আপনাতেই আমি পর্ব ৬১
ইশিকা ইসলাম ইশা
আজ মেঘ আয়ানের বিয়ে।না চাইতেও রিদিকে যেতে হচ্ছে। ডঃ আশিক মাহমুদ নিজে কল করে বলেছে তার আসা চাই। রায়ানও অনেকবার বুঝিয়েছে জীবনে এগিয়ে যেতে হলে সবার মুখোমুখি হতে হবে। তাই সবার জোড়াজড়িতে এক প্রকার রেডি হয়ে রোজ কে রেডি করাচ্ছে রিদি।পড়নে লাল-খয়েরির মাঝে গোল লং জামা।অনেক দিন এমন গর্জিয়াস জামা কাপড় পড়া হয়নি রিদির।নীরের জোড়াজুড়িতে পড়তে হয়েছে।মেয়েটা একদম নাছোর বান্দা।রোজ কেও লাল টুকটুকে একটা ফ্রগ পড়িয়ে দিয়েছে।রিদি রোজের দিকে তাকিয়ে দেখল লাল জামায় অসম্ভব সুন্দর লাগছে পিচ্চি বাবুটাকে। দু হাতের মুঠোয় নিজের জামা ধরে হাসছে আর পা হাত নাড়াচ্ছে।যেন সে ভীষণ খুশি!!রোজ কে খুশি দেখে রিদির মুখেও হাসি ফুটে উঠল।
“আমার জান বাচ্চা!! আমার কলিজা!শোন ওখানে গিয়ে কিন্তু কান্না করবে না! কেমন!!”
রোজ আরো জোরে হাত পা নাড়াতে লাগলো দেখে রিদি ধমকের সুরে বলল,
“কান্না করলে ওইখানেই রেখে আসব দেখিও!!
ও কি বুঝছে কি জানি শুধু হাত পা নাড়িয়ে খেলছে।রিদি ছোট্ট একটা নিঃশ্বাস ফেলে আয়নায় নিজেকে দেখে নিল।সাজ বলতে নীর ই সাজিয়ে দিয়েছে।চুল গুলোও নীর বেনি করে দিয়েছে।রিদি কি মনে করে কাজল নিয়ে হালকা করে দিয়ে দিল।এরপর রোজ কে কোলে নিয়ে বেরিয়ে আসল রুম থেকে। রায়ান রেডি হয়ে বিরক্ত মুখে বসে আছে।রিদিকে দেখে কিছুক্ষণ অবাক হয়ে তাকিয়ে থেকে মুচকি হাসলো।
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
মাশাআল্লাহ!!মা মেয়ে তো আজ কিলার! বাহহহ!কি মামনি!! আমার মামনি কে তো আজ সত্যি সত্যি রেড রোজ লাগছে। রোজ মামুর দিকে তাকিয়ে নিজের হাতের দেখতে লাগল চুরি ঝুনঝুন আওয়াজ তুলছে সেটাই বার বার নাড়িয়ে খেলছে আর হাসছে রোজ।
রোজ রায়ানের দুষ্টুমির মাঝেই বের হয়ে আসে নীল।নীল রঙের গর্জিয়াস থ্রি পিছ এ নীল পড়ি লাগছে। রায়ান আড়চোখে একবার নীর কে দেখে বিরবির করে বলল,
এতো সাজার কি আছে?আজ শুধু কিছু হোক!একে আমি আস্ত খেয়ে ফেলব!!
এই রিদু আয় আমি বের হচ্ছি!!বলেই রোজ কে কোলে তুলে বেরিয়ে গেল।রিদু নীল ও পিছু পিছু বের হয়ে গেল।
বিশাল বড় এরিয়ার ঝকঝকে আলোয় আলোকিত চারদিক।দূর থেকে রিদি দেখল বিশাল স্টেজ এ বসে আছে মেঘ।ভারি সাজে লাল টুকটুকে ল্যাহেঙ্ঙায় খুব সুন্দর লাগছে।
“বিয়ে তো দিনে হয়!!রাতে কেন??
নীরের কথায় ওর দিকে তাকাল রিদি,
“সেটা তো জানি না!!
রিদি আশেপাশে তাকিয়ে রায়ান কে দেখল মানুষের সাথে কথা বলতে!!নীর কে তার সাথে আসতে বলে স্টেজ এর দিকে যায় রিদি।রিদিকে দেখে মেঘ খুশিতে গদগদ হয়ে এগিয়ে আসে!!
“ভ্যাগিস তুই এসেছিস বোন!নয়তো বিয়ে আজ হতো না!!
রিদি বিরক্ত হয়ে বলে,
“নাটকবাজ সব!!এসব ছাড় বল আয়ান কোথায়?
তুই না আসলে সে নাকি স্টেজ এ আসব না!!তুই এসেছিস!! আয়ান ও চলে আসবে।এই রিদু বাবুকে একটু দে না!! আল্লাহ! আল্লাহ!মাশাআল্লাহ! তোদের কে তো লাল পড়ি লাগছে!!বাবু এতো কিউট কেন রে??
রিদি মৃদু হেসে বলে,
হয়তো বাবা মা কিউট তাই!!
মেঘ মুচকি হেসে বলল,
সে যাই বল!হাসিটা কিন্তু তোর মতোই!!একদম ঝাক্কাস!!এক দেখায় ফিদাহহ!!!কথাটা বলেই নীরের দিকে তাকিয়ে বলে,
এমা মিষ্টি মেয়ে ও এসেছে দেখছি।তোমাকে তো আজ মিষ্টি রসগোল্লা লাগছে!!
নীর বিস্তর হাসল,
তোমাকে পুরো লাল স্ট্রবেরি লাগছে আপু!!!
তাঁদের টুকটাক কথা বলার মাঝেই আয়ান স্টেজ আসে।এসেই রোজ কে আগে কোলে তুলে নেয়।
রোজ গোল গোল চোখে অবাক হয়েই দেখছে।
এই যে লিটিল প্রিন্সেস!!আমি কে বলো তো!!
মেঘ পাশ থেকে বলে,
কে বলতো!!প্লে বয় মামু!!
নীল ফিক করে হেসে উঠলো মেঘের কথায়!!দূর থেকে ঐ হাসি তাকিয়ে দেখল রায়ান।রিদি ঠোঁট চেপে হাসি আটকে বলল,
“এই যে ড্রামাবাজ!!বিয়ে করছিস! কয়েকদিন পর বাবুর বাবা হবি।এখনো সেই বাচ্চামি চলে??
মেঘ আফসোসের সুরে বলে,
বুঝলি রিদু!! ভবিষ্যৎ নিয়ে আমি ভীষণ টেনশনে আছি!!!আহারে প্লে বয় এর ভবিষ্যৎ বাচ্চা!
মেঘের কথায় এবার হেসে উঠল রিদি।সেই হাসি দূর থেকে মন ভরে দেখল কেউ।তার মুখেও ফুটে উঠল বিস্তর বাঁকা হাসি।
আরো একজন আড়চোখে এই হাসি দেখে মুচকি হাসল।বুকে কোথাও তো চিনচিনে ব্যথা টের পেল। তবুও যেন সে ভালো আছে।আর থাকবেও ইনশাআল্লাহ! ভেবেই তাকালো রোজের দিকে। অদ্ভুত ভাবেই তার মনে হয় বাবুটার সাথে রিদির অনেক মিল।ইভেন তীব্র চৌধুরীরও অবয়ব দেখতে পাচ্ছে।রোজের সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় তার টোল পড়া হাসি।আর গায়ের হলদে রঙ।খুব কম মানুষের ই এমন রং হয়। আয়ান বেশ কিছুক্ষণ রোজ কে কোলে নিয়ে কাটালো।
মেঘ আর আয়ানের বিয়ে হলেও সবাই রোজ কে কোলে নিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে।রিদি ভয়ার্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে মেয়ের দিকে।এতো মানুষ দেখে অভ্যস্ত না রোজ।সবার এমন টানাটানিতে মেয়েটার লেগে না যায়। তাছাড়া মুখ দেখে বোঝা যাচ্ছে যে কোন সময় ই কেদে দিবে।মেয়ে তার চরম বিরক্ত।তার থেকেও দূরে থেকে দেখা একজন ও মহা বিরক্ত।একবার এর কোল, একবার ওর কোল।একবার এই গাল টানছে একবার ঐ।
নীর রিদিকে বলে,
রোজ কি পুতুল নাকি!!এভাবে টানাটানি করছে কেন??
নীরের কথা শেষ হতেই ফুঁপিয়ে উঠলো রোজ!রিদি আর এক সেকেন্ড অপেক্ষা না করে কোলে তুলে নিল। ততক্ষণে রোজের কান্না দেখে কে? রিদি কোলে নিয়ে স্টেজ থেকে নেমে কিছুটা ফাঁকা জায়গায় দাঁড়ায়।ঠিক তার কয়েক হাত দূরেই আশেপাশে গাড ঘিরে রাখে তাদের।রিদির সেদিকে ধ্যান নেই!সে তো মেয়েকে থামাতে ব্যস্ত। কিছুক্ষণ পর রোজ শান্ত হতেই নীর এসে বলে।
এই নাও আপু!রোজের ব্যাগ!!
ভালো করেছিস নিয়ে এসেছিস।খুব দরকার ছিল রে।
আমি তোমাকে খুঁজছিলাম!!পরে একটা লোক বলল বাবুর খাবার নিয়ে বাইরে লনের দিকে যেতে!!তুমি নাকি ডেকেছো!!
রিদি শুনলেও আপাতত তার মস্তিষ্ক ব্যস্ত রোজের দিকে।দুধ হাতের উল্টো পিঠে চেক করে করে রোজের মুখে ধরলেও রোজ খেতে নারাজ।রিদি আদুরে গলায় বলল,
মা তুমি আমার!সোনা তুমি!জানের পাখি তুমি!!কলিজা তুমি আমার!!রাগ করে না তো মামনি!!আর কাউকে দিব না তোমাকে!ধরতেও দিব না!!কারো কোলে দিব না!!
রোজ ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কিছুক্ষণ পর ফিডার মুখে নেয়। রিদি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে রোজকে খাওয়াতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।মাঝে মাঝে মনে হয় সে যেন তীব্র কে সামলাচ্ছে। পরক্ষনেই তাচ্ছিল্য হাসে।সবটায় ধোয়াশা!!
রোজের খাওয়ার মাঝেই আয়ান এসে বলে,
থেমেছে!!!
হুম।
তুই রোজ কে নিয়ে উপরে গিয়ে খাইয়ে দে।আমি আম্মু কে বলছি তোকে নিয়ে যাবে!
না না! আন্টি কে ডাকার দরকার নেই।আমি উপরে যাচ্ছি তুমি বল কোন রুম!
উপরে উঠে প্রথমের রুমটা মেঘের।আর নীর তুমি এসো আমার সাথে!বিয়ে বাড়ি ইনজয় করো!
কিন্তু!আপু…..
আমি সামলে নিবো।তুই যা।আমি এখন ওদিক গেলে রোজ কে আর থামানো যাবে না।ও একটু শান্ত হলে আমি আসছি।
রিদি রোজ কে নিয়ে উপরে আয়ানের বলা রুমে ঢুকে। বিছানায় বসে রোজ কে খাইয়ে দিয়ে।মুখ মুছিয়ে দেয়।রোজকে বিছানায় শুইয়ে ওয়াসরুমে হাতটা ধুতেই রোজের কান্নার শব্দে চমকে উঠে রিদি।ঝট করে বের হয়ে দেখে রোজকে কেউ একজন কোলে তুলে নিচ্ছে।রিদি চিৎকার করে বলে,
এই কে??কে??কে আপনি?
রিদিকে দেখে লোকটা ঘাবরে যায়।মুখে মাস্ক পড়ে থাকায় বোঝা যাচ্ছে না।রিদিকে আসতে দেখে রোজ কে নিয়ে বের হতেই রিদি ছুটে এসে রোজ কে নিতে চাইলে। দুইজনের মধ্যে ধস্তাধস্তির কারনে রিদি ছিটকে পড়ে ফুলদানির কাছে।লোকটা বাবু কে নিয়ে বের হতেই রিদি আবারো রোজ কে নিতে গেলে লোকটা গেট খুলে বেরিয়ে যায়।রিদি চেঁচামেচি করলেও আপাতত নিচে বক্স বাজায় কেউ শুনতে পাচ্ছে না।
হুট করেই অপর পাশ থেকে ছুটে আসে লাবিব!!এদিকে রিদি অন্যদিকে লাবিব।লাবিব ভয়াবহ রেগে বলে,
“জান বাঁচাতে চাইলে বাচ্চাকে দিয়ে দে!!”
রিদি হুট করে লাবিব কে দেখে অবাক হলেও আপাতত বেশি ভাবল না!!
“বাচ্চার জান বাঁচাতে চাইলে সরে যা।নইলে আমি নিচে ফেলে দিব!!
খোলা বারান্দা দেখে রিদির আত্বা শুকিয়ে গেল।
হাত জোর করে বলল প্লিজ আমার মেয়েকে কিছু করো না!!কি চাই তোমার?সব নিয়ে নাও!
শুধু আমার বাচ্চার কিছু করো না।
লোকটি শয়তানি হেসে বলে,
বাচ্চাটাই তো সব নষ্টের গোড়া!!
রিদি চমকে উঠে,
ঐ টুকু বাচ্চার প্রতি কিসের প্রতিশোধ নিচ্ছন ।ছেড়ে দেন!!আমি হাত জোর করছি।ও কাদছে!!
কথাটা বলতে বলতেই খোলা বারান্দায় হুট করেই উঠে আসে কেউ!!তার মুখেও মাস্ক!!রোজ কে নিয়ে এক হাতে গলা চেপে ধরে লোকটার।
মরার পাখা গজিয়েছে তাই না!!!!
শক্ত গম্ভীর গলায় কথাটায় চমকে উঠলো রিদি।লাবিব ছুটে এসে লোকটাকে ধরতেই ছেড়ে দেয় পরের লোকটা।এদিকে রোজ ভয় পেয়ে কেঁদেই চলছিল কিন্তু লোকটার কোলে কান্না অফ করে দেয়।রিদি অবাক হয়ে এগিয়ে আসতেই মুখের মাস্ক খুলে তীব্র।হুডির ক্যাপ টা ফেলে চুলগুলো পেছনে ঠেলে তাকাই রোজের দিকে। কেদে কেদে কি অবস্থা!! ইচ্ছে করছে এখুনি সব গুলি ঢুকিয়ে বুক ঝাঁঝরা করে দেয়। কিন্তু রোজের দিকে তাকিয়ে শান্ত হয়ে এলো।আলতো করে চুমু খেল রোজের কপালে। রিদি তীব্র কে দেখে থ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।একটু পর হুস ফিরতেই ছুটে এসে মেয়েকে নিজের কোলে নেয়। তাৎক্ষণিক রোজ কেঁদে উঠে!
এই যে মামনি আমি আছি তো! কাঁদে না!!
তীব্র কিছু না বলে চুপচাপ তাকিয়ে রইল রিদির দিকে।রিদি তীব্রর তাকানো টের পেলেও নিজে তাকালো না।বুকের ভেতর কেমন করছে।যেন কাটা ঘায়ে নুনের ছিটা তীব্র।এদিকে রোজ কেদেই চলছে।
রিদি এটা ওটা বলে কিছুক্ষণে শান্ত হয়ে গেলো।রিদি নিজেকে শক্ত রাখতে কান্না আসলেও কাদল না।তীব্র এখনো একধ্যানে তাকিয়ে দেখছে রিদিকে।
রিদি রোজ কে নিয়ে যেতে লাগলে তীব্রর কথা শুনে থেমে যাই রিদি,
জান!!!
রিদির পদচারন থেমে যায়। বুকের ভেতরে হৃদপিন্ড লাফিয়ে উঠে।এই ডাক!! মজনু তখন ডাকত বেগম জান!সেই ডাকে গুরুতর ভাবে আসক্ত হয়ে তীব্রর জান ডাকটাও একই ভাবে আসক্ত। ছদ্মবেশী ছিল!! কিন্তু মানুষ তো একই।এই ডাকটাই রিদির পুরো সত্বা নড়ে ওঠে।জান ডাকটা তো এখন কমন ডাক সেটা হয়তো সবাই ই ডাকে! কিন্তু তীব্রর কন্ঠে জান ডাকটা রিদির হৃদপিন্ড ভেদ করে ঢুকে।কেমন মোহনীয় লাগে ডাকটা।রিদির চোখে না চাইতেও পানি টলমল করছে।সামনে এগিয়ে যেতে চেয়েও পারছে না।পা যেন কেউ আটকে রেখেছে। ইচ্ছে করছে ছুটে গিয়ে বুকে আছরে পড়তে। কিন্তু বাস্তবতা বলছে সে তোর না রিদিতা।সে এখন অন্যকারো!ভুলেও ওদিকে তাকাবি না।রিদির মনে পড়ে গেল সেদিনের মোনা ,তীব্র,আর মুগ্ধ কে একসাথে দেখা।যত চাই এসব ভুলে যাবে ততই যেন কাটা ঘায়ে নুনের ছিটা দেয় এদের দর্শন।রিদি আর এক দন্ড না দাঁড়িয়ে রুমে ঢুকে ডোর লক করে বসে পড়ে দরজায়।সে পারছে না চিৎকার করে কাঁদতে!সে পারছে না কৈফিয়ত চাইতে! শুধু দমবন্ধ এক অনূভুতি তাকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে।
রিদির যাওয়ার দিকে তাকিয়েই আছে তীব্র।বুকের ভেতর তারও তো অসহ্য ব্যাথা করছে!কয়টা মাস সে কিভাবে বেঁচে আছে সেটা হয়তো সে ছাড়া কেউ বলতে পারবে না।এসব সিচুয়েশন হ্যান্ডেল করা যদিও তার কাছে কখনো কোন ব্যাপার ছিল না।এর চেয়ে বড় বড় ব্যাপারে সে জিতেছে। কিন্তু প্রথম বার তীব্র কারো কথা শুনেছে।না চাইতেও বাধ্য হয়ে শুনেছে।এমন দু চারটা রুপেশ তার কাছে কিছু না। কিন্তু ঐ যে ভয়!!এখনকার তীব্র ভয় পায়।প্রিয় মানুষ হারানোর ভয়!
বুকের ভেতর এসব ব্যাথা কোন কালেই ছিল না তার।সে তো নির্দয়, হৃদয়হীন মানুষ ছিল।এক মায়াবী কন্যা তাকে বদলে দিল।দিল তো এমন ভাবে দিল! সে এখন এই মায়াবতী ছাড়া নিজেকে কল্পনা করতে পারে না।সব ভেবে তীব্র বাঁকা হাসল। তবে এই হাসিতে রয়েছে একরাশ অব্যাক্ত অনূভুতির দানাবলে পিষে ফেলা ব্যাথিত হৃদয়ের অতনাদ। আজ তীব্রর চোখ ও টলমল করে উঠল।ধীর পায়ে এগিয়ে গেল দরজার দিকে। কিছুক্ষণ দরজার দিকে তাকিয়ে পকেট থেকে ফোন বের করে রিদিকে দেখল।রিদি দরজায় হেলান দিয়ে রোজ কে বুকে চেপে চোখ বন্ধ করে আছে।চোখের কোনা বেয়ে পানি পড়লেও সে শান্ত হয়ে বসে আছে।তীব্র একধ্যানে ক্যামেরার রিদি আর রোজ কে দেখতে লাগল।এই দেখা যেন এই জীবনে শেষ হবে না।
রোজের কান্নার শব্দে রোজের দিকে তাকাই রিদি।মেয়েটা কাদলেই তার বুক ধুক করে উঠে। ঝট পট উঠে রোজ কে চেক করে ওর ডায়পার চেঞ্জ করে দিল।সময় তখন ১০টা।মানে ৩০মিনিট পেরিয়েছে। এখন রোজের খিদে পাবে।রিদি টলমলে শরীর নিয়ে রোজের ব্যাগ থেকে খাবার বের করে।সব ব্যবস্থা করেই এসেছিল রিদি। ছোট্ট বাচ্চা নিয়ে কোন ঝামেলা না হয় তাই। খাবার খাইয়ে রোজের জামা চেঞ্জ করতেই খেয়াল করল রোজের পিঠের দিকে লাল দাগ হয়ে আছে।রিদি চমকে উঠল। কোন সময় মেয়ে তার এভাবে কষ্ট পেল!! যখন ওকে কিডন্যাপ করতে এসেছিল!!!
কিডন্যাপ!!কথাটা মাথায় ভীষণ ভাবে আঘাত করল যেন!!রোজ কে কেউ কেন কিডন্যাপ করবে!!আর তখন যে বলল,”বাচ্চাই সব নষ্টের গোড়া”কথাটার মানে কি!!এই টুকু বাচ্চা তাঁদের কি করেছে??রোজের বাবা মা তো এখানে নেই!রোজের বাবা মা কি কোন বিপদে আছে?রোজকে কেন মারতে চায়!!ওর বাবা মার বিপদের সাথে কি রোজের কেয়ার টেয়ার ও কোন বিপদে আছে।তাই কি এতো দিনে খোঁজ করে নি রোজের!!তবে ঠিকানা ওমন বাড়ির কেন??রিদির সব ভেবে মাথা ঘুরে উঠলো।রোজ কে পেয়ে সে আর এতো কিছু ভেবে দেখে নি কখনো!!
আজ যদি ঠিক সময়ে তীব্র না আসত!!কথাটা ভেবেই রিদির নিঃশ্বাস আটকে আসল।নিজের কষ্ট তুচ্ছ করে মেয়েকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।রোজের পিঠের উপর তাজা রক্ত জমাট বাঁধা লাল দাগ দেখে রিদির কান্না পেল। রায়ান কে ফোন করার জন্য ফোন খুজলেও পেল না।নিজে ডক্টর হয়েও ভয় পাচ্ছে।কি করবে বুঝছে না।হুট করেই রুমের দরজা খুলে প্রবেশ করে তীব্র। এতোক্ষণ সে ক্যামেরায় সবটা দেখে রাগে সর্ব শরীর কাঁপছে।লাবিব কে ফোন করে চাবি নিয়ে রুমে ঢুকে।মূলত রুমটা রিদি আর রোজের জন্যই রেডি করেছে। ক্যামেরা পর্যন্ত লাগিয়েছে।রোজ কে রিদির কাছে দেওয়ার পর গাড এর সংখ্যা বৃদ্ধি করে সুরক্ষা নিশ্চিত করেছে। সবসময় রিদির আশেপাশে গাড থাকেই। কিন্তু ছদ্মবেশে থাকে যা রিদির পক্ষে জানা সম্ভব না।কখনো অটো আলা,কখনো রিসকা আলা,কখনো পেসেন্ট,কখনো সাধারণ মানুষ বেশে।আপাতত সে রুপেশ এর উপর ভরসা করতে পারছে না। বিশেষ করে রোজ কে নিয়ে।এতোদিনে নিশ্চিত জেনে গেছে তার মেয়েকে সে বাঁচিয়ে নিয়েছে।
এদিকে হুট করে তীব্র কে দেখে অবাক হয়ে আছে রিদি।তীব্র আপাতত রিদিকে তোয়াক্কা না করে মেয়ের দিকে এগিয়ে গেল।রিদিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকতে দেখে তীব্র বলল,
ওরনা পড়ো!!
রিদির কোন ভাবান্তর না দেখে তীব্র পাশ থেকে ওরনা নিয়ে রিদিকে পড়িয়ে দিতেই হুরমুর করে রুমে ঢুকে লাবিব!!হাতে তার ফাস্ট এইড বক্স। তীব্র রিদির দিকে তাকিয়ে করুন স্বরে বলে,
ওর তো জ্বলবে!! কান্না করবে নিশ্চয়!!
রিদি যেন সব ভুলে গেল। তীব্র কে হুট করে দেখে অবাক হলেও তার মাথায় সব বাদ দিয়ে একটায় চিন্তা রোজ!!।রোজ এর দিকে তাকিয়ে বিচলিত কন্ঠে বলল,
আমি কোলে নিচ্ছি!খুব আস্তে দিবেন।
তীব্র ওয়াস করার জন্য তুলা ধরতেই চিল্লিয়ে উঠল রোজ।তীব্র চোখ বন্ধ করে নিল।এদিকে রিদি তো কেদেই দিবে এমন ভাব!!
তীব্র ফু দিচ্ছে আর সাবধানে করছে।তীব্রর মতো সার্জারি ডক্টর এর ও আজ হাত কাঁপছে।অথচ কাঁটা ছোড়া করা তার নিত্য দিনের কাজ।বাবা মা দুজনেই ডক্টর কিন্তু মেয়ের বেলায় দুইজনেই থতমত খাচ্ছে।
ব্যান্ডেজ শেষ হলেও রোজের কান্না থামছে না।তীব্র রোজ কে বুকে নিয়ে ঘুরছে আর এটা ওটা বলছে।রিদি তীব্রর কোলে থেকেই রোজের পিঠের হাত বুলাতে লাগলো,
আপনাতেই আমি পর্ব ৬০
ঘুম আসে যায়,
চোখের পাতায়
আমার সোনা ঘুমাবো …..
ঘুম আসে যায়,
চোখের পাতায়
আমার সোনা ঘুমাবো …..
স্বপ্নপুরীর চাঁদের বুড়ি….
রুপোর কাঠি ছোয়াবে….
ঘুম আসে যায়,
চোখের পাতায়
আমার সোনা ঘুমাবো …..
