বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৯৯
রানী আমিনা
প্রায় সপ্তাহ খানেক তীব্র জ্বরে বিছানায় পড়ে থাকার পর আনাবিয়া আজ একটু সুস্থ হলো। উত্তাপ কমেছে শরীরের, তবে দুর্বলতা কাটেনি৷ মুখে রুচি নেই বিন্দুমাত্র, কিন্তু মীর তার রুচির তোয়াক্কা করছে না। যখন যেটা পারছে ওকে জোর জবরদস্তি গিলিয়ে দিয়ে চলে যাচ্ছে। আনাবিয়ার গিলতে মন চাইছেনা কোনো খাবার, কিন্তু মীর পারলে আঙুলে ঠেসে ওর গলা দিয়ে নামিয়ে দেয়। সাথে আছে ওর ছেলে গুলো, এগুলো যে বড় হয়ে বাবারই একেকটা জেরক্স কপি হবে সেটা আনাবিয়া এই ক’দিনেই বুঝেছে৷ ওদের অতিরিক্ত ভালোবাসায় রীতিমতো অতিষ্ঠ হয়ে গেছে আনাবিয়া, দু’দন্ড স্বস্তি নেই, কোনো প্রাইভেসি নাই। ওকে কেউ এক মুহুর্তের জন্যও একা ছাড়ছে না।
এই মুহুর্তে কাসওয়ার আর জিবরান মিলে ওর পায়ের তলায় তেল ঘষছে, আনাবিয়ার সুড়সুড়ি লাগছে কিন্তু মানা করলেও শুনছেনা৷ আনাবিয়া পা সরিয়ে নিতে গেলে কাসওয়ার ওর পা আঁকড়ে ধরে বলে উঠলো,
”আম্মা, হেকিম বলেছে হাত পায়ের তলায় তেল ঘষে দিলে ঘুম ভালো হয়। আপনি একদম বাধা দিবেন না, চুপচাপ বসে থাকুন।”
“আমি আর কত ঘুমোবো? সারাদিনই তো ঘুমাচ্ছি! ঘুমোতে ঘুমোতে আমার ঘুমই নাই হয়ে গেছে। আমি একটু যে বাইরে বের হব সেটাও হতে দিচ্ছ না তোমরা!”
অতিষ্ঠ স্বরে বলে উঠলো আনাবিয়া। জিবরান ওর পায়ের আঙুল টেনে দিতে দিতে বলল,
“আবহাওয়া ভালো নয় বেশি, আকাশে অনেক মেঘ। যেকোনো সময় ঝুম করে বৃষ্টি আসবে। আপনাকে এখন কোনোভাবেই বাইরে যেতে দেওয়া হবে না। বাবা শুনলে আমাদের চাবকাবে।”
“অল্প একটু যাব, একদম ২ মিনিট। বাবা জানবে না কিছু।”
“আমরা জানিয়ে দিব।”
নির্বিকার স্বরে বলল কাসওয়ার।
আনাবিয়া দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো। লোকে ঠিকই বলে, ঘরের শত্রু বিভীষণ। ওদের কথার মাঝেই কামরায় এলো সাইয়্যিদ, হাতে ট্রে। সেটা আনাবিয়ার পাশে রেখে বলে উঠলো,
“আম্মা, এই গরম দুধ টুকু খেয়ে নিন। এতে হেকিম সাহেব কি কি জানি মিশিয়েছেন, খেতে যেন খারাপ না লাগে তাই ভ্যানিলা এসেন্স দিয়েছেন। বলেছেন এটা খেলে আপনি একদম টকাস করে সুস্থ হয়ে যাবেন।
“সুস্থ হওয়ার সময় কি টকাস করে শব্দ হবে?”
জিজ্ঞেস করলো কাসওয়ার।
সাইয়্যিদ চোখ গরম করে তাকালো ওর দিকে। কাসওয়ার চোখ সরিয়ে নিয়ে গলা খাকারি দিয়ে নিজের কাজে মন দিলো। আনাবিয়া ঠোঁট কামড়ে হাসি আঁটকে রেখেছিলো, সাইয়্যিদ যেন দেখতে না পায় তাই দ্রুতই উঠিয়ে নিলো গ্লাস। ঢকঢক করে গিলে ফেললো পুরোটা৷ তারপরেই জিজ্ঞেস করলো,
“তোমাদের বাবা কোথায়?”
“বাবা একটা জরুরী মিটিংয়ে আছেন, চলে আসবেন হয়তো রাত নামার আগেই৷ আরসালান আর মিশআল সাথে আছে তাঁর৷”
উত্তর দিল সাইয়্যিদ।
আনাবিয়া পা জোড়া গুটিয়ে নিল তখন, কাসওয়ার আর জিবরানের উদ্দ্যেশ্যে বলে উঠলো,
“হয়েছে হয়েছে, আর ঘষাঘষি করতে হবে না। তোমরা তোমাদের কাজে যাও।”
“কাজেই আছি আম্মা, বাবা বলে গিয়েছেন তিনি অনুপস্থিত থাকা কালীন যেন আমরা আপনার সাথে লেগে থাকি।”
“লেগে থাকতে বলেছে বলে তো এই না যে একদম চিপকে থাকবে আমার সাথে। এখনি নিজেদের কামরায় যাও, আমি একটু একা একা থাকব। গেট আউট!”
শেষোক্ত কথাটা তুড়ি বাজিয়ে বলল আনাবিয়া। কাসওয়ার দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে জিবরানের দিকে তাকালো একবার, তারপর উঠে পড়লো দুজনেই। সাইয়্যিদ কে সাথে নিয়ে বেরিয়ে যেতে যেতে বলল,
“বাইরেই আছি আম্মা, কোনো প্রয়োজন হলে অবশ্যই টকাস করে ডাকবেন।”
সাইয়্যিদ আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে চাটি মারলো ওকে। তিনজনে কুস্তি লড়তে লড়তে বেরিয়ে গেলো কামরা থেকে। আনাবিয়া হাফ ছেড়ে বাঁচলো যেন! গরম দুধটা খাওয়ার পর একটু ভালো লাগছে। এতক্ষণ চোখ জোড়া জ্বালা করছিলো এখন সেটাও হ্রাস পেয়েছে৷ বিছানা ছেড়ে উঠলো ও, জানালার কাছে গিয়ে দেখলো বাইরেটা। বিকেল হলো সবে, অথচ গাঢ় মেঘের কারণে মনে হচ্ছে সন্ধ্যে হয়ে এসেছে। জোরালো বাতাস বইছে বাইরে, ঝড়ো বাতাসে সজোরে উড়ে চলেছে শুকনো পাতা গুলো। দূরের কোন সাকুরা গাছের গোলাপ রঙা ফুল গুলো বাতাসে উড়ে চলেছে সমস্ত আকাশ জুড়ে। কাজলা মেঘের বুকে সেগুলো যেন এঁকে চলেছে কোন এক অপরূপ সৌন্দর্যের বাহার।
লোভ সামলাতে পারলোনা আনাবিয়া। দরজার দিকে দেখলো একবার, ওপাশেই শোনা যাচ্ছে ওর ছেলেদের অস্পষ্ট, এলোমেলো কথা। এটাই সুযোগ!
ওয়ারড্রব থেকে একটা পাতলা চাদর বের করে জড়িয়ে নিয়ে গেলো গায়ে, তারপরেই বেলকনির দরজা খুলে নিঃশব্দে নেমে গেলো রাজমহল ছেড়ে। আর তারপরেই বন্য ঝর্ণার ন্যায় খলবলিয়ে ছুটে গেলো জঙ্গলের ভেতর!
আসন্ন বৃষ্টির সতর্কবার্তা ছড়িয়ে দিতে দিতে আকাশে উড়ে চলেছে ঝাঁকে ঝাঁকে জংলী পাখি। তাদের অর্থহীন কিচিরমিচিরে মুখোরিত হয়ে আছে সম্পুর্ন ডাস্কমায়ার জঙ্গল। নেকড়ে গুলো এই অবেলায় ঘরে ফিরে যেতে চাওয়া খরগোশ আর বনমোরগ গুলোকে শিকার করতে ওত পেতে আছে যেখানে সেখানে। বিষধর সাপ গুলো লতাপাতা, ঝোপঝাড়ের আড়ালে অপেক্ষায় আছে বৃষ্টি নামার, যখন গর্তে পানি ভর্তি হয়ে ভূপৃষ্ঠে উঠে আসবে সকল শিকার!
আনাবিয়া গায়ে চাদরটা আঁকড়ে ধরে উচ্ছ্বসিত ভঙ্গিতে এগিয়ে চলেছে সম্মুখে, যেন এক উন্মুক্ত বিহঙ্গ যার সম্মুখে শুধুই খোলা আকাশ, নেই কোনো বাধা; কোনো বিপত্তি। কোথায় যাচ্ছে জানেনা ও, কিন্তু চোখ জোড়া খুঁজে চলেছে মহল থেকে দেখতে পাওয়া সাকুরা গাছটিকে৷ চতুর্দিকে মুগ্ধ চোখে দেখতে দেখতে সে আরও জোরে ছুটতে শুরু করলো সামনে। শুভ্র চুল গুলোও যেন বিদ্রোহী হয়ে স্বর্ণ কাটাটিকে ছুড়ে ফেলে দিল ভেজা মাটিতে, উন্মুক্ত হয়ে গা ভাসিয়ে দিলো উন্মত্ত বাতাসের স্রোতে৷
ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে থাকা নেকড়ে গুলো হাড়হিম গলায় ডেকে উঠলো একে একে, যেন সতর্ক করে চলল ডাস্কমায়ারের কোণে কোণে লুকিয়ে থাকা সমস্ত হিংস্র, চতুষ্পদী জন্তু গুলোকে তাদের শেহজাদীর আগমণের ব্যাপারে।
আকাশের দিকে মুখ তুলে এগিয়ে চলা আনাবিয়ার কোলের ভেতর আচমকা ছুটে এসে লাফিয়ে পড়লো একটা ছোট্ট খরগোশের ছানা। তার পেছনে তীব্র বেগে ছুটে আসতে থাকা শিকারি নেকড়েটা ওকে দেখেই থমকে গেলো তৎক্ষণাৎ, দ্বিতীয় পদক্ষেপের সাহস করলো না। মাথা নুইয়ে আনুগত্যের সাথে ধীর পায়ে পিছিয়ে গেলো ঝোপের ভেতর।
ছোট্ট খরগোশটি নুয়ে যাওয়া শিকারির দিকে একবার দৃষ্টি দিয়ে মৃদু, পৈশাচিক হাসলো বোধ হয়, তারপর পরম নিশ্চিন্তে আনাবিয়ার আলিঙ্গণের ভেতর গা এলিয়ে দিল। আনাবিয়া ওকে বুকে চেপে ধরে এগোলো জঙ্গলের আরও গভীরে, একটা ছোট্ট সঙ্গী নিয়ে জঙ্গল ঘোরা মন্দ হবে না৷
তুমুল বৃষ্টিতে আশেপাশে কিছু দেখতে পাওয়া দায়, আঁধারে আঁটা জঙ্গল যেন বৃষ্টির কারণে আরও ধোঁয়াশা হয়ে উঠেছে৷ বন্য সাকুরাটার পাশের বিরাট রেড উড গাছের গায়ের একটা ছোট্ট কোটরে আঁটসাঁট হয়ে বসে আছে আনাবিয়া, ওর কোলের ভেতর গুটিয়ে আছে ছোট্ট খরগোশটা। আনাবিয়ার মুগ্ধ চোখ জোড়া দেখে চলেছে মুষলধারে বৃষ্টি। এই ঝুম বৃষ্টিতে তাকিয়ে ওর মনে পড়লো, বাচ্চা বয়সে একবার মীরের সাথে রেড জোনে এমন বৃষ্টিতে আঁটকা পড়ার পর মীরের কাঁধের ওপর ভর দিয়ে বসে বৃষ্টি দেখতে দেখতে জিজ্ঞেস করেছিলো,
“আচ্ছা মীরি, ইংরেজিতে মুষলধারে বৃষ্টিকে ক্যাটস অ্যান্ড ডগস বলা হয় কেন? ওদের ওদিকে কি বৃষ্টির সাথে কুত্তা বিড়াল পড়ে আকাশ থেকে?”
মীর হো হো করে হেসেছিলো তাতে, আনাবিয়া বেজার হয়ে টেনে ধরেছিলো ওর চুল, মীর ওর রাগ প্রশমন করে ওর ফোলা গাল টিপে দিয়ে বলেছিলো,
“কুকুর বিড়াল পড়তো, তবে আকাশ থেকে নয়। এই ইডিয়মসের পেছনে প্রচলিত গল্প গুলোর একটি হলো এমন, প্রাচীন ইংল্যান্ডের অনেক বাসা বাড়ির ছাদ ছিলো খড়ের তৈরি। যখন প্রচন্ড বৃষ্টি হতো তখন ছাদে ঘুমিয়ে থাকা কুকুর বেড়ালেরা অনেক সময় খড় থেকে পিছলে পড়ে যেত। তাতেই বোঝা যেত জম্পেশ বৃষ্টি হয়েছে। সেখান থেকেই এটার উৎপত্তি বলে ধারণা করা হয়।”
“তুমি এত কিছু কিভাবে জানো? তোমার ওই বড় বড় বইগুলোতে এসব লেখা থাকে?”
“হু।”
নিজের প্রতিটা অজানা, উদ্ভট প্রশ্নের উত্তর জানার পর আনাবিয়া নিজের হীরকখন্ডের ন্যায় ঝলমলে চোখ জোড়া দিয়ে আগ্রহভরে দেখতো মীরকে, অত বড় বড় বইগুলো আত্মস্থ করা এই একান্ত আপনার লোকটিকে তখন তার ছোট্ট মস্তিষ্ক এক রহস্যময় জ্ঞানভান্ডার হিসেবে ঘোষণা করে দিত। তার সব প্রশ্নের উত্তর দিতে পারা এক সবজান্তা, তার সমস্ত ইচ্ছে গুলো এক নিমিষে পূরণ করে ফেলা এক আলাদিনের জ্বীন!
মৃদু হাসি ফুটলো আনাবিয়ার ঠোঁটের কোণে, মীর মহলে ফিরে ওকে না পেলে কি করবে ভেবে দুষ্টু হাসিতে ভরে গেলো মুখ৷ কোটরের ভেতর জেঁকে বসলো আরও। বৃষ্টির ছাট থেকে বাঁচতে একটা ব্লাক মাম্বা সেই মুহুর্তেই উঁকিঝুঁকি মারলো কোটরের ভেতর, আনাবিয়াকে দেখে থমকালো ক্ষণিক। হয়তো ফিরে যেতে নিল অন্যদিকে, কিন্তু আনাবিয়া আচমকা ওর গলা ধরে টেনে নিলো কোলের ভেতর। বেচারা বাধ্য ছেলেটির মত চুপচাপ খরগোশটির গায়ের সাথে গা লাগিয়ে শুয়ে রইলো। এই মুহুর্তে শিকার এবং শিকারীর সকল শত্রুতা মুলতবি হলো যেন। ক্রমে ক্রমে কোটরে জমা হলো আরও কয়েকটা প্রাণ; একটা পেঁচা, একটা ছোট্ট গেছো ব্যাঙ, এক জোড়া কাঠবিড়ালি আর একটা র্যাকুন। সকলে অধীর আগ্রহে চেয়ে রইলো ঝমঝমানো বৃষ্টির দিকে, আনাবিয়ার শরীরের ওমে চোখ বুজে আসতে রইলো ওদের।
আনাবিয়ার এই গাদাগাদি বসবাস ভালো লাগলো প্রচন্ড। এক অজানা স্বস্তি, শান্তিতে ভরে গেলো ওর মন৷ মেঘ ডাকছে ক্ষণে ক্ষণে, আকাশ চিরে বিদ্যুৎ চমকে চলেছে। কাঠবিড়ালি দুটো ওর চাদরের নিচে ঢুকে যাওয়ার আপ্রাণ চেষ্টায় ব্যাস্ত। আনাবিয়া বাধা দিল না ওদের, পরম যত্নে চাদরে মুড়ে নিলো প্রানী দুটোকে।
অকস্মাৎ ধকধকিয়ে উঠলো ওর হৃৎপিণ্ড! আনাবিয়া চমকে এদিক ওদিক তাকাতেই কোটরের সম্মুখে আবিষ্কার করলো একটি সুউচ্চ, প্রশস্ত, জলে সিক্ত অবয়ব। বিদ্যুৎ চমকালো তৎক্ষনাৎ! সাদা আলোয় কয়েক সেকেন্ডের জন্য দৃশ্যমান হলো ব্যাক্তিটির চিন্তিত, শঙ্কিত, কঠিন মুখাবয়ব। জ্বলে উঠলো স্বর্ণাভ চোখ জোড়া৷
ঢোক গিললো আনাবিয়া। মিইয়ে গিয়ে মিশে যেতে চাইলো যেন কোটরের ভেতরের অন্ধকারে। কোলের ভেতর নড়েচড়ে উঠলো খরগোশ ছানাটি। স্বর্ণাভ দৃষ্টি ওর মুখের ওপর থেকে অপসারিত হয়ে পড়লো সফেদ প্রানীটির ওপর।
এগিয়ে এলো মীর, ওকে এগোতে দেখেই আসন্ন বিপদ টের পেয়ে ফণা তুললো ব্লাক মাম্বাটি। কিন্তু হিসহিসানি থেমে গেলো মাঝ পথেই! মীর ওর গলা ধরে উঁচু করে সজোরে ছুড়ে মারলো কোথাও, বিস্তৃত জঙ্গলের ভেতর যেন অস্তিত্বহীনের ন্যায় অদৃশ্য হয়ে গেলো সেটি।
অন্য সময় হলে প্রতিবাদ করতো আনাবিয়া, কিন্তু এই মুহুর্তে মীরের মুখভঙ্গি ওকে প্রতিবাদ করার স্পর্ধা দিলনা। চুপচাপ বসে দেখতে রইলো মীরের কীর্তি। একে একে সবগুলোর গলা ধরে এদিক ওদিক ছুড়ে দিয়ে সবশেষে ব্যাঙটাকে হাতের ভেতর চেপে গেলে দিলো সে৷ তারপর ওর গলে যাওয়া নাড়িভুঁড়ি আনাবিয়ার সম্মুখে ধরে কড়া স্বরে বলল,
“নেক্সট টাইম এভাবে কাউকে না বলে এদিক ওদিক পালিয়ে গেলে এগুলো খাইয়ে দিব, মনে থাকে যেন।”
আনাবিয়া উপর নিচে মাথা নাড়লো তৎক্ষনাৎ। মীর হাত থেকে নোংরা ঝেড়ে ফেলে বৃষ্টির পানিতে ধুয়ে ফেললো। আনাবিয়ার কপাল স্পর্শ করে দেখলো তাপমাত্রা কেমন। এখনো যথেষ্ট তাপ। আকাশের দিকে দেখলো সে একবার, বৃষ্টি থামার কোনো সম্ভাবনা নেই। এভাবেই হয়তো সারা রাত বৃষ্টি হয়ে যাবে৷
মীর প্যান্টের পকেট থেকে বের করলো একটা স্বচ্ছ রেইনকোট। আনাবিয়ার দিকে ছুড়ে দিয়ে বলল,
“পরে নাও, কুইক। দুই মিনিট সময় দিলাম।”
“দুই মিনিটের বেশি লাগলে কি হবে?”
“তোমাকে খেয়ে ফেলবো।”
“কোন খাওয়া? রান্না করে খাওয়া নাকি….. ইয়া মানে…ওই আরকি..৷”
মীর ওর দিকে কড়া চোখে তাকিয়ে বলে উঠলো,
“বেশি কথা না বলে দ্রুত কাজ শেষ করো।”
আনাবিয়া হাত চালালো। মীর সত্যিই রেগেছে, এখন ওকে একদমই খোচানো ঠিক হবে না। সত্যি সত্যি রান্না করে খেয়ে ফেললে তখন আর এক সমস্যা।
রেইনকোট পরা হলে মীর কোটর থেকে টেনে বের করলো ওকে, নিচে নামিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
“হাটতে পারবে?”
“না, আমার তো পা নেই। আমি তো সাপ।”
বলেই এগোতে রইলো আগে আগে। মীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে চলল ওর পেছন পেছন। কিন্তু কিছুদূর যাওয়ার পরেই কাঁদায় দেবে যেতে রইলো আনাবিয়ার পা৷ এখানের মাটি যে এত নরম হবে আনাবিয়া ঘূর্ণাক্ষরেও টের পায়নি। বড় বড় পা ফেলে এগোতে শুরু করলো ও এবার, কিন্তু তাতে যেন দেবে যাওয়ার পরিমাণ বাড়লো আরও।
আরও কয়েক কদম গিয়ে অসহায় চোখে পেছনে মীরকে দেখলো ও। মীর ওকে পাশ কাটিয়ে এগোতে এগোতে বলে উঠলো,
“হ্যাঁ, তুমি তো সাপ। বুকে ভর দিয়ে এঁকে বেঁকে যাও, আমার দিকে তাকিয়ে থেকে কোনো লাভ নাই।”
আনাবিয়া গাল ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো সেখানেই। মীর আরও কয়েক কদম এগোনোর পর পেছনে ফিরে দেখলো। ওকে পিছে তাকাতে দেখে আনাবিয়া যেন পা জোড়া আরও ভরে দিল কাদার ভেতর। মীর ঠোঁট গোল করে দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো তাতে। এগিয়ে এসে তুলে নিলো কোলে। আনাবিয়া বত্রিশ পাটি দাঁত মেলে হেসে গলা জড়িয়ে ধরলো ওর৷
“পারোতো শুধু এটাই।”
ওকে দুহাতে ভালোভাবে জড়িয়ে নিয়ে বলল মীর৷ আনাবিয়া তিরিক্ষি গলায় বলে উঠল,
“শুধু এটাই পারি মানে কি?”
“হাসি দিয়েই সব সমস্যার সমাধান করে ফেলতে পারো, বিরাট গুণ অর্জন করেছো।”
“হাসি দিয়েই যদি সব সমস্যার সমাধান হয় তবে আমি হাসিই তো দিব নাকি! খামোখা কষ্ট কেন করতে যাব।”
“ভালো যুক্তি। এমন যদি আমার হাসিতেও সব সমস্যার সমাধান হতো বেঁচে যেতাম। বসে বসে খেতাম।”
“তোমার যে হাসি! এভাবে দাঁত মেললে লোকে ভাবতো তুমি নরখাদক। তখন সমস্যা আরও কয়েকটা বেড়ে যেতো। তাই তোমার কষ্ট করে খাওয়া ছাড়া উপায় নেই। রিয়েলিটি মেনে নাও।”
“নিলাম। তোমার হাসিই যথেষ্ট সমস্যা সমাধানের জন্য, আমার গুলোও।”
মীরের শেষোক্ত কথার পর নিরব হলো ওরা দুজনেই। আনাবিয়া চুপচাপ ওর গলা জড়িয়ে ধরে পড়ে রইলো। মীর ধীর বেগে পা ফেলে চলল, যেন এই মুহুর্তটা আরও অনেক অনেক ক্ষণ থেকে যায়। আনাবিয়া কান পেতে রইলো মীরের বুকে, ওর হৃৎপিণ্ডের ধকধক ধ্বনি যেন তালে তালে এসে বাড়ি খেতে রইলো ওর চোয়ালে। টিপ টিপ বৃষ্টি পড়তে রইলো ওদের দুজনের শরীরে, আপাদমস্তক রেইনকোটে মোড়া আনাবিয়া উপভোগ করতে রইলো তার স্বচ্ছ রেইনকোটে পড়তে থাকা বৃষ্টির ফোটা গুলো। আচমকা উপলব্ধি হলো, মীর তার এই রেইনকোটটিরই মত। তার স্বচ্ছ ঢাল ওকে এই বৃষ্টিমুখর দৃশ্য গুলো উপভোগ করতে দিলেও কোনো বৃষ্টি ফোটাকে স্পর্শ করতে দেয়না ওর দেহ।
জমে থাকা বৃষ্টি ফোটা গুলো ভারী হয়ে গড়িয়ে পড়তেই আনাবিয়া চোখ তুলে তাকালো মীরের দিকে। হাত বাড়িয়ে স্পর্শ করলো মীরের রুক্ষ চোয়াল। ওর অনাকাঙ্ক্ষিত এই নরম স্পর্শ যেন অকস্মাৎ গলিয়ে ফেললো মীরের সমস্ত কঠিন সত্তা! ফিরতি দৃষ্টি রাখলো সে আনাবিয়ার ঝলমলে চোখে। স্নিগ্ধ, মায়াভরা চোখজোড়া যেন গলিয়ে দিলো ওর হৃৎপিণ্ড পর্যন্ত। আনাবিয়াকে নিকটে নেয়ে মীর সশব্দে চুমু খেলো ওর কপালে। আনাবিয়া চোখ জোড়া বন্ধ করে নিলো ভালোলাগায়, মীরের বুকে এলিয়ে দিলো শরীরের সমস্ত ভর!
ক্ষণিক পরেই মীর বলে উঠলো,
“কালকেই প্রাসাদে ফিরছি আমরা, তোমার জিনিস পত্র গুলো হয়তো এতক্ষণে প্যাক করা শেষ। গিয়ে একটু দেখে নিবে, প্রয়োজনীয় কিছু বাদ পড়লে নিয়ে নিবে।”
“আমি কেন যাব? আমি তো আর দেমিয়ান নই, তাইনা! আমি তো এখন সাধারণ নাগরিক, প্রাসাদে আমার জন্য কোনো জায়গা নেই৷”
বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৯৮ (২)
“কে বলেছে?”
“আমি বলছি, তুমিও জানো।”
“তুমি আগেও দেমিয়ান ছিলে, এখনো দেমিয়ান, ভবিষ্যতেও থাকবে৷”
“সেটা ব্লাডে, কাগজে কলমে তো আর নই।”
“কাগজে কলমেও।”
