Home ভিলেন ক্যান বি লাভার ভিলেন ক্যান বি লাভার পর্ব ৬২ (২)

ভিলেন ক্যান বি লাভার পর্ব ৬২ (২)

ভিলেন ক্যান বি লাভার পর্ব ৬২ (২)
মিথুবুড়ি

‘মন আকাশে কালো মেঘের ঘনঘটা। বিষন্ন অনুভূতির মিলনে চুপসে গিয়েছে মন। স্বজন হারানোর শোকে গেয়ে উঠেছে এলিজাবেথের ভেতর’টা। তবুও বাইরে দিয়ে পাথরের মতো শক্ত, নির্বিকার। কাঁচের জানালা ভেদ করে ক্ষীণ কৌণিকে আসা ম্লান আলোয় দেখা যাচ্ছে কিভাবে আত্মহারানো এক নির্বাক অপেক্ষায় ভাঙা কাঁচের মাঝখানে বিধ্বস্ত হয়ে বসে আছে এলিজাবেথ। শূন্য চোখে সময় গুনে যাচ্ছে নিরলস। আজ তিন দিন রিচার্ড নিখোঁজ। এখনো পর্যন্ত কোনো সন্ধান মেলেনি তার। এলিজাবেথ’কে সেদিন তাকবীর ম্যানশনে নিয়ে আসে। তারপর থেকে সে-ও পলাতক। তাকবীরের নামে ওয়ারেন্ট বের হয়েছে। পুলিশ তাকে যেখানে দেখতে পাবে, সেখানেই ক্রোস ফায়ার করবে৷

‘প্রথমদিন এলিজাবেথ কেঁদেছিল, খুব করে কেঁদেছিল পাগলের মতো। সব জিনিসপত্র ভেঙে চুরমার করে ফেলেছিল, নিজেকে নিজে আঘাত করেছে সেদিন রিচার্ড’কে বাঁচাতে পারেনি বলে। তারপর হুট করে স্তব্ধ হয়ে গেলো এলিজাবেথ। আর কাঁদল না, চিৎকার করর না, ছুটে রিচার্ডের কাছে যেতে চাইল না। অকস্মাৎ তার এই পরিবর্তন দেখে ইবরাত অভিভূত। ইবরাত নিজেও ন্যাসো’কে নিয়ে শংকিত। এই তিনদিনের ভিতর ন্যাসো কিংবা লুকাস কেউই ফেরেনি ম্যানশনে। শুধু ন্যাসো ইবরাতের কাছে মধ্যেরাতে ছোট করে বার্তা পাঠিয়ে জানিয়ে রেখেছে, ‘সে বেঁচে আছে’।এতে করে বুকের উপর থেকে পাথর নেমে গেলে ও বোনের গুমরে ওঠা যন্ত্রণা তাকেও পোড়াচ্ছে।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

‘হ্যাঁ, এলিজাবেথ বদলে গেছে। আগের সেই ভঙ্গুর এলিজাবেথ হলে এতদিনে ভেঙে চুরমার হয়ে যেত। অতীতের ধারালো কাঁটা আর বানভাসি অশ্রুর তোড়ে নিজেকে হারিয়ে ফেলতো। একঘোষিত মতাদর্শে নিজেই নিজেকে শেষ করে দিতো। কিন্তু এখন? এখন সে বদলে গেছে। দৃঢ় হয়েছে। প্রতিকূল সময়কে সে কেবল সহ্য করে না, শক্ত হাতে মোকাবেলাও করতে জানে। আর এই শিখনটা এই দাঁড়িয়ে থাকা শেখাটা সে পেয়েছে তারই হাত ধরে। সেই লোকটাই তাকে দেখিয়েছে কষ্ট এলে কীভাবে বুক শক্ত রাখতে হয়, আবেগ নয়, বিবেক দিয়ে বিচার করতে হয়।
লোকটা বলেছিল সংসার কীভাবে গড়ে তুলতে হয়নসেটা সে শিখিয়ে দেবে এলিজাবেথকে। বলেছিল তারা একসাথে এমন একটা ঘর গড়বে, যেখানে দুঃখ আশ্রয় পাবে না, কষ্টের থাকবে না কোনো ঠাঁই। লোকটা কথা দিয়েছিল। আর সে তো এমন কেউ নয়, যে কথা দিয়ে তা ভেঙে দেয়। সে তো হিংসুটে ছিল। এলিজাবেথের নিঃশ্বাস ছুঁয়ে যাওয়া বাতাসকেও সহ্য করতে পারতো না। এমন ইনসিকিউরিটিতে ভুগতো যেনো এলিজাবেথ তার একমাত্র পৃথিবী। তবুও কীভাবে পারবে সেই মানুষটা এলিজাবেথ’কে একা ফেলে চলে যেতে? না, এটা অসম্ভব। মানুষটা ফিরবে। শুধু প্রতিশ্রুতির খাতিরে নয়, এলিজাবেথের জন্য ফিরবে।

এই এক বুক অটুট আশা নিয়ে, ভাঙা ভেতরের ভিতরেও তবুও এখনও দাঁড়িয়ে আছে এলিজাবেথ। শক্ত, অবিচল।
‘তার পরনে আগুনরাঙা টুকটুকে লাল শাড়ি। এমন লাল, যা চোখে পড়ে মনে ধরে আর মনে পুড়ে। হুট করে যখন রিচার্ড ফিরে আসবে তাকে সারপ্রাইজ দিতে তখন উল্টো যেনো নিজেই চমকে ওঠে, সেই আশায় এলিজাবেথ গাঢ় রঙ বেছে নিয়েছে দুদিন ধরে। যেনো সে লোকটাকে বোঝাতে পারে”আমি ভেঙে পড়িনি, আমি প্রস্তুত।” লোকটা কী ভেবেছে? সে খেলবে তার সঙ্গে আর এলিজাবেথ সবটাকে সত্যি ভেবে কাঁদতে কাঁদতে মরবে? না। এলিজাবেথ কাঁদবে না। এবার সে ঠিক করে রেখেছে মুখোমুখি হলেই সমস্ত অভিমানের কথা বলে দেবে খোলাখুলি, দ্বিধাহীন। তবে ফিরুক আগে! কিন্তু ফিরছে কোথায়? তিনদিন হয়ে গেল। এতোদিন তারা কখনো আলাদা থাকেনি৷ এক মুহূর্তও না। তাহলে কি এবার সে আর ফিরবে না? সত্যিই কি এলিজাবেথকে ভুলে গেছে?

“না, না, না, নাহ!” নিজের প্রশ্নে নিজেই হোঁচট খেয়ে প্রত্যুত্তর করে এলিজাবেথ। বাইরে শক্ত রয়ে গেলেও ভেতরের অস্থিরতা থামাতে পারে না আর। হাঁটুতে মুখ গুঁজে নিঃশব্দে গুনগুনিয়ে কাঁদতে থাকে এলিজাবেথ। তিনদিন ধরে মুখে কিছু তোলেনি সে। সূর্যের আলোর সংস্পর্শে যায়নি। নিজেকে বন্দী করে রেখেছে। শুধু অপেক্ষা, শুধু সেই এক আশা নিয়ে ম্যানশের প্রধান ফটকের দিকে চেয়ে আছে। সে ফিরবে। রিচার্ড ফিরবে। ফিরতেই হবে। হঠাৎ এলিজাবেথের চোখের সামনে প্রতিফলিত হতে থাকে কিছুদিন আগের ঘটনা।
“ডু ইউ লাভ মি, মি.কায়নাত?”
‘চকিতে এলিজাবেথের দিকে ফিরল রিচার্ড। অধর কোণে ঝলক দিয়ে উঠে শয়তানি, চোখ ভরা রোমাঞ্চিত আর্তি।ঠৌঁট কামড়ে হাসল গ্যাংস্টার বস, অতঃপর স্বতস্ফুর্ত কদমে তার অর্ধাঙ্গিনীর দিকে এগিয়ে গেল এক দুর্নিবার আকর্ষণে।
“লেটস গো টু দ্য বেডরুম। আই ওয়েল সো ইউ, হাউ মাচ আই লাভ ইউ মিসেস. কায়নাত।”
“আপনি আমাকে কেন ভালোবাসেন?”

‘রিচার্ড দূর থেকে এক মসৃণ ঘূর্ণিতে এলিজাবেথ কে ঘুরিয়ে কাছে নিয়ে এল কোমর পেঁচিয়ে। ওর মখমলেbকোমল কায়া তুলে নিল শূন্যে। শোভাময় সৌন্দর্যে বিমোহিত দৃষ্টিতে চেয়ে গম্ভীর স্বরে শুধালো,
“আমি তোকে ভালোবাসি,শুধু ভালোবাসি। কেন ভালোবাসি? কারণ ভালোবাসি। ভালোবাসি,তাই ভালোবাসি। ভালোবাসি বলে, ভালোবাসি। ভালোবাসা হয় বলে ভালোবাসি! ভালোবাসি, বেশি বাসি। আজ বাসি, কাল বাসবো, জনম জনম ধরে ভালোবাসবো। কারণ ভালোবাসি।”
‘পুরোনো স্মৃতিচারণে আবারো চোখের কোণ নোনাজলে সিক্ত হয়। বুকের মধ্যিখানে রিচার্ডের ব্লেজার চেপে ধরে ফুঁপিয়ে কেঁদে ফেলল এলিজাবেথ। অনুভূত হয় কে যেন ইস্পাত দিয়ে সজোরে করাঘাত করছে তার পাঁজরের হাড়ে৷ হঠাৎ গাড়ির কর্কশ হর্নের শব্দে হুড়মুড়িয়ে ওঠে দাঁড়াল এলিজাবেথ। ছুটে গেল ট্যারেসে। দেখতে পেলো লুকাস আর ন্যাসো এসেছে। এলিজাবেথের মনের কোণে সুপ্ত আশার আলো জ্বলে উঠল। হৃদ চিত্তে সে ছুটে গেল নিচে। লুকাস সবে বসতে যাচ্ছিল ক্লান্তি-অবসাদ ধুয়ে একটু স্বস্তির খোঁজে৷ তবে আর হলো কই। প্রলয়কারী ঢেউয়ের তালে এলিজাবেথ ছুটে এসে লুকাসের কলার খামচে ধরল। বিন্দুসম মুহুর্ত ব্যয় না করে ইস্পাতের মতো ধারালো কণ্ঠে প্রথমেই জানতে চাইল,

“উনি কোথায়?”
‘লুকাস অপ্রস্তুত ছিল। হতভম্ব হয়ে সে তাকাল ন্যাসোর দিকে। ন্যাসোর চোখ ইবরাত’কে খুঁজছে। তখনই উপর থেকে নেমে আসে ইবরাত। অষ্টাদশীর ভেতরটা কেঁপে উঠে ন্যাসোর কাটাছেঁড়া শরীর দেখে। আঁখির মায়াভরা মৃগনয়নী চোখদু’টো ভিজে গেল তৎক্ষনাৎ।
“কি হলো বলুন উনি কোথায়?”
‘লুকাস চোখ বুজে নিলো নিবিড় নৈঃশব্দ্যে। অদৃশ্য ভারী জাতীয় কিছু একটার তীব্র ধাক্কা গিয়ে রাখল এলিজাবেথের বুকে। সহসা আগলা হয়ে গেলো তার হাত। এলিজাবেথ রক্তার্ভ মুখায়বের সচকিত চোখের মনিযুগল ঘুরিয়ে তাকাল ন্যাসোর দিকে। পরপর কয়েকবার শুষ্ক ঢোক গিলে ফের জিজ্ঞেস করল,
“আমার উনি কোথায়?”

‘ন্যাসো নির্বাক। নির্জীব ভাবে মাথা নুইয়ে ফেলল সে। তার নত দৃষ্টি নিবিষ্ট দেখে এলিজাবেথের শরীর টলে উঠল। সে পিছিয়ে গেল এক কদম। শরীরের রক্ত চলাচল তীব্র হয়ে উঠে। অন্তরে আঁধার নামে। ইবরাত ছুটে এসে বোনকে পিছন থেকে আগলে ধরল। থরথর করে কাঁপছে এলিজাবেথের কণ্ঠস্বর,
“ভা-ভাইয়া ব ব-বলুন না উনি কোথায়? আমার উনাকে প্রয়োজন।”
‘তারা দু’জনেই যথেষ্ট পরিমাণ আহত। শরীরে অজস্র ধ্বংসযজ্ঞের চিহ্ন। কিছু কিছু জায়গা থেকে এখনও চুইয়ে চুইয়ে রক্ত ঝড়ছে। পরণে এখনও সেদিনে পোশাক। ছিঁড়া, পোড়া, কাটা, রক্তে ভেজা। তাদের অপরাধীর ন্যায় নত দৃষ্টি নিবিষ্ট দেখে এলিজাবেথের চোখেমুখে বিদুৎচমকানোর মতো হিংস্রতা ফুটে উঠল। সে আবারো তেড়ে গেল লুকাসের কাছে, চেপে ধরল কলার। ওর বুকের গভীর থেকে ক্ষতের আতর্নাদ চিৎকার দিয়ে বেরোয়,
“খোদার কসম আমি সব ধ্বংস করে ফেলব। আপনাদের কাউকে ছাড়ব না আমি। সত্যি করে বলুন উনি কোথায়? আপনারা আমাকে বাধ্য করবেন না একজন গ্যাংস্টারের ওয়াইফের ক্ষমতা দেখাতে৷”
‘লুকাস পড়েছে বিপাকে। এই মুহুর্তে নিজেকে আবিষ্কার করল ভূমিকম্পের কেন্দ্রবিন্দুতে আটকে থাকা বিধ্বস্ত এক শরীর। সে আমতাআমতা করে,

“আসলে ম্যা,,,,,
“বাড়তি কোনো কথা নয়, আমি শুধু জানতে চাই উনি কোথায়। বাঁচতে চাইলে তাকে এখুনি আমার সামনে এনে দেন।”
‘ন্যাসো দৃষ্টি ফিরিয়ে রেখেছে, লুকাসের দিকে তাকাচ্ছেই না। লুকাসের এবার কেঁদে ফেলতে ইচ্ছে হলো।
“ম্যাম সত্যি আমি কিছু জানি না।”
‘এলিজাবেথ লুকাসের কলার ছেড়ে দিয়ে ডাইনিং টেবিল থেকে ফলের ঝুড়ি থেকে এক লহমায় তুলে নিল ধাতব নাইফ। সরাসরি তাক করে ধরল লুকাসের কণ্ঠনালি বরাবর। চমকে উঠে সকলে। ন্যাসো, ইবরাত বিহ্বল হয়ে তাকাল এলিজাবেথের দিকে। লুকাস এবার কেঁদেই দিল। শীর্ণ স্বরে বলল,
“যতো দোষ লোকা ঘোষ। কিছু হলেই সবাই আমাকে ধরে কেনো। আপনার এক্সিডেন্ট বলে বস আমাকে ধরে, বসের গুলি লাগল এখানেও আপনি আমাকে ধরছেন৷ কেন কেন কেন?”
‘তখনই একজন গার্ড প্রবেশ করল ভিতরে। নতজানু হয়ে বলল,
“একটা কফিন এসেছে।”

‘গার্ডটি তৎক্ষণাৎ সরে গেল। চোখের কোণে জমে থাকা সুপ্ত এক আশার আলো মুহূর্তেই নিভে গেল৷ আর তার ছায়া অক্ষিপট ছেড়ে গিয়ে দাঁড়াল শূন্যতার দারপ্রান্তে। অদৃশ্য কোনো শিহরণ না, যেনো এক অভ্যন্তরীণ কম্পনের ঢেউ এলিজাবেথের শরীর বেয়ে বয়ে গিয়ে ঠেলে দিলো তাকে লনে রাখা সেই কফিনের সামনে। একজন গার্ড ঢাকনাটি সরাতেই শিউরে উঠল সবাই। ইবরাত ঠুকরে কেঁদে উঠল।ন্যাসো ওকে বুকের মাঝে চেপে ধরল। তার চোখে গলানো কাচের মতো ঝাপসা বিস্ময়। লুকাস তাকিয়ে আছে রিচার্ডের নীলাভ, প্রাণহীন মুখের দিকে নির্বিকার, নিস্তব্ধ। চারপাশ যেন এক ভয়াল নীরবতাকে জড়িয়ে নিল। হালকা শীতল হাওয়া বইল। সেই কঠিন হৃদয়ের গার্ডদের চোখেও জমে উঠল জল। তবে এলিজাবেথের চোখে এক বিন্দুও পানি নেই। সে কফিনের কাছে এগোল না। দূর থেকে দাঁড়িয়ে কণ্ঠে রূঢ় ঝাঁঝ মিশিয়ে চিৎকার করল সেই অসভ্য লোকটার উদ্দেশে,

“উঠুন, ভিতরে চলুন। অনেক মজা হয়েছে।”
‘অসভ্য লোকটা উঠল না। সাড়া দিল না। চুপচাপ নিবিড় নৈঃশব্দ্যে শুয়ে আছে। এলিজাবেথ ঠৌঁট কামড়ে ধরল। জোরপূর্বক আটকাতে চাচ্ছে ঠৌঁটের কম্পন। সে এবার বিরক্তিমাখা চেহারায় বলল,
“আরে উঠুন না। আর মজা না। অনেক হয়েছে লুকোচুরি। এবার চলুন, আমি খাবো। তিন ধরে আমি খায়নি একসাথে খাবো বলে। চলুন মি.কায়নাত।”
‘এবারও কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে এলিজাবেথ ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল। কফিনের ভিতর থেকে রিচার্ডের হাতটা টেনে ধরতেই ঝাঁকুনি খেলো তার শরীর। খুব ঠান্ডা। না, নিছক ঠান্ডা নয়, মৃত্যুর ঠান্ডা। এলিজাবেথ এবার সম্পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকাল রক্তস্নাত, স্থির, দীর্ঘদেহী দেহটার দিকে।কি নির্মল সেই মুখাবয়ব অথচ কেমন অসহায় ফ্যাকাসে। রক্তহীন শরীরটা যেনো ধারালো এক অস্ত্র হয়ে বিদীর্ণ করে দিলো এলিজাবেথের অভ্যন্তর। বুকের মাঝখানে মুচড়ে উঠল এক বেদনাভার অনুভূতি, নামহীন। সে বারবার, দ্রুত ঢোক গিলল। মনের অন্ধকার অলিন্দে গুমড়ে থাকা সব অশুভ, নির্দয় ভাবনা গিলে ফেলতে চাইল। কিন্তু শরীরের প্রতিটি স্নায়ু ততক্ষণে যে তীব্র প্রতিক্রিয়ায় কাঁপছে। হাত দুটো থরথর করছে। শ্বাসহীন এক শূন্যতায় হেঁটে বেড়ানো এলিজাবেথ কাঁপতে থাকা আঙুল রাখল রিচার্ডের রুক্ষ পুরুষালী নাকের কাছে। নাড়ির একটুকুও স্পন্দন নেই। মুহূর্তেই শরীর ছিটকে গিয়ে পড়ল লনের সবুজ ঘাসে। গলার স্বর ফেটে বিদীর্ণ হয়ে বেরিয়ে এল হৃদয়চেরা চিৎকার,

“নাহহহহহহহহ।”
‘দু’হাতে সদ্য গজিয়ে ওঠা ঘাস খামচে ধরে মাটিতে মুখ গুঁজে গলা হতে নির্গত কর্কশ গোঙানির শব্দে দূর্বল গলায় বারবার উচ্চারণ করতে থাকে,
“এটা স্বপ্ন, এটা স্বপ্ন। এটা বাস্তব না হোক, খোদা।”
‘হঠাৎ মাটি থেকে ঘাস খামচে ছিঁড়ে আকাশের পানে তাকিয়ে চিৎকার করে উঠল এলিজাবেথ। বুকের গভীর থেকে ক্ষতের আতর্নাদ চিৎকার দিয়ে বেরোয়,
“এটা সত্যি হতে পারে না।”
‘কি জানি কি হলো হুট করে এলিজাবেথের। সে হুড়মুড়িয়ে ওঠে গেল কফিনের কাছে। রিচার্ডের কলার শক্ত করে চেপে ধরে চেঁচাতে থাকে,

“উঠুন, আপনাকে এখুনি উঠতে হবে। আপনার সাহস হলো কি করে আমার ছেড়ে দূরে চলে যাওয়ার। আপনার মুক্তি নেই আমার কাছ থেকে৷ এখনও অনেককিছু বাকি রয়ে গিয়েছে। আপনি আমাকে কথা দিয়েছেন, আমাকে সন্তান দিবেন, সুন্দর একটা সংসার দিবেন। আপনাকে আপনার দেওয়া কথা রাখতে হবে মি.কায়নাত। উঠুন বলছি। আমার খুব কষ্ট হচ্ছে। দেখুন না আমার চোখ দিয়ে পানি পড়ছে।”
:জবাব না পেয়ে এলিজাবেথের অস্থিরতা আরও বেড়ে গেল।চোখের কোণ থেকে টুপ করে দু’ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল রিচার্ডের নীলচে বর্ণ ধারণ করা ঠোঁটে। দু’হাত বাড়িয়ে কুয়াশাভেজা স্পর্শে ছুঁয়ে দিল রিচার্ডের রুক্ষ, চওড়া চিবুকখানা। সুতীব্র আবেগের ভারে ভেঙে পড়ছে মেয়েটা। ভেতরে ভেতরে চুরমার হয়ে যাচ্ছে সব প্রতিরোধ। কণ্ঠ বুজে এসেছে কান্নায়। চোখে ভেসে আছে হাজার না বলা কথা। নিভৃত, কোমল, কান্নাঘেরা স্বরে এলিজাবেথ ডাকল,

“জান গো…
‘রিচার্ড উঠে না। কথা বলে না ৷ চিরায়ত গম্ভীরতায় শুয়ে আছে সে। এলিজাবেথ অকস্মাৎ জড়িয়ে ধরল পাথরের মতো শক্ত শরীরটা। হাউমাউ করতে কাঁদতে থাকল মেয়েটা,
“এটা হতে পারে না। কখনোই না। উঠুন না প্লিজ। আমি আপনাকে কোথাও যেতে দিবো না। আপনাকে ছাড়া যে আমি নিঃস্ব। আমার বাপ নেই, মা নেই, পেটের সন্তানটাকেও হারিয়েছি। আপনি ছাড়া কে-ই বা আছে আমার বলুন নাহ? জানগো, উঠেন না। আপানাকে এই অবস্থায় আমি দেখতে পারছি না যে। আমার অন্তর টা ফেঁটে যাচ্ছে। ও জান,উঠুন না। আপনার এলিজান কষ্ট পাচ্ছে, মরে যাচ্ছে সে, একটু তাকিয়ে দেখুন না জান। আমার হৃদয়ে আপনার নাম লিখেছি। এতো আপন আপনি কিভাবে দূরে চলে যেতে পারেন? ছেড়ে যাওয়ার কথা তো ছিল না। আমি তো বাঁচতে চাই। এতোকিছুর পরও আমি বাঁচতে চাই আপনাকে নিয়ে। আমায় বাঁচার স্বপ্ন দেখিয়ে আপনি পালানোর পায়তারা করছেন? আমি আপনাকে কখনো মাফ করব না, কখনো না৷ আপনি আমায় সুখের আলো দেখিয়ে আঁধারে ঠেলে দিয়েছেন। আমি কিভাবে বাঁচব আপনাকে ছাড়া? কিভাবে আমি লড়াই করব সবার সাথে? কিভাবে আমার সন্তানের খুনীদের শাস্তি দিবো? কিভাবে, বলে দিন। বলে দিয়ে গেলেন না কেনো? কোথায় আপনার ভালোবাসা, কোথায় আপনার তেজ? আত্মত্যাগের মাঝে বিহীন করে দিলেন সব? এই ভালোবাসা তো আমি চাইনি। আমি শুধু আপনাকে চেয়েছি। আপনার ভুল, আপনার পাপ, সমস্তটা কবুল করে আপনাকে ভালোবেসেছি। তবুও আমি কেন হারালাম আপনাকে? আমাদের প্রেম হল, সংসার হল না রিচার্ড কায়নাত। কিভাবে আমি সহ্য করব, কোথায় লুকাবো এই ক্ষতের দাগ? আমরা এক হয়েও কেন একত্রিত হতে পারলাম না? উপসংহারে কেন মিলন হল না আমাদের?”

‘হঠাৎই এলিজাবেথের আচরণে ছড়িয়ে পড়ল এক বন্য হিংস্রতা। সে নিজেই জানে না কী করছে, কেন করছে।
উন্মাদনার ঘূর্ণিতে পড়ে গিয়ে শুরু করল জোরে জোরে কিল-ঘুষি মারা রিচার্ডের স্তব্ধ বুকে। পাশ থেকে ইবরাত ছুটে এসে বোনকে থামাতে চাইল বুকে জড়িয়ে ধরে। কিন্তু কিছুই কাজে এল না। এলিজাবেথ যেন কোনো অদৃশ্য, অমোঘ শক্তির কবলে পড়ে গেছে। চোখে জ্বলছে পাগল করা যন্ত্রণা। সে কাঁপতে থাকা কণ্ঠে ফেটে পড়া গলায় চিৎকার করে চেঁচাতে লাগল,

“কুত্তার বাচ্চা জবাব দিয়ে যা, কি করে তুই চলে যেতে পারিস? জানোয়ারের বাচ্ছা তুই কিভাবে পারলি আমাকে একা রেখে চলে যেতে? কিভাবে পারলি? তোর পাষাণ হৃদয়ে একটুও দাগ কাটল না? শুয়োরের বাচ্চা উঠ। তোকে আমার সঙ্গে থাকবে হবে। হয় আমার কাছে ফিরে আয়, নয় আমাকে সঙ্গে করে নিয়ে যা। আমাকে তখন কেন একসাথে বাঁচার স্বপ্ন দেখিয়ছিস, যদি সাথেই না থাকবি। চোখ খুল। জানোয়ারের বাচ্চা তাকা আমাকে। দেখ, আমি কিভাবে ছটফট করছি। আমার ভেতরটা ফেটে যাচ্ছে। শুয়োরের বাচ্চা তুই তো তোর দাফনের আগেই আমাকে জিন্দা দাফন দিয়ে গেলি। খোদা মৃত্যু দাও, মৃত্যু দাও খোদা। আমার মৃত্যু দাও। তোমার সৃষ্টির অন্তর ঝলসে যাচ্ছে। সে আবারও ঠকেছে খোদা। জানোয়ার’টা আমাকে আবারও ঠকিয়েছে চলে গেছে সে স্বার্থপরের মতো। কার জন্য বাঁচব আমি? লোকটা তো আমাকে মেরে দিয়ে গেলো।”

‘কাঁদতে কাঁদতে এক পর্যায়ে ঝড়ে পড়া শুকনো পাতার মতো নিচে বসে পড়ল এলিজাবেথ। আজ সকলে কাঁদছে মেয়েটার কান্নায়। কাঁদছে কায়নাত ম্যানশনের প্রতিটি ইট। শুধু কাঁদছে না তিনজন মানুষ। একজন যে, চিরনিদ্রায় শায়িত আর দু’জন—লুকাস, ন্যাসো। তাদের কোনো অভিব্যক্তি নেই। নির্বিকার সটান দাঁড়িয়ে আছে। ইতোমধ্যে কোত্থেকে তাকবীর ছুটে আসে এই খরব পেয়ে। গার্ডদের ভীর ঠেলে কফিনের সামনে যেতে থামকালো সে। বুকের উপর ভারি কিছু একটা অনুভব করল। হঠাৎ করে বুকের ভেতর টান ধরল, কারণটা ঠিক বোঝা গেল না। সে তো ভীষণ নির্দয়, নিষ্ঠুর। তার কাছে কোনো মূল্য নেই এই সম্পর্কের। বরাবরের মতো এখনও অস্বীকার করে যায় এই সম্পর্ক’কে। তারপরও কিসের টানে সে এখানে ছুটে এলো? এটাই কি তবে রক্তের টান? তাকবীর ফাঁপা দৃষ্টিতে তাকাল নিচে। হালকা চোখ নামিয়ে নিরবে ক্রন্দনরত এলিজাবেথের কাঁদে হাত রাখতে যাচ্ছিল ঠিক তখনই কফিনের ভিতর থেকে বেরিয়ে আসে হুংকার,

“কুত্তার বাচ্চা স্পর্শ করবি না ওকে।”
‘মুহূর্তেই বিস্ফোরণ ঘটল। আকাশচুম্বী বিস্ময়ে চমকে উঠে সকলে। শুধু ঠৌঁট কামড়ে হাসল ন্যাসো, লুকাস। ইবরাতের সারা শরীর কেঁপে উঠে। ভূত বলে ছুটে গিয়ে মুখ লুকালো ন্যাসোর বাহুডোরে। তাকবীর হতবিহ্বল হয়ে পিছন ঘুরতেই দেখতে পেলো রিচার্ড বসে আছে। ধারালো চিবুকে তরতাজা টগবগে ক্রোধ। রক্তিম চোখে গ্রীবা বাঁকিয়ে তাকাল তাকবীরের বিহ্বল কৃষ্ণগহ্বরে। তার কথার তেজ যেন হাওয়ার ধারালো ছুরির কাটার মতো মুহুর্তেই কেটে দিল শোকাচ্ছন্ন পরিবেশের গুমোটতা। খুশিতে ঝলঝল করতে থাকে গার্ডদের অবয়ব। রিচার্ড এক লাফে নেমে গেল কফিন থেকে। তাকবীরের মুখোমুখী দাঁড়িয়ে দাঁতে দাঁত পিষে বলল,
“স্ট্রে এওয়ে ফ্রম হার। শি ইজ মাইন।”

‘শাসানো বাক্য সম্পূর্ণ করে রিচার্ড তাকাল পাশে এলিজাবেথের দিকে। সে দৃষ্টিতে ছিল বজ্রপাতের আগে নেমে আসা নিস্তব্ধতা। এক তীব্র তড়াকে পরিবর্তন ঘটল রিচার্ডের চোখের দৃষ্টি। যেন শত সহস্র শীতল ঢেউ এসে ধাক্কা দিল এলিজাবেথের মুখোমণ্ডলে। হাওয়ায় উড়ে গেল লাল কেশরাশি, আঁচড়ে পড়ল ভেজা গালপটে। সময় থেমে রইল। এলিজাবেথ নির্জীব চোখে তাকিয়ে থাকে, নীরব, নিস্পৃহ। অথচ কী নিদারুণ অভিমান লুকিয়ে সেই চাহনিতে। দুটো চোখ —একটা দংশিত প্রেমে পোড়া, আরেকটা অপরাধবোধে পুড়ে তাকিয়ে থাকে একে-অপরের দিকে। বাকি জগতটা নিঃশেষে গলে গেছে তাদের মাঝখানের তাপমাত্রায়।
‘রিচার্ডের কানে তখনও বাজতে থাকে এলিজাবেথের সেই শেষ বলা শব্দগুলো। ঠোঁটের কোণে ফুটে ওঠে এক তপ্ত প্রাপ্তির হাসি। রিচার্ড হাত বাড়িয়ে আলতো করে সরিয়ে দিতে চায় কেশগুচ্ছ। কিন্তু এলিজাবেথ, সেই অভিমানে জর্জর, ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেয় হাত। ঠান্ডা এক শীতল স্বরে ডাকল গ্যাংস্টার বস,

“আমার এলি জান।”
“লায়ার।”
‘শুধু এই দুই শব্দ ফেলে এলিজাবেথ ছুটে চলে যায়। অন্যদিন হলে রিচার্ডের রক্ত ফুটে উঠত৷ সে ভেঙে দিত দেয়াল, গর্জে উঠত পুরো ম্যানশন। কিন্তু আজ, আজ সে শুধু হাসল। নিস্পাপ, উষ্ণ, শান্ত এক হাসি ফুটল তার অধর কোণে। সে ছুটে যায় পেছনে। যেন এক নষ্টালজিক ছেলেমানুষ, যাকে ছেলেবেলায় প্রথম ভালোবাসার মেয়েটি দূরে ঠেলে দিয়েছে। হাওয়ায় উড়ছে রিচার্ডের কোট, ঠিক যেভাবে উড়ছে রুশকন্যার রেশমি কেশরাশী৷ বাতাসে মিলিয়ে যাচ্ছে রিচার্ডের গায়ের রক্তমাখা ঘ্রাণ। ক্লান্ত শরীর, ক্ষতবিক্ষত বুক তবুও চোখে মুখে জ্বলছে প্রফুল্ল এক দীপ্তি। পিছন থেকে নিদারুণ কোমলতা মাখানো গলায় ডাকল রিচার্ড,

“হেই জান! স্যরি!”
‘এলিজাবেথ থামে না। আজ তার হৃদয় খুঁচে দিয়েছে রিচার্ড। এমন ঠাট্টা? মৃত্যুর মতো বিষাদ নিয়ে? সে ছুটে চলে যেতে থাকে ম্যানশনের দিগন্তরেখা পেরিয়ে। রিচার্ড আজও রাগে ফুঁসে ওঠে না। বরং ছেলেমানুষির মতো দৌড়াতে থাকে অভিমানী কন্যার পিছনে। ঠিক যেভাবে সেন্টমার্টিনের সেই বিকেলে ছুটেছিল।
“জান, আই’ম রেয়ালি স্যরি। এলিজান! দাঁড়াও। বললাম তো স্যরি! খুব করে স্যরি! আচ্ছা এই যে কানে ধরছি!”
‘সেই গ্যাংস্টার বস—যে এক চোখ দেখিয়েই শহর থরথর কাঁপায় আজ সে দাঁড়িয়ে যায় ম্যানশনের গেইটের সামনে। মাথা নিচু করে সত্যিই কানে ধরে। একেবারে শিশুর মতো। তোয়াক্কাও করে পিছনে একরাশ বিস্ময়ে ঘেরা চোখগুলো। রাস্তার মাঝে দাঁড়িয়ে এলিজাবেথ ঘুরে তাকায়। চোখে বিস্ময়, ঠোঁটে অল্প কাঁপুনি। বাতাস থেমে যায়। শব্দ থেমে যায়। কেবল ধীরে ধীরে ঝরে পড়ে তার গাল বেয়ে একফোঁটা জল। তখন সূর্য ঠিক অস্তে যাচ্ছে। রক্তিম আলোয় দুজন দাঁড়িয়ে একটা বিষণ্ণ প্রেম আর তার অপরাধবোধের মাঝে। এ এক অপূর্ণতার মধ্যেও পূর্ণতা। ঠিক তখনই একটা গাড়ি এসে থামল এলিজাবেথের সামনে। ভিতর থেকে কিছু লোক বেরিয়ে ওকে টেনে গাড়িতে তুলে ঝড়ের গতিতে চলে গেল।ঘটনা এতো দ্রুত ঘটল যে রিচার্ড ছুটে গিয়ে ধরতে পারল না। তবুও আর এক মুহূর্তও দেরি করল না রিচার্ড। ছুটে গেল ম্যানশনের ভিতর। গাড়ি নিয়ে সঙ্গে সঙ্গে পিছু করল সেই গাড়িটার৷

‘পুরোনো, অন্ধকার গোডাউনের নিস্তব্ধতা চিরে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে রিচার্ড আর সাদমান। সালমানের পাশে, হাঁটু গেড়ে বসে এলিজাবেথ হাত-পা বাঁধা অবস্থায়। মুখে টেপ লাগানো। রিভলভারের ঠাণ্ডা নলটা ওর তালুতে চেপে ধরা। চারপাশে সশস্ত্র গার্ডদের বৃত্তে বন্দি রিচার্ড একা কিন্তু অটল। সদ্য ভাঙা নীরবতায় ছেঁড়া গলায় চেঁচিয়ে উঠল রিচার্ড,
“ওকে ছেড়ে দে !”
‘সাদমানের ঠোঁটে বিকৃত, পৈশাচিক হাসি। রিভলভার আরও গা চেপে বসে এলিজাবেথের মাথায়। এলিজাবেথের চোখ থেকে চুপচাপ গড়িয়ে পড়ছে ফোঁটা ফোঁটা কান্না। দৃশ্যটা দেখে রিচার্ড যেন বিস্ফোরিত আগ্নেয়গিরি। গর্জে উঠে সে,
“তুই কল্পনাও করতে পারছিস না, কী ভয়াবহ মৃত্যু অপেক্ষা করে তোর জন্য!”
‘সাদমান ঠাণ্ডা গলায় ফিসফিস করল, “আগে তুই নিজে বাঁচিস। তারপর হুমকি দিস।”
“ওর গায়ে যদি একটা আঁচড়ও পড়ে, তুই আজকেই শেষ।”
‘সাদমান এবার কিছুটা এগিয়ে এল। হেসে বলল,

“কিছুই করব না। এমনিতেও নারীদের গায়ে হাত তুলি না আমি। ঘৃণা করি সেই কাপুরুষতাকে। তবে তোকে, তোকে ভাঙতে হবে। তোকে মারার শক্তি আমার নেই, সেটা আমিও মানি। কিন্তু তোকে নত দেখার, চোখ নামিয়ে হাঁপাতে দেখার, সেই দৃশ্যই হবে আমার প্রতিশোধ। আমার বাবার খুনের প্রতিশোধ।”
‘গোডাউনের বাতাস হঠাৎ ভারী হয়ে এল।
রিচার্ড ভ্রু কুঁচকাল। সাদমান ঠোঁট বাঁকিয়ে উচ্চস্বরে হেসে উঠল,
“বুঝিসনি? ইউ হ্যাভ টু বেগ অন মি!”

‘রিচার্ডের রক্তিম চোখে অগ্নিকুণ্ডের মতো জ্বলজ্বল করছে। এলিজাবেথ ভয়ে কেঁপে ওঠে। সারা শরীর থরথর করে কাঁপছে। সে বারবার মাথা নাড়াতে থাকে৷ না, না, না করছে প্রাণপণে। রিচার্ডের নিঃশব্দ দৃঢ়তা দেখে সাদমান আরও এক ধাপ এগোয়৷ রিভলবারটা এবার এলিজাবেথের কপালে ঠেসে ধরে। রিচার্ড নত স্বীকার করে। এই মেয়েটিকে, এই একটা মেয়েকে সে হারাতে পারবে না। নিজের প্রাণের বিনিময়েও না। সে ভুলে যায় তার গ্যাংস্টারের অহংকার, ভুলে যায় নিজের নির্মম খ্যাতি। রক্তাক্ত অস্তিত্ব নিয়ে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল একটা অশ্রুতপূর্ব আত্মসমর্পণে। এ দৃশ্য দেখে স্তব্ধ হয়ে যায় চারপাশ। সশস্ত্র গার্ডদের চোখেমুখে বিস্ময়ের ঝলক। রিচার্ড কায়নাত, কিংবদন্তি, সে আজ মাথা নত করেছে? সাদমান এই বিজয়ের মুহূর্তে হো হো করে হেসে ওঠে। তার প্রতিটি হাসি আগুনে দগ্ধ বিদ্রুপ হয়ে রিচার্ডকে পোড়ায়। রিচার্ডের মাথা নিচু। সে আর তখনই অপ্রস্তুত মুহূর্তে উঠে দাঁড়ায় এলিজাবেথ। তার হাতের বাঁধন খসে পড়েছে। মাটির নিচে পড়ে থাকা ধাতব কাটটা তুলে নেয় এলিজাবেথ। এক লাফে ঘুরে গিয়ে বাড়ি মারে সাদমানের মাথায়। মুহূর্তেই সে লুটিয়ে পড়ে নিথর। এই সুযোগে রিচার্ড উঠে দাঁড়ায়৷ চোখে এবার বজ্রপাতের ঝলকানি।এখন শুরু হলো তার খেলা। এখন আর গ্যাংস্টার নয় বরং এক প্রতিশোধের দেবতা ফিরে এসেছে!

‘রিচার্ড ঝাঁপিয়ে পড়ে সামনে থাকা দুই গার্ডের দিকে তীব্র নেকড়ের মতো হিংস্রতা নিয়ে। এক গার্ডের গলায় পেছন থেকে কনুইয়ের আঘাত করল প্রথমে। একটানে হাড় গুঁড়িয়ে চিৎকারের আগেই রিচার্ড পিলারের সাথে মাথা ঠুকে দেয়; খুলির চামড়া ফেটে র”ক্তে-আঁকা দেয়ালে মগজ ছিটকে যায়। পাশের জনের দিকে শূন্যে উঠে হাঁটু মারল রিচার্ড তার গলায়। হাড় চিড় ধরে ভিতর থেকে বাতাস বেরিয়ে আসে কাতর চিৎকারে, শ্বাসরোধ হয়ে মুখ বিকৃত। এলিজাবেথ সামনে ছিনিয়ে নেয় ছোঁড়া পিস্তল। প্রথম গুলিটাই এক গার্ডের চোখ ভেদ করে ঢুকে গেল খুলি ফুঁড়ে। পেছনের দেয়ালে লাল স্রোত বেয়ে নামল। দৃষ্টি ফাঁকা হয়ে পড়ে গেল শরীরটা। সাদমান দৌড়াতে চায়, পেছনে সরে যায়। রিচার্ড ছায়ার মতো ভয়াবহ নিঃশব্দে এগিয়ে আসে। এক গার্ডকে শরীর ঢাল করে তুলে নেয়। হঠাৎ পেছন থেকে ছুরি নিয়ে এক গার্ড ঝাঁপায়। রিচার্ড তার কব্জি ধরে এমন মোচড় দেয় যে হাড় মাংস ছিঁড়ে বেরিয়ে আসে এক বিকট শব্দে। ছিনিয়ে নেওয়া ছুরি ঠেসে ধরে গলার নিচে। এক টানে গলা চিরে ফেলল। র’ক্তের ফোয়ারা উঠল। চারপাশে গায়ে-মাথায় ছিটকে পড়ল লাল চাদর।

‘সালমান উঠে দাঁড়াতে চাইছিল অপার্থিব ধীরতায়।
রিচার্ড কাছে এসে টেনে ফেলে দিল তাকে। একটা ঘুষি চোয়ালে দিতেই ভাঙা দাঁতের সাথে রক্ত গড়িয়ে পড়ল মুখ বেয়ে। অতঃপর একটা হাঁটুতে, এরপর নাভির নিচে।সালমান বমি করে দেয়, ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে রক্তে ভেজা পিত্ত। রিচার্ড সাদমানের চুল ধরে মুখ তোলে৷ গ্যাংস্টার বসের চোখে ধ্বংসের প্রতিশোধ জ্বলছে।
“তুই আমার জানকে ছুঁয়েছিলি নাহ?”

‘হঠাৎই রিচার্ড ঝাঁপিয়ে পড়ল৷ এক হাতে গলা চেপে ধরে মাটিতে ফেলে দেয় সাদমানকে। অন্য হাতে তীক্ষ্ণ স্ক্রু-ড্রাইভার তুলে নেয়। প্রথম আঘাতটা করল চোখে। ধারালো ধাতব ফলা ঢুকে যায় চোখের ভেতর। সাদমান চিৎকারও করতে পারে না শুধু গলগল করে রক্ত বেরোয়। এরপর একে একে আঙুলগুলো ধরে, ভেঙে দেয়, মুচড়ে দেয় এমনভাবে যেনো সেগুলো খেলনার অংশ। তারপর বুক চিরে ছু’রি ঢোকায়। কিন্তু এইবার টেনে তোলে ওপরের দিকে ঠোঁট পর্যন্ত। হাড় কাঁপানো এক বিকট আ’র্তনা’দ ছড়িয়ে পড়ে ঘরে। পাঁজরের খাঁচা ভেঙে উল্টে যায়। ভিতরের অঙ্গগুলো ছিঁড়ে র’ক্তের বন্যা বইয়ে দেয়।
‘রিচার্ড এবার কোমর থেকে বের করে আরেকটি ছুরি। লম্বা, চিকচিকে, ঠান্ডা ধাতব অস্ত্র। সেটা ঢুকিয়ে দেয় সাদমানের পেটের ঠিক মাঝ বরাবর। তারপর এক কষে চিরে ফেলে নিচ পর্যন্ত। আত্মা গলায় এসে ঠেকে৷ সাদমানের মুখ থেকে কেবল একটা গরগর শব্দ বের হয়। রক্ত থকথকে হয়ে ছিটকে পড়ে দেয়ালে, মেঝেতে আর তার হাতের আঙুলে। রিচার্ড ছুরিটা ঘুরিয়ে তোলে। খোঁজে কোথায় সবচেয়ে বেশি ব্যথা হয়। তারপর একটা দড়ি দিয়ে পেঁচিয়ে ধরে সাদমানের গলা। এমন করে টানে যেনো মেরুদণ্ডটাও বের করে আনবে।

শেষে রিচার্ড সাদমানের জিভ কেটে ছিঁড়ে ফেলে। আর নিঃশ্বাসের পথ বন্ধ করে দেয় নিজের হাঁটু দিয়ে মুখে চেপে ধরে। সাদমান তখনও বেঁচে কিন্তু নিঃশব্দ। একটা ছিন্নবিচ্ছিন্ন, রক্তাক্ত মানবিক ধ্বংসাবশেষ মাত্র সে। এভাবেই একটা সময় ছটফট করতে করতে চিরনিদ্রায় শায়িত হলো সে।
‘এদিকে এলিজাবেথ শেষ গার্ডটির বুকে ঠাস করে গুলি করে। ধোঁয়া, রক্ত, পোড়া বারুদের গন্ধে ঘরটা যেনো নরকের এক কোণ। রিচার্ড এলিজাবেথের দিকে তাকায়। চোখে রক্তের ছিটে লেগে আছে। শরীরে বিভিন্ন জায়গায় নতুন দগদগে ক্ষত। চুইয়ে চুইয়ে রক্ত ঝড়ছে কপাল, ঠৌঁট, গলা,হাত বেয়ে৷ রিচার্ড এলিজাবেথের কোমর আঁকড়ে ধরে হিসহিসিয়ে বলল,
“তুই আছিস, সেটাই বাঁচা। বাকিটা শুধু দাহ।”

‘রিচার্ড এলিজাবেথকে নিয়ে গোডাউনের বাইরে বের হতেই দেখতে পেল তাকবীর দলবল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ঠিক সামনেই। এলিজাবেথ শিউরে উঠল। সে তাকাল রিচার্ডের দিকে। রক্তাক্ত, অবশ, আহত রিচার্ড। তবে রিচার্ডের দৃষ্টিতে ভয় ছিল না। ছিল এক নিঃসঙ্গ নীরবতা। এলিজাবেথ নিজেই এগিয়ে গেল তাকবীরের কাছে। মিনতির সুরে বলল,
“দয়া করে চলে যান। আর কোনো অপ্রয়োজনীয় কাণ্ড করবেন না।”
“তাকবীর শব্দের উত্তরে হাত বাড়িয়ে চেপে ধরল এলিজাবেথের কবজি৷ গলাটান দিয়ে টেনে নিতে নিতে বলল,”অনেক হয়েছে এলোকেশী। আমি তোমাকে আর অন্য কারোর চোখে দেখতে পারছি না।”
‘রিচার্ড আজ কোনো প্রতিরোধ করল না। না শক্তির, না ভালোবাসার। শুধু চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। এটাই ছিল তার শেষ পরীক্ষা আর এবার পালা এলিজাবেথের। সে তার ভালোবাসার পরিক্ষা অনেক দিয়েছে। ঠিক তখনই রেয়ান দৌড়ে এল। একটি রট দিয়ে সজোরে আঘাত করল রিচার্ডের হাঁটুতে। রিচার্ড ধপ করে বসে পড়তেই আরেকটি আঘাত পড়ল তার মাথায়। রক্ত গড়িয়ে পড়তে লাগল অবিরাম। তবুও রিচার্ড উঠল না, পাল্টা দিল না। শুধু নিস্পৃহ চোখে তাকিয়ে রইল এলিজাবেথের দিকে।

‘এদিকে এলিজাবেথ হাউমাউ করে কাঁদছে। ছুটে যেতে চাইছে রিচার্ডের দিকে। ছটফট করছে নিজের হাত ছাড়াতে।
কিন্তু তাকবীরের মুঠো যে পাষাণ। নড়েও না। শেষে এলিজাবেথ দমে না গিয়ে চিৎকার করে উঠল,
“আমার প্রেম কাহিনী শেষ করতে চান তো?
তাহলে আমাকে মেরে ফেলুন। তবুও ওই মানুষটাকে ছেড়ে দিন! ওনাকে ছাড়া আমি বাঁচব না। আপনার পায়ে পড়ি ওনাকে ছেড়ে দিন। চাইলে আমাকে মেরে ফেলুন কিন্তু ওনার এক ফোঁটা রক্ত আর না ঝরাতে দিন না।”
‘চমকে তাকবীর পিছন ফিরে তাকাল।এলিজাবেথের কথাগুলো বুকের গভীরে কোথায় যেন আঘাত করল।
যার জন্য এত লড়াই, সে তো আজ নিজের মৃত্যু কামনা করছে অন্য কারো জন্য। আর জোর করে ধরে রাখতে ইচ্ছে করল না তাকবীরের। ধীরে ধীরে সে ছেড়ে দিল এলিজাবেথের হাত। গার্ডদেরও ইশারায় থামিয়ে দিল।
এলিজাবেথ তখন আর এক মুহূর্ত দেরি করল না।
ছুটে গেল রক্তাক্ত রিচার্ডের দিকে। অসাড় শরীর নিয়ে উঠে দাঁড়ায় রিচার্ড। ছুটতে গিয়ে শাড়িতে প্যাচ খেয়ে পড়ে গেল এলিজাবেথ ঠিক রিচার্ডের পায়ের সামনে। নতমুখে, কাঁপা হাতে সে রিচার্ডের দিকে হাত বাড়িয়ে বলল
দূর্বল কণ্ঠে

“আপনার জন্যই নষ্ট হই,
আপনাকে ফেলে কিভাবে রই?”
‘রিচার্ডের মনে হলো আজ কিছু না করেও সব জিতে গেছে সে। রক্তমাখা ঠোঁট কামড়ে আবেশে চোখ শক্ত করে বন্ধ করল এক মুহূর্ত। তারপর গভীর, প্রশান্ত এক নিঃশ্বাস ছেড়ে তাকাল এলিজাবেথের দিকে। চোখের কোণে লুকিয়ে থাকা ভালোবাসা এবার গলায় কাঁপন তুলে বলে উঠল,
“যদিও আমার ব্যক্তিত্ব আমাকে আটকে রাখে এই কথা বলায়, তবুও বলছি রেড, তুমি যদি আমাকে ছেড়ে চলে যাও আমি নিঃশেষ হয়ে যাবো।”
‘এলিজাবেথ হেসে উঠল। হাতটা আরেকটু উপরে তুলে মৃদু সুরে বলল,
“একটু হাতটা ধরবেন আমার?”
‘রিচার্ড চোখে চোখ রেখে উত্তর দিল,”একটু না… সারাজীবনের জন্য ধরতে চাই।”
“তাহলে ধরুন।”
‘রিচার্ড এক টানে সোজা করে ফেলল এলিজাবেথকে।

আবেগাপ্লুত হয়ে এলিজাবেথ রিচার্ডকে জাপটে ধরতে চাইলে,রিচার্ড হঠাৎ দু-হাত উপরে তুলে সরে গেল একপাশে একটা খেয়ালি সারেন্ডার ভঙ্গিমায়। চমকে উঠল এলিজাবেথ। তবে রিচার্ডের চোখেমুখে লেগে থাকা হাসিটা ছিল অন্যমাত্রার। একটা শান্ত, পবিত্র উচ্ছ্বাস। ঠোঁটের কোণে খেলা করছিল অলঙ্ঘ্য আনন্দের রেখা। হঠাৎ গলায় একরাশ দৃঢ়তা এনে সুরে ভেসে উঠল রিচার্ডের কণ্ঠ,
“যদি তুমি ভালোবাসো, ভালো করে ভেবে এসো
খেলে ধরা কোনোখানে রবেনা
আমি ছুয়ে দিলে পরে অকালেই যাবে ঝড়ে
গলে যাবে যে বরফ গলেনা…”
“আমি গলা বেঁচে খাবো, গানের আশেপাশে রবো
ঠোঁটে ঠোঁটে রেখে কথা হবেনা
কারো একদিন হবো—কারো এক রা…,,

‘আর কিছু বলার সুযোগ পেল না রিচার্ড। তার আগেই এলিজাবেথ ঝাঁপিয়ে পড়ে জাপটে ধরল রিচার্ডকে।
এক হাতে গলা পেছনে টেনে ধরে, অপর হাতে মুখ চেপে হাসতে হাসতে বলল,
“পরের লাইন না।”
‘রিচার্ড আর কিছু না বলে এলিজাবেথ’কে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। এবার কোনো দূরত্ব নেই, কোনো ছায়া নেই শুধু বুকের ভেতর মিশে থাকা দুইটা হৃদস্পন্দন। এই দৃশ্যটা দূর থেকে ফাঁকা দৃষ্টিতে দেখল তাকবীর। নড়ল না, কাঁপল না। অনুভূত হল শরীরটাই নিথর কোনো যন্ত্র। শুধু একটুকরো বাক্য ঠোঁট ছুঁয়ে বেরিয়ে এল,
“মনে ধরা নারী কখনো কপাল ধরে না।”

‘সেদিন রিচার্ডকে গুলি করেছিল অন্য কেউ নয়, জেমসেরই লোক। অথচ রিচার্ড ছিল প্রশিক্ষিত, দুর্ধর্ষ। এমন এক নদী সাঁতরে পার হওয়া তার কাছে শৈশবের খেলা। ট্রেনিংয়ের দিনগুলোতে ফাদার তাকে মাঝসমুদ্রের উত্তাল ঢেউয়ে ছেড়ে দিতেন আর প্রতিবার মৃত্যুর কিনারে গিয়েও রিচার্ড ফিরে আসত। জেমসকে এখনও ধরা না গেলেও তার ফাদারকে ইতিমধ্যে ধরে ফেলেছে রিচার্ডের বাহিনী। এবার শুধু অপেক্ষা জেমসকে ফাঁদে ফেলার।

‘রিচার্ড এতোদিন নিখোঁজ ছিল না। সে ছিল এক গভীর রুদ্ধশ্বাস মিশনে। সেই রাতের পার্টিতে যে সব দেশের ব্যবসায়ী আর ছদ্মবেশী মাফিয়ারা এলিজাবেথেট দিকে দৃষ্টিপাত করেছিল, তাদের একে একে খুঁজে বের করা, তাদের শেকড় উপড়ে ফেলা ছিল তার ব্রত। রিচার্ড আগে থেকেই বিয়ানকে বলে রেখেছিল সেই ওয়েবসাইটের কথা। যেইমাত্র সেটি সচল হয়, বিয়ান পুরো ডেটা সংগ্রহ করে ফেলে। তারপর একে একে রিচার্ড চিরতরে গুঁড়িয়ে দেয় নারী কেনাবেচার সেই নিষিদ্ধ সাম্রাজ্য। পাঠিয়ে দেয় শাস্তির বুলেট তাদের প্রতি যারা এলিজাবেথকে প্রি-অর্ডারে কিনতে চেয়েছিল। চিরতরে বন্ধ হয়ে যায় নারী কেনাবেচার নিষিদ্ধ সেই ওয়েবসাইট। এই মিশনেই রিচার্ড ছিল এতদিন নিখোঁজ। আর যেদিন মিশন শেষ হয়, ফিরতে চায় ম্যানশনে ঠিক সেদিন মাথায় খেলে যায় একটুখানি দুষ্টুমি। ভালোবাসাহীন এক জীবনের ক্লান্তি তার হৃদয়ে জমেছে ছায়ার মতো। ইদানীং খুব ভালোবাসা পেতে ইচ্ছে করে লোকটার।

‘গাড়ি চলছে একাকী, নির্জন জঙ্গলের সরু পথে। এলিজাবেথ ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে পড়েছে, মাথাটা এক পাশে হেলে আছে। রিচার্ড নিঃশব্দে গাড়ি চালাচ্ছে। এক হাতে স্টিয়ারিং, আরেক হাতে আলতোভাবে ম্যাসাজ করছে তার উরুতে রাখা এলিজাবেথের পায়ে। হঠাৎ, একঝাঁক গাড়ি সামনে এসে দাঁড়ায়, রাস্তা আটকে দেয়। রিচার্ড তড়িঘড়ি করে ব্রেক কষে। প্রচণ্ড ধাক্কায় এলিজাবেথের ঘুম ভেঙে যায়। রিচার্ড গাড়ি থেকে নেমে আসে পরিস্থিতি বুঝতে, এলিজাবেথও তাকে অনুসরণ করে নামল। ঠিক তখনই সামনের গাড়িগুলো থেকে বেরিয়ে আসে একদল সশস্ত্র মানুষ৷ সকলের চোখে হিংস্রতা, হাতে ভারী অস্ত্র। রিচার্ড আহত, বুঝতে পারছিল না পেরে উঠবে কিনা। তবুও এলিজাবেথকে আড়াল করে দাঁড়িয়ে পড়ল সে। তার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় বলছে এদের আগমন কেবল ডাকাতির জন্য নয়, এর পেছনে লুকিয়ে আছে ভয়ংকর কিছু। এক মুহূর্তের দ্বিধাও করে না সে। এলিজাবেথের হাত ধরে দৌড়ায় জঙ্গলের বুক চিরে।

‘ওরা ছুটছে। পাগলের মতো ছুটছে অজানা গন্তব্যের দিকে। পিছনে গর্জে উঠছে ইঞ্জিনের শব্দ। মাটি কাঁপিয়ে ছুটে আসছে সেই দানবেরা। আলো, আওয়াজ, আর গুলির হুংকারে কেঁপে উঠছে জঙ্গলের স্তব্ধতা। রিচার্ডের হাত শক্ত, করে ধরে রেখেছে এলিজাবেথ। হঠাৎ একটা গুলির শব্দ চিরে দেয় নিস্তব্ধতা। পাশের গাছের ছাল উড়ে যায়। পিছন থেকে তারা বেঘোরে ফায়ার করতে থাকে। জঙ্গলের মধ্যে বাতাস ভারী হয়ে ওঠেছে। কোথাও দূরে শেয়ালের ডাক, কোথাও পাতা চাপা পায়ের শব্দ শোনা যায়। একটা পুরনো গাছের ফাঁকে ঢুকে পড়ে তারা। এলিজাবেথ কাঁপছে। রিচার্ড ওর মুখ চেপে ধরেছে। নিজেও দম বন্ধ করে আছে। হাতে অস্ত্র নিয়ে দুজন দানব পেরিয়ে যায় তাদের পাশ দিয়ে। আর একটু হলেই তাদের নিঃশ্বাস ছেঁড়া গর্জনে মিশে যেতো । দুজনে আবার ছুটে চলে জঙ্গলের গায়ে আঁচড় কেটে।

‘অন্ধকার জঙ্গল ভেদ করে ওরা ছুটে এসে পৌঁছায় এক বিস্তীর্ণ মাঠে। রাতের নীরবতা চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছমছমে এক বাতাস বইছে। মাঠের মাঝখানে এসে হঠাৎ থেমে যায় রিচার্ড। এলিজাবেথ টান দিলেও রিচার্ড নড়ে না। চোখে এক অদ্ভুত স্থিরতা, ঠোঁটের কোণে বাঁকা এক রহস্যময় হাসি। এলিজাবেথ কিছু বুঝে ওঠার আগেইper ইঞ্জিনের গর্জনে কেঁপে ওঠে রাত।জঙ্গলের গা-ঘেঁষে একে একে বেরিয়ে আসে অসংখ্য গাড়ি। যেনো অন্ধকার চিরে তীব্র গতিতে উঠে আসে কোনো যুদ্ধদল। মুহূর্তেই তারা চারদিক ঘিরে ফেলল লাভ সেইভের নিখুঁত ছকের মতো করে। এলিজাবেথ ভয়ে সিঁটিয়ে রিচার্ডের বুকের আশ্রয়ে লুকিয়ে পড়ে। গাড়ির দরজাগুলো খুলে যায় একসাথে।
ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসে রিচার্ডের ব্যক্তিগত গার্ডস। প্রতিটি কালো স্যুটে আবৃত, কঠোর চোখে প্রশিক্ষিত অভিব্যক্তি। আচমকা আকাশের দিকে বন্দুক তুলে তারা গর্জে ওঠে। তড়তড় করে ছুটে যায় গুলি, আঁধার আকাশে ছড়িয়ে পড়ে বিস্ফোরিত আলোর রেখা। এলিজাবেথ চোখ বন্ধ করে মুখ গুঁজে রাখে রিচার্ডের বুকে। কিন্তু পরমুহূর্তেই ভিন্ন এক ছন্দে বদলে যায় পরিবেশ।

‘আলো নিভে না, আলো ফোটে। আঁধার আকাশে বিস্ফোরিত হয় রঙবেরঙের পটকা। তারাবাতি ফুটে ওঠে দূরের গাছে, মাঠজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে নরম আলো।
গোলাপি, সোনালি, বেগুনি ফানুস একে একে আকাশে ভেসে ওঠে। সেগুলোর মৃদু আলো পড়ে এলিজাবেথের চেহারায়। এলিজাবেথ ধীরে ধীরে মাথা তোলে। ঠিক তখনই শোনা যায় হেলিকপ্টারের গর্জন। এলিজাবেথ আকাশের দিকে তাকায়। তার চোখের পাতা ছুঁয়ে নামে গোলাপের পাপড়ি। ঝিরিঝিরি বৃষ্টির মতো আকাশ থেকে নামছে পাপড়ি, নরম, স্নিগ্ধ, আর অবিশ্বাস্য রকমের বাস্তব রূপে ধরা দিয়ে। সবুজ ঘাস ঢেকে যাচ্ছে লাল গোলাপের বিছানায়। চারপাশ জ্বলছে গাড়ির হেডলাইটে, গাছের ফাঁক দিয়ে আরও ফানুস উড়ে যাচ্ছে আকাশে অনবরত। রঙিন আলোর ভেলায় ভাসছে মাঠ।
‘এলিজাবেথের চোখে ধরা পড়ে বিস্ময়। অশ্রু নয়, অবিশ্বাস নয়। শুধু নিঃশব্দ বিস্ময়। তার চোখ ছুঁয়ে যায় প্রতিটি গার্ডের হাতে ধরা লাল গোলাপ। তারা দাঁড়িয়ে আছে নিরব। মাথা নোয়ানো সকলের। এই রাতের প্রতিটি স্পন্দনে অংশ নিচ্ছে তারাও। তখনই এলিজাবেথের দৃষ্টি আটকে যায় ন্যাসো। ইবরাত। লুকাস। তারা দাঁড়িয়ে আছে দূরে। তাকিয়ে আছে তার দিকে। তাদের চোখে সেই চেনা প্রশ্রয়, ঠোঁটে শান্ত এক হাসি। রিচার্ডের ঠোঁটের বাঁকা হাসিটা তখনও তার মুখে।
‘চারপাশে আলো, আকাশে ফানুস আর ঘাসে গোলাপের পাপড়ি ছড়িয়ে থাকা সেই স্বপ্নময় মুহূর্তে এলিজাবেথ অবশেষে বুঝেই ফেলল পুরো ঘটনাটাই ছিল রিচার্ডের সাজানো। কিন্তু এতটা? এতখানি? যতোটাই নিঃশ্বাস আটকে আসে বিস্ময়ে? এলিজাবেথ রাগে গর্জে উঠবে বলে পেছন ফিরতেই মুহূর্তেই থমকে যায়। রিচার্ড হাঁটু গেড়ে বসে আছে। তার হাতে ঝলমলে, নরম আলোয় দীপ্ত এক আংটি। এলিজাবেথ চোখ বিস্ফারিত করে তাকিয়ে থাকে৷ কিছু বলার আগেই রিচার্ড বলে উঠল,

“Will you be my most trusted person red?”
‘এলিজাবেথ বাকরুদ্ধ। এই মুহূর্তে? এই পরিস্থিতিতে? এমন কথা? কিন্তু রিচার্ড থামে না। তার কণ্ঠ হয়ে ওঠে কোমল। তলিয়ে যায় গভীরতায়। বলতে থাকে,
“আট বছর বয়সে একটা দুর্ঘটনা আমার জীবন থেকে ‘বিশ্বাস’ শব্দটা কেড়ে নেয়। তখন থেকে কাউকে বিশ্বাস করতে পারিনি। কিন্তু হঠাৎ রিয়েলাইজ করলাম জীবনটা অনেক ছোট। এমন একজন দরকার, যার পাশে দাঁড়ালে বুকটা নিঃশঙ্ক হয়। যার কোলে মাথা রাখলে ঘুম পায়, ভয় নয়। যার হাত ধরে আমি চোখ বুজে হেঁটে যেতে পারি অন্ধকারের ভেতর দিয়ে। তো প্রিন্সেস এলিজাবেথ,হবে কি তুমি সেই মানুষটা? আমি কি তোমাকে অন্ধভাবে বিশ্বাস করতে পারি?”
‘এলিজাবেথের চোখে জল জমে ওঠে। গলা আটকে আসে আবেগে। সে মাথা নাড়ে নিঃশব্দে। রিচার্ড হালকা হাসে। চোখের কোনায় প্রশান্তি। হঠাৎ রিচার্ড আকাশের দিকে ইশারা করে। এলিজাবেথ তাকিয়ে দেখে ড্রোন দিয়ে আকাশে লেখা, “Will you marry me?” আলো দিয়ে আঁকা সেই প্রশ্ন এলিজাবেথের চোখে ধাঁধিয়ে ওঠে। ঠিক তখনই রিচার্ড বলে,

“Will you marry me, Red?”
‘এলিজাবেথের চোখ থেকে টুপ করে ঝরে পড়ে দু’ফোঁটা অশ্রু। পাশ থেকে ন্যাসো, ইবরাত আর লুকাস চিৎকার করে বলতে থাকে,
“Say yes! Say yes! Say yes!”
‘এলিজাবেথ মুখে দু’হাত চেপে ধরে। নিঃশ্বাস কেঁপে ওঠে বারেবারে। চারপাশে আলো, ভালোবাসা, বিস্ময় সবকিছু মিলে যেন এক অপার্থিব স্বপ্ন। এলিজাবেথ অবশেষে স্পষ্ট গলায় বলে ওঠে,
“Yessss!”
‘আর পুরো মাঠজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে এক মহা-উল্লাস।

জঙ্গলের গায়ে ফিরে আসে অনুরণন। রিচার্ড ধীরে ধীরে আংটিটা পরিয়ে দিল এলিজাবেথের অনামিকায়। মুহূর্তটা যেন থেমে গেল সময়ের গর্ভে। তারপর এলিজাবেথও কাঁপা হাতে রিচার্ডের আঙুলে পরিয়ে দিল আরেকটা আংটি।তারা পূনরায় আবদ্ধ হল প্রতিশ্রুতি, বিশ্বাস আর ভালবাসার নিঃশব্দ এক চুক্তিতে। রিচার্ড উঠে দাঁড়িয়ে এলিজাবেথের রিং পরিহিত হাতটা ধরে উপরে তোলে চারদিকে সকলের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে বলে,
“She said yessssss!”
‘আকাশ আরও রঙিন হয়ে ওঠে। তারপর হঠাৎ রিচার্ড চোখ টিপে তাকায় এলিজাবেথের দিকে।
“Why not make a memory?”
‘সে ফোন বের করে ক্যামেরা অন করে৷ গান বেজে উঠতেই রিচার্ড নাটকীয় ভঙ্গিমায় নিজের রিং পরা আঙুল ক্যামেরার সামনে নাড়ায়,

“Sniper, sniper, sniper, sniper, sniper!”
‘এরপর ক্যামেরা ঘোরায় এলিজাবেথের দিকে।
এলিজাবেথ হেসে হেসে চোখে জল আর ঠোঁটে আলো নিয়ে রিং দেখিয়ে বলে,
“Wifey, wifey, wifey, wifey, wifey!”
‘মুহূর্তেই রিচার্ড ফোন পকেটে রেখে এক লাফে এলিজাবেথকে তুলে নেয় শূন্যে দু’হাতে পা জড়িয়ে ধরে শক্ত করে। আলো আর গন্ধে ভেসে থাকা এই মাঠজুড়ে তখন শুধু তাদের দু’জনের প্রেমই অস্তিত্ববান। এলিজাবেথ ঝুঁকে রিচার্ডের ঠোঁটে ঠোঁট ছুঁইয়ে দেয়। এক নিঃশ্বাসে, এক চুম্বনে, এক শপথে তারা মিশে যায় তাদের পূর্ণতায়। আকাশে আবার গর্জে ওঠে গার্ডদের বন্দুকের গুলি। তবে এবার তা যুদ্ধের নয়, উৎসবের। আকাশে জ্বলে ওঠে তারাবাতি, ফানুস, আলো আর হৃদয়ে গাঁথা হয় এই রাতের চিরন্তন স্মৃতি।

ভিলেন ক্যান বি লাভার পর্ব ৬২

‘দূর থেকে একদৃষ্টি চেয়ে রইল তারা তিনজন। হঠাৎ নাক টানার শব্দে ন্যাসো পাশ ফিরে দেখে লুকাসের চোখ ছলছল করছে। বিস্ময়ে থমকে যায় ন্যাসো। লুকাসের বাহুতে হালকা ধাক্কা দিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“কি হলো? কাঁদছ কেনো?”
‘আসলে আবেগে ভেসে গেছে লুকাস। কিন্তু সেটা প্রকাশ করতে চায় না সে। সবসময় সবাই ওকে নিয়ে ঠাট্টা করেছে। আজ নিজেই নিজের সাথে একটু মজা করল লুকাস। মুখে ভাঙা ভঙ্গিতে নাটকীয় সুরে বলল,
“বাবা আমার কি বিয়ে হবে না?”
‘গাড়ির ইঞ্জিনের গন্ধে ইবরাতের গা গুলিয়ে ওঠে। সে ওয়াক ওয়াক করে সাইডে সরে যায়। লুকাসের দিকে একবার তাকিয়ে ন্যাসোও দীর্ঘশ্বাস ফেলে ইবরাতের পিছু ছুটে।

ভিলেন ক্যান বি লাভার পর্ব ৬৩