িয়ে বাধা দিয়ে বলে…
‘ সরন যাইব না রতন মিয়া। তোমরা আইজ যাওগা কাম হইব না। নূরজাহান বাইত্তে নাই। হের বাপে হেরে লইয়া হাসপাতালে গেছিল এহোনো আইয়ে নাই। আইজকার প্ল্যানিং বাদ দেওন লাগব রতন মিয়া। তয় চেয়ারম্যান সাবরে কইয়ো আমি আরেকদিন সুযোগ কইরা দিমু তহোন নাহয় নূরজাহানরে উঠায় লইয়া যাইতে কইয়ো। আইজ তোমরা যাও গা…
কথা বলতে বলতে শাহানার শরীর ঝাকিয়ে উঠে থেমে যায়। শাহানা থামে নয়, থামতে হয়।
কয়েক সেকেন্ডের জন্য মনে হলো শাহানা থমকে গেছে। নিঃশ্বাসের অভাবে শরীর দুলে উঠে শাহানার। শক্ত ছু*রিটা রতনের পাশের লোকটা শাহানার পেটে ঢুকিয়ে তৎক্ষণাৎ টেনে বের করে শাহানাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে পায়ের বুট জুতার ধুমধুম শব্দে একত্রে দলে দলে লোক সিকদার বাড়িতে প্রবেশ করছে। শাহানা মনে করেছিল রতন দশ বারোজন লোক নিয়ে এসেছে নূরজাহানকে নিয়ে যেতে কিন্তু ছু*রি আঘাত পাওয়ার পর দেখতে পেল প্রায় ৫০ থেকে ৬০ জনের মতো মুখোশধারী ডাকাত পড়েছে সিকদার বাড়িতে। গোপনে শাহানা মোল্লা চেয়ারম্যানের সঙ্গে হাত মিলিয়েছিল নূরজাহানকে তুলে দেবে বলে, কথা অনুযায়ী আজ নূরজাহানকে নিয়ে যেতে মানিকের ছোট দুই ভাই রতন ও তাপস মিলে, তাও ১০-১২ জন লোক নিয়ে আসবে ওরা সিকদার বাড়িতে। কিন্তু এত মানুষ দেখেই বোঝা যাচ্ছে তাদের উদ্দেশ্য ভিন্ন। তারা শুধু নূরজাহানের জন্য আসেনি। তারা এসেছে সিকদার বাড়ির ধ্বংস করতে। মোল্লা চেয়ারম্যান শাহানার সঙ্গে বেইমানি করেছে এটা বুঝতেই শাহানা আহাত পেট চেপে চিৎকার করে ঘরের দিকে দৌড় দিয়ে বলে…
‘ ওই তোরা সবাই কইরে.. উঠরে, উঠ! বাইত্তে ডাকাত পরছেরে। ডাকাত পর…
পিছন থেকে দুটো লোক শাহানাকে ঝাপটে মুখ চেপে ধরে। যে লোকটা শাহানার পেটে ছু*রি মেরেছিল সেই লোকটা আবারও ক্ষিপ্ত মেজাজে এগিয়ে এসে লাগাতার ছু*রি বসায় শাহানার পেটে। শাহানার মুখ চেপে ধরায় শাহানার চিৎকারে গু গু শব্দ হচ্ছে। হাত পা নাচিয়ে ধপধপ করছে মাটিতে। বৃষ্টির পানিতে শাহানার রক্তে মুহূর্তেই লাল স্রোত বয়ে যায়। শাহানার দেহটা প্রাণহীন নিস্তেজ না হওয়া পর্যন্ত শাহানাকে চেপে ধরে রাখে। শাহানার শরীর নিস্তব্ধ নিস্তেজ হতেই লাশ ধাক্কা দিয়ে ফেলে উঠানে। মুহূর্তের মাঝে সিকদার বাড়ির চারিপাশে মুখোশধারী ডাকাত ঘিরে দাঁড়ায় পজিশন নিয়ে। প্রত্যেকের হাতে ধারালো ছু*রি অ*স্ত্র নিয়ে দাঁড়িয়েছে শিকারীর শিকার করার আশায়। হাসান সিকদার বাড়িতে সাত-আটজন পালোয়ান টাইপের লোক রাখতো নূরজাহানের নিরাপত্তার জন্য কিন্তু নূরজাহানের বিয়ের পর হাসান তাদের বিদায় করে দেয় মারিদের কথায় সেজন্য পালোয়ান লোকজনের থাকার ঘরে রতন কাউকে না পেয়ে ফিরে আসে। টিনের ঘরে কাঠের দরজায় ধুমধাম শব্দ হতেই তারানূর চমকে উঠে বলে…
‘ কেডা? কেডা আইছে এতো রাইতে? হাসান আইছত বাপ??
আবার খটখট শব্দ। টিনের চালে ঝুমঝুম বৃষ্টির কারণে কারও কথা শুনতে পারছেন না তারানূর। মাথার উপর নিশাচর পাখিটা তখনো ডাকছে। তারানূর পাখিটার দিকে তাকিয়ে দরজার কাছে যান। দরজা খটখট শব্দটা এখন আর করছে না। তারানূর দরজায় কান পেতে আবারও ডাকেন….
‘ কেডা আইছে কথা কও না কিলিগা?
বসার ঘরে জমিনে লম্বা বিছানা করে শুয়ে ছিল, পুষ্পা, পুষ্পার তিন বছরের ছেলে, কুসুম, মাজিদের শাশুড়ী, তারপর কুসুমের সতেরো বছরের ছেলে সিয়াম, তার পাশাপাশি মাজিদের শশুর নুহাশকে নিয়ে শুয়েছে। শাহানা সবার থেকে আলাদা বিছানা করে শুয়েছিল। কিন্তু এখন শাহানার বিছানাটা খালি পড়ে আছে। শাহানা তারানূরকে ল্যাটিনে যাওয়ার কথা বলে বেরিয়েছিল এখনো ফেরেনি। তারানূরের ডাকাডাকির শব্দে কুসুম ফুলবানু দুজনেই ঘুম থেকে উঠে বসে। কুসুম বলে….
‘ কি হইছে আম্মা? দরজার কাছে কারে ডাকতাছেন?
তারানূর দরজা থেকে কান তুলে পিছনে তাকিয়ে চিন্তিত স্বরে বলে…
‘ দেহো না বড় বউ, কেডায় জানি আইছে এত রাইতে এহন কথা কয় না। কয়বার দরজায় ডাকছে আমি মনে করলাম হাসান আইছে নূরজাহানরে লইয়া। এহোন কেউ আর ডাকে না।
তারানূরের কথায় চিন্তিত হলো কুসুম ফুলবানু দুজনেই। ফুলবানু কিছু বলবে তার আগেই মাথার উপর নিশাচর পাখির ডাক শুনে দুজনে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে হায় হায় করে উঠে। কুসুম লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলে…
‘ আল্লাহ গো এই দুষ্ট দুশমনটা ঘরে কেমনে ঢুকলো আম্মা? এই পাখি তো ঘরে ঢোকে না। যে বাইত্তে মানুষ মরে হেই বাইতে গাছের ডালে থাহে কয়দিন কিন্তু হেরপরও ঘরে ঢুকে না। তাইলে আজ এতবড় সর্বনাশ কেমনে হইলো এই দুশমনটা কেমনে ঘরে ঢুকলো আম্মা।
কুসুমের কথায় তারানূর ফুলবানু দুজনই নিশাচর পাখিটার দিকে তাকায়। গায়ের পশম দাঁড়িয়ে গেছে ফুলবানুর। কুসুমের কথাটা গ্রামের প্রচলিত হলেও সত্য। কি ভয়ংকর দৃষ্টিতে তাদের দিকে তাকিয়ে আছে নিশাচর পাখিটা। কুসুম দোয়া দরুদ পড়ে নিজের এবং ছেলের গায়ে ফুঁ দিচ্ছে। ফুলবানু খাট থেকে নেমে লাঠি খুঁজছে পাখিটাকে বের করতে। এর মাঝে আবার দরজায় খটখট শব্দ হতেই পাখিটার ডাক থেমে যায় আর ডাকেনি। তারানূর ফুলবানু কুসুম তিনজনেই দরজার দিকে তাকায়। ফুলবানু বলে…
‘ দরজা খোলার আগে দরজার ফাঁক দিয়া দেহ সখী কেডায় আইছে এত রাইতে।
তারানূর তাই করলেন। দরজার ফাঁকে চোখ রাখতেই ঠাস শব্দে ছিটকে পড়লেন তারানূর মাটিতে। মুহূর্তে তারানূরের দেহখানা কৈ মাছের ন্যায় লাফাতে লাগল মাটিতে লুটিয়ে পরে। তারানূরের বাম চোখটা গ*লে গু*লি*টা মাথার পিছন দিয়ে ম*গ*জ ফে*টে বেরিয়েছে। মূহুর্তে লাল র*ক্তে*র স্রোত বয়ে যাচ্ছে ঘরে। গু গু শব্দে তারানূরের দেহটা যখন মাটিতে লাফাচ্ছিল তখন এক মুহূর্তের জন্য হুশ ফিরে ফুলবানু আর কুসুমের। গগন কাঁপিয়ে চিৎকার করে উঠে তাঁরা একত্রে, আল্লাহ গো! শেষ গো শেষ। তোরা কইরে উঠ তাড়াতাড়ি। আম্মা শেষ গো, আম্মা শেষ।
কুসুম ফুলবানুর চিৎকারে ঘরের গভীরে ঘুমে থাকা প্রতিটা মানুষ ধড়ফড়িয়ে উঠে বসে। পুষ্পা, পুষ্পার ছেলে কুসুমের চিৎকারে কাঁদছে তাই পুষ্পা ছেলেকে বুকে জড়িয়ে কাঁপতে কাঁপতে তারানূরের দেহটার দিকে তাকায়। সিয়াম নুহাশকে কোলে নিয়ে দ্রুত বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। লা*শ আর এতো র*ক্ত দেখে মাথা চক্কর দিয়ে উঠে সিয়ামের। তারপরও চিৎকার করে সবাইকে ডাকে। মাজিদ, সাদিক ইকবাল তারাও মেয়েলি চিৎকারের শব্দে ঘুম থেকে উঠে পরনের লুঙ্গির গিট দিতে দিতে দৌড়ে বের হতেই পথে পেল তৌহিদ আহাদ সাজিদকে। তাদেরও সেইম অবস্থা মেয়েমানুষের হাউমাউ চিৎকার শুনে সকলেই দৌড়ে বের হতে ভাতঘরে আশনূর ইকরার দেখা পায়। নদী শেফালি তারা আগেই বসার ঘরে গিয়ে চিৎকার করছে। এতসব ঘটনা ঘটেছে হয়তো মিনিট খানেকের চেয়ে কিছুটা বেশি সময়ে ঘটেছে। তারানূরকে গু*লি করার পরপরই ধামধাম শব্দে কাঠের দরজা ভেঙে ঘরে ঢুকে দলে দলে ছু*রি রা*মদা হাতে মুখোশধারী ডা*কা*তের দল। ঘরের হারিকেনের আলোয় মুখোশধারী ডা*কা*ত দলকে দেখে ঘরের মহিলারা সবাই ভয়ে আতঙ্কে হাউমাউ চিৎকার করে সকলেই প্রাণের ভয়ে এলোমেলো দৌড়াতে লাগল পালাতে। কিন্তু মুখোশধারী ডা*কা*ত যেন তাদের অবস্থান নিয়েই এসেছিল।
মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ে ঘর জুড়ে। কথা নেই, বার্তা নেই, কোনো চাওয়া নেই। ঘরের আসবাবপত্র গয়নাগাটি সবই আমানত রয়েছে শুধু ঘরের মানুষগুলো লা*শ হয়ে পড়ে আছে এলোমেলো ভাবে। তারানূরের পাশেই ফুলবানুর লা*শটা ছটফট করছে। ফুলবানুর মাথার কাছে কুসুম তারপর পুষ্পার লা*শটা পরে। পুষ্পার তিন বছরের ছেলেটার লা*শটা সোফার কাছে উল্টে পড়ে, তার পাশেই মাজিদের বয়স্ক শশুরের র*ক্তা*ক্ত দেহটা পরে। বসার ঘর আর ভাতঘরের মাঝামাঝি দরজাটায় নদীর আর তার ছেলে তুতুলের লা*শটা পড়ে। সাজিদ মাজিদ আহাদ তৌহিদ সাদিক আর ইকবালের লা*শটা ভাতঘরে পড়ে এলোমেলো ভাবে পরে আছে। ডা*কা*ত দলের সাথে তাদের ধস্তাধস্তি হয়েছে বেশ কিন্তু তারপরও কেউ প্রাণে বাঁ*চতে পারেনি। ডা*কা*ত দলের সংখ্যা বেশি হওয়ায় ছেলেরা কেউ পেরে উঠেনি নির*স্ত্র হয়ে। তবে দুই তিনজন ডা*কা*ত গুরুতর আহত হয়েছে মাজিদের হাতে। সেই আ*হত ডাকাতদের অন্য ডাকাতরা দ্রুত সরিয়ে ফেলে। ধস্তাধস্তিতে সাদিক ইকবাল মাজিদ তিনজনের লুঙ্গি খুলে গেছে। উ*ল*ঙ্গ অবস্থায় খালি দেহটা বারবার ঝাঁকিয়ে উঠছে শেষ নিশ্বাসের তাগিদে।
এখনো সবার প্রাণ যায়নি কয়েকজনের শেষ নিশ্বাস চলছে। তৌহিদ সাজিদ আহাদ শর্ট প্যান্ট পরা ছিল বলে তাদের শরীরে অবশিষ্ট কাপড়টুকু বাকি ছিল। আশনূরের দেহটা নূরজাহানের ঘরের দরজার সামনে উল্টে পড়ে। আশনূরের শরীরটা নূরজাহানের ঘরে আর পা দুটো দরজার বাইরে ভাত ঘরে পরে আছে। আশনূর ইকরা নূরজাহানের ঘরে পালাতে চেয়ে ডাকাতদের হাতে সেখানে জবাই হয়। আশনূরের দেহখানার কোনো সাড়াশব্দ দেখা গেল না। তবে ইকরার লা*শটা বেশ লাফাচ্ছে গু গু শব্দ করে। ইকরার পা দুটো আশনূরের পিঠে। ইকরার শরীরটা নূরজাহানের পড়ার টেবিলের পাশে পরে। ইকরার দেহটা লাফানোতে লাথি পড়ছে আশনূরের পিঠের উপর। মাজিদের ছেলে নুহাশ ভয়ে দৌড়ে গিয়ে নূরজাহানের ঘরের খাটের নিচে লুকিয়ে ছিল কিন্তু তারও শেষ রক্ষা হয়নি। একজন ডাকাত নুহাশকে খাটের নিচ থেকে টেনে বের করে বুকে পাড়া দিয়ে গলায় ছু*রি চালিয়ে জ*বা*ই করে। সিয়াম মাকে ফেলে পালিয়ে যেতে চেয়েছিল মাজিদের ঘরে। ডাকাল দলের লোক সিয়ামকে মাজিদের ঘরের দরজার পিছন থেকে টেনে বের করে সেখানেই জ*বা*ই করে। শেফালী আর মাজিদের শাশুড়ী দৌড়ে রান্নাঘরের দরজা দিয়ে পালাতে চেয়েছিল বোধহয় শেফালী আর মাজিদের শাশুড়ীর লা*শটা রান্নাঘরের দুয়ারে ছটফট করতে দেখা যায়।
উপরে টিনের চালে ঝুমঝুম বৃষ্টি আর নিচে ঘরের ভিতরে লা*শের ব*ন্যা। ঘরের মেঝেতে লাল র*ক্তে*র স্রোত বয়ে যাচ্ছে। সকলের গলায় ছু*রি চালানোর কারণে চোখ উল্টে জিভে কা*ম*ড় পড়েছে সবার। কি নৃ*শং*স হ*ত্যাকা*ন্ড গা শিউরে উঠার মতো। একই রাতে এই জায়গায় সপরিবারে একুশ জনের গ*লা কে*টে হ*ত্যা*র নৃ*শংসতা হয়তো কোথাও ঘটেনি আজও, এই প্রথম। শাহানার লা*শ*টা বাহির থেকে ঘরে এনে ফেলা হয়। সবগুলো লা*শে*র উপর কন্টেইনারের কেরোসিন ঢেলে আ*গু*ন লাগানোর প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। এর মাঝে রশিদের অটোরিকশাটা বটগাছের কাছাকাছি আসতে দেখে কতগুলো ট্রাক বটগাছের নিচে দাঁড়িয়ে। সেখানে ছু*রি রা*ম*দা হাতে দুজন লোক দাঁড়িয়ে পাহাড়ায়। রশিদের অটোরিকশার লাইট সেই লোকগুলোর দিকে পড়তে ডাকাত দুটি লোক হৈ হৈ করে বাকি ডাকাত দলদের ডেকে সতর্ক করে এদিকে ছু*রি হাতে দৌড় দেয় রশিদের অটোরিকশা দাওয়া করতে। রশিদ ডা*কা*ত দলদের দেখে ঘাবড়ে যায়। রাস্তা থেকে তৎক্ষণাৎ সিকদার বাড়ির দিকে তাকাতেই দেখে এই ঝুম বৃষ্টিতেও সিকদার বাড়িতে আ*গু*ন দাউদাউ করে জ্ব*ল*ছে। রশিদের পাশাপাশি হাসান নূরজাহান তাঁরাও ঘটনাটা সম্পূর্ণ দেখেছে। রশিদ গাড়ি থামিয়ে সামনে কি হচ্ছে দেখতে নেমেছিল, ডা*কা*ত দলের উপস্থিতি পেয়ে লাফ দিয়ে পুনরায় গাড়িতে উঠে গাড়ি উল্টো ঘুরাতে চেয়ে আ*ত*ঙ্কি*ত ভঙ্গিতে হাসানকে বলে…
‘ হাসান চাচা গো ডা*কা*ত পরছে আপনেগো বাইতে। জা*ন লইয়া পা*লান।
রশিদ নিজের অটোরিকশা ঘুরাতে ঘুরাতে দুজন ডা*কা*ত ঘিরে ফেলে তাদের। হাতে রা*ম*দা দিয়ে রশিদ হাসান নূরজাহানকে আক্রমণ করে। ডা*কা*ত দলের সংখ্যা কম হওয়ায় হাসান রশিদের হাতে দুজন ডাকাত আহত হয়ে রাস্তায় পড়ে। বাকি ৫০-৬০ জনের মতো ডা*কা*ত দল হাসানদের ফিরে আসার খবর পেয়ে সিকদার বাড়ি থেকে দলে দলে বের হতে দেখে রশিদ হাসান নূরজাহান তিনজনে একত্রে চিৎকার করে গ্রামবাসীদের ডাকে….
‘ ডা*কা*ত পরছে রে বাঁচাও। তোমরা কেডা কই আছো তাড়াতাড়ি বাইর হও রে। ডা*কা*ত আইছেরে। গেরামে ডাকাত পরছেরে। তোরা কেডা কই আছত বাইর রে। বাঁচারে আমডারে বাঁচা। সিকদার বাইতে ডা*কা*ত পরছে রে। বাঁচারে! বাঁচা। আমডারে বাঁচা।
নিস্তব্ধ নিশিতে সকলে ঘুমে। তার ওপর এই ঝুম বৃষ্টিতে গ্রামবাসী রশিদ হাসান নূরজাহানের চিৎকার কেউ শুনতে পারছে না। যেমন শুনেনি সিকদার বাড়ির একুশ জন মানুষের আর্ত*চিৎকারের শব্দ। দলে দলে ডা*কা*তদের দৌড়ে আসতে দেখে রশিদ হাসানকে বলে…
‘ হাসান চাচা তুমি নূরজাহানরে লইয়া তাড়াতাড়ি পালাও। আমি গেরামের মানুসগোরে ডাইকা লইয়া আইতাছি। যাও।
দুজন ডা*কা*তকে রাস্তায় ফেলে হাসান নূরজাহানের হাত ধরে কালি পাহাড়ির রাস্তা ধরে দৌড় দেয়। আর রশিদ গেরামের রাস্তার দিকে। রশিদের অটোরিকশা থামানোর কিছুটা দূরে রাস্তার মাথায় কয়েকটা বাড়ি ছিল। তাজুল বাড়ি বলে মানুষ এই খন্ডটাকে। এই খন্ডে বেশ কয়েকটি পরিবার একত্রে বাস করে। নূরজাহান হাসান রশিদের হালকা পাতলা চিৎকার শুনে তাজুল রাস্তার পাশের জানালাটা খুলে রাস্তায় টর্চ টিপ দিয়ে হৈ হৈ করে ডেকে বলে….
‘ ঐ কেডারে চিল্লায়? কেডা ঐখানে?
‘ ঐ তাজুল চাচা আমডারে বাঁচাও। ডা*কা*ত পরছে সিকদার বাইতে। বাঁচাও আমডারে।
রশিদ চিৎকারের সাথে সাথে রাস্তায় লুটিয়ে পড়ে। রশিদকে গু*লি করা হয়েছে পিঠে। তাজুল সেই গু*লির শব্দে চিৎকার করে গ্রামের আশেপাশে ঘুমন্ত মানুষদের ডেকে বলে….
‘ ঐ তোরা কেডা কই আছত রে সিকদার বাইতে ডা*কা*ত পরছে রে। তোরা বাইর হ রে। বাইর হ!
তাজুলের চিৎকারের সাথে সাথে আশেপাশের মানুষের ঘরে আলো জ্বলতে শুরু করে। গ্রামবাসী ছেলে মেয়ে ছোট বড় যার যা আছে সেসব নিয়ে দৌড়ে দৌড়ে বাড়ি থেকে বের হচ্ছে ডাকাডাকি করে আরেকজনকে ডাকছে বের হতে। আস্তে আস্তে পুরো গ্রাম জাগ্রত হচ্ছে ডা*কা*তের আভাস পেয়ে। গ্রামের মানুষ জেগে যাচ্ছে দেখে মুহূর্তে মুখোশধারী ডা*কা*ত দল লাফিয়ে ট্রাকে উঠে গাড়ি নিয়ে চলে যাচ্ছে। কয়েকজন গ্রামবাসী লাঠিসোটা দা* হাতে ডা*কা*তের গাড়ির পিছনে দৌড়েও কেউকে ধরতে পারেনি। গু*লি*বিদ্ধ রশিদকে ধরাধরি করে রাস্তা থেকে তুলতে রশিদ মৃ*ত্যু*র আগে বলে যায় হাসান নূরজাহানকে নিয়ে কালি পাহাড়ের দিকে গেছে। কিছু ডা*কা*ত দল তাদের পিছনে গিয়েছে মা*র*তে। গ্রামবাসী হাসানদের বাঁ*চাতে। গ্রামের কিছু লোকজন দৌড়ে গেছে কালি পাহাড়ের দিকে হাসান নূরজাহানকে বাঁচাতে। বাকি পুরো গ্রামবাসী হৈ হৈ করে দৌড়ে যায় সিকদার বাড়ির আগুন নেভাতে। এই ঝড় বৃষ্টির কারণে ডা*কা*তদের লাগানোর আ*গু*নটা পুরো সিকদার বাড়িতে ছড়িয়ে পড়তে পারেনি।
অন্ধকার রাতে বৃষ্টির মাঝে পাহাড় বেয়ে হাসান নূরজাহানকে নিয়ে উপরে উঠছে। দিশেহারা আতঙ্কে হাসান নূরজাহানকে নিয়ে কোথায় যাচ্ছে দিকবিদিক জ্ঞান নেই। দৌড়াতে দৌড়াতে নূরজাহান ক্লান্ত। পিছনে ডা*কা*তের হৈ হৈ চিৎকার শোনা যাচ্ছে। নূরজাহানদের ধরার জন্য তাড়া করছে। নূরজাহান প্রেগন্যান্ট। শরীর দুর্বল তার ওপর অনেকক্ষণ ধরে পাহাড়ি রাস্তায় এলোমেলো দৌড়ানোর কারণে প্রচণ্ড পেটে ব্যথায় শ্বাস ফুলে উঠছে। নূরজাহান বড় একটা গাছ ধরে দাঁড়িয়ে পড়ে। শ্বাসের অভাবে হাঁপাতে হাঁপাতে খালি পেটে বমি করে বসে। হাসানের শরীর কাঁপছে। তখন ডা*কা*তদের সঙ্গে ধস্তাধস্তি করার সময় একজন ডা*কা*তের হাতে হাসানের পেটে ছু*রি ঢুকেছে। এতে র*ক্ত*ক্ষ*রণ হচ্ছে বেশ। হাসান নিজেও চোখে ঘোলাটে দেখছে। কিন্তু চিন্তা আতঙ্কে মাথা ফেটে যাচ্ছে হাসানের। বাড়ি থেকে ডা*কা*ত দল বের হওয়ার সময় বাড়িতে আ*গুন জ্ব*লতে দেখেছিলেন তিনি, এখন বাড়ির মানুষগুলো সবাই সহিসালামত আছে কিনা সে নিয়ে হাসানের চিন্তা হচ্ছে। এই পাহাড়ি ঘাঁটি থেকে নূরজাহানকে নিয়ে কিভাবে সহিসালামত বের হবে সেই পথও পাচ্ছে না তিনি। তার ওপর নূরজাহান অসুস্থ। হাসান দ্রুত নূরজাহানের পিঠে হাত বুলিয়ে বমি বন্ধ করতে চেয়ে বলে….
‘ আম্মা এইখানে থামলে হইব না। আরেকটু কষ্ট করেন। আমাগো পিছনে ডা*কা*ত পরছে। জানে বাঁচতে হইলে আমাগোরে এহোন দৌড়াইতে হইব। চলেন।
নূরজাহান নিঃশ্বাসের অভাবে গাছের সঙ্গে শরীর টিকিয়ে দাঁড়িয়ে বলে…
‘ আমার প্রচণ্ড পেটে ব্যথা করছে আব্বা। শরীর কাঁপছে আমি মনে হয় জ্ঞান হারাব। আমার শরীর চলছে না আব্বা, আপনি চলে যান। বাড়িতে গিয়ে দেখেন সবার কি অবস্থা। আমি এখানেই কোথাও লুকিয়ে পড়ব না-হয়। সকালে আমার খোঁজে আপনি মানুষ নিয়ে আইসেন।
নূরজাহানের পেটে ব্যথা মানে গর্ভপাত হতে পারে। গর্ভবতী মেয়েদের দৌড়াদৌড়ি কিংবা টেনশন করতে নেই তাহলে গর্ভপাত হতে পারে। হাসান নূরজাহানের গর্ভপাতের আলামত দেখে দিশেহারা হয়ে উঠে। আশেপাশে দৌড়ে একটা গর্ত খুঁজে বের করে নূরজাহানকে সেই গর্তে ধরে নামিয়ে দেয়। রাতের অন্ধকারের গর্তটা দেখা যায় না কাছে না গেলে। হাসানের তলতলে মোটা পেট থেকে গরগর করে র*ক্ত ঝরে বৃষ্টির পানিতে মিশে যাচ্ছে এটা নূরজাহান গর্তে নামার সময় খেয়াল করে। অন্ধকারের জন্য নূরজাহান এতক্ষণ দেখতে পাইনি হাসানের পেটের আ*ঘা*তটা। কিন্তু গর্তে নামার পর হাসানের পেট বরাবর নূরজাহানের মুখ ঠেকতেই নূরজাহান আঁতকে উঠে হাসানের তলতলে পেট ছিঁ*ড়ে পা*ক*স্থলী দেখা যেতে। নূরজাহান তৎক্ষণাৎ থাবা মেরে হাসানের হাত চেপে হু হু করে কেঁদে উঠে বলে….
‘ আব্বা! আব্বা! আপনার পেটে…
আতঙ্কে থরথর করে কেঁপে উঠছে নূরজাহান। অতিরিক্ত আতঙ্কের জন্য নূরজাহানের মুখ দিয়ে কথা বের হচ্ছে না। কিন্তু হাসান নূরজাহানের কথা বুঝে পেটের বাম পাশটা চেপে ধরে অপর হাতটা নূরজাহানের মাথায় রেখে বলে….
‘ আমার কিচ্ছু হইব না আম্মা। আপনে চিন্তা কইরেন না। আমি কাইল সক্কালে আইয়া আপনেরে লইয়া যামু। খবরদার আম্মা আমি না আওনের আগ পর্যন্ত আপনে কিন্তু গর্ত থেইক্কা বাহির হইয়েন না। আশেপাশে ডা*কা*তের উপদ্রব বেশি। আপনে কিন্তু নিরাপদ না।
নূরজাহান কাঁদছে হাসানের জন্য। অলরেডি হাসানের পাক*স্থ*লী দেখা যাচ্ছে। এই পেট নিয়ে কিছুক্ষণও দৌড়াতে পারবে না তার আগেই হাসান জ্ঞান হারাবে নয়তো ডা*কা*তের হাতে ধরা পড়ে ম*র*বে। নূরজাহান গর্ত থেকে উঠতে চেয়ে বলে….
‘ আমিও আপনার সঙ্গে যাব আব্বা। আপনার এই অবস্থায় আমি আপনাকে একা ছাড়তে পারব না। ম*র*লে বাপ বেডি এক সঙ্গেই ম*র*ব চলুন।
হাসান নূরজাহানকে থামিয়ে কসম দিয়ে বলে…
‘ আমার কসম লাগে আম্মা আপনে এইখান থেইক্কা বাইর হইয়েন না। আমার চিন্তা কইরেন না আম্মা আমি ঠিক ফিরা আমু আপনারে নিতে।
নূরজাহান তারপরও হাসানের হাত চেপে কাঁদছে। হাসান কম্পিত হাতটা নূরজাহানের মাথায় পরশ বুলিয়ে বলে…
‘ আপনেরে বাঁ*চতে হইব আম্মা। আমার নাতি-নাতনিগোর লাইগা আপনেরে বাঁ*চতে হইব। আপনি বাঁচবেন আম্মা। আপনের এই আব্বা যতদিন বাইচ্ছা আছে ততদিন কেউ আপনেরে মা*রতে পারব না। আপনে বাঁ*চবেন।
নূরজাহান কাঁদতে কাঁদতে টেনে নিজের গায়ের শাড়িটা খুলে হাসানের পেটে পরপর কয়েক বার প্যাঁচিয়ে বেঁধে দেয় যাতে দৌড়াদৌড়িতে হাসানের পেট ছিঁ*ড়ে পা*কস্থ*লী বেরিয়ে না যায়। হাসান নূরজাহানকে বাধা দিতে চাইলে নূরজাহান বাধা মানেনি। ইজ্জতের থেকে বাবার জীবন বড়। হাসানের গায়ে র*ক্তে ভেজা সাদা ফতুয়াটা টেনে খুলে হাসান নূরজাহানকে পরতে দেয়। নূরজাহান বাবার রক্তে ভেজা র*ক্তা*ক্ত ফতুয়াটা পরে নেয় শরীরে। হাসান যাওয়ার আগে নূরজাহানের কপালে চুমু খেয়ে শেষ বিদায় নেয়। নূরজাহান গর্তে বসে হাসানের দৌড়ে চলে যাওয়া দেখে মুখ চেপে কাঁদতে কাঁদতে। ঠিক একই ভাবে একদিন আয়েশাও নূরজাহানকে এইভাবে গর্তে লুকিয়ে পালিয়েছিল ফিরে আসবে বলে। কিন্তু আয়েশা আর কোনো দিন ফিরে আসেনি নূরজাহানের কাছে, ফিরে এসেছিল আয়েশার লা*শ। আজ একই পথে হাসানও দৌড়াচ্ছে নূরজাহানকে ফিরে আসার ওয়াদা করে। হাসান কখনো ফিরে আসতে পারবে কিনা নূরজাহান জানে না। তবে নূরজাহান খুব করে আল্লাহ কাছে দোয়া চাইছে হাসান যেন তার কথা রাখতে পারে। কাল সকালে যেন সত্যি সত্যি হাসান নূরজাহানকে নিতে ফিরে আসে এখানে। আয়েশার মতো হাসানও যেন ধোঁকা দিয়ে হারিয়ে না যায়। সত্যি ফিরে আসুক হাসান।
ডা*কা*তদের হৈ হৈ শব্দ নূরজাহানের গর্তের আশেপাশে কোথাও থেকে আসছে। ডাকাত দলের লোকজন এদিকটায় আসলে খুব সহজেই নূরজাহানকে পেয়ে যাবে। নূরজাহান যে বড় গাছটার নিচে গর্তে লুকিয়ে ছিল হঠাৎ করে সেই গাছটা থেকে একটা কাঁচা ডাল বাতাস ছাড়ায় আপনাআপনি ভেঙে পড়ে গর্তের মুখে। গাছের ডালের জন্য নূরজাহানকে আর দেখা যাচ্ছে না। ডাকাত দল যখন নূরজাহানের গর্তের সামনে চলে আসে এবং এদিক-সেদিক পাগলের মতো নূরজাহানকে খুঁজতে থাকে তখনই সেই গর্তের মুখে গাছের ডালে মস্ত বড় সাপ ফণা তুলে উঠে বসে ডা*কা*তদের উদ্দেশ্যে। সাপের ভয়ে ডা*কা*ত দল অন্যদিকে চলে যায় যেদিকে হাসান গেছে সেদিকে। নূরজাহান গর্তে জ্ঞান হারানোর পথে। ঝুপঝুপ বৃষ্টি পড়ছে গর্তে। নূরজাহান ঝাপসা চোখে জ্ঞান হারানোর আগে সেই সাপটির দিকে তাকায় যেন নূরজাহান চিনতে পারছে সাপটি কে। সাপটি মাথা নত করে নূরজাহানের কপালে মুখ লাগায়। মূহুর্তে মাঝে সাপটি আবার বিড়ালের রুপ নেয়। মানুষ বলে জ্বিন জাতির দুটো রুপ নিতে পছন্দ করে। একটি সাপের অন্যটি বিড়ালের। বিড়ালটি নূরজাহানের মুখের সামনে গাছের ডালে পাহাড়ায় বসে নূরজাহানের দিকে তাকিয়ে। নূরজাহান জ্ঞান হারানোর আগে একটু করে বিড়ালটির দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলে যায়…
‘ দাদী? আমার আব্বাকে বাচাও। ওরা আমার আব্বাকে মেরে ফেলবে। জিন্নাত জ্বিন!
জ্বিন শব্দটিতে মায়া তৎক্ষনাৎ ডাইরিটি বন্ধ করে ফেলে আতঙ্কে। কি ভয়ংকর সব মৃ*ত্যুর দৃশ্য বর্ণনা করা এই ডাইরিতে। মায়া এই ডাইরিটার পরবর্তী পৃষ্ঠা গুলো ভয়ে পরার সাহস পাচ্ছে না। তারপর কি হয়েছে জানার আগ্রহ চেয়ে মায়ার ভিতরে ভয় আর আতঙ্ক কাজ করছে বেশি। মায়া থমকে বসে রইল কয়েক মূহুর্ত। অতিরিক্ত ভয় থেকে মায়ার হাত-পা কাঁপছে। বাইরে কালবৈশাখীর ঝড়-ঝাপটায় টিনের চালে ঝুমঝুম বৃষ্টি হচ্ছে। ঠিক এমন একটা রাতের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে এই ডাইরিতে। ইকরা নুহাশের লাশটা তো নূরজাহানের পড়ার টেবিলের পাশেই পরে ছিল তাই না। ভয়ে মায়ার গায়ে তৎক্ষনাৎ কাটা দিয়ে উঠে। মায়া পা উঠিয়ে চেয়ারে বসে পরে তৎপর। পাশের ঘর থেকে একটা লোকের চিৎকার শোনা যাচ্ছে—’দোহাই আল্লাহ-রসুল! দোহাই আল্লাহ-রসুল!’ বলে। কালবৈশাখীর ঝড়ের তোপে লোকটা গলা ছেড়ে আজান দিতে লাগল। মায়ার জানা মতে এই বাড়ির সবাইকে সেদিন ডা*কা*ত দল জ*বা*ই করে একত্রে মেরে আগুনে জ্বালিয়ে দিয়েছিল, তাহলে আজকে যারা পরিবার হয়ে এই বাড়ি বাস করছে তাঁরা কারা? নূরজাহানের কি হয় তাঁরা? নাকি সেদিন ডা*কা*তদের হাতে সবার মৃ*ত্যু হয়নি? কেউ কি বেঁচেছিল সেদিন এত কিছুর পরও?
মায়া নূরজাহানের ঘরে বসে আছে। নূরজাহানের পড়ার টেবিলে হারিকেনটা টিপটিপ করে জ্বলছে। ঠান্ডা-শীতল পরিবেশেও মায়া ধরধর করে ঘামছে। এই ঘাম গরমের নয়, প্রচণ্ড ভয় আর আতঙ্কের ঘাম। মায়ার সামনে নূরজাহানের অসমাপ্ত ডায়রিখানা পড়ে আছে। এতক্ষণ সে এই ডায়রিখানায় পড়ছিল। ডায়েরিখানা পড়ে মায়ার এবার ভীষণ ভয়ে কলিজা কাঁপছে। গায়ের ওড়নাটা দিয়ে বাম হাতে কপালের ঘাম মুছতেই খটখট শব্দ হলো ঘরে।
মায়া চমকে দরজার দিকে তাকায়। নূরজাহানের ঘরে মায়া ব্যতীত আর কেউ নেই; পাশের ঘরে সবাই আছে। বিপদে পরে মায়া এই বাড়িতে এসে আশ্রয় নিয়েছে। এই বাড়ির মানুষজন খুবই ভালো, মায়ার ভালো লেগেছে তাদের আন্তরিকতা। এই বাড়ির একজন বয়স্ক মহিলাটা মায়াকে নূরজাহানের ঘরে রাতটা থাকার পারমিশন দিয়েছে। এতক্ষণ ধরে মায়া একা এই ঘরে বসে নূরজাহানের ডাইরিটা পড়ছিল অথচ এখন মায়ার মনে হচ্ছে এই ঘরে সে ছাড়াও দ্বিতীয় কেউ একজন আছে। মায়া কারও ছায়া দেখেছে এই ঘরে ঢুকতে। মায়া ভয়ার্ত ভঙ্গিতে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ায়। নূরজাহানের পড়ার টেবিল থেকে হারিকেনটা নিয়ে মুখের সামনে ধরে পিছনে ঘুরে খালি ঘরটার দিকে তাকিয়ে আতঙ্কিত গলায় আওড়ায়—
‘কে? কে ঐখানে?
কারও সাড়াশব্দ পেল না মায়া। মায়া হারিকেন হাতে নূরজাহানের সম্পূর্ণ ঘরে দৃষ্টি বুলিয়ে কাউকে দেখতে না পেয়ে সামনে ঘুরতে চাইলে আবারও কারও পায়ের শব্দ পেল সে। মায়া ভয়ে জমে গেল! চমকে তৎক্ষণাৎ পেছনে তাকাতেই নূরজাহানের ঘরের উত্তরের বন্ধ দরজার সামনে একটা কালো ছায়া দেখে মায়া আতঙ্কিত হলো। এইমাত্র মায়া দেখেছে ঐখানে কেউ ছিল না, তাহলে এখন কই থেকে মানুষের ওই কালো ছায়াটা এল? মায়া হারিকেন হাতে ভয়ার্ত দৃষ্টিতে সেদিকে তাকিয়ে ক্ষীর্ণ স্বরে আওড়াল—
‘কে? কে ওখানে? কথা বলছেন না কেন? কে আপনি?
‘আমি জিন্নাত।
নামটা শুনেই মায়া চমকে গেল। হারিকেনের আলোয় হালকা স্পষ্ট হলো বৃদ্ধা মহিলাটির মুখ। এই বৃদ্ধা মহিলাটির নামটাই তো নূরজাহান নিয়েছিল। জিন্নাত জ্বিন। নূরজাহান বেশ কয়েকবার এই বৃদ্ধা মহিলাটার কথা উল্লেখ করেছে নিজের ডায়রিতে। এই বৃদ্ধা মহিলাই নূরজাহানের জীবন বাঁচিয়েছিল। এই জিন্নাত জ্বিনের সঙ্গে নূরজাহানের হয়তো কোনো সম্পর্ক আছে। মায়া যতটুকু পরেছে এতে সে এই ব্যাপারে সঠিক করে কিন্তু বলতে পারছে না এই জিন্নাত জ্বিনের সাথে নূরজাহানের আসলে কি সম্পর্ক ছিল তাতে। এই মহিলা কেবল তাদের সামনেই প্রকাশ্যে আসে, যাদের সাথে এই বদ্ধা মহিলার কোনো গভীর সংযোগ থাকে। মারিদ, নূরজাহান… আর এখন মায়ার সামনে এসেছে এই বৃদ্ধা মহিলা। মারিদ আর নূরজাহানের বিষয়টা না-হয় বোঝা যায়, কিন্তু এই বৃদ্ধা মহিলার সাথে মায়ার কী সংযোগ থাকতে পারে? যার জন্য এই বৃদ্ধা মহিলা মায়াকে দেখা দিচ্ছেন?
মায়া কম্পিত স্বরে বলে—
‘আপনি আমার সামনে কেন এসেছেন? আমার কাছে কী চান?
‘আমাকে ভয় পাচ্ছিস?
‘আপনি মানুষ নন, একজন বুজুর্গ জিন। আপনার নাম জিন্নাত। আমি নূরজাহানের ডায়েরিতে পড়ে…
বৃদ্ধা মহিলাটি মায়াকে কথা শেষ করতে না দিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করে বললেন—
‘তোর নাম কী?
মায়া কম্পিত স্বরে বলে—
‘আ-আমি রিক্তা ইসলাম মায়া।
‘আমি জানতাম তুই এখানে আসবি।
কেমন অদ্ভুত শোনাল বৃদ্ধা মহিলাটির কথা মায়ার কাছে! মায়া ভয়ার্ত মুখে নিজের হয়ে সাফাই দিয়ে বলে—
‘আমি এখানে ইচ্ছে করে আসিনি। আমরা থানচিতে ট্যুরে এসে ঝড় বৃষ্টিতে ফেঁসে গিয়ে এই বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছি। আমি একা নয় আমার সাথে আরও মানুষ আছে এই বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে। বৃষ্টি থামলেই আমরা সবাই চলে যাব, আমার ভাইয়া আসবে আমাকে নিতে।
বৃদ্ধা মহিলাটি মায়ার কথার গুরুত্ব দিলেন না। উনি কেবল গমগমে আওয়াজে খিটখিটে মেজাজে এতটুকু বললেন—
‘যাহ! যাহ! এখান থেকে চলে যা। আর কখনো এই বাড়িতে আসবি না। এখানে তোর কোনো কাজ নেই।
এটা অভিশপ্ত বাড়ি। এখানে যারা আসে তারা লা*শ হয়ে ফিরে যায় তুইও ম*রবি। চলে যা এখান থেকে। চলে যা।
[ ডাকপ্রিয়র চিঠির প্রথম খন্ড শেষ করলাম। পরবর্তী পর্বগুলো দ্বিতীয় খন্ডে আসবে ইনশাআল্লাহ ]
