Home বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ১০০

বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ১০০

বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ১০০
রানী আমিনা

রাজমহলে, নিজেদের মাস্টার বেডরুমে টেবিলের ওপর কাগজে খসখস করে মীর লিখে চলেছে কিছু। হাত কেঁপে চলেছে তার অনবরত, তবুও নিজের হস্তাক্ষর স্বাভাবিক রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে সে৷ রক্ত জমা চোখ জোড়া দিয়ে এখন স্পষ্ট দেখতে অপারগ, ঝাপসা চোখ জোড়া বড় বড় করে সে লেখা শেষ করে নিজের সাক্ষর বসিয়ে দিলো কাগজের নিচে।
ড্রয়ার গুলো সবেগে হাতড়ে হাতড়ে খুঁজে বের করলো সবচেয়ে সুন্দর খামটি। কাগজখানা ভাজ করে সযত্নে ভরলো খামের ভেতর, নিজের ক্ষমতার সিলমোহর মেরে দিলো ওপরে, পরক্ষণেই খামটা হাতে নিয়ে বেরিয়ে এলো কামরা ছেড়ে। তার ভেতরের তুমুল ঝড় সামান্য তম বিচ্ছুরিত হলোনা বাইরে, পূর্বের মতোই শান্ত মুখশ্রীতে ধীর, ভারী পা ফেলে নিজের বলিষ্ঠ শরীরখানা সপাটে সোজা করে হেটে এগোলো সে সামনে।

অদূরেই বাচ্চাদের কামরা থেকে ভেসে আসছে ওদের হাস্যজ্বল, উচ্ছ্বসিত কন্ঠস্বর। সেখানে ফিরাসের চড়া গলার প্রাবল্যই বেশি, আর তার সাথে পাল্লা দিয়ে চলেছে আরসালান। দুজন যে আবারও কোনো তুচ্ছ বিষয় নিয়ে তর্কে জড়িয়েছে বুঝতে বাকি থাকেনা। মিশআল আর সাইয়্যিদ হয়তো আপ্রাণ চেষ্টা করে চলেছে তাদের ঝগড়া থামাতে। আর তার অন্য দুই ছেলে, জিবরান কাসওয়ার বরাবরের মতোই নির্বিকার ভঙ্গিতে দেখে চলেছে ওদের কান্ডকারখানা। মীরের ঠোঁটের কোণে বাক পড়লো কিঞ্চিৎ, ঘর ভর্তি সন্তান তার —সুযোগ্য সন্তান! আর চিন্তা নেই কোনো।
ওদের কামরার সম্মুখে গিয়ে দাঁড়ালো মীর, সুইচ টিপে বন্ধ করে দিলো তাকে দৃশ্যমান করা ঝাড়বাতিটি। তার রাজকীয় পোশাকের নিচের অংশটি কামরার দরজার ফাঁক দিয়ে বের হওয়া আলোকে দৃশ্যমান হয়ে রইলো তখনো। কাসওয়ারের চোখ পড়লো তাতে, নিঃশব্দ ইশারায় সে সকলকে জানিয়ে দিল বাবার আগমন সংবাদ৷ যাবতীয় ঝগড়াঝাটি, দুষ্টুমি ছেড়ে বড্ড শান্ত-শিষ্ট ছেলেটির মত দাঁড়িয়ে পড়লো সকলে৷
কিন্তু মীর এলোনা ভেতরে, উচ্চারণ করলনা একটি সামান্য শব্দও, সে ক্ষমতা অনেক আগেই কেঁড়ে নিয়েছে তার মস্তিষ্কে বয়ে চলা বিধ্বংসী যন্ত্রণা। শুধু নির্বাক চেয়ে রইলো আরসালানের দিকে!
আরসালান আবছায়ায় বাবার দৃষ্টি লক্ষ্য করে এগিয়ে এলো, কিন্তু সে কাছাকাছি আসার আগেই মীর হাত বাড়িয়ে নিজের সাঁড়াশির ন্যায় দুই আঙুলের ফাঁকে ধরা খামটি হস্তান্তর করলো তাকে। পরক্ষণেই পেছন ফিরে মিলিয়ে গেলো জমাট অন্ধকারে।

আরসালান বাবার চলে যাওয়ার দিকে ক্ষণিক চেয়ে থেকে তাকালো খামের ওপর। ওপরে বড় বড় করে লেখা “ফ’ আনাবিয়া ফারহা দেমিয়ান”। মিশআল লাফিয়ে এগিয়ে এলো, মনোযোগী চোখে চেয়ে রইলো খামের দিকে। ক্ষণিক খামটিকে দেখে শুধোলো,
“বাবা এটা আম্মাকে না দিয়ে তোকে দিলেন কেন?”
“কি জানি! আম্মার সাথে আবার কোনো ঝামেলা বাধিয়েছেন কিনা কে জানে! আম্মাকে খুঁজে বের করা দরকার এখনি।”
“বাবা না খুঁজতে গেলেন আম্মাকে?”
ভ্রু কুচকে শুধোলো সাইয়্যিদ। ফিরাস ওদের দিকে এগিয়ে এসে খামটা হাতে নিয়ে উলটে পালটে দেখে বলল,
“নিশ্চয় খুঁজে পেয়েছিলেন, তারপর হয়তো আবার তাদের ঝগড়া হয়েছে। খুব সিরিয়াস কেস মনে হচ্ছে। আম্মা বাবার সাথে মহলে ফিরেছেন কিনা খোঁজ নেওয়া দরকার, যদি না ফিরে থাকেন তবে আমরা আম্মাকে খুঁজতে বের হব।
আমি খোঁজ নিয়ে আসছি, আম্মাকে মহলে না পেলে বের হব। কাসওয়ার আর আরসালান, তোরা দুজন শহরের দিকে যাবি, আম্মা ফাঁকা রাস্তা পছন্দ করেন। আমি আর জিবরান জঙ্গলে যাব, আর সাইয়্যিদ মিশআল পোর্টের দিকে। আম্মাকে এই তিন জায়গাতে খুঁজলেই পাওয়া যাবে৷”
ফিরাসের কথায় সম্মতি জানিয়ে মাথা নাড়ালো ওরা সকলে। ফিরাস পরক্ষণেই বেরিয়ে গেলো মায়ের ফেরার খোঁজ নিতে।

আনাবিয়া বসে আছে ডাস্কমায়ারের অদূরেরই একটা রেস্টুরেন্টে। ক্ষিদে পেয়েছে প্রচন্ড, দুপুরের পর থেকে খাওয়া হয়নি কিছু। এমন তীব্র ক্ষিদে তার বহুদিন লাগেনি! মনে হচ্ছিলো যেন খেতে না পেলে সে এখন মরেই যাবে। হাটতে হাটতে এই রেস্টুরেন্টটা চোখে পড়তেই ঢুকে পড়েছে। টেবিলের ওপর নানা পদের খাবার, সেগুলো প্রায় গোগ্রাসে গিলছে সে৷ সেই মুহুর্তেই বেজে উঠলো রেস্টুরেন্টের দরজার বেল। আনাবিয়া খাবারের ফাঁকে তাকালো একবার, একজন অতিশয় বৃদ্ধ লাঠি ভর দিয়ে ঢুকলো ভেতরে, প্রতি পদক্ষেপে কেঁপে উঠছে তার শরীর৷
আনাবিয়া ভ্রু কুচকে তাকালো, চেহারাটা খুব চেনা চেনা ঠেকছে তার কাছে। ক্ষণিক পর্যবেক্ষণের পরেই চিনতে পেলো সে, বিস্ময় ভরে ডেকে উঠলো,
“ব্রায়ান!”
ব্রায়ান নিজের মোটা চশমায় আবৃত ঝাপসা চোখ জোড়া কুচকে দেখার চেষ্টা করলো তাকে নাম ধরে ডাকা রমনীটিকে। চিনতে পারা মাত্রই অপ্রস্তুত হলো, ইতস্তত ভঙ্গিতে আনুগত্যের সাথে মাথা নাড়িয়ে বলে উঠলো,
“শেহজাদী!”

আনাবিয়া ওকে নিজের সামনের চেয়ার দেখিয়ে বলে উঠলো,
“দাঁড়িয়ে কেন, বসো! কি খাবে বলো! শুনেছি এক্সিডেন্টের পর আমার সার্জারি নাকি তুমি করেছিলে! তোমাকে অনেক ধন্যবাদ ব্রায়ান।”
ব্রায়ান টেবিলের ওপর খাবারের সমাহার দেখে অবাক হলো কিছুটা। শঙ্কা নিয়ে ধীর পায়ে এসে বসলো সেখানে। ভয় হল তার, একবার কোনো ভাবে ক্ষমা চেয়ে, পায়ে ধরে বেঁচে ফিরেছে। এবার তাকে শেহজাদীর সাথে টেবিল শেয়ারে জানটাই না খোয়াতে হয়! কিন্তু শেহজাদীকে উপেক্ষা করার স্পর্ধাও নেই তার। মুখে অপ্রস্তুত হাসি ফুটিয়ে সে মাথা নাড়লো। কিন্তু আনাবিয়ার সময় হল না এত কথা বলার, সে গোগ্রাসে একটা ভেড়ার পায়া চিবোতে ব্যাস্ত হয়ে পড়লো। ব্রায়ান কি বলবে বুঝতে না পেরে ভাঙা গলায় জিজ্ঞেস করলো,
“হিজ ম্যাজেস্টির শরীর এখন কেমন আছে, শেহজাদী?”
আনাবিয়া খাওয়ায় সামান্য বিরতি দিয়ে ভ্রুতে কিঞ্চিৎ ভাজ ফেলে বলল,
“ভালোই আছে, কেন? হঠাৎ এ কথা জিজ্ঞেস করছো!”
“এ-এমনিতেই, শেহজাদী!”

“এমনিতে এ কথা জিজ্ঞেস করার পাত্র তুমি নও, খোলাখুলি বলো।”
বলে আবার খাওয়ায় ব্যাস্ত হলো আনাবিয়া। ব্রায়ান ওকে ক্ষণিক নিরীক্ষণী চোখে পরখ করে ইতস্তত স্বরে বলল,
“আ-আসলে, আপনি হসপিটালে অ্যাডমিট থাকা কালীন লিও ভাইজান বলছিলেন আমাকে প্রাসাদে নেওয়ার কথা। হিজ ম্যাজেস্টির কোনো একটা গুরুতর অসুস্থতা আছে যেটা প্রাসাদের বর্তমান নিউরোলজিস্ট সমাধান করতে পারছেন না। তাই……!”

আনাবিয়া মুখের খাবার টুকু গিলে ভ্রু কুচকালো, এমন কোনো সংবাদ সে কেন পায়নি ভাবতে শুরু করলো সে। টেবিলে খাবার এখনো পড়ে আছে বেশ কিছু। সেদিকে একবার চেয়ে ভেড়ার পায়ার মাংসটুকু এক গ্রাসে শেষ করে উঠে পড়লো সে। তাকে এখনি একবার মীরের কাছে যেতে হবে, তখন রাগের মাথায় অতগুলো বাজে কথা বলা একদমই উচিত হয়নি। এখন গিয়ে একটু আদর যত্ন করে ওকে ভোলানো দরকার৷ কিন্তু এটা মিটে গেলেই আবার ঝগড়া বাধাবে সে, কেন তার থেকে অসুস্থতার খবর লুকোনো হলো এর কৈফিয়ত চাইবে৷ ব্রায়ানের সাথে দ্বিতীয় কথা না বলে দ্রুত বিল পে করে রেস্টুরেন্ট ছাড়তে উদ্যত হলো সে, পেছন থেকে তখনি ব্রায়ান ইতস্তত স্বরে বলে উঠলো,
“শেহজাদী, আপনি অতি সত্ত্বর একবার হাসপাতালে গিয়ে চেকআপ করালে ভালো হবে আশা করি।”
আনাবিয়া ঘাড় ঘুরিয়ে চেয়ে ভ্রু কুচকে জিজ্ঞেস করলো,

“কেন?”
“এ-এমনিতেই…. শেহজাদী। তবে আপনার একবার চেকআপ করা জরুরি বলে মনে হলো। ভুল হলে মার্জনা করবেন।”
আনাবিয়া আর সময় নষ্ট না করে বেরিয়ে এলো সেখান থেকে৷ পেটে এখনো ক্ষিদে, কিন্তু মীরের সাথেও কথা বলা দরকার। খাবার মহলে ফিরেও খাওয়া যাবে৷
রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে কিছুদূর যেতেই আনাবিয়ার হঠাৎ শরীর খারাপ বোধ হলো। এমন লোকাল রেস্টুরেন্টে ঢোকা ওর ঠিক হয়নি, কেমন যেন গা গোলাচ্ছে। যদি ফুড পয়জনিং হয়, আর মীর সেটা জানতে পারে তবে এমন চিপ রেস্টুরেন্টে খাওয়ার অপরাধে মীর ওকে উদ্ধার করে দিবে!
কিছুক্ষণ হাটার পর এবার মাথার ভেতরেও কেমন চক্কর দিতে শুরু করলো, গ্যাসটা মাথায় উঠে গেলো না তো! মাথাটা এক হাতে চেপে ধরেই এগুলো ও। কিন্তু হাটতে একদম ইচ্ছে করছে না, শরীর টা হঠাৎ করেই কেমন দুর্বল লাগছে৷ অন্ধকারে সুনশান রাস্তায় শীতল হাওয়া বইছে, চারদিকে কাউকে দেখা যাচ্ছেনা। এদিকে ফোনটাও কাছে নেই, কাউকে সংবাদ পাঠানোর উপায় নেই তার! দুর্বল পায়ে আরও কিছু দূর এগোতেই আচমকা রাস্তার ওপর হড়হড়িয়ে বমি করে দিল আনাবিয়া।
তখনি দূর থেকে ছুটে এলো আরসালান আর কাসওয়ার, দুজনে আনাবিয়াকে ধরে রইলো শক্ত করে। আনাবিয়া উগরে দিলো পেটের ভেতরের সব! আরসালান শঙ্কিত স্বরে বলল,

“আম্মা! কি হয়েছে আপনার? কোথায় ছিলেন আপনি এতক্ষণ! আপনাকে কখন থেকে খুঁজছি!”
আনাবিয়া একটু ধাতস্থ হয়ে দুর্বল স্বরে উত্তর দিল,
“ক্ষিদে পেয়েছিলো, তাই ওখানে গিয়ে খেয়েছিলাম! তারপর থেকেই কেমন গা গোলাচ্ছিলো, আর মাথার ভেতর কেমন চক্কর দিচ্ছিলো যেন!”
“উঠুন আম্মা, আপনাকে এখনি হাসপাতালে নিতে হবে। ফুড পয়জনিং হলে সমস্যা। এমন জায়গায় আপনি কেন খেতে গেছিলেন বলুন তো! জানেন যে এগুলো আপনার সহ্য হয়না!”
মৃদু ভর্ৎসনার স্বরে বলে উঠলো কাসওয়ার। আনাবিয়া ওদের শরীরে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে অস্ফুটস্বরে স্বরে জিজ্ঞেস করলো,
“তোমাদের বাবা কোথায়?”
“বাবা একটু আগে বেরিয়ে গেলেন, আম্মা! আপনার জন্য একটা এনভেলপ রেখে গিয়েছেন, সেটা দিতেই আপনাকে খুঁজতে বেরিয়েছিলাম।”
“কিসের এনভেলপ?”

আরসালান হস্তান্তর করলো সেটি। আনাবিয়া সেটা খুলতে উদ্যত হতেই আরসালান বলল,
“এসব পরে দেখবেন আম্মা, এখন আপনার হাসপাতালে যাওয়া প্রয়োজন! গাড়িটা ওদিকে রাখা আছে।”
বলেই মা’কে কোলে তুলে নিলো আরসালান, তারপর এগোলো গাড়ির দিকে।

কুরো আহমারের সমুদ্রের কিনারে থাকা উঁচু খাদের ওপর নিজের কুচকুচে কালো রঙা, স্বর্ণ বাধানো গাড়ির ভেতর বসে আছে মীর। চোখজোড়া রক্তিম থেকে মেরুণ রঙ ধারণ করেছে, যেন এখুনি চোখ ফেটে কলকলিয়ে বেরিয়ে আসবে তাজা রক্ত! অথচ মুখখানা প্রচন্ড শান্ত, চোয়াল জোড়া শক্ত, কপালে নেই কোনো যন্ত্রণা, কোনো বিরক্তির ভাজ! ক্ষণিক শূন্য চোখে উদ্দেশ্যহীনের মত সম্মুখে চেয়ে থেকে গাড়ি থেকে বেরিয়ে এলো সে।
চতুর্দিকে চোখ ঘুরিয়ে দেখলো একবার। মাথা তুলে দেখে নিল একবার ঝলসানো চাঁদখানা আর তার আশেপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা অসংখ্য নক্ষত্ররাজ! বুক ভরে টেনে নিলো ফুরফুরে, সতেজ বাতাস। তারপরেই খাদের চারপাশে থাকা বড় বড়, ভারী পাথর খন্ডের কয়েকটিকে তুলে সে রাখলো গাড়ির ডিকিতে। ডিকিটি ভালোভাবে বন্ধ করে আরও কয়েকটি পাথর তুললো গাড়ির ভেতর৷ কাজ শেষ করে ফিরে এলো আবার ড্রাইভিং সিটে। সিটবেল্টটা সজোরে টেনে এদিক ওদিক জড়িয়ে বাঁধলো শক্ত করে৷ গাড়ির দরজা দুটো ভালোভাবে লক করে শান্ত হয়ে বসলো ক্ষণিক। ড্যাশবোর্ডে রাখা ফোনটি তুলে চোখ রাখলো স্ক্রিনে, সেখানে এখনো জ্বলজ্বল করছে আনাবিয়ার হাস্যজ্বল মুখখানা, ঝলমলে চোখ জোড়ায় যেন উপচে পড়ছে খুশি!

মীরের চোখ হতে গড়িয়ে পড়লো দুফোটা রক্ত মিশ্রিত লোনা জল, আনাবিয়া হয়তো এখন থেকে এমনই খুশি থাকবে, এমনই হাসি লেপ্টে থাকবে তার মুখে! তার জীবনের সবচেয়ে বড় ধোঁকাবাজ, অভিশাপ, যন্ত্রণাটি বিদায় নেবে চিরতরে, আর কখনো ফিরবেনা! জীবনে আর কোনো বাধা থাকবেনা তার, সারাজীবন যে স্বাধীনতা পেতে সে গুমরে মরেছে আজ সেই স্বাধীনতাই মীর তাকে স্বহস্তে উপহার দিয়ে যাবে!
স্ক্রিন টা খোলা রেখেই মীর ফোনটা রেখে দিলো আবার, যেন আনাবিয়ার মুখখানা শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত দৃষ্টিগোচর হয় তার! ফোনটা রাখা মাত্রই এক সুতীব্র, তীক্ষ্ণ যন্ত্রণা সূচ হয়ে যেন বিঁধতে রইলো তার মস্তিষ্কের প্রতিটি পরতে! বিধ্বংসী যন্ত্রণায় গুমরে উঠলো মীর, যন্ত্রণায় দাঁত চেপে গেলো দাঁতে! পরক্ষণেই গাড়ি স্টার্ট দিয়ে সর্বোচ্চ বেগে ছুটিয়ে সুউচ্চ খাদ হতে লাফিয়ে সমুদ্র পৃষ্ঠে আছড়ে পড়লো সে গাড়ি শুদ্ধ! অতঃপর সুগভীর নীলচে লোনা পানির আস্তর ভেদ করে পাথরে ভরা ভারী গাড়িটি সবেগে পতিত হতে রইলো সমুদ্র তলের দিকে!
.
কাছেরই একটি হসপিটালের ইমার্জেন্সি রুমে কাসওয়ারের কাঁধে মাথা রেখে বসে আছে আনাবিয়া। কাসওয়ার দুহাতে আগলে রেখেছে মাকে। আরসালান কথা বলছে ডাক্তারদের সাথে। বদহজম হয়েছে জেনেও ডাক্তার টেস্ট দিয়েছিলো কিছু, সেগুলোর প্রক্রিয়া এখনো চলমান৷ কথা শেষ করে আরসালান এসে বসলো মায়ের পাশে। মায়ের বাহুতে আদুরে ভঙ্গিতে মাথা ঠেস দিয়ে রইলো। আনাবিয়া এক হাতে আগলে নিলো ওকে।
ক্ষণিক পরেই ফিরলো ডাক্তার, কেবিনে ঢুকে আরসালান আর কাসওয়ারের দিকে তাকালো একবার। ডাক্তারকে এভাবে তাকাতে দেখে সোজা হয়ে বসলো দুজনেই৷ ডাক্তারটি অল্পবয়সী, মেয়ে। টেস্ট রেজাল্টে চোখ বুলিয়ে ওদের দিকে চেয়ে আরসালানকে জিজ্ঞেস করলো,
“আপনারা পেশেন্টের কি হন?”
“আমরা পেশেন্টের ছেলে, উনি আমাদের আম্মা।”

ডাক্তারটি ভ্যাবাচেকা খেয়ে চেয়ে রইলো কিছুক্ষণ। আনাবিয়াকে দেখলো একবার। এতটুকুন মেয়ের এরকম বড় বড় বাচ্চা হতে গেলে দুই বছর বয়সে বাচ্চার মা হতে হয়। আবার চেহারাতেও বেশ মিল! ডাক্তারটি নাখোশ হলো সামান্য, এরকম সিরিয়াস মোমেন্টেও যে লোকে এমন ফাজলামো করতে পারে তার জানা ছিলো না। ভ্রুতে বিরক্তির ভাজ ফেলে সে বলে উঠলো,
“আপনাদের বোন প্রেগন্যান্ট। আগামী সপ্তাহে দেড় মাস হবে। আজেবাজে বাইরের খাবার আর খাওয়াবেন না, স্বাস্থ্যকর খাবার খেতে দিবেন। আর বোন জামাইকে বলবেন বেশি বেশি আদর যত্ন করতে, এমন পাতলা শরীরে তো প্রেগন্যান্সি ঝুঁকিপূর্ণ হবে৷ এখন পেশেন্টকে বাসায় নিয়ে যান, সে সম্পুর্ন সুস্থ আছে৷”
আনাবিয়া স্থির হয়ে গেলো তৎক্ষনাৎ! কান গরম হয়ে গেলো মুহুর্তেই, গালদুটো ধারণ করলো রক্তিম বর্ণ। এ কি শুনলো সে, সেটাও তার এত বড় ছেলেদের সামনে! মান সম্মান টুকু আর বোধ হয় বাকি রইলো না! আরসালান আর কাসওয়ারের ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠেছে মৃদু হাসি, একে অপরের দিকে আড়চোখে দেখে ভাব বিনিময় করতে ব্যাস্ত দুজন।

ডাক্তারটি হনহনিয়ে বেরিয়ে গেলো কেবিন ছেড়ে। সে বেরিয়ে যেতেই আনাবিয়া বিছানা থেকে লাফিয়ে উর্ধশ্বাসে ছুটে বেরিয়ে গেলো বাইরে। আরসালান আর কাসওয়ার একে অপরের দিকে একবার হতবাক চোখে তাকিয়ে পরক্ষণে নিজেরাও ছুটলো মায়ের পেছনে৷
আনাবিয়া ততক্ষণে সজোরে ছুটে রাস্তায় উঠে এসেছে। এমন সংবাদ ওই অসভ্য মেয়েটার তার ছেলেদের সামনেই দিতে হলো! এখন এই মুখ সে কিভাবে দেখাবে? ছিঃছিঃ!
আরসালান আর কাসওয়ার পেছন থেকে ওকে ছুটতে মানা করতে রইলো বারংবার, কিন্তু আনাবিয়া শুনলোনা ওদের কারো কথা। উর্ধশ্বাসে ছুটতে রইলো মহলের রাস্তায়।
কিছুদূর যেতেই অকস্মাৎ হৃৎপিণ্ড লাফিয়ে উঠলো তার! থমকে দাঁড়ালো আনাবিয়া তৎক্ষনাৎ, হাঁফাতে হাঁফাতে ঠেস দিলো রাস্তার পাশে থাকা গাছে। সেই মুহুর্তেই আবার সজোরে লাফিয়ে উঠলো তার হৃৎপিণ্ড! কিন্তু এবার আর বিরতি দিল না, একের পর এক জোরালো স্পন্দন করতে রইলো সেটি, যেন এখনি পাজরের হাড় ভেঙে বেরিয়ে আসবে বুক চিরে! আনাবিয়া বুকে হাত দিয়ে অস্ফুট আর্তনাদে বসে পড়লো তৎক্ষনাৎ! মুখ বিকৃত হয়ে উঠলো তার এই আকস্মিক যন্ত্রণায়!

আরসালান কাসওয়ার ছুটে এলো তখনি, মাকে ধরে উঠিয়ে মৃদু শাসনচ্ছলে বলে উঠলো,
“বললাম ছুটবেন না! এই অবস্থায় কেউ ছুটে? এখন হলো তো!”
আনাবিয়া যেন শুনতে পেলোনা কিছুই, বুকে সজোরে হাত চেপে রেখে সে অস্ফুটে উচ্চারণ করলো,
“তোমাদের বাবা কোথায়? তাকে দ্রুত রিচ করো!”
আরসালান বাবাকে ফোন দিতে ব্যাস্ত হয়ে পড়লো। নিজের হাতের মুঠিতে থাকা এনভেলপের কথা মনে পড়লো আনাবিয়ার তখনি। দ্রুত হাতে সেটি খুলে ভেতরের কাগজখানা মেলে ধরলো সামনে, সেখানে মীরের কাটা কাটা হস্তাক্ষরে লেখা,

“আমি, বাদশাহ নামীর আসওয়াদ দেমিয়ান, সুস্থ মস্তিষ্ক ও স্বেচ্ছায়, আমার মৃত্যুর পর আমার আমার সর্বাধিক প্রিয় স্ত্রী, আনাবিয়া ফারহা দেমিয়ান-এর নামে আমার মালিকানাধীন দেমিয়ান প্রাসাদের অর্ধেক অংশ (পশ্চিম প্বার্শ) তৎসংলগ্ন ভূমি, উদ্যান, ব্যক্তিগত কক্ষসমূহ এবং উক্ত অংশের সঙ্গে আইনগতভাবে সংযুক্ত সকল অধিকার ও সুবিধা চিরস্থায়ীভাবে উইল করে দিয়ে গেলাম।
আমার মৃত্যুর পর উক্ত সম্পত্তির ওপর আনাবিয়া ফারহা দেমিয়ানের পূর্ণ মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হবে এবং তিনি আইনসম্মত সীমার মধ্যে তা নিজ ইচ্ছানুযায়ী ভোগ, ব্যবহার, সংরক্ষণ, হস্তান্তর কিংবা অন্য কোনোভাবে পরিচালনা করতে পারবেন।
আমি বিশেষভাবে ঘোষণা করছি যে, এই সম্পত্তি আমি আমার স্ত্রীকে কেবল আর্থিক নিরাপত্তার জন্য নয়, বরং আমার অনুপস্থিতিতে তাঁর সম্মান, মর্যাদা ও স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ রাখার উদ্দেশ্যে দিয়ে যাচ্ছি।
আমার মৃত্যুর পর তিনি যেন কারও দয়া, অনুগ্রহ কিংবা আশ্রয়ের ওপর নির্ভরশীল হয়ে জীবনযাপন করতে বাধ্য না হন। আমার স্ত্রী তাঁর জীবনের বাকি সময় সম্মান, নিরাপত্তা ও স্বাধীনতার সঙ্গে এই সম্পত্তি ভোগ করবেন এটি আমার সুস্পষ্ট ও আন্তরিক ইচ্ছা।

— বাদশাহ নামীর আসওয়াদ দেমিয়ান”
লেখাটুকু পড়েই বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলো আনাবিয়া, চোখ জোড়া বড় বড় হয়ে গেলো তার! এক অবর্ণনীয় শঙ্কা, ভয়, যন্ত্রণা ঘূর্ণিঝড়ের ন্যায় ফণা তুলে যেন দাপিয়ে বেড়াতে শুরু করলো তার সমস্ত বক্ষ জুড়ে! এক দুর্দমনীয় কান্নার দমক গলায় এসে আটকালো মুহুর্তেই। আরসালান তখনি জানালো,
“আম্মা, বাবার ফোন আউট অব রিচ বলছে। তাকে ফোনে পাওয়া যাচ্ছে না।”
আনাবিয়া শুনতে পেলো কিনা স্পষ্ট হলো না, তার বিস্ফোরিত, আতঙ্কিত চোখ জোড়া তখনও আঁটকে উইলের ওপর। সেই মুহুর্তেই আবারও সজোরে লাফিয়ে উঠলো তার হৃৎপিণ্ড, যেন টেনে নিয়ে যেতে চাইলো তাকে তার উদ্দ্যেশ্যের নিকট। আনাবিয়া সমস্ত ফেলে আচমকাই বিদ্যুৎ গতিতে ছুটে চলল তার হৃৎপিণ্ডের দেখানো পথে! এতক্ষণের আঁটকে থাকা দুঃখগুলো যেন ছাড়া পেলো আচমকা, বন্য ঘোড়ার মতন সেগুলো ছুটতে রইলো আনাবিয়ার ধমনী জুড়ে! ডুকরে কেঁদে উঠলো সে, তার ফাঁকা হয়ে যেতে চাওয়া বক্ষপরে দুহাতে আকড়ে ধরতেই এক হাহাকারের ন্যায় আর্তনাদ বেরিয়ে এলো তার গলা চিরে!

বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৯৯

আরসালান, কাসওয়ার কিছুই বুঝতে না পেরে ছুটলো মায়ের পেছনে। কিন্তু মায়ের এমন দুর্দান্ত, ঝড়ো বেগ দেখে ফিরে এসে আবার গাড়িতে উঠে সবেগে এগুলো মায়ের পেছন পেছন।
ছুটতে ছুটতেই নিজের বক্ষপরে আঘাত হানলো আনাবিয়া, তৎক্ষনাৎ বক্ষ ভাজ হতে বের হওয়া শুভ্র, উজ্জ্বল গোলকটি মুহুর্তেই আবৃত করে ফেললো তাকে শ্বেতশুভ্র, স্বর্ণবাধানো এক আর্মরে। পরমুহূর্তেই বজ্রের ন্যায় তীব্র বেগে আকাশপানে ধাবিত হলো সে!

বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ১০১

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here