মেহরিনের সপ্নরঙ পর্ব ৬৮
মির্জা সূচনা
আ…আমি খু’নি-আমি খু’নি খু….খু’নি আমি।আ….আমাকে পুলিশে দাও! পুলিশে দাও, আ..আমাকে সবাই খু’নি বলবে। আ.. আমি আমার পালক বাবা, যে বাবা আমাকে এত বড় করেছে সেই বাবাকে মেরে ফেলেছি!আ.. আমি খু’নি!! আমকে ধরে নিয়ে যাবে সবাই আমকে খু..খু’নি বলবে।
রেদুয়ান তালুকদারের শরীরটা স্থির হতেই, রাহির পাগলামি জুড়ে দিলো। রাহির পাগলামি মারাত্মক বেড়ে গেলো। সবাই রাহির কাছে চলে আসে,আর রাহি কে বুঝানোর চেষ্টা চালাচ্ছে, কেউ সামলাতে পারছে না রাহি কে। রাহির অবস্থা দেখে সায়েম রহমান আরো বেশি ভয় পেয়ে গেলো।
সায়েম রহমান মনে মনে বলে, আল্লাহ আমাকে বাঁচাও।
নিজেই একের পর এক কুপ দিলো পালিত বাবার বুকে,আবার এখন নিজেই কাঁদছে। আল্লাহ জানে আমাকে কী করে আমার কোথায় কোথায় কুপ দেয়। এ কথা ভাবতে ভাবতেই মনে পরে গেলো সে রুপা বেগমের দিকে কু-নজর দিয়েছিলো, তার সঙ্গে জোর করে শারীরিক সম্পর্ক করতে চেয়েছিলো। এটা ভাবতেই সায়েম রহমান উঠে দেয়ালে হেলান দিয়ে কোনো রকম কোজো হয়ে বসে।
লামিয়া তাকায় সায়েম রহমানের দিকে। লামিয়া তাকাতেই সায়েম রহমান নিজের স্পর্শকাতর জায়গায় হাত দিয়ে ঢেকে নেয়। এমন একটা ভাব যেনো, লামিয়া তার মায়ের দিকে কু-নজর দেওয়ায় তার স্পর্শকাতর জায়গায় কুপ দেবে।
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
রাহি তার বাবা-মার খু’নিকে বুকে কুপ দিয়েছে। লামিয়া তার মায়ের দিকে কু-নজর দেওয়ায়-যদি আমার এইটার উপর কুপ দেয়? বা আমার চোখে কিছু ঢুকিয়ে দেয়? মুখটা কাঁদো কাঁদো করে, মনে মনে বলে, আমাকে এই জায়গায় মারিস না, আম্মা আমি মরার আগেই মরে যাবো।
লামিয়া কপাল কুঁচকে তাকায়। সায়েম রহমান কে এমন করতে দেখে লামিয়া ব্রু নাচিয়ে জিজ্ঞেস করলো, কি?
সায়েম রহমান দাত বের করে দুই দিক মাথা নাড়লো বুঝালো কিছু নাই। লামিয়া হাসলো বুঝে সায়েম রহমান ভয় পেয়েছে। হাফ ছেড়ে আবার লামিয়ার দিকে তাকায়, ব্রু কুঁচকে খুটিয়ে খুটিয়ে দেখে। মনে মনেই বলে মেয়েটাকে দেখে তো শান্ত মনে হলো।
আবার আমাকেও পানিও খাওয়ালো হয়তো এই মেয়েটা এতো উগ্র নয়। না মনে ওই মেহরিন আর ওর বোন বা রাহির মতো নয়। বড় একটা শ্বাস নিয়ে চোখ বুজে সায়েম।
আর এমন সময় সামনে থেকে লামিয়া উঠে একটা দা নিয়ে এসে বললো,
কুকুরের বাচ্চা তোর চোখ আর কোল্লা দুইটাই ফেলে দিবো আজ। তুই আমার মায়ের দিকে বাজে নজর দিস?
ইয়াা আল্লাহ….!
সায়েম রহমান চোখ বন্ধ করে চিৎকার করে উঠলো, না-আ-আ-আ-আ…
সবাই তাকায় সায়েম রহমানের দিকে। সায়েম রহমান চোখ মেলে তাকায়, যখন দেখে সবাই তার দিকে চেয়ে আছে আর বুঝে এটা শুধুই তার কল্পনা তখন দাত বের করে বলে, না মানে আমি রাহি মামোনির কান্না থামানোর চেষ্টা করলাম।
এই কথা শুনে লাবিন তেরে আসতে চাই কিন্ত মেহবুবা ধরে ফেলে। আর সায়েম রহমান শিষ বাজাতে বাজাতে অন্য দিকে ঘুরে যায়। ভাবটা যেন কিছু হয়নি।
ওদিকে রাহি পাগলের মতো করেছে, তার মুখে একটাই কথা, আমি খু’নি, আমি খু’ন করেছি, আমি মেরে ফেলেছি, আমাকে পুলিশ ধরে নিয়ে যাবে।
রাহিকে কিছুতেই সামলানো যাচ্ছেনা, কেউ তাকে শান্ত করতে পারছে না।
মেহরিন রাহিকে বলে,
না সোনা কিছু হবে না, তুই কিছু করিসনি সোনা, তুই না আমার পাখি চুপ কর বাবু চুপ।
কিন্তু রাহি কিছু বুঝতে চাইছে না, সে আবার পাগলামি জুড়ে দিলো। শেষমেষ না পেয়ে মেহরিন একটা থাপ্পর মারলো রাহিকে। সবাই চমকে যায়। শুধু মেহের বাদে।
রিদ এগিয়ে আসতে চাইল, মেহে ধরে ফেলে মাথা নেরে না করলো। রাজ কিছু বলতে চাইল, মেহরিন হাত তুলে থামিয়ে দিয়ে বললো, সমস্যা কী তোর? কে তোকে খু’নি বলেছে?
মেহরিন কথাটা চেঁচিয়ে বললেও, এর পর রাহিকে আবার বুকে আগলে নেয়। শুন, ভেঙে পরলে চলবে না, তুই না আমার স্ট্রং পাখি, আমার শক্তিশালী, বুদ্ধিমতী, তবে তুই কেন এমন বোকাদের মতো করিস? তুই তো ভুল কিছু করিসনি। তুই নিজের বাবা মা ভাই মামার মৃত্যুর বদলা নিয়েছিস, ইন্তেকাম নিয়েছিস। জানিস তো ইসলাম প্রতিষ্ঠা করতে অনেক প্রাণ দিতে হয়েছি আবার নিতে হয়েছিলো।
উসমান গাজীর নাম শোনেছিস না?
রাহি নাক টেনে মাথা নাড়লো।
মেহরিন বলে, উসমান গাজীর দুইটা বউ ছিল বালা খাতুন ও মালহান খাতুন। তুই জানিস ওরা কত মানুষের জীবন নিয়েছে। তাহলে কি তারা খু’নি হয়েছে না? হয়নি, আমরা খুব সম্মানের সাথে তাদের নাম নেই, কারণ তারা ইসলামের জন্য লড়েছে মানুষের জন্য লড়েছে।
জানিস সেই সময়ে ইহূদী ও মঙ্গলিরা মুসলিমদের ধরে নিয়ে মেরে ফেলতো? শুধু তাই নয় ওরা মুসলিমদের ধরে নিয়ে মেরে ফেলতো? তখনকার জালিমদের মতোই কাউকেই তুই মেরেছিস।
তুই তো ভালো মানুষকে মেরিসনি।
এমন একজনকে মেরেছিস যে, তোর বাবা মা ভাই মামার খু’নি, তোর পরিচয় করে নেওয়া অপরাধী, তার থেকেও বড় কথা রেদওয়ান তালুকদারের মতো একজন মানুষ আগের কালের মঙ্গলিদের মতোই।
জানিস মঙ্গলিরা মুসলিম শিশুদের নিয়ে গিয়ে জাদু টুনা করতো, বেধর্মি বানাতো, ওদের খারাপ পথে ঠেলে দিতো। রেদওয়ান তালুকদারও ওদের মতো এই মানুষের জন্য। যে আমাদের দেশের যুবসমাজ ধংস করে দিচ্ছে।
রাহি ছোট ছোট ছেলে মেয়ে ড্রাগসে অসক্ত হচ্ছে, সেই নিশাই ওরা চুরি ডাকাতি করছে এমনকি মানুষ পর্যন্ত মেরে ফেলছে নেশার টাকার জন্য।
তুই বল! তুই ওনাকে মেরে ভালো করেছিস না?
তুই শুধু তোর প্রতিশোধ নিয়েছিস এই দেশের অনেক মানুষের জীবন বাঁচিয়েছিস।
রাহি তাকিয়ে থাকে মেহরিনের দিকে, শুধু রাহি নয় সবাই মুগ্ধ হয়ে মেহরিনের কথা শুনছিল।
কি সুন্দর একটা উদাহরণ দিয়ে বুঝালো রাহিকে।
রাহির পাগলামি কমে গেলো, হেঁকছি তুলতে তুলতে রাহি বললো, কিন্তু কেউ যদি বলে দেই আমি খু’ন করেছি তাহলে তো আমায় পুলিশ ধরে নিয়ে যাবে।
রাহির এমন কথায় সবাই হাসে।
মেহরিন হেসে বললো, দূর পাগল কিছু হবে না, কে বলবে বলতো? আর বাংলাদেশে আইন বিভাগ এখন টাকার ওপর চলে। ওদের এখন আর মনসত্ত্ব নেই, কয়টা টাকা পেলে নির্দোষকে দোষী আর দোষীকে নির্দোষ বানিয়ে দেয়। আর তার থেকেও বড় কথা পুলিশ কাছে প্রমাণ লাগবে যে খু’নটা তুই করেছিস সেই প্রমাণ বা সাক্ষী কোথায় বলতো।
রাহি বললো, তোমরা সবাই তো দেখেছো।
মেহরিন হাসলো হাসতে হাসতে বললো, কেউ কি কিছু দেখেছো? সবাই একসঙ্গে বললো, এমদমই নাা।
রাহি হাসলো। রাহি কে হাসতে দেখে বাকি সবাই ও হাসলো।
রাহি হাসতে হাসতে বললো, সব কয়টা ড্রামা বাজ।
মেহরিন রাহির চিবুকে হাত রেখে বললো, আর তুই আমাদের ড্রামা কুইন।
রাহি হেসে হঠাৎ চিন্তিত হয়ে বললো, তোরা তো কাউকে কিছু বলবি না কারণ? তোরা সবাই আমার কিন্তু ওই শয়তানের চাওয়াল যদি বলে দেই।
সায়েম রহমানের দিকে আঙুল তোলে কথা টা বললো রাহি,রাহির কথা সবাই চায় ওদিকে।
সায়েম রহমান রাহির কথা শোনার আগে সে চেঁচিয়ে উঠলো, না না না আমি কিছু দেখি নাই। সত্যি বলছি আমি কিছুই দেখি নাই। রেদওয়ান তালুকদার নামের কাউকে তো আমি চিনি না।
তারপর মাথায় হাত দিয়ে বলতে লাগলো, আল্লাহ আমি কে? আমার নাম কি? বাপের নাম কি? আম্মা গো!! আমি কিছু মনে করতে পারছি না- কি হলো আমার? আমি কে? আমার নাম কি? বাবা মা কে?
নিজের জীবন বাঁচাতে নাটক শুরু করলো সায়েম রহমান।
আর বাকি সবাই সায়েম রহমানের এসব দেখে হাহু করে হাসে ফেলে।
মেহরিন বাঁকহাসি দিয়ে বললো,
চিন্তা করিস সোনা, কাকুকে খুব তাড়াতাড়ি তার চিরস্থায়ী ঘরে পাঠিয়ে দিবো।
মেহরিনের কথা শুনেই সবাই হাসে উঠলো, শুধু সায়েম রহমানের মুখটা কাপসে গেলো। রুপা বেগম তা লক্ষ্য করল,বাঁকা হাসতে হাসতে ডাকে,
লাবিব..! মায়ের মুখে নিজের নাম শোনে কাছে এসে দাঁড়ায় লাবিব। লাবিবকে ডেকে এবার রুপা বেগম রাজকে ডাকল। রাজও গিয়ে দাঁড়ালো রুপা বেগমের পাশে। রাজ আর লাবিব একে অপরের দিকে দিকে তাকালো, আবার রুপা বেগমের দিকে।
রুপা বেগম বলল,
লাইফে তো বিনোদনের ও খেলা-ধুলার দরকার আছে, তাই না?
এমন একটা সময়ে রুপা বেগমের মুখে বিনোদন আর খেলা-ধুলার কথা যেন কারো হজম হল না। শুধু মেহরিনের মুখে দেখা দিলো একটা রহস্যময় হাসি। তার একটাই কারণ — এই দুই বছরে রুপা বেগমের সঙ্গে মেহরিনের একটা অন্যরকম সম্পর্ক গড়ে উঠেছে, যাকে বলে ‘অতিথিক সম্পর্ক’। এমন অনেক ঘটনা ও ঘটেছে। যেমন একদিন এমনই হয়েছিল, মেহরিন রুপা বেগমকে একটা কথা বলতে গেল, রুপা বেগম মেহরিনকে দেখেই বলল, বৌমা, তুমিই তো এটা বলতে চেয়েছো?
সেদিন মেহরিন খুব অবাক হয়েছিল। ঠিক তেমনি একদিন রুপা বেগম মেহরিনকে একটা কথা বলতে এসেছিল, মেহরিন বলেই ফেলল, মামনি আপনি কী এটা বলতে চান?
আসলে এমন কিছু কিছু মানুষ আমাদের জীবনে থাকে, যাদের আমরা ফিল করতে পারি, তারা আমাদের কাছে খোলা বইয়ের মতো। তাদের সম্পর্ক এমন হয় যে, একজন অপরজনের মন পড়তে পারে। ঠিক তেমনি একটা সম্পর্ক মেহরিন আর রুপা বেগমের মধ্যে। তারা শাশুড়ি-বৌমা হলেও তাদের সম্পর্ক বন্ধুর মতো। মেহরিনের কাছে চুমকির যেমন রুপা বেগম ও তেমনই।
এগুলেই ভাবে হাসছিলো মেহরিন। এমন সময় সাবিহা তালুকদার উঠে বলল,
কি বলছিস এসব রুপু? তোর কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে? এমন একটা অবস্থায় দাঁড়িয়ে তুই গেম আর বিনোদনের কথা বলছিস?
রুপা বেগম সাবিহা তালুকদারকে এক হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে ধরে বলল,
আরে বেডি, একটু আপডেট হো। সবাই যা করে আমরা কেন তা করবো বল তো?আমদের জীবন কী বাকি সবার মত? দেখ আমরা যে সময়টা পার করেছি বা যা যা ফেস করেছি, যে পরিস্থিতির ওপর দিয়ে গেছি তা আর ১০ জন যায়নি। তো আমরা সবার থেকে আলাদা।
সবার দিকে ফিরে আবার বলে,
কী বলো বাচ্চারা ঠিক বলেছিতো?
সবাই একসাথে বলে উঠল, ঠিক।
রুপা বেগম হাসল, হাসতে হাসতে বলল,
দেখলি তো?
রিদ ব্রু কুঁচকে বলে,
তুমি মাথায় কি আছে-বলে ফেলে তো মামনি
রুপা বেগম হাসতে হাসতে বলল,
বাচ্চারা সবাই একসাথে হও।
রুপা বেগমের কথামতো সবাই একসাথে হয়ে দাঁড়ালো। বাচ্চারা মানে রাজ, মেহরিন, রিদ, মেহের, শান্ত, মেহবুবা, লাবিব, লামিয়া, আরফা, আর রাহি — সবার চোখে কৌতূহল ঝরছে।
রুপা বেগম বলল,
আচ্ছা, তোমরা লাস্ট কখন খেলাধুলা করেছো বাচ্চারা?
সবাই একসাথে বলল, অনেক দিন আগে।
রুপা বেগম বলল,
তাই আমি সবাইকে আজ একটা গেম খেলার সুযোগ দিবো, তোমরা খেলবে তো?
সামনে লাশ,আরেকজন রক্তাক্ত অবস্থায় কেউ পড়ে আছে, আর ওরা নাকি খেলাধুলার কথা বলছে? এগুলো কী সাধারণ মানুষের মধ্যে পড়ে? এসবই মনে মনে ভাবছে সায়েম রহমান, মনে মনে আরও বলে, এরা কেউ সুস্থ মানুষ নয়, সবগুলই পাগল। হে আল্লাহ আমাকে বাঁচাও। এবার যদি বেঁচে ফিরতে পারি? আর কোনো দিন এদেশ মুখো হবো না।
কিন্তু আফসোস, বেচারা সায়েম রহমান জানেই না! গেমের নামে বলির পাঠা যে সে হবে।
হঠাৎ মেহরিন বলল, মামনি, গেমটা ইন্টারেস্টিং তো?
রুপা বেগম একবার সায়েম রহমানের দিকে তাকিয়ে আবার বাঁকা হেসে বলল,
অবশ্যই এটা এমন একটা গেম, যাতে মনও ভর্বে, বিনোদনও পাবে।
তবে একটা কথা?
সবাই একসাথে বলে, কী??
রুপা বেগম বলল, এটা সাহসীদের জন্য, ভিতুরা পারবে না।
এই কথা শুনে সবার মধ্যে একটা জোস চলে আসে। সবাই একসাথে বলল, আমরা রেডি।
রুপা বেগমের পাশে বোকার মতো তার দিকে তাকিয়ে থাকা সাবিহা তালুকদারের দিকে তাকিয়ে হেসে বলল
তুই খেলবি না, সাবু?
সাবিহা তালুকদার আস্তে আস্তে গিয়ে সোফায় বসে বলল,
আমি খেলাধুলায় নেই, আর আমার এখন সেই বয়সও নেই। বাচ্চারা খেলুক আমি দেখবো।
রুপা বেগম ব্রু কুঁচকে বলল,
তুই যা বললি মনে রাখিস! পরে যেন আফসোস করিস না।
সাবিহা তালুকদার, রুপা বেগমের কথায় পাত্তা দিলো না।
রুপা বেগম সবার দিকে তাকিয়ে বলল,
তোমরা একটু ওয়েট করো, আমি আসছি। আর হে রিদ, রাজ, তোমরা সামুকে একটা চেয়ারের সঙ্গে বেঁধে ফেলো। কোনো প্রশ্ন ছাড়াই, কোনো কারণ না জেনেই তারা রুপা বেগমের কথামতো সায়েম রহমানকে একটা চেয়ারে বেঁধে ফেলল রাজ আর রিদ।
এতক্ষনে রুপা বেগম চলে আসে। একটা বক্স হাতে নিয়ে, সবাই কৌতূহল নিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। রুপা বেগম বক্সটা সবার সামনে রাখলো টেবিলের উপর। বক্স খুলতেই সবাই একটু চমকে উঠে। কারণ বক্স ভর্তি ছিল ছুরি!
রুপা বেগম বলল,
চিল্ল করো বাচ্চারা, খেলা তো এর সাহায্যেই হবে।
এ কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে রাজ আর লাবিব বাকাঁ হাসল আর রুপা বেগম বলল,
তো এবার খেলার নিয়মটা বলি কেমন?
সবাই মাথা নাড়ল।
রুপা বেগম বলল,
সিম্পল বিষয়, তোমাদের চোখ বাধাঁ হবে। আর তারপর তোমরা এই বক্স থেকে চুরি তুলে সামনে বসা জেনোয়ার শরীরে মারবে। যে ঠিকঠাক মারতে পারবে সে জিতবে।
এই কথা সবার কাছে সহজ হলেও সায়েম রহমানের কাছে ভয়ানক। সে কথা বলতেই যেন ভুলে যায়। তাকে গেমের সামগ্রী বানিয়ে উপরে পাঠানোর প্ল্যান করেছে রুপা বেগম, যেটা ওনি খুব ভালোই বুঝতে পারছেন।
নিজের জীবন সংকটে বুঝতে পেরে, সায়েম রহমান হাও মাও করে কান্না শুরু করে দেয় আর বলতে থাকে,
ও রুপু, ও সবু… আমাকে ছেড়ে দে রে, আমি আর কোনো দিন দেশের মুখো দেখবো না।
সাবিহা তালুকদার তেরে যেতে চায় কিন্তু মেহের হাসতে হাসতে ধরে ফেলে।
সাবিহা তালুকদার বলে,
আর একবার সবু বললে তোমার জিহ্বা আমি গরম পানিতে দিয়ে সিধো করে দেব, বি*য়াদপ।
মেহরিন হাসলো,
বাহ্ আন্টি বুদ্ধিতা তো সেই! আগে আমরা মামোনির তৈরি করা খেলা খেলি, তার পর আপনার ইচ্ছাও পরণ হবে।
মেহরিনের এমন কথা শুনে আরফা আর সাবিহা তালুকদার দু’জনেই ঢুক গিলে।
সাবিহা তালুকদার করুণ চোখে তাকায় রুপা বেগমের দিকে,
এটা কি বৌমা পেলি রে?
রুপা বেগম স্বচ্ছন্দ হাসলো,
আরে বন্ধুবি, চিল, এটা আমার বেটার বউ।এমন না হলে চলে? শুধু আমার বৌমা না, তোর বৌমাও কিন্তু কম যায় না।
এই কথা শুনে সাবিহা তালুকদার চমকে তাকালো মেহেরের দিকে। মেহের শাশুড়িকে তার দিকে তাকাতে দেখে বাকাঁ হাসে।
সাবিহা তালুকদার ঢুক গিলে মাথা নেড়ে জিজ্ঞেস করলো,
রুপা বেগম যা বলল তা ঠিক কি না?
মেহের ও মাথা নাড়িয়ে উত্তর দিলো, হ্যাঁ।
সাবিহা তালুকদারের মাথা ঘুরে যাওয়ার মতো উপক্রম।
যে মহিলা স্বামীকে খু’ন হতে দেখে পলিত মেয়ের হাতে, তাতে তার কিছু হলো না—এদিকে ছেলের বউ ভয়ংকর, বৌমা এমন ডেঞ্জারাস শুনেই মাথা ঘুরে যাচ্ছে। হয়তো কারণ—দুইটা ব্যাপার ভিন্ন ছিল। রেদওয়ান তালুকদার ভালো মানুষ হলে হয়তো এমন টা হতো না, আর হলেও সয্য করতে পারতেন না, কিন্তু সে তো মানুষই না। আর মেহেরের ব্যাপারটা ভিন্ন কারণ রিদ সারা জীবন তার বউয়ের সঙ্গে থাকবে। তার একটা মাত্র ছেলে। তার ফিউচারের ব্যাপারে চিন্তিত হয় সাবিহা তালুকদার।
সাবিহা তালুকদার কে এমন করতে দেখে রুপা বেগম হাসতে হাসতে মেহবুবার কাছে গিয়ে- মেহবুবার কাঁধে হাত রেখে বলল,
তোর মনে পড়ে রিদরের বিয়ে’য়ের কয়দিন আগে রেদু হাসপাতালের ভর্তি ছিল।
সাবিহা তালুকদার মাথা নাড়লো।
রুপা বেগম গর্ব করে বলল,
সেটা কোনো এক্সিডেন্ট ছিল না, আমার বৌমা মানে মেহবুবা মেরেছিলো।তাও কী করেছিলো জানিস? একদম বুকে ছুরি গেঁথে দিয়ে ছিলো।
সাবিহা তালুকদার যেন আকাশ থেকে পড়ে ভূত দেখার মতো মেহবুবার দিকে তাকালো।
মেহবুবাও সঙ্গে সঙ্গে দাঁত বের করে হাসলো,
যা দেখে সবাই হাসলো।
সাবিহা তালুকদার বলল,
বিয়াই সাহেব কি মেয়ে জন্ম দিলো, রে? কারো থেকে কেউ কম না, এক একটা পুরাই বোম..!
সাবিহা তালুকদারের কথায় আবার সবাই হাসলো উঠে।
সাবিহা নিজেও হাসলো ফেলে।
রুপা বেগম বলল,
চল, তাহলে বাচ্চারা শুরু করো।
সবাই খেলায় নামে। শুধু শান্ত আর আরফা বাদে, তারা এক কোনে দাড়িয়ে থাকে।
লাইফ অ্যাকশন মুভি দেখার প্রথম সুযোগ হলো তাদের।
প্রথমেই সুযোগ পেলো লাবিব চোখ বেঁধে দিলো তার রাজ। লাবিব ছুরি মারতেই যাচ্ছে এমন সময় মেহরিন বললো,
ওয়েট, দেবরজী! ফিল আসছে না, একটা মিউজিক দরকার, তা না হলে জমবে না।
মেহরিনের কথা শুনে রাজ উঠে বললো,
উফ বউজান!তুমি এতে বুঝো কেমনে? একদম মনমতো কথা।
মেহরিন হাসলো,
আমি তো পতি বক্তবউ, তাই পতির মনবাসনা বুঝি।
এই কথা শুনে রাজ বির বির করে বলল,
হ্যাঁ, সে তো সব বুঝো, শুধু আমার একটু বউ বউ পেলেই বুঝো না।
মেহরিন বললো,
কিছু বললেন?
রাজ হাসলো,
না না, কিছু না, কিছু না।
মেহরিন ওহ! বলে সাউন্ডবক্সটা ছেড়ে দিলো। আর তাতে একটা হিন্দি গান ‘হ্যান্ড জবাওয়ানি’ চালালো।
সেই গান চলতেই সবাই যেনো জস নিয়ে নাচছে, সবাই লিপসিং করছে আর নাচছে।
সাবিহা তালুকদার আর রুপা বেগম বসে আছে। শান্ত আর আরফা দাঁড়িয়ে আছে একটু দূরে।
শান্ত এসে বলল,
দেখলে ওদের নাকি মানুষ মারতেও মুড লাগে।সব কইটা সাইকো।
আরফা বললো,
যা বলেছ ভাইয়া।
নাচতে নাচতে এগিয়ে আসলো মেহরিন। তার নাচ দেখে মনে হচ্ছে না তার বাচ্চা হয়েছে আর আজ তাদের সাত দিন। সে দিব্বি নাচছে।
লাবিবের কাছে আছে মেহরিন বললো,
লেটস স্টার্ট, দেবরজী।
লাবিব ছুরিটা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে নাচছে, নাচতে নাচতে ছুরিটা ছুরে মারছে আর সেটা ঠিক গিয়ে লাগছে।সায়েম রহমান বুকের ডান পাশে চিৎকার করে উঠেসে গলগলিয়ে রক্ত ঝরে।
তবে তার চিৎকার কারো কান পর্যন্ত পৌঁছাচ্ছে না,কারন মেহবুবা গিয়ে সাউন্ড বাড়িয়ে দিয়েছে। যার দরুন ওরা একটু ও বিরক্ত হচ্ছে না, চিল মুডে গেম উপভোগ করছে।
লাবিবের পর রাহি আসে। রাহির চোখ বাদে রাজ।
রাহি তো আগেই উড়াধুরা, একটু নাচে। ওকে দেখে মনে হচ্ছে এখানে ছুরি মারার গেম নয়, ডান্স কম্পিটিশন চলছে।
নাচতে নাচতে হাতের ছুরিটা সাই করে ছুরে মারে আর সেটা গিয়ে ঠিক লাগে। সায়েম রহমান গলায় গলাগলি করে রক্ত ঝরে আবারও।
তারপর আসে লামিয়া, সে ও নাচতে নাচতে ছুরি মারে, সেটা গিয়ে লাগে সায়েম রহমানের বুকের বাম পাশে।
তারপর আসে রিদ, সে ছুরিটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ঠাস করে ছুরে মারে। চুরি সেটা ঠিক গিয়ে লাগে সায়েম রহমানের কপালের বাম পাশে।
তারপর আসে রাজ, রাজ ছুরি হাতে নিয়ে আগে ছুরি দিয়ে নিজের ঘাড় চুলকায়, আর একটু হেলে ডুলে নাচে। রাজ বরাবরই সুন্দর নাচে, সবাই রাজের নাচ দেখছে।
নাচতে নাচতে হঠাৎ করেই ছুরি মেরে দিলো রাজ, আর সেটা গিয়ে লাগলো একদম সায়েম রহমানের কপালের মাঝখানে।
সায়েম রহমানের শরীর থেকে প্রাণপাখি অনেক আগে বেরিয়ে গেছে, কিন্তু তা যেন মনোর তৃষ্ণা মিটে না।
রেদওয়ান তালুকদারের ক্ষেত্রে একটু খারাপ লাগা কাজ করলে ও সায়েম রহমানের ক্ষেত্রে কারো খারাপ লাগে না, উল্টো সবাই উপভোগ করেছে।
এখনো দুই রমনী বাকি। মেহরিন গিয়ে গানটা চেঞ্জ করেলো, এবার ও একটা হিন্দি গান,শিকি শিকি।
দুই বোন একসাথে খেলবে, তাই রাজ ও রিদ, মেহরিন আর মেহের চোখ বেঁধে দিলো। দুই বোন আগে নাচে শিকি শিকি গানে।
তারপর যখন গানটা শেষ হলো, সেই মুহূর্তেই একসাথে ছুরি মারলো। দুই বোন ঠিক সায়েম রহমানের দুই চোখে ছুরি মারলো।
গেম শেষ হলো আর সাথে রুপা বেগম উঠে বললো,
উফস্! তোমরা সবাই ফেল, আমার দুই বৌমা উইন, মেহরিন ও মেহের।
সবাই হাসলো উঠে।
মেহরিনের সপ্নরঙ পর্ব ৬৭
শত্রু যেন শেষ হয়েও হলো না।
যে শত্রুদের আমরা চিনি, তাদের তো মোকাবিলা করা যায়।
কিন্তু যে শত্রুকে আমরা চিনি না, তাকে কি আদৌ মোকাবিলা করা সম্ভব?
এই শত্রু বিনাশের মাধ্যমেই যেন শত্রুর অবসান ঘটে। আর কোনো কালো ছায়া যেন না নামে তাদের জীবনে।
ভালোই যাচ্ছে এখন দিন। নেই কোন কালো ছায়া, নেই দুঃখ, নেয় কোন কষ্ট, কোনো সুখের অভাব নেই, নেই কোনো চিন্তা, নেই কোনো শত্রুর ষড়যন্ত্র।
সবকিছু কাটছে শুধু সুখ আর শান্তিতে।
এভাবেই দেকতে দেখতে কেটে গেলো দুই মাস কেটে গেছে।
