পাতা বাহার পর্ব ৫২ (২)
বেলা শেখ
নিত্যদিনের মতো আজকেও অলস পাতা বেলকনিতে অবস্থিত দোলানায় বসে আছে! সময়টা মধ্যাহ্নের পর পর! ভোর স্কুল থেকে আজ জলদিই ফিরেছে! হুজুরের কাছে আমপাড়া পড়ছে। ছোট্ট ভোর বাংলা ইংরেজিতে পড়াচোরের ভূমিকা পালন করলেও আরবি পড়াকালীন কোনো তাল বাহানা করবে না। আর আরবিতে সে দক্ষ! সাতটা সূরা সহ বেশ কিছু দোয়া দরুদ তার ঠোঁটস্থ। হুজুর বলেছে খুব শিগগিরই তাঁর আমপাড়া পাঠ শেষ হবে! এরপর অনেকবার রিভিশনের পর কুরআন শরীফ হাতে দেবে।
পাতা দোলনায় বসে পা দোলায়! লোমশ কিছু বারংবার পায়ে ছুঁয়ে দিচ্ছে। পাতার সুরসুরি লাগে। অল্প ঝুঁকে দেখে পাতাবাহার বসে। তাঁর তাকানোতে মিও মিও করে ডাকে! পাতা নাক মুখ কুঁচকে নেয়! ইদানিং তাঁর এই অসভ্য বিড়ালটাকে একদমই অসহ্য লাগে। এখন তাঁর গা ঘেষছে পিছু পিছু ঘুরছে অথচ নাক উঁচু লোক আসলে বিড়ালটি পাতা কে চেনেই না। সে অরুণ সরকারের কাছে থাকলে বিড়লটি সিসিটিভি ক্যামেরার ন্যায় আড়চোখে তাদের পর্যবেক্ষণ করবে। পাতা পা দিয়ে ঠেলে সরিয়ে দেয় বিড়ালটিকে। পাতাবাহার যায় না। সেখান থেকে উঠে গ্রিলে ঝুলে পড়ে। পাতার চোখ বড় বড় করে চায়! বিড়ালটি সুইসাইড করবে না তো? পাতা কেমন বোকা বোকা হয়ে যায়! চিল্লিয়ে ভোরকে ডাকতে থাকে! ভোর ও তাঁর হুজুর সাথে সাথেই দৌড়ে বেলকনিতে উপস্থিত হয়! পাতা আঙ্গুল দিয়ে গ্রিলে ঝুলতে থাকা বিড়ালটিকে দেখিয়ে বলে,
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
-” পড়ে যাবে তো ওই ছা’পোষা!”
ভোর ও তাঁর হুজুর ভ্রু কুঁচকে দেখে বিড়ালকে। পাতাবাহার গ্রিল বেয়ে একবার উপরে উঠছে তো একবার নিচে। যেন পাতাকে বোকা বানিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করছে। ভোরের হুজুর মুচকি হেসে বলল,
-” পড়বে না নিশ্চিন্তে থাকুন। আপনি এমন ভাবে চিল্লিয়ে উঠলেন আমরা ভেবেছি কি না কি হয়েছে!”
পাতা কাঁচুমাচু চোখে ভোরের দিকে চায়! ইশ্ কেমন একটা পরিস্থিতি। বিড়ালের বাচ্চা ছা”পোষাটা তাকে বোকা বানালো? নাকি সেই বোকা! পাতা আড়চোখে ভোরের হুজুরের দিকে চায়।মাথা নিচু করে আছে; তাঁর দিকে ভুলেও তাকাচ্ছে না। লোকটা তাঁর বয়সী হবে। বেশ ভদ্র ও লাজুক। ভোর নিশ্চয়ই এর কাছ থেকেই লাজুক স্বভাবের হদিশ পেয়েছে! নয়তো ভোরের বাবার কাছে ম্যানারস, লাজুকতার ছিটেফোঁটাও খুঁজে পাওয়া যাবে না। আর বাচ্চারা এমনিতেই অনুকরণ প্রিয় হয়ে থাকে। সম্মুখে আশেপাশে যা দেখবে নিজেকেও সেভাবেই প্রদর্শন করবে। তাই ছোট বাচ্চাদের সামনে ভেবে চিন্তে কার্যসম্পাদন করা উচিত। আপনি ভালো কাজ করলে বাচ্চারা অনুপ্রাণিত হবে; তথাপি খারাপ কাজ করলেও বাচ্চারা সেটা করতে কুণ্ঠাবোধ করবে না। তাদের ধারণা হয়তো এই হবে ‘বড়রা করছে তাহলে ভালো কাজই হবে।’
ভোর ও ভোরের হুজুর চলে গেলে পাতা বিড়ালটির লেজ টেনে ধরে। খাঁচায় পুরে কটমট করে বলে,
-” শালার বিড়াল!”
ভোর আরবি পড়া শেষ করে হুজুরকে বিদায় দিয়ে পাতার পাশে দাঁড়িয়ে থাকে। পাতা খেয়াল করে ভোরকে। ছেলেটার চোখে মুখে কেমন লজ্জালু ভাব! গুলুমুলু ফর্সা গালে লাল আভার দেখা মিলে ক্ষীণ। ঠোঁটের এক চিমটে লজ্জা বরণ হাসি। পাতা খেয়াল করে ভোর দু হাত পেছনে রেখে কিছু লুকাচ্ছে। পাতা তাকে টেনে কাছে আনে। প্রেগন্যান্সির সাত মাসের ফুলো পেট হওয়ার দরূণ কোলে নিতে পারে না। নইলে কোলে নিয়ে চুমুতে ভরিয়ে দিতো এই রসে ভরা রসগোল্লাকে! এতো আদুরে বাচ্চা! আর লালিমায় আচ্ছাদিত ভোর যেন কিউটনেসের সীমা অতিক্রম করে ফেলে। পাতা ভোরকে সামনে দাঁড় করিয়ে চুমু দেয় কপালে। লালিমা ছেয়ে যাওয়া কপোলেও দেয়! তবে ভোর আগের মতো অপর গাল এগিয়ে দেয় না। মুচকি হেসে লজ্জা লুকানোর চেষ্টা করে। পাতা তাঁর গাল জোড়া টেনে বলে,
-” কি হয়েছে ভোরের? হাতে কি? লেটার মনে হচ্ছে! এই লাভ লেটার? কে দিলো? বাব্বাহ ভোর সোনা এখনি লাভ লেটার বড় হলে তো দেখছি গেইটে মেয়েদের লাইন লেগে যাবে!”
ভোরের নাক মুখ কুঁচকে যায়। হলুদ খামে মোড়ানো চিঠিটা পাতার হাতে দিয়ে বলে,
-” আমাকে দেয় নি! আব্বুকে দিয়েছে একটা আন্টি। টুটুল বলল এটা নাকি লাভ লেটার! টুটুলের আব্বু ওর আম্মুকে দেয়।”
পাতার মুখখানি চুপসে গেল নিমিষেই। তাঁর ছেলের কাছে তাঁরই জামাইকে লাভ লেটার দিয়েছে? পাতা মুচকি হেসে খাম থেকে চিঠিটা বের করে। তাঁর মনের একাংশে ঈর্ষা নামক উদ্বায়ী বস্তু উদ্ভাবিত হলেও পাতা গায়ে লাগায় না। যতই লাভ লেটার আসুক লোকটাতে তো তাঁরই সিলমোহর!
ভোর আগ্রহ ভরা নয়নে চেয়ে আছে চিঠি পানে! আব্বুকে কি লিখেছে ওই আন্টিটা? পাতা চিঠিটা পড়ে মনে মনে। ভোর শোনার জন্য বায়না করলে পাতা তাকেও শোনায়। চিঠি পত্রের প্রেমবাক্য পড়ে পাতা ভোর শান্ত সুবোধ চন্দ্রের ন্যায় চুপ থাকে। আড়চোখে দুজনে দুজনের দিকে তাকায়! চোখাচোখি হলে অস্বস্তিতে পড়ে পাতা! ভোর পাতার বাহু ধরে ডাকে,
-” ও আম্মু?”
পাতা ভোরের দিকে তাকালো। ভোরও তাকিয়ে! হঠাৎ কি হলো কে জানে। দু’জনে ভূবন ভোলানো হাসির ঝংকারে দেয়ালের ফাঁকফোকরের আগাছা মোড়ানো ছোট্ট বাসায় চড়ুই পাখি উড়ে চলে যায় অন্যত্র। ঘরময় প্রতিধ্বনিত হয় তাদের হাসির শব্দের ঝংকার।
গোধূলি পেরিয়ে ধরনী রাতের কবলে। ড্রয়িংরুমে পাতা ও ভোর চুপচাপ বসে আছে। অনবরত কলিং বেল বাজলেও কারোর মাঝেই দরজা খোলার কোনো উদ্বেগ দেখা যায় না। পাতা ভোরকে অংক শিখিয়ে দিচ্ছে। ভোর পেন্সিল মুখে পুরে হা করে গিলছে। কিছুই তাঁর মাথায় ঢুকছে না। তবে বাধ্য ছেলের ন্যায় পাতার কথার প্রেক্ষিতে মাথা নাড়াতে ভুলে না। হঠাৎ কলিং বেলের আওয়াজ বন্ধ হয়ে যায়। কেউ ভিতরে প্রবেশ করে। পাতা ভোর আড়চোখে দেখেও নিজ কাজে মনোনিবেশ করে।
অরুণ বিরক্ত মুখে বড় বড় পা ফেলে এসেই ঝাড়ি দেয়,
-” এখানেই ছিলে দু’জন কলিং বেলের আওয়াজ কানে ঢোকে নি? এক্সট্রা চাবি না থাকলে ভিতরে কিভাবে আসতাম!”
পাতা ভোর মাথা তুলে একনজর তার দিকে তাকিয়ে আবার নিজ কাজে মনোনিবেশ করে। অরুণ বিরক্তিকর চাহনি নিক্ষেপ করে রুমের দিকে রওনা হয়। আশ্চর্য কিসিমের প্রাণী এ দু’টো! অরুণের পেছনে তাঁর বউ নামক পাতাবাহার না দৌড়ালেও বিড়াল নামক পাতাবাহার দৌড় লাগায়!
একটু পর অরুণ ড্রয়িংরুমে আসে। পরণে শুধু টাওজার আর গলায় তোয়ালে! সে এসে ভোরের কপালে গালে ঠোঁট দাবিয়ে চুমু দেয়। ভোর প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে না। লিখতেই থাকে। যেন পড়ালেখায় তাঁর চেয়ে মনোযোগী বাচ্চা আরেকটা নেই! অরুণ ভ্রু কুঁচকে ভাবে হয়েছে টাকি তাঁর দুই চড়ুইয়ের ! কিচিরমিচির শব্দে কেন মুখরিত করছে না তাঁর কর্ণ গহ্বর, মনকুঠিরের আঙিনা! সে পাতার পাশে বসে।একদম গা ঘেঁষে। কপালে গলায় হাত রেখে নরম গলায় সুধায়,
-” চুপচাপ কেন চড়ুইয়ের দল? খারাপ লাগছে? খেয়েছো দুজন? এই কথা বলছো না কেন পাতাবাহার? কলিজা?”
কন্ঠে উদগ্রীবতার রেশ! কেমন অস্থির ভাব প্রকাশ করছে! পাতা তাঁর বলিষ্ঠ হাত নিজ পিঠ গলিয়ে কাঁধে রাখে; লোমশ বুকে মাথা রেখে মুচকি হাসে। ভোর পকেট থেকে চিঠিটা বের করে বাবার হাতে ধরিয়ে গম্ভীর মুখে বলে,
-” ওই আন্টি তোমাকে লাভ লেটার কেন দিবে?”
অরুণের কপালে গাঢ় ভাঁজ পড়ে। পাতাকে সরিয়ে দিয়ে চিঠিটা হাতে নেয়।
-” কিসের লাভ লেটার!”
-” ওই যে তুমি যাকে একদিন আমাদের গাড়িতে লিফট দিয়েছিলে? সেই আন্টি তোমাকে দিতে বলেছে এই লাভ লেটার ! আমি আম্মুকে দিয়েছিলাম! আম্মু পড়েছে!”
-” আমাকে দিতে বলেছে আমাকেই দিতে; তোমার আম্মুকে কেন দিয়েছো? চিঠি পড়তে ভালোই লাগে। স্টুডেন্ট লাইফে কত চিঠিপত্র পেয়েছি! ”
চিঠি পড়ার মাঝেই জবাব দেয় অরুণ সরকার! পাতা ছোট ছোট চোখে চায়। চুল দাঁড়ি পাকতে শুরু করছে অথচ বুইড়া বেডার প্রেমপত্র পড়ার শখ যায়নি! মনে মনে বলেই পাতা তওবা কাটে। তাঁর জামাইটা মোটেও বুইড়া বেডা না। কালো কুচকুচে চুল, দাঁড়ির মাঝে সাদা চুল উঁকি ঝুঁকি দিলেও নিজ গাম্ভীর্যে ভরপুর ব্যাক্তিত্বে ঠাসা বলিষ্ঠ সপুরুষটি এখনো কিশোরী মেয়েদের তাক লাগিয়ে দিতে পারবে হুম!
অরুণ চিঠি পড়ে পাতা ভোরের দিকে তাকিয়ে বলে,
-” এটা তো লাভ লেটার নয়! মেয়েটা ধন্যবাদ জানিয়েছে।”
-” এটা থ্যাংকস লেটার; লাভ লেটার না আব্বু?”
উচ্ছ্বসিত হয়ে বলে ভোর। তাঁর আব্বুকে কেউ লাভ লেটার দেয় নি! আম্মুর নিশ্চয়ই আর খারাপ লাগবে না! অরুণ উপর নিচ মাথা নেড়ে সায় জানালো ভোরের কথায়। পাতা এখনো চুপটি করে বসে। অরুণ ভ্রু উঁচিয়ে তাকে ইশারা করে ‘কি হলো?’ পাতা মুচকি হেসে না বোধক মাথা নেড়ে বলে ‘কিছু না’! অরুণ তার গাল টিপে চিঠিটা টাওজারের পকেটে পুরতে নিবে পাতা খপ করে ধরে কুচি কুচি করে ফেলে দেয়। অরুণ হেসে ওঠে হালকা শব্দ করে!
-” পাতাবাহার, হোয়াই আর ওমেন সো জেলাস?”
-” বিকজ দে নো হাউ টু লাভ ম্যাডলি উইথ অল দেয়ার হার্ট এন্ড সৌল!”
ফটাফট জবাব পাতার! অরুণ মুচকি হাসলো। পাতা আবার বলে,
-” আপনার তথাকথিত মহিলারা চায় তাদের ব্যাক্তিগত পুরুষের উপর শুধু তাদের ছায়া থাকুক! অন্য সব আবছায়া নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হোক!”
-” পাতাবাহার তুমি যতই বিড়ালকে পোষ মানাও তাঁর ছোক ছোক স্বভাব যাবার নয়। মাছ দেখলে সে মুখ দেয়ার চেষ্টা করবেই!”
নিরেট গলায় বলে অরুণ। সাথে পাতার অভিপ্রায় দেখার চেষ্টায়! পাতার আলোক উজ্জ্বলতায় আচ্ছাদিত মুখশ্রীতে আঁধার নেমে আসে।অরুণের দিকে থমথমে গলায় বলে,
-” বিড়াল ছোক ছোক করবে আর মালকিন বসে বসে আঙ্গুল চুষবে নাকি? জাতের বিড়াল কুজাতি কাজ করলে ঘাড়ধাক্কা দিয়ে ঘর থেকে বের করে দিতে দেড়ি হবে না।”
অরুণ প্রসন্ন হাসলো। সোফা ছেড়ে উঠে গলায় ঝুলানো আধভেজা তোয়ালে পাতার মুখের উপর ছুড়ে কিচেনের দিকে যেতে যেতে বলে,
-” ঘরে এরকম আদুরে, গুলুমুলু সুন্দরী ও সুন্দর মনের অধিকারী জামাই পাগলি বউ থাকার পরও পুরুষ যদি বাইরে ছোক ছোক করে তাঁর উপর লানত পড়ুক পাতাবাহার!”
পাতার মেঘে ঢাকা আকাশে রৌদ্রের দেখা মিলে। গলা খাঁকারি দিয়ে বলে,
-” আপনি কি গুলুমুলু বলে ইনডিরেক্টলি আমাকে মোটা বললেন?”
-” প্রশংসা করলাম সেটা তো কানে যায় নি ক তে কাশিমপুর ভাবা মহিলা।”
উঁচু গলায় অরুণের আওয়াজ ভেসে আসে কিচেন থেকে। পাতাও গলা উঁচিয়ে বলে,
-” আপনি মহিলা বলে কি প্রমাণ করতে চান? আমি বুড়িয়ে যাচ্ছি?”
-” না রে মায়ের মা! বুড়ো তো আমি! আর তুই এই বুড়োর কিশোরী বউ!”
অরুণের উত্তরে পাতা চোখ রাঙিয়ে বলল,
-” এই নাক উঁচু ম্যানারলেস লোক আপনি ইনডিরেক্টলি আমাকে বুড়োর বউ বললেন?”
অরুণ হতাশ বদনে ফ্রিজ থেকে আপেল বের করে তিনটে। কিচেনের সিংকে ধুয়ে ড্রয়িং রুমে আসলো। পুনরায় পাতার পাশে বসে বলে,
-” ঝগরুটে হয়ে যাচ্ছো পাতাবাহার!
পাতা কিছু বলবে তার আগে ভোর লেখা বাদ রেখে টি টেবিলের উপর উঠে দাঁড়ালো। কোমড়ে হাত রেখে ভ্রু কুটিতে ভাঁজ ফেলে বলল,
-” আশ্চর্য! তোমরা ঝগড়া করছো কেন? আমার পড়ায় ডিস্টার্ব হচ্ছে তো!
অরুণ ভোরের দিকে তাকিয়ে রাশভারী গলায় বলে,
-” সাপ্তাহিক পরীক্ষার রেজাল্ট বেরিয়েছে আব্বাজানের?”
ভোরের চোখ মুখের আকার পরিবর্তন হয়। ঘন ঘন না বোধক মাথা নেড়ে কাঁচুমাচু করে টি টেবিলের উপরে বসেই লিখতে শুরু করে।
অরুণ কপালে ভাঁজ পড়ে।
-” বের হয় নি না? আমি তো শুনলাম ফেল করেছো তুমি। একশতে এক শূন্য পেয়েছো!”
-” তুমি ভুল শুনেছো! আমি পাঁচ শূন্য পেয়েছি! মানে পঞ্চাশ। পাশ করেছি তো।
ভোর বড় বড় করে তাকিয়ে বলে। বলেই জিভে কামড় দিয়ে চোখ খিচে নেয়। আব্বু নিশ্চয়ই অনেক বকবে! আম্মুও রাগ করবে। অরুণ বকে না। শান্ত গলায় বলে,
-” বাকি পঞ্চাশ নম্বর কোথায় গেলো?”
-” আব্বু ওটা ম্যাডাম রেখে দিয়েছে মনে হয়!”
ইনোসেন্ট ফেস বানিয়ে বলে ভোর! অরুণ চোখ রাঙায়! ভোর পিটপিট করে চায়। চোখে জল আনার প্রচেষ্টা করে। নইলে বকা খেতে খেতে আজ তাঁর ডিনার খাওয়া হবে না। পাতা উঠে আসে। ভোরের পাশে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে বলে,
-” কত সুন্দর করে পড়ালাম! সব অংক পারো তুমি। তাহলে এতো কম নম্বর? আর রেজাল্ট দিয়েছে বলও নি!”
ভোর হালকা দুঃখবোধ করে। সে ভালো করেই লিখেছে এক্সামে। তবুও কম কিভাবে পেলো?
-” রোহান ফাস্ট হয়েছে। তোমার বন্ধু টুটুলও এইট্টি ফাইভ নম্বর পেয়েছে! সবার স্কোর সিক্সটি প্লাস! র ্যাংকিয়ে লাস্ট তুমি। ফাস্ট হতে বলিনি তাই বলে লাস্ট হবে?”
চড়া গলায় বলে অরুণ! ভোরের এবার আর চোখের জল আনার জন্য বৃথা চেষ্টা করতে হয় না। আপনে আপ এসে যায়। ভোর সোফা, টি টেবিলের উপর থেকে বই খাতা নিয়ে ফ্লোরে ছুঁড়ে ফেলে রাগে ক্ষোভে চিল্লিয়ে বলে,
-” আমি সব সুন্দর করে লিখেছিলাম তো। টুটুল তো আমার টা দেখেই লিখলো; ও বেশি পেলো! আর আমি কম! ভোর আর স্কুলে যাবে না। পড়বেও না।”
পাতা শান্ত চোখে অবলোকন করে সব। তাঁর মাথায় কিছু রহস্য ঘুরপাক খায়। ভোরকে সে এক্সামের জন্য ভালো ভাবেই প্রিপেয়ারড করেছিল। এক্সাম দিয়ে এসেও ভোর বলেছে সব লিখেছে। তাছাড়া ভোর পড়াশোনার ক্ষেত্রে একটু অমনোযোগী হলেও দূর্বল ছাত্র না যে লাস্ট হবে। একবার প্রিন্সিপাল ম্যামের সাথে কথা বলতে হবে! পাতার ভাবনাচ্ছেদ ঘটে অরুণের কান্ডে!
অরুণ সোফা ছেড়ে ভোরের বাহু ধরে ধমক দিয়ে বলে,
-” স্কুলে যাবে না, পড়বে না ! তাহলে কি করবে টা কি শুনি? তুমি পড়বে তোমার বাবা সুদ্ধ পড়বে। ঘাড়ত্যাড়ামি করলে বিয়ে করিয়ে…’
অরুণকে শেষ করতে না দিয়েই ভোর বলে ওঠে,
-” করিয়ে দাও বিয়ে! লাল টুকটুকে বউ আনো। এক টা না দশটা আনো। তবুও ভোর স্কুলে যাবে না।”
পাতার হাসি পায়; ঠোঁট চেপে হাসে। ভোর তাঁর হাসি দেখে আরো রেগে যায়। বাবার হাত ঝটকায় সরিয়ে শব্দ করে পা ফেলে নিজ রুমের দিকে অগ্রসর হয়। উঁচু গলায় হিসহিসিয়ে বলতে থাকে,
-” ভোর ভাত খাবে না বিয়ে করিয়ে দিবো। ভোর গোসল করবে না বিয়ে করিয়ে দিবো। খালি বিয়ে বিয়ে! আমার কি বিয়ের বয়স হয়েছে নাকি!”
পাতা তার কথা শুনে শব্দ করে হেসে উঠলো। অরুণের গম্ভীর মুখেও হাসির রেখা। সে ভোরের পিছু যাবে পাতা হাত ধরে আটকিয়ে বলে,
-” ভোরের বাবা খবরদার ছেলেকে বকলে! ছোট বাচ্চা। আজ লাস্ট এসেছে কাল ফাস্ট আসবে। শুধু বুঝিয়ে বলুন।”
অরুণ কিছু না বলে আলগোছে ভোরের রুমে চলে যায়। পাতা কিছু সময় বসে থেকে আস্তে করে উঠে দাঁড়ালো। হাত পা ঝিমঝিম করছে। বমি বমি ভাব হচ্ছে। পাতা রুমের দিকে অগ্রসর হবে; কিছু পড়ার শব্দ হয়! পাতা চকিত নজরে চায়। বাড়ন্ত পেটে হাত রেখে যত দ্রুত সম্ভব ভোরের রুমে চলে যায়। শব্দটা সেখান থেকেই আসলো। নাক উঁচু লোকটা ছেলেটাকে কাঁদালে আজ পাতা তাকে দেখে নিবে হুম!
তবে রুমে গিয়ে পাতা ভাবনায় পড়ে, হয়েছে টা কি! ফ্লোরে অরুণ সরকার চিৎ হয়ে শুয়ে আছে; ভোর তাঁর বুকের উপর বসে খিলখিলিয়ে হাসছে। প্রাণোচ্ছ্বল সেই হাসি। হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খাবার উপক্রম। পাতাকে দেখে ভোর হাসতে হাসতে বলে,
-” ও আম্মু জানো কি হয়েছে? আব্বু বকছিলো আমাকে। আমি রেগে আমার ওই খেলনা রাবারের স্নেকটা আব্বুর দিকে ছুঁড়ে মেরেছিলাম। আব্বু ভয় পেয়ে পিছলে পড়ে গেল।”
রাতের ভোজন শেষে ভোর ঘুমিয়ে পড়েছে নিজ রুমে। পাতাও ঘুমে ঢুলু ঢুলু অবস্থায় বিছানায় বসে আছে। অরুণ পুরো রুম জুড়ে পায়চারী করছে! পাতা হামি তুলে বলে,
-” এই ভোরের বাবা? শুয়ে পড়ুন আমি মালিশ করে দিচ্ছি! আরাম পাবেন ঘুমও চলে আসবে।”
-” তোমার ওই নরম তুলতুলে হাতের মালিশে আরাম তো পাবো কিন্তু ঘুম আসবে না।”
কোমড়ে হাত রেখে বলে অরুণ। তখন ভোরের রুমে পড়ে যাওয়ায় একটু আকটু ব্যাথা পেয়েছিলো তবে আমলে নেয় নি! এখন অসহ্যনিয় ব্যাথায় একদন্ড স্থীর থাকতে পারছে না। ওষুধ খেয়েছে তবে ওষুধের কার্যকারিতা শুরু হতেও তো সময় লাগবে। সেই সময় টুকু সহ্য করা যাচ্ছে না। আশ্চর্য সে কি বুড়ো হয়ে যাচ্ছে?
-” কেন ঘুম আসবে না শুনি?”
পাতার প্রশ্নে অরুণ তাঁর দিকে তাকালো। কিছু বলে না। না কিছু ইশারা করে। তবে তার ছোট মায়াময় শান্ত চোখের গভীরতা কিছুটা হলেও আন্দাজ করে পাতা লাজে রাঙা হয়! এসির পাওয়ার কমিয়ে কম্ফোর্টে নিজেকে মুড়িয়ে নেয়। অরুণ আরো কিছু সময় পায়চারি করে। ব্যাথা কমছে না; মনে হয় বাড়ছে। অরুণ ওষুধের বক্স থেকে একটা ঘুমের ওষুধও খেয়ে নিল। ব্যাথা নাশক স্প্রে এনে বিছানায় বসে পাতাকে ডাকে ; ঘুমিয়েছে কিনা! পাতার চোখ লেগেছিল তবে ঘুম গাঢ় হয় নি। সে উঠে বসতেই অরুণ তাঁর হাতে স্প্রে টা দিয়ে উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ল। পাতা হামি তুলে কোমড়ের কাছটায় স্প্রে করে মালিশ করে দিতে থাকে। অরুণ আরাম পেল বোধকরি। ঘুম জড়ানো গলায় বলে,
-” ওই কাওসারের বাবা ফোন করেছিলো। কাউসারও করেছিলো। ওর নাকি বিয়ের ডেট ফিক্সড হয়েছে তারই জন্য ইনভাইট করলো!”
পাতা উচ্ছসিত গলায় বলে,
-” হ্যাঁ আমাকেও ফোন করেছিল কাওসার ভাই। সামনের শুক্রবারে বিয়ের ডেইট!”
অরুণ ছোট্ট করে ‘হুম’ বলে। পাতা জিজ্ঞেস করে,
-” তো কবে যাচ্ছি আমরা? হুম? আমার তো ভাবতেই খুশি খুশি লাগছে। সেই ছোট্ট বেলা থেকে কাওছার ভাইয়ের বউ দেখবো বিয়ে খাবো বলে কত বায়না করেছি ওর কাছে! এই ভোরের বাবা আমরা কিন্তু দু’দিন আগেই যাবো। মা বলেছে জলদি করে যেতে!”
অরুণ পাশ ফিরে চিৎ হয়ে শুয়ে স্বাভাবিক সুরে বলে,
-” কোথাও যাচ্ছি না। প্রথমত তোমার শারীরিক কন্ডিশন। ডাক্তার সতর্ক থাকতে বলেছে । আর দ্বিতীয়ত সম্পর্কটা একটু দূরের। তোমার খালুর ছোট ভাইয়ের ছেলে। তাছাড়া আমাদের রিসেপশনে তাদের বাড়ি গিয়ে ইনভাইটেশন দেয়া হয়েছিল। ওনারা এসেছিল? শুধু কাওছার এসেছিল কিন্তু।
-” আমার শৈশব কৈশোরের চোদ্দ পনেরটা বছর সেখানে কাটিয়েছি। কাওছার ভাই আমার খুবই পছন্দের একজন। হাতেগোনা কয়েকজনের স্নেহের হাত আমার মাথায় পড়েছে তন্মধ্যে কাওছার ভাই একজন। আপনার কাছে দূরের সম্পর্ক হলেও আমার নিকট আপন। তাঁর জীবনের স্পেশাল একটা দিন আর আমি যাবো না?আমি যাবো।”
জেদি গলা পাতার। অরুণ হামি তোলে; ঘুমে আধবোজা চোখ বুজে নিয়ে বলে,
-” আমি যাচ্ছি না। আমি না গেলে তোমার যাওয়ার প্রশ্নই নেই। কোনো কথা না? ঘুমিয়ে পড়ো!”
পাতা অরুণের বলিষ্ঠ পেটে নখ দাবিয়ে খামচি দিয়ে শুয়ে পড়ল অরুণের দিকে পিঠ করে। অরুণ মুচকি হেসে পাতাকে পেছন থেকে জড়িয়ে নেয়। তাঁর এক হাত বাড়ন্ত পেটে আলতো করে বুলিয়ে দিচ্ছে। অরুণ পাতার কাঁধে ঠোঁট দাবিয়ে সশব্দে চুম্বন করে।
ঘুমের ওষুধের প্রকোপে পরদিন সকালে অরুণ সরকারের ঘুম থেকে উঠতে দেড়ি হয়! ঘুমের ঘোরেই বিছানা হাতরিয়ে পাতাকে ও ভোরকে খোঁজে। না পেলে তাঁর বুকটা ধ্বক করে ওঠে। ঘুম ছুটে গেলে অরুণ শুনতে পায় তাঁর দুই চড়ুইয়ের কিচিরমিচির! দরজা খোলা থাকায় ড্রয়িংরুম থেকে তাদের কলতান ভেসে আসছে। দেয়াল ঘড়িতে নজর পড়তেই অরুণ চটজলদি উঠে পড়ে। বিছানা থেকে নামবে তাঁর তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে কিছু আটকে যায়। বেড সাইড টেবিলে কিছু চিরকুট। অনেকগুলো! অরুণ কিছু চিরকুট হাতে নেয়! হলুদ রঙের একটা চিরকুটে গোটা গোটা অক্ষরে লেখা,
~এই নাক উঁচু ম্যানারলেস লোক,
আপনি চিঠি পড়তে ভালোবাসেন? আমি তাহলে চিঠি লিখতে ভালোবাসবো। আমার ভাঙা ভাঙা হাতে লেখা চিঠির প্রতিটা লাফজে আমি এক চিলতে ভালোবাসা লুকিয়ে রাখবো! আপনি খুঁজে নিবেন কিন্তু!°
অরুণ আরেকটা চিরকুট খোলে,
~এই ভোরের বাবা,
শুনুন? পাতার তরফ থেকে ছোট্ট করে একটা ধন্যবাদ। কেন? পাতার ধূসর রাঙা মেঘাচ্ছন্ন দিগন্তে অরুণের তেজস্বী রশ্মি ছড়িয়ে রৌদ্রজ্জ্বল করার জন্য। মূর্ছা যাওয়া এক আবেগী পাতার ক্লোরোফিল হওয়ার জন্য।°
অরুণ পর পর অনেক গুলো চিঠি পড়ে।একেক চিরকুটে একেক সম্বোধন । অরুণ উনিশ তম চিরকুট শেষ করে সে বিশ নম্বরটা পড়া শুরু করে,
পাতা বাহার পর্ব ৫২
~এই ভাবনার বাবা,
এই আবেগী পাতার রগে রগে আপনি নামক কনিকা বাহিত হয়! শুনুন এই পাতা কিন্তু আপনাকে অল্প অল্প ভালোবাসে।°
অরুণের সকালটা ভালো লাগায় ভরে ওঠে। সবগুলো চিরকুট সুন্দর ভাবে ভাঁজ করে সে টেবিলের উপর রাখে। আলমারির লকার থেকে একটা পুরোনো ডায়েরি বের করে সেথার ভাঁজে ভাঁজে চিরকুট গুলো রেখে লক করে দেয়। আলমারি বন্ধ করে গলা উঁচিয়ে ডাকে,
-” এই পাতাবাহার?”
