Home ভিলেন ক্যান বি লাভার ভিলেন ক্যান বি লাভার পর্ব ৬৫

ভিলেন ক্যান বি লাভার পর্ব ৬৫

ভিলেন ক্যান বি লাভার পর্ব ৬৫
মিথুবুড়ি

‘বৈশাখের মাঝামাঝি। শুষ্ক খাল-বিলগুলোতে ধীরে ধীরে ফিরে আসছে প্রাণ। দুইদিনের টানা টুইটুম্বুর বৃষ্টির জল আজ রাক্ষসের মতো গিলে নিচ্ছে বৈশাখী রোদের হিংস্র তাপ। হসপিটালের মাথার ওপর জিদ্দি বাচ্চার মতো ঠাঁই দাঁড়িয়ে সূর্যীমামা। রাজধানীর সর্বোচ্চ সম্মানিত হাসপাতাল—ইভার কেয়ার হসপিটাল। ধনীদের চিকিৎসার প্রথম এবং একমাত্র ভরসা। হাসপাতালের ভিআইপি কেবিনে আজ টগবগে উত্তেজনা। চৌদ্দ দিন অচেতন থাকার পর অবশেষে জ্ঞান ফিরেছে রিচার্ডের। সেই ভয়াল এক্সিডেন্টে রিচার্ডের মুখ থুবড়ে পড়েছিল ইটের ওপর। মাথায় ঘটে অভ্যন্তরীণ আঘাত। মুখের এক পাশ থেঁতলে যাওয়া চেহারাটা চিনে নেওয়ার মতোও ছিল না। জ্ঞান ফিরে এলেও কথা বলতে পারেনি, চোখ মেলেনি। তবে দীর্ঘ চিকিৎসার পর রিচার্ডের মুখে সফল সার্জারি সম্পন্ন হয়। সিঙ্গাপুরের একজন খ্যাতিমান স্পেশাল সার্জনের হাতেই হয়েছে মুখমণ্ডলের পুনর্গঠন। আজ সেই মুখ থেকে ব্যান্ডেজ খোলার দিন।

‘কেবিন জুড়ে চাপা শ্বাস, থমথমে হাওয়া। এক হাতে আয়না ধরে আছেন সহকারী চিকিৎসক, পাশে দক্ষ হাতে অপারেশন করা স্থান থেকে ব্যান্ডেজ সরিয়ে নিচ্ছেন সার্জন। ধীরে, অত্যন্ত মৃদু স্পর্শে। তার চিন্তিত মুখাবয়বে চাপা ভয়। রিচার্ডের পাশেই দাঁড়িয়ে আছে লুকাস। চোখে উদ্বেগ স্পষ্ট, ঠৌঁটে অস্পষ্ট প্রার্থনা আর বুকজুড়ে অজানা এক ভয়। সে জানে, রিচার্ডের মুখমন্ডল থেকে ব্যান্ডেজ খোলার পরই রিচার্ডের সর্বপ্রথম প্রশ্ন কি হবে। সেই প্রশ্নের উত্তর তার কাছে নেই। বিশাল আয়োজন করে প্রস্তুতি নিয়েও সে ব্যর্থ, তারা ব্যর্থ। ভেতরে, ভেতরে তটস্থ অগ্রসায়ী তান্ডবীয় ঝড়ের তীব্রতা নিয়ে।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

‘তবে তেমন কিছুই হলো না। ঝড় শুরু হওয়ার পূর্ব মুহুর্তের নিস্তব্ধতা কেবিনজুড়ে। সম্পূর্ণ ব্যান্ডেজ খুলতেই সার্জনের ভেতর থেকে চাপা উদ্বেগ বিলীন হয়ে গেল। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল অ্যাপ্রোণ পরিহিত নিপাট ভদ্রলোক। উদ্বিগ্নতায় ঠাসা লুকাসের মুখ প্রসন্নতায় উদ্ভাসিত হলো। অনুভব করল দীর্ঘক্ষণ ধরে বুকের ওপর দুমড়ে পড়া ভারি পাথরটা আর নেই। হালকা লাগছে বুকের বাঁ পাশ। তবুও সে মনের ভেতরর অস্থিরতা থেকে খুঁটিয়ে-খাঁটিয়ে শ্যেনদৃষ্টিতে পরখ করছে রিচার্ডকে। তার অবচেতন মন দেখল প্রাণভরে বসের নতুন রূপ। রিচার্ডের প্রস্তর কঠিন মুখে দৃষ্টিনন্দন তেমন কোনো পরিবর্তনই আসেনি। শুধু, নতুন ত্বকের আস্তরণে ঢাকা পড়ে গিয়েছে গালের কাটা দাগটা। দারুণ এলাহি আয়োজনের মাধ্যমে মুছে দেওয়া হয়েছে সেই রোমহষর্ক অতীতের নৃ’শংস কারুকার্যের নিদর্শন। সবকিছু ঠিকঠাক আছে, তা গভীর, সুক্ষ্ণভাবে পর্যবেক্ষণ করে বেরিয়ে গেল ডক্টরস। কক্ষজুড়ে পিনপতন নীরবতা। সময় নিয়ে রিচার্ড চোখ খুলল। অন্তগর্ত ভয় নিয়ে সে সর্বপ্রথমে তাকাল হাতের দিকে। ক্যানোলা লাগানো হাতটা খালি দেখে বুক চিঁড়ে বেরিয়ে গেল করুণ দীর্ঘশ্বাস। সঙ্গে, সঙ্গে চোখ বুজে নিলো নিবিড় নৈঃশব্দ্যে। তার একটিমাত্র প্রশ্নের উত্তর সে নিঃশব্দে পেয়ে গেছে। এলিজান নেই! থাকলে ভঙ্গুর প্রকৃতির মেয়েটা নিশ্চয়ই তার হাতটি শক্ত করে ধরে পাশে বসে থাকত। চোখে থাকত এক আকাশ কাতরতা।

“বস?” লুকাস আয়নাটা রিচার্ডের মুখের সামনে ধরে রুদ্ধ কণ্ঠে ডাকল। রিচার্ড এবারও সময় নিল। লোকটার আচরণে মনে হচ্ছে, সে চোখ খুলতে ভয় পাচ্ছে। এ-র পিছনের রহস্য একমাত্র এই মানুষটাই জানে। পেরিয়ে গেল সময়ে বাঁধা কিছু মূল্যবান সময়। অবশেষে চোখ খুলল রিচার্ড। দৃষ্টি রাখল স্বচ্ছ আয়নায়। তেমন কোনো পরিবর্তন ধরা পড়ল না তার ঈগল দৃষ্টিতে। মাথার ব্যান্ডেজ তিনদিন আগে খোলা হয়েছে। চুলগুলো একদম ছাঁটানো। রিচার্ডের মনে পড়ল, ভিয়েতনামের মিশনে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হওয়ার পরও চুলগুলো এভাবে ছাঁটিয়ে ফেলা হয়েছিল। আজ আবারও সেই ঘটনার পূণাবৃত্তি ঘটল। কারণ—লালরঙা কেশরাশির সেই মেয়েটা।

‘নিজের দিকে তাকিয়ে থাকার বিন্দুমাত্র ইচ্ছা হলো না রিচার্ডের। তীব্র বিতৃষ্ণা নিয়ে চোখ ফিরিয়ে ফেলল সে। নিঃশব্দে গিয়ে দাঁড়াল জানালার কাছে। গোধুলির মরা রোদ ঝিমুচ্ছে জানালার কার্নিশে। রিচার্ড ফাঁপা দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে কোমলা রঙের আকাশে। আকাশে সূর্য নেই, ধরিত্রীতে নেই সূর্যের তেজস্ক্রিয় রশ্মিরঙা কুন্তলরাশির সেই নারী। রিচার্ড যেন অকূল পাথারে পড়ল। হঠাৎ করেই বুক হিম হয়ে আসে তার। হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসে। অপ্রতিরোধ্য রিচার্ডের দু’চোখ সজল হয়ে আসে। তার পুরুষোচিত অহং, অপ্রতিরোধ্য রাগ, পৈশাচিক হিংস্রতা, একা বাঁচার দৃঢ় আত্মবিশ্বাস, চোখে দাউদাউ করে জ্বলতে থাকা প্রতিশোধস্পৃহা, নাকউঁচু, দম্ভে ভরা লোকটার সকল তেজ হঠাৎ, একদম হঠাৎই স্নান হয়ে আসে। নিজেকে আবিষ্কার করল ভঙ্গুর, স্বামী হিসেবে ব্যর্থ, প্রেমিক হিসেবে জঘন্য। এতো, এতো বদনামের বাড়ে মুড়ষে পড়ে তার হৃদয়।

‘রিচার্ডের চোখ গেল হাতের পিঠের ওপর। দীর্ঘদিন ধরে সেলাইন চলার কারণে চামড়া যেন মরে গিয়েছে। নেই সেই উজ্জ্বলতা! টগবগে রগ গুলোও অবিশ্রাম ইনজেকশনের সুচারু ঘাতে নুইয়ে পড়েছে। হঠাৎ রিচার্ডের মানসপটে ভেসে উঠল একটি অনিন্দ্য সুন্দর চাঁদনী রাতের অনুপম দৃশ্য। তারা দু’জন খোলা আকাশের নিচে, উন্মুখ ট্যারেসে একে-অপরের সত্তায় নিজেদের উষ্ণতা ছড়ানোয় মগ্ন ছিল। এলিজাবেথ ছিল রিচার্ডের কোলে অর্ধ অনাবৃত অবস্থায়। স্বামীর অপ্রতিরোধ্য হাতের স্পর্শে স্পর্শে কাঁপছিল তার দেহবল্লরী। মোমের মতো উদর, নধর পিঠজুড়ে ছিল লোকটার নিষ্ঠুর ওষ্ঠের রাজত্ব। নিঃশ্বাসে ছিল অস্থির ভাব। গভীর অন্তরঙ্গ মুহুর্তে, আচানক এলিজাবেথের চোখ গিলছিল রিচার্ডের হাতে। পূর্ণিমার দীপ্তিময় আলোয় রিচার্ডের মোমঢালা, লালিত হাত যেন চাঁদের আলোরই প্রতিবিম্ব। কত শুভ্র, কোমল, নিখুঁত। সেই অপার্থিব মুহূর্তে এলিজাবেথ তার ধবধবে হাতটি নিজের হাতের পাশে ধরে মিলিয়ে বলেছিল,

“আপনার গায়ের রঙ দেখে বোঝাই যায় না আপনি বাঙালি। যেন বিদেশি কোনো বিড়াল। ইস্, কী অপরূপ আপনার হাতের রঙ! মাঝেমাঝে আমার খুব হিংসে হয়।!
‘রিচার্ড ভ্রু কুঁচকে তাকাতেই এলিজাবেথ পরপরই তাকাল নিজের গোলাপি হাতের দিকে। মুহূর্তেই মনে হলো যেন দুইটি হাত নয়, দুইটি সৌন্দর্যের প্রতিযোগী। কেউ কারও চেয়ে কম নয়। এক চিলতে সংকোচে এলিজাবেথ পড়ল দ্বিধায়। নিজেই সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না, কে এগিয়ে। হঠাৎই সে রিচার্ডের গলায় বাহু জড়িয়ে ধরে একচিলতে উচ্ছ্বাস নিয়ে বলেছিল,

“আমি তো এখন শুধু ভাবছি, আমাদের বাচ্চাটা কত সুন্দর হবে! আই কান্ট ওয়েট টু সি হিম/ হার!”
‘রিচার্ড নিশ্চল মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে। লুকাস নিজেও বিস্ময়ে হতবুদ্ধি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে রিচার্ডের পিছনে। রিচার্ডের এই স্তব্ধতা ঘূর্ণিঝড়ের আভাস। নিজেদের ব্যর্থতার
অস্বস্তিতে গুম হয়ে যায় মন। লুকাস সাহস সঞ্চয় করে অনুনয়ে বলল,
“বস, আমরা খুব শীঘ্রই ম্যাম’কে খুঁজে বের করব। নাথিং ক্যান স্পট আস।”
“ন্যাসো, কাম ইনসাইড।”
‘লুকাস চমকে উঠল রিচার্ডের রাশভারি আওয়াজে। চমকে উঠল দরজার আড়ালে থাকা মানুষটাও। দীর্ঘ সময় গড়িয়ে যাওয়ার পরও কেউ না আসায়, রিচার্ড ধৈর্যচ্যুত হয়ে কঠিন গলায় ডাকল,
“ন্যাসো।”

‘নিঃশব্দে পা ফেলে ভেতরে প্রবেশ করল বলহীন, নিষ্প্রাণ ন্যাসো। তবে এগোনোর সাহস হয় না। প্রস্তরমূর্তির মতো দুরত্ব রেখে দাঁড়িয়ে রইল। নত দৃষ্টি নিবিষ্ট। লুকাস সচকিত। অনবরত ঢোক গিলছে সে। আড়চোখে রিচার্ডকে দেখছে একবার, তো আবারো ন্যাসোকে। ধূসর রঙের টি-শার্ট পরা ন্যাসোর গমরঙা পেলব চেহারা কালরাত্রির আঁধারে তলিয়ে গিয়েছে। অনাহারে, গ্লানিতে, অন্তর্দহনে চিমসে যাওয়া চোয়াল সাক্ষী নিদ্রাহীন রাতগুলোর। বাদামি চোখজোড়া ফ্লোরে নিবদ্ধ। একটি দীর্ঘদেহি ছাড়া এসে দাঁড়াল তার সামনে। শূন্যে চোখে নিরীক্ষণ করছে তার আপাদমস্তক। ন্যাসোর নিঃশ্বাসে অস্থিরতা বাড়ে। রক্তচলাচল কিছুক্ষণের জন্য থেমে যায়। সে নিঃশ্বাস আঁটকে কম্পিত কণ্ঠে বলল,
“স্যরি বস।”

‘বরফের থেকেও ঠান্ডা রিচার্ডের কণ্ঠস্বর। ঘাড় বাঁকিয়ে বলল,”জাস্ট স্যরি?”
‘ন্যাসোর চোখ বাষ্পাকুল হয়। অবশিষ্ট গ্লানিবোধটুকু ধোঁয়ার মতো চারপাশ থেকে ঘিরে ধরে তাকে। ওই একটা ভুলই তাকে এতোদিন যাবত আত্মগ্লানিতে কুঁড়ে খাচ্ছে। বুকের ভেতর এতো বড় বোঝা নিয়ে আর থাকতে পারছে না সে। এই গ্লানি নিয়ে বাঁচা যায় না। নিজ অবস্থানে থেকে ন্যাসো তার দিকটা ব্যাখা করার চেষ্টা করল জড়িয়ে আসা কণ্ঠে,
“জেমসের লোকেরা, ইবরাতকে কিডন্যাপ করার চেষ্টা করেছিল। জেমস্ আমাকে থ্রেড দেয়, যদি আপনাকে শুট না করি তাহলে ওরা ইবরাত আর আমার বাচ্চাকে মেরে ফেলব। থ্যাংক গট, তখন ল্যাকিলি, লুকাস ঠিক সময় ওখানে পৌঁছাতে পেরেছিল, তাই ওদের কোনো ক্ষতি হয়নি। বিশ্বাস করুন বস, আমি প্রি প্ল্যান সাজিয়ে আপনাকে ওখানে যাবার জন্য কল করেছিলাম, কিন্তু আমার জানতাম না জেমসের কাছে প্ল্যান বি ছিল। হঠাৎ করে ট্রাক,,,,

‘ন্যাসোর কণ্ঠরোধ। চোখের কোল বেয়ে গড়াগড়ি খাচ্ছে জলরাশি। রিচার্ডের মসৃণ কপোলে ভাঁজ পড়ল চিন্তার বলিরেখার। অভিব্যক্তি অত্যন্ত স্বাভাবিক। সে এবার তার প্রেক্ষাপট থেকে ন্যাসোর অবসান উক্তি বলতে লাগল,
“তোমার প্ল্যান ছিল নিখুঁত শীতল, হিসেবি, আর ধূর্ততায় মোড়ানো। লুকাসকে ইবরাতের কাছে পাঠানোটা ছিল একেবারেই কৌশলী চাল। জেমস কিছুই জানত না। আর সে জানত না, তুমি রিচার্ড কায়নাতের পোষা। যে মরবে, তবু বিশ্বাসঘাতকতা করবে না। তাই তুমি বেছে নিয়েছিলে বুদ্ধির আশ্রয়। তুমি ঠিকঠাক নিশানা করেছিলে। নাইনএম থেকে আমার কাঁধের কোমল মাংসে গুলি করেছিলে। যাতে করে প্রাণ না যায়, অতিরিক্ত র-ক্তক্ষরণে শুধু সেন্স হারাই। যাতে সময়মতো লুকাস ইবরাতকে উদ্ধার করতে পারে। এরপর জেমসের আদরের সৈন্যদের মৃতদেহ, আমার পোষা শকুনের ভোজন। ছিঁড়ে, টেনে, গিলে ফেলা সবটাই ছিল তোমার নকশার অংশ। রাইট? কিন্তু… তোমার গাণিতিক ছকে মিস হয়েছিল একটা অজানা চলক।তোমাদের ম্যামের আগমন। আমার ট্রাকের সাথে তাঁর সেই আকস্মিক সংঘর্ষটা, ছিল তোমার প্ল্যানের বাইরে।অথচ ওই ‘বাইরে’-টাই আজ সবকিছু ওলটপালট করে দিল। আম আই রং?”

‘ন্যাসো হতবিহ্বল হয়ে রিচার্ডের দিকে তাকাল। তার চোখের কাতর দৃষ্টি বলছে, হ্যাঁ! সবটা সত্য। সে নেমকহারাম না। নুন খেয়ে গুণ গাওয়ার স্বভাব তার না থাকলেও পিঠ পিছে ছুরি মারার মতো অকৃতজ্ঞ সে নয়। সে অনিমেষ চোখে রিচার্ডের দিকে তাকিয়ে থাকে। পরক্ষণেই নিজ কর্মকান্ডের অনুতাপে মাথা নত হয়। নতশ্রী মুখে দাঁড়িয়ে থাকে নৈঃশব্দ্য, শীতল আত্মব্যাথা নিয়ে। যে মানুষটা তাকে এতোটা বিশ্বাস করে, সে সে-ই মানুষটারই বুকের গুলি চালিয়েছে। কথাগুলো ছুরি হয়ে ন্যাসোর হৃদয়ে দাগ কাটতে থাকে। গ্লানিতে র-ক্তা-ক্ত হয় অভ্যন্তর৷ তাদের মাঝে লুকাস কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে। রিচার্ড ধূর্ত সে জানত, মনেপ্রাণে বিশ্বাসও করে। তবে সময় যতই গড়াচ্ছে, ততই সে রিচার্ডের প্রতি মুগ্ধ হচ্ছে।

‘রিচার্ডের ঠৌঁটে তখনও চাপা হাসির সয়লাব। সে সন্তপর্ণে হাত রাখল ন্যাসোর কাঁধে। ন্যাসো চমকে ওঠে রিচার্ডের দিকে তাকায়। সামনের লোকটার চোখের সুদৃঢ় আশ্বাসে এবার তার চোখের কোল ছাপিয়ে প্লাবন হলো। ছুটে গিয়ে জাপ্টে ধরল রিচার্ডকে। হু হু করে কেঁদে উঠল। রিচার্ড ভারি নিঃশ্বাস ফেলে ন্যাসোর পিঠে হাত রাখে। দু’ফোঁটা নিরবে গড়িয়ে পড়ল লুকাসের চোখ থেকেও।

‘রিচার্ড প্রস্তর কঠিন মুখে দেয়ালে পিঠ হেলিয়ে আধশোয়া হয়ে বসে আছে। চোখ বন্ধ করা। গভীর ভাবনায় নিমজ্জিত সে। দীর্ঘক্ষণ হাত শক্ত করে মুষ্টিমেয় করে রাখার কারণে সাদা ব্যান্ডেজ লালচে বর্ণ ধারণ করেছে ইতিমধ্যে। তবুও সে নির্বিকার, নিরুদ্বেগ। পাশেই লুকাস চিন্তিত মুখে সোফায় বসে আছে। বাইশ দিন হয়ে গিয়েছে এলিজাবেথ নিখোঁজ। এতো চেষ্টা করেও কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। জেমসেরও কোনো খবর নেই। এতো লোক লাগানো হয়েছে, তারপরও হদিস মিলছে না। অথচ, আড়ালে থেকে নিখুঁত নিশানাই কোপ দিয়ে যাচ্ছে অপার পরিকল্পনায়।

‘হঠাৎ ন্যাসো দৃপ্ত পদচ্ছাপে রিচার্ডের সামনে এসে দাঁড়ায়। রিচার্ড চোখ খুলতেই সে তার সামনে একটা ভিডিও ক্লিপ তুলে ধরল। এটা সেদিনের সিসিটিভির ফুটেজ, যেদিন এলিজাবেথ সবিতা বেগমকে খু-ন করেছিল। লুকাস, ন্যাসো, রিচার্ড—তিনজনেই দেখল এক নতুন এলিজাবেথকে। এই নৃশংস এলিজাবেথকে তারা আর কখনো দেখেনি। এই তেজ, এই হিংস্রতা এতোদিন কোথায় লুকিয়ে ছিল? সবিতা বেগম প্রাণপণে নিজেকে রক্ষা করতে চেয়েছিল, কেঁদেছিল, হাতজোড় করেছিল কিন্তু প্রতিশোধে উন্মত্ত এলিজাবেথের চোখে সেই আর্তি ছিল তুচ্ছ। একটা পোকামাকড়ের কান্নার মতো। একবার নয়,বারবার, ঠাণ্ডা মাথায়, যান্ত্রিক ভঙ্গিতে, সে ছু-রি বসিয়েছিল সবিতা বেগমের বুকে, পেটে, গলায়। হাড়ে ঠেকে ছু-রি থেমেছে, আবার চালানো হয়েছে। একেকবার যেন কাটছিল শুধু শরীর নয়। সমস্ত অতীত, প্রতারণা, অপমান। র-ক্ত ছিটকে গিয়ে দেয়ালে আঁকছিল লাল ছবির মতো বীভৎস চিহ্ন। সবিতা বেগমের গোঙানি আর ছু-রি-মাংস কাটার গ্যাচ-গ্যাচ শব্দ মিশে তৈরি করেছিল এক রুদ্ধশ্বাস নরকসঙ্গীত। একটা ঘরজোড়া মৃত্যুর অর্কেস্ট্রা।
‘রিচার্ড দৃষ্টি ফিরিয়ে নিল। ন্যাসো ফোনটা পকেটে গুঁজে রেখে শান্ত গলায় বলল,

“ডোন্‌ট ওয়ারি, বস। আই থিংক শি ক্যান প্রোটেক্ট হারসেল্ফ। শি ইজ এনাফ স্ট্রং, না?”
‘হঠাৎ রিচার্ডের চোখমুখে বিজলি খেলে গেল। কণ্ঠস্বরটা ভারী, ভাঙা শোনালো,
“হাউ অ্যাবাউট মি, হাহ? হাউ অ্যাবাউট মি?হাউ কাউড আই সার্ভাইভ উইথআউট হার?”
‘বরাবরের মতোই রিচার্ড অনুভূতি প্রকাশে ব্যর্থ। তার চোখ থেকে অশ্রু বেরুয় না, বেরুয় রক্ত। তবুও অভিব্যক্তি থাকে পাথরের ন্যায়। লুকাস পাশ থেকে বিরস মুখে বলল,
“বস, জেমস্ তো একেবারেই বেপাত্তা। শেষবার ওকে সিলিসি দ্বীপে দেখা গিয়েছে। কোনো সোর্স পাচ্ছি না, যেটার মাধ্যমে ম্যামের কাছে পৌছাবো।”
‘রিচার্ড খুব মনোযোগ দিয়ে লুকাসের কথা শুনল। গম্ভীর চিন্তার ভাঁজ পড়ল তার রাশভারি কপোলে। রিচার্ড লুকাসের দিকে তাকিয়ে তীক্ষ্ণ গলায় বলল,

“হোয়ার ইজ হার ফোন?”
‘লুকাস এলিজাবেথের গ্লাস ফাঁটা ফোনটা রিচার্ডের হাতে দিল। রিচার্ড তার ধারণা অনুযায়ী সর্বপ্রথমে হোয়াটসঅ্যাপে গেল এবং সেই ভিডিওটাই ওপেন করল। ভিডিও দেখামাত্র উৎসুক ন্যাসো, লুকাস সচকিত চোখের মনিযুগল ঘুরিয়ে একে-অপরের দিকে তাকাল। লুকাস বিস্মায়াবিষ্ট গলায় বলল,
“বস এটা তো মিস এল,,
“মিস এলিসা।” রিচার্ড ফোনটা বেডে রেখে আবারও দেয়ালে গা এলিয়ে দেয়। ন্যাসো গম্ভীর মুখে ততধিক বিস্ময় নিয়ে বলল,

“কিন্তু বস, জায়গাটা আসলে কোথায়? এমন ভয়ংকর স্থান তো শুধু সিনেমা বা দুঃস্বপ্নেই মানায়৷ বাস্তবে নয়। আমার তো মনে হয়, পৃথিবীতে এমন নরকসদৃশ কারাগার সত্যিই আছে কিনা, তা নিয়েই সন্দেহ। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো জেমসের কাছে মিস এলিসা গেল কীভাবে?”
‘রিচার্ড কোনো প্রশ্নেরই উত্তর দিল না। সে ওঠে দাঁড়াল। হাতের ক্যানোলা টা নিস্তরঙ্গ মেজাজে একটানে ছিঁড়ে ফেলল মেঝেতে। সাথে কয়েক ফোঁটা র-ক্ত ছিটকে পড়ল সাদা টায়েলে। লুকাসের হাত থেকে কালো ব্লেজার নিয়ে পরতে পরতে বলল,
“গাইজ, গেট রেডি। আমরা ইতালি যাচ্ছি।”
‘তাদের কারোর মুখেরই দ্বিমতের ছাপ দেখা গেল না। সুতরাং, তারা সদা প্রস্তুত। রিচার্ড ঘাড় বাঁকাতে, বাঁকাতে ন্যাসোর উদ্দেশ্য বলল,

“মায়া, মাফি আর ওদের বাচ্চাদের সাথে নিয়ে নাও। ওরা এখানে কার সাথে থাকবে।”
‘মায়া ও মাফি এখন একটি পুত্র ও তিনটি কন্যা সন্তানের পিতামাতা। চারজনেই মায়ার গায়ের উজ্জ্বলতা পেয়েছে। অহংকারী মনোভাব দেখিয়ে বাপের ধারও ধারেনি। ন্যাসো একটু ইতস্ত গলায় বলল,
“বস, ওরা নাহয় ইবরাতের সাথে থাকুক। রাত একদম একা হয়ে পড়বে তো।”
‘রিচার্ড কিছু বলল না। ফোঁস নিশ্বাস ফেলে সামনে পা বাড়াতেই পিছন থেকে লুকাস বলল,
“বস?”

‘রিচার্ড ভ্রু কুঁচকে পিছন ফিরতেই লুকাস থমথমে গলায় বলল,”বস, পাশের কেবিনে আপনার ভাই,,,
‘রিচার্ডের রক্তিম চোখের দিকে তাকিয়ে শুষ্ক ঢোক গিলল লুকাস। ভুল সংশোধন করে ফের বলল,
“মিনিস্টার, তাকবীর দেওয়ান পাশের কেবিনে, অচেতন। যদিও মাঝেমধ্যে দুইবার সামান্য জ্ঞান ফিরেছিল, কিন্তু পাগলামির মতো আচরণ করায় ডাক্তার তাকে হাই ডোজ ঘুমের ইনজেকশন দিয়েছেন। এখন তিন দিন ধরে নিস্তেজ পড়ে আছে। আর সবচেয়ে ভয়ের ব্যাপার দুই পায়ের অবস্থা ভয়াবহ। পা দুটো একেবারে থেঁতলে গেছে… সম্ভবত কেটে ফেলতেই হবে।”
“না।” রিচার্ডের হঠাৎ গর্জনে চমকে উঠল দুজনেই। রিচার্ডের চোখে গনগনে অগ্নিশিখা। সে স্পষ্ট গলায়, রাশভারি আওয়াজ তুলে বলল,
“টেক হিম উইথ আস।”

‘সেদিন এলিজাবেথ যখন ছুটে পালাচ্ছিল তাকবীরের কাছ থেকে,তখন পিছন থেকে কান্নায় ভেঙে পড়ে তাকবীর চিৎকার করতে করতে বলেছিল,
“আমি অভিশাপ দিলাম তোমায়! তোমার গর্ভ থেকে জন্ম নিক এক তাকবীর দেওয়ান—আর তার সঙ্গেও যেন এমনটাই হয় ঠিক যেভাবে প্রতারণা হয়েছে আমার সঙ্গে। দুনিয়া যেন তার কাছেও হয়ে ওঠে ততটাই নির্মম, যতটা হয়েছিল আমার বেলায়। তখন তুমি বুঝবে, অনুভব করবে এই যন্ত্রণার ভেতর দিয়ে বেঁচে থাকা কাকে বলে!”

‘তখন সে ভেসে যাচ্ছিল কষ্টের জোয়ারে। পাগলের মতো উচ্চারণ করেছিল কথাগুলো। কিন্তু ওই মুহূর্ত পেরোতেই অনুশোচনার আগুনে পুড়তে থাকে সে। এলিজাবেথের পেছনে দৌড়াতে দৌড়াতে পৌঁছে যায় সেই অভিশপ্ত জায়গাটায়। যেখান থেকে ওকে তুলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। তাকবীর নিজের জীবন বাজি রেখে চেষ্টা করেছিল এলিজাবেথকে বাঁচাতে। কিন্তু জানোয়ারগুলো তার পায়ের ওপর দিয়ে গাড়ি চালিয়ে দেয়। ওই সময় ন্যাসো, রিচার্ডকে রক্তাক্ত অবস্থায় দেখে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারেনি। সবাইকে মেরে যখন সে রিচার্ডকে নিয়ে হাসপাতালের দিকে দৌড়াচ্ছিল, তখনই রাস্তায় পায় ছটফট করতে থাকা তাকবীরকে। পরে তাকবীরকেও হাসপাতালে নিয়ে আসে ন্যাসো।
‘রিচার্ড বোধহয় রক্তের টানেই হেঁটে যাচ্ছে তাকবীরের কেবিনের দিকে। সে নিজেও জানে না কেন যাচ্ছে। তবে তার পা দীপ্ত পদচ্ছাপ ফেলে ক্রমাগত এগিয়ে যাচ্ছে। লুকাস, ন্যাসো রিচার্ডের দু’পাশে। রিচার্ড নিজেকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করল।

“আমি এবার খেলব খেলোয়াড় ছাড়া। মাঠে খেলা হবে, তবে থাকবে না বল।”
‘লুকাস ভুরু কুঁচকে সন্দেহভরা গলায় বলল,”তাহলে খেলা হবে কিভাবে, বস?”
‘রিচার্ড বিরক্ত হয়ে ঠোঁট বাঁকাল,”উফ্‌ফ, লোকা! তুমি খুবই সরল।”
‘রিচার্ডের ঠোঁটের কোণে ঝুলে থাকা রহস্যময় হাসিটাই ছিল লুকাসের জবাব। লুকাস হঠাৎ লাফিয়ে উঠল,
“বুঝেছি বস, একদম বুঝেছি!”
‘রিচার্ড গম্ভীর গলায় বলল,”যার জন্য জান কোরবানি দিতে পারি, তার গায়ে আঁচ পড়তে দিবে না এই রিচার্ড কায়নাত। আমি এখনও বেঁচে আছি। জেমস ভুলে গেছে, এই মাঠের পুরোনো খেলোয়াড় আমি। সাময়িক বিরতিতে ছিলাম ঠিকই, কিন্তু খেলার হাত ভুলিনি।”
‘রিচার্ড থামল। গভীর একটা নিঃশ্বাস টেনে বলল,
“ভাগ্য যখন আমায় ছোবল মারে, রক্তে তখন বিষের প্রবল জ্বালা। আর সেই মুহুর্তে ওই মেয়েটা আশার আলো এসেছিল আমার জীবনে। তার স্পর্শে আমি অনুভব করি আর নেই জ্বালাপোড়া, নেই বিষক্রিয়া। আমি সুস্থ, আমার প্রতিটি পাঁজরে, পাঁজরে আছে প্রগাঢ় ভালোবাসা । আমি মানুষ, আমিও ভালোবাসতে জানি।

❝আমার প্রথম ভালোবাসা সে।
আমার শেষ ভালোবাসাও সে।”❞
‘রিচার্ড নিঃশব্দে কেবিনে প্রবেশ করল। এয়ারকন্ডিশনের শীতল বাতাসে ঘরজুড়ে এক চাপা থমথমে ভাব। ন্যাসো ভেতরে এলো না। দরজার ঠিক বাইরে দাঁড়িয়ে রইল।ওদিকে লুকাসের ফোন বারবার বাজছে। শেষে বিরক্ত হয়ে সে ফোন নিয়ে বাইরে চলে যায়। সুইটি কখন থেকে ফোন করছে, সে খেয়ালই ছিল না। ফোন কানে তুলতেই ওপাশ থেকে ভেসে এলো এক অভিমানী রমণীর কর্কশ কণ্ঠস্বর। কিন্তু আজ লুকাসের মন দারুণ ভালো। বউয়ের রাগ ভাঙাতে সে হেসে ফেলে। একটা দুষ্টু কৌতুক ছুঁড়ে দেয়,
“আমি তোমার প্রেমে পাগল, তাইতো করি পাগলামি। মারেছ চটকনা, হেরলাইগা তুমি প্রেম দিবানা? আই লাভ ইউ! দিল তো পাগল!”

‘রিচার্ড ঝুঁকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে তাকবীরের দিকে। তাকবীরের মুখে অক্সিজেন মাস্ক৷ নিস্তেজ শরীরটা সাদা চাদরের সঙ্গে মিশে একাকার। কোনো সাড়া নেই। রিচার্ডের চোখে এক অদ্ভুত দৃষ্টি। তবে হঠাৎই তার চোখের সামনে ভেসে ওঠে একটা ঝাপসা স্মৃতি। অস্পষ্ট একটা প্রতিবিম্ব। সঙ্গে সঙ্গে মুখ শক্ত হয়ে ওঠে, চোয়াল আঁটসাঁট। সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে রিচার্ড ঠাণ্ডা গলায় বলল,
“আইসসস, তুই আমার ভাই না,শুধুই প্রতিদ্বন্দ্বী ।”
‘শব্দগুলো বিষের মতো চিবিয়ে বলে হনহনিয়ে বেরিয়ে যায় রিচার্ড। পেছনে পড়ে থাকে তাকবীরের নিথর দেহ। নিস্তব্ধ ঘরে হঠাৎই তার চোখের কোণে গড়িয়ে পড়ে দু’ফোঁটা অশ্রু নীরবে, নিঃশব্দে।

‘আড়াইশ হাতের এক মৃতঘর৷ একদম আলোহীন, নিঃশ্বাসবন্দী৷ যেন অনন্তকাল ধরে সময় এখানে থমকে আছে। তিন হাতের সরু দরজায় পা রাখতেই এক বিষাক্ত, পঁচা গন্ধ হাওয়ার মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে। নাসো আর লুকাসের মুখে রুমাল উঠে যায় নিজে থেকেই। বিকৃত হয় মুখভঙ্গি। অথচ রিচার্ড এগিয়ে যায় চুপচাপ। এই গন্ধই তার চেনা কোনো পুরোনো বন্ধু। চারপাশে মৃত্যুর নিঃশ্বাস৷ ঘরটি পাশ বরাবর বড়, কিন্তু লম্বালম্বি এতটাই খাটো যে সোজা হয়ে দাঁড়াতে গেলেই মাথা ঠুকে যায়।

‘তারা তিনজনই দুলতে দুলতে নত হয়ে প্রবেশ করে। ভিতরে পা রাখতেই অন্ধকার এমন ঘন হয়ে ওঠে যে যেন আলো নিজেই এখানে ঢুকতে ভয় পায়। নাসো আর লুকাস হাত কাঁপতে কাঁপতে ফোনের ফ্ল্যাশ জ্বালায়। ঘুটঘুটে অন্ধকারচ্ছন্ন ঘরে মৃদু আলো জ্বলে উঠতেই সাথে সাথে গা ছমছমে নিঃশব্দতার গায়ে আতঙ্ক চিৎকার করে ওঠে। মেঝেটা যেন সাক্ষাৎ এক মৃত্যুর জাদুঘর। ছড়ানো ছিটানো হাড়গোড়, কিছু মানুষের, কিছু এমন জানোয়ারের যাদের খোঁজ ইতিহাসও রাখে না। কঙ্কালগুলো শুয়ে নেই। তারা যেন শোকে জর্জরিত হয়ে কুঁচকে আছে। কুন্ঠিত চোয়াল ফাটিয়ে আর্তনাদ করে উঠতে চায়। মেঝেতে জমাট বাঁধা রক্ত এক হাত উচ্চতার স্তর তৈরি করেছে।

‘দেয়ালজুড়ে আঁকা রক্তমাখা আঙুলের রেখায় ফুটে উঠেছে কোনো অজানা, প্রাচীন, অভিশপ্ত শিল্প। প্রতীকগুলো চোখের ভিতর গেঁথে যায় আর মগজে বিষ ঢেলে দেয়। ধারালো ছুরি, কুঠার, কাঁচির মতো অস্ত্র পড়ে আছে যত্রতত্র। এখানে কোনো জানালা নেই, কোনো আসবাব নেই। শুধু আছে এক অদৃশ্য ফিসফিসানি, একটা ঠান্ডা, রক্তহীন বাতাস, আর মৃত্যুর গন্ধে ভারী হয়ে ওঠা সময়। এই ঘরে একটা সময় মানুষ ছিল, তার আর্তনাদ ছিল৷ তবে এখন শুধু আছে ভয়ের হাড়গোড় আর আত্মার অনিঃশেষ থরথরানি।

‘ঘরের মাঝখানে বসানো একটি কাঠের চেয়ার৷ পোকায় কাটা, আধা ভেঙে পড়া। তার গায়ে জড়িয়ে থাকা মোটা দড়ি বলে দেয় কেউ এখানে কেবল বন্দি হয়নি কাউকে শিকার করা হয়েছে। এমনভাবে বেঁধে রাখা হয়েছিল যেন তার সময়টাকে আস্তে আস্তে ছিঁড়ে ফেলা হয়। লুকাস, ন্যাসো বুঝতে পারে এটাই সেই চেয়ার যেখানে মিস এলিসা কে বেঁধে রাখা হয়েছিল। ভিডিওডে তারা এই চেয়ারটাই দেখেছিল। তখন জায়গাটা যতটা না ভয়ংকর মনে হচ্ছে, সচক্ষে ততটাই ভৌতিক লাগছে। নিস্তব্ধতা কাঁদতে চায়। দেয়ালের ছায়া গা বেয়ে নেমে আসে। কেউ যেন ঘরের এক কোণায় দাঁড়িয়ে শ্বাস নিচ্ছে আস্তে, গা ছমছমে, ঠিক ঘাড়ের ওপর।

‘লুকাস, ন্যাসোর শিরদাঁড়া বেয়ে গড়িয়ে পড়ে শীতল ঘাম। চোখেমুখে স্পষ্ট আতঙ্ক। লুকাস একহাতে খামচে ধরে ন্যাসোর বাহু। ন্যাসো দিশেহারা হয়ে রিচার্ড’কে খুঁজল। রিচার্ড এককোণে নির্বিকার অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে। সে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সেই জায়গাটাই, যেখানে সে মাথা ফেলে ঘুমাতো। যেখানে সে পার করেছে বারোটা বছর। রিচার্ডের শরীরের রক্ত চলাচল তীব্র হয়ে উঠে। অন্তরে আবারো এই আঁধার কুঠুরির আঁধার নামে। সমুদ্র নীল চোখে আজ আবারো রক্ত। চোয়াল কাঁপছে। এখানকার ঘটনাপ্রবাহ সম্পূর্ণ অবগত হতেই, হঠাৎই ন্যাসো, লুকাস আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ল। তারা ছুটে গিয়ে জাপ্টে ধরল রিচার্ডকে। ফ্যাসফ্যাসে আওয়াজে একত্রে বলে উঠল,
“এই, আপনার সেই কালো অতীত, যা আপনি কখনো সামনে আনতে চাইতেন না।”
“ভয় পেতাম যে এই কালো অতীতটাকে।” রিচার্ড অনর্থক হাসল। প্রাণহীন, নির্জীব হাসি। সরে এলো ওরা। অতি আবেগি লুকাস হাতের পিঠ দিয়ে চোখ মুছতে, মুছতে বলল,

“বস, আপনার সাথে আমাদের আরো আগে দেখা হলো না কেন?”
‘রিচার্ড হাসল,বলল,”আগে দেখা হলে কি করতে?”
‘ন্যাসো দৃঢ় চিবুকে বলল,”আপনাকে এই আজাবে কখনোই থাকতে দিতাম না।”
‘রিচার্ড না হেসে পারল না। ঘাড় ঘুরিয়ে শ্যেনদৃষ্টিতে চারদিক পূর্ণরায় পর্যবেক্ষণ করে ফোঁস নিশ্বাস ফেলল।
“আমাদের আসতে অনেক দেরি হয়েছে গিয়েছে।”
‘রিচার্ডের কথায় লুকাস তপ্ত নিঃশ্বাস ফেলে। ন্যাসো ভাবনাতীত গলায় বলল,
“কিন্তু, ফাদার যে মিস এলিসাকে এখানেই লুকিয়ে রেখেছে, সেটা জেমস্ জানল কিভাবে?”
‘রিচার্ড রহস্য করে চাতুর্যের সহিত বলল,”শত্রুর গুপ্ত খবর একমাত্র শত্রুর কাছেই থাকে।”

‘এলিজাবেথ নিখোঁজ আজ সাতাশ দিন। তিনদিন হলো রিচার্ড ইতালিতে পা রেখেছে। এই তিনদিনে সে মানুষ ছিল না। ছিল এক অগ্নিগর্ভ উন্মত্ততা। সে নিজে হাঁটছে, ঘামছে, গর্জে উঠছে। রিচার্ড, যে এক সময় শুধু নির্দেশ দিত, এখন নিজে লোকজনকে জেরা করছে। শক্ত গোছের রিচার্ড পাগলের মতো আচরণ করছে। পাথর যেমন তার ব্যাথা প্রকাশ করতে পারে না, কারণ তাকে সেই ক্ষমতা দেওয়া হয়নি, তেমনিও রিচার্ড নামক এই ব্যক্তি ভেতরে, ভেতরে দগ্ধ হয়েও প্রকাশ্যে ব্যর্থ। সে পাথরের মতো নিটল। সে শুধু চিৎকার করছে, রক্ত ঝড়াচ্ছে, ছটফট করছে। কিন্তু কাঁদতে পারছে না। মেঘমেদুর আকাশে যেমন বজ্রপাত হয়, তেমনি তার ভেতরে প্রতিটি পাঁজরে, পাঁজরে হয় ভাঙন। তবুও আকাশের মতো তার চোখের কোল ঝাপিয়ে বৃষ্টি নামে না। প্লাবিত হয় না তার অন্তর্হিত কান্না। অভ্যন্তরীণ তোলপাড় সে একা বহন করে যাচ্ছে, কারণ সৃষ্টিকর্তা কেড়ে নিয়েছে তার কাছ থেকে সেই কোমল হৃদয়। যে হৃদয়টা অল্পতেই ভেঙে পড়ত।
‘নিশব্দ শহরের বুক চিরে ছুটছে এক পাগলা প্রেমিক।

রিচার্ড। তিনদিন ধরে ঘুম নেই, খাওয়া নেই, মাথায় শুধু একটাই নাম এলিজাবেথ। ভালোবাসা প্রকাশ করতে না পারা মানুষটাও এখন শুধু প্রেমিক নয়, এক উন্মাদ যোদ্ধা।ইতালির রাজপথে বৃষ্টিভেজা অলিগলিতে
রিচার্ড ছুটছে।পাগলের মতো নয়,ভালোবাসায় জ্বলতে থাকা এক অভিশপ্ত দেবতার মতো। কি না করেছে সে মেয়েটাকে খুঁজে পেতে। নিজের পুরো আন্ডারওয়ার্ল্ড নেটওয়ার্ক নামিয়ে দিয়েছে রাস্তায়। সিসিলি থেকে রোম প্রতিটি শহরে কনট্রোলরুম বসিয়েছে। শত্রু গ্যাংগুলোকেও এক রাতের চুক্তিতে নিজের অধীনে এনেছে।প্রতিটি বর্ডার পোস্টে নিজের লোক বসিয়েছে। শহরের প্রতিটি ক্যাসিনো, নাইটক্লাব, বার, হোটেলে তল্লাশি চলছে গোপনে।

‘যে ডাক্তার বেআইনি অস্ত্রোপচার করে তাদের ধরে জেরা করেছে।নিজের ফিক্সারদের পাঠিয়েছে পাসপোর্ট অফিস, ভুয়া পরিচয়ের খোঁজে। সিসিটিভি অপারেটরদের ধরে বেইসমেন্টে এনে জেরা করছে৷ নখ তুলছে, মুখ খুলছে।এক সপ্তাহের মধ্যে ১২টা অস্ত্রচক্র গুড়িয়ে দিয়েছে, শুধু একটা নামের জন্য।ড্রাগ ডিলারদের সব রুট ব্লক করে দিয়েছে। যতক্ষণ না এলিজাবেথের খোঁজ পাই, ব্যবসা বন্ধ। পুলিশ কমিশনারের মেয়ে গায়েব। যে বাঁধা দিচ্ছে, তার বাড়ি উড়িয়ে দিচ্ছে রকেট লঞ্চার দিয়ে। নিজের গুন্ডাদের গাড়িতে শুধু এলিজাবেথের পোস্টার—চেকপোস্ট বানিয়ে ফেলেছে পুরো শহরে। তার নিজের প্রাইভেট সাবমেরিন দিয়ে তল্লাশি চলছে উপকূলীয় টানেলে। আকাশে ড্রোন নয়, হেলিকপ্টারে মাউন্ট করা স্নাইপার। যদি দেখা যায় তাহলে উদ্ধারে যাবে না, যুদ্ধে যাবে ডিরেক্ট৷

‘ব্যর্থতা আর বিক্ষুব্ধ অন্তরের গর্জনে রিচার্ড সজোরে ঘুষি চালায় সামনের স্বচ্ছ আয়নাটায়। ঝনঝন শব্দ তুলে ভেঙে পড়ে কাঁচ। ছড়িয়ে পড়ে মেঝেতে। ক্ষতস্থানে আর আগের মতো রক্ত পড়ে না।চামড়া ক্ষয়ে গিয়েছে বহু আগেই। এবার হয়তো জায়গাটাই পঁচে যাবে চিকিৎসাহীনতায়। দুই হাত যেন রক্তেই লিপ্ত। ঠিক যেমন তার অতীত, যেখান থেকে রক্ত কোনদিনই সরেনি। রিচার্ড আবারও ডুব দিয়েছে তার পাপসমুদ্রের গভীর অন্ধকারে।

‘রিচার্ড এখন অবস্থান করছে ফাদারের ম্যানশনে, তার ব্যক্তিগত কক্ষে। চারদিকে ছড়ানো ড্রাগস, ভাঙা মদের বোতল, আর এক ধরনের ঝাঁঝালো, পচা গন্ধ৷ যা কোনো সুস্থ মানুষের সহ্যসীমার বাইরের জিনিস। রিচার্ড রক্তাক্ত হাতে মদ ঢেলে দেয় ক্ষতের উপর। তারপর ধরা হাতেই তুলে নেয় একটা ইনজেকশন। হিংস্র ভাবে পুশ করে শরীরে। সঙ্গে সঙ্গে মাথাটা ঘুরে ওঠে। চোখের তারা নিভে যেতে থাকে। পুরো পৃথিবীটা কেমন নিঃশব্দে, নিঃরঙে গলে যেতে থাকে চারপাশ থেকে।

“বস! বস! বস! বস?”
‘বাইরে থেকে ন্যাসো, লুকাস অবিশ্রাম ডাকছে আর দরজায় ধাক্কাচ্ছে। ভেতর থেকে শুধু জিনিসপত্র ভাঙচুরের শব্দ শোনা যাচ্ছে আর রিচার্ডের চিৎকার। বন্য পশুর মতো চিৎকার করছে রিচার্ড। বুকের গভীর থেকে ক্ষতের আতর্নাদগুলো চিৎকার রূপে বেরোয়।
“রিদ!”

‘হঠাৎ চিৎকার থেমে যায়। রিচার্ড হন্তদন্ত হয়ে দরজা খুলে। লাড়া কে দেখতে পেয়ে দুচোখ সজল হয়ে আসে। রিচার্ডের লোক লাড়াকে ইউএস থেকে তুলে নিয়ে এসেছে। রিচার্ডের এক্সিডেন্ট, এলিজাবেথ নিখোঁজ—এইসবের কিছুই জানত না লাড়া। সে তো সবকিছুর মায়ামোহ ছেড়ে আবারও দূর দেশে পাড়ি দিয়েছিল। ভেতরের ধ্বংসস্তূপ দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলল লাড়া। রিচার্ড চোখে ইশারা করতেই সরে গেল ন্যাসো, লুকাস৷ লাড়া ভিতরে প্রবেশ করতেই রিচার্ড দরজা আটকে দেয়। রিচার্ড হঠাৎই খুব কাছে আসে লাড়ার। তার নিঃশ্বাস আঁচড়ে পড়ছে লাড়ার মোমঢালা লালিত চেহারায়। রিচার্ড এই অকল্পনীয় পদক্ষেপে বুকের ভেতর অসহনীয় ব্যাথার ঢেউ ওঠে আড়ষ্ট মেয়েটার। রিচার্ডের কণ্ঠে অনভ্যস্ত কোমলতা। সে ডাকল,

“লাড়া?”
‘বুকের ভেতর দুমড়ে মুচড়ে যায়। ওষ্ঠদ্বয় কেঁপে ওঠে। ঈষদুষ্ণ জল খেলা করে চোখের কোলে। রিচার্ড আর এগোল না। খাদযুক্ত কণ্ঠে বলল,
“লাড়া আই ব,,,,
“ছলনার আশ্রয় নিচ্ছো?”
‘রিচার্ড নিঃশব্দে মাথা নিচু করে। লাড়া তাচ্ছিল্য করে হেসে বলল,
“লজ্জা করে না, একটা মেয়ের জন্য, আরেকটা মেয়ের কাছে ছলনার আশ্রয় নিতে?”
‘রিচার্ড নতশ্রী মুখ তুলে।বিলম্বহীন জবাবে তীব্র কণ্ঠে বলল,
“না করে না। প্রসঙ্গ যদি হয় সে, তখন একদমই করে না।”
‘লাড়া ছলছলে নয়নে তাকিয়ে থাকে রিচার্ডের দিকে। রিচার্ড আবারও এগিয়ে আসে। ঘনঘন নিঃশ্বাসের সাথে দূর্বল, ভাঙা গলায় বলতে থাকে,

“লাড়া আই ডোন্ট ওয়ানা ফোর্স ইউ। আই বেগ ইউ, প্লিজ হেল্প লাড়া। শি নিডস মি।”
‘লাড়া চোখে পানি সমেত হাসল।গোধুলির মতো নরম গালে শুষ্ক অশ্রুর কারুকার্য। লাড়া বলল,
“দুইবার, এই নিয়ে দুই-দুইবার তুমি আমার কাছে হাতজোড় করলে রিচার্ড। ওই মেয়েটা কি তোমার কাছে এতোই দামি, যে তুমি রিচার্ড কায়নাত বারংবার মাথা নত করছ? ক,,,,
“নিঃশ্বাস।”
‘লাড়া থমকে রিচার্ডের দিকে তাকাই। রিচার্ড আবারও বলল,
“আমার জীবনে তার উপস্থিতি, নিঃশ্বাসের মতো অপরিহার্য।”
‘থেমে,
“প্লিজ লাড়া, আমাকে সাহায্য কর। আমরা চাইলে ভালো বন্ধু হতে পারি।”
‘লাড়া নিজেকে আর ধরে রাখতে পারল না। ছুটে গেল রিচার্ডের কাছে। জড়িয়ে ধরতে চাইলে সরে যায় রিচার্ড। লাড়া কাঁদতে, কাঁদতে বলল,
“রিচার্ড আমি মরে যাবো। প্লিজ আমার সাথে ছলনা কর না, শুধুমাত্র তাকে বাঁচানোর জন্য।”
“মরে যাও। সব কিছুর বিনিময়ে হলেও আমার শুধু ওকেই চাই। আই ওয়ান্ট মাই ওয়াইফ, নো ম্যাটার হোয়াট।”

‘অমোঘ সময় বহমান। পেরিয়ে গিয়েছে আরো পনেরো টি দিন। লাড়া নিত্যদিনের রুটিনের মতো আজও ল্যাপটবের সামনে বসে আছে। জেমসের কোনো নাম্বার তার কাছে নেই। সম্পর্কে তাদের দূরত্ব এতোটাই ছিল। যোগাযোগ সূত্র বলতে ছিল শুধু একটি ই-মেইল। লাড়া পনেরো দিন ধরে মেইল করে যাচ্ছে। তবে নেই কোনো সাড়া। সে ক্লান্তির ভারে নুইয়ে পড়া আঙুলে চালিয়ে প্রতিদিনের মতো আজও লিখল কিছু আবেগঘন কথা,
‘সেলফিশ ড্যাড,

‘তুমি কি এখনো মনে রেখেছ? মম যখন মারা গিয়েছিল, আমি কতটা কাঁদতাম। আমার সেই কান্না তোমাকে ব্যথা দিত, তাই তুমি বেশিক্ষণ বাড়িতে থাকতে না। অথচ মাঝরাতে চুপিচুপি এসে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে যেতে।আমি ঘুমিয়ে থাকলেও বুঝতাম, তুমি এসেছো। কিন্তু, আমার ধারণা ছিল, তুমি আমায় সহ্য করতে পারো না। আমি কতবার তোমার কোলে উঠতে চেয়েছি, কিন্তু তুমি চুপচাপ পেছিয়ে যেতে। আমি তখন ভাবতাম, তুমি আমাকে ভালোবাসো না। আমি কাঁদতাম, অভিযোগ করতাম। গ্র্যান্ডপা’র কাছে তোমার নামে কত যে নালিশ করতাম। তবুও তুমি আমাকে কোলে নাওনি। আজ বুঝি, তুমি ভয় পেতে। কিসের ভয় ছিল সেটা জানি না ঠিক করে। তবে হয়তো মমের মতো আমিও তোমার জীবনের ছায়ায় এসে, তোমার শত্রুদের হাতে হারিয়ে যাবো এই ভয়। ড্যাড, যদি তখন আমি এটা বুঝতাম, কখনোই তোমার ওপর রাগ করতাম না।

‘তুমি কি মনে রেখেছ ড্যাড, একদিন ম্যানশনে ফিরে আমাকে কাঁদতে দেখেছিলে? আমি তোমার একটা সঁপিস ভেঙে ফেলেছিলাম, আর তাই মেড আমাকে মেরেছিল। তুমি যখন আমার গালে দাগ দেখেছিলে, রাগে তুমি সব মেডদের মেরে ফেলেছিলে। আরেকদিন শুধু ধমক দিয়েছিল বলে তুমি গ্র্যান্ডপাকে অনাথ আশ্রমে পাঠিয়ে দিয়েছিলে। আমি যত বড় হয়েছি, তত তোমার চোখে ভয় বেড়েছে। আর আমার ভেতরে জমেছে অভিমান। শেষমেশ তুমি সেই ভয়েই আমাকে ইউএস পাঠিয়ে দিলে। আর আমি একরাশ অভিমান নিয়ে নিরবে চলে গেলাম। ড্যাড, তোমার সেই ছোট্ট লাড়াটি তখন খুব অবুঝ ছিল। সে বুঝত না ভালোবাসা সবসময় জড়িয়ে ধরা নয়, কখনো কখনো নিরবে পাহারা দেওয়া। আমি তোমাকে খুব মিস করি, ড্যাড।
প্লিজ ফিরে এসো।আমি শুধু তোমার বুকটাতে মাথা রাখতে চাই। আর একটুখানি কাঁদতে চাই তোমার ছায়ায়।
ইতি,
অনাদরের লাড়া,,,

‘নিঃশ্বাস ভারি হয় লাড়ার। অদ্ভুত নীল ব্যাথা মরিয়া হয়ে উঠল। ভেতর থেকে আসা দুয়েক লাইন আবারও লিখল,
“বাবা তোমায় ছাড়া
কেউ দেয় না সাড়া
আমি দিশেহারা, পলকেই…
‘অদ্ভুতপূর্ব ভাবে সঙ্গে, সঙ্গে লাড়ার কাছে একটি গুগল মিট লিংক আসে। লিংকে ক্লিক করতেই স্ক্রিনে জ্বলজ্বল করে উঠল জেমসের দু’টো চোখ। সে অন্ধকার একটি কক্ষে। ব্যাকগ্রাউন্ডে কিছুই দেখা যাচ্ছে না। লাড়ার চোখ দু’টো ছলছল করে। জেমস্ কিছু বলতে যাবে তখনই রিচার্ড পিছন থেকে এসে লাড়ার গলায় ছুরি চেপে ধরে। লাড়া একটুও চমকাল না। নিঃস্পৃহ চোখে তাকিয়ে থাকে শূন্যে। জেমস্ ওপাশ থেকে গর্জে উঠল,
“ইউ মাদারফাকার! তোর সাহস কী করে হয় আমার মেয়েকে টোপ বানানোর? লাড়া, তোমাকে এতটা নির্বোধ ভাবিনি আমি। ও তোকে ভালোবাসে না, হি’স জাস্ট ইউজিং ইউ, বেটা!”
‘লাড়ার বুকে এক ঝড় বয়ে যায়। সে চোখ বন্ধ করে নিঃশব্দে বলে,

“আই নো, ড্যাড।”
‘লাড়ার চোখের কোণ বেয়ে দু’ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ে।
রিচার্ডের ঠোঁটে ছায়া ফেলে ধূর্ত এক হাসি। ছুরির ফলা লাড়ার গলায় আরও একটু চেপে ধরে। জেমস্ হিংস্র গলায় চিৎকার করে ওঠে,
“জারতের বাচ্চা! তুই আমার সব ছিনিয়ে নিয়েছিস। আমার সম্রাজ্য, আমার ক্ষমতা, আমার পরিচয়,এমনকি আমার ফাদার কেও! সব, সব, সব কেড়ে নিয়েছিস তুই!”
‘রিচার্ড শুধু ঠোঁট বাঁকায়। জেমস্ থামে না,
“ইউ এসহল! ছুরি সরা আমার মেয়ের গলা থেকে! লাড়া, ড্যাড আছে। কিছু হতে দিবে না তোমার! কুত্তার বাচ্চা, সরা বলছি!”

‘রিচার্ডের চোখে জমে রহস্যের কুয়াশা। ধীরস্বরে বলল,
“ওহ, ম্যান! ইউ নো দ্যাট, রিচার্ড কায়নাত কতটা ডেঞ্জারাস কাজের ব্যাপারে আর কতটা ডেসপারেট জেতার ব্যাপারে।”
‘জেমস্ আবার গর্জে ওঠে,
“আমার মেয়ের একটা চুলও ছিঁড়লে তোর শরীর ছিঁড়ে কুকুর দিয়ে খাওয়াবো। ছেড়ে দে বলছি ওকে।”
‘রিচার্ড ভ্রু নাচিয়ে, ঠোঁটে শীতল হাসি মেখে বলল,
“ডিল হয়ে যাক তবে?”

‘পরিত্যক্ত একটি হেলিপ্যাড। চারদিকে বিস্তীর্ণ নীরবতা।শুধু আকাশে ঝলমলে রোদের ঝিলিক। রিচার্ড চুক্তি অনুযায়ী এসেছে একা, গার্ডহীন, অস্ত্রহীন। চেহারায় অদ্ভুত ধৈর্য আজ। অথচ চোখের গভীরে এক অশান্ত ঢেউ। লাড়া দাঁড়িয়ে আছে ঠিক পাথরের মতো। চোখেমুখে না ভয়ের রেখা, না রাগের উত্তাপ। শুধু এক শূন্যতা ওকে গ্রাস করে রেখেছে। হঠাৎ করে হেলিপ্যাডের গোল চক্রে থেমে দাঁড়ায় একটি হেলিকপ্টার। রিচার্ড মুহূর্তেই সতর্ক হয়। বুকের ভেতর অজানা শঙ্কায় গতি বাড়ায় হৃদস্পন্দন। কাতর হলো দৃষ্টি। হেলিকপ্টারের দরজা খুলে নামে এক মুখোশপরা লোক। কানে ব্লুটুথ। সে নামতেই ভেতর থেকে বের করে এক মেয়েকে। মেয়েটার মাথা ঢাকা এক বিশাল কালো হিজাবে। মেয়েটির মুখ,গায়ের গঠন, কিছুই দেখা যাচ্ছে না। রিচার্ডের কানেও ছোট ব্লুটুথ। ওপাশ থেকে শোনা যায় জেমসের কণ্ঠ,
“ইট’স টাইম টু শো রয়ালিটি, রিচার্ড কায়নাত।”
‘রিচার্ডও ঠোঁট চেপে উত্তর দেয়,

“ইট’স টাইম টু শো রয়ালিটি, জেমস স্ট্রোন।”
‘তারপর হঠাৎ লাড়াকে সামনে ধাক্কা দেয় রিচার্ড। মুখোশপরা লোকটাও সেই মেয়েটিকে সামনে এগিয়ে দেয়। দুই পক্ষ ধীরপায়ে মাঝামাঝি এগিয়ে আসে। লাড়া একবার ফিরে নিস্পৃহ চোখে চেয়ে দেখে রিচার্ডকে। নাম জানা এক কারণে তার চোখে পানি। এ কি বিদায়ের অশ্রু না আত্মত্যাগের? রিচার্ড তাকিয়ে আছে একদৃষ্টিতে সেই হিজাব পরা মেয়েটির দিকে সচকিত চোখে।
‘তখনই আচমকা এক ধমকা বাতাসে সরে যায় মেয়েটির হিজাব। মুক্ত হয়ে পড়ে কাঁচের মতো চকচকে কালো চুল। রিচার্ড সঙ্গে সঙ্গেই চিৎকার করে উঠে,
“লাড়া, স্টপ! ইট’স নট হার!”পাগলের মতো ছুটে গিয়ে লাড়ার সামনে এসে দাঁড়ায়। লাড়া নিজেও হতবাক, স্তব্ধ। ওপাশ থেকে ভেসে আসে জেমসের বিকৃত, পৈশাচিক হাসি। রিচার্ড ক্ষোভে ফেটে পড়ে। আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে তোলে বলল,

“কুত্তার বাচ্চা!”
‘জেমসের গলা হাসতে হাসতে বলে,
“তুই কি ভেবেছিস, এত সহজে তোকে মুক্তি দিবো? কত শত আগুনে পুড়ে তবে তোকে পেয়েছি আমি, রিচার্ড কায়নাত। এই খেলা এখনো শেষ হয়নি।”

‘রিচার্ড খুব ভালো করেই বুঝতে পারে জেমস এই খেলা এতো সহজে শেষ করবে না। এই বিরোধ মিটবে না। আজ প্রথমবারের মতো তার নিজেকে খুব ক্লান্ত লাগল।। রিচার্ডের মানসপটে ভাসতে থাকে সে-ই মেয়েটি। সে-ই মেয়েটির সর্বনাশা হাসি, ললিত কপোল, পুরন্ত ঠৌঁট। তিক্ত এক শূন্যতায় খাঁ, খাঁ করে উঠল ভেতরটা। রিচার্ড তপ্ত শ্বাস ফেলে সামনে এগিয়ে গেল। পাখির ডানার মতো দু-হাত মেলে দিয়ে বলল,
“আই’ম টায়ার্ড জেমস্। লেটস ইন্ড দ্য ওয়ার। সমস্ত শত্রুতা তো আমার সাথে। জাস্ট কিল মি। প্লিজ লেট হার এলোন।”
‘বাকশক্তি রহিত লাড়া বিস্ময় কাটিয়ে ওঠে চিৎকার করে উঠল,”রিদ, এসব কি বলছ তুমি?”
‘রিচার্ড গ্রীবা ঘুরিয়ে লাড়ার দিকে তাকাল। এক টুকরো নিখাদ হাসি দিয়ে বলল,

“পাথরের বুকে ফুঁটে ওঠা ফুলটাকে, যদি আমি রক্ষা করতেই না পারি—তবে আমি কেমন প্রেমিক?”
‘রিচার্ড আবারও সামনে ফিরল,”শুট মি” বলে বুক উজাড় করে দিয়ে চোখ নিঃশব্দে বুজলো। জেমস লোকটাকে নির্দেশ দিতেই সে শুট করল। বিকট এক শব্দে কেঁপে উঠল চারিপাশ। হতচকিত রিচার্ড মেলে দেখতে পাই, রক্তাক্ত লাড়া তার পায়ের নিচে পড়ে আছে। রক্তের রক্তিমা নদী বয়ে গিয়েছে নিমিষেই। রিচার্ড শুনতে পাচ্ছে, ওপাশ থেকে জেমসের আহাজারি। সে-ই লোকটা দ্রুত হেলিকপ্টারে ওঠে প্রস্থান করল। রিচার্ড কান থেকে ব্লুটুথ খুলে ছুঁড়ে ফেলল। সে হাঁটু ভেঙে বসল লাড়ার সামনে। লাড়ার দেহে তখনও প্রাণ আছে। বুকের ছোট, সরু ছিদ্র থেকে অবিশ্রাম রক্ত বের হচ্ছে। বিদ্যুৎস্পষ্টের মতো স্তব্ধ হয়ে আছে রিচার্ড। কণ্ঠনালিতে ষড়যন্ত্রের দলা পাকানো হয়েছে। তার পাষন্ড বুকে মায়ার উদ্রেক হয়। লাড়ার মাথাটা রাখল নিজ উরুর ওপর। জড়িয়ে আসা কণ্ঠে বলল,

“এটা তুমি কি করলে লাড়া?”
‘লাড়ার শরীর বিদায়ের ঝাঁকুনি দিয়ে ওঠে। মুখ দিয়ে রক্ত বের হচ্ছে। শরীরের রক্ত চলাচল ধীরে, ধীরে শিথিল হয়ে আসছে। লাড়া রক্তাক্ত হাতটা রাখল রিচার্ডের হাতে। অস্পষ্ট স্বরে কাঁপতে, কাঁপতে শেষ আবদার করে বসল,
“মিথ্যে হলেও একবার ভালোবাসি বলবে রিদ?”
‘রিচার্ডের চোখে ভেসে ওঠে অসহায় এক ছায়া। দুচোখে জমে ওঠে ভারী জল। তবুও মিথ্যের আশ্রয় নেয়নি সে । লাড়ার প্রার্থনামাখা চোখ উপেক্ষা করে নিঃশব্দে ওকে কোলে তুলে নেয়। দ্রুত পায়ে গাড়ির দিকে ছুটে যেতে যেতে বলল,
“তোমায় কিছু হবে না, লাড়া।”

ভিলেন ক্যান বি লাভার পর্ব ৬৪

‘তবে, তার মতো লাড়াও আজ কথা রাখল না। এক বুক না-বলা কথা, অপূর্ণতা আর নিঃশেষ আর্তি নিয়ে সে পাড়ি দিল দূর আকাশের পথে। অবচেতন হাতটা নিস্তেজ হয়ে ঝুলে পড়ল। রিচার্ডের পা থমকে যায়, স্তব্ধ হয়ে তাকায় লাড়ার রক্তশূণ্য মুখে।

ভিলেন ক্যান বি লাভার পর্ব ৬৫ (২)