Home হামিংবার্ড হামিংবার্ড পর্ব ৬

হামিংবার্ড পর্ব ৬

হামিংবার্ড পর্ব ৬
তাসমিয়া তাসনিন প্রিয়া

বিছানায় গুটিসুটি হয়ে বসে আছে অরা। কতক্ষণ হলো আরিশ ওয়াশরুমে ঢুকেছে, কিন্তু এখনও বের হওয়ার নামগন্ধ নেই! মা বলেছিল, আরিশকে উনার সাথে কথা বলার জন্য, সেই বিষয় কথা বলবে বলেই অরা অস্থির হয়ে আছে। ওয়াশরুমের দরজা খোলার শব্দে অরার ভাবনার ছেদ ঘটল। সদ্য গোসল করা আরিশের অর্ধউন্মুক্ত শরীরের দিকে মোহাচ্ছন্ন হয়ে তাকিয়ে আছে অরা। আরিশের ভেজা চুলের কিছু পানি গড়িয়ে পড়ল কপাল বেয়ে, নিচে নেমে গেল শক্ত চোয়ালের ধার বেয়ে। এলোমেলো ভিজে চুলগুলো কপালের ওপর নেমে এসে তাকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে। প্রশস্ত কাঁধ আর খোলা বুকজুড়ে ছোট ছোট পানির ফোঁটা চিকচিক করছে। এই প্রথম কোনো পুরুষকে এভাবে দেখছে অরা।

” কী দেখছ?”
আরিশের কথায় হকচকিয়ে গেলো মেয়েটা৷ হালকা কেশে উঠল কয়েকবার। দৃষ্টি সরিয়ে বলল,
” না মানে, আপনার এতক্ষণ সময় লাগছিলো….. ”
” তুমি অসুস্থ বলে নিজেই নিজেকে শান্ত করলাম হামিংবার্ড। নেহাৎই শরীর খারাপ তোমার, নয়তো ছাড় পেতে না। ”
অরার কান দিয়ে যেন গরম ধোঁয়া বের হচ্ছে৷ লোকটা কী বলল? কেউ এতটা নির্লজ্জ হয় কীভাবে? ছিহ! লজ্জায় চোখমুখ বন্ধ করে ফেলল অরা। টুঁশব্দ পর্যন্ত করলোনা। আরিশ ওয়ারড্রবের সামনে গিয়ে, পরনের তোয়ালে খুলে বিছানায় ছুড়ে ফেলল। অরা মাথা নিচু করে আছে। পোশাক পরতে পরতে বলল আরিশ,
” কথার জবাবে চুপ করে থাকা কি তোমার স্বভাব? আর সবসময় এমন বোবা হয়ে থাকো কেনো? আদরই তো করি, মারধর তো নয়। তাতে এতো ভয়ের কী আছে, বলো তো ছোট্ট পাখি? ”
অরা ভবল, আরিশ ভুল কিছু তো বলেনি। আদরই করে তবে খুব হিংস্রভাবে। অরা তাকাল আরিশের দিকে। কালো রঙের টি-শার্ট সাথে হাফপ্যান্ট পরেছে সে। চুলগুলো ভেজা, সামনে ছোটো ছোটো চুল থেকে পানি চুইয়ে কপালে পরছে। অরার ইচ্ছে করছে চুলগুলো ভালো করে মুছে দিতে। কিন্তু সে সাহস হলো না।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

” মা কল করেছিলেন, কথা হয়েছে । ”
” হুম,তারপর? ”
” বললেন, আপনার সাথে কথা বলবে। কল দিলে যেন, রিসিভ করেন এতটুকুই। ”
” ঔষধপত্র খেয়ে জলদি সুস্থ হও। সব সময় এমন মায়া দয়া দেখানোর পাত্র আমি নই, গট ইট?”
অরা অবাক হলো। আরিশের দিকে বড়ো বড়ো চোখে তাকাল এবার। কোথায় মায়ের কল রিসিভ করার কথা হলো আর উনি বলছে অন্য কিছু। আরিশ অরার দিকে এগিয়ে এসে কোলে তুলে নিতে নিতে বলল,
” সব কথার জবাব চাই আমার। চুপ করে থাকলে মেজাজ খারাপ লাগে। আর আমার মাথা গরম হলে কী হয়, সেটা তুমি জানো। ”
” হ্যাঁ ঔষধ খাবো নিয়মিত। ”
অরাকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে আরিশ। অরা না চাইতেও আরিশের গলা জড়িয়ে ধরে আছে। আরিশের নজর অরার গোলাপি ঠোঁটের দিকে। অরার ঠোঁট কাঁপছে, বুক ধুরুধুরু করছে।
” গুড গার্ল। নাউ, গিভ মি এ সুইট কিস। কিস মি। ”

অরা আবারও ভয় পাচ্ছে। কিস না করলেই তো ক্ষেপে যাবে লোকটা! কিন্তু অরার পক্ষে কিস করাও সহজ না। এটা তার জীবনের প্রথম কিস, কোনো পুরুষকে প্রথম নিজে থেকে কিস করা। যা চিরস্মরণীয় হওয়ার কথা! কিন্তু এই মুহূর্তে, অরা ভয় আর দ্বিধায় কাঁপছে। আরিশ অরার মতিগতি বুঝতে চেষ্টা করছে। কেনো কিস করছে না ছোট্ট পাখিটা? তার কি অন্যত্র সম্পর্ক আছে? উফ! আর ভাবতে পারল না আরিশ। মাথায় আগুন জ্বলছে।
আরিশের চোখের দৃষ্টি বদলে যাচ্ছে , নরম প্রশ্রয় মিলিয়ে গিয়ে এক ধরণের কঠোরতার ঝলক ফুটে উঠেছে । সে অপেক্ষা করবে না। অপেক্ষা করা তার স্বভাবের বাইরে।

” হামিংবার্ড, ইউ আর লেইট, নাউ ইট্‌স মাই টার্ন।”
অরার চিবুক শক্ত করে ধরে মুখটা নিজের দিকে টেনে নিলো আরিশ। অরা বাধা দেওয়ার চেষ্টা করতেই সে আরও শক্ত করে ধরে ফেলল, একদম নিজের দখলে নিয়ে নিলো তাকে।
“নিজের স্বামীকে কিস করতে এত সময় লাগে ? ইচ্ছে করে করলে না? করতে হবে না। আমি যথেষ্ট। ”
আরিশের গলা ভয়ঙ্কর শোনাচ্ছে। অরার নিঃশ্বাস দ্রুত হয়ে আসছে, বুকের ভেতর ধুকধুকানি অসহনীয় হয়ে উঠেছে ।
“আরিশ, এটা ঠিক না…”
তার কণ্ঠ ভাঙতে থাকে, কিন্তু সে আর কথা শেষ করতে পারে না। ভয় মুখ থেকে কথাও বের হচ্ছে না। কোন পাগল নিয়ে ঠেকল বুঝতে পারছে না।
“কালম ডাউন হামিংবার্ড, আই ওয়োন্ট হার্ট ইউ। আইল জাস্ট কিস ইয়োর লিপস।”
আরিশের ঠোঁট ওর কানের কাছে ঝুঁকে আসে, উষ্ণ নিঃশ্বাস কানে ছড়িয়ে পড়ে অরার।
তারপর কোনো কথা ছাড়াই, আরিশ ঠোঁট নামিয়ে আনল তার ঠোঁটের ওপরে। নরম, সজাগ, কিন্তু সম্পূর্ণ তার নিয়ন্ত্রণে। অরা তীব্রভাবে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করে, হাত দিয়ে ঠেলে সরিয়ে দিতে চায়, কিন্তু আরিশের শক্তি বেশি। স্বাভাবিকভাবেই পুরুষালি শক্তির সাথে পেরে উঠছে না অরা।
আচমকা অরার ফোনের রিংটোন বেজে ওঠাতে বিরক্ত হলো আরিশ। অরার ঠোঁটে মৃদু কামড় দিয়ে বিছানায় বসাল সে। অরার অস্থির লাগছে। কে কল দিলো আবার! আরিশ অরার ফোনটা হাতে নিতে নিতে বলল,

” রোমান্সের সময় বিরক্ত করলো কে? ”
❝ রনি..❞
এটা লিখেই সেইভ করা আছে নম্বরটা। রনি নামে কেউ কল করেছে অরাকে। কোনো ছেলে কল করেছে দেখেই চোখ বড়ো বড়ো হয়ে গেছে আরিশের। তার এমন প্রতিক্রিয়া দেখে অরার ভয়ে প্রাণ যায় যায় অবস্থা। আরিশ কল রিসিভ করল , তবে এ পাশ থেকে কোনো কথা বলছে না।
” অরু? এই অরু? কী হয়েছে তোমার? কতদিন হলো কোনো খোঁজ নেই! কেমন আছো, কী করছ কিচ্ছু জানি না। টেনশন হয় তো? কিছু বলো। ”
আরিশ কল কেটে দিয়ে ফোনটা ছুঁড়ে ফ্লোরে ফেলতেই লাফিয়ে উঠল অরা। আরিশের চোখে-মুখে রাগে আগুন জ্বলছে। চট করে অরার থুতনি চেপে ধরল সে। ব্যথায় চোখে জল ছলছল করছে অরার।
” অরু? টেনশন হচ্ছে? এত সুন্দর করে অরু ডাকল কেন ওই ছেলে? কে হয় তোর?”
অরা কথা বলতে পারছে না। ভয়ে গলা শুকিয়ে গেছে থরথর কাঁপছে শুধু। ঠোঁট নড়ছে একটু একটু, কথা বলতে চাচ্ছে। আরিশ রাগে গর্জে উঠল আবার,

” স্পিক, আ’ম লিসনিং। ”
” আ..মার বন্ধু, একই ক্লাসে প..ড়ি। আরকিছুই না। ছাড়ুন প্লিজ, লাগছে। ”
” ক্লাসমেট? বন্ধু! ডু ইউ থিঙ্ক আ’ম স্টুপিট?”
অরা বলে,
” না। বিশ্বাস করুন। আমি মিথ্যা বলছি না। শান্ত হোন। আপনি…..”
” চুপ!”
আরিশের চুপ করতে বলায় কিছু একটা ছিলো। অরা চাইলেও আর কথা বলতে পারলোনা। আরিশ তাকে বিছানায় ধাক্কা দিয়ে ফেলল। অরা হাতজোড় করছে। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। আরিশ তার নিজের মধ্যে নেই এখন।

” সুমনা তোমার ডাক্তার দেখানো দরকার। তুমি দিন দিন মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে যাচ্ছ। এভাবে চললে আরিশের ওপর আরো বাজে প্রভাব পড়বে। এতটুকু ছেলে! তুমি ওর মা, অথচ ও তোমার সামনে আসতেও ভয় পায়৷ ”
পাশাপাশি বসে আছেন আফজাল ও সুমনা। আরিশ অন্য রুমে ঘুমাচ্ছে। আফজাল সুমনার সমস্যাগুলো নিয়ে তার পরিচিতদের সাথে অনেক আলোচনা করে বুঝতে পেরেছে সুমনা মানসিকভাবে অসুস্থ। হয়তো অবসেসিভ কমপালসিভ পার্সোনালিটি ডিজঅর্ডার আছে। এটা এমন একটা রোগ যেখানে, আক্রান্ত মানুষ চরম মাত্রায় পারফেকশনিস্ট হয়। অন্য কেউ তার জিনিসে হাত দিলে রেগে যায়। তারা শৃঙ্খলাপূর্ণ জীবন চায়, অন্যের অনুভূতির তোয়াক্কা করে না।
সুমনার মধ্যেও তেমন অনেক সমস্যা আছে। আফজাল তা হাড়ে হাড়ে টের পায়।
” চুপ করো। আমি কি পাগল? আর কীসের ডাক্তার দেখাব? তুমি আর তোমার ছেলে আমার জীবন শেষ করে দিয়েছ। তোমার কাছ থেকে না পাই শারীরিক সুখ আর না পাই আর্থিক সুখ৷ দিয়েছ একটা বাচ্চা! সারাদিন জ্বালিয়ে মারে, আমার সব গোছানো জিনিস এলোমেলো করে। ”

আফজাল ধৈর্যহারা হচ্ছে আজ৷ বারবার শারীরিক বিষয় প্রশ্ন তোলায় খারাপ লাগছে তার। টাকাপয়সার কথা বললে সে-ও তো একেবারে কম কিছু ইনকাম করেন না তিনি৷ আসলে সুমনার চাহিদা বেশি। এবং সেটা সবকিছুতেই।
” সমস্যা আমার না সুমনা, তোমার। একটা সুস্থ মানুষ সর্বোচ্চ কতক্ষণ ফিজিক্যাল এটাচমেন্টে থাকতে পারে? সর্বোচ্চ দশ মিনিট? বা বারো মিনিট? ধরলাম বিশ মিনিট। আমার কি সেই ক্ষমতা নেই? তুমি কেনো এমন করছ সুমনা? তোমার যখন প্রয়োজন হয় আমি তো সাপোর্ট করি, বলো? আর মাসে ষাট হাজার টাকা ইনকাম করা স্বত্বেও তুমি টাকায় সুখী নও বলছ?”
সুমনার ভালো লাগছে না এসব কথা। সে কোনো কিছু বুঝতে চায় না। তার আরো দরকার , আরো।

হামিংবার্ড পর্ব ৫

বসার ঘরে বসে আছে তামান্না। অরার চিৎকারে ঘুম ভেঙে গেছে আজ। তামান্না বেশ বুঝতে পারছে, ওর সাথে কী হয়েছে। কিন্তু কিছু করার নেই। তামান্না নিজেও বুঝতে পারছে না, আরিশ ঠিক কী চায়? এই ভালো, এই খারাপ।

হামিংবার্ড পর্ব ৭