Home লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ৫৯

লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ৫৯

লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ৫৯
নুসাইবা আরা নুরি

ডাইনিং রুমে কিছু একটা পড়ে যাওয়ার শব্দ শুনে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে ইভান।অনেক পানির তৃষ্ণা লাগায় পানি খেতে উঠেছিলো ও।পানি খেয়ে বিছানায় আবারো ঘুমাতে যাবে তখনই শুনতে পায় ডাইনিং এ কিছু একটা পড়ে গেছে শব্দ করে।ইভানের পা জোড়া থমকে যায় সাথে সাথে মেঝেতেই। ভ্রু কুচকে কি পড়ে গেলো দেখতে কৌতুহলী মন নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এলো সে।
ডাইনিং এর আবছা আলোয় চারিদিকে পরিষ্কার।ঘর থেকে বের হতেই সর্ব প্রথম ইভানের নজর যায় সোফায় বসে থাকা মেয়েটার দিকে।আর তার সামনেই মেঝেতে পড়ে থাকা মোবাইল টার দিকে।মোবাইলের আলো তোহার মুখে এসে পড়ায় স্পষ্ট বোজা যাচ্ছে তোহার অভিব্যাক্তি।তোহাকে দেখে ইভান চমকে যায় হলোটা কি মেয়েটার।এই রাতে ডাইনিং এ এমন করে বসে আছে কেন??
ইভান দ্রুত হেটে গিয়ে ডাইনিং এর আলোয় জালিয়ে দেয়।হটাৎ আলো জ্বলে উঠাই চোখ মুখ খিচে বন্ধ করে নেয় তোহা।ইভান দ্রুত তোহার দিকে এগিয়ে এসে বলে,

-এই তনু কি হইছে তোর।এখানে কি করছিস??
কথাটা বলে তোহার সামনে এসে দাড়িয়ে নিচু হয়ে ফোনটা তুলতে যেতেই নজর যায় ভিডিওটার দিকে।ইভান হটাৎ কিছু বুজে উঠতে না পারলেও ভিডিওটাকে প*গ্রাফি ভেবেছিলো।তবে মোবাইল টা হায়ে নিয়ে ভালো করে ভিডিওটাতে খেয়াল করতেই ইভানের চোখ মুখের অভিব্যাক্তি পরিবর্তন হয়ে গেলো।অবাক হয়ে গেছে ভিডিও টা দেখে।
ভিডিওতে কয়েকটা মেয়ের সাথে সিয়াম কে দেখা যাচ্ছে।মেয়ে গুলোর বয়স অল্প খুব বেশি হলে শ্রেয়সীদের বয়সী।তার বেশি হবে না।সবাই উল*ঙ্গ।আর সাথে সিয়াম নিজেও।একটা মেয়েকে সবার সামনে জোর করে হাত পা বেধে রে*প করছে সিয়াম।আর অন্য মেয়ে গুলোই বুকে হাত গুজে ভয়ে নিজের সম্মান বাচানোর শে*ষ চেষ্টা চালাচ্ছে।মাত্র ৪৩ সেকেন্ড এর একটা ভিডিও দেখে ইভান নিজেও কথা বলার ভাষা হারিয়ে ফেলল।এতদিন সিয়ামের পাপের কথা শুনেছে আর আজ নিজ চোখে দেখে স্তব্ধ হয়ে গেলো ইভান।
ইভান পাওয়ার বাটনে চাপ দিয়ে ফোনটা অফ করে তোহার পাশে সোফায় বসে ফোনটা টি টেবিলের উপর রেখে দিলো।তারপর তোহার দিকে তাকালো।শান্ত নিস্প্রভ চোখ।এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে কোথাও।যেনো ট্রমা টা নিতে না পেরে অতি শোকে জমে পাথর হয়ে গেছে তোহা।ইভানের মুখে তোহাকে শান্তনা দেওয়ার কোনো ভাষা নেই।কি বলবে সে।যেখানে নিজেই তোহাকে ভালোবাসতো।তবে ভাগ্যর নির্মম পরিহাস সবাই জোর করে মেনে নিতে বাধ্য করেছিলো তাকে।তোহার চোখে সে সিয়ামের প্রতি ভালোবাসা টের পেয়েছিলো তখন থেকেই চাইতো তার তনু সিয়ামের কাছেই সুখি থাক।তবে আজ যা দেখলো এর পর কি হবে।
ইভান একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে নিজেকে শান্ত করলো। তারপর শান্ত ভাবে তোহার কাধে হাত রাখলো।তবে তোহার কোনো নড়চড় হলোনা।ইভান ভ্রু কুচকে তোহাকে নাড়া দিয়ে ডেকে উঠলো,

-এই তনু??
ইভানের কথা শেষ হবার আগেই ইভানের গায়ের উপর ঢলে পড়লো তোহা।জ্ঞান হারিয়েছে মেয়েটা।ভিডিও টা মস্তিষ্কে আঘাত করেছে ওর।এমন বাজে একটা এক্সপেরিয়েন্স এর মুখোমুখি হবে বুজতে পারেনি তোহা।তাই মেনে নিতে না পেরেই জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে।তোহাকে পড়ে যেতে দেখে ভয় পেয়ে যায় ইভান।তোহার গালে কয়েকটা চাপড় মেরে ডাকতে শুরু করে তবে কাজ হয় না।প্রতিটা চাপড়ে মৃদু নড়ে উঠছে তোহার গাল।
ইভান আশে পাশে একবার তাকিয়ে কিছু একটা খুজে তোহাকে সোফায় হেলান দিয়ে রেখে ডাইনিং টেবিলের দিকে এগিয়ে গেলো।তারপর জগ থেকে পানির গ্লাসে পানি নিয়ে এসে দাঁড়ায় তোহার সামনে।হাতে পানি নিয়ে ছিটা মারে তোহার চোখে মুখে।

ঠান্ডা পানির স্পর্শ পেয়ে চোখ মেলে তাকায় তোহা।তীব্র আলোক রশ্মি চোখে এসে ধাক্কা খেতেই চোখ খিচে বুজে নেয় তোহা।তবে ভিডিওর কথা মনে পড়তেই বুকের ভিতর মোচড় দিয়ে উঠে গভীর এক বেদনা ময় যন্ত্রনায়।তোহা চোখ খুলে চোখের সামনে ইভান কে তার দিকে ঝুকে থাকতে দেখে হুট করে অপ্রত্যাশিত একটা কাজ করে ফেলে।তোহা নিজেও বুজতে পারেনি সে এমন করবে।তবে নিজেকে আটকাতে পারেনি।
হুট করেই ইভানের গলা জড়িয়ে ধরে শব্দ করে কেদে উঠে তোহা।তোহার হটাৎ জড়িয়ে ধরায় চমকে যায় ইভান।মুহুর্তেই হৃদস্পন্দনের গতির মাত্রা বেড়ে যায়।অপ্রতাশিত কিছু ঘটলে হয়ত হৃদয় তার জানান এভাবেই দেয়।ইভান তোহাকে ছাড়াতে চাইলো এক হাত দিয়ে তবে পারলো না।তোহা আরো জোরে আকড়ে ধরলো ইভানকে।
ইভান হাতে থাকা গ্লাস টা টি টেবিলের উপর রেখে তোহাকে নিয়ে বসায় সোফায়।তোহা ছাড়েনি এখোনো ইভান কে।ইভানের কেমন যেনো লাগছে হাশফাশ করছে ভিতরে ভিতরে।যখন মেয়েটাকে ভালোবাসতো তখন ও হাত টা ও ঠিকমতো ছুয়ে দেখা হয়নি আর এখন সে তো অন্যর বউ।যতই তার ভালোবাসার মানুষ হোক তার তো আর অধিকার নেই। এখোনো ইভানের বুকে মুখ লুকিয়ে কাদছে তোহা।অঝর ধারায় পড়ছে চোখের কোন বেয়ে উত্তপ্ত নোনাজল।ভিজিয়ে দিচ্ছে ইভানের বুকের কাছে টিশার্ট এর অংশটা।
নিজের মাঝে নেয় তোহা।হাত অবশ হয়ে আসছে মেয়েটার।কাদতে কাদতে হটাৎ চুপ ক্ক্রে গেলো তোহা।ইভান প্রথমে কিছু না বললেও তোহাকে একদম চুপ দেখে ভ্রু কুচকে ঘাড়ে হাত দিতেই দেখলো কেমন যেনো চোখ গুকো সাদা হয়ে যাচ্ছে তোহার।ইভান যানে তোহার আগেও একবার এমন হয়েছিলো কলেজে থাকতে এক ফ্রেন্ড এক্সিডেন্ট এ মারা যাওয়ায়।
সেই শোক নিতে না পেরেই এমন হাত পা অবশ হয়ে এসেছিলো তোহার।ইভান দ্রুত তোহার পিঠে হাত রেখে ডলা দিতে থাকে।ডলতে ডলতে গ্লাসে থাকা পানি টুকু তোহার মাথায় ঢেলে দিয়ে তোহাকে ডাকতে থাকে।তবে কোনো উন্নতি না দেখে চিল্লিয়ে সবাই কে ডাকতে শুরু করে ইভান।ইভানের এমন চিল্লানো শুনে কিছুক্ষনের মাঝেই ঘর থেকে বেরিয়ে আসলে সকলে।সাথে ইভানের কোলে জ্ঞানহীন তোহা কে অবাক হয়ে যায় সকলে।

বন্দরের প্রবল হাওয়ার মাঝে পিছনে দুহাত ধরে অন্ধকার সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে আছে মেহেরাজ।চোখে সাদা কাচের কালো ফ্রেমের চশমা।ধুসর চোখ জোড়া বন্দরে জলা আলোয় স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।
আজ থেকে মেহেরাজের ডিউটি শুরু হবেওই গভীর নীল সমুদ্রে।নৌবাহিনী থাকা সত্ত্বেও দেশে অবৈধ অস্ত্র প্রবেশ করছে প্রতিদিন।তাই আজ থেকে ফোর্স বাড়িয়ে দেওয়া হবে।আর গোপন সুত্রে যানা গেছে আজ ভোর রাতে শ্রীলঙ্কায় যাওয়া কন্টেইনার শিপ এর মাধ্যমে গা*জা সহ নারী পাচার হবে।আর এই সম্পুর্ন দায়িত্ব টা এসে পড়েছে মেহেরাজ দের টিমের উপর।
কিছুক্ষন আগেই সে অফিসে এসে পৌছালো।ফজরের আজানের পর তাদের বোর্ড গুলো ছাড়বে বাংলাদের সমুদ্র সিমান্ত পাহারা দেবার জন্য।যতটুকু তার কাজের প্রতি মনযোগ তার থেকেও বেশি মন চাচ্ছে তার বাচ্চা বউ টাকে দেখতে।এখন কি ঘুমিয়ে গেছে নাকি জেগে আছে।মেয়েটা নিশ্চয় কাদছে।মেহেরাজ কি একবার কল দিয়ে দেখবে।নিজের ভাবনায় নিজেই হাসলো মেহেরাজ।যদি মেয়েটা ঘুমিয়ে থাকে তাহলে তার কল পেয়ে ঘুম ভেঙে যাবে।ফাও ফাও কাচা ঘুম টা ভাঙিয়ে কি হবে।ওর থেকে সে পৌছে গেছে ম্যাসেজ করে জানিয়ে দেওয়া ভালো নয়তো মেয়েটা আবার চিন্তা করবে।
মেহেরাজ ম্যাসেজ দিয়ে ফোনটা পকেটে রাখলো।তারপর বেশ কিছুক্ষন হাটাহাটি করে হআত ঘড়িতে সময় দেখে অফিসের দিকে হাটা ধরলো।আর কিছুক্ষন বাদেই আজান দিবে।এক কাপ কফি খেয়ে নামাজ পড়ে সবাই রওনা দিবে ওই সমুদ্রের পথে।

উদাম গায়ে বিছানায় আধসোয়া হয়ে ম*দের বোতলে চুমুক দিচ্ছে সিয়াম।পাশেই বসে আছে রকি আর টনি।তাদের হাতের কাচের গ্লাস ভর্তি ম*দ।ঘরের ভেতর এখোনো সদ্য ধ*র্ষিতা হওয়া মেয়েটা পড়ে আছে।মৃত্যুর যন্ত্রণায় ছটফট করছে তবে আল্লাহ বোধ*হয় মেয়েটার বেলায় বড় নির্দয়।ছটফট করেও যেনো মৃত্যু এসে ধরা দিচ্ছে না মেয়েটার কাছে।
আনাম মিয়া এখোনো ডেরায় ফেরেন নি।এখোনো একদিন পর ফিরবে সে।তবে সিয়াম আজ ইচ্ছা করেই ডেরায় এসেছিলো।কাজ কেমন চলছে দেখতে।এর ভিতরে আনাম মিয়ার সাথে কথা হয়েছিলো ফোনে ওর।আনাম মিয়া সব মিটমাট করে নিয়েছে।প্রমান ও দিয়েছে যথাসাধ্য তবে শিকার করেনি যে সেদিন তারাও গিয়েছিলো কিডন্যাপ করতে।

সিয়াম যখন শিওর হয়েছে কিডন্যাপ টা আনাম মিয়া না অন্য কেও করিয়েছে তখন মাথায় আরো আগুন উঠে গেছে ওর।আর সাথে সাথে সর্ব প্রথম তাদের নতুন শত্রু অনুভব চ্যাটার্জীর কথা মনে পড়েছে।তবে সিয়াম বুজতে পারেনা এই অনুভবের তার বোন আর বউকে নিয়ে কি দরকার।তবে যদি সত্যিই কিডন্যাপ করে থাকে তাহলে কোনো ক্লু কেন দিচ্ছে না।নাকি সে যাদের কিডন্যাপ হওয়ার চিন্তায় পাগল হয়ে যাচ্ছে তারা নিজেরাই আত্মগোপন করেছে।
সিয়ামের এই কথাটা আগে একবারো মাথায় আসেনি।তবে যখন আনাম মিয়া তার নিজের মায়ের কসম খেয়ে বলল তখন সিয়াম বিশ্বাস করতে বাধ্য হয়েছে। আনাম মিয়া এই কাজ করেনি।আর যদি করতো তাহলে যেকোনো ভাবে যানতে পারতো সিয়াম।আর অনুভব কিডন্যাপ করলেও কোনো কারন উল্লেখ করে ক্লু দিতো। তবে কোনোটাই হয়নি তাহলে কি নিজেরাই নিজেদের গোপন করে রেখেছে ওরা।কারন কি??

সিয়াম জানে মেহেরাজের বন্ধুরা কেও আর্মিতে কেও মেডিকেল এর।আর একজন পুলিশে কর্মরত।সেদিন বিয়ের ঝামেলায় শুনেছিলো তবে বুজে উঠতে পারেনি কে পুলিশে জব করে।সিয়াম সেটাই খোজ লাগিয়েছে আনাম মিয়ার মাধ্যমে থানার উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার কাছে।কারন তাদের পিছনে অনেক আগে থেকেই পুলিশ আর্মিরা লেগে আছে।কোনো ভাবে শ্রেয়সী আর তোহার কিডন্যাপের বিষয়ে পুলিশ বা আর্মির কেও জড়িয়ে নেয় তো।আর থাকলেই তারা জানবে কি ভাবে।নিশ্চয় পরিচিত কারোর অবদান আছে এতে।তবে সেই মহান ব্যাক্তি কে সেটাই খুজে বের করবে সিয়াম এবার।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here