মাঝরাতের রোদ্দুর পর্ব ৪৬
নওরিন কবির তিশা
—”বউ!”
ঘুমে জড়ানো এক ঘোরলাগা কন্ঠ নাহিয়ানের। যেন তাতে মিশে আছে আফিমের মা’দ’ক’তা। শিশির একটা শুকনো ঢোক গিলে নিজেকে ধাতস্থ করে মৃদু স্বরে বলল,,
—”হু!”
নাহিয়ান ফের একই কন্ঠে বলল,,
—”ও বউ!”
নাহিয়ানের এই ডাক যেন বারবার শিশিরকে ভেতর থেকে আকুল করে তুলছে। ব্যাকুল কণ্ঠে সে শুধালো,,
—”কি হয়েছে?”
নাহিয়ান:”শোনো না!”
শিশির:”বলুন!”
নাহিয়ান:”আমার না..!”
শিশির:”হুম..!”
নাহিয়ান:”ভীষণ…”
শিশির:”হুম..!”
নাহিয়ান:”বউ বউ পাচ্ছে!”
নাহিয়ানের এহেন কথাবার্তায় লজ্জায় লতানো চারা গাছের ন্যায় নুইয়ে পড়ল শিশির। ফর্সা মুখশ্রীতে সদ্য ফোঁটা কৃষ্ণচূড়ার লাল আভা ছড়িয়ে পড়ল। কন্ঠ দিয়ে কোনো শব্দ বের হলো না তার। নাহিয়ান ফোনের ওইপাশ থেকে মুচকি হেসে বলল,,
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
—”কি করব? ঘড়ির কাটায় রাত তিনটা, নিস্তব্ধ ঘর, অন্ধকার রাত,ঝিরিঝিরি বৃষ্টি হচ্ছে, ঠান্ডা আবহাওয়া! উফফস পুরাই পারফেক্ট রোমান্টিক ওয়েদার ! কিন্তু পাশে বউটা নেই বলে…”
আর কিছু বলতে পারল না সে শিশির এই পাশ থেকে সামান্য চিৎকার করে বলল,,,
—”চুপ করুন অসভ্য লোক কোথাকার!”
নাহিয়ান মুচকি হেসে বলল,,
—”আমাকে অসভ্য কে করেছে হ্যাঁ শুনি?”
শিশির:”তা আমি কি জানি?”
নাহিয়ান:”সেটা তো ঠিক ম্যাম!আপনি কিভাবে জানবেন আমাকে অসভ্য করেছে এক মহিয়সীনি যে আমার শার্ট চুরি করে এনে পরছে”
শিশির কোনো কথা বলতে পারলে না। সেইতো নাহিয়ানের বাসা থেকে দুইটা শার্ট চুরি করে এনেছে। আসলে সেদিন নওরিফা খানমের সাথে কথা বলা শেষে যখন সে নিজের রুমের দিকে আসছিল তখন নাহিয়ানের রুমের দরজা খোলা দেখে একবার রুমে উঁকি দিলো সে। তার মনে পড়ে গেল প্রথম সেদিনের কথা যেদিন সে নক না করে নাহিয়ানের রুমে ঢুকে পড়েছিল। নাহিয়ান এর সাথে কাটানো প্রতিটি মুহূর্ত তার স্মৃতির পাতায় এসে ধরা দিল।
শিশির মুচকি হেসে রুমে প্রবেশ করল। ড্রেসিং টেবিলের বড় আয়নার ঠিক বাঁ পাশে নাহিয়ান এর একটা বড় ছবি পুরো টানানো ব্ল্যাক কালার লেদার শার্ট পরনে নিউইয়র্কের ব্রুকলিন ব্রীজের পাশে সন্ধ্যার আকাশের দিকে অন্যরকম ভঙ্গিমায় তাকিয়ে আছে সে। চারপাশে ছোট ছোট স্ট্রিং লাইটের উজ্জ্বল নিভু নিভু আলো। শিশির একদৃষ্টে মুগ্ধ নয়নে চেয়ে থাকল সেই দিকে। অতিবাহিত হলো মুহূর্ত খানেক।
হঠাৎ তার চোখ গেল আলমারিটার দিকে। আলমারির কপাটে হাত দিতেই খুলে গেল সেটি। শিশিরের সামনে দৃশ্যমান হলো এক কালো শার্টের পাহাড়, প্রত্যেকটা হ্যাঙ্গারে কালো শার্ট, কাভার্ড খুললো সে প্রত্যেকটা কাবার্ডেও কালো শার্ট শিশির বিস্ময়ের চূড়ান্তসীমায় দাঁড়িয়ে অবাক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকলো। একটা মানুষের এতগুলো ব্ল্যাক শার্ট!
হঠাৎ একটি দুষ্ট বুদ্ধি খেলে গেল তার মস্তিষ্কে। সেখান থেকে দুইটা শার্ট সকলের অগোচরে সে নিজের কাছে বন্দী রাখল সে। মাঝে মাঝেই সেই শার্ট দুটো সে নিজের শরীরে জড়ায়, যেন মনে হয় নাহিয়ান তার শরীরকে জড়িয়ে আছে, এক অদ্ভুত রকম অনুভূতি অনুভব হয় তার। কিন্তু নাহিয়ান একথা কি করে জানলো? শিশির অবাক কন্ঠে কিছু প্রশ্ন করতে যাওয়ার আগেই নাহিয়ান বলল,,
—”আপনার প্রত্যেকটা পদক্ষেপই আমার দৃষ্টিগত মিসেস নাহিয়ান চৌধুরী! এমনকি আপনার হৃদয়ে কখন কি চলছে তার আপডেটও আমার কাছে থাকে!কিন্তু সে যাই হোক এটা অবিচার হলো না?”
শিশির:”কিসের অবিচার?”
নাহিয়ান:”শার্টের মালিক হয়েও আপনাকে কখনো আমি সেভাবে ছুঁতে পারিনি সেখানে সামান্য একটা শার্ট আপনাকে কি গভীরভাবে ছুঁচ্ছে আমার কি তার উপর হিংসা করা উচিত নয় ম্যাম?”
শিশির অবাক হয়ে বলল,,
—”শার্ট কে কেউ আবার হিংসা করে নাকি?”
নাহিয়ান:”যেখানে আমার একান্ত ব্যক্তিগত আপনিটাকে ছোঁয়া বাতাসকেও আমি হিংসা করি সেখানে শার্ট মানে তো আমার কাছে অনেক কিছু ম্যাম!”
শিশির নিশ্চুপ। একটা মানুষ তার জন্য এতটা পাগল! তাও যে কিনা তার হালাল পুরুষ, তার ব্যক্তিগত পুরুষটি, যার চোখের কৃষ্ণগহব্বরে শিশির হারিয়ে যায় বারংবার, সেই লোকটিই তার জন্য উন্মাদ ভেবেও তার ভিতরে আনন্দের ঢেউয়েরা দোলা দিয়ে যাচ্ছে।
শ্রাবণের দ্বিপ্রহরে সূর্য যেন তার সমস্ত প্রখরতা উজাড় করে দিয়েছে। আকাশে মেঘের আনাগোনা থাকা সত্ত্বেও রৌদ্র কিরণ অবলীলায় যেন তপ্ত শলাকার মতো বিঁধছে। বাতাস স্তব্ধ, প্রকৃতিতে এক নিস্তব্ধ তপ্ততা, শুধু মনে হয় যেন উন্মত্ত গ্রীষ্মের কোনো উষ্ণ দীর্ঘশ্বাস রয়ে গেছে।
গাড়ি ছুটছে আপন গতিতে, নিজ মনে দক্ষ হাতে ড্রাইভ করছে নির্ঝর,তার পরনে ক্যাজুয়াল স্লিভ অফ হোয়াইট কালার শার্টের সাথে ব্ল্যাক কালার জিন্স। তার ঠিক পাশের সিটেই বসে আছে ফারিন। ফারিনের পরনে লেভেন্ডার কালার লং ফ্রকের সাথে ওয়াইট কালার লেগিন্স।
দুই কপোত-কপতী মিলে বেরিয়েছে ঘোরাঘুরির উদ্দেশ্যে। তবে এটা একেবারে অনাকাঙ্ক্ষিত। দুজনের কেউই চাইনি এক প্রকার জোড়াজড়িতে বাধ্য হয়ে দুজনকে বের হতে হয়েছে। আজ আগস্টের ১২ তারিখ বাংলা বর্ষ পঞ্জিকা অনুসারে শ্রাবণ মাসের ২৭ তম দিন। তবে দিনটা একটু বেশি বিশেষ আজকে ফারিনের ১৮ তম জন্মদিন।
আজ অষ্টাদশী হলো সে, আর তাদের পরীক্ষাও শেষ হয়ে গেছে আরো দুই দিন আগে তাই হাসনা খান একপ্রকার জোর করে তাকে আর নির্ঝরকে পাঠিয়েছে ঘোরাঘুরি করার জন্য। কিন্তু বর্তমানে গাড়ির ভেতর দুজনই নিশ্চুপ।ফারিন আলাপচারিতা বাড়াবে সে সুযোগও নেই। নির্ঝর সেই কখন থেকে একমনে ড্রাইভ করেই চলেছে,গতিবিধির কোনো নড়চড় নেই।
ফারিন মনে মনে হাজারটা গালি দিয়ে সাইড ব্যাগ থেকে সেল ফোনটা হাতে নিতেই এক অপরিচিত নাম্বার থেকে ফোন আসলো। ভ্রু দুটি কিঞ্চিত কুঁচকে ফোনটি রিসিভ করল সে।সঙ্গে সঙ্গে ওই পাশ থেকে ভেসে আসল একটা পরিচিত কণ্ঠস্বর,,
—”Happy birthday janu Many many happy returns of the! Sorry for the late wish! Actually আমার আজকে ডেটটা নোটিশ করি নি!”
পরিচিত কন্ঠস্বর কর্নকুহরে পৌঁছাতেই মুখে হাসির ঝিলিক ফুটে উঠল ফারিনের।হাসির রেখাটা সামান্য প্রশস্ত করে সে বলল,,
—”It’s ok baby!”
সঙ্গে সঙ্গে ওই পাশ থেকে একই কন্ঠস্বর,,
—”That’s why I love you janu.Love you so much”
ফারিন:”Love you too Jan!”
এতক্ষণ স্বাভাবিক গতিতে গাড়ি চালালেও হঠাৎই সজোরে ব্রেক কষলো নির্ঝর।ফারিন হুমড়ি খেয়ে পড়ে যেতে গিয়েও নিজেকে সামলে নিল।তবে গতি হারাল তার ফোনটা,সেটি নিচে পড়ে সামনের গেরিলা গ্লাস ভেঙ্গে খানখান হয়ে গেল।ফারিন অসহায় দৃষ্টিতে সেদিকে তাকিয়ে পরক্ষণেই রাগী দৃষ্টিতে নির্ঝরের দিকে তাকিয়ে বলল,,
—”এটা কি করলেন?”
নির্ঝর ভাবলেশহীন ভাবে বলল,,
—”গাড়ি থেকে নামো!এসে গেছি!”
ফারিন একবার বাহিরে তাকাল।সেখানে দৃশ্যমান খুলনার সুপরিচিত হাদিস পার্ক।বাইরেটা সবুজ-শ্যামল প্রকৃতিতে ঘেরা।তবে তা দেখে আশানুরূপ খুশি হতে পারল না ফারিন।সে নির্ঝরের দিকে কঠোর দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,,
—”সেটা আমিও দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু আপনি এতো জোরে ব্রেক করলেন কেন?আমার ফোনটা..!”
নির্ঝর:”তোমার সাথে এইসব অবাঞ্ছিত বিষয় নিয়ে গসিপ করার টাইম একদমই নাই আমার।তাই যদি চাও নামো নাহলে ঠিক হয়ে বসো ব্যাক কবর!”
ফারিন আর কোনো কথা না বলে গাড়ি থেকে নামলো, মিনিটের মধ্যেই নির্ঝর ও গাড়ি থেকে নেমে দুইজন রওনা দিল হাদিস পার্কের উদ্দেশ্যে,মেইন গেট পেরিয়ে ভিতরে ঢুকতেই প্রথমেই নজরে আসলো সামনের সবুজ শ্যামলীতো রাস্তার দুই ধারে বৃষ্টিস্নাত বাগান বিলাস গাছগুলো। বৃষ্টির পানি এখনো টুপটাপ গড়িয়ে পড়ছে ফুলগুলো দিয়ে।
সামনেই বিশাল ঝাউগাছগুলো মাথা তুলে দাঁড়িয়ে,মাঝখানে খোলা ময়দান, দুই কপত-কপতি মিলে পার্কের ভেতর দিয়ে হাঁটতে লাগলো,চারপাশে ছড়ানো আছে সোনালি অ্যালম, শিরীষ, কৃষ্ণচূড়া আর ঝুমিয়ে পড়া কাঁঠালিচাঁপা।ভেজা মাটির গন্ধে মিশে আছে এক অপূর্ব স্নিগ্ধতা। হঠাৎই ফারিন এর দৃষ্টিগত হল সামনের বেঞ্চে বসা একটা মেয়ের দিকে তার পরনে গ্রে কালার সাটিন শাড়ি , মুহূর্ত কয়েকের মধ্যে সাদা পাঞ্জাবি পরা একটা ছেলে হাতে বিভিন্ন রঙের একগুচ্ছ গোলাপের তোড়া এনে মেয়েটির সামনে হাঁটু গেড়ে বসে তাকে প্রপোজ করলো।
দৃশ্যটা বেশ মনে ধরল ফারিনের। তার মনে হলো নির্ঝরও যদি তাকে….!না আর কিছু ভাবলো না সে। মনে এসব উল্টাপাল্টা আবদারেরা ইদানিং একটু বেশিই জ্বালাতন করে! কিন্তু এটাও তো ঠিক হাসবেন্ড হিসেবে নির্ঝরের দায়িত্বের ভেতরে এটা পড়ে। স্ত্রীকে প্রতিদিন অন্তত একটা গোলাপ ফুল এনে দেওয়া ,অন্ততপক্ষে ফারিন তো এটাই কল্পনা করতো। কিন্তু কল্পনা বাস্তবতার ভিতর আকাশ-পাতাল তফাৎ। নির্ঝরের কাছ থেকে গোলাপ আশা করা আর উত্তর দিগন্তে সূর্যি মামার দেখা পাওয়া একই কথা!
ফারিন যখন এ সকল চিন্তায় নিমগ্ন। হঠাৎ পিছন থেকে নির্ঝর বলেন,,
—”এখানেই দাঁড়িয়ে থাকবে? নাকি যাবে সামনের দিকে!”
ফারিন তার দিকে ফিরে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,,
—”দেখছেন না সামনে কি সুন্দর একটা দৃশ্য!”
নির্ঝর:”কোথায়? আমি তো কিছু দেখছি না!”
ফারিন:”তা দেখবেন কি করে বেডা আনরোমান্টিক!”
আনরোমান্টিক কথাটা অনেক আস্তে বলল ফারিন। যার দরুন নির্ঝর কথাটা বুঝতে পারল না ভ্রুদ্বয় কিঞ্চিত কুঁচকে সে বলল,,
—”কি বললে?”
ফারিন:”কিছু না, চলুন কোথায় যাবেন!”
তারা দুইজন সামনের একটা বেঞ্চের উদ্দেশ্যে পা বাড়ালো। চলতি পথে ফারিন বলল,,
—”স্যার!”
নির্ঝর:”হু!”
ফারিন:”কিছু না মনে করলে একটা কথা জিজ্ঞাসা করি?”
নির্ঝর ফারিনের দিকে সন্দিহান দৃষ্টিতে চেয়ে বলল,,
—”কি কথা?”
ফারিন:”আপনি এর আগে কখনো এখানে এসেছেন?”
নির্ঝর:”কেন আসবো?”
ফারিন:”এই যেমন আজকে আমাকে নিয়ে এসেছেন এর আগে কখনো অন্য কাউকে নিয়ে আসেন নি?”
নির্ঝর:”অন্য আর কাকে নিয়ে আসব?”
ফারিন মনে মনে স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়লো। তার মানে নির্ঝরের এর আগে কোন গার্লফ্রেন্ড ছিল না আহ শান্তি! তবুও একবার নির্ঝরকে বাজিয়ে দেখার জন্য বলল,,
—”না মানে গার্লফ্রেন্ড বা এই টাইপের কিছু!”
সঙ্গে সঙ্গে নির্ঝর রেগে গিয়ে বলল,,
—”ফালতু কথা বলা শেষ হলে, চুপ থাকো। ওসব আউল ফাউল কাজকর্মের সময় ছিলো না আমার কাছে!”
ফারিন ফিসফিসিয়ে বলল,,
—”আজকে বুঝলাম এই বেডা কেন এত আনরোমান্টিক!”
কথা বলতে বলতে দুইজন গিয়ে একটা বেঞ্চে বসলো।ঠিক তখনই একজোড়া প্রেমযুগল তাদের বিপরীত দিকের ঠিক সামনের বেঞ্চটাতেই বসে ছিল। হঠাৎই ছেলেটি মেয়েটির মাথায় আলতোভাবে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে নিজের কাঁধে মেয়েটির মাথা রাখলো। তা দেখে ফারিনেরও ভীষণ ইচ্ছা করলে নিজেদের কাঁধে মাথাটা রাখার কিন্তু নির্ঝরের দিকে তাকাতেই পরক্ষণেই তার ইচ্ছার আশা উড়ে গেল নির্ঝর একবার ছেলে মেয়েটির দিকে তাকিয়েই পরক্ষনে চোখ মুখ এমনভাবে কুচকালো মনে হল কোন অদ্ভুত জিনিস ঘটে গেছে তার সামনে। ফারিন তা দেখে মনে মনে বলল,,
—”সোনা পাখি ইচ্ছা গুলো! তোমাদের ক’ব’র কি আমি খুরবো নাকি নিজেইরাই স্বইচ্ছাতে ক’ব’রে শায়িত হবে সোনারা! কারণ মোর বাপ-মা মোরে এমন একজনের সাথে বিয়া দিছে সে যদি জানতে পারে আমার মনে তোমরা আছো তাহলে তোমাদের আগে আমাকে ক’ব’র দিবে!”
গোধূলি লগ্নে পশ্চিম দিগন্ত রক্তিম বর্ণ ধারণ করে আছে,যেন কেউ সেখানে ছড়িয়ে দিয়েছে লাল আবির, শ্রাবণ মাস হওয়ায় সারাদিন বেশ বৃষ্টিপাত হয়েছে, তাই আকাশে আবছা রামধনুর দেখা মিলেছে, বৃষ্টিটা বিকাল থেকে বেশ কমে এসেছে, সারা বিকেল ঢাকার বিভিন্ন জায়গা ঘোরাঘুরির পর বর্তমানে রিদিতের গাড়ি চলছে আনায়াদের বাড়ির উদ্দেশ্যে, গাড়ির রেডিও সিস্টেমে বাজছে মৃদু মিউজিক। সেটা অফ করে দিয়ে আনায়া বলল,,
—”মিস্টার রিদিত এসব ফালতু মিউজিকের থেকে আপনিই সুন্দর গান করেন!”
রিদিত ড্রাইভ করতে করতে তার দিকে ফিরে চোখ সরু করে মুচকি হেসে বলল,,
—”তাই নাকি?”
আনায়া:”হুম!”
রিদিত:”তাহলে তো একটা গান গাইতেই হচ্ছে!”
আনায়া মৃদু হেসে বলল,,
—”তা গাইলে মন্দ হয় না!”
রিদিত তার কথায় একগাল হাসলো, তারপর গলা খাকারী দিয়ে গেয়ে উঠলো,,
🎶তুমি তুমি তুমি শুধু এই মনের…
আনাচে-কানাচে….
সত্যি বলো না…
কেউ কি প্রেমহীনা কখনো বাঁচে…🎶
আনায়া রিদিত গান শুনে মাথা নিচু করে মুচকি হাসলো। কিছুক্ষণ পর সামনে তাকিয়ে এসে দেখলো তার বাড়ির প্রায় কাছাকাছি চলে এসেছে রিদিত। উত্তেজিত কন্ঠে সে বলল,,
—”থামুন থামুন চলে এসেছি তো! আর কতদূর যাবেন এরপরে তো…”
তাকে থামিয়ে দিয়ে রিদিত বললো,,
—”কেন আমি আমার শ্বশুর বাড়ি যেতে পারি না? বিয়ের আগেই এই অবস্থা বিয়ের পরে কি হবে?”
আনায়া:”এরকম কিছু না, কিন্তু এখনো তো আমি আমার বাবা মাকে কিছু বলিনি এই ব্যাপারে! আর তাছাড়া আপনার বাবা মাও..”
রিদিত:”আমার বাবা-মার কথা বাদ দাও আগে বলো শ্বশুর আব্বা শাশুড়ি আম্মা রাজি হবে কিনা?”
আনায়া কিছু বলল না কারণ সে খুব ভালো করেই জানে এই মুহূর্তে সে যদি নিজের বিয়ের কথা বলে তাহলে তার বাবা-মা এক পায়ে খাড়া! কিন্তু তার চিন্তা রিদিতের বাবা মাকে নিয়ে, তারা নিশ্চয়ই নিজের একমাত্র ছেলের বিয়ে কোন বড়লোক পরিবারের মেয়ের সাথেই দিতে চাইবে খামোখা আনোয়ার মত একটা মেয়ের সাথে কেনই বা তাদের একমাত্র ছেলের বিয়ে দিতে যাবে। হাজার হলেও তারা দেশের নামকরা ব্যবসায়ী সম্ভ্রান্ত পরিবার।
আনায়া যখন এসব চিন্তায় নিমগ্ন তখনই সে টের পায় রিদিতের গাড়ি তাদের মেইন গেটের সামনে এসে থেমেছে। কিছুটা সন্ধ্যা হয়ে আসায় গাড়ির হেডলাইটার আলো দিয়ে সরাসরি তাদের লোহার গেইটে পড়েছে। আনায়া কিছুটা প্রস্তুত হয়ে উঠলো। রিদিতকে সে বারণও করতে পারছে না আর এদিকে চিন্তাও হচ্ছে ভীষণ। হঠাৎই রিদিত গাড়ি থেকে নেমে তার দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল,,
—”আমি যতক্ষণ আছি ততক্ষণ তোমার কোনো চিন্তা না করলেও হবে মিসেস খান!”
আনায়া গাড়ি থেকে নেমে আসলো,রিদিত তার হাত শক্ত করে ধরে মেইন গেইট পেরিয়ে কলিং বেল চাপলো। কিছুক্ষণ পর দরজা খুলল আনায়ার বড় বোন ইনায়া। ইনায়াকে দেখে বেশ অবাক হলো আনায়া, ইনায়ার তো এখন আসার কথা না। সে যাই হো।তবে সবচেয়ে অবাক করা বিষয়টি হচ্ছে আনায়া আর রিদিতকে একসাথে দেখে একদমই অবাক হলো না ইনায়া। বরঞ্চ ইনায়ার হাজবেন্ড জাহিদ এসে কুশল বিনিময় করল রিদিতের সাথে।
আনায়া যখন বিশ্বের চরমসীমায় তখনই সেখানে উপস্থিত হলো শিশির। ইনায়া আর জাহিদ কে দেখে সে বলল,,
—”আরে আপু ভাইয়া ওদের যেতে তো দাও ভিতরে নাকি এখানেই দাঁড় করিয়ে রাখবে!”
তার কথা শুনে ইনায়া আর জাহিদ মুচকি হেসে বলল,,
—”না না একদমই না!”
তারপর ইনায়া আর শিশির আনায়াকে আর জাহিদ রিদিতকে নিয়ে ভিতরে প্রবেশ করলো। ঠিক তখনই ঘটলো একটি অন্যরকম বিস্ময়কর ঘটনা। ভেতরে ঢুকতেই আনায়ার দেখা হলো দুইজন বৃদ্ধ দম্পতির সাথে। আনায়া এক দেখায় চিনে ফেলল তাদের। দৌড়ে গিয়ে বৃদ্ধ তাদের সালাম দিয়ে বলল,,
—”আরে আঙ্কেল আন্টি আপনারা? কেমন আছেন আর এখন আঙ্কেলের শরীর ভালো তো?”
মধ্য বয়স্ক মহিলাটি দাঁড়িয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে বলল,,
—”আলহামদুলিল্লাহ আম্মু আমি সুস্থ তোমার কি অবস্থা?”
আনায়া একগাল হেসে বলল,,
—”আলহামদুলিল্লাহ আমিও ভালো আছি!”
এত কিছুর মধ্যে এসে খেয়ালই করল না তার পাশে দাঁড়িয়ে সবাই মিটিমিটি হাসছে। হঠাৎই শিশির বলল,,
—”তা আয়ু! শুনবি না এনারা কেন তোদের এখানে এসেছে?”
আনায়া জিজ্ঞাসুদৃষ্টিতে তার দিকে তাকালো। তা দেখে শিশির মুখ চেপে হেসে বলল,,
—”তাদের ছেলের সাথে তোর বিয়ের পাকা কথা ঠিক করতে!”
মুহূর্তেই আনায়া একবার রিদিতের দিকে তাকালো। তবে রিদিতের মনোভাব ঠিক বোঝা গেল না। মধ্যবয়স্ক পুরুষটি বলল,,
—”হ্যাঁ আম্মু তোমাকে আমাদের ভীষণ ভালো লেগেছে। তাই আমরা চাই তোমাকে আমাদের ছেলের বিয়ে করে নিয়ে যেতে।তোমার কোন আপত্তি আছে?”
আনায়া রিদিতের দিকে তাকালে রিদিত সবার উদ্দেশ্যে বলল,,
—”তাহলে আজকে আমি যাই আমার মনে হয় এখানে আর কোন প্রয়োজন নেই!”
তখনই আনায়া তাকে আটকে বলল,,
—”আপনি চলে যাবেন মানে? আর আপু আম্মু আব্বু আমি এনাকে ভালোবাসি এনাকেই বিয়ে করতে চায়!”
সবাই অবাক দৃষ্টিতে আনায়ার দিকে তাকালো। সেখান থেকে মধ্য বয়স্কা মহিলাটি বলল,,
—”সেটা কিভাবে হবে? তোমাকে তো আমাদের ছেলের বউ করেই নিয়ে যেতে চাই আমরা!”
আনায়া তার দিকে তাকিয়ে শালীন ভঙ্গিতে বলল,,
—”আমি দুঃখিত আন্টি! এটা ঠিক যে আপনারা ঐদিন আমাকে অনেক সাহায্য করেছিলেন! আমাকে অনেক কিছু বুঝতে সাহায্য করেছিলেন কিন্তু… কিন্তু আমার পক্ষে উনাকে ছাড়া আর কাউকে বিয়ে করা সম্ভব নয়!”
কিছু কথা আর মুহূর্তেই ড্রয়িং রুমে হাসির রোল পড়ে গেল। জাহিদ নিজেকে সামলাতে সামলাতে বলল,,
—”ডেয়ার শালিকা আগে শুনে তো নিতে ওনাদের ছেলে কে?”
আনায়া জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে দম্পতি টির দিকে তাকাতেই শিশির হাসতে হাসতে বলল,,
—”সাধে কি তোকে আমি বোকারাম বলি, এনারাই হচ্ছে রিদিত ভাইয়ের বাবা মা!”
শুনেই যেন আকাশ থেকে পড়লো আনায়া। এই দম্পতিকে সে চেনে কিছুদিন আগে থেকে। যেদিন আনায়া রিদিতের সন্ধানে তার ক্যাফে তে গিয়েছিল, কিন্তু রিদিতের কোন কিছুর খবরই সে পায়নি। সেদিনই একজোড়া দম্পতির সাথে দেখা হয়েছিল তার। তারা বেশ কিছুক্ষণ ধরেই আনায়ার সাথে গল্প করেছিল তার বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে জানতে চেয়েছিল সে কেন এখানে এসেছে আরো অনেক কিছু, বেশ অনেকক্ষণ ধরেই তাদের এসব আলাপচারিতা স্থায়ী হয়েছিল। কিন্তু কখনই তারা নিজেদের পরিচয় উল্লেখ করেছিল না।
তবে আজ যখন আনায়া জানতে পারলো এই দম্পতি তার ভবিষ্যৎ শ্বশুর শাশুড়ি! তখন যেন বিস্ময়ের শেষ সীমান্তে অবস্থান করল সে। সে তো ভেবেছিল রিদিতের বাবা যেহেতু অনেক বড় ব্যবসায়ী সে তো অনেক বেশি গাম্ভীর্যপূর্ণ আর রিদিতের মা সিনেমায় দেখা বড়লোক সম্ভ্রান্ত শাশুরিদের মতন হবে যারা তাদের বৌমা হিসেবে হয়তো কোন বড়লোক বাবার আদরের দুলালী কে চাইবে। কিন্তু বাস্তবে তার কিছুই নয়।
এটা ভেবেই আনায়ার ভীষণ ভালো লাগছে যে মানুষগুলো অনেক বেশি আন্তরিক। আনায়া মুচকি হেসে মহিলাটির দিকে তাকাতেই তিনিও আনায়াকে মুচকি হাসি উপহার দিয়ে বলল,,
—”আমরা অনেক আগে একেই তোমাকে চিনতাম মা।রিদিতের ফোনে তোমার অনেক ছবি দেখেছিলাম, ওর তোমাকে ভীষণ পছন্দ কিন্তু আমাদের একমাত্র ছেলে। তার জীবন সঙ্গিনী হিসেবে আমরা তো যেকোন মেয়েকে পছন্দ করতে পারি না।তাই না? এজন্যই সেদিন তোমাকে মিথ্যা বলে বসিয়ে রেখেছিলাম যে আমাদের পরিবারে কেউ নেই। আসলে তোমার সাথে কথা বলে আমরা বুঝতে চেষ্টা করছিলাম যে তুমি আসলে কেমন? কিন্তু বিশ্বাস কর সেই দিনই তোমাকে আমার আর রিদিতের বাবার ভীষণ পছন্দ হয়, কিন্তু তোমাদের মধ্যে কিসের একটা জানি ঝামেলা চলছিল। তাই রিদিত তোমাকে সরাসরি বিয়ের কথা বলতে বারণ করেছিল। কিন্তু আজকে যখন জানতে পারলাম তোমাদের সব ঠিক হয়ে গেছে। আর তোমরা একে অপরকে নিজেদের জীবনসঙ্গিনী করে নিতে প্রস্তুত তখন আর দেরি না করে দুইজন মিলে চলেই আসলাম তোমাদের বিয়ের পাকা কথাটা সারতে।”
তার কথা শেষে রিদিতের বাবা রহমান খান আনায়ার বাবা-মার উদ্দেশ্যে বলল,,
—”তাহলে বিয়াই বিয়ান যে কথা ঠিক করলাম তাই থাক আগামী শুক্রবারেই তাহলে বিয়ের দিন তারিখ ধার্য হোক!”
আনায়ার বাবা মৃদু হেসে বলল,,
—”আপনাদের যেমনটা ইচ্ছা! শুধু দেখবেন আমার মেয়েটা যেন সুখী থাকে! জীবনে অনেক ঝড় ঝাপটা পেরিয়ে এসেছে ও!”
রিদিতের বাবা রিদিতের দিকে ফিরে বলল,,
—”আঙ্কেল কি বলল শুনলে তো!পারবে আনায়াকে সারা জীবন সুখী করে রাখতে?”
রিদিত আনায়ার চোখে চোখ রেখে বলল,,
—”যতক্ষণ এই দেহে র’ক্তে’র শেষ ক’না’টা অবশিষ্ট থাকবে ততক্ষণ পর্যন্ত এই রিদিত খান তার আয়নিনকে আগলে রাখবে ইনশাআল্লাহ!”
মাঝরাতের রোদ্দুর পর্ব ৪৫
রহমান খান হেসে টেবিলের উপরের প্রীচ থেকে একটা মিষ্টি নিয়ে আনায়ার বাবার গালে দিয়ে বলল,,
—”তাহলে আপনার সব প্রশ্নের উত্তর তো আমার ছেলেই দিয়ে দিল! তাহলে বিয়ের শুক্রবারেই ঠিক করি!”
আনায়ার বাবাও একটা মিষ্টি নিয়ে রহমান খানের গালে গিয়ে বলল,,
—”তাই হোক!”
পুরো ড্রয়িং রুমে ছড়িয়ে পড়ল হাসির কলরব। আনায়া লাজুক দৃষ্টিতে রিদিতের দিকে তাকালো,রিদিত তখনো সেই একই সম্মোহনীয় দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আনায়ার দিকে।
