Home অনুরাগে তুই অনুরাগে তুই পর্ব ৫

অনুরাগে তুই পর্ব ৫

অনুরাগে তুই পর্ব ৫
সাদিয়া শওকত বাবলি

“আসতে বলেছি চুপচাপ আসবি। আমার প্রশ্নের পৃষ্ঠে কারো প্রশ্ন করা আমার একদম পছন্দ নয়।”
ত্রয়ী আর কোনো প্রশ্ন করল না। শরীরে জড়ানো ওড়নাটা টেনে নিজের ভেজা শরীরটাকে ঢাকার ব্যর্থ প্রয়াস চালাল। অতঃপর আড়ষ্ট ভঙ্গিতে উঠে গেল সুইমিং পুল ছেড়ে। শীর্ষ একবার তাকাল সেদিকে অতঃপর দুই হাতে পানি ঠেলে নিজেও উঠে এলো।
রাতের কৃষ্ণাভ আঁধারের সাথে পাল্লা দিয়ে কিছুটা সময় গড়ালো। চারদিকটা যেন নীরব নিস্তব্ধ হয়ে উঠল আরও। ত্রয়ী শীর্ষের আদেশ অনুযায়ী নিজের ভেজা পোশাক পালটে এলো রান্নাঘরে। ততক্ষণে শীর্ষও চলে এসেছে। নিজের ভেজা পোশাক পালটে শরীরে জড়িয়েছে এক খানা কালো রঙের ঢোলাঢলা টিশার্ট আর থ্রী কোয়ার্টার প্যান্ট। মাথার চুলগুলো থেকে এখনো মুক্ত দানার ন্যায় পানি ঝড়ছে। ঠিকভাবে মোছেনি হয়তো। ত্রয়ী দৃষ্টি নুইয়ে নিল। মিনমিনে স্বরে বলল,

“এখানে আসতে বলেছিলেন কেন?”
শীর্ষ রান্নাঘরের কোনে রাখা একটা মোড়া টেনে বসল তার ওপরে। পকেট থেকে মোবাইলটা বের করতে করতে বলল,
“ফ্রীজ থেকে খাবার বের করে গরম করে দে। এত রাতে মাকে ডাকতে ইচ্ছে হচ্ছে না। তাছাড়া মা হাই প্রেশারের রোগী। এত রাতে ডাকলে আবার না অসুস্থ হয়ে যায়।”
ত্রয়ী খেয়াল করল শীর্ষ তাকে তুই তুই করে বলছে। অবশ্য এটা যে সে এই প্রথম খেয়াল করেছে তেমন নয়। শীর্ষের সাথে দেখা হওয়ার পর থেকেই সে এটা খেয়াল করেছে। কিন্তু বিভিন্ন ঝামেলায় ঝামেলায় বিষয়টা নিয়ে আর কথা বলা হয়ে ওঠেনি। আচ্ছা শীর্ষ তাকে তুই তুই করে কেন বলে? তারা তো পূর্ব পরিচিত নয়। এখানে আসার আগে লোকটার সাথে কখনো তার দেখা হয়েছে বা কথা হয়েছে বলেও তো মনে পড়ছে না। তাহলে? অপরিচিত একজনকে দেখেই তাকে তুই তোকারি করা বিষয়টা কেমন অদ্ভুত লাগল ত্রয়ীর নিকট। কই বাড়ির আর কেউ তো তার সাথে তুই তোকারি করে না। সবাই তুমি তুমি করেই কথা বলে। তাহলে শীর্ষের বেলায় ভিন্নতা কেন? এমনিও অপরিচিত মানুষের মুখ থেকে তুই শুনতে ত্রয়ীর কেমন বিদঘুটে একটা অনুভূতি হয়। যদিও প্রশ্নটা করতে তার ইতস্তত লাগছে তবুও সে ইতস্তত বোধকে পাশে ঠেলে শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা করেই ফেলল,

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

“আপনি আমাকে তুই তুই করে কেন বলেন?”
শীর্ষ নিজের মোবাইলের দিকে দৃষ্টি রেখেই জবাব দিলো,
“তাহলে কি বলব? ওগো, হ্যা গো, শুনছো গো, আমার ভালোবাসার প্রাণপ্রিয় বালির বস্তা গো।”
ত্রয়ী হতবাক হলো। সে এমনটা কখন বলল? সামান্য একটা প্রশ্ন করেছে আর লোকটা কি আজেবাজে উত্তর দিচ্ছে। ত্রয়ী যে ভেবেছিল একে ভুতে ধরেছে তা কি শুধু শুধু? তার এবার মনে হচ্ছে একে সত্যিই ভুতে ধরেছে নয়তো নির্ঘাত মাথায় কোনো সমস্যা আছে। নয়তো একটা মানুষ এমন স্বভাবের কিভাবে হয়? মেয়েটা একটু সময় নিল। আমতা আমতা করে বলল,
“তেমনটা নয়। আসলে অন্যরা তো আমাকে তুমি করেই বলে। আপনিও দয়া করে তুমি করেই বলবেন। অপরিচিত কারো মুখে তুই শুনতে আমার কেমন যেন লাগে।”
শীর্ষ মোবাইল থেকে দৃষ্টি সরিয়ে তাকাল ত্রয়ীর দিকে। ঠান্ডা কণ্ঠে শুধাল,

“তুই বললেই তোকে আমার তুমি করে বলতে হবে? তুমি আমার বউ লাগিস নাকি প্রেমিকা?”
ত্রয়ী অপ্রস্তুত হলো। সে কি বলল আর এই লোকটা কোথায় নিয়ে গেল। সে শুধু বলল তাকে তুমি করে বলতে। আর এই লোক বউ, প্রেমিকা পর্যন্ত নিয়ে গেল। ত্রয়ী এলোমেলো দৃষ্টি ফেলে বলল,
“না মানে…”
“দুই দিন এ বাড়িতে আসতে না আসতেই বাড়ির মালিকের ছেলের দিকে নজর দিতে শুরু করেছিস? তুই তো দেখছি সুবিধার মেয়ে না।”
খারাপ লাগল ত্রয়ীর। সে তো এমন কথা ভুলক্রমেও ভাবেনি। শীর্ষের দিকে খারাপ নজর দেওয়া তো দূরে থাক তার দিকে চোখ তুলে ভালোভাবে দেখেইনি এখনো। মেয়েটা চটজলদি বিরোধীতা করল শীর্ষের কথার। প্রতিবাদী স্বরে বলল,

“আপনি ভুল বুঝছেন। তেমন কিছুই না।”
“তাহলে কেমন কিছু?”
“আপনি…”
ত্রয়ীর কথা সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই শীর্ষ উঠে দাঁড়াল। মোবাইলটা হাতে নিয়েই এগিয়ে এলো মেয়েটার দিকে। হালকা ঝুঁকে বলল,
“তেমন কিছু হলেও নজর ঠিক করে ফেলিস দ্রুত। আমার নজর কিন্তু তোর থেকেও বহুগুণ খারাপ। আমি একবার নজর পরিবর্তন করলে তোর বাঁচা দায় হয়ে পড়বে নিশ্চিত থাক।”
থামল শীর্ষ। ত্রয়ীর থেকে একটু দূরে সরে গিয়ে নজর বুলানো তার পা থেকে মাথা অব্দি। বাঁকা হেসে বলল,
“অবশ্য আমি তোদের ন্যায় ন্যাকা, ভীতু, বোকা মেয়েদের প্রতি আগ্রহী নই।”
ত্রয়ী আড়ষ্ট দৃষ্টিতে তাকাল শীর্ষের দিকে। পরপরই আবার চোখ নামিয়ে নিল। লোকটা যে খুব একটা ভালো স্বভাবের নয় তা বেশ বুঝলো সে। নয়তো একটা মেয়ের সাথে এভাবে কথা বলে কিভাবে? তাও অপরিচিত মেয়ে। ত্রয়ীর বলতে ইচ্ছে হলো,

“আমিও আপনার ন্যায় নির্লজ্জ, ঠোঁটকাটা, উশৃঙ্খল স্বভাবের পুরুষের প্রতি আগ্রহী নই।”
কিন্তু সাহস করে মেয়েটার আর কথাটা বলা হলো না। হাজার হলেও সে শীর্ষদের বাড়িতে থাকছে খাচ্ছে। এ বাড়ির লোকদের সাথে ঝামেলা করলে কিংবা এ বাড়ি থেকে বের করে দিলে তার আর যাওয়ার কোনো পথ থাকবে না। তপ্ত নিঃশ্বাস ফেলল মেয়েটা। এগিয়ে গিয়ে ফ্রীজ থেকে খাবার বের করে আনল। স্বল্প সময়ের মধ্যেই খাবারটা গরম করে বাড়িয়ে দিলো শীর্ষের দিকে। স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল,
“নিন হয়ে গেছে।”
শীর্ষ তাকাল ত্রয়ীর দিকে। রুক্ষ কণ্ঠে বলল,
“এখানে রান্নাঘরে বসে খাবো আমি? টেবিলে খাবার দে।”

কথাটা বলেই রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে গেল সে। ঈষৎ বিরক্ত হলো ত্রয়ী। অল্প কিছু খাবার। এটা এখানে বসে খেয়ে গেল কি এমন হতো? মনের মধ্যে এক রাশ বিরক্তি নিয়েই মেয়েটা খাবারের প্লেট নিয়ে এলো খাবার কক্ষে। টেবিলে সুন্দরভাবে রেখে বলল,
“নিন খেয়ে নিন।”
শীর্ষ আর কোনো কথা না বাড়িয়ে খেতে বসে পড়ল। চুপচাপ একদম কোনো কথা না বলে খেয়ে উঠল।‌ হাত ধুয়ে কক্ষ থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে বলল,
“এদিকটা সব গুছিয়ে, থালাটা ধুয়ে তারপর ঘুমাতে যাস।”
শীর্ষ চলে গেল। ছোট একটা নিঃশ্বাস ফেলল ত্রয়ী। শীর্ষের থালার সাথে আরও যে কয়টা নোংরা বাসন কোসন ছিল সব ধুয়েই তবেই নিজ কক্ষে ফিরল সে।

অম্বরে সোনালী সূর্য। রাতের আঁধারকে বিদায় জানিয়ে প্রকৃতি আপন রঙে হেসে উঠতে শুরু করেছে। সেই সাথে ব্যস্ততা বাড়তে শুরু করেছে জনজীবনের। খান বাড়ির সবাই এক সাথেই খাবার টেবিলে সকালের নাস্তা করতে বসেছে। রহমান খান, শীর্ষ এবং পন্না বসেছে টেবিলের একদিকে। আর ফাহমিদা বেগম, রিমা এবং ত্রয়ী বসেছে টেবিলের অন্যদিকে। সবাই চুপচাপ যে যার মতো খাচ্ছিল। তবে হঠাৎ নীরবতা ভাঙলেন রহমান খান। ত্রয়ীর দিকে এক পলক তাকিয়ে রিমিকে বললেন,
“ত্রয়ী তো এতদিন গ্রামে ওর দাদীর কাছে থাকতো। সেখানেই একটা কলেজে অনার্স দ্বিতীয় বর্ষে অধ্যয়নরত ছিল। তবে এখন আমি ভাবছি ওকে তোমার কলেজে ভর্তি করব। ইতোমধ্যে ওর গ্রামের কলেজ থেকে ভর্তির জন্য সকল কাগজপত্রও তুলে এনেছি।”

রিমি বিরক্ত হলো। এমনিই এই মেয়েটাকে তার সহ্য হয় না। কোথাকার কোন গাইয়া মেয়ে তাকে নিয়ে তার বাবা মায়ের আদিখ্যেতার শেষ নেই। এখন আবার তার কলেজেও ভর্তি করিয়ে দিতে চাইছে। এর কি যোগ্যতা আছে তার কলেজে পড়ার? রিমি চোখ মুখ কুঁচকাল।‌ বিরক্তি নিয়ে বলল,
“আমার কলেজেই কেন? আরও তো কত কলেজ আছে চারদিকে।”
“চারদিকে আরও হাজারটা কলেজ থাকলেও ঐ কলেজটা চেনা-জানা, ওখানকার কর্তৃপক্ষের সাথে আমার একটা ভালো সম্পর্ক আছে। ওখানে আগে শীর্ষ পড়েছে, এখন তুমি পড়ছো। তাছাড়া ত্রয়ী গ্রামের সহজ-সরল মেয়ে। নতুন নতুন শহরে এসেছে। এখানকার হালচাল এখনো কিছুই বোঝে না। কলেজে গিয়ে কখনো কোনো সমস্যা পড়লে তুমি ওকে সাহায্য করতে পারবে।”

রিমি মুখ বাঁকালো। সে কিনা সাহায্য করবে ত্রয়ীকে? কলেজে গেলে একে যে সে চিনে সে বিষয়েই তো প্রকাশ করবে না আর তো সাহায্য। রিমির ভাবনার মধ্যেই রহমান খান ফের তাকে বললেন,
“ত্রয়ীর তো ভালো জামা কাপড় নেই। কলেজে যাওয়া, সবার সাথে চলাফেরার জন্য ওকে কিছু ভালো জামা কাপড় কিনে দেওয়া প্রয়োজন। তুমি কি ওকে কিছু ভালো জামাকাপড় কিনে দিতে পারবে?”
“আমার অত সময় হবে না বাবা। কলেজে আজ আমার গুরুত্বপূর্ণ ক্লাস আছে।”
কথাটা বলেই রিমি খাবার টেবিল ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। ত্রয়ীর দিকে একবার বিরক্তি নিয়ে তাকিয়ে চলে গেল নিজ কক্ষের দিকে। তপ্ত নিঃশ্বাস ফেললেন রহমান খান। শীর্ষের দিকে ফিরে তাকিয়ে বললেন,
“তুমি নিয়ে যেতে পারবে ওকে জামাকাপড় কিনতে?”
শীর্ষ স্পষ্টভাবে জবাব দিলো,

“না।”
রহমান খান অবশ্য আগে থেকেই জানতেন তাঁর ছেলে এমন উত্তরই দিবে। কিন্তু এখন ত্রয়ীর সাথে তিনি জামাকাপড় কিনতে কাকে পাঠাবেন? ফাহমিদা বেগম বা পন্না কাউকেই ত্রয়ীর সাথে পাঠানো যাবে না। ফাহমিদা বেগম শহরে বসবাস করলেও এখানকার হালচাল সম্পর্কে ততটা অবগত নন। তার কিছু প্রয়োজন হলে রহমান খান বা ছেলেমেয়েরা এনে দেয়। ভদ্র মহিলার এখনো যানযটে পরিপূর্ণ রাস্তা পাড় হতেই সমস্যা হয়। আর পন্না এখনো ছোট। ওকে ভরসা করা যায় না। রহমান খান আরেকটু সময় নিয়ে ভাবলেন। খাবার মুখে দিতে দিতে শীর্ষকে বললেন,
“আচ্ছা তাহলে ওকে আমিই নিয়ে যাব। তুমি বরং আমার পরিবর্তে মিস্টার সোহাগের সাথে রেস্টুরেন্টে দেখা করতে যেও। একটা ডিলের ব্যাপারে উনার সাথে আজ দেখা করার কথা ছিল আমার।”
“আচ্ছা।”

আকাশে সূর্যটা তার তেজ ছড়িয়ে দিয়েছে। শহরের বুকে জনজীবনের ব্যস্ততা বেড়েছে আরও। চারদিক থেকে যানবাহনের প্যা পো ধ্বনি ভেসে আসছে অনবরত। শীর্ষ আর নয়ন পাশাপাশি বসে রয়েছে রেস্টুরেন্টে। অপেক্ষা মিস্টার সোহাগের। কিন্তু তার তো দেখাই নেই। শীর্ষের এবার বিরক্ত লাগল। সেই কখন থেকে সে রেস্টুরেন্টে এসে বসে রয়েছে অথচ এই ভদ্রলোক আসার নাম গন্ধও নিচ্ছে না। শীর্ষ হাত উঁচিয়ে তার হাত ঘড়িটায় চোখ বুলালো একবার। কপাল কুঁচকে বলল,
“মিস্টার সোহাগ কখন আসবে নয়ন।”
“বলল তো আসছে।”
কথাটা বলে নয়ন গলা উঁচিয়ে এদিক ওদিক তাকাল। স্বল্প সময়ের ব্যবধানেই হইহই করে বলে উঠল,
“ঐ তো এসে পড়েছে স্যার।”

শীর্ষ নয়নের দৃষ্টি অনুসরণ করে তাকালো সম্মুখের দিকে। অমনি চোখ দুটো বড়ো বড়ো হয়ে গেল তার। আঁতকে উঠল হৃদয়। এ কে? পুরুষ নাকি মহিলা? মাথায় এর পুরুষের ন্যায় ছোট ছোট চুল, মুখ ভর্তি দাঁড়ি গোঁফ। আবার পুরো মুখ জুড়ে ভারী মেকআপের আবরণ, ঠোঁটে লিপস্টিক, কানে দুল। পড়নে মিনি স্কার্ট। পায়ে হাই হিল। মিনি স্কার্টের নিচ থেকে আবার তার নগ্ন পা দুটো দৃশ্যমান। শীর্ষ ঢোক গিলল। হতবাক হয়ে প্রশ্ন করল,
“এই অদ্ভুত প্রাণীটা কে নয়ন?”
“কেন স্যার এই তো মিস্টার সোহাগ।”

অনুরাগে তুই পর্ব ৪

শীর্ষ ফের ঢোক গিলল। এর রূপ দেখেই গলা যেন শুকিয়ে এসেছে তার। চটজলদি বসা থেকে উঠে দাঁড়াল সে। টেবিলের উপর থেকে মোবাইলটা হাতে নিয়ে দ্রুত কল লাগালো বাবার নাম্বারে। ওপাশ থেকে কোনো মতে কলটা রিসিভ হতেই সে হড়বড়িয়ে বলল,
“ঐ তোরোয়ী না ফোরোয়ী ওর শুধু জামাকাপড় কেন ওর পা থেকে মাথা অব্দি যা যা লাগবে সব কিনে দেব আমি। তবুও তুমি এখানে এসো বাবা। আমাকে এই মিস্টার সোহাগের হাত থেকে বাঁচাও।”

অনুরাগে তুই পর্ব ৬