Home আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে পর্ব ৬৯

আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে পর্ব ৬৯

আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে পর্ব ৬৯
লেখনীতে সালমা চৌধুরী

মেঘের অসুস্থতার কথা শুনামাত্র তানভির আঁতকে উঠে। তার অক্লিষ্ট মন দৌর্মনস্যে ছেয়ে গেছে। দ্রুত রওনা দিল। ততক্ষণে বন্যারা মেঘকে নিয়ে হাসপাতালে চলে গেছে। তানভিরকেও জানিয়ে দিয়েছে। ডাক্তার মেঘকে চেক করছেন, বন্যা মেঘের পাশে বসে আছে। তারমধ্যে তানভির ছুটে এসে রুমে ঢুকে ডাক্তারকে দেখেই থমকালো। দরজার সামনে মিনহাজরা থাকায় রুমটা চিনতে অসুবিধা হয় নি। ডাক্তার বেরিয়ে যেতেই তানভির মেঘের কাছে বসে মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে শীতল কন্ঠে আর্তনাদ করে বোনকে ডাকতে শুরু করল। বন্যা চোখ নামিয়ে চুপচাপ বসে আছে। অকস্মাৎ তানভিরের ফোনে কল আসছে। তানভির পকেট থেকে ফোন বের করে আঁতকে উঠে বলল,

“সর্বনাশ!”
বন্যা চোখ সরু করে তানভিরের দিকে তাকালো। তানভির নিজের চোখমুখ মুছে গলা খাঁকারি দিয়ে কল রিসিভ করে কানে ধরলো। ওপাশ থেকে আবির উদ্বিগ্ন কন্ঠে শুধালো,
“আমার বউ কোথায়? কতগুলো কল দিচ্ছি, কল রিসিভ করছে না কেনো?”
তানভির কি বলবে বুঝতে পারছে না। চোখের সামনে বোনের নিথর দেহ পড়ে আছে এ অবস্থায় ফোনের অপর পাশের মানুষটাকে মিথ্যা বলার সাধ্যও তার নেই। আগের বার অসুস্থতার কথা লুকাতে গিয়ে বড়সড় ধাক্কা খেতে হয়েছে। এবার সে সত্যি নিরুপায়। তানভির অত্যন্ত নমনীয় কন্ঠে আস্তে করে জবাব দিল,

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

“বনু আমার সামনেই আছে।”
আবির স্বাভাবিক কন্ঠে বলল,
“ফোনটা ও কে দে। ”
পরপর ঢোক গিলে তানভির শীতল কন্ঠে বলল,
” বনু কথা বলার অবস্থাতে নেই। ”
আবির আর্তনাদ করে উঠল,
“কেনো? কি হয়েছে ওর?”
“সেন্স হারিয়ে ফেলছিল। এখনও….”

এটুকু বলার আগেই আবিরের হুঙ্কার শুরু হলো। মুহূর্তেই মাত্রাতিরিক্ত রেগে গেছে, আবিরের মেজাজ তুঙ্গে। রাগে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে। তানভির কপালে কয়েকস্তর ভাঁজ ফেলে, শক্ত করে চোখ বন্ধ করে নাকে মুখে হাত চেপে আবিরের ঝারি খাচ্ছে। বন্যা নির্বাক চোখে তানভিরের অভিমুখে তাকিয়ে আছে। ফোনের অপর পাশের মানুষটা আবির ভাইয়া এটা বুঝতে বন্যার খুব বেশি সময় লাগলো না । মেঘের অসুস্থতার কথা শুনে টানা ১৭ দিন মেঘের সাথে কোনো কথা বলেনি। অনেক চেষ্টার পর সম্পর্ক কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছে এখন আবারও অসুস্থতার কথা শুনলে, আবির ঠিক কি করবে এটা ভেবেই বন্যা ভয় পাচ্ছে। আবির যদি আবারও কথা বন্ধ করে দেয় তখন মেঘের ই বা কি হবে! তানভির আর একটা শব্দও বলে নি। আবির নিজের মতো বেশকিছুক্ষণ চেঁচিয়ে কল কেটে দিয়েছে। এ অবস্থায় আবিরের করণীয় কিছুই নেই। তানভির চোখ মুখ মুছে স্বাভাবিক কন্ঠে শুধালো,

“বনুর কি হয়েছিলো? ”
বন্যা শান্ত স্বরে সব বলল। কিছুক্ষণ পর মেঘের জ্ঞান ফিরেছে। চোখ ঘুরিয়ে আশেপাশে দেখে নিল। তবে তানভিরকে দেখেই আতঙ্কিত হলো। তানভির আবিরকে বললে আবির আর কথা বলবে না এই ভয়ে মেঘও সিঁটিয়ে গেছে। তানভির কন্ঠ খাদে নামিয়ে শুধালো,
“এখন শরীর কেমন? ঠিক আছিস?”
মেঘ আস্তে করে বলল,
“হ্যাঁ”

কিছুক্ষণের মধ্যে মিনহাজ রিপোর্ট নিয়ে আসছে। তানভির রিপোর্ট টা হাতে নিয়ে ভালোভাবে পড়তে লাগলো। প্রেশার স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক কমে গেছে। সিস্টোলিক রক্তচাপ ১২০ মিলিমিটার মার্কারি থাকার জায়গায় ১০০ তে নেমে গেছে অন্যদিকে ডায়াস্টোলিক রক্তচাপ ৮০ মিলিমিটার মার্কারির পরিবর্তে ৬০ এ চলে আসছে। শরীরে হিমোগ্লোবিনও স্বাভাবিকের তুলনায় কিছুটা কমে গেছে। খাওয়া দাওয়ার অনিয়ম, শরীরের প্রতি অযত্ন তার সাথে অতিরিক্ত মানসিক চাপ তো লেগেই আছে। সবকিছুর চাপেই সেন্স হারিয়ে ফেলেছিল। তানভির মেঘকে এক পলক দেখে গম্ভীর কন্ঠে বলল,

” তোকে আমার আর কিছুই বলার নেই।”
মেঘ ঠোঁট উল্টিয়ে কাঁদো কাঁদো মুখ করে তাকিয়ে আছে। মেঘ শান্ত কন্ঠে বলল,
“বাসায় কাউকে কিছু বলো না, প্লিজ।”
তানভির রাগী স্বরে বলল,
” আমার তো ইচ্ছে করছে….”
এটুকু বলেই থেমে গেল। সামান্য কথাতেই মেঘের দুচোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পরছে। তানভির মেঘের চোখ মুখে তপ্ত স্বরে বলল,

“ঠিক আছে। বাসায় বলবো না। কিন্তু তোকেও ঠিকমতো খাওয়াদাওয়া করতে হবে। করবি তো?”
“করবো।”
মেঘের শরীর কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার পর মেঘকে নিয়ে হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে গেছে। তানভির আর বন্যা দুজন মেঘের দু’পাশে হাঁটছে। মিনহাজ, তামিম আর সাদিয়া তাদের পেছনে। ক্লিনিকের সামনে এসে তানভির মিনহাজ আর তামিমকে উদ্দেশ্য করে স্বাভাবিক কন্ঠে বলল,

“বাইকটা বাসায় দিয়ে আসতে পারবে?”
“জ্বি ভাইয়া।”
তানভির পকেট থেকে চাবি বের করে মিনহাজকে দিয়ে দিল৷ বন্যা উদ্বিগ্ন কন্ঠে শুধালো,
“আপনারা কিভাবে যাবেন?”
“আমরা রিক্সায় চলে যাব, সমস্যা নেই। ”
আচমকা আয়েশার সঙ্গে দেখা। আয়েশা এদিকেই যাচ্ছিল। তানভিরের কন্ঠ শুনে এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করল,
“কি হয়েছে তানভির? ”

মিনহাজরা বাইকের কাছে যেতে গিয়েও থমকালো৷ মেঘ কপাল গুটিয়ে মেয়েটাকে দেখছে। প্রথমদিন কেবল চোখ আর হাত-পা দেখা গেলেও আজ তার মুখও খোলা। অনেক বছর পর দেখায় আয়েশাকে চিনতে মেঘের বেশ কিছুটা সময় লাগলো। বন্যা নিষ্পলক চোখে তাকিয়ে আছে, মুখে গাম্ভীর্যের ভাব। আয়েশা নিজের মতো কত কি বলছে, মেঘের খোঁজ নিচ্ছে। এদিকে মেঘ তেলে বেগুনে জ্বলছে। গায়ের জোরের অভাবে কিছু করতেও পারছে না। আয়েশা ধীর কন্ঠে বলল,

“কার কি হয়েছে?”
তানভির গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
“বনু অসুস্থ।”
এই কথা শুনে মেয়েটা একদম উতলা হয়ে গেছে। মেঘের কাছে এগিয়ে আসতে আসতে বলল,
“হায় হায়, আমার ননদের আবার কি হয়েছে?”
মেঘ রাগে ফোঁস করে উঠল,
“আমাকে একদম ননদ বলবেন না। এর পরিণাম ভালো হবে না বলে দিলাম। ”
মেয়েটা আর একটু এগুতেই তানভির হুঙ্কার দিল, “আমার বোনকে ছোঁয়ার চেষ্টাও করবে না। ”

বন্যা মুখ গোমড়া করে নিরেট দৃষ্টিতে দুই ভাই বোনের কর্মকাণ্ড দেখছে। আয়েশা এবার মোলায়েম কন্ঠে বলে উঠল,
” আমি মেঘকে ধরলে কি হবে? জান…….!”
শব্দটা বলতে দেরি হয়েছে আয়েশার গালে তানভিরের শক্তপোক্ত হাতের থা*প্পড় পড়তে দেরি হয় নি। থা*প্পড়ের শব্দে উপস্থিত সবাই খানিকটা কেঁপে উঠেছে। তানভির রাগান্বিত কন্ঠে চিৎকার করল,

” আজকের পর আর কোনোদিন আমার সামনে নাটক করতে আসবা না। শুধুমাত্র মেয়ে বলে আর আমি মেয়েদের সম্মান করি বলে আজ পর্যন্ত তোমার কোনো ক্ষতি করি নি, নয়তো বহু আগেই তানভিরের ভয়ঙ্কর রূপ দেখিয়ে দিতাম। আমায় খারাপ হতে বাধ্য করো না।”
আয়েশার গালে রক্তের ছোপ ছোপ দাগ হয়ে গেছে। গালে হাত ঘষতে ঘষতে মাথা নিচু করে চলে যাচ্ছে। তামিম মিনহাজের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করল,
” মেয়েটার আজ খবর আছে। তানভির ভাইয়ার হাতের থা*প্পড় যে একবার খেয়েছে একমাত্র সেই বুঝে। তুই কি বলিস?”
মিনহাজ কপালে কয়েকস্তর ভাঁজ ফেলে তপ্ত স্বরে বলল,

“অতীত খুব ভয়ানক জিনিস, মনে করাতে যাস না। তার থেকে বরং চল।”
তানভির রিক্সার জন্য কিছুটা সামনে চলে গেছে। মেঘ ঠান্ডা কন্ঠে বলল,
” খুব তো গাল ফুলাইয়া রাখছিলি, এখন দেখছিস আমার ভাইকে? ভাইয়ার জীবনে জলজ্যান্ত এক ডানাকাটা পরী থাকতে ভাইয়া ডানাকাটা পেত্নীর প্রেমে পড়বে? জীবনেও না।”
বন্যা মুচকি হেসে বলল,
“এখন এত কথা না বলে নিজের যত্ন নিয়েন৷ আবির ভাইয়া কিন্তু ওনাকে খুব ঝাড়ছে।”
মেঘ আতঙ্কিত কন্ঠে শুধালো,

” আমার অসুস্থতার কথা আবির ভাই শুনে ফেলছেন? আমি আরও না করছি যেন বাসার কাউকে না বলে। ”
“আবির ভাইয়া যখন কল দিয়েছে তখন তোর সেন্স ছিল না। ”
“আমি শেষ। আর একটা সপ্তাহ পরে সেন্স হারালে কি এমন ক্ষতি হতো। উফফফ! ভালো লাগে না।”
এরমধ্যে তানভির রিক্সা নিয়ে হাজির। বন্যার থেকে বিদায় নিয়ে তানভিরের সাথে বাসার দিকে চলে গেছে। মালিহা খানরা তখনও ড্রয়িংরুমে বসে পিঠা বানাতে ব্যস্ত। মেঘকে দেখে হাসিমুখে বললেন,

“মেঘ, ফ্রেশ হয়ে তাড়াতাড়ি নিচে আয়। পিঠা বানাতে হবে। ”
মেঘ কিছু বলার আগেই তানভির পেছন থেকে বলল,
“বনুকে পিঠা বানাতে বলো না বড় আম্মু। ওর এখন ঘুমানো প্রয়োজন। ”
আকলিমা খান প্রশ্ন করলেন,
“তোমার হাতে কি তানভির? ”
তানভির স্বাভাবিক কন্ঠে বলল,
” তেমন কিছু না। ফল আর কিছু খাবার।”
“ফল তো বাসায় আছে।”

“এগুলো শুধু বনুর। এখানে কেউ যেন হাত না দেয়। আর হ্যাঁ এগুলো যেন দুদিনের মধ্যে শেষ হয়।”
শেষ কথাটা মেঘের দিকে তাকিয়ে বলেছে। মেঘ চোখ সরিয়ে নিজের রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়েই শুয়ে পরেছে। শরীর এখনও বেশ দূর্বল। সারাক্ষণই মাথা ঘুরাচ্ছে। ফোন হাতে নিয়ে আবিরকে কল দিতে গিয়েও থেমে গেছে। ২-৩ ঘন্টা ঘুমিয়ে প্রায় ৪ টার দিকে সজাগ হয়েছে। ঘুম ভাঙতেই সবার আগে ফোন চেক করল কিন্তু আবিরের মেসেজ,কল কিছুই আসে নি। মেঘ বুক ফুলিয়ে শ্বাস টেনে ভয়ে ভয়ে কল দিল। ১০ থেকে ১২ সেকেন্ড রিং হওয়ার পর আবির কল রিসিভ করল। মেঘ অত্যন্ত মৃদু স্বরে বলল,

“আসসালামু আলাইকুম। ”
“ওয়ালাইকুম আসসালাম।”
“কি করছেন?”
“কিছু না।”
“খেয়েছেন?”
“না।”
“কেনো?”
“খেতে ইচ্ছে হয় নি।”
“আপনি কি রাগ করেছেন?”
“জানি না।”

” বিশ্বাস করুন, আমি ইচ্ছে করে সেন্স হারায় নি। ”
“জানি।”
“তাহলে এমন করছেন কেনো?”
“এমনি।”
মেঘ এবার শীতল কন্ঠে শুধালো,
“আবির ভাই, আপনি কবে আসবেন?”
“জানি না।”
মেঘ ঠান্ডা কন্ঠে বলল,
“ঠিক আছে, রাখি।”
আবিরের নিরুদ্বেগ জবাব,
“ইচ্ছে।”

বন্যা বিকেলে টিউশন শেষ করেই তানভিরকে কল দিল। অনেকদিন যাবৎ তানভিরের সাথে ঠিকমতো কথায় হয় না বন্যার। দেখা হলেও রেগে থাকে সবসময়। আজ আয়েশার প্রতি তানভিরের এমন আচরণ দেখে বন্যার মনে কিছুটা আশার আলো ফুটেছে। বন্যা এতদিন পর নিজে থেকে কল দিয়েছে এই খুশিতে তানভির শুয়া থেকে লাফিয়ে উঠেছে। তৎক্ষনাৎ কল রিসিভ করল। বন্যা স্বাভাবিক কন্ঠে প্রশ্ন করল,
“এইযে ভিলেন, আপনি কি ফ্রী আছেন?”
তানভির নিঃশব্দে হেসে বলল,

“৫০০% ফ্রী আছি। বলো..”
বন্যা মুচকি হেসে বলল,
” আপনার বোনকে ফোনে পাচ্ছি না। তার খোঁজ নিতে কল দিয়েছি।”
তানভিরের হাসিমুখ পুনরায় গম্ভীর হয়ে গেছে। শ্বাস ছেড়ে বলল,
” এজন্যই কল দিয়েছো?”
বন্যা ঠোঁটে হাসি রেখে উল্টো প্রশ্ন করল,
” কল দেয়ার আর কোনো কারণ আছে নাকি?”
তানভির গুরুতর কন্ঠে জবাব দিল,
“না, আচ্ছা বাদ দাও। ওয়েট বনুকে ডেকে দিচ্ছি।”

“আপনি কি করছিলেন?”
তানভির মৃদু হেসে ঠাট্টার স্বরে বলল,
” কল্পনা করছিলাম।”
“কি?”
” বলা যাবে না। নাও বনুর সাথে কথা বলো।”
মেঘকে ফোন দিয়ে তানভির চলে গেছে।

২-৩ দিন যাবৎ আবিরের সঙ্গে মেঘের তেমন কথায় হয় না। মেসেজ দিলে আবির হ্যাঁ,হু, আচ্ছা, জানি না বলেই রিপ্লাই করে। কল দিলে এমনভাবে কথা বলে যেন তার কথা বলার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে নেই। মন খারাপ করে মেঘও তেমন কল দেয় না। সারাদিন খাওয়া আর ঘুম ছাড়া মেঘের আর কোনো কাজ ই নেই। মাঝে মাঝে বন্যার সাথে একটুআধটু দুষ্টামি করে। সন্ধ্যার দিকে তানভির বাসা থেকে বের হলেই মেঘ রান্না করতে চলে যায়। টুকটাক রেপিসি ট্রাই করে আর মীম, আদিকে নিয়ে খায়।

আজ সকাল থেকে আবিরকে বেশ কয়েকবার কল দিয়েছে কিন্তু আবির নেটে নেই, ফোনও বন্ধ। এদিকে তানভিরও বাসায় নেই। মেঘ একে একে সবার নাম্বার থেকেই চেষ্টা করেছে কিন্তু আবিরের নাম্বার বার বার বন্ধ বলছে।
ঘড়িতে তখন বিকেল ৪ টা বেজে ২৬ মিনিট। মেঘ গভীর ঘুমে নিমগ্ন, নিঃশ্বাস এলোমেলো। বুকের উপর রাখা ফোনটাকে জড়িয়ে ধরে স্বপ্নদেশে পারি দিয়েছে। মলিন চেহারা, চোখের কার্নিশে স্পষ্ট পানির দাগ দেখা যাচ্ছে। আবির মায়াবী দৃষ্টিতে মেঘের ঘুমন্ত আদলে চেয়ে আছে, বুকের ভেতর অনবরত ধ্রিম ধ্রিম কম্পন হচ্ছে। প্রায় পাঁচ মাস পর আবিরের বক্ষপিঞ্জরে আবদ্ধ হৃদয়টা স্বস্তি পেয়েছে।

এতদিন পর নিজের প্রেয়সীকে এত কাছে পেয়েছে। আবির এক দৃষ্টিতে মেঘকে পরখ করছে, আপাদমস্তক দেখে ঘুমন্ত মেঘের পাশে বসে অতি সন্তর্পণে বুকের উপর থেকে আলতোভাবে ফোনটা তুলে নিল। হোম স্ক্রিনে নিজের ছবিটা দেখে মলিন হেসে ফোনটা এক পাশে রেখে দিয়েছে। চোখের কার্নিশে জমে থাকা অশ্রু মোলায়েম হাতে মুছে পরপর মেঘের কপালে, গলায় হাত রেখে জ্বর পরীক্ষা করছে। কিছুটা সময় নিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। হৃদয়ের অন্তঃস্থলে জাগ্রত প্রেমানুভূতিতে আর চাপিয়ে রাখতে পারছে না। আনমনে মেঘের অদৃষ্টে ঠোঁট ছোঁয়াল। গাল ভর্তি আবিরের খোঁচা খোঁচা দাঁড়ির স্পর্শে মেঘের ঘুমন্ত শরীর ঝাঁকুনি দিয়ে উঠেছে। সদ্য শাওয়ার নিয়ে আসায় আবিরের গা থেকে এক অন্যরকম সুঘ্রাণ মেঘের নাসারন্ধ্রে প্রবেশ করছে। মেঘ ঘুমের মধ্যেই নড়েচড়ে উঠল। আবির সঙ্গে সঙ্গে সরে গেছে, বসা থেকে উঠে কিছুটা দূরে সরে দাঁড়ালো। আবির দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে সুস্থির কন্ঠে ডাকল,

“মেঘ…”
মেঘের উত্তর না পেয়ে আবির ঠোঁট কামড়ে হেসে আবারও ডাকল,
” স্প্যারো….”
ঘুমন্ত মেঘ আদো আদো কন্ঠে বলল,
“হুমমম!”
আবিরের আঁখি যুগল প্রশস্ত হলো। ঠোঁটে হাসি রেখে এবার শক্ত কন্ঠে বলল,
” এইযে ম্যাডাম….!”

মেঘ ঘুম ঘুম চোখে তাকাতেই তার স্বপ্নের রাজকুমারকে চেখের সামনে আবিষ্কার করল।আবিরকে দেখেই স্তব্ধ হয়ে গেছে। দু-চোখ যেন এখনি কোটর ছেড়ে বেড়িয়ে আসবে। মেঘ মুগ্ধ আঁখিতে প্রিয়মানুষটার মুখের পানে তাকিয়ে আছে। বরাবরের মতো হৃদয়ে তোলপাড় শুরু হয়ে গেছে। সত্যি কি কল্পনা বুঝার আগেই শুয়া থেকে এক লাফে উঠে বসলো।অকস্মাৎ এমন কান্ডে আবিরের নিঃশ্বাস আঁটকে গেছে, পরপর বুকটান করে সোজা হয়ে দাঁড়ালো। ঘুমের ঘোরে মেঘ অবাক চোখে আবিরকে দেখছে।

আচমকা বসা থেকে এক লাফে আবিরকে জড়িয়ে ধরলো। ঠিক জড়িয়ে ধরা বলেনা এটাকে। মেঘের দু পা মাটি থেকে প্রায় এক হাত উপরে। আকস্মিক ঘটনায় আবির এক পা পিছিয়ে সহসা সর্বশক্তি দিয়ে মেঘকে আঁকড়ে ধরল। আবিরের একহাত মেঘের পিঠে আরেক হাত কোমড়ের উপরে, শক্ত করে ধরে আছে। মেঘ অর্ধ ঘুমে থাকলেও আবির পুরোপুরি সজ্ঞানে আছে। আবিরের শিরা-উপশিরায় তুফান চলছে, উষ্ণ শ্বাস মেঘের উন্মুক্ত ঘাড়ে পড়ছে। দু’জনের হৃদপিণ্ডের ধুকপুকানি তীব্র থেকে তীব্র হতে শুরু করেছে, গাত্র জুড়ে অদ্ভুত শিহরণ জাগছে। মেঘের দুচোখ ছলছল করছে। ঘন ঘন শ্বাস ছেড়ে অকস্মাৎ কাঁদতে শুরু করেছে। আবির তখনও শক্ত হস্তে মেঘকে জড়িয়ে ধরে রেখেছে। মেঘ কোন ঘোরে আঁটকে আছে সে নিজেও বুঝতে পারছে না। কাঁদতে কাঁদতে নিজের মনিকোঠায় জমে থাকা অভিযোগগুলো ব্যস্ত কন্ঠে জাহির করছে। মেঘ কাঁদতে কাঁদতে আর্তনাদ করে উঠল,

” আপনি এত নিষ্ঠুর কেনো?”
মেঘ কি ভেবে হঠাৎ আবিরকে ছেড়ে দিয়েছে। আবিরও আস্তে আস্তে ছাড়লো। মেঘের দুপা আবিরের বৃহৎ পদযুগলের উপর পরলো। আবির মেঘকে জড়িয়ে ধরে রেখেই সম্পূর্ণ ঘুরিয়ে মেঘকে দেয়াল ঘেঁষে দাঁড় করালো। তাৎক্ষণিক ঘটনায় মেঘের মস্তিষ্ক পর্যন্ত এলোমেলো হয়ে গেছে। আবির ডানহাতের বৃদ্ধাঙ্গুল দিয়ে মেঘের চোখের পানি মুছে কন্ঠ খাদে নামিয়ে আস্তে করে বলল,
” সরি, আর কখনো নিষ্ঠুরের মতো আচরণ করব না।”
কাঙ্খিত ব্যক্তি কোমল কন্ঠের জবার শুনে মেঘ নিশ্চুপ হয়ে গেছে। মেঘের পা তখনও আবিরের পায়ের উপর। আবির এগুতেই মেঘ পেছাতে চেষ্টা করল। কিন্তু কয়েক ইঞ্চির গ্যাপ মুহুর্তেই ফুরিয়ে গেল। আবির মাথা নিচু করে মেঘের কানের কাছে মুখ নামিয়ে এনে পাতলা অধর নেড়ে বিড়বিড় করে বলল,

” খুব তো মিস ইউ, মিস ইউ করছিলেন । তা ঠিক কতটুকু মিস করেছেন দেখি?”
মেঘের ঠোঁট কাঁপছে ফিনফিন করে, মুখ দিয়ে কোনো কথায় বের হচ্ছে না। ক্ষণিকের জন্য ভেতরটা অনুভূতিশূন্য হয়ে গেছে। আবিরের উষ্ণ শ্বাস প্রশ্বাস মেঘের ঘাড়ে পড়ছে। আবির মুখ তুলে মেঘের নিরুদ্বেগ চেহারার পানে তাকালো। আবিরের এক হাত তখনও মেঘের পিঠ আঁকড়ে ধরে আছে। অন্য হাতে দিয়ে মেঘের এলোমেলো চুলগুলো ঠিক করে, মেঘের ডানহাতটা আবিরের বুকের বা পাশে শক্ত করে চেপে ধরে বলল,
” তোর শূন্যতায় আমার অনুভূতির দেয়াল ভেঙেচুরে তছনছ হয়ে গেছে। আমার ভগ্ন হৃদয়ের কম্পন কি তুই টের পাচ্ছিস? বুঝতে পারছিস কতটা মিস করেছি তোকে?”

আবিরের হৃৎস্পন্দন অস্বাভাবিক তীব্র, আবিরের বক্ষঃস্থলে হাত রাখায় মেঘের সর্বাঙ্গে কম্পন শুরু হয়ে গেছে। চিরচেনা মানুষটার গায়ের গন্ধ, স্পর্শ, মায়াবী কন্ঠ, নেশাক্ত দৃষ্টি সবেতে মেঘ মাতাল প্রায়। কয়েক মুহুর্তের মধ্যে ক্ষতবিক্ষত হৃদয়ের হাহাকার অশ্রু রূপে গড়িয়ে পরলো। মেঘের হাত আর পিঠ ছেড়ে আবির এবার শান্ত হস্তে মেঘের দু’চোখ মুখে কন্ঠ দ্বিগুণ ভারি করে বলল,

“আজকের পর আমার কারণে তোর চোখ থেকে এক ফোঁটা পানিও পড়তে দিব না আমি, প্রমিস।”
কথাটা বলতে বলতে মেঘের কপালে দীর্ঘ এক চুমু দিল। ওমনি মেঘ পাথর বনে গেছে। আবিরের পায়ের উপর থেকে মেঘের পা সরে গেছে। অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় মেঘের শ্বাসনালীতে তুফান শুরু হয়ে গেছে। দুচোখ পূর্বের তুলনায় দ্বিগুণ প্রশস্ত হয়ে গেছে। প্রায় দুই বছরের জমে থাকা অনুভূতিগুলো এলোপাতাড়ি ছুটছে। মেঘের এলোমেলো নিঃশ্বাস আবিরের বুকে লাগছে। প্রায় মিনিট খানেক পর আবির কিছুটা সরে দাঁড়ালো। মেঘ নিস্তব্ধ হয়েই দাঁড়িয়ে আছে। আবির শেষবারের মতো মেঘের চোখ মুখ মুছতে মুছতে শক্ত কন্ঠে বলল,

” আজ এই মুহুর্ত থেকে তোর চোখে সুখের অশ্রু ব্যতীত আমি আর কিছুই দেখতে চাই না। ”
মেঘকে ছেড়ে চলে যেতে নিয়ে আবার থমকালো। কোমল কন্ঠে বলল,
“তোর গিফট টেবিলে রাখা আছে।”
আবির মেঘের দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হেসে গুনগুন করতে করতে বেড়িয়ে গেছে,
“সাত সাগর আর তের নদী
পার হয়ে তুমি আসতে যদি
রূপকথার রাজকুমার হয়ে
আমায় তুমি ভালবাসতে যদি।”

মেঘ নির্বাক চোখে আবিরের পানে তাকিয়ে আছে। মেঘ দেয়ালে গা এলিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এগুলো স্বপ্ন, কল্পনা নাকি বাস্তব কিছুই বুঝতে পারছে না। কয়েক মুহুর্ত হতবাক থেকে আচমকা বিছানায় শুয়ে পরলো। শরীরের দূর্বলতার কারণে কিছু সময়ের মধ্যে আবারও ঘুমিয়ে পরেছে।
ঘন্টাখানেক পর হঠাৎ হৈচৈ এর শব্দে মেঘের ঘুম ভাঙে। শুয়া থেকে উঠে আড়মোড়া ভাঙতে ভাঙতে চোখ পরে টেবিলের দিকে। টেবিলের উপর একটা গিফ্ট বক্স রাখা। মেঘ হকচকিয়ে উঠে বক্সটার কাছে এগিয়ে গেল। তৎক্ষনাৎ এক ঘন্টা আগের ঘটনাগুলো মনে পড়তে লাগলো। মেঘ আনমনে বলে উঠল,

“আবির ভাই কি সত্যি চলে আসছেন?”
এক দৌড়ে ওয়াশরুম থেকে চোখে মুখে পানি দিয়ে, মুখ ঠিকমতো না মুছেই ছুটলো। আশপাশ না তাকিয়ে অন্তহীন পায়ে ছুটে আচমকা সিঁড়ি এসে থামলো।আবির নিচ থেকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। আবিরের এমন দৃষ্টি দেখে মেঘ হতভম্ব হয়ে গেছে। চোখ নামিয়ে ধীর গতিতে নামতে শুরু করল।মীম আর আদি গিফট নিয়ে কাড়াকাড়ি করছে।
মেঘ কাছাকাছি আসতেই আবির সস্নেহে জিজ্ঞেস করল,

” কেমন আছিস?”
কিছুটা দূরেই হালিমা খান আর মালিহা খান দাঁড়ানো। মেঘ চোখ তুলে তাকাতেই চোখাচোখি হলো দুজনের। আবিরের দুচোখে শাণিত প্রেমানুভূতি, যা লুকাতে অক্ষম সে। মেঘ মায়াবী দৃষ্টিতে তাকিয়ে মোলায়েম কন্ঠে বলল,
“আলহামদুলিল্লাহ ভালো। আপনি কেমন আছেন?”
“আলহামদুলিল্লাহ। ”
হালিমা খান বলে উঠলেন,

“সেই কখন আসছিস, এখনও কিছু খাস নি। আগে থেকে জানিয়েও আসিস নি।। কি খাবি বল”
আবির মেঘের দিকে তাকিয়ে থেকেই শান্ত স্বরে বলল,
” শুনলাম তোমার মেয়ে পাকোড়া বানাতে এক্সপার্ট। জিজ্ঞেস করো আমাকে বানিয়ে খাওয়াবে কি না!”
হালিমা খান হেসে বললেন,
“এ আবার কেমন কথা, তোকে খাওয়াবে না কেনো! এই মেঘ আয়।”
মালিহা খান তপ্ত স্বরে জিজ্ঞেস করলেন,
” রাতে কি খাবি?”
আবির সরল কন্ঠে বলল,
“তোমার যা ইচ্ছে তাই রান্না করো। ”
মালিহা খান আবারও বললেন,

“তুই আসবি এটা আগে জানাস নি কেনো?তোর রুমটা পরিষ্কার করা হয় নি৷ সেদিন তানভির দেখলাম কোনোমতে পরিষ্কার করেছে।”
আবির মলিন হেসে বলল,
“সমস্যা নেই। আমি সবকিছু পরিষ্কার করেছি।”
আবির সোফায় হেলান দিয়ে বসে আছে। মেঘকে পাকোড়া নিয়ে আসতে দেখে ইচ্ছেকৃত গান শুরু করল,
“সাত সাগর আর তের নদী
পার হয়ে তুমি আসতে যদি…”
মেঘ মুখ ফুলিয়ে সূক্ষ্ম নেত্রে তাকাতেই আবির অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছে। মেঘ মুখ ফুলিয়ে শ্বাস ছেড়ে বলল,
” আজ আসবেন এটা আগে জানালেন না কেনো?”

“জানালে কি সারপ্রাইজ থাকতো?”
মেঘ ভেঙচি কেটে বিড়বিড় করে বলল,
” সারপ্রাইজ দিতে কে বলছিল আপনাকে?”
আবির গম্ভীর কন্ঠে শুধালো,
“দুদিন পর পর অসুখ বাঁধাতে কে বলছিল আপনাকে?”
এরমধ্যে আলী আহমদ খান বাসায় আসছেন৷ ওনাকে দেখেই মেঘ দ্রুত রান্নাঘরে চলে গেছে। আবির এগিয়ে গিয়ে আব্বুকে সালাম করল। ঘন্টাখানেক পর তানভির আসছে। আবিরকে দেখেই জড়িয়ে ধরে বলল,

“ভাই আমি ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত। ”
আবির মুচকি হেসে জানাল,
” অফিসিয়ালি দায়িত্ব নেয়ার আগ পর্যন্ত আর একটু সহ্য করে নে।”
আজ অনেকদিন পর সবাই একসঙ্গে খেতে বসেছে। যদিও মোজাম্মেল খান বাসায় নেই। ইকবাল খান আজই বাসায় এসেছেন। আলী আহমদ খান ভারী কন্ঠে প্রশ্ন করলেন,
“তোমার না আরও তিনদিন পর আসার কথা ছিল?”
“জ্বি আব্বু। কিন্তু কাজ শেষ হয়ে গেছে তাই চলে আসছি। ”
“সব কাজ শেষ নাকি আবারও যেতে হবে?”
“শেষ।”

আবির প্রশ্ন করল,
“সিফাতের ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত নিয়েছেন?”
” আগামীকাল জয়েন করবে৷ ”
আবির উদ্বিগ্ন কন্ঠে শুধালো,
” আপনি কি আপনার সিদ্ধান্তে অটল থাকবেন?”
কাকামনি আবিরের দিকে একপলক তাকিয়ে শান্তস্বরে বললেন,
“ভাইজান, আমারও মনে হচ্ছে এই কাজটা করা ঠিক হচ্ছে না৷ ”
আলী আহমদ খান খাওয়া শেষ করে উঠে যেতে যেতে বললেন,
” মানুষকে ভালো হওয়ার সুযোগ করে দিতে হয়।”
আবির এবার ঠান্ডা কন্ঠে হুঙ্কার দিল,

” যদি তার কারণে কখনো কোম্পানির উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে তখন কেউ আমাকে বাঁধা দিতে আসবেন না। ”
আলী আহমদ খান চলে গেছেন। ইকবাল খান দু একটা কথা বলে নিজেও ওঠে গেছেন। আবির আর তানভির নিজেদের মধ্যে টুকটাক কথা বলছে। মেঘ খেতে খেতে বার বার আবিরকে দেখছে। আগের তুলনায় আবির একটু মোটা হয়েছে। দেখতেও কিছুটা ফর্সা লাগছে। মেঘ মিটিমিটি হাসছে আর খাচ্ছে। হঠাৎ আবিরের নজর পড়তেই ভ্রু নাচালো। মেঘ থতমত খেয়ে চোখ নামিয়ে নিল। খাওয়াদাওয়া শেষ করেই আবির ঘুমাতে চলে গেছে।
আজ সিফাত নামক ছেলেটা জয়েন করবে। আবির, আলী আহমদ খান আর ইকবাল খান তিনজন ই অফিসে আছে। সিফাত এসে আলী আহমদ খান আর ইকবাল খানের সাথে কথা বলে আবিরের মুখোমুখি হলো। আবির কপাল কুঁচকে সূক্ষ্ম নেত্রে তাকিয়ে আছে। সিফাত গুরুগম্ভীর কন্ঠে প্রশ্ন করলো,

“আপনি ই তাহলে সাজ্জাদুল খান আবির?”
“জ্বি। কোনো সমস্যা? ”
সিফাত হেসে বলল,
” না৷ আংকেলের মুখে আপনার কথা অনেক শুনেছি তাই জিজ্ঞেস করলাম।”
আবির গম্ভীর কন্ঠে বলল,
“অফিসে স্যার বলতে শিখুন।”
“সরি, স্যার।”
আবির ভ্রু কুঁচকে বলল,
” নিজের কাজে মনোযোগ দেন।”
আবির চলে গেছে। সিফাত নিরেট দৃষ্টিতে আবিরের দিকে তাকিয়ে আছে। এদিকে মোজাম্মেল খান একের পর এক কল দিয়েই যাচ্ছেন। আবির নিজের কেবিনে গিয়ে কল রিসিভ করতেই মোজাম্মেল খান রাশভারি কন্ঠে শুধালেন,
“আটকাতে পেরেছো?”

“না।”
“আমি জানতাম। তোমার আব্বুকে আমি খুব ভালোভাবে চিনি। ওনি যা বলবেন তাই করবেন। কিন্তু তাই বলে শত্রুর সাথে হাত মেলাবেন?”
আবির নিরুদ্বেগ কন্ঠে জবাব দিল,
“কিছু করার নেই চাচ্চু। এখন আমাদেরকেই সাবধানে থাকতে হবে। ”
আবির বিকেল দিকে নিজের অফিসে আসছে। রাকিব, রাসেলের সাথে অনেকদিন পর দেখা। অফিসের কাজ শেষে সবাইকে ছুটি দিয়ে তিন বন্ধু গল্প করতে বসেছে। অনেকদিনের জমানো কথা, অফিসের বিভিন্ন কাজ, পার্সোনাল লাইফ সব বিষয়েই গল্প চলছে। রাসেল হঠাৎ প্রশ্ন করল,

“আবির, বিয়ে কবে করছিস?”
আবির মলিন হেসে জবাব দিল,
” করবো করবো।”
“সেটা কবে? আর তোর শ্বশুর আসবে কবে?”
“আমার শ্বশুর আসলেই ধামাকা হবে।”
“কোনো? ”
“৬ মাস সময় যে ঘনিয়ে আসছে।”
রাকিব উদ্বিগ্ন কন্ঠে শুধালো,
“তুই কি ভেবেছিস? বাসায় আগে কথা বলবি? নাকি মেঘকে আগে জানাবি?”

” মেঘকে জানিয়ে তারপর বাসায় বলব। তবে সেটা একই দিনে। আমি ওকে কোনো প্রতিশ্রুতি দিব না। ডিরেক্ট বিয়ের অফার দিব আর ঘুম থেকে উঠলেই বাড়িতে বিয়ের আমেজ থাকবে। ”
এরমধ্যে মেঘের কল আসছে। রাসেল উঁকি দিয়ে নামটা দেখে একগাল হেসে বলল,
“ওনার নাম নিতেই কল চলে আসছে। ওনি অনেকদিন বাঁচবেন। ”
আবির মুচকি হেসে উত্তর দিল,
“বাঁচতে তো হবেই। ওর কিছু হলে আমি যে বেঁচে থেকেও ম*রে যাব। ”
আবির কল রিসিভ করে মৃদুস্বরে বলল,
“সারাদিনে এই মনে পড়ল?”
মেঘ গাল ফুলিয়ে শ্বাস ছেড়ে বলল,

“আপনিও তো কল দেন নি। ফুপ্পিরা বাসায় এসে আপনার জন্য অপেক্ষা করছেন। আপনার কি আসতে দেরি হবে?”
“না। এখনি আসতেছি।”
আবির তাদের থেকে বিদায় নিয়ে যেই উঠতে যাবে রাকিব আনমনে ডাকল,
“আবির..”
“বল”
“তোর আব্বু যদি সত্যি সত্যি মেনে না নেয় তখন কি করবি?”
আবির দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে রাশভারি কন্ঠে জবাব দিল,
” ম*রে যাব।”
রাসেল বলল,
“ফাজলামি করিস না। সিরিয়াসলি বল”
আবির অগ্নিদৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,

“তোদের কি মনে হচ্ছে আমি ফাজলামি করতেছি? আব্বু চাচ্চু সহজে মেনে নিলে ভালো, যদি বলে মেঘকে নিয়ে বাড়ি থেকে চলে যেতে তাহলে আরও ভালো। কিন্তু যদি বলে মেঘকে রেখে একা বেড়িয়ে যেতে তারপর কি হবে আমি জানি না। তবে এটায় সত্যি যে মেঘকে না পেলে, আমি ম*রে যাব।”
আবির বাসায় ফিরতেই আবিরের ফুপ্পি আবিরকে ডেকে নিয়ে গেছেন। মাহমুদা খান চিন্তিত স্বরে জানতে চাইলেন,
“কি সিদ্ধান্ত নিয়েছিস? বাসায় কবে বলবি?”
“৮-১০ দিনের মধ্যেই বলল।”

“তোর আব্বু কিন্তু তোর উপর ভীষণ রেগে আছেন। সেদিন অনেককিছু বলতেছিল, সাবধান।”
“তুমি কিসের জন্য এত ভয় পাচ্ছো? বাড়ি থেকে বের করে দিবে এই ভয়?”
“সম্পর্ক ছিন্ন করার ভয় পাচ্ছি।”
আবির মলিন হেসে বলল,

” ওনি যতবার সম্পর্ক ছিন্ন করবেন আমি ততবার নতুন করে সম্পর্ক মজবুত করব। প্রয়োজনে সুপার গ্লু দিয়ে সম্পর্ক জোড়া লাগাবো। যাই হয়ে যাক না কেন, গ্লু নষ্ট হবে না।”
“সিরিয়াস বিষয় নিয়েও তুই মজা করছিস?”
আবির ফুপ্পির দিকে তাকিয়ে গুরুভার কন্ঠে ডাকল,
“ফুপ্পি”
“হ্যাঁ বল।”

“আমি যদি মা*রা যায় তুমি কি আমায় মিস করবা?”
মাহমুদা খান আবিরের কান চেপে ধরে রাগান্বিত কন্ঠে বললেন,
“তোর সাহস কতটুকু হয়ছে যে তুই আমার সামনে দাঁড়িয়ে মরা*র কথা বলিস।”
আবির আর্তনাদ করে উঠল,
“সরি ফুপ্পি, সরি। আর বলবো না।”

আবির বাসায় ফিরেছে তিনদিন হলো। মোজাম্মেল খান এখনও বাসায় ফিরেন নি। আজ শুক্রবার হওয়ায় তানভির, আবির দু’জনেই বাসায়। গত ৫ মাসে মেঘের সাথে কথা বলতে বলতে বৃহস্পতিবারের রাত জাগার অভ্যাস টা একদম কেটে গেছে। আবির সকালের নাস্তা করে সেই যে রুমে গেছে, আর বের হওয়ার নাম নেই৷ বাড়িতে আসার পর থেকে মেঘের সাথে কথাও কমে এসেছে। চোখের ইশারায় টুকটাক দুষ্টামি করলেও মুখে কিছুই প্রকাশ করে না। ১১ টার দিকে মেঘ আবিরের রুমের সামনে আসছে। আবির দুচোখ বন্ধ চুপচাপ শুয়ে আছে। মেঘ পা টিপে টিপে রুমে ঢুকে আবিরের বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে অপলক দৃষ্টিতে আবিরকে দেখছে। অকস্মাৎ আবির বলে উঠল,

” একটা অবোধ বালকের দিকে কুনজর দিতে আপনার লজ্জা লাগে না?”
মেঘ ভেঙচি কেটে জবাব দিল,
“কে অবোধ? আপনি?”
“তা নয়তো কে? কেনো আসছিলেন?”
মেঘ ঠান্ডা কন্ঠে বলল,
” আসার পর থেকে দেখছি যতক্ষণ বাসায় থাকেন ততক্ষণ আপনি রুম থেকে বের ই হোন না, কারো সাথে কথা পর্যন্ত বলেন না। কি হয়েছে আপনার?”
আবির শুয়া থেকে উঠে বসে মুচকি হেসে বলল,
” ভাবছি ঘরে বসে থেকে কয়েকদিনেই আপনার মতো একটু সুন্দর হয়ে যাব।”

মেঘ স্ব শব্দে হেসে বলল,
” পারবেন না। ”
“কেনো?”
“এমনি।”
আবির বসা থেকে উঠে রুম থেকে বের হতে হতে বলল,
“ওয়েট, আজ রূপচর্চা করে হলেও সুন্দর হয়েই ছাড়বো । ”
মেঘ হাসতে হাসতে বলল,
“আপনাকে সুন্দর হতে হবে না। আপনি এমনেই সুন্দর আছেন।”

আবির ঠোঁট চেপে হেসে বেড়িয়ে গেছে। তানভিরের রুম থেকে তানভিরকেও টেনে নিয়ে গেছে। ফ্রিজ থেকে দুটা শসা বের করে ঠান্ডা শসায় কেটে চোখে দিয়ে বসেছে। সাথে একটা ন্যাচারাল প্যাক বানিয়েও মুখের লাগিয়েছে। সামনে প্লেটে আবির আরও কিছু শসা কেটে রেখেছে। তানভির চোখের শসা রেখেই হাত বাড়িয়ে একটা একটা করে সব খেয়ে ফেলছে।ওদের কান্ড দেখে মেঘ আর মীম হাসতে হাসতে ক্লান্ত হয়ে যাচ্ছে। ভিডিও করে বন্যাকেও পাঠিয়েছে। এরমধ্যে আদি আসছে। ওদের চোখ মুখ দেখে আদিও উত্তেজিত কন্ঠে বলল,

“ভাইয়া তোমরা কি দিয়েছো? আমিও দিব।”
মেঘ শান্ত কন্ঠে বলল,
“আয়, আমি তোকে দিয়ে দিচ্ছি।”
আবির উদাসীন কন্ঠে বলল,
“আজ আমাদের যত্ন নেয়ার কেউ নেই বলে। ”
মেঘ ঠান্ডা কন্ঠে বলল,

আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে পর্ব ৬৮

” আপনারা চাইলে আমি আপনাদের ফেসিয়াল করে দিতে পারি। ”
হঠাৎ বাহিরে আলী আহমদ খানের কন্ঠ শুনে আবির আর তানভির উঠে যে যার মতো দৌড়। যেতে যেতে তানভির বলল,
” থাক বাবা, আরেকদিন। আজকের মতো পালায়।”

আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে বোনাস পর্ব