Home রাগে অনুরাগে রাগে অনুরাগে গল্পের লিংক || সুমাইয়া ইসলাম জান্নাতি

রাগে অনুরাগে গল্পের লিংক || সুমাইয়া ইসলাম জান্নাতি

রাগে অনুরাগে পর্ব ১
সুমাইয়া ইসলাম জান্নাতি

“নতুন বউ ঘরে রেখে রাত পার করে বাড়ি ফেরাটা কোন ধরনের অসভ্যতা মিঃ জাওয়াদ? এই আপনার সময়নিষ্ঠতা? এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন হয়ে কি করে দেশের গুরুত্বপূর্ণ একজন সেনা সদস্য হয়ে বসে আছেন? আপনার দ্বারা কি উপকার হবে দেশের?”

বাসর ঘরে নববধূর লজ্জারাঙা মুখের মিষ্টি ভাষা শোনার পরিবর্তে এমন সাহসী, কাটখোট্টা ঝাঝালো প্রশ্নবাক‍্য হয়তো জাওয়াদকেই প্রথম শুনতে হলো। সেই একমাত্র ব‍্যাক্তি যে বিবাহিত জীবনের প্রথম রজনীতে বউয়ের কঠিন কন্ঠস্বরের সম্মুখীন হলো। জাওয়াদ রাগী মানুষ। নাকের ডগায় রাগ সবসময় ঝুলেই থাকে। নববধূর এমন সাহসী কর্মকাণ্ড তার মোটেই পছন্দ হলো না। তার যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন করে। এত সাহস মেয়ের?
জাওয়াদ গম্ভীর স্বরে বললো, “যা আগে করার কথা ছিল তা এখন করলেই হয়। এত উতলা হওয়ার কি আছে? আসুন শুরু করি। আপনার এত তাড়া আছে আগে বলতে পারতেন।”

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

জাওয়াদের হেয়ালি কথা বুঝতে পারলো না নববধূ সাজে বসে থাকা মালিহা। সে বিরক্তিতে ভ্রু কুচকে ফেললো। জিজ্ঞাসা করলো, “মানে?”
জাওয়াদ হাত ঘড়ি খুলে পরনের শেরওয়ানি খুলে এক পা দু পা করে এগিয়ে গেল বিছানার দিকে। দুষ্টু হেসে বললো, “বুঝতে পারেননি? এতটা কচি খুকি বলে তো মনে হয় না।”

প্রচণ্ড অপমানবোধ করলো মালিহা। তার বয়স নিয়ে খোটা দেওেয়া হচ্ছে? কতই বা বয়স তার? সবে ভার্সিটির সেকেন্ড ইয়ার টপকেছে। কন্ঠে তেজ মিশিয়ে বললো, “প্রথমে ভেবেছিলাম সময়জ্ঞান নেই। দায়িত্ব সম্পর্কে উদাসীন। এখন তো দেখছি রিতিমতো অসভ‍্য আপনি!”

জাওয়াদের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল। ক্রোধে কপালের রগ ফুলে উঠলো। এত বড় সাহস! এসেই খবরদারি শুরু করে দিয়েছে। নববধূর মুখ থেকে একের পর এক কঠিন বাক‍্য জাওয়াদকে বেপরোয়া করে তুললো। ভুলে গেল সাধারণ জ্ঞানবুদ্ধি। হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ক্রোধে ফুসতে ফুসতে বলে উঠলো, “তাহলে অসভ‍্যের অসভ্যতা দেখাতে হয়।” দ্রুতগতিতে ফুলে সজ্জিত বিছানায় বসে থাকা নববধূকে টেনে হিচড়ে নিচে নামিয়ে আনলো জাওয়াদ। টেনে টেনে খুলতে লাগলো মালিহার পরনের সাজ পোষাক। মাথার দোপাট্টা খুলতে গিয়ে চুল ছিরে গেল। এক গোছা চুল উঠে এলো হাতে। গায়ের ল‍্যাহেঙ্গা টেনে খুললো। ব‍্যাথায়, লজ্জায়, ভয়ে ককিয়ে উঠলো মালিহা। রাতের শেষ প্রহরে নববধূর চিৎকারের শব্দে ঘুম ভেঙে গেল পাশের রুমের মেয়েগুলোর। গল্পে, আড্ডায় মশগুল ছিল তারা।

জাওয়াদ তার স্বাভাবিক জ্ঞান শক্তি হারিয়েছে। মালিহাকে কোন কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে স্বামীর অধিকার ফলালো বড্ড হিংস্রভাবে। ভয়ে, লজ্জায় মরে যেতে মন চাইলো মালিহার। তার দূর্বল নারী দেহ পেরে উঠলো না জাওয়াদের পুরুষালি শক্ত পোক্ত শরীরের সাথে। ঘৃণায় বমি আসতে লাগলো মালিহার। এক পর্যায়ে জ্ঞান হারালো মেয়েটি।
পরপর দরজায় করাঘাতের শব্দ। ওয়াশরুম থেকে পানির ছলছল শব্দ ভেসে আসছে। বিছানায় এলোমেলো ভাবে অচেতন হয়ে শুয়ে আছে মালিহা। হুশ নেই তার।

জাওয়াদ শাওয়ারের নিচে চোখ বন্ধ করে দাড়িয়ে আছে। এটুকু সময়ের মধ্যে কি থেকে কি হয়ে গেল মস্তিষ্ক বুঝতে অপরাগ। শাওয়ার শেষে জামাকাপড় পড়ে ওয়ালেটটা নিয়ে দরজা খুলে সোজা বেরিয়ে গেল। পিছন ফিরে একটাবার তাকানোর প্রয়োজন মনে করলো না সে।
দরজায় দাড়ানো কৌতূহলী মুখগুলো নিজেদের মধ্যে মুখ চাওয়াচায়ি করছে। ভিতরে ঢুকবে কি ঢুকবে না। এ নিয়ে খানিক দ্বিধাদন্দে ভুগলো সবাই। জাওয়াদের বড় ভাইয়ের বউ এবং ছোট ফুফুর বিবাহিত মেয়েটি ছোটদের বুঝিয়ে বিদেয় করে রুমে ঢুকলো।

বাড়ির বড়দের কানে মালিহার চিৎকারের শব্দ যায়নি। তাদের রুমগুলো দূর দিয়ে। শারীরিক ক্লান্তি, খাটুনির জন্য সবাই গভীর ঘুমে। অন‍্যদিকে যুবতী মেয়েগুলো সব একসাথে জড়ো হয়ে গল্প মশগুল ছিল। বহুদিন পরে সকলে একসাথে হওয়া। ফলে গল্পে, আড্ডায় রাত প্রায় শেষ হয়ে আসছিল। এরমধ্যে মালিহার অনবরত চিৎকারের শব্দে আড্ডায় সকলের মনযোগ যায় সেদিকে। প্রথম পাত্তা না দিলেও পরবর্তীতে ছুটে আসে সবাই।
বিছানায় এলোমেলো অবস্থায় অচেতন মালিহাকে দেখে হৃদপিণ্ড কেঁপে ওঠে দুজনের। জাওয়াদকে ওভাবে হনহন করে চলে যেতে দেখে বুঝতে বাকি রইলো না সামথিং ইজ রং!

জাওয়াদের বড় ভাইয়ের বউ রিপ্তি মৃদু আর্তনাদ করে উঠলো, “একি অবস্থা ইমা? কি অবস্থা করেছে মেয়েটির জাওয়াদ? মনে হচ্ছে জ্ঞান হারিয়েছে।”
জাওয়াদের ছোট ফুফুর মেয়ে ইমা এগিয়ে যায় মালিহার দিকে। গায়ে হাত ছুইয়ে সিউর হয়। রিপ্তির দিকে ফিরে বলে, “হ‍্যাঁ ভাবি। ওর জ্ঞান নেই। সেন্সলেস হয়ে গেছে।”

রিপ্তি দ্রুতগতিতে ওয়াশরুম থেকে মগভর্তি পানি নিয়ে এসে মালিহার চোখেমুখে ছিটিয়ে দেয়। ইমা হাত পা ঘষে উষ্ণ করার চেষ্টা করে। মিনিট খানিক পরে পিটপিট করে চোখ খুলে তাকায় মালিহা। নিজের দুপাশে অর্ধপরিচিত নারীমুখ দেখে লজ্জায়, অস্বস্তিতে জড়সড় হয়ে পড়ে মেয়েটি। শোয়া থেকে উঠতে নিলে ব‍্যাথায় টনটন করে ওঠে কোমর। সফেদ রঙা বিছানায় রক্তের ফোটার অস্পষ্ট ছাপ। সেদিক তাকিয়ে ঘৃণার চোখ ফিরিয়ে নেয় মালিহা।
রিপ্তি মালিহাকে ধরে ওয়াশরুমে নিয়ে যায়। ইমা বিছানা বদলে আলমারি থেকে নতুন চাদর এনি বিছিয়ে দেয়। মেঝেতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা পোশাকগুলো গুছিয়ে তুলে রাখে। মালিহাকে ওয়াশরুমে রেখে রিপ্তি রুমে আসে শুকনো কাপড় নিতে।

শাওয়ারের নিচে দাড়িয়ে নিজেকে খুটিয়ে খুটিয়ে দেখে মালিহা। গলায়, গালে কামরের দাগ। যেটাকে হয়তো লাভ বাইট বলা যেতো। সাবান দিয়ে ঘষে ঘষে নিজেকে দাগমুক্ত করার ব‍্যার্থ চেষ্টা করে। বোকা মেয়েটি হয়তো জানেই না সব দাগ ধুয়ে মুছে সাফ করা যায় না। অস্তিত্ব থেকেই যায়। রিপ্তি বাইরে থেকে নক করলো। মালিহা শুকনো কাপড় নিয়ে পুনরায় দরজা বন্ধ করে দিলো।

দূরের মসজিদ থেকে ফজরের আজানের সুমধূর ধ্বনি ভেসে আসতে লাগলো। রিপ্তি মালিহাকে গুছিয়ে শাড়ি পড়িয়ে দিলো। ইমা দুধ গরম করে এনে দিলো। সাথে একটা প‍্যারাসিটামল খাইয়ে দিলো।
মালিহার কোমর সমান ভেজা চুলগুলো রিপ্তি টাওয়েল দিয়ে মুছতে মুছতে বললো, “জানিনা জাওয়াদ কেন এমন আচরণ করলো। তোমাকে জিজ্ঞাসা করব না কি হয়েছে। তোমরা স্বামী স্ত্রী। তবে একটা রিকুয়েস্ট করি বোন তোমাকে, এসব কথা কাউকে বলিও না। মানে তোমার বাড়ির কাউকে বলিও না।”

রিপ্তির মুখ থেকে এমন কথা শুনে অবাক চোখে তাকায় মালিহা। রিপ্তি সে চোখের ভাষা বুঝতে পারে। স্মিথ হেসে বলে, “বোন বিয়েটা যখন হয়েছে তখন ভালো মন্দ সবটা সামলে চলতে হয়। তবে ভেব না আমি আমার দেবরের সাফাই গাইছি। সবার আগে আমি একজন মেয়ে। তবে একথাও সত্য জাওয়াদ খুব ভালো ছেলে। এ পর্যন্ত আমি সেটাই দেখেছি। বাসর রাতে বউকে আদর সোহাগ করবে স্বাভাবিক। কিন্তু এমন অসভ‍্যের মত আচরণ কেন করলো সেটাই বুঝলাম না। তোমরা দুজনই ম‍্যাচিউর। তবুও! যাইহোক, এখন একটু ঘুমানোর চেষ্টা করো। শরীর দূর্বল। ঘুম দিলে আশাকরি ভালো লাগবে।”

মালিহা কোন বাক‍্যবিনিময় করলো না। নিঃশব্দে বিছানায় গা এলিয়ে দিলো। মন মস্তিষ্ক তার বিক্ষিপ্ত হয়ে আছে। মিলছে না হিসাবে। যে মানুষটার জন্য জীবনের একুশটা বসন্ত একাকিত্বে কাটিয়ে দিয়েছে সেই মানুষের এমন পশুর মত আচরণ তাকে বড্ড পীড়া দিচ্ছে। ভাবিয়ে তুলছে ভুল করলো না তো জীবনসঙ্গী নির্বাচনে!
ডুপ্লেক্স বাড়ির ওপর তলায় তিনটে রুম। পাশাপাশি দুটো রুম দু ছেলের। মাঝখান দিয়ে বয়ে গেছে লম্বা বারান্দা। অন‍্যপাশে জাওয়াদের একমাত্র বোনের শোবার রুম। যে স্বামী সন্তান নিয়ে প্রবাসে সংসার পেতেছে। পাসপোর্ট জটিলতায় ভাইয়ের বিয়েতে আসতে পারেনি মেয়েটি। সে নিয়ে অবশ‍্য দুঃখেরও শেষ নেই তার।

বেশ বেলা করে ঘুম ভাঙলো মালিহার। খোলা জানালার গ্রিল গলিয়ে মৃদু বাতাস আসতে লাগলো রুমে। জানালার পর্দাগুলো দুলে দুলে উঠছে হাওয়ার তালে। শোয়া থেকে উঠে বসলো মালিহা। জানালার পর্দা সরিয়ে বাইরে তাকায়। বাড়ির সামনে ছোট বাগান করা। পাচিল ঘেরা বাড়ির সাথেই লম্বা সরু পিচঢালা রাস্তা বয়ে গেছে। ওপাশে সবুজ ঘেরা মাঠ। বেশ জোরে জোরে বাতাস বইতে লাগলো। উড়তে লাগলো মালিহার খোলা চুল। চোখমুখ জুড়িয়ে যাচ্ছে শীতল বাতাসে। কিন্তু মন জুড়চ্ছে কোথায়? মনের মধ্যে যে আগ্নেয়গিরির জলন্ত লাভা জ্বলতে শুরু করেছে তা নিভবে কিভাবে?

রুমের দরজা ভেজানো। তারপরও দুবার কড়া নড়ল ওপাশ থেকে। মালিহা মাথায় শাড়ির আচল উঠিয়ে নিয়ে ধীরে ধীরে বিছানা থেকে নেমে আসলো। কোমরের ব‍্যাথায় কুচকে গেল কপালের চামড়া। মনে মনে বলে উঠলো, “অসভ‍্য বেয়াদব ছেলে। জীবন শেষ করে দিয়েছে। তোর উপর ঠাডা পড়ুক হাতির বাচ্চা!”

রাগে অনুরাগে পর্ব ২