রোদ্দুর এবং তুমি পর্ব ১৪ (২)
ফারহানা চৌধুরী
-“সব ভুলে যাও অরু। আ’ম স্যরি ফর মাই বিহেভিয়ার।”
অরু থমকে গেল। পলকহীন চেয়ে রইলো শুভ্রর দিকে। এতো সহজে বলে দিলো? কি করে? বাঁধলো না? সে কি অরুকে একটুও ভালোবাসে না? একটুও না? নিজেকে অহেতুক বিশ্রী প্রশ্নে জর্জরিত করলো অরু। যখন বুঝলো বেকার তা, তাচ্ছিল্য করে হাসল। এতো বেশি আশা রাখা তার ভুল ছিল। মাশুল দিতে হবে, এটা অস্বাভাবিক নয়।
শুভ্র তাকিয়ে আছে তার দিকে। কিছু বলতে না দেখে সে শঙ্কিত হলো। মেয়েটার বয়স যা, আবেগের বশে অনেক কিছু ভাবতে পারে, করতে পারে। অরুকে সে ম্যাচিউর ভাবে না। তার সকল কাজ-কর্মই ইমম্যাচিউর ঠেকে তার কাছে। শুভ্র ধীর গলায় ডাকে,
-“অরু।”
অরুর বুকটা কাঁপছে সমানে। মনে হচ্ছে শরীরটা নিস্তেজ হয়ে পড়ছে। অরু চোখ তুলে তাকায়। অভিমানী চোখ জোড়া শুভ্র পড়তে পারলো কি? জানা নেই। সে আবার বলল,
-“আ’ম স্যরি? হু?”
অরু কান্না গিলে মাথা দোলালো৷ মৃদু শব্দে বলল,
-“হুম।”
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
কন্ঠনালী রোধ হয়ে এলো। গলাটা মনে হচ্ছে কেউ চেপে ধরেছে। সে আর কিচ্ছু বলতে পারলো না। কিচ্ছু না। অরু নিজেকে প্রতিক্রিয়াহীন দেখাতে চাইলো। এমন লোকজনের সামনে নিজের অনুভূতি প্রকাশের মানেই হয় না। এরা জঘন্য হয়। প্রচন্ড জঘন্য! অরুর মনে একরাশ ঘৃণা জন্মাল। নিজের অনুভূতির এমন করুণ দশার জন্য সে শুভ্রকে কক্ষনো ক্ষমা করবে না। কক্ষনো না! অরু উঠে দাঁড়ালো। হাতের ব্রেডটা প্লেটে রেখে ব্যাগটা কাঁধে নিলো। খাওয়ার ইচ্ছে নেই আর। রুচি হচ্ছে না। যেই লোকটা তার অনুভূতির মূল্যায়ন করে না, তাকে মূল্যায়ন করে না; তার এতো আদর-যত্ন অরুর কাছে বিষ সম। লোক দেখানে লাগলো অরুর। সে তার দিকে তাকিয়ে হালকা গলায় বলল,
-“অফিসের লেইট হচ্ছে। আমি বের হচ্ছি।”
শুভ্র অদ্ভুত চোখে তাকালো। বলতে নিলো,
-“আমি ড্রপ কর—”
-“আমি যেতে পারি একা। বাচ্চা নই।”
কাঠকাঠ গলায় বলল অরু। শুভ্র থেমে গেলো। থমকে গেল। মেয়েটার আচরণে এতক্ষণে সবটা স্পষ্ট। অরু কোনোভাবে তার আচরণকে পজিটিভলি নিয়েছিলো। শিট! শুভ্রর মন চাইলো কপাল ঠুঁকে মরে যেতে। এতোবড় ভুল কি করে করলো সে? অরু ততক্ষণে বেড়িয়ে গিয়েছে। শুভ্র চেয়ে রইলো সেদিকে। অরু তার দৃষ্টি সীমানা অতিক্রম করতেই সে পকেট থেকে সেলফোন বের করলো। কারো নাম্বার ডায়ল করে কানে ঠেকাল। ওপাশে রিসিভ হতেই গম্ভীর গলায় বলে উঠলো,
-“অরু বেরিয়েছে। রেগে আছে আপাতত। খেয়াল রাখবে ওর দিকে। ভুলভাল কিছু যেন না করে বসে।”
ওপাশ থেকে ইতিবাচক সাড়া পেতেই শুভ্র খট করে কল কাটলো। পকেটে হাত গুঁজে দাঁড়িয়ে রইলো কপাল কুঁচকে।
অফিসে পৌঁছে অরু ক্যাব থেকে নামলো। ভাড়া চুকিয়ে অফিসে ঢুকলো। সে ভেতরে গিয়ে নিজের জন্য নির্ধারিত ডেস্কে বসতেই একজন এলো তার কাছে। নিত্যদিনের ন্যায় স্বাভাবিক গলায় জিজ্ঞেস করলো,
-“Are you miss Arunika?”
অরু ভ্রু গুটিয়ে তাকালো। মাথা দুলিয়ে প্রত্যুত্তর করল,
-“Yes. But, why?”
লাল রঙা চুলের অত্যাধিক ফর্সা বিদেশী মেয়েটা বড্ড নম্র গলায় এবার বলল,
-“Shuvro sir is calling you, mam. It’s urgent.”
অরু কপাল কুঁচকায়। ডেস্কে ব্যাগ রেখে বলল,
-“Okay, you may go. I’ll see it.”
মেয়েটা স্বভাবসুলভ হাসলো। সে চলে গেলে অরু তপ্ত শ্বাস ফেললো। আশেপাশে তাকিয়ে মিশমিকে খুঁজলো নিরবে। না পেয়ে আরো হতাশ হলো। পা চালিয়ে গেলো শুভ্রর কেবিনের সামনে। নক করলে অনুমতি পেল ভেতরে যাওয়ার। সে ভেতরে ঢুকলে দেখলো সেখানে আরেকটা লোকও রয়েছে। শুভ্রকে দেখে চোখ ফিরিয়ে নিলো অরু। ফ্লোরে চোখ জোড়া আঁটকে রাখলো গ্লু দিয়ে। নম্র গলায় বলল,
-“আমায় ডেকেছিলেন স্যার?”
ওখানে বসা লোকটার নাম অভিক। অভিক একবার তাকালো শুভ্রর দিকে। নির্লিপ্ত মুখের শুভ্রকে কিছু বলতে না দেখে সে তপ্ত শ্বাস ফেলল। চোখ সরিয়ে তাকালো অরুর দিকে,
-“আসলে আপনাকে কিছু কাজের জন্য ডাকা হয়েছে, মিস অরুনিকা।”
অরুর কপাল কুঁচকে এলো চিন্তার ভারে। লোকটা বাঙালি? চেহারার খাঁজে বাঙালিয়ানা নেই। অরু অতোশত ভাবলো না। মাথা দোলালো,
-“জ্বি, বলুন।”
শুভ্র তাকায় তার দিকে। অভিক কিছু ফাইল এগিয়ে দিলে সেগুলো শুভ্র অরুকে এগিয়ে দেয়। হাত ঘড়িতে চোখ বুলিয়ে বলে,
-“এগুলো গতদিন বানিয়েছিলেন। অনেক ভুল আছে। কারেকশন করে দু’ঘন্টার মধ্যে সাবমিট করবেন।”
অরু ফাইলে চোখ রেখেই তা নিলো। যন্ত্রের মতো বলল,
-“ওকে।”
শুভ্র গম্ভীর গলায় বলে,
-“এগুলো কমপ্লিট করে আমার কেবিনে মিট করবেন। কাজে কোনো ত্রুটি চাই না আমি। মাইন্ড ইট। বি কেয়ারফুল।”
অরু মাথা দোলালো নিঃশব্দে। তাকায়ও না শুভ্রর দিকে। শুভ্র এই যাত্রায় এসে কপাল কুঁচকায়। অদ্ভুত চোখে চেয়ে থাকলে অভিক অরুর দিকে চায়। বলে,
-“আপনি যেতে পারেন। কাজ শেষ করে দেখা করবেন।”
অরু বেরিয়ে এলো। শুভ্র এবার তাকালো অভিকের দিকে। তার গোছানো কপাল দেখে অভিক ভড়কালো। আমতা আমতা করে জিজ্ঞেস করলো,
-“কি- কি?”
-“ওকে যেতে বললি কেন?
অগ্নিঝড়া গর্জনে অভিক হকচকালো,
-“তো ওকে কাজ করতে যেতে বলব না?”
-“কে বলেছিলো বলতে? দাঁড়িয়েই ছিলো সামনে তোর এতো কি হচ্ছিল?”
অভিক হতবুদ্ধির মতোন চেয়ে বলল,
-“আজব! ও এখানে কাজ করতে এসেছে না দাঁড়িয়ে থাকতে তোর সামনে? তুই নিজেও চুপ করে দাঁড়িয়ে আছিস। কিচ্ছু বলছিসও না। তাহলে ঐ বেচারিকে এখানে দাঁড় করিয়ে রাখার মানে কি?”
শুভ্রর চোখ কপাল ছুঁলো যেন,
-“বেচারি? ওকে বেচারি লাগে তোর?”
-“বেচারি নয়তো কি? তোর মতো স্বামী কপালে জুটেছে, ও বেচারি না তো কি?”
শুভ্র হেসে উঠল। উপহাস করে বলল,
-“তোর বিয়ে হয়েছে? না বউ আছে? কোনোটাই নেই, আবার কোনমুখে কথা বলতে আসিস? ও কি তা আমি জানি ভাই।”
বন্ধুর মুখের এমন কথা শুনে অভিকের বিষম খাওয়ার উপক্রম। বেচারা কেশে উঠলো। ভোঁতা মুখে চোখ রাঙিয়ে বলল,
-“তোর সমস্যা কি? বিয়ে করিনি তো কি হয়েছে হ্যাঁ? এজন্য এসব বলে অপমান করবি? বেয়াদব!”
শুভ্র অতিষ্ঠে মাথা নাড়ালো। হাড়ে বজ্জাত একেকটা। বাড়িতে অরু, আর বাইরে বন্ধু-বান্ধবগুলো। সে পড়েছে ফ্যাঁসাদে।
মিশমির ঘুম ভেঙেছে সাদাফের ফোন কলে। সে ঘড়ি দেখে হতভম্ব। তন্দ্রা আকাশে পালালো চকিতে। এতোটা দেরি হলো কি করে? এখন অফিসে কিভাবে? শিট! মিশমি কপাল চাপড়ালো। বিড়বিড় করে বলতে লাগল,
-“আমাকে জব থেকেই বের করে দেবে। শুভ্র স্যার যেই লোক, আল্লাহ!”
মিশমির এতো হাহাকারের মাঝে দেবদূত হয়ে ধরা দিতে সাদাফের ফোন কল এলো আবারও। ঝংকার তুলে কেঁপে উঠলো কালো আস্তরণে ঢাকা মোবাইল ফোন খানা। সেবার বাজতে বাজতেই কেটে গিয়েছিল। মিশমি ধরার সুযোগ পায়নি। এবার পেলো। লুফে নিলো তা। ফোন তুলেই কানে ঠেকিয়ে আর্তনাদ করে বসলো,
-“সাদাফ!”
সাদাফ ভ্রু কুঁচকায়। চিন্তিত স্বরে প্রশ্ন জুড়ে দিলো শ’খানেক,
-“কি হয়েছে সোনা? আজ এলে না কেন? সব ঠিক আছে? তুমি ঠিক আছো? হোয়াট’স রং মিশু? কথা বলো?”
এতো এতো প্রশ্নে জর্জরিত হয়ে মিশমি তত শ্বাস ফেলল। লোকটার চিন্তিত কন্ঠস্বর বক্ষে বইয়ে দিলো ভালোলাগার স্রোত। তবুও মেয়েটা নিজস্বরে একরাশ কৃত্রিম বিরক্তি ঢেলে বলল,
-“উফ, সাদাফ! থামো না। আমাকে বলতে দিলে তারপরে তো আমি বলবো। তাই না?”
সাদাফ থামলো। বড়ো করে শ্বাস ফেলে চেয়ারে ঠেকালো প্রশস্ত পিঠ খানা। রোলিং চেয়ারের হাতলে কনুই রেখে পায়ের উপর পা তুলল বড়ো আয়েশে। হাত ঘড়িতে একপল চেয়েই চেখ সরালো, শান্ত-শীতল গলায় পরাস্ত সৈনিকের ন্যায় আত্মসমর্পণ করে বলল,
-“আচ্ছা, বলো।”
মিশমি প্রশ্রয় পেলো। কাঁদো কাঁদো গলায় বলল,
-“আমি আজকে অফিসে যেতে পারিনি।”
-“হুম।”
-“দেরিতে ঘুম ভেঙেছিলো। আমি এলার্ম দিয়েছিলাম তো। তারপরেও বাজেনি ওটা।”
-“হুম।”
-“ তোমার কলে কেবল ঘুম ভাঙলো আমার।”
-“আচ্ছা, তো কি হয়েছে এতে?”
-“কি হয়েছে মানে? শুভ্র স্যার আমাকে চাকরি থেকেই বের করে দেবে সাদাফ, ট্রাস্ট মি। তখন আমি কি করবো?”
কি রোবোটিকস জবাব! মিশমি ক্ষেপে গেল। মুখগহ্বর তেঁতো হয়ে এলো রাগমিশ্রিত কথায়,
-“সমস্যা কি তোমার? ‘হুম’, ‘আচ্ছা’; এগুলো কি লাগিয়েছো? আজব লোক! আমি তোমাকে কি বলছি আর তুমি কি বলছো?”
সাদাফ কপালে আঙুল ঘষলো। হেসে ফেললো মৃদু শব্দে। হাসির আওয়াজ কর্ণধার হতেই মিশমি কপাল গোঁছালো,
-“অদ্ভুত তো। হাসছ কেন তুমি? আমি কি জোকস্ বলেছি কোনো?”
সাদাফ ঠোঁট চেপে হাসি গিললো। বলল,
-“মোটেও না।”
-“তবে?”
-“এতটুকু ব্যাপারের জন্য টেনশন করছো?”
মিশমির চোখ কপালে উঠলো,
-“এতটুকু? এটাকে এতটুকু মনে হচ্ছে তোমার?”
সাদাফ কোমল স্বরে ডাকে,
-“মিশু, জান আমার, রিল্যাক্স। ভাইয়া এতোটাও কঠোর নন। শান্ত হও।”
-“তাই না? তুমি জেনে-শুনেও বলবে স্যার কঠোর না? সিরিয়াসলি?”
-“ইয়েস, কজ আই নো হিম। আমি ভাইয়াকে বলবো, তুমি ভেবো না। আজকে যখন দেরিই হয়েছে, তাহলে আজ রেস্ট করো। আসতে হবে না। সন্ধ্যায় রেডি থেকো, আমি পিক করতে আসবো তোমায়।”
মিশমির উৎফুল্লতা আকাশ ছুঁলো। উচ্ছ্বাসিত কন্ঠে বলল,
রোদ্দুর এবং তুমি পর্ব ১৪
-“সত্যিইইই?”
-“হ্যাঁ বাবা, সত্যি।”
-“প্রমিস করো। পিংকি প্রমিস।”
মেয়েটার বাচ্চামোতে সাদাফ হেসে ফেললো নৈঃশব্দ্যে। আদুরে গলায় বলল,
-“আচ্ছা, পিংকি প্রমিস।”
