ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ৪৭ (২)
মারিয়াম ফুল
মেহের রেহানা চৌধুরীর দুটি হাত আঁকড়ে ধরে কান্নাজড়ানো, ভাঙা স্বরে বলল, “আমি আর এক মুহূর্তের জন্যও এই বাড়িতে থাকতে চাই না, মা… এটা কোনোদিন আমার নিজের বাড়ি ছিল না, আর কোনোদিন হবেও না! আপনারা কি আমাকে আপনাদের বাড়িতে নিয়ে যাবেন না?”
রেহানা চৌধুরী নিজের কোমল হাত দুটো বাড়িয়ে মেহেরের চিবুক ছুঁয়ে দিলেন। মেহেরের চোখের জল মুছে দিয়ে বললেন,
“আপনাদের বাড়ি মানে কী, মেহের? চৌধুরী বাড়ি যতটা আমাদের, ঠিক ততটাই তোমারও। এভাবে বলতে নেই…মা ”
মেহের ধীরে মাথা নাড়ল। বুকের ভেতর জমে থাকা পাহাড়সম যন্ত্রণাটা চেপে কিছু একটা বলতে চেয়েও পারল না। কথাগুলো যেন গলায় এসে আটকে গেল। সারা দিনের ঝড়ঝাপটায় নিজেকে ভীষণ এলোমেলো আর বিষণ্ণ লাগছিল তার। চোখের সামনে পরিচিত মানুষগুলোর মুখগুলোও কেমন ঝাপসা হয়ে আসছিল। সায়েদ বাড়ির সবার কাছ থেকে শেষ বিদায় নিয়ে সে ধীর পায়ে গাড়ির দিকে এগিয়ে গেল। একবার পেছন ফিরে বাড়িটার দিকে তাকাল, তারপর নিঃশব্দে গাড়িতে গিয়ে উঠল।
মনে মনে বিড়বিড় করে উঠল মেহের, “এই বাড়ি তোমাকে কিছুই দেয়নি, মেহের। বরং তোমার যা ছিল, তাও হারিয়েছ শুধু এই বাড়ির কারণে।”
গাড়িতে ওঠার আগে মাশফি মেহেরকে বিদায় জানানোর সময়ও তাকে আশ্বস্ত করে বলেছিল, সুযোগ বুঝে রুদ্রর সঙ্গে মেহেরের ডিভোর্সের বিষয়টি নিয়ে সে কথা বলবে। চলতি মাসের মাঝামাঝি সময়েই মেঘলা আর মেহেরকে সঙ্গে নিয়ে একেবারে দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার পরিকল্পনাও জানিয়েছিল। তবে তার আগে নূরে আর তার ছেলের যেন কোনো ধরনের অসুবিধা না হয়, সেদিকেও সে খেয়াল রাখবে বলে মেহেরকে আশ্বস্ত করেছিল মাশফি।
নিজের এক চিলতে নিষ্পাপ সন্তানকে বুকে আগলে মেহের পেছনের সিটে রেহানা চৌধুরীর পাশে গিয়ে বসল। ছোট্ট ছেলেকে কে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে কিছুক্ষণ নীরবে তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল সে। নিষ্পাপ মুখটায় যেন এই পৃথিবীর কোনো দুঃখের ছায়াই এখনো পড়েনি। সামনের আসনে চুপচাপ বসে ছিলেন হামজা চৌধুরী। আর স্টিয়ারিংয়ে হাত রেখে চালকের আসনে বসেছিল রুদ্র। গাড়ির ভেতরটা অস্বাভাবিক নীরব হয়ে ছিল। কেউ কোনো কথা বলছিল না। রুদ্র ইঞ্জিন চালু করতেই সেই নীরবতা ভেঙে মৃদু শব্দে গাড়িটি কেঁপে উঠল। তারপর ধীরে ধীরে গাড়ি বাড়ির সীমানা পেরিয়ে চৌধুরী বাড়ির উদ্দেশে এগিয়ে যেতে লাগল।
কিছুটা পথ পেরোনোর পর রুদ্র স্টিয়ারিংয়ে হাত রেখে সামনের লুকিং গ্লাসে চোখ রাখতেই তার দৃষ্টি গিয়ে থামল পেছনের সিটে। মেহের নিজের কোলের ছেলেকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে নিস্তেজ হয়ে বসে আছে। মুখজুড়ে ক্লান্তি, বিষণ্ণতার ছাপ। দেখে মনে হচ্ছিল, শরীরটা গাড়িতে থাকলেও মনটা যেন বহু দূরে কোথাও পড়ে আছে। রুদ্র কয়েক মুহূর্ত স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। তারপর হঠাৎই নিজের অজান্তে চোখ সরিয়ে নিল সে।
সামনের সিটে বসে থাকা হামজা চৌধুরীর নজরও বিষয়টি এড়াল না। ছেলের চোখ যে বারবার লুকিং গ্লাসের আড়ালে মেহেরের দিকে চলে যাচ্ছে, তা তিনি বেশ ভালোভাবেই লক্ষ্য করছিলেন। তবে এ নিয়ে কিছু বললেন না। শুধু নীরবে ছেলের মুখের দিকে একবার তাকিয়ে আবার সামনের দিকে চোখ ফেরালেন।
হঠাৎ কিছু বুঝে ওঠার আগেই মাঝরাস্তায় গাড়িটা বিকট শব্দ করে ঝাঁকুনি দিয়ে থেমে গেল। আকস্মিক ঘটনায় মেহেরও চমকে উঠে ছেলেকে আরও শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ধরল। রুদ্র দ্রুত স্টিয়ারিং সামলে গাড়িটা নিয়ন্ত্রণে এনে ইঞ্জিনের দিকে মনোযোগ দিল।
হামজা চৌধুরী সামনের দিকে একটু ঝুঁকে রুদ্রকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
“কী হলো, রুদ্র? হঠাৎ গাড়ি থামিয়ে দিলি যে?”
রুদ্র এবারও বাবার প্রশ্নের সরাসরি কোনো উত্তর দিল না। গাড়ি থামার সঙ্গে সঙ্গেই মেহের একবার চোখ তুলে রুদ্রের দিকে তাকিয়েছিল। কিন্তু পরক্ষণেই তার দৃষ্টি সরে গিয়ে সন্তানের দিকে স্থির হলো। রুদ্রও ছেলের দিকে কিছুক্ষণ মনোযোগ দিয়ে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীর গলায় লুকিং গ্লাসের দিকে তাকিয়েই মেহেরকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“কিছু খাবে?”
হঠাৎ এমন অপ্রত্যাশিত প্রশ্ন শুনে মেহের বেশ চমকে গিয়ে বড় বড় চোখে রুদ্রর দিকে তাকাল। সে বুঝতে পারল প্রশ্নটা তাকেই করা হয়েছে। তবে কোনো কথা না বলে সে কেবল ওপর-নিচ মাথা নেড়ে না সূচক সঙ্কেত দিল— না, সে এখন কিছুই খেতে চায় না।
কিন্তু রুদ্র মেহেরের এই ‘না’ শুনল বলে মনে হলো না। কোনো কথা না বাড়িয়ে সে একপ্রকার নীরবেই গাড়ির দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে গেল।
রেহানা চৌধুরী একটু চিন্তিত মুখে হামজা চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে বললেন, “তোমার ছেলেটা এত রাতে কোথায় গেল বল তো? দেশের পরিস্থিতি তো এমনিতেই ভালো না, কত রাত হয়েছে দেখেছ?”
হামজা চৌধুরী একগাল আশ্বাসের হাসি হেসে বললেন,
“আমাকে কি বলে গেছে নাকি? দেখো, হয়তো জরুরি কিছু আনতেই গেছে।কিচ্ছু হবে না…”
কথাটা শেষ করে হামজা চৌধুরী মেহেরের কোলে ঘুমিয়ে থাকা ছোট্ট বাচ্চাটার দিকে তাকালেন। মুখে আপনাআপনি মায়ার ছাপ ফুটে উঠল। তারপর বাচ্চাটার দিকে তাকিয়ে বললেন,
“আহা, কী লক্ষ্মী আমার দাদুভাই আজ এত কিছু হয়ে গেল, একবারও কান্না করল না। সারাদিন দাদু, বাবা আর দাদির কোলেই তো ঘুরল।”
তারপর হামজা চৌধুরী মেহেরের দিকে তাকিয়ে বললেন, “আমার নাতিটা ভীষণ লক্ষ্মী, দেখেছ মেহের? একদম তোমার মতো হয়েছে — ভারী আদুরে এক সোনা বাচ্চা।ভালো হয়েছে, বাপের মতো হয়নি… না হলে জান খেয়ে ফেলত। যদিও ওর বাপ এমনই ছিল ছোটবেলায়।”
কথাটা শুনে মেহেরের বুকটা কেমন যেন একটা অপরাধবোধে মুচড়ে উঠল। চৌধুরী পরিবারের রক্তের কোনো ছাপ এই শিশুর শরীরে নেই, অথচ এই মানুষগুলো কতটা নিবিড় মায়ায় তাকে বুকের ভেতর আগলে রাখছে! মেহের নিজের অজান্তেই মুখে জোর করে এক চিলতে অপরাধবোধ মেশানো হাসি ফুটিয়ে তুলল।
রেহানা চৌধুরীও মৃদু হেসে পাশ থেকে বললেন , “আমার তাতিনটাও তো ছোটবেলায় এমনই শান্ত ছিল। বড় হয়েই না একটু অশান্ত হয়েছে! কিন্তু দেখেছ, আমার ছেলেটা এখন কত সংসারী হয়ে গেছে…আমার ছেলের কোলে তার ছেলে, ঘুরে বেড়ায়। দেখলে, হামজা… আমরা দাদা-দাদি হওয়ার সাথে সাথে বুড়ো-বুড়িও হয়ে গেছি।”
বলতে বলতেই রেহানা চৌধুরী মেহেরকে নিজের কাছে টেনে নিয়ে জড়িয়ে ধরলেন।হামজা চৌধুরী হো হো করে হেসে উঠলেন। পরক্ষণেই হাত দিয়ে নিজের মুখ চেপে ধরলেন। নাহ, এভাবে হাসা যাবে না। নাতিটা যে ঘুমাচ্ছে!
অথচ এই মানুষ দুজন জানেনই না, যাকে নিজেদের বংশের প্রদীপ ভেবে এতটা আপন করে নিয়েছেন, সেই শিশুটিকে ঘিরেই লুকিয়ে আছে এমন এক সত্য, যা জানার পর হয়তো তাদের এই হাসিটুকুও আর থাকবে না।
মেহের একবার বুকে চেপে রাখা সন্তানের নিষ্পাপ মুখখানার দিকে তাকাল, তারপর চোখ তুলে তাকাল রেহানা ও হামজা চৌধুরীর মায়াময় মুখের দিকে। তীব্র অপরাধবোধ তাকে ভেতর থেকে কুড়ে কুড়ে খেতে লাগল। আজ যেন তার জীবন থেকে অনেক কিছু হারিয়ে গেল। এক দমকা ঠান্ডা বাতাস মেহেরের হৃদয়ে নাড়া দিয়ে গেল—
এই মানুষগুলোকে ছেড়েও তাকে একদিন চিরতরে চলে যেতে হবে। কিন্তু শেষ কোথায়? মেহেরের যেন মনে হলো, জীবন থেকে একে একে সবকিছু হারাতে হারাতে সে নিজেও কোথাও নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে। অথচ তারও তো এমন একটা পরিবার চাওয়ার অধিকার ছিল। খুব করে চেয়েছিল সে। এমন একটা পরিবার, যেখানে আপন বলে কাউকে আঁকড়ে ধরতে ভয় হবে না, যেখানে ভালোবাসা হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকবে না।
ঠিক তখনই গাড়ির দরজায় শব্দ হলো। রুদ্র হাতে বড় দুটো ফুড প্যাকেট নিয়ে ফিরে এসেছে। সে বাবার হাতে প্যাকেট দুটো বাড়িয়ে দিয়ে বলল, “এই নাও, এগুলো ধরো।”
তারপর মেহেরের দিকে একটা প্যাকেট আর পানির বোতল বাড়িয়ে দিয়ে বেশ শান্ত স্বরে বলল, “এগুলো খেয়ে নাও। সারা দিন তো কিছুই মুখে দাওনি। অসুস্থ হয়ে যাবে।”
মেহের নীচু গলায় বলল, “আমি এখন খাব না…”
“তাহলে বাড়ি গিয়ে খেয়ে নিও,” রুদ্র মেহেরকে জোর করল না। মেহেরের মানসিক ভাঙনটা সে বুঝতে পারছে সে। এমন অবস্থায় জোর করে মুখে খাবার তুলে দিলেও, তা গলা দিয়ে নামবে না।
মেহের আর কোনো তর্ক করল না। পানির বোতলটা থেকে কয়েক ঢোক খেয়ে আবার চুপচাপ বসে রইল।
রুদ্র গাড়ি স্টার্ট দিল। ২০ মিনিট পর গাড়ি এসে থামল চৌধুরী বাড়ির সুবিশাল ফটকের সামনে। রাত বেশ গভীর হওয়ায় সুলতানা চৌধুরী অসুস্থ শরীর নিয়ে আগেই ঘুমিয়ে পড়েছেন। হামজা চৌধুরী আর রেহানা চৌধুরীও পরিশ্রান্ত শরীরে নিজেদের ঘরের দিকে পা বাড়ালেন।
রুদ্র মেহেরকে নিয়ে নিজের ঘরের দিকে এগিয়ে গেল। এই বাড়িতে মেহেরের আসা দ্বিতীয়বারের মতো। বিয়ের পরপরই রুদ্র তাকে সঙ্গে করে অ্যাপার্টমেন্টে নিয়ে গিয়েছিল। এরপর আর এই বাড়িতে আসা হয়নি। মেহেরও কখনো আসার কথা বলেনি, রুদ্রও তাকে নিয়ে আসেনি।
পুরো বাড়িটা নিস্তব্ধ হয়ে আছে। রাতের নীরবতা ভেদ করে বাইরে থেকে কেবল মাঝে মাঝে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক ভেসে আসছে।
মেহের রুদ্রের ঘরে ঢুকেই কোলে ঘুমিয়ে থাকা ছেলেটাকে সাবধানে বিছানায় শুইয়ে দিল। গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন শিশুটাকে বিরক্ত না করে ধীরে ধীরে তার মাথার নিচের বালিশটা ঠিক করে দিল, তারপর গায়ের চাদরটাও একটু টেনে দিল। ছেলেটা ঘুমের মধ্যেই সামান্য নড়েচড়ে আবার শান্ত হয়ে গেল। মেহেরও কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে ধীরে ধীরে সোজা হয়ে দাঁড়াল।
ঠিক তখনই রুদ্র ঘরের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই হঠাৎ থেমে গেল। ঘরে ঢুকেই ড্রেসিং টেবিলের পাশের দিকে তাকাতেই তার চোখে পড়ল, সোফাটা আর আগের জায়গায় নেই। কয়েকদিন আগেও তো সোফাটা ঠিক এখানেই ছিল। হয়তো বাড়ির কেউ সরিয়ে রেখেছে, তাকে না জানিয়েই। বিষয়টা বুঝতে পেরে ভেতরে ভেতরে সে বেশ খুশিই হলো।
তবে সেই খুশির সামান্যতম ছাপও মুখে না এনে পৃথিবীর সবচেয়ে নিষ্পাপ অথচ বাধ্য মানুষের একটা ভাব ফুটিয়ে মেহেরের দিকে তাকাল। তারপর স্বাভাবিক কণ্ঠে প্রশ্ন করল,
“সোফাটা কোথায় গেল? কে এখান থেকে নিয়ে গেল?”
মেহের রুদ্রের কথা শুনে একবার তার দিকে তাকাল। তারপর চোখ চলে গেল আগে যেখানে সোফাটা ছিল, সেদিকে। ড্রেসিং টেবিলের পাশের জায়গাটা সত্যিই ফাঁকা। কয়েক মুহূর্তের জন্য তার দৃষ্টি সেখানেই আটকে রইল। এরপর মেহের রুদ্রের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“সোফাটা গেল কোথায়?”
রুদ্র বেশ নির্বিকার ভঙ্গিতে কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল, “আমি কী জানি কোথায় গেল! নাকি আমি কোনো অলি-আউলিয়া যে জানতে পারব কে নিয়ে গেল? তোমার মতো আমিও প্রথমবার দেখেছি, এখান থেকে সুফাটা সরানো হয়েছে।।”
রুদ্রের এমন নির্বিকার উত্তর শুনে মেহের চিন্তায় পড়ে গেল। তাহলে রুদ্র এখন কোথায় ঘুমাবে? মেহেরের পক্ষে তো রুদ্রকে সরাসরি বলা সম্ভব নয়, ‘আপনি আমার ঘর থেকে বের হয়ে যান।’ আর বললেও বা রুদ্র এত রাতে কোথায় যাবে? নিজের ঘর ছেড়ে সে যে বেরিয়ে যাবে, এমনটা ভাবারও কোনো কারণ নেই। বরং মেহের বেশ ভালোভাবেই জানে, রুদ্র সহজে এই ঘর ছেড়ে বের হবে না। সোফাটা সরিয়ে নেওয়ার পর রুদ্রের জন্য আলাদা করে শোয়ার জায়গা যে আর থাকছে না, এই কথাটা মনে হতেই মেহেরের অস্বস্তিটা আরও বেড়ে গেল।
একপ্রকার বাধ্য হয়েই মেহের কিছুটা ইতস্তত করে বলল, “আপনি… আপনি চাইলে এখানে ঘুমাতে পারেন।”
রুদ্র মনে মনে তো এটাই চাইছিল! কিন্তু মুখটা গম্ভীর রাখার চেষ্টা করল।
মেহের চট করে বলল , “কিন্তু একটা শর্ত আছে…”
রুদ্র ভ্রু কুঁচকে এগিয়ে এসে বলল, “এক কাজ করো, এত শর্ত দেওয়ার দরকার নেই। খাটটা মাঝখান থেকে ভেঙে দুই টুকরো করে ফেলো, তাহলেই ঝামেলা মেটে!”
মেহের বিরক্ত হয়ে বলল, “শুনুন, আপনার সাথে ঝগড়া করার মতো মেজাজ আমার একদম নেই। দয়া করে জালাতন করবেন না… আজ অন্তত একদম না!”
রুদ্র ধীর পায়ে মেহেরের দিকে এক পা বাড়াল।মেহের চমকে উঠে দু-পা পিছিয়ে গেল। এই লোকটা চাইছেটা কী? হঠাৎ তার দিকে এভাবে এগোচ্ছে কেন?
মেহের থতমত খেয়ে তোতলাতে তোতলাতে বলল, “স…সরুন! সরুন, ক্যাপ্টেন সাহেব!”
রুদ্র থামল না। সে মেহেরের চোখের অতি গভীরে স্থির দৃষ্টিতে ডুব দিল। পলক না ফেলে একদম এক পরম সম্মোহনী কণ্ঠে বলল,
“আজ জালাতন করব না বললে… তার মানে বোঝো? সারা জীবন জ্বালাতন করার অধিকার দিয়ে দিচ্ছ কিন্তু।”
মেহের বুকের ভেতর অচেনা এক তোলপাড় অনুভব করল। নিজেকে সামলে নিয়ে চটজলদি বলল, “সরুন তো ভাই, সরুন! আমার ভীষণ ঘুম পেয়েছে, আমি ঘুমাব।”
“ঘুমাও, কে বারণ করেছে?” রুদ্র স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল।
“কিন্তু আপনি… আপনি এখানে…?” মেহের বলতে গিয়েও আটকে গেল। তারপর ইতস্তত করে বিছানার একপাশ দেখিয়ে বলল, “আমি এই ডান দিকে ঘুমাব। মাঝখানে লিটল চ্যাপ থাকবে, আর বাঁ দিকে আপনি…”
রুদ্র চোখ ছোট ছোট করে মেহেরের দিকে তাকাল, “উহু, একেবারেই না। ওই ডান দিকটায় আমি ঘুমাব, আর বাঁ দিকে তুমি।শখ কত… এসি বাতাস ডান দিকে বেশি লাগে,তাই মহাশয়ও ডান দিকে ঘুমাবে। ”
“আহা! বললেই হলো নাকি!” মেহের রুদ্রর উত্তরের জন্য আর অপেক্ষা করল না। এক লাফে সে বিছানার ডান দিকে গিয়ে চেপে বসে জেদী গলায় বলল,
“আমি এখানেই ঘুমাব! আমি কিচ্ছু জানি না, আর কিচ্ছু মানিও না!”
বিছানায় শান্ত হয়ে ঘুমিয়ে থাকা ছোট্ট নিষ্পাপ শিশুটি মেহেরের হঠাৎ এই লাফিয়ে ওঠার ধাক্কায় কেঁপে উঠল। তারপরই বাচ্চার ঠোঁট ভেঙে কান্না শুরু করল। রুদ্র নিষ্পাপ প্রাণটার দিকে তাকাল। তারপর মেহেরের দিকে তাকিয়ে শুষ্ক হেসে বলল,
“হয়েছে? করো আরও লাফালাফি! এখন এই এফএম রেডিও সামলাও দেখি। একদম মায়ের মতো হয়েছে!”
মেহের কান্না থামানোর চেষ্টা করতে করতে মুখ বাঁকাল, “আপনি যান এখন…”
রুদ্র নিঃশব্দে এক পা এগিয়ে এসে বলল, “আরে যাব মানে? ”
“আমি বেবিকে ফিড করাব।”
রুদ্র বুঝতে পারল, বাচ্চাটাকে ফিড করানো প্রয়োজন। সেই বিকেল থেকে কিছুই খায়নি। কতটা কষ্টে, না খেতে পেয়ে কান্না করতে করতে ঘুমিয়ে পড়েছে।রুদ্র আর কথা বাড়াল না। চুপচাপ ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
রুদ্র রুম থেকে বের হতেই মেহের বাচ্চাকে আলতো করে বুকের মাঝে টেনে নিল। পরম মমতায় ওর কপালে চুমু খেয়ে বলল, “এই যে… সারা দিন তো কত ভালো ছিলে, হুম? মাকে একদম মনে পড়েনি? ”
নিষ্পাপ শিশুটি মেহেরের বুকের ওমে এসে মৃদু শব্দ করল। মেহের ওর পেটে আলতো করে হাত বুলাতে বুলাতে আদুরে গলায় বলল, “আমার পাখিটার খাওয়ার সময় হয়ে গেছে? মাম্মা সরি পাখি… একদম সরি, আর এমন হবে না। মাম্মা আজকে তোমাকে একদম সময় দিতে পারেনি… সো সরি মাই বাচ্চা।”
মেহের বাচ্চার পিঠে আলতো চাপড় দিয়ে ওকে শান্ত করতে লাগল। বেশ কিছুক্ষণ পর বাচ্চাটি মায়ের গায়ের গন্ধে আবার গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল।
মেহের ধীরচোখে সন্তানের নিষ্পাপ মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। সন্তানের এই অবয়বের মাঝে সে বারবার অন্তুর মুখটা দেখতে পাচ্ছিল। এক গভীর শূন্যতা আর কান্না মেহেরের গলা ঠেলে ওপরে উঠে আসতে চাইল। কিন্তু মেহের নিজের চোখ দুটো শক্ত করে বুজে বিড়বিড় করে নিজেকে বোঝাতে লাগল,
‘একদম না… একদম কাঁদবি না মেহের! পৃথিবীর নিয়মে কেউ চিরকাল মানুষের পাশে থাকে না…’
হঠাৎ মেহেরের মনে মিরাজের বিষণ্ণ মুখটাও ভেসে উঠল। বাচ্চাটাকে কি এখন বাবা ছাড়া থাকতে হবে? নূরের ভেতরে এখন কী চলছে? আসার সময় সে দেখেছে, মেয়েটা এত কেঁদেছে। ওই পশুটার জন্য…একের পর এক প্রশ্ন মেহেরের মাথায় এসে ভিড় করল।
আজকের দিনটা মেহেরের জীবনের সবচেয়ে অদ্ভুত আর মর্মান্তিক দিনগুলোর একটি। একদিনেই সে তার বাবাকে হারিয়েছে, আর যে ভাইকে এতদিন নিজের শত্রু ভেবেছে, তাকেই নিজের হাতে শাস্তি দিয়েছে। এসবের অনেকটাই সে বহু আগে থেকেই পরিকল্পনা করে রেখেছিল। নিজের প্রতিশোধের পথটাও সে ভেবে রেখেছিল ধীরে ধীরে, হিসেব করে। কিন্তু সেই পরিকল্পনার শেষটা এত দ্রুত, এত নির্মমভাবে তার সামনে এসে দাঁড়াবে, তা মেহের কখনো ভাবেনি।
মেঘলা আর তার যে প্রতিশোধের পরিকল্পনা ছিল, তা আজ সফল হয়েছে। অথচ এই সফলতার পেছনে কোনো আনন্দ নেই, একটুও তৃপ্তি নেই!
মেহের নিজের অজান্তেই বিড়বিড় করে উঠল, “অন্তু, তোমাকে আমি জাস্টিস দিলাম… না, ঠিক জাস্টিসও তো না। তোমাকে তো আমার পক্ষে পুরোপুরি জাস্টিস দেওয়া সম্ভবই না…”
চোখ দুটি আবার কোলের ঘুমন্ত শিশুটির দিকে চলে গেল। মেহের অশ্রুসজল চোখে ফিসফিস করে বলল, “তুমি জানলে না অন্তু… তুমি জানতেই পারলে না, এই ছোট্ট প্রাণটা তোমাকে কোনোদিন ‘বাবা’ বলে ডাকতে পারল না। পুরো দুনিয়াটাও যদি আমি ধ্বংস করে দিই, তাহলেও তোমার সাথে হওয়া অন্যায়ের বিচার হবে না…”
কথা বলতে বলতেই মেহের অনুভব করল, ক্লান্তি আর অবসাদে তার চোখের পাতা দুটো ভারী হয়ে আসছে। সারা দিন পেটে এক ফোঁটা দানাপানিও পড়েনি, পাকস্থলী খিদেয় মুচড়ে উঠছে। পেটে হাত দিয়ে মেহের বিড়বিড় করল,
“উফ… প্রচণ্ড খিদে পেয়েছে। কিন্তু এখন তো কিছু নেই… মেহের, ঘুমিয়ে পড়। সকালে উঠে খাবি।”
বিছানায় মাথা রাখার পর মেহেরের চোখ দুটো ধীরে ধীরে বুজে এল। সারাদিনের নানা ঘটনার পর শরীর-মন দুটোই যেন আর সাড়া দিচ্ছিল না। কিছুক্ষণের মধ্যেই গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল সে।
ঘুমিয়ে পড়ার আগে মেহের খেয়ালই করেনি, দরজার পাশে দাঁড়িয়ে রুদ্র নীরবে তাকে দেখছিল । বেশ কিছুক্ষণ তার দৃষ্টি মেহেরের মুখেই স্থির হয়ে রইল। ঘুমের মধ্যে মেয়েটার মুখটা অদ্ভুত শান্ত লাগছিল। দিনের বেলায় যে মুখে এত কথা, এত অভিমান জমে থাকে, ঘুমের ভেতর সেই মুখটাই যেন সম্পূর্ণ অন্যরকম।
রুদ্রর মনে হলো, মেহেরকে নিয়ে তার ভেতরে কিছু একটা বদলে যাচ্ছে। বিষয়টা সে নিজেও ঠিক বুঝে উঠতে পারছিল না। শুধু এটুকু বুঝতে পারছিল, মেয়েটার দিকে তাকিয়ে থাকলে আগের মতো নির্লিপ্ত থাকা যাচ্ছে না। নিজের অজান্তেই দৃষ্টিটা বারবার তার মুখের ওপর আটকে যাচ্ছে।
আরও কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে রুদ্র ধীরে চোখ সরিয়ে নিল। তারপর নিঃশব্দে দরজাটা ভেজিয়ে দিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। তার যাওয়ার উদ্দেশ্যটা স্পষ্ট, কিন্তু মেহেরের ঘুমন্ত মুখের দিকে শেষবার তাকানোর সেই মুহূর্তে তার চোখে যে অনুভূতিটা ছিল, সেটার কোনো নাম যেন সে নিজেও দিতে পারল না।
এই কয়দিনে রুদ্র খুব ভালো করেই বুঝে গেছে, মেহের ভীষণ ঘুমকাতুরে। দু চোখের পাতা এক হতেই সে নিমেষেই অতল ঘুমে হারিয়ে যেতে পারে। আর একবার ঘুমালে তাকে ডেকে তোলা পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন কাজগুলোর একটি!
মা-ছেলেকে এভাবে পাশাপাশি ঘুমিয়ে থাকতে দেখে রুদ্রর বুকটা কেমন যেন পূর্ণতায় ভরে উঠল।রুদ্রর ঠোঁটের কোণে এক চিলতে প্রশান্তির হাসি ফুটে উঠল।
সে বিড়বিড় করে নিজেকেই বলল, “আমার হাসের বাচ্চাটা আবার ঘুমিয়ে পড়েছে… একদম ওর মায়ের মতো হয়েছে। ঘুমালে আর ওঠার নামগন্ধ নেই!”
রান্নাঘরে গিয়ে রুদ্র খাবার খোঁজার চেষ্টা করল। সে দেখেছে, মেহের ক্ষুধায় কেমন কাতরিয়ে ঘুমিয়েছে। কিন্তু চারপাশ ঘুরেও তৈরি কোনো খাবার পেল না। এত রাতে সে তো আর মেহেরকে ডেকে তুলে বলতে পারবে না, ‘এই নাও, কফি খাও।’
মেহের নির্ঘাত চোখ-মুখ কুঁচকে বলে উঠবে, ‘আপনার মনের মতো কুচকুচে কালো পানি আমি খাই না! আপনি গিলুন আপনার কালো পানি!’
ভাবতেই রুদ্রর ঠোঁটের হাসিটা আরও চওড়া হলো। সে রান্নাঘরের কাউন্টার আর ক্যাবিনেটগুলো খুঁজতে খুঁজতে হঠাৎ থামল। তার চোখে পড়ল পাস্তার একটা প্যাকেট। প্যাকেটটা হাতে নিতেই রুদ্রর মনে পড়ে গেল বেশ কিছুদিন আগের এক রাতের কথা।
সেদিন রুদ্র বাইরে থেকে মদ্যপ অবস্থায় ফিরেছিল। আর মেহের কোনো অভিযোগ না করে নিজের হাতে পাস্তা বানিয়ে তাকে খাইয়ে দিয়েছিল। সেই রাতের পর রুদ্র আর কোনোদিন মদ ছুঁয়ে দেখেনি। জীবনের হতাশা যখনই তাকে আবার সেই অন্ধকারের দিকে টেনে নিতে চেয়েছে, যখনই বোতল হাতে তুলে নেওয়ার কথা ভেবেছে, ঠিক তখনই তার চোখের সামনে ভেসে উঠেছে মেহেরের সেই শান্ত, স্নিগ্ধ মুখটা।
রুদ্র কাটিং বোর্ডে পেঁয়াজ কাটতে শুরু করল। দক্ষ হাতে সবজিগুলো কুচাতে গিয়ে হঠাৎ খেয়াল করল, ভীষণ গরম লাগছে। বিরক্ত হয়ে গায়ের টি-শার্টটা খুলে একপাশে ছুড়ে ফেলল সে।
ওদিকে মেহেরের ঘুম ভাঙল মিনিট পনেরো-কুড়ি পর। পেটের তীব্র কামড় আর সহ্য করতে না পেরে সে চোখ মেলল। খালি পেটে এভাবে ঘুমানো সত্যিই অসম্ভব।
বিছানার দিকে তাকিয়ে দেখল রুদ্র এখনো ঘরে ফেরেনি। বাচ্চার গায়ে কাঁথাটা ঠিকমতো জড়িয়ে দিয়ে মেহের উঠে দাঁড়াল, তারপর ধীর পায়ে সিঁড়ি দিয়ে নিচে রান্নাঘরের দিকে নেমে গেল।
রান্নাঘরের কাছাকাছি আসতেই ভেতর থেকে একটা হালকা শব্দ ভেসে এল।মেহের তখনো ঘুম আর জাগরণের মাঝামাঝি এক ঝাপসা ভাব নিয়ে হাঁটছিল। রান্নাঘরে পা রাখতেই তার চোখ আটকে গেল সামনের দৃশ্যটার ওপর।
রুদ্র।
চুপচাপ দাঁড়িয়ে পাস্তা বানাচ্ছে। মেহের যে পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে, তা সে টের পায়নি। কিন্তু মেহেরের দৃষ্টি আটকে গেল রুদ্রর অনাবৃত সুঠাম পিঠের ওপর। প্রশস্ত কাঁধ, পিঠের স্পষ্ট খাঁজ আর আলো-আঁধারিতে ফুটে ওঠা পেশিগুলো লোকটাকে অদ্ভুত রকমের আকর্ষণীয় করে তুলেছে। পিঠে জমে থাকা হালকা ঘামের বিন্দুগুলো রান্নাঘরের মৃদু আলোয় চিকচিক করছে।
মেহের নিষ্পলক তাকিয়ে রইল। এত সুদর্শন পুরুষ সে আগে কখনো দেখেছে কি না, মনে করার চেষ্টা করেও মনে করতে পারল না। আজ রুদ্রকে যেন একদম অন্যরকম লাগছে। চোখ সরাতে চাইল সে, কিন্তু পারল না। বরং বুকের ভেতরে অচেনা এক অনুভূতির দোলাচল শুরু হলো।
মেহের অজান্তেই শুকনো ঢোক গিলল।
ঠিক তখনই রুদ্র পাস্তাভর্তি একটি প্লেট হাতে নিয়ে মেহেরের দিকে ঘুরে দাঁড়াল। সে ভাবেনি মেহের এত রাতে ঘুম থেকে উঠে নিচে চলে আসবে। তবে অবাক হলেও সেটা মুখে প্রকাশ করল না। দুজন মানুষের চোখ যখন এক হলো, মেহেরের বুকের ভেতরটা আবারও কেঁপে উঠল।
রুদ্রর ঠোঁটের কোণে সেই চেনা বাঁকা হাসিটা ফুটে উঠল। যেন মেহেরের চোখে লুকিয়ে থাকা বিস্ময়টুকু সে বেশ বুঝতে পেরেছে। মেহেরের চোখের সেই অকপট বিস্ময়টুকু সে বেশ উপভোগ করছে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই রুদ্র নিজের ভেতরের অনুভূতিটা স্বাভাবিক করে নিল।
তারপর প্লেটটা মেহেরের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে রুদ্র অত্যন্ত স্বাভাবিক, অথচ সম্মোহনী ভঙ্গিতে বলল,
“হাই, সুইটহার্ট।”
‘সুইটহার্ট’… শব্দটা মেহেরের কানে ঘণ্টার মতো বাজতে লাগল। আগে রুদ্র যখনই তাকে কোনো নামে ডাকত, তার মধ্যে এক ধরনের তাচ্ছিল্য আর বাঁকা হাসি থাকত। কিন্তু আজকের এই ডাকের মধ্যে যেন এক জাদুকরী টান লুকিয়ে আছে!
মেহের ঝটপট চোখ নামিয়ে নিল।
রুদ্র হালকা হেসে প্রশ্ন করল, “কখন উঠলে? খুব খিদে পেয়েছে, তাই না? তখনই তো বললাম কিছু খেয়ে নিতে…”
পাস্তার প্লেটটা মেহেরের হাতের কাছে এগিয়ে দিয়ে বলল, “এই নাও, খেয়ে নাও।”
মেহের রুদ্রর চোখের দিকে বড় বড় ডাগর চোখে তাকিয়ে বলল, “আপনি… আপনি বানিয়েছেন এটা? আমার জন্য?”
রুদ্র গম্ভীর হওয়ার ভান করে বলল, “পাগল নাকি? তোমার জন্য কেন বানাতে যাব? নিজের জন্যই বানাচ্ছিলাম। কিন্তু তুমি যেভাবে তাকাচ্ছ… যদি আমার পেটে ব্যথা করে! তাই দিয়ে দিলাম। নো রিস্ক!”
মেহের কপাল কুঁচকে তক্ষুণি প্লেটটা রান্নাঘরের কাউন্টারে রেখে দিল। সে রুদ্রর পাশ দিয়ে গিয়ে অন্য খাবারের খোঁজ করতে করতে বলল,
“আমি এটা খাব না। অন্য কিছু খেয়ে নিচ্ছি। আপনি যদি এতে বিষ-টিশ মিশিয়ে দেন…?”
রুদ্র হালকা হেসে উত্তর দিল, “তাহলে কালকের পেপারে হেডলাইন হবে—‘ প্রেমের টানে স্বামীর হাতের বিষ পান করলেন ২০ বছরের এক তরুণী’”
মেহের রুদ্রর এই কথায় কোনো পাত্তা দিল না, বরং আরও বিরক্ত হলো। কিন্তু মুশকিল হলো, চারপাশ খুঁজেও কোনো তৈরি খাবার পাওয়া গেল না। সারাদিন বাড়িতে কেউ ছিল না তাই হয়তো কোনো খাবার নেই, আর থাকলেও খাবার কোথায় রাখা আছে তা মেহেরের জানা নেই।
রুদ্র শান্ত হয়ে মেহেরের এই পাগলামি দেখছিল। মেহের শেষমেশ ফ্রিজ থেকে ঠাণ্ডা পানির বোতল বের করে কয়েক ঢোক খেয়ে নিল। মনে মনে ঠিক করল, আজকের রাতটা কোনোমতে কেটে যাক, সকালে উঠে খেয়ে নেবে।
সে কিচেন এরিয়া থেকে পা বাড়িয়ে বেরিয়ে যেতে চাইল। কিন্তু ঠিক তখনই অনুভব করল, পেছন থেকে কেউ শক্ত করে তার হাত চেপে ধরেছে।
মেহের রেগেমেগে রুদ্রর দিকে ফিরে তাকাতে যাবে, তার আগেই রুদ্র তাকে শূন্যে তুলো ধুনোর মতো পাঁজাকোলা করে তুলে নিল!
হঠাৎ করে কী ঘটে গেল, মেহের তা বুঝে ওঠার সুযোগই পেল না। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে সে আবিষ্কার করল, সে রান্নাঘরের একটা চেয়ারে বসে আছে!
রুদ্র ধমকের সুরে বলল, “বললাম না, চুপচাপ খেয়ে নাও! অবাধ্যতা আমার একদম পছন্দ না।”
মেহের ঢোক গিলল। তার চোখ গিয়ে পড়ল রুদ্রর অনাবৃত চওড়া বুকের ওপর। সে তড়িঘড়ি চোখ সরিয়ে নিয়ে বলল, “আপনার সাথে আমি পরে কথা বলছি! আগে জামাকাপড় পরে আসুন তো!”
রুদ্র নিজের খালি গায়ে একবার চোখ বুলালো। তারপর কাউন্টারে পড়ে থাকা টি-শার্টটা এক হেঁচকা টানে গায়ে গলিয়ে নিল। তার ঠোঁটের কোণে আবারও সেই বাঁকা হাসি ফুটল, গালে আবছা টোল দৃশ্যমান হয়ে উঠল।
সে মেহেরের ঠিক পাশের চেয়ারটা টেনে এনে একদম মুখোমুখি বসল। মেহের অনর্থক লজ্জা পেয়ে নিজের ওড়নার কোণ আঙুলে পেঁচাতে শুরু করল। রুদ্রর দিকে সে চোখ তুলে তাকাতেই পারছে না।
রুদ্র হঠাৎ মেহেরের চেয়ারটা এক টানে নিজের আরও কাছে নিয়ে এল। যে দু-হাতের দূরত্ব ছিল, তা নিমেষেই উবে গেল।
মেহের আকস্মিক এই টানে রুদ্রর বুকের ওপর পড়তে পড়তে নিজেকে সামলে নিল। রুদ্র নিজের মুখের ভাব একদম স্বাভাবিক রেখে পাশের প্লেট থেকে এক চামচ পাস্তা তুলে নিল। তারপর এক হাতে মেহেরের দুটি হাত শক্ত করে ধরে রাখল, যাতে মেহের নড়েচড়ে না পারে।
” হা করো “রুদ্র বেশ গম্ভীর কণ্ঠে একদৃষ্টিতে মেহেরের দিকে তাকিয়ে বলল।
মেহের মুখ ফিরিয়ে নিয়ে চোখ-মুখ কুঁচকে রইল। এই লোকের হাতের খাবার সে কোনো অবস্থাতেই খাবে না! যত খিদেই পাক না কেন!
রুদ্র চামচটা মেহেরের ঠোঁটের কাছে এনে আবারও সেই গমগমে গলায় বলল, “আমি কি বলিনি, অবাধ্যতা আমার একদম পছন্দ না? হা করো বলছি!”
রুদ্রর স্বরের সেই কর্তৃত্ব দেখে মেহের কিছুটা ভয় পেয়ে গেল। এত রাতে যদি চেঁচামেচি শুনে বাড়িতে কেউ চলে আসে?
সে ধীরে ধীরে মুখ হা করে পাস্তাটুকু মুখে নিল। মেহের খাবার মুখে নিতেই রুদ্রর যে হাতটি মেহেরকে শক্ত করে ধরে রেখেছিল, তা শিথিল হয়ে এল। রুদ্র শান্ত দৃষ্টিতে মেহেরের দিকে তাকিয়ে রইল। মেহেরের চিবুক ধরে সে আবার এক চামচ খাবার তার মুখে তুলে দিল।
ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ৪৭
খাবার অর্ধেকের বেশি শেষ হওয়ার পর মেহের ছোট শিশুর মতো বিড়বিড় করে উঠল, “আমি… আমি আর খাব না। ক্যাপ্টেন সাহেব!দেখুন না, আর নড়তে-চড়তে পারছেন না। একটা মানুষ এত খাবার খায় কীভাবে? ”
রুদ্র চামচটা প্লেটে রেখে মেহেরের দিকে একপলক তাকাল। তারপর পরম তৃপ্তির নিঃশ্বাস ফেলে বলল, “ওকে।”
