Home আযদাহা সিজন ২ আযদাহা সিজন ২ পর্ব ২৯

আযদাহা সিজন ২ পর্ব ২৯

আযদাহা সিজন ২ পর্ব ২৯
সাবিলা সাবি

নিশ্ছিদ্র অন্ধকারের মতোই গভীর সমুদ্রের অতল গহ্বরে তলিয়ে যাচ্ছিল জ্যাসপার ও ফিওনা। সমুদ্রের সুনশান নীল দিগন্ত যেন ধীরে ধীরে তাদের গ্রাস করে নিচ্ছিল। জ্যাসপার জানত, একবার এই স্রোতের গভীরে হারিয়ে গেলে ফিরে আসার আর কোনো পথ থাকবে না। কিন্তু তার জন্য এখন সবচেয়ে বড় বিষয় ছিল ফিওনা। এক মুহূর্তের জন্যও সে তাকে আলগা করতে পারছিল না।
ফিওনার শরীর ছিল ঠান্ডায় জমে যাওয়া বরফের মতো, অথচ তার হৃদয়ের ধুকপুকানি স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছিল জ্যাসপার। হালকা শ্বাস নেওয়ার চেষ্টা করছিল ফিওনা, কিন্তু গভীর পানির চাপে তার ফুসফুস যেন আগুনের মতো জ্বলছিল।
জ্যাসপার ফিসফিস করে বলল, “এই জন্মেও একসঙ্গে থাকা হলো না, তবে অন্তত শেষ মুহূর্তটা একসঙ্গে কাটাতে পারছি…”

তার বাহুতে ফিওনাকে আরও শক্ত করে ধরে নিল সে।
কিন্তু বিধির লিখন হয়তো অন্য কিছু ছিল।
আকাশ কেঁপে উঠল হঠাৎ!
গম্ভীর গর্জনের সঙ্গে সাগরের উপরে দেখা গেল তিনটি বিশাল ড্রাগন, তাদের সুবিশাল ডানা আকাশকে ঢেকে দিয়েছে। আগুনে রঙের থারিনিয়াস, বরফশুভ্র আলবিরা—দুজনে বজ্রের গতিতে ঝাঁপিয়ে পড়ল সমুদ্রের বুকে।
এক মুহূর্তে তাদের দীর্ঘ নখ গেঁথে গেল জ্যাসপার ও ফিওনার শরীরে।
ফিওনা বিস্ময়ে তাকিয়ে ছিল, তার দৃষ্টি অস্পষ্ট হয়ে যাচ্ছিল। একটা শক্তিশালী ধাক্কায় সে অনুভব করল, তার শরীর হালকা হয়ে যাচ্ছে—সমুদ্র তাকে ছেড়ে দিচ্ছে, আকাশের দিকে উড়িয়ে দিচ্ছে।
লিউ ঝান তখনও দাঁড়িয়ে ছিল এক জায়গায়। নিস্তব্ধ আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখছিল কীভাবে জ্যাসপার ও ফিওনাকে বহন করে নিয়ে উড়ে যাচ্ছে ড্রাগনরা।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

ফিওনার অচেতন হাত থেকে কয়েকটি ভেজা ফুল খসে পড়ল নীচে, গহীন সমুদ্রের অতলে হারিয়ে গেল—ঠিক যেমন কিছুক্ষণ আগে তারা দুজন হারিয়ে যাচ্ছিল।
হঠাৎ করেই আকাশ বিদ্যুতের ঝলকের মতো চিরে, নীলচে আলোয় ভরে উঠল চারপাশ। এক বিশাল, নীল ড্রাগন—অ্যাকুয়ারা—আকাশ থেকে বজ্রপাতের মতো নেমে এলো, তার ডানার প্রান্তে জলকণার মতো ঝলসে উঠছিল রহস্যময় আভা।
লিউ ঝান কিছু বুঝে ওঠার আগেই ধারালো নখর তার শরীর ঘিরে নিল, এক প্রচণ্ড টানে তাকে তুলে নিলো আকাশের অতল গভীরে। বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দের মাঝে লিউ ঝান দেখলো, নীচে পড়ে থাকা অভিশপ্ত পাহাড়টা যেন এক অন্ধকার ফাঁদ, যেখানে প্রবেশের অর্থই হারিয়ে যাওয়া।
অ্যাকুয়ারা জানতো—একবার এখানে ফেলে গেলে লিউ ঝান কখনও ফিরতে পারবে না। কিন্তু সে ভেনাসে নিয়ে যায়নি তাকে, বরং সেই অভিশপ্ত পাহাড় পার করে আরও অজানা এক প্রান্তরে ফেলে রেখে গেলো।

নির্জন চন্দ্রালোকিত এল্ড্র রাজ্যে রাজসভার নীরবতা ভেদ করে জ্যাসপারকে আনা হলো। তিন দিন ধরে মহাশূন্যের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে যখন সে ভেনাসে ফিরল, তখন তার শরীর যেন কোনো জমাট বাঁধা অভিশাপের প্রতিচ্ছবি। নীলাভ বর্ণ ছড়িয়ে পড়েছে তার প্রতিটি শিরা-উপশিরায়, ঠোঁট রক্তশূন্য সাদা, নিঃশ্বাস যেন মৃত্যুর দরজায় কড়া নাড়ছে।
জ্যাসপারকে রাজ্যপ্রাসাদের ভেতরে প্রবেশ করানোর সঙ্গে সঙ্গেই এল্ড্র রাজ্যের বন্দী রাজা ড্রাকোনিসকে মুক্তি দেওয়া হলো। যেই সন্তান একদিন নিজের হাতে তাকে বন্দি করে পৃথিবীতে চলে গিয়েছিল, আজ সেই সন্তানকে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে দেখে ড্রাকোনিসের বুক কেঁপে উঠলো।
“জ্যাসপার, মাই সান!”
ড্রাকোনিসের কণ্ঠ ভেঙে গেলো, চোখ থেকে ছলছল করে বেরিয়ে এলো যুগের গোপন শোক। রাজা কাঁদলেন—এক নিষ্ঠুর পিতার মতো নয়, এক পরাজিত মানুষের মতো, যার অস্তিত্বের কেন্দ্র আজ মৃ*ত্যুর ছায়ায় ঢেকে গেছে।
রাজ্যজুড়ে নেমে এলো ব্যস্ততা। রাজ্যের সর্বশ্রেষ্ঠ বায়ো-কেমিস্টরা, মহাজাগতিক চিকিৎসকরা, সোনালী আলোর প্রাণশক্তি ব্যবহার করে শত শত চেষ্টা চালাতে লাগলো। কিন্তু কিছুতেই কিছু হলো না ভেনাসের বায়ো ক্যামিকেল জ্যাসপারের শরীরে কার্যকর হলোনা।
ভেনাসের কোনো ঔষধই এই নীল বিষ ছিন্ন করতে পারল না।
রাজসভা স্তব্ধ হয়ে গেলো। সমস্ত জ্ঞানের সীমা ছুঁয়ে এখন তারা দাঁড়িয়ে আছে এক অজানা পরিণতির সামনে। নক্ষত্রের আলোও যেন জ্যাসপারের নিস্তেজ শরীরের দিকে তাকিয়ে কেঁদে উঠেছে…

ফ্লোরাস রাজ্যের আকাশ তখন সোনালি আভায় ঢাকা, কিন্তু রাজপ্রাসাদের বাগানঘেরা অট্টালিকায় যেন শোকের ছায়া নেমে এসেছে। আলবিরা সমুদ্রপথে ছুটে এসেছিল, কিন্তু ফিওনা… সে আর সইতে পারেনি। অতিরিক্ত লবণাক্ত জল তার দুর্বল মানব শরীরের সহ্যসীমা পেরিয়ে গেছে।
শুভ্র মখমলের মতো বিছানায় নিথর পড়ে আছে ফিওনা। নিঃশ্বাস ক্ষীণ, চোখ বন্ধ, যেন চিরনিদ্রায় তলিয়ে গেছে। রাজপ্রাসাদের মহলজুড়ে নেমে এসেছে এক অনিশ্চিত অপেক্ষা।
লিয়ারা কাঁদছেন, নির্বাক বসে আছেন মেয়ের পাশে। তিনি জানেন, ফিওনা কেবল তার মেয়ে নয়, তার একমাত্র আশ্রয়। তার কষ্ট-তাড়িত চোখে নীরব আকুতি—”ফিওনা আমার ছোট্ট মেয়ে আমার প্রিন্সেস তুমি সুস্থ হয়ে মায়ের কাছে ফিরে আসবে তো?”
রাজা জারেন বোনের কষ্ট সহ্য করতে পারছেন না। তাঁর প্রাসাদের একমাত্র ভাগ্নি, যাকে তিনি কখনও এত দুর্বল অবস্থায় দেখেননি, আজ নিঃসাড় পড়ে আছে তাঁর চোখের সামনে। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সিলভা, যে সবসময় প্রাণবন্ত, আজ সে-ও বাকরুদ্ধ।
ডাক্তারের কণ্ঠ শোনা গেলো—”পেশেন্ট এখন বিপদমুক্ত,
কিন্তু কবে জ্ঞান ফিরবে, সে নিশ্চয়তা দিতে পারছি না।”
এক মুহূর্তের জন্য পুরো রাজ্য স্তব্ধ হয়ে গেলো।
সময়ের প্রবাহ থেমে আছে। রাজপ্রাসাদের স্নিগ্ধ বাতাসে শুধু একটাই অপেক্ষা—ফিওনার চোখ কখন খুলবে?

একদিন পেরিয়ে গেছে, অথচ ফিওনার চোখে এখনো কোনো সাড়া নেই। কিন্তু হঠাৎ করেই তার মস্তিষ্কে প্রচণ্ড চাপ অনুভূত হলো, কোনো অদৃশ্য শক্তি তার চিন্তাকে আঘাত করছে। মাথার ভেতর যন্ত্রণা বাড়তে লাগলো, প্রতিটি স্নায়ুতে আগুন জ্বলছে। অজানা এক অতীতে আটকে যাওয়া স্মৃতির দরজা ধীরে ধীরে খুলছে…

সমুদ্রের বিশাল নীল গভীরে, এক আহত সার্ক ছটফট করছিলো। তার বিশাল দেহের এক অংশ ছিঁ*ড়ে গেছে, কোনো এক অজানা জাহাজের সাথে সংঘর্ষে। র*ক্তে লাল হয়ে গেছে চারপাশের জল। ধীরে ধীরে সার্কটি ভেসে যেতে থাকে, স্রোতের টানে একটা নির্জন দ্বীপের দিকে।
দ্বীপের মানুষগুলো ছুটে আসে। এত বিশাল মাছ! তারা বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে। কিন্তু হঠাৎ করেই কেউ একজন কিছু লক্ষ্য করে—সার্কের ক্ষতস্থান থেকে আলো ছড়িয়ে পড়ছে!
এক রহস্যময় সবুজাভ বস্তু, যা দেখতে অনেকটা লাভ-শেপের মতো, তার শরীরের ভেতরে আটকে আছে। দ্বীপবাসীরা ভাবে, হয়তো কোনো মূল্যবান রত্ন, কোনো বহুমূল্য সম্পদ! আলো ক্রমশ উজ্জ্বল হতে থাকে,মনে হচ্ছে সত্তার গভীর থেকে কিছু বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছে।
কেউ একজন বললো, “এটা পাথরের মতো, কিন্তু এই পাথরের ভেতরে কিছু আছে দেখা যাচ্ছে।!”
তারা যখন পাথরটি ভেঙে ফেলে—

আলো আর শব্দের প্রবল বিস্ফোরণ ঘটে, সময়ের প্রবাহ ছিন্ন হয়ে গেলো!
সেই মুহূর্তেই ফিওনার নিথর শরীর কেঁপে উঠলো।
রাজপ্রাসাদের বিছানায় শুয়ে থাকা ফিওনার নিঃশব্দ ঠোঁট ফিসফিস করে উঠলো, “প্রিন্স…”
সে জানে না কেন, কিন্তু তার ভিতরে এক অদ্ভুত শক্তির প্রবাহ ছুটে যাচ্ছে।হারিয়ে যাওয়া কোনো অস্তিত্ব তার মস্তিষ্কে ফিরে আসছে, পুনরায় জন্ম নিচ্ছে!
এটাই সেই স্মৃতি, যা জ্যাসপার তার লকেটের ডিভাইসে বন্দি করে প্রশান্ত মহাসাগরের অতল গহ্বরে ফেলে দিয়েছিলো…
কিন্তু স্মৃতি কি চিরকাল হারিয়ে যায়?
না, সময়ের স্রোত আবারো তা ফিরিয়ে এনেছে।
ফিওনা এখনো অচেতন, কিন্তু তার ভেতরে এক নতুন যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে!

ফিওনার নিথর দেহ হঠাৎ কেঁপে উঠলো। তার হৃদস্পন্দন দ্রুত হতে লাগলো, শ্বাস ভারী হয়ে এলো। তার মস্তিষ্কের প্রতিটি কোষে কোনো প্রবল বিস্ফোরণ ঘটলো—
স্মৃতির দ্বার খুলে গেলো!
প্রথম দেখা…
কোনো এক ল্যাম্পপোস্টের আবছা ছায়াতে আর দ্বিতীয়বার সামনে থেকে অন্ধকার নৈশক্লাব, মিউজিকের বিটে মাতাল উন্মাদনার মাঝে এক আগন্তুক দাঁড়িয়ে ছিলো। মুখ ঢেকে রাখা কালো মাস্কে, মাথায় হুড টানা, আর চোখজোড়া লুকিয়ে সানগ্লাসের আড়ালে।
সেদিন ফিওনার মন বলেছিলো, “কিছু একটা অস্বাভাবিক…”
সে প্রথমবার তার চোখ দেখেছিলো গড়িয়ে বসে—
অলিভ-সবুজ, অতলান্তিক রহস্যময়, গভীরতর কোনো শপথে বাঁধা…
সব মনে পড়ছে!

জ্যাসপার তাকে অপহরণ করেছিলো। মাউন্টেন গ্লাস হাউজের কাঁচের দেয়ালের বন্দিশালায় সে প্রথম বুঝেছিলো, এই অপহরণ শুধু শারীরিক নয়, বরং মনেরও।
“তুমি আমার কাছে বন্দী।”
কিন্তু দিন যেতে না যেতেই এই অপহরণ এক অদ্ভুত বাঁকে মোড় নিয়েছিলো।
ফিওনা বুঝতে পেরেছিলো, সে এক ড্রাগনের বন্দিনী নয়—বরং এক ড্রাগনের হৃদয়কে বন্দী করে ফেলেছে!
বিচ্ছেদ…
তারপর?
জ্যাসপার চলে গেলো, আর ফিরে আসেনি।
কিন্তু সে কি হার মানার মেয়ে?
স্পেসশিপের আলো জ্বলে উঠেছিলো, পৃথিবীর মাটি ছেড়ে ফিওনা নিজেই উড়ে গিয়েছিলো ভেনাসে, ভালোবাসার পিছু ছুটতে।

কিন্তু জ্যাসপার…
সে ফিওনার মঙ্গলের জন্য তাকে দূরে সরিয়ে দিতে চেয়েছিলো।
ফিওনা যখন শেষবার তাকে আকড়ে ধরেছিলো, কান্নায় ভেঙে পড়েছিলো, তখনই সে ফিওনার লকেট খুলে নিয়েছিলো।
সেই লকেটে বন্দী করে ফেলেছিলো এক টুকরো অতীত—
তাদের প্রথম দেখা, প্রথম চাহনি, প্রথম অদ্ভুত সংযোগ।
আর তারপর?
জ্যাসপার সেই লকেট প্রশান্ত মহাসাগরে ছুঁড়ে ফেলেছিলো…
এতদিন সে ছিলো এক বিভ্রান্ত মানবী।
কিন্তু এখন?
এখন সে ড্রাগন।
এবার ফিওনা ফিরে পেয়েছে সব স্মৃতি, ফিরে পেয়েছে তার শ*ক্তি।
কিন্তু সে কি জ্যাসপারকে এত সহজে ক্ষমা করবে?
না, জ্যাসপার তো কষ্ট পেয়েছে।যেমন কষ্ট সে নিজে পেয়েছিলো।
পুনরায় জ্যাসপার পাগলামি করছে তাকে ফিরে পেতে।

বজ্রপাতের বিকট শব্দ আকাশ কাঁপিয়ে উঠলো। প্রবল ঝড়ের সাথে বৃষ্টি ভেনাসের বুক চিরে নামছে। কিন্তু ফিওনার জন্য এ বৃষ্টি কেবলই এক ব্যাকুলতা, এক তীব্র আকুলতার অশ্রু!
সে আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা করতে পারছে না।
“আমি… আমি তো প্রিন্সকে শেষবারের মতো বিষাক্ত ফুলের রস খাইয়েছিলাম!”
এই সত্যটা বজ্রের চেয়েও ভয়ানক হয়ে তার বুকের ভেতর বাজলো।
“আমরা তো একসঙ্গে তলিয়ে যাচ্ছিলাম… সমুদ্রের অতলে!”
এটা মনে পড়তেই ফিওনার র*ক্ত হিম হয়ে এলো। সে জানে, সে অপেক্ষা করতে পারবে না।
ফিওনা দৌড়ে বেরিয়ে গেলো তার কক্ষ থেকে।
সিঁড়ি বেয়ে নেমে এলো দ্রুত, এক মুহূর্তও পিছনে তাকানোর সময় নেই।
প্রাসাদের মেইন দরজার সামনে এসে দাঁড়াতেই চারপাশের গার্ডরা হতভম্ব হয়ে গেলো।
“রাজকুমারী! কোথায় যাচ্ছেন?”

কিন্তু ফিওনার চোখে এখন কেবল একটিই গন্তব্য—এল্ড্র রাজ্য!
বাইরে ঝড় শুরু হয়ে গেছে। প্রকৃতি যেন আজ তার হৃদয়ের তোলপাড়কে প্রতিফলিত করছে।
বৃষ্টি ফিওনার মুখ ভিজিয়ে দিচ্ছে, কিন্তু সে থামছে না।
বাতাসের তীব্র ধাক্কায় তার চুল এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু সে কিছুই টের পাচ্ছে না।
তার একমাত্র লক্ষ্য—জ্যাসপার!
সে জানে, আজ কিছু একটা ঘটতে চলেছে।
সে জানে, আজ যদি সে দেরি করে, তবে হয়তো…
সবকিছু চিরতরে শেষ হয়ে যাবে!

প্রলয়ঙ্করী ঝড়-বৃষ্টি উপেক্ষা করে দীর্ঘ পথ পেরিয়ে অবশেষে ফিওনা পৌঁছে গেলো এল্ড্র রাজ্যে। তার শরীর ভিজে চুপচুপে, ঠোঁট কাঁপছে, নিঃশ্বাস ভারী। কিন্তু হৃদয়ে একটাই চিন্তা—জ্যাসপার কেমন আছে?
এল্ড্র প্রাসাদের গার্ডরা তাকে বাধা দিলো না। তারা জানে, ফিওনা জ্যাসপারের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তার পথ থামলো প্রাসাদের সিঁড়ির সামনে।
তার হাত শক্ত করে ধরে ফেললেন রাজা ড্রাকোনিস।
রাগে দৃষ্টিতে আগুন ছড়াচ্ছে, গলার স্বর বিষণ্ণতা আর তীব্র ক্ষোভে ভারী হয়ে উঠলো—
“আমার ছেলেকে মৃ*ত্যুর পথে ঠেলে দিয়েও তোমার শান্তি হয়নি? এবার চোখের সামনে মরতে দেখতে এসেছো?”
ফিওনার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেলো।
“বারবার কেন আমার ছেলের জীবনে শুধু তোমার কারণেই বিপদ আসে?”
ফিওনার কান্না বাঁধ ভেঙে দিলো।
সে কাঁদতে কাঁদতে ড্রাকোনিসকে মিনতি করতে লাগলো।

“দয়া করে আমাকে আমার প্রিন্সের কাছে যেতে দিন! আমি তাকে একবার দেখতে চাই! একবার!”
কিন্তু ড্রাকোনিস নিষ্ঠুরের মতো ফিওনাকে টেনে বের করে দিতে লাগলেন।
ফিওনা তখন দুই হাতে রাজার পা চেপে ধরলো।
“আমি প্রিন্সকে ছাড়া বাঁচতে পারবো না! প্লিজ, আমাকে যেতে দিন!”
কিন্তু রাজা কোনো দয়া দেখালেন না।
ঠিক তখনই পেছন থেকে এথিরিয়ন এগিয়ে এসে ফিওনার হাত ধরে ফেললো।
“বাবা, ওকে যেতে দিন!”
ড্রাকোনিস এবার আরো ক্ষেপে উঠলেন।
এথিরিয়নের চোখেও রাগ, কিন্তু তার কণ্ঠস্বরে ছিল দৃঢ়তা।
“আজ পর্যন্ত কখনো আপনাকে আমি বাধা দিইনি, কিন্তু আজ দেবো।জ্যাসু ভাইয়াকে যদি কেউ বাঁচাতে পারে, তবে সেটা শুধু ফিওনা। আপনি ওকে যেতে দিন!”
রাজা ড্রাকোনিস কিছুক্ষণ নীরব হয়ে গেলেন। তার নিজের ভেতরেই একটা যুদ্ধ চলছে।
তারপর এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফিওনার হাত থেকে নিজের হাত সরিয়ে নিলেন।
ফিওনা এক মুহূর্তও অপচয় করলো না।
সে দৌড়ে সিঁড়ির দিকে ছুটে গেলো—

তার প্রিয়তমের কাছে,
তার জ্যাসপারের কাছে।
ফিওনার হাত কাঁপছে, নিঃশ্বাস ভারী।
রাজকীয় কক্ষের বিশাল দরজাটা ঠেলে খুলতেই তার চোখ পড়লো—
নিথর, শুয়ে থাকা জ্যাসপারের দিকে।
তার শরীর নীল বর্ণের হয়ে গেছে, ঠোঁট ফ্যাকাশে। একটুও নড়াচড়া নেই।
ফিওনার চোখ জ্বলে উঠলো কান্নায়।
“না… না…!”
সে দৌড়ে গেলো জ্যাসপারের কাছে, হাঁটু গেড়ে বসলো বিছানার পাশে। দুহাতে ধরে তুললো জ্যাসপারের মুখ, হাত বুলিয়ে দিলো তার চেহারায়।
হঠাৎ তার মনে পড়লো—
মাউন্টেন গ্লাস হাউজে যখন এমন হয়েছিলো, তখন…
তখন তার চুম্বনেই জ্যাসপার ফিরে এসেছিলো।
আর এক মুহূর্তও দেরি করলো না ফিওনা।
সে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলো, চোখ বুজলো, আর তার ঠোঁট ছুঁইয়ে দিলো জ্যাসপারের ফ্যাকাশে ঠোঁটে।
গাঢ়, গভীর চুম্বন।

একটা মুহূর্ত কেটে গেলো।
দুইটা…
তিনটা…
হঠাৎ—
জ্যাসপারের আঙুল একটু নড়লো।
তার শ্বাস কিছুটা ভারী হলো।
ফিওনা চমকে উঠে তার ঠোঁট সরালো, কিন্তু তখনই—
জ্যাসপারের হাত ধীরে ধীরে উঠলো আর ফিওনার কোমরে জড়িয়ে ধরলো।
এক মুহূর্তের জন্য পুরো রাজকীয় কক্ষ নিস্তব্ধ হয়ে গেলো।
জ্যাসপারের চোখ ধীরে ধীরে খুললো, প্রথমে অস্পষ্ট ছিলো সবকিছু। মনে হলো বাস্তব আর স্বপ্নের মাঝখানে ফাঁক গলে একটা দুর্বল চিত্র ভেসে আসছে।
সে তাকিয়ে দেখলো ফিওনাকে তার সামনে—
হামিংবার্ড, তার প্রিয় হামিংবার্ড।

“হামিংবার্ড এটা কি সত্যি… তুমি?” জ্যাসপার হঠাৎ ভেবে পেলো না, “আমি কি স্বপ্ন দেখছি?”
ফিওনা জবাব দিলো, “হ্যাঁ, প্রিন্স… আমি। আমি সত্যিই তোমার সামনে, আমার সবকিছু মনে পড়েছে প্রিন্স,
আমাদের সব স্মৃতি আমার মনে পড়ে গেছে।”
ফিওনার চোখের দিকে গভীরভাবে তাকিয়ে থাকা জ্যাসপার বুঝতে পারলো, কিছুটা অবাক হয়ে, “তোমার সব কিছু মনে পড়েছে…
জ্যাসপার মনে মনে ভাবলো “তাহলে কি লকেটটা কোনোভাবে ভেঙে গিয়েছে এছাড়া তো অসম্ভব এটা?”
এটা চিন্তা করতে করতেই জ্যাসপার তার আবেগ আর সুখের অনুভূতি থেকে নিজেকে বিরত রাখতে পারলো না। সে শক্ত করে ফিওনাকে নিজের দিকে টেনে নিয়ে তার মধ্যে বিলীন হয়ে গেলো,মনে হলো ভেনাস বলতে আর কিছুই নেই। একে অপরকে এত শক্তভাবে আঁকড়ে ধরলো মনে হলো ছেড়ে দিলেই হারিয়ে যাবে।
ফিওনার দেহ পিষে যাচ্ছিলো তার শরীরের ব্যথা অনুভব করলেও, সে শুধু সুখের অনুভূতিতে ডুবে ছিলো।
তবে কিছুক্ষণ পরেই, জ্যাসপার ফিওনাকে আলতো করে ছেড়ে দিলো।
ফিওনা তার চোখের দিকে তাকিয়ে দেখলো, জ্যাসপারের দুই চোখে রক্তের অশ্রু।

“আমি তো ভেবেছিলাম, তুমি আর কখনো আমাকে মনে করতে পারবে না… আর কখনো আমাকে মন থেকে ভালোবাসবে না, আমি সারাজীবন তোমার ঘৃণার পাত্র হবো” জ্যাসপার নরম গলায় বললো।
ফিওনা তখন জ্যাসপারের চোখের অশ্রু মুছে দিয়ে গালে হাত রেখে বললো, “প্রিন্সের হামিংবার্ড সবসময়ই তার ফায়ার মনস্টারটারকে ভালোবেসেছে, আর ভালোবাসবে— সারা জীবন।”
এটা শুনে জ্যাসপার তার আবেগকে আর থামাতে পারলো না। সে ফিওনার চোখের পানি চুমু দিয়ে শুষে নিলো, তার ঠোঁটে এক নরম চুম্বন রেখে।
ফিওনা চমকে উঠলো, তার পুরো শরীরে শিহরণ চললো।
জ্যাসপার আর অপেক্ষা করলো না—সে ফিওনার ঠোঁটে ঠোঁট মিলিয়ে দিলো, পুরো ভেনাস নিঃশেষ হয়ে গেলো সেই চুম্বনে।

এটা ছিল না শুধু ভালোবাসা— এটা ছিল এক অবিরাম মিলনের প্রতিশ্রুতি, যা কখনো শেষ হবেনা।
ফিওনা,নিজেকে হারিয়ে ফেলেছে, এক মুহূর্তে সমস্ত মহাবিশ্ব ভুলে গিয়ে, জ্যাসপারের শার্টের কাঁধে নিজের হাত দিয়ে শক্ত করে আঁকড়ে ধরলো। তার শরীর এক অজানা তৃষ্ণায় মথিত হচ্ছে। প্রতি সেকেন্ডে সেই অনুভূতিকে আরো গভীর করে তুলছিল। ঠোঁট দুটি একে অপরের সাথে মিলে গেলো, দুজনের আত্মা একে অপরকে খুঁজে বের করতে চাইছে।

আযদাহা সিজন ২ পর্ব ২৮ (২)

জ্যাসপারও এক মুহূর্তে চুপচাপ ফিওনার পেছনের চুলে হাত রেখে আঁকড়ে ধরলো। তার স্নিগ্ধ চুম্বনে পুরো ভেনাস থমকে গিয়েছিল। তার ঠোঁটগুলো এমনভাবে ফিওনার ঠোঁটের সাথে মিশে যাচ্ছিলো, তাদের চুম্বনে শুধু প্রেম নয়, এক ধরনের গভীর তৃষ্ণার্তির ছাপ ছিল—দুই হৃদয় একে অপরকে এক সেকেন্ডের জন্যও না ছেড়ে রাখতে চাইছিলো।
ফিওনার হৃদয় জ্যাসপারের প্রতি আরও গভীরভাবে বিঁধে গিয়েছিল, এক অজানা অনুভূতির স্রোত তার ভেতর দিয়ে বয়ে যাচ্ছিল। তাদের শরীরের মাঝে এমন এক অবর্ণনীয় তৃপ্তি ছড়িয়ে পড়ছিল, যা কোন শব্দে বর্ণনা করা সম্ভব ছিল না। তারা একে অপরকে খুঁজে পেয়েছে, আবার একে অপরের কাছে ফিরে এসেছে।
কিছুই আর গুরুত্বপূর্ণ ছিল না, কেবল তাদের এই মুহূর্তের গভীরতা, তাদের মধ্যে থাকা অসীম ভালোবাসা।

আযদাহা সিজন ২ পর্ব ৩০