Home উত্তল তরঙ্গ উত্তল তরঙ্গ পর্ব ৪৯

উত্তল তরঙ্গ পর্ব ৪৯

উত্তল তরঙ্গ পর্ব ৪৯
দিশা মনি

আহির হতবাক চোখে তাকিয়ে আছে নাতাশা ও রিনার দিকে৷ রিনা বুঝতে পারছে না এই মুহুর্তে তার কি করা প্রয়োজন। নাতাশাও শুকনো ঢোক গিলতে থাকে। আহির ক্ষিপ্তবেগে এগিয়ে এসে নাতাশার দুই বাহু শক্ত করে ধরে বলে,
“তুই…তুই মেরেছিস আমার বন্ধু মৃদুলকে..এতদিন ধরে এই সত্যটা আমার থেকে লুকিয়ে গেছিস তুই..”
রিনা সুযোগ বুঝে দৌড়ে পালায়। নাতাশার পালানোর পথ নেই। সে অনুনয়ের স্বরে বলে,
“আমার কথাটা একবার শোন, আহির। তোর শুনতে ভুল হয়েছে।”

“আমি কিছু ভুল শুনিনি। রিনা আর তোর সব কথোপকথন শুনেছি আমি। মৃদুলের মৃত্যুর পরও পোস্টমর্টেম রিপোর্ট অনুযায়ী বলা হয়েছিল, অতিরিক্ত ড্রাগ নেয়ায় ওর মৃত্যু হয়েছিল। তার মানে ওকে সেই ড্রাগের যোগান দুই দিয়েছিস! এভাবে আরো কত জনের জীবন নষ্ট করেছিস তুই। আর আমি কিনা নেহাকে দোষী ভেবে শুধু শুধু ওকে..”
আহির পুরো ভেঙে পড়ে। এতদিন ধরে তার মনে যে অপরাধবোধের পাহাড় জমছিল আজ যেন তা সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছে যায়। তার কানে বাজতে থাকে নেহার করুণ আর্তনাদগুলো। যখন নেহা বলছিল, আমি কোন অন্যায় করিনি, কোন অপরাধে আমাকে এমন কঠিন শাস্তি দিচ্ছেন আপনি? আহির পুরোপুরি স্তব্ধ হয়ে যায়। নাতাশা নিজেকে নিরপরাধ দাবি করে নানান কথা বলতে থাকে কিন্তু সেসব কোন কথাই আহিরের কানে যায়না। আহির আচমকা ক্ষোভে ফেটে পড়ে। নাতাশার চুলের মুঠি ধরে সে বলে,

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

“চুপ কর তুই..তোর জন্য শুধুমাত্র তোর মিথ্যা প্ররোচনায় আমি নেহার মতো একটা নিরপরাধ মেয়েকে দিনের পর দিন এত কষ্ট দিয়েছি। নিজের এক সন্তানের সাথেও অন্যায় করেছি। নিজের আরেক মেয়েকে তার মায়ের থেকে দূরে করে দিয়েছি..আমার সব পাপের কারণ তুই..আমাকে পাপী বানানোর জন্য তুই দায়ী। আর আজ এসব কিছুর ফল তোকে ভোগ করতে হবে। তোর হাত ধরেই আমার সব পাপের সূচনা আর আজ তোকে শেষ করেই আমি নিজের সব পাপের ইতি টানব।”
নাতাশা বলে ওঠে,
“আহির..ছাড়..লাগছে আমায়।”

আহির নাতাশাকে জোরপূর্বক টেনে নিজের গাড়িতে তোলে। অতঃপর গাড়ি স্টার্ট করে। কিছুক্ষণ পর আহির নিজের সেই গোপন ডেরায় নিজে যায় নাতাশাকে। যেখানে সে একসময় নাতাশাকে বন্দি করে রেখেছিল৷ অতঃপর নাতাশার চুলের মুঠি ধরে টানতে টানতে তাকে ভেতরে নিয়ে যায়। নাতাশা বলে,
“এসব কি করছিস তুই আহির?”
আহির বলে,
“মনে পড়ছে এই যায়গাটার কথা? আজ থেকে ৬ বছর আগে তোর প্ররোচনায় আমি ঠিক এখানে নিয়ে এসে নেহার উপর ৯ মাস চরম অত্যাচার করেছি। যার কোন ক্ষমা হয় না৷ তোর জন্য আমি ওর কাছে আজীবনের জন্য অপরাধী হয়ে গেছি ”

আহিরের গলার স্বর ভেঙে পড়ল। নাতাশা বলল,
“আমার কথাটা শোন একবার..”
আহির রেগেমেগে পাশ থেকে একটি লোহার রড তুলে নিয়ে নাতাশার হাতে জোরে আঘাত করে। নাতাশা জোরে চেচিয়ে ওঠে। আহির নিজের ফোন বের করে বলে,
“যদি ভালো চাস তাহলে এখনই নিজের সব অপরাধ স্বীকার করে নে। আমি তোকে আর সুযোগ দেব না। সব আজ আমার কাছে পরিস্কার।”
নাতাশা ক্রন্দনরত স্বরে বলে,
“হ্যাঁ, আমিই..আমিই মৃদুলের মৃত্যুর জন্য দায়ী। আমিই ওকে ড্রাগ দিয়েছিলাম৷ আর অতিরিক্ত ড্রাগের নেশায় ও নিজেকে শেষ করে দিয়েছিল।”

“আর কি কি করেছিলিস সব বল।”
“আমি তোকে নেহার বিরুদ্ধে উসকে দিয়েছিলাম৷ তোকে বুদ্ধি দিয়েছিলাম নেহাকে এখানে নিয়ে এসে বন্দি করে রেখে ওর উপর অত্যাচার করার। এভাবে মৃদুল আর তোর মায়ের প্রতি হওয়া অন্যায়ের প্রতিশোধ নিতে বলেছিলাম আমি তোকে।”
আহির নিজের রাগ সামলাতে না পেরে রডটা দিয়ে নাতাশার গায়ে আবারো আঘাত করে। নাতাশা আবারো চেচিয়ে ওঠে। আহিরের রাগ কমে না। তার বারবার মনে হয়, এই মেয়েটা তাকে পাপের সাগরে নিয়ে গেছে। তাই তাকে ক্ষমা করা উচিৎ নয়। নাতাশা বলতে থাকে,

“আমি যাই করি না কেন..দিনশেষে এটাই সত্য..এই দুনিয়ায় যদি কেউ তোকে সত্যিকারে ভালোবেসে থাকে সেটা শুধুই আমি আহির। তোর মায়ের পর আমিই সেই নারী যে তোকে মন থেকে ভালোবেসেছে..ঐ নেহা ও তো তোকে ঘৃণা করে..আর যেই মেয়েকে তুই এত আদরে মানুষ করলি সেই আহিরাও তোকে ঘৃণা করে..”
আহির এটা শুনে আরো ক্ষেপে গিয়ে নাতাশাকে আরো জোরে জোরে আঘাত করতে করতে বলে,
“শুধুমাত্র তোর জন্য আমাকে ওরা ভালোবাসে না। তুই আমাকে কুমন্ত্রণা না দিলে আজ আমি একটা স্বাভাবিক জীবন পেতাম। শুধুমাত্র তোর জন্য আমাকে পাপের রাস্তায় আসতে হয়েছে।”

এভাবে আহির নিজের ক্ষোভ মেটাতে থাকে নাতাশাকে মারতে মারতে। নাতাশা অনেক অনুনয় করে আহিরকে থামার। কিন্তু আহির থামে না। নাতাশার পুরো শরীর রক্তাক্ত হতে থাকে। নাতাশার শ্বাস ক্ষীণ হয়ে আছে। টানা ৩০ মিনিট আহির এভাবেই নাতাশাকে মারতে থাকে। নাতাশা ধরে আসা স্বরে বলে,
“তুই আমায় যতোই আঘাত করিস না কেন..মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আমি এটাই বলে যাব..আমি যা করেছি তাতে আমার কোন আফসোস নেই। দিনশেষে আমি তোকে ভালোবাসি..আর শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত তোকেই ভালোবেসে যাব।”
আহির এটা শুনে রেগে নাতাশার মাথায় জোরে একটা আঘাত করে। সাথে সাথেই নাতাশার দু চোখ বন্ধ হয়ে যায়। তার মাথার মগজ বেরিয়ে আসে। নাতাশার শ্বাস চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়। আহির যখন বুঝতে পারে নাতাশা আর নেই তখন সে নাতাশার মৃতদেহের পাশে বসে পড়ে। ক্রন্দনরত স্বরে বলে,

“কেন নাতাশা কেন? তুই তোর আমার বন্ধু ছিলি। তাহলে কেন আমায় এভাবে পাপের দুনিয়ায় নিয়ে এলি? আর চলেও গেলি আমায় খু**নি বানিয়ে…তুই একটু ভালো হতে পারতি না? তাহলে আমিও একটা স্বাভাবিক জীবন পেতাম। কিন্তু এখন..এখন যে আমার পুরো জীবনটা শেষ হয়ে গেল। এত নিকৃষ্ট পাপ আমি করেছি যা নিজের জীবন দিয়েও শোধরাতে পারব না..নাহ অনেক অপরাধ করেছি আমি। এবার নিজের সব অপরাধের শাস্তিও আমায় ভোগ করতে হবে। কিন্তু তার আগে, আমি সবকিছু ঠিক করে দেব। নেহার জীবনটা আমার জন্য এলোমেলো হয়ে গেছে। এখন ওর জীবনটা আমাকে আবার স্বাভাবিক করতে হবে। জানিনা কতোটা পারব তবে আমায় চেষ্টা করতে হবে। আমি আহিরাকে ওর আসল মায়ের কাছে ফিরিয়ে দেব। আদালতে নিজের সব অন্যায়ও স্বীকার করব। তারপর আদালত আমায় মৃত্যুদণ্ড দিলেও আমার আর আফসোস থাকবে না।”

নেহার জ্ঞান ফিরেছে কিছু সময় আগে৷ চোখ খুলতেই সে আরাভকে নিজের সামনে দেখে। বর্তমানে সে একটি হাসপাতালে। নেহা উঠে বসে আরাভের উদ্দ্যেশ্যে বলে,
“এটা কি কোথায় আরাভ ভাই? আমি..আমার নামে আদালতে কেন মিথ্যা বলা হচ্ছে? আমার সাথে হওয়া অন্যায়গুলো আমি কিভাবে প্রমাণ করব? কিভাবেই বা নিজের মেয়ের অধিকার অর্জন করব আমি?”
বলেই কাঁদতে থাকে নেহা। আরাভ বলে,

“তুই শান্ত হ নেহা। আমি উকিলের সাথে কথা বলেছি। সব ঠিক হয়ে যাবে।”
বিপাসা চৌধুরীর হাত ধরে নিয়াও ততক্ষণে সেখানে চলে এসেছিল। সে এসেই নিয়াকে জড়িয়ে ধরে বলে,
“আম্মু..কি হয়েছে তোমার? দেখো, তোমার মেয়ে এসেছি।”
নেহা নিয়াকে জড়িয়ে ধরে। আহিরার কথাও মনে পড়ে তার। আহিরাও তো তারই মেয়ে। অথচ তার থেকে কতো দূরে।
ঠিক এমন সময় আহির চলে আসে। তার কোলে আহিরা। আহিরের শরীরে রক্ত। সে এসেই বলে,
“নেহা..”
নেহা দরজার দিকে তাকিয়ে অবাক চোখে দেখে। আহির আহিরাকে কোল থেকে নামাতেই আহিরা ছুটে এসে নেহাকে জড়িয়ে ধরে বলে,

উত্তল তরঙ্গ পর্ব ৪৮

“আমার মাম্মা..”
“আমার মেয়ে!”
সবাই অবাক। আহির বলে,
“পরিবারটাকে পূর্ণতা দিতে চলে এলাম। ধরে নাও এটা আমার প্রায়শ্চিত্ত।”

উত্তল তরঙ্গ পর্ব ৫০