আযদাহা সিজন ২ পর্ব ১৬
সাবিলা সাবি
ফিওনার জ্ঞান ফিরেছে। অন্ধকারের মধ্যে থেকে ধীরে ধীরে আলোর ঝলক স্পষ্ট হতে থাকে। সে উপলব্ধি করে, বেশ কিছুক্ষণ অজ্ঞান ছিল; এক অজানা অনুভূতির সমুদ্রে ভাসছিল। যখন তার ঝাপসা চোখে দৃশ্য পুনরায় উন্মোচিত হয়, তখন সে আবিষ্কার করে, অচেনা একটি কক্ষে বিছানায় শুয়ে আছে।
কক্ষটি যেন এক রহস্যময় রাজ্য—চারপাশের দেয়ালগুলো প্রাচীন আর্টিফ্যাক্টে সজ্জিত, একটি জাদুকরী ছোঁয়া রয়েছে যার মধ্যে। ফিওনা চারপাশে তাকায়, তবে কোথাও কেউ নেই। এরই মধ্যে তার মনে হয়, এই স্থানটি যেন তার কাছে অপরিচিত নয়। সেই কালো রাতের স্মৃতি জাগ্রত হয়, যখন জ্যাসপার তাকে ফ্লোরাস প্রাসাদ থেকে তুলে নিয়েছিল—তার গম্ভীর চাহনি, ভয়াবহ শক্তি যেন একটি নরকের ডাক।
অন্ধকারের মধ্যে হারানোর সময় বুকের ভেতর চাপা ভয়ের অনুভূতি মনে পড়ে ফিওনার। সে উঠে বসার চেষ্টা করে, কিন্তু মাথা ঘুরে যায়, যেন এক ভিন্ন বাস্তবতায় প্রবাহিত হচ্ছে। জানালার দিকে নজর দেয়, সেখানে সবুজ পাহাড়ের শৃঙ্গগুলো সূর্যের আলোতে দীপ্তিময় হয়ে উঠেছে। সাদা মেঘগুলো যেন পাহাড়ের শীর্ষে ভাসমান, এক রূপকথার মতো দৃশ্য।
“প্রিন্স…” সে কাতর কণ্ঠে উচ্চারণ করে,যেন সেই ড্রাগনের উপস্থিতি ফিরিয়ে আনতে চায়।তার হৃদয়ে উদ্বেগের একটা চাপ অনুভব হয়। এখানে সে একা নয়; কিন্তু জ্যাসপার কোথায়? কক্ষের নিস্তব্ধতায় তার হৃদস্পন্দন তীব্র হয়ে ওঠে। সে বুঝতে পারে, এই রহস্যময় স্থানে তার জন্য অপেক্ষা করছে ভিন্নমাত্রার কিছু ঘটনা—এবং সে জানে, তার যাত্রা এখান থেকে শুরু হতে যাচ্ছে।
ফিওনা উঠে দরজার দিকে এগোতে চাইলে, হঠাৎ করেই কক্ষে প্রবেশ করে আলবিরা এবং অ্যাকুয়ারা। তাদের দেখে ফিওনা চমকে ওঠে। সে তাদের চিনতে পারে—ফ্লোরাস প্রাসাদে জ্যাসপারের সঙ্গে তাদের আগমনের সময় এদেরই সাক্ষাৎ পেয়েছিল।
“আমি কোথায়?” ফিওনা প্রশ্ন করে, তার গলায় উদ্বেগ ও বিভ্রান্তির ছাপ। “আমাকে কোথায় এনেছো? আর তোমাদের প্রিন্স কোথায়? তাকে ডেকে আনো!”
আলবিরা সহানুভূতির সঙ্গে হাসে। “একটু পরেই তাকে তোমার কাছে নিয়ে আসা হবে। তবে তার আগে, তোমাকে একটু সাজিয়ে নিতে হবে,” সে বলে। তার কথার সঙ্গে সঙ্গে আলবিরা এবং অ্যাকুয়ারা ফিওনাকে সাজাতে উদ্যত হয়।
ফিওনা লক্ষ্য করে, তার গায়ে নেই সেই রাজকীয় গাউনটি, যা সে ফ্লোরাস রাজ্যে বিয়ের জন্য পরেছিল। পরিবর্তে, তার শরীরে রয়েছে অন্য একটি গাউন—সাদা, তবে আগেরটির চেয়ে অনেক বেশি সাদামাটা। এই নতুন গাউনটি লম্বা, আর এর ভাঁজগুলো যেন ফিওনার অস্তিত্বের সাথে একটি অদৃশ্য সম্পর্ক স্থাপন করছে।
আলবিরা এগিয়ে এসে বলে, “এটি তোমার নতুন সাজ। তোমার সৌন্দর্যকে আরো ফুটিয়ে তুলবে।” ফিওনা তাতে কিছুটা অস্বস্তি অনুভব করে, কিন্তু কৌতূহলও কাজ করে—এটা কি সত্যিই জ্যাসপারের জন্য? তার হৃদয়ের ভিতরকার আলোচনার আওয়াজ যেন তীব্র হয়ে ওঠে।
অ্যাকুয়ারা পাশে দাঁড়িয়ে, “প্রিন্স দ্রুত আসবে। আমাদের পরিকল্পনা যেন সফল হয়, তাই তোমার প্রস্তুতি জরুরি,” বলে। ফিওনা জানে, এখন তার জন্য কিছু করতে হবে—একটি সিদ্ধান্ত নিতে হবে, যে সিদ্ধান্ত তার জীবনকে বদলে দিতে পারে।
সাজানোর পর, আলবিরা এবং অ্যাকুয়ারা ফিওনাকে কক্ষের বাইরে নিয়ে আসে। ফিওনার চোখে বিস্ময়ের ঝলক দেখা দেয়। সামনে যে দৃশ্য তার সামনে ফুটে উঠছে, তা একেবারে ভিন্ন—একটি প্রাচীন চার্চ। বিশাল গম্বুজ, উঁচু জানালা, আর সারা চারপাশে সাদা পাথরে খোদাই করা নকশা।
ফিওনার মনে হয়, যেন আকাশ ভেঙে পড়েছে। তার মাথায় এক ঝলক চিন্তা আসে—এটা কি সম্ভব? ভেনাসে তো কোনো চার্চ নেই! তাহলে কি জ্যাসপার তাকে পৃথিবীতে নিয়ে এসেছে? এবং এই চার্চে কি বিয়ে করতে এনেছে? প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে গিয়ে তার হৃদয়ে ভয় এবং শঙ্কার স্রোত বইতে থাকে।
“এটা কোথায় আমারা কি এখন পৃথিবীতে?” ফিওনা হতবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে, তার কণ্ঠে অসহায়তা। “তোমরা আমাকে চার্চে কেনো নিয়ে এসেছো?”
আলবিরা ও অ্যাকুয়ারা পরস্পরের দিকে তাকিয়ে হাসে। “হ্যা ফিওনা তুমি এখন পৃথিবীতে আছো,” আলবিরা বলে। “এখানে তোমাকে আনা হয়েছে কারন আজ তোমার আর প্রিন্সের বিয়ে। আজকের দিনটি বিশেষ, আর তোমার জন্য সবকিছু প্রস্তুত করা হয়েছে।”
ফিওনার হৃদয় দ্রুতগতিতে ধুকধুক করতে থাকে। তার মাথায় চিন্তাগুলো একের পর এক ভিড় করে। সে কি সত্যিই এখানে বিয়ে করতে এসেছে?জ্যাসপারের সঙ্গে তার সম্পর্কের গভীরতা আর তাৎপর্য নিয়ে তার মনে শত প্রশ্ন। চার্চের এই আবহ তাকে উদ্বেগে ভরিয়ে দেয়, আর সে জানে—এখন তাকে যেকোনো পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে।
অ্যাকুয়ারা ফিওনার কাঁধে হাত রেখে তার দিকে ভরসার চোখে তাকালো। “চিন্তা করোনা, ফিওনা। যা হবে, তা তোমার ভালোর জন্যই,” সে বলে।
ফিওনার অ্যকুয়ারার কথায় কেমন একটা অদ্ভুত স্বস্তি অনুভব করে, তবে তার হৃদয়ে জেগে ওঠা প্রশ্নগুলো তাকে তাড়িয়ে নিয়ে যায়।অ্যাকুয়ারা যেন তার অন্তর্দৃষ্টিকে বুঝতে পেরেছে এবং সংবেদনশীলতা দিয়ে তাকে শান্ত করতে চায়।
অবশেষে জ্যাসপার ফিওনার সামনে এসে দাঁড়ালো। তার গাঢ় কালো রঙের স্যুট সূর্যের আলোতে প্রথমে ধোঁয়াশার মতো লাগছিল,কিন্তু আস্তে আস্তে স্পষ্ট হয়ে উঠল।ফিওনার চোখে জ্যাসপার যেন এক রহস্যময় প্রতিমূর্তি।জ্যাসপারের বিয়ের পোশাকটি ছিল একটি আকর্ষণীয় ব্যতিক্রম।
স্যুটটি ছিল মার্জিত,কালো রঙের, যা তার ব্যক্তিত্বের গাম্ভীর্যকে ফুটিয়ে তুলছিল।স্যুটের ফিটিং আর সেলাইগুলো ছিল নিখুঁত,যেন তিনি কোনও রাজকীয় অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করছেন। তার গলায় একটি সাদা ফিতা বাঁধা ছিল।তার রক্তিম বেগুনি ঠোঁটের উপর দৃঢ়তা আর গম্ভীরতা ফুটে উঠছিল।কিছুক্ষণের জন্য সে নিষ্পলক তাকিয়ে রইলো, যেন বাস্তবতা থেকে দূরে কোথাও হারিয়ে গেছে। হঠাৎ তার সম্বিত ফিরে আসে।
“আপনি আমাকে এখানে কেন তুলে এনেছেন?” ফিওনা দ্রুত জিজ্ঞেস করে, তার কণ্ঠস্বর চিৎকারের প্রান্তে। “আমার মা আর লিউ ঝান চিন্তা করছে, এতোক্ষণে হয়তো!” তার কণ্ঠে আতঙ্ক ও অসন্তোষের মিশ্রণ। “আমাকে পৃথিবীর চার্চে কেন এনেছেন?”
জ্যাসপারের হাসিমুখ মুহূর্তের মধ্যে গায়েব হয়ে যায়। তার সবুজ চোখগুলো রাগের দহনবিলাসে জ্বলতে থাকে। শরীরের প্রতিটি পেশি শক্ত হয়ে যায়।ফিওনার হাত শক্ত করে চেপে ধরে, যেন তাকে থামানোর জন্য তার শক্তি প্রয়োগ করছে।
“তুমি ওই লিউ ঝানের নাম মুখেও উচ্চারণ করবে না আমার সামনে!” জ্যাসপার বলল, তার কণ্ঠস্বর গম্ভীর, একটি লুকানো তেজ ছিল সেখানে। “এর ফল খারাপ হবে।”
এটা ছিল যেন ঝড়ের পূর্বাভাস।জ্যাসপারের গম্ভীরতা চারপাশের বায়ুমণ্ডলকে ভারি করে তুলল।ফিওনার মনে হলো,তার শ্বাস প্রশ্বাস কষ্টকর হয়ে উঠেছে।এক ভিন্ন পৃথিবীতে সে বন্দী—এমন এক জায়গায়,যেখানে জ্যাসপারের অনুমতি ছাড়া ফিওনা বোধহয় অক্সিজেন ও গ্রহন করতে পারবে না।
জ্যাসপারের মুখাবয়বে যে রাগ আর অবজ্ঞা, তা স্পষ্ট। যেন সে একটি ভিন্ন দুনিয়ার অধিকারী, যেখানে তার কথাই শেষ কথা। চার্চের গম্ভীর পরিবেশ, চারপাশে উজ্জ্বল আলো, সেখান থেকে কোনো ভাবেই মুক্তি পাওয়া সম্ভব নয়।
“আমি তোমাকে এখানে নিয়ে এসেছি কারণ আমাদের সম্পর্ক এখন থেকে আরো গভীরতার দিকে যাবে। এখানে আমাদের নতুন সম্পর্কের ইতিহাস রচিত হবে।” সে জানানোর চেষ্টায় তার কণ্ঠস্বর শীতল হয়ে যায়। “তুমি বুঝতে পারছো না হামিংবার্ড? লিউ ঝান আমাদের পরিকল্পনার অন্তর্ভুক্ত নয়। তুমি এখানে আমার ইচ্ছেতে এসেছো, আমাকে বাধ্য করেছো তোমাকে এভাবে তুলে আনতে।তোমার মুক্তি তো এখন আর সম্ভব নয়।”
ফিওনার হৃদয়ে এক আতঙ্কের ঢেউ বয়ে যায়। তার মনে একটি প্রশ্ন, কিন্তু সঠিক শব্দ খুঁজে পেতে সে ব্যর্থ। চার্চের গম্বুজের নিচে,সে যেন একটি নির্জন দ্বীপে বন্দি।ফিওনার মনে জ্যাসপারের প্রতি ভয়, ষআতঙ্ক আর জ্যাসপারের মনে ফিওনাকে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা।
“আমার জীবন আমার সিদ্ধান্ত প্রিন্স!” ফিওনা বলেন, তার কণ্ঠে আত্মবিশ্বাসের ছাপ। “আমি আপনার বন্দিনী হবো না!”
এমন কথা শুনে জ্যাসপারের মুখে এক বিরক্তির হাসি দেখা দেয়। “তোমার মনে রাখতে হবে হামিংবার্ড,এখানে তুমি যে সিদ্ধান্ত নাও না কেনো ,তা আমার কাছে মূল্যহীন।আমি তোমাকে যে উদ্দেশ্যে এনেছি,তা বাস্তবে আনতে হবে।”
আমি এই বিয়ে করতে পারবো না ,” ফিওনা বলল। “আমার সিদ্ধান্তের বাইরে আপনি আমাকে মেরে ফেললেও আমি বিয়ে করবো না আপনাকে।”
জ্যাসপার তার দিকে গভীরভাবে তাকাল। “আমাদের মধ্যে যা ঘটছে,তা আমার তৈরি করা নিয়তি।তুমি চাইলে বা না চাইলেও,আমরা এক হয়ে যাব সারাজীবনের জন্য।”
এমন এক মুহূর্ত, যখন ফিওনা বুঝতে পারে যে তার অযাচিত স্বাধীনতা শিকার হচ্ছে। চার্চের প্রাচীন প্রাচীরগুলো তাদের সংঘর্ষের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে,আর তারা নিজেদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে ফসলে পড়েছে।এই লড়াইয়ের মাঝেই তাদের ইতিহাস গড়ে উঠবে,এমন একটি অন্ধকার পথের দিকে অগ্রসর হতে হবে,যা তাদের সম্পর্ককে টেনে নিয়ে যাবে এক নতুন অধ্যায়ে।
একটু পরেই কয়েকজন পাদ্রী সেখানে এসে উপস্থিত হয়। তাদের মধ্যে থারিনিয়াস এবং এথিরিয়নও ছিল। ফিওনার চোখের জল গড়িয়ে পড়ছিল, এক অজানা আতঙ্কে সে কাঁদছিল। জ্যাসপার পাদ্রীর দিকে তাকিয়ে বলল, “মিস্টার, বিয়েটা দ্রুত শুরু করুন। আমার হাতে সময় কম।”
পাদ্রী তাঁর কাজের প্রস্তুতি নিতে লাগলেন, যেন পরিস্থিতির কাছে তিনি আপস করেছেন। ফিওনার হৃদয়ে তখন অস্থিরতা দানা বেঁধে উঠল। সে হঠাৎ করে চেঁচিয়ে উঠল, “প্লিজ, পাদ্রী! আমাকে সাহায্য করুন! আমি বিয়েতে রাজি নই!” তার কথা যেন সমস্ত বাতাসে একটি বিপ্লবের মতো ছড়িয়ে পড়ল।
পাদ্রীর মুখে কোন প্রতিক্রিয়া ছিল না। তাঁর চোখে ছিল অবিশ্বাস এবং সমর্থনহীনতা, মনে হচ্ছিল যেন তিনি নিজেই বাধ্য হচ্ছেন এই বিয়ে পড়াতে। চারপাশের অস্থির পরিবেশে ফিওনার হতাশার সাথে অনুভব করছিল, যে সে একাকী এই সংগ্রামে। তবুও, সে মনে মনে আশা করছিল, হয়তো কোনো উপায় আছে এই পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পাওয়ার।
সব প্রস্তুতি শেষ হতেই পাদ্রী জ্যাসপারকে বললেন, “ফিওনাকে নিয়ে সামনে যেতে।” জ্যাসপার ফিওনার হাত ধরে টানতে শুরু করল, কিন্তু ফিওনা ছাড়ার জন্য জোরালোভাবে ধস্তাধস্তি করতে লাগল। তার শরীর একটুও নড়ছে না, মনে হচ্ছিল যেন সে কোনো মূল্যবান জিনিসকে রক্ষা করতে চায়। “আমি কিছুতেই বিয়ে করব না আপনাকে!” সে চিৎকার করে উঠল।
জ্যাসপার বুঝতে পারল,জোর করে বিয়ের স্থানে নিয়ে আসা গেলেও জোর করে বিয়েটা করা যাবে না। ফিওনার আত্মরক্ষার মানসিকতা তাকে বাধা দিচ্ছে। ষতাই সে একটু চিন্তিত হয়ে গেল। “তবে তোমাকে আপোষে বিয়ে করতে বাধ্য করতে হবে,” জ্যাসপার মনে মনে ভাবল। সে বাঁকা হাসি দিয়ে ফিওনাকে বলল, “ওকে, তুমি নিজেই এবার বিয়েতে রাজি হবে। এক মিনিট অপেক্ষা করো, তোমাকে আমি একটা ক্লাইমেক্স দেখাই।”
ফিওনার চোখে তখন আতঙ্ক আর কৌতূহল উভয়ই মিশ্রিত হয়েছিল। সে ভাবছিল, কি করতে চাইছে এই প্রিন্সটা? তার মনে একটানা দ্বিধা চলছিল,কিন্তু জ্যাসপারের অঙ্গভঙ্গি যেন বলছিল,কিছু বড় ঘটনা ঘটতে চলেছে।
হঠাৎ করে জ্যাসপার ফিওনার সামনে একটি ল্যাপটপ ধরালো। স্ক্রীনে ফিওনা দেখলো সিসিটিভি ফুটেজ, যেখানে তার দাদু এবং মিস ঝাং ডাইনিং টেবিলে খাবার খাচ্ছেন। এই দৃশ্য দেখে ফিওনার চোখে আবেগের জল চলে আসল। সে একাধিকবার ল্যাপটপের দিকে হাত বাড়ানোর চেষ্টা করল, কিন্তু জ্যাসপার তা সরিয়ে দিল।
“উহু ডোন্ট টাচ ,” সে তীব্র স্বরে বলল। এরপর ল্যাপটপে অন্য একটি ফুটেজ দেখিয়ে দিল।ফিওনা দেখল,বাড়ির সামনে বাগানে একটি বোমা ফিট করা আছে।
জ্যাসপার হেসে বলল, “এটা কোনো সাধারণ বোমা নয়। এটা আমার তৈরি করা ভেনাসের স্পেশাল পারমাণবিক বোমা। একবার ডিভাইস এখান থেকে ক্লিক করলেই বেইজিং এর পুরো এলাকা সহ ব্লাস্ট হবে।”
তার হাসিতে যেন এক অন্ধকার ছায়া ছড়িয়ে পড়ল। ফিওনার চোখের জল গড়িয়ে পড়তে লাগল। সে কান্না করে বলল, “প্লিজ, প্রিন্স! আমার গ্ৰান্ডপা আর মিস ঝাংকে মারবেন না! তাদের ছেড়ে দিন, প্লিজ!”
জ্যাসপার এক মুহূর্তের জন্য থামল। তার মুখে এক অদ্ভুত হাসি ফুটে উঠল। “ওহো, হামিংবার্ড,” সে বলল, “আমি কেনো তাদের মারতে যাবো? তাদের মরা বাঁচার সিদ্ধান্ত তোমার হাতে।তুমি কোনটা বেছে নেবে?”
ফিওনার মনে তখন একটাই চিন্তা—যেভাবেই হোক, তার প্রিয়জনদের রক্ষা করতে হবে।
জ্যাসপার ফিওনার দিকে নিবিড় তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, “আমাকে আপোষে বিয়ে করে নিবে,নাকি নিজের চোখে নিজের গ্ৰান্ডপার এমন করুন মৃ*ত্যু দেখবে হামিংবার্ড?”
জ্যাসপারের প্রশ্নের মধ্যে চাপা আছ তীব্র হুমকি,যেন ফিওনার অঙ্গীকারের মাধ্যমে তার প্রিয়জনদের জীবন বাঁধা। জ্যাসপারের চোখের উজ্জ্বল সবুজতার মধ্যে এক অদ্ভুত কঠোরতা ছিল,যা ফিওনাকে একবারের জন্যও ভীতির দিকে ঠেলে দিল।
“ফিওনা,” সে বলল, “তুমি জানো, আমি চাই না তোমার প্রিয়জনদের ক্ষতি হোক। কিন্তু সময় আমাদের প্রতি সদয় নয়। সিদ্ধান্ত তোমার হাতে।”
ফিওনার মনে দ্বন্দ্বের স্রোত বইতে লাগল। একটি অংশ তাকে ডেকে তুলছিল, অন্য অংশ তাকে ভয় দেখাচ্ছিল। কিন্তু জ্যাসপারের চোখে থাকা কঠোরতার সামনে সে জানত, তাকে একটি অজানা পথ বেছে নিতে হবে—তার পরিবারের নিরাপত্তার জন্য।
“ঠিক আছে, তুমি বোধহয় বিয়েটা করতে চাইছো না। জ্যাসপার এথিরিয়নের দিকে তাকিয়ে বললো “আচ্ছা এথিরিয়ন,ডিভাইসটা ক্লিক করে দে,” তার কণ্ঠ শীতল শোনালো।
ফিওনার মনে হলো পৃথিবী যেন থমকে দাঁড়িয়েছে। তার হৃদয় ধড়ফড় করতে লাগল।সে জ্যাসপারের হাত টেনে ধরে বললো, “না, না! প্লিজ! প্লিজ! আমি রাজি! আমি বিয়ে করবো! আমি রাজি!”
তার চোখের জল পড়তে লাগল, আর সে অন্তরের সমস্ত শক্তি দিয়ে বলল, “আমি কিছু করবো না,আমি আপনাকে জন্যে বিয়ে করবো! প্লিজ,আমার আমার পরিবারের ক্ষতি করবেন না!”
এথিরিয়ন আর জ্যাসপার একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইল। ফিওনার আকুতি ছিল হৃদয়স্পর্শী,আর তার তীব্র আবেগ যেন জ্যাসপারকে থামিয়ে দিয়েছিল।এখন সবকিছু যেন একটি পালাবদলের দিকে চলে যাচ্ছিল,আর ফিওনার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়া হলো।
অবশেষে ফিওনা জ্যাসপারের হাত ধরে সামনের দিকে গেলো,ফিওনা মূর্তির মতো নির্বিকার।তার শরীরের প্রতিটি অঙ্গের ভিতর,যেন এক অদৃশ্য শৃঙ্খল বেঁধে রাখা হয়েছে। জ্যাসপারের হাতের শক্তি তার বিরুদ্ধে ছিল,কিন্তু এ যাত্রায় তার হৃদয়ের সংকট ছিল গভীর আর স্পষ্ট।
এতদিন ঘৃণার অনুভূতি তার মনে আসেনি,কিন্তু আজকের পরিস্থিতি তার মনোজগতকে বদলে দিয়েছে।ফিওনা বুঝতে পারছিল তার প্রানের চেয়ে প্রিয় গ্ৰান্ডপা আর মিস ঝাংয়ের জীবন যে সংকটের মুখোমুখি,তা কোনোভাবেই সহ্য করা যায় না।জ্যাসপার যে নির্দয়ভাবে তার পরিজনদের নিরাপত্তাকে বিপন্ন করতে চাইছে,সে অনুভব করছিল তার প্রতি ক্রোধের আগুন জ্বলছে।
“তুমি জেনে রাখো প্রিন্স আমি তোমাকে কখনোই ভালোবাসব না,” ফিওনা মনে মনে দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করল। “তুমি আমার গ্ৰান্ডপার জীবন মৃত্যু নিয়ে ছিনিমিনি খেলেছো,যার জন্য আমি তোমাকে ক্ষমা করব না। তুমি আর আমার কাছে কখনোই প্রিয় হবে না।”
তার এই অনুভূতি, যতই স্থূল হোক, তাকে শক্তিশালী করে তুলছিল। ঘৃণা আর ক্ষোভের মাধ্যমে সে আজকের এই পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে ছিল,আর সে প্রতিজ্ঞা করল যে তার প্রিয়জনদের জন্য সে যুদ্ধ করবে,জ্যাসপারের বিরুদ্ধে।
চার্চের ভিতর গাঢ় আলো, মৃদু গায়নের সুর, আর প্রার্থনার পরিবেশ। সুন্দর ফুলের তোড়া আর উজ্জ্বল মোমবাতির আলো চারপাশকে জাদুকরী করে তুলেছে। জ্যাসপার ফিওনাকে নিয়ে একদম সামনে দাঁড়িয়ে, পাদ্রীর দিকে লক্ষ্য করে। ফিওনার হৃদয়ে উত্তেজনার পাশাপাশি এক ভয়াবহ শঙ্কা রয়েছে।
“ফিওনা,” জ্যাসপার বলল, তার কণ্ঠে একটি অদ্ভুত শৃঙ্খলা ছিল, “তোমার মা লিয়ারা যে পৃথিবীর মানবকে ভালোবাসে বিয়ে করেছিল,সে খ্রিষ্টান ছিল।গ্রিসের।তাই তুমিও খ্রিষ্টান। আজ আমরা এখানে খ্রিষ্টান নিয়মে বিয়ে করবো।”
ফিওনার মনে এক দোলা শুরু হলো। “কিন্তু… আমি কি প্রস্তুত?” মনে মনে ভাবতে লাগল সে। তবে তার চোখে দৃঢ়তা ছিল, কারণ তার প্রিয়জনদের নিরাপত্তা এই বিয়ের উপর নির্ভরশীল।
জ্যাসপার আবার বলল, “আপাতত তোমার পৃথিবীর নিয়মেই আমি তোমায় হাজবেন্ড হয়ে যাবো।তারপরে কয়েকদিনের মধ্যেই তোমাকে নিয়ে যাবো ভেনাসের নিয়মের বিয়ের জন্য।এখন এই পৃথিবীতে বিয়েটা করছি কারন এরপর আমি তোমার প্রতি সম্পূর্ণ অধিকার অর্জন করবো।”
ফিওনার মুখে কোনো কথা আসছিল না। সব কিছু যেন তার কাছে এক স্বপ্নের মতো মনে হচ্ছিল। চার্চের পবিত্র পরিবেশ, জ্যাসপারের কথা, এবং তার মা লিয়ারার স্মৃতি সবকিছু একত্রিত হয়ে তাকে এক কঠিন সিদ্ধান্তের সামনে দাঁড় করিয়েছে।
পাদ্রী তখন তাদের দিকে তাকিয়ে বলেন, “যদি তোমরা প্রস্তুত থাকো,তাহলে আমরা শুরু করতে পারি।”
জ্যাসপার ফিওনার হাত ধরে শক্তভাবে বলল, “তুমি প্রস্তুত, হামিংবার্ড। এই বিয়ে আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”
ফিওনা বাধ্য হয়ে মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল, তার মন বিভক্ত হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু তার গ্ৰান্ডপা আর মিস ঝাংয়ের নিরাপত্তা সবকিছুর ঊর্ধ্বে। “হ্যাঁ, আমি প্রস্তুত,” বলল সে, কিন্তু ভিতরে ভিতরে তার হৃদয় ভাঙছে।
চার্চের পরিবেশ, পাদ্রীর প্রার্থনা, আর জ্যাসপারের উজ্জ্বল সবুজ চোখ—সব কিছু এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করছিল।
চার্চের পরিবেশ পবিত্রতা ও আবেগে ভরপুর। সাদা ও গোলাপি ফুলের সাজসজ্জা চারপাশকে সজ্জিত করেছে, যেন ঈশ্বরের আশীর্বাদ ঝরছে। বাতির মৃদু আলো, ফুলের সুগন্ধ এবং প্রার্থনার মন্ত্র—সব মিলিয়ে একটি স্নিগ্ধ পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। আজকের এই বিশেষ মুহূর্তে ফিওনা ও জ্যাসপার দাঁড়িয়ে আছেন, দুজনের চোখে যেন একটি নতুন জীবনের আশা, তবে সঙ্গে রয়েছে ভয়ের আঁচ।
পাদ্রী তাদের দিকে তাকিয়ে বললেন, “আজকের এই ঐতিহাসিক দিনে, আমরা এখানে একত্রিত হয়েছি এই দুই প্রিয় বন্ধুকে তাদের আত্মার চিরস্থায়ী সঙ্গী হিসেবে একত্রিত করার জন্য। এখন আমি জ্যাসপারকে জিজ্ঞেস করছি, তুমি কি ফিওনাকে তোমার জীবনসঙ্গী হিসেবে গ্রহণ করতে রাজি?”
“হ্যাঁ,” জ্যাসপার দৃঢ়ভাবে বললেন।
পাদ্রী এরপর ফিওনার দিকে মুখ ফিরে বললেন, “এখন ফিওনা, তুমি কি জ্যাসপারকে তোমার জীবনসঙ্গী হিসেবে গ্রহণ করতে রাজি?”
ফিওনার কণ্ঠে স্পষ্ট ছিল একটি আবেগ—“হ্যাঁ, আমি রাজি।”
পাদ্রী বললেন, “এখন তোমাদের একে অপরকে হাত ধরে নিচের শপথটি পুনরাবৃত্তি করতে হবে।”
ফিওনা আর জ্যাসপার একে অপরের হাত ধরে নিলো, তারপর শপথ শুরু করলো:
“আমি,এলিসন ফিওনা, তোমার কাছে প্রতিজ্ঞা করছি, প্রিন্স জ্যাসপার অরিজিন,তোমাকে আমার জীবনসঙ্গী হিসেবে গ্রহণ করছি।আমি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি যে,সুখে-দুঃখে,স্বাস্থ্য ও অসুস্থতায়,আমি তোমার সঙ্গে থাকবো।আমি তোমাকে ভালোবাসবো এবং সারা জীবন তোমার পাশে দাঁড়াবো।আমি শপথ করছি,আমাদের সম্পর্কের যে কোনো চ্যালেঞ্জে একসঙ্গে লড়বো এবং তুমি আমাকে যেভাবে সম্মান করবে, আমি সেটি রক্ষা করবো।আমি তোমাকে বলছি,আমি তোমাকে কখনো ছেড়ে যাবো না,যতদিন আমি বাঁচবো।”
তারপর জ্যাসপার তা্য শপথ শুরু করলো:
“আমি,প্রিন্স জ্যাসপার অরজিন,তোমার সামনে দাঁড়িয়ে, হামিংবার্ড,আমার জীবনের প্রতিটি রক্ত ও মাং*সের বিনিময়ে তোমাকে গ্রহণ করছি।আমি শপথ করছি,আজ থেকে তুমি শুধু আমার।আমি তোমার উপর অন্যের কারো হাতের ছোঁয়া বা নজর সহ্য করবো না। আমি বলছি,যদি অন্য কোনো পুরুষ তোমার কাছে আসার সাহস করে,তার পরিণতি হবে মারাত্মক।আমি তোমাকে রক্ষা করবো,রক্ষা করতে হবে আমাকে—যতক্ষণ বাঁচবো,ততক্ষণ তোমার ওপর আমার অধিকার অক্ষুণ্ণ থাকবে।
আমি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি, সুখে-দুঃখে,জীবনের প্রত্যেকটি মুহূর্তে,আমি তোমার পাশে থাকবো।তুমি আমার জীবনের আলো,আর আমি তোমাকে কখনো ছেড়ে যাবো না।আমি প্রতিজ্ঞা করছি,আমি যতদিন বাঁচবো এমনকি মলে গেলেও তোমাকে ভালোবাসবো।
আমি জানি,আমাদের সম্পর্কের মধ্যে বাধা আসবে,কিন্তু আমি প্রতিজ্ঞা করছি,তোমার প্রতি আমার ভালোবাসা এমন এক পাথরের মতো কঠিন হবে যা কোনো শক্তি ভাঙতে পারবে না।আমি তোমাকে চিরকাল রক্ষা করবো,কারণ তুমি আমার অন্তরে বাস করো।
আমি আবারো বলছি,আমি তোমাকে আমার স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করছি,আর তোমাকে শাসন করবো,যতক্ষণ পর্যন্ত জীবন থাকবে,তুমি আমার।তাই আজ,এই বিশাল দায়িত্ব নিয়ে,আমি তোমাকে গ্রহণ করছি আর তুমিও আমাকে গ্রহন করে নাও মন থেকে।”
চার্চের পরিবেশ যেন এক মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে গেল। ফিওনার হৃদয়ে এক ভীতির অনুভূতি ঢুকলো,কিন্তু ফিওনা জানতো,এই শপথের পিছনে জ্যাসপারের গভীর প্রেম রয়েছে।
পাদ্রী তখন তাদের বিয়ের সার্টিফিকেটে সাইন করার জন্য আহ্বান করলেন।ফিওনা যতক্ষণ সাইন করলো,ততক্ষণ তাঁর হৃদয় একটি দ্বন্দ্বে ভরা ছিল। সার্টিফিকেটে লেখা ছিল:
এই সার্টিফিকেট দ্বারা প্রমাণিত হচ্ছে যে:
নাম: জ্যাসপার অরিজিন
নাম: এলিসন ফিওনা
এরা দুজন আজকের দিনে,ফেব্রুয়ারি ১৯, ২০২৫ তারিখে, একটি খ্রিস্টান ধর্মীয় অনুষ্ঠানে বিয়ে করেছেন।এই বিয়ের অনুষ্ঠান সেন্ট মারির চার্চ,বেইজিং,চীন এ অনুষ্ঠিত হয়েছিল এবং পাদ্রীর পরিচালনায় বিকেল ৪:০০ টায় সম্পন্ন হয়।
বিয়ের স্থান: সেন্ট মারির চার্চ, বেইজিং
বিয়ের সময়: বিকেল ৪:০০
সাক্ষী:
১. আলবিরা
২. অ্যাকুয়ারা
৩. এথিরিয়ন
৪. থারিনিয়াস
এই সার্টিফিকেটে উল্লিখিত বিবাহটি আইনগতভাবে বৈধ এবং উভয় পক্ষের সম্মতি ও ভালোবাসার ভিত্তিতে সংঘটিত হয়েছে।
জ্যাসপার অরিজিন
[স্বাক্ষর]
এলিসন ফিওনা
[স্বাক্ষর]
পাদ্রীর স্বাক্ষর:
[পাদ্রী লিয়াম উইলিয়ামস]
[স্বাক্ষর]
এই সার্টিফিকেটের মাধ্যমে উভয় পক্ষ একে অপরের প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ এবং তাদের একত্রে জীবনের পথ চলার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।
আলবিরা,অ্যাকুয়ারা,এথিরিয়ন, আর থারিনিয়াস সাইন করলো,প্রত্যেকের মুখে ছিল আবেগ ও প্রত্যয়ের চিহ্ন।তারা নিজেদের সত্তার প্রতীক হিসেবে এই নতুন অধ্যায়ের সাক্ষী হয়ে রইলো।
পাদ্রী তখন বিয়ের সমাপ্তি ঘোষণা করেন,“এখন আমি আপনাদের দুজনকে একে অপরকে চুম্বন করার জন্য অনুমতি দিচ্ছি।”
ফিওনা চুম্বনের কথা শুনে সামান্য পেছিয়ে গেলো, তার মনে কিছুটা দ্বিধা ছিল। কিন্তু জ্যাসপার তার দুই হাত শক্ত করে ধরে এক অদ্ভুত হেঁচকা টান দিয়ে ফিওনাকে কাছে টেনে নিয়ে এল। সে তখনো প্রস্তুতি নিতে পারেনি, অথচ জ্যাসপার তার মুখের দিকে গভীর দৃষ্টি দিয়ে বললো, “আমার স্ত্রী, তোমার ওপর সম্পূর্ণ অধিকার আমার।”
তারপর, চোখের দিকে চোখ রেখে সে গভীর থেকে গভীর চুমু দিল ফিওনার ঠোঁটে।প্রথমে এটি একটি মৃদু স্পর্শ ছিল, কিন্তু দ্রুতই তা বদলে গেল গভীর, আগ্রাসী চুমুতে।
ফিওনার ঠোঁটে জ্যাসপারের চুমু আক্রমণাত্মকতা ছিল অপ্রত্যাশিত।সে যেন একজন অধিকারী স্বামী, যে তার স্ত্রীর প্রতি তার দাবি প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে। জ্যাসপার দু হাত দিয়ে ফিওনার মুখটিকে শক্ত করে ধরল, যেন তার প্রতিটি শ্বাসের মধ্যে ফিওনার অস্তিত্বকে প্রাতিষ্ঠানিক করল।
চুমুটি ছিল গভীর ও উষ্ণ, কিন্তু তাতে এক ধরনের জোরাজুরি ছিল। জ্যাসপারের ঠোঁটগুলো ফিওনার ঠোঁটের ওপর দাপটের সাথে নেমে আসছিল, যেন সে বলছে, “তুমি আমার।” ফিওনার মনে হচ্ছিল যেন এই মুহূর্তে সে সম্পূর্ণভাবে হারিয়ে যাচ্ছে, তার সমস্ত স্বকীয়তা এবং স্বাধীনতা যেন চুরমার হয়ে যাচ্ছে।
যখন সে জিজ্ঞেস করার চেষ্টা করছিল, “কেন?” তখন জ্যাসপারের ঠোঁট তাকে এমনভাবে শ্বাসরুদ্ধ করে তুলল, যেন প্রশ্ন করার অধিকারই নেই। উপস্থিত দর্শকরা হাততালি দিতে লাগলো, কিন্তু ফিওনার জন্য সেই হাততালিগুলো ছিল একটি ভয়ঙ্কর সুর, তার চেতনা যেন অন্ধকারের দিকে চলে যাচ্ছিল।
জ্যাসপার, তার চেহারায় একটি বিজয়ী হাসি নিয়ে, ফিওনার প্রতি তার দাবিদারিত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল। সে বুঝতে পারছিল না, ফিওনার ভেতরের যন্ত্রণা আর ঘৃণা তাকে আরও আগ্রাসী করে তুলছে। ফিওনার মুখের দিকে তাকিয়ে, সে যেন তার প্রতিটি অনুভূতি চিহ্নিত করতে চেয়েছিল—যেখানে প্রেমের কোনো চিহ্ন ছিল না,বরং ছিল ঘৃণা ও বন্দিত্বের স্পষ্ট চিহ্ন।
ফিওনা তখন এক মুহূর্তের জন্য মনে করলো, “আমি এই জীবন চাই না।” তবে সে জানতো, জ্যাসপারের এই আগ্রাসী চুমু তাকে কখনো মুক্তি দেবে না।
শেষে, সে জোরের সাথে বলল, “জ্যাসপার, আমি এটা চাই না।” কিন্তু তার আওয়াজ ছিল যেন বাতাসে হারিয়ে যাচ্ছে।
জ্যাসপার তার চোখে নজর রেখে বলল, “তুমি আমার হয়ে গেছো হামিংবার্ড।” এরপর চুমুর মধ্যে সে আরো বেশি একাগ্রতা নিয়ে যুক্ত হলো,যেন ফিওনাকে পুরোপুরি তার অধীনে আনতে চাইছে।ফিওনার মনে তখনই একটি আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল,সে জানত,এই চুমু তার জন্য এক নতুন দিগন্তের সূচনা করছে,যেখানে মুক্তির কোনো আশা নেই।
চার্চের ভেতরে তখনও মোমবাতিগুলো জ্বলছিল। শপথ, আংটিবদল বাদে,সবকিছুই হয়ে গেছে, ষকিন্তু ফিওনার মনে শান্তি নেই।তার হৃদয়ের প্রতিটি স্পন্দন যেন একটা ভারী বোঝা বইছে।
জ্যাসপার সবার উদ্দেশ্যে কঠিন কণ্ঠে বললো, “আপাতত তোমরা ভেনাসে ফিরে যাও।আমার প্রয়োজন হলে আমি তোমাদের পৃথিবীতে আসার জন্য ডাকবো।”
ওরা সবাই মাথা নাড়ল,প্রিন্সকে অভিনন্দন জানালো,কিন্তু ফিওনার দিকে কেউ তাকাল না।
জ্যাসপার এবার থারিনিয়াসের দিকে তাকিয়ে বললো, “থারিনিয়াস,পাদ্রীর ছেলেকে তার বাসায় দিয়ে এসো,আর মিস্টার চেন শিং-এর বাসার বোমাটা নিষ্ক্রিয় করে দিয়ো।”
থারিনিয়াস মাথা ঝুঁকিয়ে সম্মতি জানালো।চারপাশের সবাই একে একে বিদায় নিতে লাগল,আলবিরা একটু থেমে ফিওনার দিকে তাকাল,কিন্তু কিছু বলল না।অ্যাকুয়ারা শুধু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চলে গেল।
এটা বলে জ্যাসপার ফিওনার হাত শক্ত করে ধরলো।তার শীতল আঙুলগুলো ফিওনার গরম চামড়ায় স্পষ্ট অনুভূত হলো।
ফিওনা ধরা গলায় বললো, “আমাকে কোথায় নিয়ে যাবেন? আমরা ভেনাসে ফিরবো না?”
তার কণ্ঠে এক ধরনের অনিশ্চয়তা ছিল, যেন সে আশা করছিল, এই দুঃস্বপ্নের একটা শেষ হবে।
জ্যাসপার তার দিকে তাকিয়ে এক ঠান্ডা হাসি দিলো, চোখে এক ধরনের রহস্যময় আগুন জ্বলছিল। “এখনো ভেবেছো, তুমি এত সহজে মুক্তি পাবে,ফিওনা?”
চার্চের দরজার বাইরে তখন সন্ধ্যার আলো ম্লান হয়ে আসছিল। আকাশের এক কোণে লালচে আভা, যেন সূর্য নিজেও ফিওনার নতুন জীবনের কঠোর বাস্তবতার সাক্ষী হয়ে আছে।
জ্যাসপার ফিওনার হাতটা শক্ত করে ধরে রাখলো, যেন এই বন্ধন এখন চিরস্থায়ী। তার ঠোঁটের কোণে এক তাচ্ছিল্যের হাসি, চোখে আগুনের মতো দৃষ্টি।
“মাত্র বিয়ে করলাম, আর তুমি এত তাড়াতাড়ি ভেনাসে ফিরতে চাইছো? আগে হানিমুনটা করে নেই, হ্যাঁ?” তার কণ্ঠে এক ধরনের কঠোর আনন্দ ছিল, যেন সে উপভোগ করছিল ফিওনার অস্বস্তি।
ফিওনা চোখ সরিয়ে নিলো, এক মুহূর্তের জন্য নিজের অসহায়ত্ব লুকানোর চেষ্টা করলো। কিন্তু সে বুঝতে পারছিল, পালানোর কোনো পথ নেই।
“আমি গ্ৰান্ডপাকে দেখতে চাই,” ফিওনার কণ্ঠ কাঁপছিল। “আমি তার সাথে কথা বলতে চাই। অনেকদিন তাকে দেখিনি।”
জ্যাসপার তখন এক দীর্ঘশ্বাস ফেললো, যেন এই কথাগুলো তার কাছে বিরক্তিকর। এক ঝটকায় ফিওনাকে কাছে টেনে আনলো, তার মুখের সামনে মুখ এনে বললো—
“উফ, এখন কারো সাথেই দেখা করতে পারবে না।যতদিন না তুমি আমাকে আগের মতো ভালোবাসছো।”
তার গলায় কোনো কোমলতা ছিল না, ষছিল দাবি। তার চোখের ভেতর এক দহন, এক শাসন, এক অধিকারবোধ, যেন ফিওনার স্বাধীনতার শেষ বিন্দুটাও সে নিজের হাতে নিতে চায়।
ফিওনা শ্বাস আটকে গেলেও নিজেকে শক্ত করলো, কিন্তু সে জানতো—জ্যাসপারের বিরুদ্ধে এই মুহূর্তে তার কিছুই করার নেই।
চার্চের আকাশে এক মুহূর্তের জন্য নিস্তব্ধতা নেমে এল, তারপর হঠাৎ এক প্রবল বাতাস উঠল,যেন আকাশ কেঁপে উঠল তার আগমনী বার্তায়।এথিরিয়নকে ইশারা করতেই দূর আকাশ থেকে যেন অদৃশ্য কোনো শক্তি বিশাল কুইট হেলিকপ্টারটিকে নামিয়ে আনল।সেটি কোনো সাধারণ হেলিকপ্টার ছিল না—কালো ধাতব আবরণ,ঝকঝকে গ্লাস, নীরব কিন্তু প্রবল শক্তিশালী,যেন এক আধুনিক দৈত্য।
জ্যাসপার ফিওনাকে শক্ত করে হাত ধরে হেলিকপ্টারের দিকে এগিয়ে গেল।ফিওনা এক মুহূর্তের জন্য পেছনে তাকাল,তার হৃদয়ের এক অংশ যেন এই চার্চের সামনে রেখে যেতে চাইছিল।অথচ সামনে ছিল এক অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ, এক ড্রাগনের সাথে যার সাথে সে আজীবন বাঁধা পড়েছে।
জ্যাসপার হেলিকপ্টারের দরজা খুলে ফেলল একঝটকায়, তারপর কোনো কষ্ট না করেই ফিওনাকে এক দপে তুলে নিল তার শক্ত বাহুতে।ফিওনা ছটফট করল,কিন্তু তার শক্তি জ্যাসপারের কাছে কিছুই ছিল না।সে বিস্মিত চোখে দেখল—জ্যাসপার পাইলটের আসনে বসে পড়েছে!
“আপনি… পাইলট?” ফিওনার কণ্ঠ অবিশ্বাসে কাঁপছিল।
জ্যাসপার মুখে একধরনের নির্লিপ্ত হাসি আনল, যেন এটা কোনো গুরুত্ব দেওয়ার মতো বিষয়ই নয়। “আমি যা চাই,তাই পারি,পৃথিবী আর ভেনাসের এমন কিছু নেই যা আমি না পারি”
ফিওনার চোখে বিস্ময়ের ছায়া ফুটে উঠল। “এই ড্রাগন আর কি কি পারে?সবকিছুই পারে নাকি?”
এরপর কিছু বোঝার আগেই হেলিকপ্টারটি আকাশে উঠে গেল,কোনো শব্দ ছাড়াই।চারপাশে প্রবল বাতাস বইছিল, গাছের পাতাগুলো ছিন্নভিন্ন হয়ে উড়ছিল,চার্চের সামনের বাতিগুলো টলমল করছিল,কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে কোনো বিকট শব্দ হচ্ছিল না,কারন সেটি ছিলো “লাউডনেস রিডিউসড হেলিকপ্টার”
ফিওনা জানালার দিকে তাকাল,শহরের আলো একে একে ছোট হয়ে আসছিল,চার্চটা কুয়াশার চাদরে ঢেকে যাচ্ছিল। তার বুকের ভেতর কেমন জানি একটা শূন্যতা ভর করছিল, ভয়,অনিশ্চয়তা আর জ্যাসপারের নিয়ন্ত্রণের এক অলঙ্ঘনীয় শেকল যেন তাকে বেঁধে ফেলছিল।
সে আড়চোখে তাকাল জ্যাসপারের দিকে। শক্ত চোয়াল, স্থির দৃষ্টি, সম্পূর্ণ আত্মবিশ্বাসী একজন ড্রাগন পুরুষ,যে জানে সে যা চায় তা তার হতে বাধ্য।
এখন ফিওনার সামনে কোনো পথ খোলা নেই, একটাই সত্য—এই ভয়ঙ্কর, রহস্যময় ড্রাগনের স্ত্রী হিসেবে তার নতুন জীবন শুরু হয়ে গেছে।
ভেনাসের আকাশে কালো মেঘ জমে উঠেছে, যেন প্রকৃতি নিজেই কিছু আসন্ন বিপদের ইঙ্গিত দিচ্ছে। রাজপ্রাসাদের অভ্যন্তরে থমথমে পরিবেশ, পাহারায় থাকা ড্রাগন যোদ্ধারা একে অপরের দিকে তাকিয়ে কেবল শঙ্কার ছায়া দেখতে পাচ্ছে।
দেবতা আভ্রাহারের প্রাসাদের বিশাল স্ফটিক দেয়ালজুড়ে প্রতিফলিত হচ্ছে আগুনের আভা,আর তার কেন্দ্রস্থলে দাঁড়িয়ে আছে লিউ ঝান—তার চোখ দুটো উত্তপ্ত লাভার মতো জ্বলছে।সে জানতে পেরেছে,ফিওনাকে জ্যাসপার তুলে নিয়ে গেছে! এই সংবাদ পাওয়ার পর থেকেই সে যেন পাগল হয়ে উঠেছে।
প্রাসাদের বিশাল মার্বেল টেবিলটা এক হাঁচকা ধাক্কায় উল্টে ফেলে দিলো সে।চারপাশে স্ফটিকপাত্রগুলো ভেঙে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেল।অভিজাত ড্রাগন সেনারা হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো,কেউ সাহস করে কিছু বলতে পারলো না।
“ফিওনাকে ফ্লোরাস রাজ্যে একা রেখে আমি ভুল করেছি!” লিউ ঝানের কণ্ঠস্বর গর্জনের মতো প্রতিধ্বনিত হলো। তার শরীর উত্তপ্ত হয়ে উঠছে, ভেতরের আগুনটা যেন তাকে গ্রাস করতে চাইছে। “আমি জানতাম, জ্যাসপার এমন কিছু করবেই! আমাকে ওকে আগেই ধরে ফেলতে হতো!”
তার চারপাশের বাতাসে প্রবল উত্তাপ ছড়িয়ে পড়তে লাগলো।হঠাৎ তার পিঠ থেকে বিশাল ড্রাগন ডানা বেরিয়ে এলো,আর সাথে সাথে তার শরীরের গঠন বদলে যেতে লাগলো।কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই লিউ ঝান তার সম্পূর্ণ ড্রাগন রূপে ফিরে এলো—এক বিশাল আগুনে আবৃত ড্রাগন,যার লাল-সোনালি আঁশগুলো সূর্যের মতো ঝলসে উঠছে।
আযদাহা সিজন ২ পর্ব ১৫
কিন্তু সে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলো,কারণ এটা তার জন্য নতুন কিছু নয়।আগের জন্মে,সে ছিল এক দক্ষ ড্রাগন সেনাপতি।
সেই অভিজ্ঞতা আর প্রশিক্ষণের কারণেই সে এখন তার রূপ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে,অন্যসব ড্রাগনের মতো বেপরোয়া হয়ে যায় না।কিন্তু তার ভেতরের রাগ যেন এক মহাজাগতিক আগুন হয়ে জ্বলছে।
সে এক ঝটকায় তার ড্রাগন রূপ থেকে আবার মানবরূপে ফিরে এলো। তার মুষ্টি শক্ত, চোয়াল কঠিন।
“আমি ফিওনাকে ফিরেই আনব!”
