লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ৫৮
নুসাইবা আরা নুরি
এ আই বিড়ালটির কথায় মানবটি শান্ত গলায় বলে উঠে,
-আম নট ফাইন কিউটিপাই।বিকজ মাই ওয়াইফ ইজ ক্রাইং ফর মী।
-হোয়াই।
-সি ইজ ক্রাইং বিকজ সি হ্যাজ টু লিভ উইথাউট মি।
কথাটা বলার পর পরই মানব টির ফোন ভাইব্রেট হয়ে কল বেজে উঠলো।সে ফোনটা পকেট থেকে বের করে হাতে নিয়ে এ আই বিড়ালটিক দিকে হাত ইশারা করে বলে,
-অনলি টেন মিনিট কিউটিপাই।দ্যান আই উইল লিসেন টু ইউর এ্যভরিথিং।
-ওকে।আম ওয়েটিং ফর ইউ।কিং অনুভব।
অনুভব আর তাকালো না বিড়ালটির দিকে।একটা রকিং চেয়ারে বসে ফোন টা বিছানায় ছুড়ে দিয়ে কানে ব্লুতুথ লাগিয়ে কল রিসিভ করলো।সাথে সাথে ওপাশ থেকে কেও একজন বলে উঠলো,
-পৌছে গেছো অনুভব।কোনো সমস্যা হয়নি তো বাবা তোমার??
লোকটির কথায় অনুভবের ঠোঁটে মুচকি হাসির রেখা দেখা দিয়ে আবার মিলিয়ে গেলো।অনুভব কন্ঠ সাভাবিক রেখে শান্ত গলায় বলল,
-জ্বি আঙ্কেল আমি পৌছে গেছি।আর ভালো ভাবেই পৌছেছি।কাইজার তো ছিলোই সাথে।আপনাকে কত বার বলেছি চিন্তা না করতে এতো বড় বড় মিশন সলভ করতে পারি আমি আর সামান্য এই অন্ধকার ট্যানেল পার হওয়া নিয়ে আপনার এতো চিন্তা কিসের??
অনুভবের কথায় ফোনের ওপাশে থাকা লোকটা বোধহয় হাসলো।তারপর বলল,
-বাবা হও তারপরে বুজবা।এতো চিন্তা কিসের।সন্তানের জন্য বাবার যে কত চিন্তা হয় সাধারণ বিষয়ে তা এখন বুজবা না।
লোকটার কথায় অনুভবের ঠোঁটে হাসি খেলে গেলো।অনুভবের শব্দহীন হাসি দাপ দাড়ির অন্তরালেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেলো।লোকটা আবারো বলল,
-আজ থেকে তো আমার ডিউটি।কত করে বললাম বাবা ছেলে এক সাথেই দেশে থাকবো।তবে তুমি এটা কি করলে।পুরো তিন মাসের জন্য আটকে দিলে সমুদ্রের মাঝে।
-এইজে আপনি বললেন সন্তানের জন্য বাবার চিন্তা হয়।এই জায়গা টাই আপনি আমার সন্তান এন্ড আমি আমি আপনার বাবা।তাই আপনাকে দেশের বাইরে সমুদ্রে নিরাপদ রাখছি যাতে আপনার গায়ে একটা ফুলের টোকাও না পড়ে।
অনুভবের কথায় লোকটার বুক গর্ভে ভরে উঠলো।চোখে পানি চলে এলো।অনুভব কে লোকটা নিজের ছেলের চেয়ে বেশি ভালোবাসে।চোখ বুজে অনুভব কে বিশ্বাস করে।আর অনুভব ও এর মর্যাদা রেখেছে।লোকটা বেশ কিছুক্ষন চুপ থেকে বলে উঠলো,
-আম প্রাউড অফ মাই সান।অনেক অনেক দোয়া করি আমার বাচ্চাটাকে যেনো আল্লাহ সব সময় সুস্থ রাখে সব মিশন গুলো যেনো সফল ভাবে শেষ করতে পারে।অল দ্যা বেস্ট।
-ইনশাআল্লাহ।আপনার দোয়া আমার মাথার উপরে আছে তো।আমি পারবোই।সাবধানে যাবেন।মায়ানমার সিমানায় পোছানোর পর সিগন্যাল দিবেন আমাকে।আল্লাহ হাফেজ।
-আল্লাহ হাফেজ মাই সন।
পিক পিক শব্দে কলটা কেটে গেলো।অনুভব চেয়ার থেকে উঠে ওয়াল মিররের সামনে গিয়ে দাড়াল।সাদা অংশের কেন্দ্রবিন্ধুতে নীল সমুদ্রের ন্যায় নীলাভো চোখের মনি জোড়া আজ বড্ড শান্ত।কিছুক্ষন আগে যে লোকটা ফোন দিয়েছিলো।সে অনুভবের জীবনের একান্ত সব থেকে কাছের মানুষ তার আঙ্কেল।তার হাত ধরেই অনুভব আজ আন্ডারওয়ার্ল্ড এ রাজত্ব করছে।এই অন্ধকার জগতে অনুভবের জীবনের দুজন গুরুত্বপূর্ণ মানুষ হলো তার আঙ্কেল আর ফুয়াদ।
আঙ্কেল তাকে ঠিক যতটা সাপোর্ট করে ফুয়াদ ও ঠিক ততটাই তাকে সাহায্য করে।ফুয়াদ তো তার আশে পাশে আছে তবে আঙ্কেল কে চিন্তা মুক্ত রাখতেই সমুদ্রের মাঝে একটা মিশনে পাঠিয়ে দিচ্ছে।নয়তো তার আঙ্কেল বার বার তাকে ফোন দিবে।পরে অনুভব ফোন না ধরলে চিন্তায় প্রেশার বাড়িয়ে ফেলবে।
অনুভব কাবার্ড থেকে টাওয়েল বের ফ্রেশ হয়ে এলো ওয়াশরুম থেকে।বেশ লম্বা শাওয়ার নিয়েছে সে।পরনে ইয়াশ রঙের কার্গো প্যান্ট।জিম করা শক্ত পেশিবহুল দৃশ্যমান।হাতের শিরা গুলো ভেসে উঠেছে চামড়ার উপরে। উন্মুক্ত ফর্সা শরীরে উজ্জল মুক্তর মতো পানি ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে।বুকের উপরের তিল গুলো জ্বলজ্বল করছে ফর্সা শরীরে।কপালে এসে পড়া এলোমেলো চুল গুলো থেকে টপ টপ করে পানি পড়ছে অনুভবের।
অনুভব ধীর পায়ে মিররের সামনে এসে দাঁড়িয়ে নিজের অবয়বের দিকে তাকায়।তারপর সমস্ত শরীর টাওয়েল দিয়ে মুছে ফেলে সুক্ষ ভাবে।কাবার্ড থেকে সাদা রঙের একটা টিশার্ট বের করে গায়ে জড়িয়ে নেয়।চুল গুলো হাত দিয়ে ঠিক করে নেয়।ল।হাতে আকানো কালো লালের মিশ্রনে তৈরি বিচ্ছুর ট্যাটুটা পানিতে ভিজে আরো জীবন্তের ন্যায় চকচক করছে ফর্সা হাতে।নীলাভো চোখ জোড়া যেনো দ্বিগুন সুদর্ষন করে তুলেছে পুরুষটাকে।
অনুভব মনের দিক দিয়ে যতটা ভালো তার থেকে কয়েক হাজার গুন নিকৃষ্ট।মানুষ মারতে হাত কাপেনা তার।কিছু সেকেন্ড এর ভিতরে একজন মানুষের দেহ থেকে আত্মা বের করে দিতে সক্ষম সে।তবে আজ পর্যন্ত যত গুলো মানুষ কে মেরেছে সব গুলোই অপরাধী। কেও নিরাপরাধ ছিলনা।
অনুভব হাতে একটা স্মার্টওয়াচ পরে।কানে ব্লুতুথ গুজে নিলো।তারপর বিছানার উপর থেকে ফোনটা হাতে নিয়ে বেরিয়ে গেলো নিজের রুম থেকে। দ্রুততার সাথে পা চালালো মনিটরিং রুমের দিকে।
ফজরের আগ মুহুর্ত।চারিপাশের আবহাওয়া বেশ ঠান্ডা ঠান্ডা।আকাশে এখোনো চাঁদ বিদ্যমান।ঘড়ির কাটায় রাত চারটা বেজে তেরো মিনিট।হটাৎ তোহার ফোনের ম্যাসেঞ্জারের নটিফিকেশনে টুং করে শব্দ করে একটা ম্যাসেজ আসে।ম্যাসেজের মৃদু শব্দে ঘুম ছুটে যায় তোহার।ধড়ফড়িয়ে উঠে বসে। পুরো রাত টা সোফায় বসে উপন্যাস পড়েছে ও।
হুমায়ুন আহমেদের অন্যতম সুন্দর একটা গল্প কৃষ্ণপক্ষ আর চারটা পৃষ্ঠা পড়লেই শেষ হতো।তবে পড়তে পড়তে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিলো তোহার জানা নেই।তোহা উঠে বসে বই টা সামনে থাকা টি টেবিলের উপর রেখে চোখ ডলে আড়ামোড়া খেয়ে ঘুম কাটিয়ে নেয় তারপর পাশ থেকে ফোনটা নিয়ে ফোনের লক খুলে মেসেঞ্জারে ক্লিক করতেই ভ্রু জোড়া কুচকে যায় তোহার।
অনুভবের আগের আইডি বাদেও নতুন আরেক টা আইডি থেকে ম্যাসেজ এসেছে।তোহা ভালো করে নাম দেখলো ইংরেজি তে লেখা “OnuVob Chattarge”।নামটা দেখে আরো ভ্রু কুচকে যায় তোহার।আইডিতে ক্লিক করতেই ইনবক্সে ঢুকে পড়ে সাথে সাথে স্ক্রীনে ভেসে উঠে পর পর কয়েকটা ম্যাসেজ।রাত সাড়ে তিনটা থেকে ম্যাসেজ আসছে। তোহার গলা শুকিয়ে গেলো এক মুহুর্তের জন্য।কত বড় ভুল করে ফেললো সে।
ভয়ে ভয়ে ম্যাসেজ গুলো পড়তে শুরু করলো তোহা।প্রথমেই একটা ভিডিও শেয়ার করা ৪৩ সেকেন্ড এর।তারপরে লেখা,
-গত সতেরো মিনিট আগে ঘুমিয়ে পড়েছেন আপনি তনুজা শেখ।এই আপনি অপরাধী ধরতে মিশনে জয়েন করেছেন।আপনার দ্বারা হয়তো কিচ্ছু হবে না আমার মনে হয়।তবুও একটা সুজোগ দিতে চাই আপনাকে।যে ভিডিও টা শেয়ার দিয়েছি।খুব মনযোগ দিয়ে ভিডিও টা দেখবেন।দেখার পরে অনুভুতি জানাবেন।আর অবশ্যই ভিডিও টা ১০০% আসল।এ আই ভেবে মনকে বুঝ দেওয়ার কোনো কারন নেই।
তোহার চোখ ছোট ছোট হয়ে গেলও।অনুভব লোকটা জানলো কিভাবে সে সতেরো মিনিট আগে ঘুমিয়েছে।সে ঘরের ভিতরের খবর জানছে কিভাবে।ঘরে কোনো হিডেন ক্যামেরা নেই তো।কিন্তু থাকবে কি করে বাইরের কেও তো বাড়ির ভিতরে আসে নি।তোহা আর কিছু না ভেবে ভিডিও টাতে চাপ দিতে গিয়েও দিলনা।পরের ম্যাসেজ টায় চোখ বোলালো।সেখানে লেখা,
-চোখ কান খোলা রাখবেন।স্বার্থের দুনিয়াই সবাই বেইমান।আপনি জাকে মিত্র ভাববেন হুট করে দেখবেন সেই আপনার সব থেকে বড় শত্রু হয়ে আপনার পিঠে ছুরি মেরে বসবে।
আর সব শেষ এ লাস্ট দুইমিনিট আগে একটা ম্যাসেজ গিফট এসেছে।তোহা ম্যাসেজ গিফট এ ক্লিক করতেই ভেসে উঠলো লেখাগুলো।তোহা চোখ বুলাতে শুরু করলো লেখাগুলোই।সেখানে অনুভব লিখেছে,
-নিজের মন শক্ত করে নিন।দরকার হয় নিজের মায়াকে পুরোপুরি মেরে ফেলুন।খুব শীঘ্রই আমাদের সামনা সামনি দেখা হবে।আমি আপনার সান্নিধ্যে থাকলেও প্রতিপক্ষের সাথে লড়তে হবে আপনাকেই।
তোহা বুজতে পারলো না কিছু।কে আপন জন।আর কেই বা পিঠে ছুড়ি বসাবে।তবে তোহা অনুভবের মুখোমুখি হতে রাজি।এই মিশন টা শেষ করতেও রাজি।তোহার ভাবনার মাঝে আবারো একটা ম্যাসেজ ভেসে এলো,
-ঘুমিয়ে পড়ুন।আগামী ৩৬ ঘন্টা আপনাদের বিরতি।
তোহা ম্যাসেজের দিকে বেশ কিছুক্ষন তাকিয়ে ইনবক্স থেকে বেরিয়ে এলো।অনুভবের আগের আইডির ইনবক্সে ঢুকে দেখলো।ওই আইডির লিংক আর একটা ম্যাসেজ,
-আপনার যখন কিছু জানার দরকার হবে তখন onuvob Chattarge আইডিতে নক দিবেন।আর আজ থেকে সব কথা সেখানেই হবে।আর আপনার হ্যাকার বন্ধুকে আর একবার চেষ্টা করতে বলবেন আমার আইডিটা হ্যাক করতে।গুগলের ওয়েবসাইটের সিক্রেট টিমের হ্যাকার হয়েও আমার লোকেশন খুজে পেলোনা।হাউ ফানি।
ম্যাসেজ টাপড়ে তোহা চমকালো।সে জানে ইভান আইডিটা হ্যাক করেছিলো তবে লোকেশন পাইনি।তোহা জানতো ইভান সাধারন কোনো হ্যাকার তবে অনুভবের কথা শুনে অবাক না হয়ে পারছেনা।তার মানে ইভান কে যতটা সহজ সরল ভাবে ততটা শান্ত আর সহজ সরল ইভান না।
তোহা চুপ করে রইলো কিছুক্ষন।ইভান যদি এমন হ্যাকার হয়ে কিছু না করতে পারে।তাহলে অনুভব কোন প্রো লেভেল এ গেম খেলছে ভাবতেও অবাক লাগে তোহার।একটা মানুষ কতটা ইন্টেলিজেন্স হতে পারে তা অনুভবের সাথে কথা না হলে জানতে পারতো না ও।
তোহা অনুভবের ইনবক্সে হিয়ে মাথাঠান্ডা করে ভিডিও টা চালু করল।একটা ঘরের সিসি টিভি ফুটেজ।ঘরে কয়েকটা অল্প বয়সি মেয়ে আছে।আর একজন পুরুষ। প্রথমে কিছু বুজে উঠতে না পারলেও হটাৎ ২১ সেকেন্ডে ভিডিও টা যেতেই তোহার হাতে থাকা ফোনটা কেপে উঠলো।মুখের ভাবমুর্তি বদলে গেলো মুহুর্তেই।
