প্রেমের ধূলিঝড় পর্ব ৪৬
ফিজা সিদ্দিকী
অসুস্থতার চরম পর্যায়ে পৌঁছে নন্দিতা যখন সামান্য কিছু মুখেও তুলতে পারছিল না, তুর্জয়ের অগোচরে ডাক্তারের কাছে যায়। নিজের বিপন্ন শারীরিক অবস্থার কথা খোলামেলা আলোচনার পর করুণ কণ্ঠে ডাক্তারকে বলে,
“বেঁচে থাকার কোনো উপায় কি বেঁচে নেই আমার?”
মর্মাহত চোখে নন্দিতার দিকে তাকিয়ে ডাক্তার অনন্যা ভরসার হাত বাড়িয়ে দিয়ে নরম কণ্ঠে বলেন,
“আপনার শারীরিক অবস্থার মতিগতি আমার কিছু ঠিক লাগছে না। এমনও হতে পারে আপনার বডি সেই ব্লাড একসেপ্ট করতে পারছে না বলে এমন রিয়েকশন। স্যাম্পেলের ব্লাড গ্রুপ আপনার গ্রুপের সাথে ম্যাচ না করলে, সেটা রিজেক্ট হয়ে যাওয়ার সম্ভবনা 60%। এক্ষেত্রে আমরা খানিকটা আশা রাখতে পারি। সবার আগে আমাদের কিছু টেস্ট করতে হবে আপনার শারীরিক অবস্থা বোঝার জন্য।”
এতো এতো ঝামেলার মাঝে সেসব কথা প্রায় ভুলতে বসেছিল নন্দিতা। আজ কোর্ট রুমের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ডাক্তার অনন্যাকে দেখে মনে পড়ে তার রিপোর্টের কথা। তিনদিন আগে রিপোর্ট আনার ডেট ছিল, সে যায়নি বলেই কী ডাক্তার অনন্যা আজ এখানে?
“আপনার যা কিছু বলার আছে উইটনেস বক্সে এসে বলুন।”
বিচারকের কথা শুনে মাথা নাড়িয়ে অনন্যা এগিয়ে যায় উইটনেস বক্সের দিকে। সেখানে দাঁড়িয়ে নন্দিতার দিকে তাকাতেই এগিয়ে আসে সে। কৌতূহল ভরা কণ্ঠে প্রশ্ন করে,
“ডক্টর অনন্যা, আপনি এখানে?”
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
“আপনার ব্যাপারে সবটা শোনার পর আমার রাতের ঘুম উড়ে গিয়েছিল। একটা মানুষ কিভাবে আর একজনকে এতটা ভালবাসতে পারে, সেই হিসেব মিলিয়ে উঠতে পারছিলাম না। একজন ডাক্তার হিসেবে আমি আমার সর্বোচ্চটুকু দিয়ে চেয়েছিলাম আপনি সুস্থ, স্বাভাবিক একটা জীবন ফিরে পান। আপনার কেসটা আমার কাছে প্রফেশনের চেয়ে পার্সোনাল হয়ে যায় বেশি। আমার সিনিয়র ডাক্তারের সাথে আলোচনার এক পর্যায়ে আপনার রিপোর্টগুলো আমার হাতে আসে। আর রেজাল্ট দেখে তো আমি হতবাক। এই গুড নিউজটা দেওয়ার জন্য বিগত তিনদিন থেকে অপেক্ষা করতে করতে আর না পেরে অবশেষে আপনার ঠিকানা অনুযায়ী সেখানে চলে যাই, ওয়াচম্যানের থেকে জানতে পারি আপনাকে এখানে পাব। তাই কোনকিছু চিন্তা না করেই ছুটে আসি এখানে।”
দীর্ঘ একটা বক্তৃতা শেষে খানিকটা দম নিলো অনন্যা। নন্দিতা ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে তাকে প্রশ্ন করলো,
“গুড নিউজ?”
“ইউ আর প্রেগনেন্ট মিসেস আহসান।”
ডক্টর অনন্যার হাসি হাসি মুখে বলা এই বাক্যটুকু শুনে রীতিমত বড়সড় ঝটকা খেল নন্দিতা। চমকে উঠে দুই পা পিছিয়ে যেতেই আচমকা তাকে পিছন থেকে আগলে ধরে তুর্জয়। ঘোর কাটছে না তারও। তুর্জয়ের দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে একপলক তাকিয়ে কাঁপা কাঁপা হাত নিজের পেটে রাখে নন্দিতা। ভেজা কন্ঠে বলে ওঠে,
“কিন্তু, এটা কিভাবে সম্ভব?”
“অল ইজ পসিবল, মিসেস আহসান। মেডিকেল টারমিনোলজিতে এটাকে অবিশ্বাস্য মনে হলেও, ইটস হ্যাপেন্ড। আপনার ভালোবাসা এই মিরাকেল ঘটিয়েছে।”
অতঃপর তুর্জয়ের দিকে তাকিয়ে বলেন,
“এতদিন ভাগ্যবতীর গল্প শুনেছি, আজ প্রথম কোনো ভাগ্যবানকে দেখলাম। যমের দুয়ার থেকে ছিনিয়ে আনা হয়েছে তাকে, শুধুমাত্র আপনার জন্য।”
পিনপতন নীরবতায় আচ্ছন্ন থাকা কোর্টরুমে শোনা গেল বিচারকের কন্ঠস্বর। আদেশী সুরে তিনি বলে উঠলেন,
“কোর্ট এডভোকেট আলোক আনসারকে পুলিশি তদারকিতে রাখার নির্দেশ দিচ্ছে। সেই সাথে শিকদারদের বিরুদ্ধে আইনি তদারকি ও কোর্টে জমা পড়া প্রমাণের স্বচ্ছতার উপর নজরদারি জারি করার নির্দেশ দিচ্ছে। আজকে এই পর্যন্ত। আগামী শুনানি দুই দিন পর। দা কোর্ট ইজ অ্যাজার্নড।”
সচল দুনিয়ার সবকিছু নিয়মমাফিক চলছে। একে একে খালি হয়েছে কোর্টরুম। সকলে পা বাড়িয়েছে যার যার গন্তব্যে। শুধু দুটো মানুষ, থমকে গেছে তারা। জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন দুটো দেহ যেন জমে গেছে বরফের মত। জগতের কোনকিছু টানছে না তাদের। টানছে না কোনো মায়া। কোনো এক মাহেন্দ্রক্ষণে তারা থেমে গেছে।
তুর্জয় আলতো হাতে নন্দিতাকে নিজের দিকে ঘোরায়। চোখের কোলে তার থৈ থৈ করা জল। নন্দিতার মুখোমুখি হতেই গাল বেয়ে যা গড়িয়ে পড়লো নিমেষেই। নন্দিতার নিজের চোখেও জল। এই খবরটা এভাবে, এই পরিস্থিতিতে জানতে হবে কে জানতো?
তুর্জয় আচমকা নন্দিতাকে কোলে তুলে নেয়। কান্নাভেজা কণ্ঠে বলে,
“ধন্যবাদ দেওয়ার অভিনব পদ্ধতি তুমিই বলে দাও, আমি ভাষা হারিয়ে ফেলেছি। ধন্যবাদ দিলেও, কতকিছুর জন্য দেব? আমি যে গোটাটাই ঋণী, তোমার কাছে।”
নন্দিতা তুর্জয়ের গলা জড়িয়ে ধরে আদুরে ভঙ্গিতে বলে ওঠে,
“ভালোবাসার চেয়ে অভিনব উপহার আর আজীবন পাশে থেকে যাওয়ার চেয়ে অভিনব ঋণ পরিশোধ আর হয়না। থেকে যেও।”
ধূসরের হাত ধরে নওরীন বেরিয়ে আসে বাইরে। অন্ধকার ঘরের বাইরে পা পড়তেই আলো দেখে চোখমুখ খিঁচে বন্ধ করে ফেলে নওরীন। কাঁপতে থাকা শরীরটা তার সম্পূর্ণই ভর ছেড়ে দিয়েছে ধূসরের উপর। শরীরে বল নেই, গায়ে কঙ্কালসার দেহটা শুধু একটা জরাজীর্ণ কাপড়ে জড়ানো। ভঙ্গুর চেহারা, চিটচিটে শরীর থেকে উদ্ভট একটা গন্ধ ভেসে আসছে। ধূসরের ঘৃণা লাগছে না তবুও। একটুও দূরত্ব না রেখে বুকের সাথে জড়িয়ে নিয়ে মাথায় হাত রেখে আদরমাখা কণ্ঠে বলে ওঠে,
“আস্তে আস্তে চোখ খোলো। দেখো, জীবনের সব অন্ধকার পিছনে ফেলে আসছি আমরা আম্মা। অন্ধকার অতীতে আমাদের কোনো হাত ছিল না, তবে নতুন ভোরের আলো আমাদের গায়ে লেগেছে। আমরা বাঁচবো, স্নিগ্ধ ভোরের আলো গায়ে মেখে বাঁচবো।”
ধূসরের হাতে ভর দিয়ে ধীরে ধীরে চোখ খুললো নওরীন। কতোগুলো মাস পর এই আলো, এই বাতাস তার গায়ে লাগছে। চোখ চকচক করে উঠলো তার। মনের জোরে দুই পা এগিয়ে সোনালী রোদ্দুর গায়ে মেখে নিতে চাইলো, কিন্তু শরীর তাতে সে দিলো না। পড়ে যেতে গেলে আবারো তাকে আঁকড়ে ধরলো ধূসর।
শিকদার নিবাসের একপাশে মাথা নুইয়ে দাঁড়িয়ে থাকা গেস্ট হাউস ধূসরের দখলে। এদিকটা কেউ আসে না তেমনভাবে। চারপাশ বাগানে ঘেরা এই জায়গাটাকে নিজের মতো করে সাজিয়েছে সে। বিশাল ওই ইট পাথরের বাড়ির থেকে খানিকটা আলাদা, পাথরের তৈরী এই দুই কামরার ঘর তার বড্ডো সখের। একটা ঘর জুড়ে বিশাল লাইব্রেরী বাড়ির বেশিরভাগ সদস্যরা এ সময় কোর্টে, বাকি যারা আছে তারা প্রয়োজন ছাড়া বাড়ির বাইরে আসে না। এই সুযোগে সকলের অগোচরে নওরীনকে নিয়ে গেস্ট হাউসে ঢুকলো ধূসর। তাকে সেখানে রেখেই বাইরে থেকে দরজা লক করে সাথে সাথে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়ল কোথাও।
বিলাশবহুল ঘরে পা রাখতেই শরীর কেঁপে উঠলো নওরীনের। একপলক নিজের দিকে তাকিয়ে তারপর এই ঘরের দিকে তাকালো। মাঝারি আকারের এই ঘরটাতে চারিদিকে আভিজাত্যের অদৃশ্য এক প্রলেপ লেপ্টে। জানালার একপাশে মাঝারি সাইজের খাট, একটা পিয়ানো আর কয়েকটা সৌখিন আসবাব ছাড়া কিছু নেই এ ঘরে। বিছানায় লেপ্টে থাকা সাদা ধবধবে চাদরের দিকে তাকিয়ে নিজেকে তার ভিক্ষুক মনে হলো। বড্ডো বেমানান এখানে সে। ছেলেটা কী তাকে এখানে রাখবে নাকি? কেন রাখবে এখানে? নন্দিতার কাছে দিয়ে আসছে না কেন তাকে? হুট করে কোথায় বা গেল সে?
ধূসর এলো আরও খানিকটা সময় পর। দুই হাত ভর্তি শপিং ব্যাগ নিয়ে বেশ কষ্ট করে দরজার লক খুলে ভেতরে ঢুকে সাথে সাথেই ভেতর থেকে লক করলো সে। নওরীন যেন তারই প্রতীক্ষায় বসে ছিল। তাকে দেখামাত্র করুণ চোখে চেয়ে কোনক্রমে বলল, “পানি”
হাতের ব্যাগগুলো বিছানায় রেখে পানি ভর্তি একটা কাঁচের গ্লাস নিয়ে বেরিয়ে এলো সে পাশের ঘর থেকে। একে একে তিন গ্লাস পানি খেয়ে তবে শান্ত হলো নওরীন অতঃপর সাথে সাথেই অনুরোধের সুরে বলে উঠলো,
“আমাকে আমার মেয়ের কাছে নিয়ে যাবে? কতোদিন দেখিনি তাকে।”
ধূসর হাঁটু মুড়ে বসলো নওরীনের পায়ের কাছে। তার দুইহাত নিজের হাতের ভাঁজে নিয়ে বলল,
“তোমাকে এখান থেকে অন্য কোথায় নিয়ে যাওয়া ঠিক হবে না, আম্মা। চারিদিকে শত্রু। যেখানেই রাখি না কেন, তোমাকে ঠিকই খুঁজে বের করে ফেলবে ওরা। কিন্তু ওরা টেরই পাবে না, ওদেরই নাকের নীচে, তাদের ঘরের লুকিয়ে আছো তুমি। এরচেয়ে সেফ জায়গা আর কিছু হতে পারে না তোমার জন্য।”
প্রেমের ধূলিঝড় পর্ব ৪৫
নওরীন কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল। শরীর কুলাচ্ছে না তার। ছেলেটা ভুল কিছুও তো বলেনি।
বেডের উপর থেকে একটা শপিং ব্যাগ নিয়ে এসে নওরীনের হাতে দিয়ে তৎক্ষণাৎ ধূসর বললো,
“আসো আম্মা, ওয়াশরুম পর্যন্ত এগিয়ে দিই তোমাকে। আমি বাইরেই আছি, কিছু লাগলে আমাকে বলবে।”
কোর্ট থেকে বের হতেই নন্দিতার চোখ যায় অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা জাওয়াদ শিকদারের দিকে। তার তীক্ষ্ণ চোখের অন্তর্ভেদী দৃষ্টি দেখে কেঁপে ওঠে নন্দিতা। ভয়ে বামহাতে খামচে ধরে তুর্জয়ের বাহু। ডান নিজের পেটের উপর আলতো করে রেখে দ্রুত পা বাড়ায় সে। কয়েকপা সামনে এগোতেই ব্যাথাতুর শব্দ করে খিঁচে বন্ধ করে ফেলে সে চোখ। মুখ দিয়ে উচ্চারিত হয়,
“আহ!”
