Home সাঁঝের মায়া সাঁঝের মায়া পর্ব ৭০ (২)

সাঁঝের মায়া পর্ব ৭০ (২)

সাঁঝের মায়া পর্ব ৭০ (২)
দুর এ দিলশাদ্ দুআা

খানিক আগের তাঁরা ঝলমলে আকাশে ঘন কালো মেঘের ঘনঘটা এখন । চাঁদ তাঁরা বিদায় নিয়েছে মেঘের আড়ালে । বিশাল আকাশের বুক চিড়ে সরু সরু আলোর ঝলকানি দেখতে পাওয়া যাচ্ছে বেশ ঘনঘন। যেকোনো মূহুর্তে প্রকৃতি তান্ডব শুরু করে দেবে, সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না আর । এলোমেলো বাতাস বইছে সে-ই সন্ধ্যা থেকে। সেটার মাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঝড়ের পূর্বাভাসও জোরালো হচ্ছে বেশ করে। রাহাতকে থানায় নিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি চলছে। শ দুয়েক পুলিশ ইতিমধ্যেই ঘেরাও করে রেখেছে গোটা কটেজ। সাভারের শুনশান এই এলাকা এখন পুলিশের পদচারণায় মুখর বলা চলে। ভোর হওয়ার আগেই লোকসমাগম এড়িয়ে আসামীকে থানার নেওয়ার পরিকল্পনা চলছে । ওপর মহল থেকে এরকমই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে ।

আসামীকে ধরার পুরো ক্রেডিট এনআইবির হলেও, ঈশান সন্তর্পণে সেটা সাজিদকে দিতে চায় । প্রথমত নিজের পরিচয় জনসম্মুখে আনতে পারে না সে। এই মিশনের পর ওপর মহল তার পরিচয় সবাইকে জানানোর পরিকল্পনা করলেও, ঈশান তাতে পাত্তা দেয়নি মোটেই। আন্ডারকভার অফিসার হয়ে থাকার সুবিধাও নেহাৎ কম নয়। স্বাভাবিক জনগনের মতো চলাফেরা তার। রাহাত কে ধরার পর, সে সবার সামনে আসলে প্রেস মিডিয়ার নিউজের চক্করে, তার স্বাভাবিক জীবন যাপন অসম্ভব হয়ে দাড়াবে একপ্রকার। তাছাড়া চাকরির শুরুতেই প্রথম কেস ছিলো এটা তার। এর মাঝে ছোট বড় আরও অনেক তদন্ত করলেও, কেস সলভ করলেও মূলত এই কেসের দায়িত্ব নেওয়ার মাধ্যমেই যাত্রা শুরু হয়েছে তার। গোটা ক্যারিয়ার সামনে পরে রয়েছে। যেভাবে আছে, সেভাবেই যাত্রা চালিয়ে নিতে চায় সে। ঈশান ক্রমাগত ফোনকলে ব্যাস্ত। নিজের ফোর্স সহ, সকল টিম কে জোরালো নির্দেশনা দেওয়া আছে, রাহাতকে থানায় নেওয়ার আগ অবধি, কিছুতেই যেনো এই তথ্য প্রেসের কাছে না পৌছায়। পুলিশ বা আইনের তরফ থেকে একদম গোছানো কোনো বয়ান তৈরি না হওয়া পর্যন্ত বিষয়টা গোপনীয়ই রাখতে চায় সে। প্রেস মিডিয়া ফেক নিউজ তৈরিতে ওস্তাদ।

নাঈম, নিয়াজ আলাদা গাড়িতে দু’জন পুলিশ পাহারায় – তমা আর তিতির কে নিয়ে রওনা দিয়েছে শহরের উদ্দেশ্য। আরও খানিকটা আগেই রওনা দেওয়ার কথা থাকলেও, দেরি হয়েছে বিভিন্ন আইনের কাজকারবারে । যেহেতু দুটো মিসিং ডায়েরি করা ছিলো। এবং মোস্ট ওয়ান্টেড ক্রি’মিনালের জেম্মায় ছিলো দু’জন। সেই হেতুতে অনেক জবানবন্দি দিতে হবে কেসের সার্থে। ঈশানও বাঁধা দেয়নি তাতে অবশ্য। বিষয়টা দরকারি। সকালের দিকে আরেক দফা জবানবন্দি দেওয়ার জন্য থানায় আসতে হবো মেয়েদুটোকে। সে কারণে এখানেই রাখতে চেয়েছিলো। তবে রাহাত কে নিয়ে থানায় যাওয়ার পথ নিশ্চয় নিরাপদ হবে না। সে-ই সময় টা তিতির কে রাহাতের থেকে যতটা সম্ভব দূরেই রাখতে চায় ঈশান।

দেওয়ান বাড়ি বর্তমানে খানিকটা হলেও স্বস্তির ছায়া ফুটে উঠেছে। । তমা আর তিতির সুরক্ষিত আছে ঈশানদের সাথে– শোনার পর থেকেই , শান্তি শান্তি ভাব একপ্রকারে। রাইসুল দেওয়ান যদিও ছেলের ওপর মহা বিরক্ত এখনো অবধি। স্ত্রীর মুখে ছেলের সত্যিটা শোনার পর থেকে, থ মেরে বসে ছিলো ঘন্টা খানেক। দিনের পর দিন, বছরের পর বছর ধরে, তার থেকে সব লুকিয়ে রাখা হয়েছে। আজকে বাড়ির মেয়ে- বউয়ের এরকম বিপদের দিনে জানতে পারছে সব! এই দূর্যোগের কারণ কে? কে দায়ী? ঈশান নয় কি? ওর পেশা’র রেশ ধরেই এতো অশান্তির সুত্রপাত।
দীর্ঘদিন পর বাড়ির মানুষ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে দু চোখের পাতা এক করতে গিয়েছে । বাইরের আবহাওয়ার টানে নূরি এসে দাড়িয়েছে ছাদে। নিশি নামাজে বসেছে। নামাজ শেষে সে-ও আসবে । সেলফোনে মিহি আওয়াজে সম্ভবত কোনো উর্দু গান বেজে যাচ্ছে ক্রমাগত। তবে সে গানের ওপর থেকে নূরির ধ্যান ভড়কেছে বহু আগেই। গানটার গভীরতায় মন দিতেই, মন গিয়ে স্থান করে নিয়েছে অন্য জায়গায়। তবে হুশ ফিরলো সেলফোনের কর্কশ শব্দে। এবং স্ক্রিনে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললো সে। সাইকোলজির ক্যাচক্যাচানি আজকাল সত্যি হতে শুরু করেছে। ফোনটা সে রিসিভ করলো একদম শেষ মূহুর্তে এসে। ইচ্ছাকৃত দেরি যাকে বলে আরকি!
ওপাশের কাঙ্ক্ষিত অথচ অনাকাঙ্ক্ষিত কন্ঠস্বরের নিরুত্তাপ কন্ঠস্বর শুনতে পাওয়া গেলো তৎক্ষনাৎ।

—’ ঘুমাও নি? ‘
নূরি চোখবুঁজে শীতল বাতাসটুকু অনূভব করতে চাইলো যেনো। স্বাভাবিক কন্ঠে বললো,
—’ ধরুন ঘুমিয়েছিলাম। ঘুম ভাঙিয়ে দিলেন । তাহলে ? ‘
—’ তাহলে আর কি! ফোন রেখে দেবো। বিরক্ত করার জন্য ক্ষমা চাইবো । ‘
নূরি নিঃশব্দ হাসলো। হেয়ালি গলায় বললো,
—’ এতো সহজে হার মেনে নেবেন ? ‘
নাঈমের মুখটা তখনো বড্ড স্বাভাবিক। মাঝরাতে, মাঝরাস্তায় দাড়িয়ে হাস্যজ্বল মুখে সেলফোনটা কানে গুঁজে রাখা । তমা আর তিতির কে নিয়ে সে আর নিয়াজ ফিরছে। ঈশান বা সাজিদ দু’জনের কারোরই নাগাল আজকে পাওয়া যাবে না। আজ কেনো! দু’তিন দিন তো ভালোমতো কাজে ডুবে থাকবে তারা। মেয়ে দুটোকে আজ রাত তা বিশ্রাম নিতে দিয়ে, কাল বেলা হলে রওনা দেবে সিলেটের দিকে । আর যদি আরও একপাক থানায় হাজিরা দিতে হয়, সেটাও দেবে। ওরা দু’জন সুরক্ষিত আছে শোনার পর থেকে রাইসুল দেওয়ান একপ্রকার পাগল হয়ে গিয়েছিলেন আবার ঢাকায় আসতে। নাঈমই মানা করেছে। মানুষ টা এ কদিন যা ঝক্কি পোহালো । গাড়ি রাহাতের কটেজ ছেড়ে এসেছে ঘন্টাখানেক হলো। শহরের মধ্যে এখনো ঢুকতে পারে নি। তার আগেই গাড়িটার চাকা ইস্তফা দিয়েছে। ড্রাইভার সেটাই সারছে। নিয়াজ তদারকি করেছে সেখান টায়।
নূরির প্রশ্নে মৃদু হাসলো নাঈম । নরম গলায় বললো,

—’ সবেতে হারজিত এর হিসেব আমি করি না তো । তবে যেটাতে করি, সেটাতে জিততে কি করতে হয়, সেটা করবো । ‘
—’ চ্যালেন্জ হিসেবে নেন? ‘
—’ কাইন্ড অফ । ‘
—’ আামকেও নিয়েছেন? ‘
এ যাত্রায় নাঈমের হাসি টুকু যেনো কর্ণগোচর হলো নূরির।
—’ হাসছেন যে? ‘
নাঈম অযথা গলা পরিষ্কার করে আদুরে গলায় বলে উঠলো,
—’ ভালোবাসা চ্যালেন্জ হিসেবে নেওয়া উচিত নয়, নূরি। যে মূহুর্তে ওটাকে তুমি তোমার জেদ মনে করবে। সেই মূহুর্ত থেকে তুমি সামনের মানুষ টার ওপর অকারণে জোর খাটাতে চাইবে । আর ভালোবাসায় অকারণে জোর খাটানো অন্যায় । সেটা আর ভালোবাসা থাকে না । ‘
নূরি থমকায় হয়তো। শুকনো ঢোক গিলে মিহি গলায় শুধায়,

—’ তাহলে? আপনি যে বললেন, যে জিনিস চান সে জিনিস জিতেই ছাড়েন। ‘
—” ভালোবাসা দিয়ে… ভালোবাসা দিয়ে ভালোবাসা জেতার কথা বলেছি আমি । এই একটা জিনিস এ জগতে একজিস্ট করে। যেটার ক্ষমতা আকাশচুম্বী। যার ওপর খোদার অনেক রহমত । আমি খোদাকে মানি, তাকে ভরসা করি, নিজের অনূভুতি -ভালোবাসা কে ভরসা করি। নিজে শতভাগ সৎ আমার অনূভুতির ওপর। সুতরাং, খোদার কাছে অন্য রকম একটা জোর খাটিয়ে চাইতে পারি। মানুষের কাছে জোর না-ই খাটলো। ওই এক খোদা আছেন। যাকে মন থেকে ডেকে, নিজের বুকের জমায়িত অভিমান, আবদার, আক্ষেপ সব প্রকাশ চলে। উনি ফেরান না। ‘
এই লোকটা প্রতিনিয়ত বিমুগ্ধ করে চলেছে মেয়েটার ক্ষতবিক্ষত মনটাকে। অন্য এক পুরুষের ভীষন যত্ন আর পরিকল্পনা নিয়ে করা ক্ষত, এই মানুষ টা নিজ হাতে তারও অধিক যত্নে নিরাময় করতে মরিয়া । অবচেতন মন মাঝেমধ্যে সাড়া দিতে চায় না। এমনটা নয়! তবে, ঘর পোড়া গরু, সিঁদুরে মেঘ দেখলে ভয় পায় । এতো গুলো দিনের অনূভুতি কে দমিয়ে নতুন করে স্বপ্ন দেখা, একটা মেয়ের জন্য নেহাৎই মামুলি বিষয় নয়!

নূরি আর জবাব দেয়না দীর্ঘক্ষন । খোলা আকাশের নিচে দমকা বাতাসে এলোমেলো হওয়া চুলগুলো মুখের ওপর এসে বড্ড বিরক্ত করছে । নারী মন বড্ড অদ্ভুত। নিজ হাতে এই চুলগুলো কানে গুঁজতে ইচ্ছে করছে না মোটেই। একটা অনৈতিক ইচ্ছে মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। ফোনের ওপাশের মানুষ টা এই কাজটা করলে কেমন হতো! নূরি মলিন হাসলো। আজকাল স্বপ্ন দেখতেও বড্ড ভয় হয়। অপাত্রে ভালোবাসা দান করে এখন পস্তাচ্ছে। সঠিক মানুষ দেরিতেই আসে জীবনে। ততদিন একটা নারীমনের কাবু রাখতে পারা উচিত। আবেগে গা ভাসালে মেয়েদের চলবে কেনো! নূরি হুট করে কোনো প্রতিত্তোর করতে পারে না। হয়তো চায় ও না। মেয়েটার নিরবতা বরাবরই বড্ড পোড়ায় ছেলেটাকে। সে যত আবেগ বা ভালোবাসা ময় কথা বলে, নূরি তত চুপ হয়ে যায়। কে জানে, ভালোবাসা শব্দটা কানে গেলেই হয়তো সেই পুরুষটার মুখচ্ছবি টা ভেসে ওঠে মানসপটে। যে কি-না অতি নিপুণ হাতে ভেঙেচুরে গিয়েছে নারীমনটা।

—’ তাহলে রাখি, কেমন? ঘুমিয়ে পরো । এতো রাত জাগা উচিত না। ‘
—’ তমা আর বার্বি সুস্থ আছে? ওদের নিয়ে কবে ফিরবেন? আর ভাইয়া ? ‘
—’ কাল ফিরবো ইনশাআল্লাহ। দু’জনেই সুস্থ, স্বাভাবিক। ঈশানও তাই। চিন্তার কারণ নেই । ‘
স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে মেয়েটা। নিচ থেকে শুনেছিলো ক্রি’মিনাল ও নাকি ধরা পরেছে । আর কেউ জানুক না জানুক, সে তো জানে– ক্রিমিনাল টা আদতে কে! তবে নাঈমকে জিজ্ঞেস করতে ইতস্তত হলো ভীষন।
—’ শুনুন। ‘
—’ বলো। ‘
নূরির আচমকা ডাকে উজ্জ্বল হয়ে এসেছে ছেলেটার মুখটা । তবে সে আকাঙ্খা স্থায়ি হলো না বেশিক্ষণ। নূরির মুখে ঘুরেফিরে ইয়াজের নাম শুনে দুমড়েমুচড়ে উঠলো বুকটা ।
—’ ইয়াজ কে কি এরেস্ট করেছে পুলিশ ? ‘
—’ হুম । ‘
—’ ওই ছিলো সবের মুলে? ‘
—’ সন্দেহ আছে ? অন্য কাউকে আশা করেছিলে ? ‘
—’ সত্যি বলতে, শেষ অবধি ওকেও আশা করতে ইচ্ছে হয়নি । ‘
মলিন হাসলো নাঈম । ভালোবাসার একটা মানুষ কে স্মৃতি থেকে মুছে ফেলা মুখের কথা নয় । মেয়েটাকে দোষ দিতে কখনোই রাজি নয় সে । আজও নয়।

—’ কিন্তু আশা না করলেও, বাস্তবে ঘটেছে সেটা । তমা কে রে*প করার চেষ্টার সময়, অন ডিউটি পুলিশ অফিসার অনস্পট গ্রেফতার করেছে তাকে । এবং তিতিরের বিপদ আশঙ্কা করে, নিজের যাবতীয় সত্য পুলিশের সামনে স্বীকার ও করেছে সে…আমি আর কিছু না-ই বলি । তোমার কাছ থেকে অনেক কিছু শুনতে রাজি , কিন্তু কেনো যেনো এই বিষয়টা নিয়ে ভালো লাগছে না । কাল দুপুরের দিকে প্রেসমিট ডাকা হবে৷। জানানো হবো প্রেস, মিডিয়াকে। সবটা…তখন নিজ চোখে দেখে নিয়ো। আর নিজেকে শক্ত রেখো। আশা যেহেতু রাখো নি। নিশ্চয় কষ্টও হবে । ‘
নূরি ইচ্ছে করেই আর কোনো জবাব দিলো না। নাঈম হয়তো বা খানিকটা হলেও, আশা পোষণ করেছিলো মেয়েটার দিক থেকে কোনো প্রতিত্তোরের। প্রেমিক মন, এইটুকু আশা করতেই পারে। তবে সে-সব ঘটলো না কিছু। আর না তো নূরি অভিমান ভাঙাতে আর কিছু বলে উঠলো।

পরিকল্পনা মাফিক ঘটলো না কোনোকিছুই । প্রেস মিডিয়ার থেকে লুকিয়ে রাখা গেলো না বিষয়টা । পুলিশের পিছনে হয়তো বা সাংবাদিক বেচারারা লেগেই ছিলো। সমসাময়িক কালের মধ্যে সবথেকে আলোচিত একটা বিষয়। সবথেকে আলোচিত ক্রিমিনাল। সুতরাং, পুলিশের গাফিলতিতেই জানাজানি হয়ে গেলো মূলত । তখন ভোররাত। রাহাতকে নিয়ে থানায় পৌঁছেছে পুলিশ। ঈশান নিজেও আছে ।। তবে মুখাবয়ব কালো পর্দার আড়ালে। যদি তখনও জনসাধারণের ভিরভাট্টা তৈরি হয়নি ৷ তবুও, বাড়তি সতর্কতার খাতিরে এটা করা । বিধ্বস্ত আসামি কে লকাপে রেখে বিভিন্ন সেকটরের সকল আইনি কর্মকর্তা মিলে মিটিং এর আয়োজন বসেছে। বিশাল আকারের একটা টেবিল। দু’পাশে কম করে হলেও আঠারো জন কর্মকর্তা বসা। তাদের মধ্যে বেশ কয়েকজন ঈশান সম্পর্কে অবগত, বাকিরা নন। তাদের কাছে পুরোটা নতুন সে। তাহমিদ কায়েসর পায়ের ক্ষতের চিকিৎসা করে, সে-ও এসেছে জোগ দিয়েছে খানিকটা আগে। স্বরাষ্ট্র অধিদপ্তরের লোকজনও আছেন বেশ কয়েকজন । যদি বলা হয় সবার কেন্দ্র বিন্দু মূলত ঈশান আরশাদ দেওয়ান। তাহলে বোধহয় ভুল বলা হবে না। কেসের শুরু থেকে আজকে অবধি ঈশান ঠিক কতটা জড়িয়ে সবাই অধির আগ্রহে অপেক্ষা করছে সে-সব শুনতে ।

প্রায় ছয় বছর আগে শুরু হওয়া এই আতঙ্ক, পাঁচ বছর আগে দায়িত্ব নেওয়া আন্ডারকভার অফিসার কিভাবে একা হাতে সামলে গিয়েছে, সেটার একটা ছোটখাটো ব্রিফ পর্ব চলছে যেনো । স্বরাষ্ট্র মন্ত্রাণলয়ের সিনিয়র সচিব সাহেব বড্ড আগ্রহ নিয়েই তাকিয়ে আছে তার দিকে । পৌঢ় ভদ্রলোকে রিটায়ার করবেন দিন কয়েক পরেই। ঈশানের বয়স ঠাহর করতে চাইলেন যেনো । ফিটফাট, সফেদ শার্টটা নির্মেদ কোমড়ে কালো প্যান্টের ওপর ইংক করে রাখা । ফর্শা মুখ জুড়ে আভিজাত্যের ছোঁয়া। তীক্ষ্ণ চোখজোড়া টেবিলের গুটিকয়েক ফাইলের ওপর স্থির তার ।। চেয়াল শক্ত করে রাহাতের রিপোর্ট গুলোয় চোখ বুলিয়ে যাচ্ছে । ভদ্রলোক ঈশানের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন বেশ রয়েসয়েই ।

—’ ইয়াং ম্যান , এই প্রফেশনে আসার পরিকল্পনা কিভাবে চেপেছিলো তোমার ? এরকম তীক্ষ্ণ দৃষ্টি শক্তি, পরখ ক্ষমতা, বুদ্ধিদিপ্ত মুখ…অবশ্য এই প্রফেশনেই ফিট তুমি । ‘
ঈশান হাসলো লোকটার দিকে তাকিয়ে । লোকটির সাথে এর আগে তার যতবার প্রফেশনাল কোনো বিষয় নিয়ে আলাপ আলোচনা করতে হয়েছে। প্রতিবারই মাধ্যম ব্যবহার করেছে। এবারই প্রথম সম্ভবত মুখোমুখি হলো দু’জন। ঈশান বড্ড অনুগতের সাথে গম্ভীর কন্ঠে চললো,
—’ মাসুদ রানা পড়তাম, স্যার। এককালে…কাজী আনোয়ার হোসেন? কাজিদা? চেনেন তো নাকি? তার লেখা এমআর নাইন! ছোট বেলা কেটেছে সেটার সাথেই । সময়ের সাথে মস্তিষ্কে গেঁথে গেলো গল্পগুলো। স্বপ্নে পরিনত হলো রীতিমতো। তারপর আর কি! খোদাও চাইলেন, আমিও পরিশ্রম করলাম…হয়ে গেলো! ‘

ভদ্রলোক সন্তুষ্টির হাসি হাসলেন । বয়স শেষের দিকে হলেও, মাসুদ রানার সাথে পরিচয় ভালোমতোই। কে না চেনে, কালজয়ী চরিত্র টাকে! ঈশানের বুদ্ধিদিপ্ত, হাস্যজ্বল চেহারার দিকে তাকাতেই, কল্পনার মাসুদ রানার চেহারা ভেসে উঠলো। ভদ্রলোকের এক মূহুর্তের জন্য মনে হলো, বছরের পর কল্পনায় তিনি যে মুখ কল্পনা করে এসেছে মাসুদ রানার! ঈশানের মুখটা বোধহয় সেটাই। ভদ্রলোক একদফা হাসলেন। সাজিদ কে ঈশারা করে বললেন,
—’ ছোট বেলার বন্ধু তোমার । হরিহর আত্মা । সর্বক্ষণ একসাথে ওঠাবসা। সে-ও আইনের লোক। তুখর অফিসার। তার দৃষ্টি ফাঁকি দিয়ে, এতগুলো বছর চললেন কি করে ? একবারও জানানোর কথা কেনো মনে হয় নি? ‘
সাজিদের মনেও এই প্রশ্নটাই ঘুরপাক খাচ্ছিলো ঈশানের পরিচয় জানার দিন থেকেই । তাকে ঈশান জানিয়েছে সেদিনই। যদিও ঈশান যে স্বাভাবিক কোনো বিজনেস ম্যান মোটেই নয়, সেটা সে আন্দাজ করে আসছিলো বহু আগে থেকেই। কখনো নিজের মনের ভুল, কখনো না পুলিশি মন মানসিকতা মনে করে কাটিয়ে গিয়েছে বরাবর। তবে সমসাময়িক বিষয়গুলো এতো গভীরে ইঙ্গিত করছিলো বারংবার। সে নিজেই দোলাচলে ভুগতো সবসময়। একটা সময় ঘুরেফিরে সকল এলিগেশন গুলো যখন ঈশান কেই ইঙ্গিত করে যাচ্ছিলো । এলোমেলো করে দিচ্ছিলো তার সকল প্রেডিকশন। ঠিক তখনই সবটা পরিষ্কার করেছিলো ঈশান নিজেই।

অতীতের একাংশ,
বদ্ধ দরজার ভিতরে পরিচিত ঘ্রানে ম ম করছে । ঈশানের পারফিউমের ঘ্রান। এ ঘরটা বড্ড ছোট লাগলো সাজিদের কাছে। দু কদম এগিয়ে ভিতরে যেতেই পা থমকালো। সঙ্গে শ্বাসও। সামনের বিশাল দেয়ালের পুরোটা জুড়ে অসংখ্য রঙিন, বেরঙিন ছবি সেঁটে রাখা। অসংখ্য তথ্য– লাল, নীল কালিতে মার্ক করা। অজস্রবার দাগ কাটা হয়েছে কিছু ছবি, আর লেখর ওপর । ঠিক তার মাঝামাঝি অবস্থিত একটা পুরুষের ছবি। তাদেরই বয়সী বোধহয়। সুদর্শন, প্রচুর সুদর্শন । তবে ছবির মালিক কে চিনে নেওয়ার আগেই, সেই ছবি বা পাশে এক হাস্যজ্বল রমণীর ছবিতে গিয়ে আটকালো তার চোখ। খানিক দূরেই তার নিজেরও ছবি। সাথে তাহমিদ কায়েস থেকে শুরু করে আরও বহু অফিসার, বা পরিচিত মানুষ দের ছবি। হতভম্ব হয় সাজিদ। গোটা ঘরের চারদেয়ালের একটা দিকও অবশিষ্ট নেই। গোলকধাঁধার মতো লাগলো সবকিছু তার কাছে…সাজিদ ধীর পায়ে ঈশানকে ছেড়ে এগিয়ে গেলো সেদিকটায়। আনসলভ কেস থেকে শুরু করে, সলভ হয়ে যাওয়া বহু কেসের পুঙ্খানুপুঙ্খ তথ্য এখানটায় , এ ঘরের মাঝে! তীক্ষ্ণ দৃষ্টি বুলিয়ে, যতদূর বুঝলো এটা বর্তমান সময়ের সবথেকে আলোচিত কেসের তথ্যগুলো। যেটার দায়িত্ব সয়ং তার ওপরই ন্যাস্ত ছিলো এ কটা দিন। যেটা থেকে ইস্তফা দিতে সে এসেছে এখানে। নিজের হতভম্বতা কাটাতে পারছে না বেচারা। তবে স্টিলের শক্ত দরজাটা, শব্দ করে বন্ধ হতেই চমক ভাঙলো সাজিদের। পিছনে ঘোরার প্রয়োজনও বোধ করলো না। দেয়ালের ওপর ইয়াজ মির্জার রঙিন ছবির ওপর হাত রেখে অস্ফুটে বললো,

—’ কে তুই, ঈশান ? ‘
ঈশান পিছনে দু-হাত ভাজ করে ততক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে বন্ধুর পাশেই। দেয়ালের দিকে গভীর দৃষ্টি রেখে হালকা গলায় বললো,
—’ স্যার ডাকুন, মিস্টার সাজিদ তালুকদার । সিনিয়র দের সাথে কিভাবে কথা বলতে হয়, সে ভদ্রতা জ্ঞান আপনার নেই দেখছি! ‘
সাজিদ ফ্যালফ্যাল করে তাকাতেই, ঈশান কাঁধ জড়িয়ে ধরলো ছেলেটার। নিজের পকেট থেকে আইডেন্টিটি কার্ডটা বের করে টেবিলের ওপর রাখতে রাখতে বললো,
—’ চাকরির বয়সেও তোর থেকে বছর খানেকের সিনিয়র, পদের দিক থেকে তো আরও । আমার এক ইশারায় তোর পোস্টিং বান্দরবান হয়ে যাবে, ট্রাস্ট মি…’
সাজিদ স্তম্ভিত,হতভম্ব, হতবিহ্বল। হাতখানা কাঁপছে একপ্রকারে। চিন্তাচেতনার বাইরের ব্যাপার স্যাপার হচ্ছে পুরোটা। বাঁ হাতে ধীরেসুস্থে টেবিল থেকে কার্ড টা তুলে নিয়ে অসহায় দৃশ্য তাক করলো বন্ধুর দিকে। ঈশান হাসলো। চমকের পর্ব শেষ হতেই, ঈশান ছোট্ট করে পরিচয় দিলো নিজের। সেদিনই সাজিদ প্রথম জানতে পারে বন্ধুর পরিচয়। জানতে পারে, কেসের মূল দায়িত্বে শুরু থেকে আজ অবধি কে ছিলো, কিভাবে ছিলো । তবে সময় সল্পতায় জানা হলো না পুরোটা।
সাজিদ ছোট্ট করে শুধালো,

—’ এতো লুকোচুরি ক্যানো? অন্তত পরিবার এর থেকে?৷ ‘
—’ এই অন্ধকার দিক থেকে ওদের আড়াল করতে । ‘
—’ তিতির কে নিয়ে অনেক তথ্য দেখলাম । ও? ‘
—’ ও কি ? ‘
—’ ও শুরু থেকে জড়িয়ে এসবে! কি করে৷? ‘
—’ শোন, যেকোনো পরিকল্পনা চুটকি তে জলে ফেলে দিতে জাস্ট একটা কারণই যথেষ্ট। প্রেম! ইয়াজ মির্জা প্রেমে পরেছিলো তিতিরের। এই প্রেমই কাল হবে ওর! ‘
সাজিদ সোজা হয়ে দাঁড়ালো। অবাক গলায় বললো,
—’ তিতির কে তুই কি এ-কারণেই বিয়ে করেছিস৷? শুধুমাত্র ক্রিমিনালের কাছ অবধি পৌছাতে ? ওকে দূর্বল করতে ? ‘
ঈশান ডানে-বামে মাথা ঝাঁকালো। হাতের আঙলগুলো চুল গলিয়ে দিয়ে বললো,
—’ ভেবেছিলাম সেটাই। তবে পরে বুঝলাম অন্য কিছু । ‘
—’ মানে? ‘
ঈশান হাসলো বন্ধুর দিকে তাকিয়ে। কাঁধ চেপে ঘর থেকে বের হয়ে যেতে যেতো কাব্য সুরে বলে উঠলো,
—’ প্রেম এসেছিলো জীবনে! প্রেম…বসন্ত…বুঝিস? ‘

বর্তমান,
তাহমিদের বিষয়টাও একপ্রকার অস্পষ্টই ছিলো সাজিদের কাছে । ঈশান না-হয় আন্ডারকভার অফিসার, কিন্তু তাহমিদ! সে তো দেখা যায় আরেক ধুরন্ধর। পুলিশের লোক হয়ে, কি সুন্দর বাংলার মাস্টার সাহেব সেজে হাজির হয়েছিলো তাদের ওখানটায়। সবকিছুর যখন খোলসা হচ্ছে, এটার রহস্যও খোলাসা হওয়া উচিত। সেটার পর্দা উন্মোচনও ঈশানই করলো । ঘুরেফিরে সবার মতো তাহমিদেরও সন্দেহ হয়েছিলো ঈশানের ওপরই। যেটা স্বাভাবিক। সকল প্রমাণ গুলো ঘুরেফিরে তাকেই ইঙ্গিত করছিলো। অপর দিকে বাংলাদেশের আনাচে-কানাচেতে কোথাও ইয়াজ নামক কোনো ব্যাক্তির অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিলো না। অথচ তদন্তের খাতিরে হোক বা ব্যাক্তিগত কোনো কিছু, ঈশান সহ সবাই কিভাবে যেনো ওই একটা নামই খুঁজে পাচ্ছিলো। তদন্তের সূর্ত ধরে সাজিদের পরিচয় পায় তাহমিদ। ঈশান আর সাজিদ যে একে অপরের বন্ধু, সেটা নজরে আসতেই ভ্রু জোড়া কুঁচকে আসে তার৷। বন্ধুত্বের খাতিরে সাজিদ শেষমেশ ঈশানকে আড়াল করতে প্রমান লোপাট করবে কি-না এই ভয় এসে বাসা বাঁধে তার মনে। সেই জের ধরেই ছদ্মবেশে আসা ছেলেটার । তবে লুকোচুরি বেশিদিন স্থায়ী হয়নি তার। ঈশানের দক্ষ চোখে ফাঁকি দিয়ে পালাতে পারেনি একচুলও। ঈশান জেনে গিয়েছে তার পরিচয় । তদন্তের সার্থে, সব দিক বিবেচনায় তাহমিদ কে নিজের সত্যিটা জানাতে হয়েছে ঈশানকে। সচিব সাহেব মন দিয়ে শুনছিলেন এতক্ষণ সবই । তাহমিদ কায়েস এর বিষয়টাও শুনেছে সে আজকেই৷। ভাসা ভাসা হিসেবে আরকি।

গুরত্বপূর্ণ সব আলোচনা বেশিক্ষণ চালিয়ে যাওয়া গেলো না । হাবিলদার এসে খবর জানালো, তমা আর তিতিরের জবানবন্দি নেওয়া শেষ হয়েছে । পাশের ঘরেই অপেক্ষা করছে তারা । নাঈম আর নিয়াজ একদফা জবানবন্দি দিয়ে নিয়ে চলে গিয়েছিলো মেয়ে দুটোকে। তবে তদন্তের খাতিরে মাঝপথ থেকে ফিরিয়ে আনতে হয়েছিলো তাদেরকে। সবেই শেষ হয়েছে সেটা । ঈশান নিচু গলায় তাদের অপেক্ষা করতে বলে মিটিং এ মন দিতেই, হৈ হট্টগোলের আওয়াজ ভেসে এলো কানে । আচমকা এমন লোকসমাগম কোথা থেকে হলো, সেসব ভাবাভাবির মধ্যেই একপ্রকার ছুটে এলেন একজন কনস্টেবল। জানালো প্রেস, মিডিয়া সহ সাধারণ লোকজনের বহর এসে জমায়েত হয়েছে, থানার সামনে। দু’হাতের আঙুলে কপাল চেপে ধরলো ঈশান। বাকিদের মুখ দিয়েও খেদোক্তি বের হয়ে এলো । বিরক্তি তে। এখনো সব তথ্য একাট্টা করে, রিপোর্ট তৈরিই হয়ে ওঠেনি। আলোচনা পর্বই শেষ হয়নি । তার আগেই কি করে সবটা জানাজানি হয়ে গেলো, বুঝে এলো না তাঁদের। ঈশান বিরক্ত কন্ঠে বললো,

—’ প্রেসে খবর দিয়েছেন কে ? ‘
স্বীকার করবে না কেউ, এটা জানা কথা । তারপরও ঈশানের হুংকারে কাঁপলো সকল কনস্টেবল । অত্যন্ত ঝামেলার অবস্থা একটা । ঘটনা হাতের বাইরে তখন চলে গেলো, যখন বাইরের হৈ হট্টগোল রুপ নিলো একপ্রকার মিছিলের মতো। বাইরের মানুষের উচ্চস্বরের আওয়াজ শুনতে পাওয়া যাচ্ছে। সাজিদ ব্যাস্ত পায়ে বেড়িয়ে গেলো রুম থেকে। ফিরলো প্রায় মিনিট সাতেকের মাথায়।
—’ আসামী কে ওরা বাইরে চাচ্ছে । ‘
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর সচিবের মুখটা শুকিয়ে এসেছে ততক্ষণে। বৃদ্ধ বয়সে যেকোনো কিছুর ভয় জোড়ালো হয় একটু বেশিই।
—’ বাইরে চাচ্ছে মানে ? ‘
সাজিদ গম্ভীর মুখে বললো,
—’ ওদের হাতে তুলে দিতে বলছে ক্রিমিনাল কে। ওরা নিজ হাতে শাস্তি দিতে চায় । প্রচুর লোকজন জমায়েত হয়ে গিয়েছে । সাথে ঈশান কেও বাইরে চাচ্ছে। ‘

পরিস্থিতি সত্যিই হাতের বাইরে চলে যাওয়ার মতোই হয়ে এসেছে । আসামির প্রতি যেমন তীব্র ঘৃ ণা, আক্রোশে ফেটে পরেছে জনগন । তেমনই সেই আন্ডারকভার অফিসারের খোঁজও করছে সবাই । তার প্রতি কৃতজ্ঞতা থেকে তাকে একনজর দেখতে চাইছে সবাই । আলোচিত এই সিরিয়াল কি*লারের ঘটনা দেশের গন্ডি পেরিয়ে বিদেশের সংবাদেও স্থান পেয়েছিলো বেশ কয়েকবার । সুতরাং সেই আসামি যখন ধরা পরেছে, সেই খবরও ছয়লাব হতে সময় নিলো না মোটেই। অতি উৎসাহী সব সাংবাদিকদের দল, এরই মধ্যে দেশের সরকারি, বেসরকারি সব চ্যানেলের হেডলাইন এ নিয়ে এসেছে বিষয়টা । দিনের আলো ফুটছে, ঢাকা শহর থেকে শুরু করে দেশের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে পরছে বিসয়টা । হিসেব মতে আজকে আসামি কে কাঠগড়ায় তোলার কথা ছিলো। পুলিশ ঈশানকে সন্দেহ করে কোর্টে তোলার পায়তারা করলেও, এখন পরিস্থিতি পালটেছে। রাহাতকে তোলা হবে কোর্টে। ওপর মহলের সাথে এই গোপনীয় আলোচনা বহু আগেই হয়েছিলো ঈশানের । সেই হিসেবে, মহা ফ্যাসাদেই পরেছে সকলে। বাইরের যে পরিস্থিতি। না- তো আসামি কে এখানে রাখা সম্ভব, আর না তো এখান থেকে বের করে কোর্ট অবধি নিয়ে যাওয়া সম্ভব। ঈশান গম্ভীর মুখে উঠে গিয়ে দাঁড়ালো পাশের এক ছোট্ট কামড়ার লোহার শিকের কাছে। ভিতরে তমা আর তিতির। নিয়াজও আছে সাথেই। কি যে গল্প করছে কে জানে। তিতিরই বকবক করছে মূলত। হয়তো এ ক’দিনের শ্বাসরুদ্ধকর কাহিনি শোনাচ্ছে। মেয়েগুলো হোটেলে চলে গিয়েছিলো, সেটাই ভালো ছিলো। আরেকদফা জবানবন্দি দেওয়ার জন্য নিয়ে এসে আরেক ঝামেলায়। বাইরের উত্তাল জনগন ভাঙচুর শুরু করলে নিশ্চয় ভয়ে একসাড় হয়ে যাবে ওরা৷। আবার এই ভিড়ের মধ্যে খুব সহজে নিজেকে আড়াল করে, তিতির -তমাকে আড়াল করে চলেও যাওয়া সম্ভব না।
মিটিং রুমের বিশাল কামড়ার দক্ষিণের দেয়ালের এলইডি টিভি টা চালাতেই বিশেষ সংবাদের ব্রডকাস্ট শুনতে পাওয়া গেলো। এক জনৈক ভদ্রমহিলা, এক বেসরকারি টিভি চ্যানেলের মাইক হাতে অতি উত্তেজিত গলায় সংবাদ পরে যাচ্ছে…

এক অজানা আন্ডারকভার অফিসার, যে কি-না এখনো লোকচক্ষুর আড়ালেই, বিগত পাঁচ বছর কি করে এই তদন্তের সঙ্গে ছিলো সে-সবই আউরাচ্ছে। তার সঙ্গে একেরের এক হ ত্যা গুলো কিভাবে হতো…
ঈশান চূড়ান্ত হতাশ হলো । যিনিই ফাঁস করে দিক না ক্যানো, অনেক কিছুই জানিয়েছে সাংবাদিক দের। তা না হলে এতো কিছু জানার কথা নয় মোটেই। সে ব্যাক্তিগত ভাবে চায়নি, এই ক্রেডিট টা নিতে!
“ National intelligence Bureau এর স্পেশাল অপারেশনে, সিনিয়র আন্ডারকভার অফিসারের হাতে
বিগত ছয় বছর সমাজে বুকে কলুষিত এক, নোংরা এক অধ্যায়ের সমাপ্তি। নারী ধর্ষ*ক, এবং সিরিয়াল কি*লার গ্রেফতার! ‘
সংবাদ টা দেখেই টিভি অফ করে দিলো ঈশান । আশেপাশের সবার দিকে দৃষ্টি রেখে প্রস্তাব করলো, দিনের আলো ফুটে, আরও জন সমাগম হওয়ার আগেই রাহাত কে বের করে নিয়ে যাওয়া হোক এখান থেকে। এবং সে নিজেও তার পরিবার নিয়ে যেনো প্রস্থান করতে পারে। কেসটার সকল দায়িত্ব সে যযে সাজিদ আর তাহমিদের ওপর দিয়েছে, সকল ক্রেডিট যে তাদেরই থাকবে কথাও জানিয়ে দিয়েছে সে।

যতটা সহজে সবটা করা যাবে বলে মনে হলো, ততটাও সহজে হলো না কিছুই। পুরো থানা ঘেরাও হয়ে গেলো সাধারণ জনগনে । পুলিশ, সেনাবাহিনীর লোকজন এসেও সরাতে পারছে না তাদের। ভাঙচুর করে ভিতরে আসতে চাইছে লোকজন । নিজ হাতে ধর্ষক কে শাস্তি দিতে মরিয়া হয়ে আছে সবাই। তিতির তমা কাচুমাচু মুখ করে বসে আছে চেয়ারে। আশেপাশে সবার উচ্চবাচ্য শুনতে পাওয়া যাচ্ছে । আসামির পাশাপাশি সবার চিন্তা যে ওদের দু’জনকে এখান থেকে সাবধানে বের করে নেওয়ার, সেটা ওরাও বুঝতে পারছে এতক্ষণে। তবে দেরি হয়ে গিয়েছে ভীষন। ভিতর থেকে যে-ই বের হোক না ক্যানো, সাধারণ লোকজন চড়াও হবে তাদের ওপরই। ওপর মহলের কড়া নির্দেশে বাইরের লোকজনের ওপর কোনো ধরনের কড়া ব্যবহারও করা যাবে না।
সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উত্তাল হচ্ছে চারিদিক। কোর্ট বসার সময়ও হয়ে আসছে। একপ্রকার বাধ্য হয়েই রাহাত কে নিয়ে বের হওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো ।

গরমের তীব্রতা আজকে ভয়াবহ। রাতের দিকের আবহাওয়ার সাথে, দিনের আবহাওয়ার আকাশ পাতাল তফাত। রাতের মেঘ মেঘ পরিবেশ দেখে হলফ করে বলে দেওয়া যায়, আগামী সাতদিন টানা ঝড় বৃষ্টির কবলে থাকবে গোটা দেয়। তবেই দিনেই সেই প্রকৃতির সম্পূর্ণ অন্য রুপ ।
পুলিশের সুরক্ষা সামগ্রী পরিয়ে রাহাত কে যখন লকাপ থেকে বের করা হলো, তখন ঈশান নিজেকে আবৃত করে ফেলেছে ভালোরকম। পুলিশের সকল তাগড়া তাগড়া অফিসার রা বন্দুক সমেত ঘেরাও করে আছে তাকে ।
রাহাত বের হয়েই, তার অনুসন্ধানী তীক্ষ্ণ চোখজোড়া কাউকে খুঁজলো। ঈশানকে সম্ভবত। পেলোও তাকে । তবে যা আশা করেনি মোটেই, সেটাও চোখে পরলো। পুলিশের সমাগমের মাঝেও, অদূরে দু’টো মেয়েকে দাড়িয়ে থাকতে দেখে । ঘরটা সম্পূর্ণ আলাদা। তবে লোহার শিকের ওপাশে শক্ত চোখে চোখ পরতেই পা জোড়া থামলো ছেলেটার । এক লহমায় সম্ভবত ভুলে বসলো নিজের অবস্থান । ঈশান তখনো দূরেই দাড়িয়ে।
তাকে উদ্দেশ্য করে এতো এতো শব্দ উপেক্ষা করে বললো,

—’ আমাকে কি ফাঁ’সিতে ঝোলানোর পরিকল্পনা আছে, ঈশান আরশাদ দেওয়ান? ‘
ঈশান বুকে আড়াআড়ি হাত ভাজ করে দাঁড়িয়ে টেবিলের সাথে। প্লেন কালো টি শার্টটা বলিষ্ঠ শরীরের সাথে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে আছে। খানিক আগের ফরমাল লুক এখন আর নেই। কালো মাস্কে মুখটা ঢেকে রাখা। সুতরাং রাহাতের কথায় তার মুখে হাসি ফুটলো নাকি অন্য ভাবাবেগ হলো, তা বোঝা গেলো না। তবে গমগমে কন্ঠস্বর শুনতে পাওয়া গেলো দ্রুতই।
—’ সেটা কোর্ট বুঝবে৷। তবে তোকে ফাঁ সির দড়িতে ঝুলাতে বাদবাকি যা করতে হয়, সেটা আমি করবো। সর্বোচ্চ চেষ্টা থাকবে আমার । ‘

সাজিদ টানলো রাহাতকে এগিয়ে নিয়ে যেতে। বাইরের লোকজন ঠেলে ভিতরে চলে আসতে চাচ্ছে। রাহাত একরোখার মতো করে ঘাড় বাঁকিয়ে পিছন ফিরছে বারংবার। তবে কফিনের শেষ পেড়েক পরলো একদম শেষ মূহুর্তে। পুলিশ হেডকোয়ার্টারের সদর দরজা খুলে কয়েক কদম নামিয়ে নিয়ে আসা মাত্র, লোকজনের মাঝ থেকে আচমকা অতর্কিত গু*লি ছুড়লো কেউ একটা। মূহুর্তেই চেঁচামেচি শুরু হয়ে গেলো। আতঙ্কিত জনগন এলোমেলো হলো দ্রুতই। পুলিশের এতো করা সতর্কতা সত্ত্বেও এরকম হবে ভাবাই যায়না। রাহাতকে ঘেরাও করে পিছিয়ে আসতে উদ্যত হওয়ার মাঝেই, খেয়াল হলো আরেকটা বিষয়। গু*লি গুলো মোটেই রাহাতের উদ্দেশ্যে চালানো হচ্ছে না। চালানো হচ্ছে পুলিশ কে উদ্দেশ্য করে। বিশেষত সাজিদ কে লক্ষ করে। ঈশান সতর্ক পায়ে ছুটে আসার আগেই চোখের সামনে ঘটে গেলো যা ঘটার। হাতের মুঠোয় চেপে রাখা . ২২ ক্যালিবারের বন্দুক খানা বাড়িয়ে এগোনোর আগেই একটা গু*লি এসে বিধলো এসপি সাজিদ তালুকদারের পেটের বাঁ পাশটায়। ততক্ষণে ছন্নছাড়া হয়ে গিয়েছে সবকিছুই। সাধারন জনগনের সুরক্ষার কথা ভেবে এলোপাতাড়ি গু*লি চালাতে পারছে না পুলিশ। অথচ ঠিকই সেই ভিড়ের মধ্যে দিয়ে আক্রমণ চলছে তাদের ওপর। পুলিশ হুড়মুড়িয়ে পিছিয়ে যাওয়ার আগেই রাহাতের দক্ষ হাত দু’টোর মাঝে দেখতে পাওয়া গেলো একটি পিস্তল। এবং হ্যান্ডকাফে আটকা হাত দুটো গিয়ে ঠেকলো লুটিয়ে পরা সাজিদের মাথায়। ছেলেটার র ক্তে ভেসে যাচ্ছে গোটা মেঝে। রাহাত হাঁটু ভেঙে বসে পরেছে ততক্ষণে সাজিদের পাশে। আশেপাশের সবার ব ন্দুকের নিশানা রাহাতের দিকে থাকলেও, রাহাতের মুখে কোনো ভাবাবেগ লক্ষ করা গেলো না। তবে হাত বাঁকিয়ে বন্দুক টি পেটের সেই ক্ষ’ত স্থানে আবার চেপে হিসহিসিয়ে বললো,

—’ পাশা খেলায় আমিও নেহাৎ কাঁচা নই, ঈশান আরশাদ। এতো সোজা! এতোই সহজ! এতো কাঁচা খেলোয়াড় আমিই? আমাকে থানা থেকেই বের করতে পারলেন না, আবার ফাঁ সির দড়িতে ঝোলাবেন! আমার হাত আইনের হাতের থেকেও লম্বা…ভীষন লম্বাআ…ট্রাস্ট মিই। ‘
ঈশানের মুখের মাস্কের কারণে কঠিন চেহারা টা চোখে পরছে না। তবে রক্ত বর্ণ চোখজোড়া দিয়ে ভষ্ম করে ফেলবে জেনো। দু’হাতে দু’খানা পিস্তল। তাক করে আছে তার দিকে। সাজিদ গো ঙাচ্ছে রীতিমতো।
তিতির ভয়ার্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে। নাঈম, নিয়াজ দুজনেই আড়াল করেছে ওকে।
—’ সারেন্ডার কর। তোর মনে হয়, এখান থেকে বেঁচে বের হতে পারবি? ‘
—’ মরার ভয় নেই। বিশ্বাস কর। শুধু তিতির কে নিজের করে না পাওয়ার একবুক আক্ষেপ আছে। তবে ওকে আমি না পেলে, তোরও হতে দেবো না বিশ্বাস কর। ‘
—’ সিনেমা পাস নি এটা । ওকে ছেড়ে সরে দাড়া। না হলে, আমার হাত চলতে দু’বার ভাববো না। ‘
রাহাত না সরলো, না তো ভয়ের ছাপ দেখা গেলো। উল্টো হাতের চাপ দৃঢ় করলো যেনো। সাজিদের অবস্থা তখন বেশ শোচনীয়। রক্তে মাখামাখি হচ্ছে আশপাশ।

—’ তিতির কে এক নজরের জন্য সামনে আসতে বল।’
—’ ও নেই এখানে। ‘
—’ মিথ্যা মানাচ্ছে না এখন। আসতে বল। পরীইই? ‘
আতঙ্কিত মেয়েটা দু’হাতে মুখ চেপে ধরলো। ভিড়ের মাঝে দেখা যাচ্ছে না সাজিদ কে। তবে সবার উত্তেজিত অবস্থা দেখে স্পষ্ট বলে দেওয়া যায়, কিছু একটা বয়াবহ ঘটেছে।
—’ পরীইইই…’
রাহাতের হাত ওপর দিকে তুলে, সিলিং ফ্যান উদ্দেশ্য করে শব্দ করে গু*লি ছুড়লো আরেকটা । শব্দ করে হেসে ফেললো। ছেলেটা উন্মাদ তখন!
ঈশান দু কদম এগোতেই, হিসহিসিয়ে উঠলো ছেলেটা।
—’ মেরে দেবো তোর বন্ধুকে। একদম মেরে দেবো। তিতির কে ডাক। রাইট নাও। ‘
পুলিশ বাজে ভাষায় গালি দিয়ে রাহাতের দিকে এগোতে যাওয়ার আগেই হাত বাড়িয়ে তাকে থামিয়ে দিলো ঈশান । গম্ভীর গলায় বললো,
—’ তিতিরের ক্ষতি হবে এমন কিছু তুই করবি না। ‘
—’ করবো না। ভালোবাসি ওকে আমি। ‘
—’ আমি ডাকবো তিতির কে। তুই সাজিদ কে ছেড়ে সরে দাড়া। ‘
—’ এতো সহজে তুই তোর বউকে পরপুরুষের সামনে আনবি? তোকে আমি চিনি না! ‘
ঈশানের হাতের ইশারা উপেক্ষা করে আচমকাই পিছন থেকে একজন এগোতেই উন্মাদের মতো আরেকটা গুলি ছুড়ে দিলো সাজিদের বাহুর দিকে। চেঁচিয়ে উঠলো ঈশান,

—’ স্টপ, রাইট নাও। আমি ডাকছি। ‘
ঈশানের ডাকতো না মোটেই। অন্য পরিকল্পনার ছক ঘুরছে মাথায় । তবে সে চিন্তাভাবনায় জল ঠেলে পাশের কামড়া থেকে দ্রুত পায়ে এগিয়ে এসে দাড়ালো তিতির। ব্যাগ্র গলায় ডেকে উঠলো,
—’ রাহাত ভাই, নাআ…’
মেয়েটার কান্নামাখা চোখ তখন র’ক্তাক্ত সাজিদের ওপর স্থির। রাহাত তার ওপর হাঁটু গেঁড়ে বসে আছে। হাঁটুর নিচ রক্তে ভেসে যাচ্ছে।
—’ পরীই? ‘
—’ রাহাত ভাইই, সরে যান ওখান থেকে। দয়া করে। রহম করুন। সাজিদ ভাইকে ছাড়ুন । ‘
—’ পরীইই । ‘
হুংকার দিয়ে উঠলো ঈশান ।
—’ ভিতরে যা, তিতিইর। ‘

সাঁঝের মায়া পর্ব ৭০

তিতির আতঙ্কিত নজরে, কাঁপছে থরথর করে। সাজিদের এই অবস্থার জন্য সে দায়ি কি? নাঈম দু’হাতে আগলে মেয়েটাকে ভেতরে নিয়ে যেতে উদ্ধত হতেই আরেকদফা পাগলামি শুরু হলো ছেলেটার।
—’ তোমাকে যদি আমার কল্পনাতেই বাঁচিয়ে রাখতে হয় , তবে অন্য কারোর বাস্তবে তোমার বিচরণ কিভাবে মানবো আমি, পরী-ই ? তুমি আজকের পর থেকে ঈশানের জীবনেরও মরিচীকা । কেমন ? ‘

সাঁঝের মায়া পর্ব ৭০ (৩)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here