Death or Alive part 39
priyanka hawlader
রাতের নিস্তব্ধতা চারপাশে সমভাবে বিরাজ করছে। এতক্ষণ ইসাবেলা অর্ষার সঙ্গে গল্প করছিল, আর এবার সে নিজেই ওয়াজফান আসতেই ধীরে ধীরে উঠে যায়। কলিডরের দিকে হেঁটে যাচ্ছিল নিজের কক্ষের উদ্দেশ্যে, কিন্তু হঠাৎ তার চোখের সামনে সবকিছু অন্ধকারে ঢেকে যায়। হঠাৎ করে জ্ঞান হারায়, আর সেখানেই মাটিতে লুটিয়ে পড়ে।
কিছুক্ষণ পর, যখন তার জ্ঞান ফিরে আসে, সে দেখতে পায় নিজেকে নিজের কক্ষে বিছানায় শুয়ে থাকতে। পাশে বসে আছে কেউ যেন আনন্দে ভেসে উঠেছে, চোখে জল ঝকঝকে—যেন সবচেয়ে খুশির সংবাদ সে পেয়েছে।ভালো করে চোখ মেলে তাকাতেই বুঝে যায় পাশে বসে থাকা ব্যক্তিটা ড্যানিয়েল।
ঘর জুড়ে সবকিছু স্থির, সবাই—ওয়াজফান সহ—ঘরেই দাঁড়িয়ে আছে, যেন এই মুহূর্তটি তাদের জন্যও অতিমূল্যবান।
ঠিক তখনই, ড্যানিয়েলকে ভেদ করে অর্ষা আসে, ইসাবেলার সামনে বসে এবং তাকে জড়িয়ে ধরে। খুশিমুখে বলে ওঠে,
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
“ধন্যবাদ, ইসাবেলা, এত জলদি আমাকে মামি বানানোর জন্য।”
ইসাবেলা কথার মানে বুঝতে না পেরে হা করে তাকিয়ে থাকে। তখনই অর্ষা আবার বলে ওঠে,
“তুমি মা হচ্ছ, ইসাবেলা।”
কথাটা শোনার সঙ্গে সঙ্গে ইসাবেলা নিজের হাতটা স্বয়ংক্রিয়ভাবে পেটের দিকে নিয়ে যায়। সে অবাক হয়ে থমকে দাঁড়ায়, চোখে বিস্ময় আর আনন্দের এক মিশ্রিত ভাব—তার মনে ভেসে ওঠে না, এমন কী হয়েছে যে তার জীবন এভাবে নতুন মোড় নিতে চলেছে।
ইসাবেলা পেটের উপর হাত রাখে, ধীরে ধীরে অনুভব করে, এখানে একটা ছোট্ট প্রাণ আছে—একটা অংশ যা তার নিজের। তার মনের গভীরে এই অনুভূতি যেন আলাদা এক শান্তি এনে দেয়। সে মৃদু হাসি ধরে, নিজের জন্য কিছুটা আনন্দ, কিছুটা আশ্বাস অনুভব করে।
কিন্তু হঠাৎ চোখে ভেসে ওঠে সেই ছবি—ড্যানিয়েলের সেই অত্যাচার, প্রতিরাতে জোর করে নিজের কাছে নেওয়া। মনে পড়ে, এইটা কখনো ভালোবাসার চিহ্ন হতে পারে না; এটা ছিল একতরফা, জোরজবরদস্তি, সবকিছু যেখানে তার অনুমতি ছিল না। প্রতিটি রাত তাকে ভোগ করতে হয়েছে, শুধুমাত্র ড্যানিয়েলের ইচ্ছায়। এই স্মৃতির বোঝা অনুভব করে, ইসাবেলা সঙ্গে সঙ্গে হাতটা সরিয়ে নেয় এবং আবার মুখ ফিরিয়ে নেয়, যেন সেই কষ্টের ছায়া থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারে।
ওয়াজফান, যা কিছু ঘটছে তা এখানে দাঁড়িয়ে গম্ভীরভাবে দেখছিল। তার মন অনেকটাই গলে গেছে—সুখবরটি পেয়েও, তাকে অভ্যন্তরীণ শান্তি দেয়। কিন্তু সে এখন কিছু বলতে চায় না। ধীরে ধীরে, অর্ষাকে নিয়ে, সেখান থেকে বেরিয়ে যায়, তাদের একাকী মুহূর্তটিকে সম্মান দিয়ে।
।
সবাই চলে যাওয়ার পর ড্যানিয়েল ধীরে ধীরে এসে বসে, পাশে হাত বাড়িয়ে পেটের দিকে ছুঁয়ে যেতে চায়। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে ইসাবেলা সরে যায়, দূরে দাঁড়িয়ে কঠোর স্বরে বলে,
“ছোয়ার চেষ্টা করবেন না আমার ! আপনার নোংরা হাতটা না! আমি আপনার ঘৃণা করি। আপনি ইচ্ছে করে এসব কিছু করেছেন। পেটে যে আছে, সে আমার অংশ নয়, কারণ ভালোবাসায় সে এখানে আসেনি। সে এসেছে শুধু আপনার জেদে, আপনার কামনায়। এটা আপনার ভোগের অংশ। আমি একে মেরে দেবো, একে রাখবো না।”
কিন্তু কথার শেষ করার আগে ড্যানিয়েল হঠাৎ চিৎকার করে, হাত তুলতে গেলে যেন থাপ্পড় দিতে চায়।
কিন্তু নিজেকে কন্ট্রোল করে থেমে যায় মনে পড়ে যায় ইসাবেলা প্রেগনেন্ট তাই ধীরে হাতটা নামিয়ে নেয়।
হুংকার দিয়ে বলে,
“তোর সাহস কি করে হয়! আমার বাচ্চাকে নিয়ে এরকম কথা তোর মুখ দিয়ে উচ্চারণ করার! তোর ভাগ্য ভালো, এখন সে তোর পেটে না হলে তোকে আমি এখানে মেরে পুতে দিতাম। ওকে মেরে ফেলার কথা তো দূরের; যদি তুই ভুলেও তা ভাবিস ওর ক্ষতি করার কথা তাহলে , আমি ভুলে যাব। আমি তোকে ভালোবেসেছি… ভালোবাসি।”
বলে, সে সেখান থেকে উঠে চলে যায় এক বুক গভীর যন্ত্রণার নিয়ে —তার খুশির মুহূর্তটি সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায় ইসাবেলার কথাগুলোর জন্য।
ড্যানিয়েল বেরিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ইসাবেলা একা হয়ে পড়ে। ধীরে ধীরে সে মাটিতে বসে কেঁদে উঠে, হাওয়ায় তার নিশ্বাস ভারি, চোখ থেকে অশ্রু ঝরে পড়ে। মনে মনে সে বারবার উচ্চারণ করে—
“আপনি যতই বলুন না কেন, আমি ওকে রাখব না। আমি ওকে নিজের মধ্যে বড় করব না। সে কখনও আমার অংশ হবে না।”
অশ্রু ঝরানো চোখে ইসাবেলা নিজেকে ভেঙে ভেঙে দেখছে, হৃদয় যেন বেদনার অন্ধকারে হারিয়ে গেছে। প্রতিটি শব্দ যেন তার কন্ঠে ক্ষয় ঘটায়, কিন্তু সে নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকে।
নিজের রুমের বারান্দায় দাঁড়িয়ে ইয়ানা হাতে কফি নিয়ে অন্ধকার আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল। হঠাৎ, মনে হলো যেন কালো কোনো ছায়া তার পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে। হঠাৎই শরীরে শিহরণ বয়ে যায়, ভয় অনুভব করে সে। কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করে,
“কে আপনি? আমাকে ভয় দেখাচ্ছেন কেন? এখানে কি কেউ আছেন? সামনে আসুন।”
ঠিক তখনই তার সামনে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে আয়রাক।
আয়রাককে দেখে ইয়ানা কিছুটা স্বস্তি পায়, কিন্তু ভয় আর আগের মতো পুরোপুরি কাটেনি। সে বলল,
“আপনি এভাবে হঠাৎ এসে আমাকে কেন ভয় দেখান? এতদিন ভার্সিটিতে এসে গিয়েছেন, অথচ
কথাটি শেষ হওয়ার আগেই আয়রাক তার মুখে টেপ লাগিয়ে দেয়। এরপর, নির্বিঘ্নে তাকে তুলে নিয়ে অন্ধকারের মধ্যে চলে যায়।
ইয়ানা আতঙ্কে নিজের হাত-পা ছড়াতে চেষ্টা করে, “উ…উ…” শব্দ করে, কিন্তু কিছুই বোঝে না। সে বুঝতে পারছে না, আয়রাক কেন তাকে এমন করে তুলে নিয়ে যাচ্ছে এবং কোথায় নিয়ে যাচ্ছে। তার চারপাশ অজানা, হৃদয় ভয় আর উৎকণ্ঠায় দোল খাচ্ছে।
ইয়ানা কে তুলে নিয়ে আয়রাক এক অন্ধকার বাড়িতে পৌঁছে। চারপাশটা ভুতুড়ে, গা ছমছমে করে ওঠার মতো। ইয়ানা চারপাশ দেখে ভয়ে কাঁপছে, কিন্তু মুখে টেপ থাকার কারণে কিছুই বলতে পারছে না।
আয়রাক তাকে একটি চেয়ারে বসিয়ে দেয় এবং হাত-পা বেঁধে দেয়। ইয়ানা ছটফট করতে থাকে, হাত-পা ছোড়ার চেষ্টা করে, কিন্তু কোন লাভ হয় না।
এরপর আয়রাক ধীরে ধীরে একটি কাগজ বের করে ইয়ানার সামনে ধরে সই করতে বলে।
কাগজটি দেখেই ইয়ানার চোখ বড় হয়ে যায়। তার চোখে প্রশ্নের ঝিলিক—“এই কাগজটা কী? কেনই বা আমাকে এটা সই করতে হবে?”
আয়রাক তার মুখে টেপ খুলতে একটি সংকেত দেয়, “উহু।”
আয়রাক টান দিয়ে টেপ খুলে দেয়। ইয়ানা রাগে চোখ মেলে তাকিয়ে বলে,
“আপনি আমাকে এখানে কেন তুলে এনেছেন? আর আপনার কি উদ্দেশ্য এই কাগজ? আমি কেন সই করব? এমন ব্যবহারের কি মানে, আপনি কি পাগল হয়ে গেছেন?
আয়রাক চিৎকার করে বলে ওঠে,
“হ্যাঁ! পাগল হয়ে গেছি! কেন? কারণ তুই—তুই আমাকে পাগল করেছিস! তোর জন্যই আমি পাগল হয়ে গেছি। আমি তোকে ভালোবেসেছি, আর তুই কি করলি? অন্য ছেলের সঙ্গে ডলাডলি করতে শুরু করলি! এই এতদিনে তুই একবারও কি আমার চোখে ভালোবাসা দেখিস নি? তবে কেন অন্য ছেলের বুকে এভাবে লুটিয়ে পড়লি? বল তো—কেন?”
তার চোখে আগুন, হাতে কাগজ ধরে বলছে,
“আর এই কাগজটা আমাদের বিয়ের কাগজ। তুই এটা সই করবি, সারা জীবনের জন্য আমার হয়ে যাবি। তো, ভালো করে সই কর। আর তুই সই না করলে? আমি সই ছাড়াই তোর সঙ্গে এখনই বাসর সেরে ফেলব!”
ইয়ানা অবাক হয়ে তাকায়। মনে মনে ভাবছে, এই লোকটা যে তাকে ভালোবাসে, সেটা আগেই বুঝেছিল, তবে ভালবাসে সেটা এসে মুখে বললেই তো হতো। এভাবে জোর করে তুলে নিয়ে আসার কি মানে? আর কি বলছে—আমি কার সঙ্গে ঢলাঢলি করেছি?
ইয়ানা কিছু বলার চেষ্টা করলে তার আগেই আয়রাক বলে ওঠে,
“এখানে সই কর! কোন কথা শুনতে চাই না। যা বলার সই করার পরে বলবি।”
চুপচাপ ইয়ানা কাগজটি হাতে নিয়ে সই করে দেয়।
কারণ ইয়ানা ও যে আয়রাবকে ভালোবাসে তাই আর অমত করলো না।
ইয়ানা কাগজে সই করতেই আয়রাক কিছুটা শান্ত হয়ে যায়। তার ভিতরের আগুন ধীরে ধীরে নিভতে শুরু করে। সে ধীরে ধীরে ইয়ানার হাত-পা খুলে দেয়। এরপর পেছনে ঘুরে দাঁড়িয়ে বলে,
“আমি তোকে ভালোবেসেছিলাম, ইয়ানা। এভাবে জোরজবরদস্তি করে নয়, তোর অনুমতিতেই তোকে নিজের করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তুই আমার ভালোবাসা বুঝলিনা। তার আগে তুই লুটিয়ে পড়লি অন্য একটা ছেলের বুকে।
জানিস, সেদিন আমার কতটা যন্ত্রণা হয়েছিল তোকে অন্য ছেলেকে জড়িয়ে ধরতে দেখে।”
ইয়ানার মনে তখন সেই দিনের কথা ফিরে আসে। ঐদিন অনেক পুরনো একটা বন্ধুর সঙ্গে তার দেখা হয়েছিল, আর নরমালি একটি হাগ করেছিল। আর হয়তো সেই ছোট্ট দৃশ্যটাই আয়রাক দেখেছিল।
মনে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই ইয়ানা মুচকি হাসে ভাবে কি পাগল লোক পুরোটা না জেনে ভুল বুঝে বসে আছে।
এরপর ধীরে এগিয়ে গিয়ে , পেছন থেকে আয়রাককে জড়িয়ে ধরে।
হঠাৎ ইয়ানা আয়রাককে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরায় আয়রাক অবাক হয়ে যায়, মনে মনে ভাবে—ইয়ানা কেন এমন করছে? তবে হঠাৎ ইয়ানা কন্ঠ তুলে বলে,
“আপনি আমাকে ভুল বুঝেছেন। আমি কারো বুকে লুটিয়ে পড়িনি। আমিতো শুধু লুটিয়ে পড়ার আশায় ছিলাম আপনার বুকে। আমিও যে আপনাকে ভালোবেসেছি, তবে বলতে পারিনি। ঐদিন যেটা দেখেছেন, সেটা শুধুই বন্ধুত্ব ছিল।”
ইয়ানার কথায় আয়রাক অবাক হয় তবে সাথে এক অদ্ভুত শান্তি অনুভব করে। নিজের হতে, যাকে সে ভালোবাসে, সেই মেয়েটা নাকি তাকে ভালোবাসে—এই চিন্তাতেই তার হৃদয় আনন্দে ভরে ওঠে।
সে ধীরে ধীরে ইয়ানাকে সামনে টেনে এনে দাঁড় করায়, জড়িয়ে ধরে কপালে চুমু দেয়। তারপর কণ্ঠ কষে বলে,
“কি বললে? আর একবার বল, আবার বল।”
ইয়ানা ছোট্ট কণ্ঠে লাজুক হয়ে উত্তর দেয়,
“আই লাভ ইউ।”
শব্দগুলো আয়রাকের মনে এক আলাদা শান্তি ভরে দেয়। চোখে নেশার মতো আবেগ ভাসে, সে তাকিয়ে থাকে ইয়ানার চোখের দিকে। ধীরে ধীরে নিজের ঠোঁট এগিয়ে নিয়ে আসে ইয়ানার ঠোঁটের কাছে।
কিন্তু ইয়ানা ঠোঁটের স্পর্শ পাওয়ার আগেই হাত দিয়ে সেটা আটকে দেয়। তারপর লাজুক একটি হাসি দিয়ে মাথা নিচু করে বলে,
“এখন না, আগে আমাদের কবুল করে বিয়ে হোক, তারপর যা ইচ্ছা করবেন।”
বলেই সে আয়রাকের বুকে মুখ লুকিয়ে দেয়।
এমন দৃশ্য দেখে আয়রাক মুচকি হাসে। তারপর বলে,
“আচ্ছা, চলো, তবে আগে তোমার ইচ্ছাই পূরণ করা যাক।”
তারপর কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে,
“তারপর না হয় আমার সব ইচ্ছা পূরণ করব। তখন আর কোন ছাড় নেই।”
ইয়ানা যেন লজ্জা পেয়ে আরেকটু গুটিয়ে নিতে চায় নিজেকে আয়রাকের বুকে।
নিজের কক্ষে দাঁড়িয়ে জানালার দিকে তাকিয়ে ইসাবেলার মন ভীষণ উদাস। হঠাৎ একজন দাসী এসে বলে,
“আপনাকে, বাদশা, রাজ সভায় ডাকছে।”
কথাটা শোনামাত্রই ইসাবেলা অবাক হয়ে যায়। ওয়াজফান তাকে ডাকছে—এটা কি সত্য, নাকি ভুল—মনে প্রশ্ন জাগে। তবে দাসীর সামনে সে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায় না, কেবল বলে,
“তুমি যাও, আমি আসছি।”
দাসী চলে গেলে ইসাবেলা ধীরে ধীরে রাজ সভার দিকে এগিয়ে যায়। রাতের অন্ধকারের মধ্যেও সবাই রাজ সভার হলেই উপস্থিত। রাজ সিংহাসনে বসে আছে ওয়াজফান, তার পাশে সিংহাসনে বসে আছে অর্ষা। সবাই নিজের নিজের স্থানে, ড্যানিয়েলও সেখানে আছে।
ইসাবেলা সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই ওয়াজফান তার দিকে তাকিয়ে হাত বাড়িয়ে ডাকে।নিজের কাছে,
ইকাবেলা অবাক হয় বক্তব্য ধীরে ধীরে উঠে গিয়ে দাঁড়ায় ওয়াজফানের সামনে,
“আজ আমি তোকে মাফ করে দিয়েছি,” ওয়াজফান বলে, “জানিস কেন? তোর ভেতরের ওই ছোট্ট প্রাণের জন্যই আমি মামা হচ্ছি, আর তুই মা। তাই তোকে আমি মাফ করে দিলাম। তবে আমার ছোট্ট চ্যামের খেয়াল রাখবি। আমি তোদের মেনে নিলাম। তুই সুখে আছিস—এটাই আমি চেয়েছিলাম। তুই যেহেতু ড্যানিয়েলকে ভালোবেসে তাকে বিয়ে করেছিস, তাই আমি সব ভুলে তোকে আবার মেনে নিলাম।”
কথাগুলো শুনে ইসাবেলা অবাক হয়ে যায়। ঝামেলার শেষ পর্যায়ে ওয়াজফান এত সহজে মেনে নিল—সে ভাবতেও পারত না। তবে বাচ্চার জন্য, তার ভেতরের ছোট প্রাণের কারণে, সে আবার তার ভাইকে ফিরে পাবে, আবার তার পরিবারকে ফিরে পাবো—এ ভাবনায় খুশি হয়ে সে ওয়াজফানের বুক জড়িয়ে ধরে কেঁদে ওঠে।
মনেই ভাবছে, “বাচ্চাকে আমি দুনিয়ায় আনতেই চাইনি, কিন্তু সে আসার আগে আমাকে এত কিছু ফিরিয়ে দিল। আর আমি মা হয়ে কি না তাকে মারতে চাইছিলাম”—এই অনুশোচনা ইসাবেলার মনে গভীর ছাপ ফেলে।
ওয়াজফান তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে হেয়ছে এই সময় বেশি কাঁদতে নেই যা নিজের কক্ষে যা এরপর ড্যানিয়েল কে ডেকে তার হাতে ইসাবেলার হাত দিয়ে বলে ওর খেয়াল রেখো না হলে তো তুমি জানোই আমি তোমার কি অবস্থা করতে পারি বলে সেখান থেকে সে চলে যায়।
অর্ষা মুখে হাসি ফুটে উঠে এতদিনে ভাই বোনের মিলন হলো তবে মিলনের কারণ সে জানে না ওয়াজফান এত সহজে কেন মাফ করলো এইটা সে বুঝলো না।
রাত গভীর। চাঁদের আলো জানালার ফাঁক দিয়ে ধীরে ধীরে ঘরে ঢুকছে, ছড়াচ্ছে মৃদু হালকা নীল আভা। অর্ষা নিজের বিছানায় শুয়ে আছে, গভীর নিদ্রার মধ্যে ভেসে যাচ্ছে অচেনা স্বপ্ন আর স্মৃতির ছায়ায়।
হঠাৎ সে অনুভব করে—তার জামার ভিতরে, পেটের ওপর কেউ আলতো করে স্পর্শ করছে। চমকে ওঠে অর্ষা, চোখের পাতা অর্ধমুক্ত করে তাকালো। তার বুকের ধড়ফড় শব্দ যেন রাতের নিস্তব্ধতাকে চিৎকারে ভেঙে দিল।
— “কি হয়েছে, কায়াস্থ সাহেব? এভাবে কেন… আমার সঙ্গে?”
ওয়াজফান জানত, অর্ষা এমন প্রশ্ন করবে। আজ সে আর আগের মতো চিৎকার করবে না, আর তার মৃদু দ্বিধা-ভরা গলায় ভয়ও নেই। কারণ, তার লিটল মনস্টার ধীরে ধীরে সুস্থ হচ্ছে। পুরোপুরি নয়—তবে আগের দিনের মতো ক্যালিয়নের নাম বলার তীব্রতা এখন অনেকটাই কম। তার মনে নতুন আলো ফুটেছে, নতুন স্বস্তি এসেছে।
ওয়াজফান অর্ষার দিকে ধীরে ধীরে এগিয়ে এল।
তার হাতে অর্ষার কোমল দেহকে আলতো করে টেনে নিজের কোলে বসিয়ে নিল। ধীরে ধীরে জড়িয়ে ধরে নিজের বুকে আঁকড়ে ধরল।
তার ঠোঁট অর্ষার ঘাড়ে ডুবিয়ে ফিসফিস করে বলল—
— “কেন রে? লিটল মনস্টার… আমার ছোঁয়া কি তোমার ভালো লাগছে না? আমি কি চলে যাবো?”
অর্ষার চোখ অদ্ভুত চমকে উঠল। বুকের ভেতর কেমন যেন এক ঝাঁক কাঁপন ছড়িয়ে গেল। সে নিজেও বুঝল, এক মুহূর্তে তার মন অচেনা উত্তেজনায় ভরে উঠছে।
কিন্তু তারপর সে নিজে থেকেই বলল—
— “না… আমি এটা কখন বললাম?”
ওয়াজফান মনে মনে হাসল, যদিও মুখে কোনো ভাব দেখাল না।
ভালোবাসার অদ্ভুত এই মুহূর্ত—যেখানে ভয় আর স্বীকারোক্তির মধ্যে সূক্ষ্ম ভারসাম্য, সেখানে তার লিটল মনস্টার নিজেই বেছে নিয়েছে, সে কেবল অপেক্ষা করছে।
এরপর ওয়াজফান আলতো করে তার কানের লতিতে ছোট্ট কামড় দেয়। মুহূর্তের মধ্যে অর্ষার পুরো শরীরে শিহরণ ছড়িয়ে পড়ে—এক অদ্ভুত মিশ্রণ আনন্দ, বিস্ময় এবং নরম লজ্জার।
ওয়াজফানের কণ্ঠ ফিসফিসের মতো—হালকা, নরম, কিন্তু প্রতিটি শব্দে মধুর খেলাপনা—ঘরে ভেসে উঠল।
— “দেখেছো জান পাখি, ইসাবেলা আমাদের অনেক পরে বিয়ে করছে, আর কত সুন্দর একটা ছোট্ট বেবি নিয়ে আসছে এই দুনিয়ায়। তোমার কি ছোট্ট বেবির সঙ্গে খেলার ইচ্ছে নেই? চল, আমরাও একটা ছোট্ট বেবি আনি।”
অর্ষার গালের রঙ লাল হয়ে ওঠে। তার চোখ লাজুকভাবে মাটির দিকে নেমে আসে। বুকের ভেতরে যেন অচেনা উষ্ণতা ছড়িয়ে পড়ছে, আর ঠোঁট সামান্য কেঁপে ওঠে।
ওয়াজফান তার রিয়্যাকশন লক্ষ্য করে—মৃদু হাসি ফোটে তার ঠোঁটে। বুঝতে পারল, আজ তার লিটল মনস্টার কোনোভাবে তাকে প্রতিরোধ করবে না। সে আজ ভেতরের ভীতি সরিয়ে দিয়েছে, সমস্ত দ্বিধা কেটে ফেলেছে।
তাহলে কি আজ, এই মুহূর্তে, তার ছোট্ট মনস্টার পুরোপুরি তার কাছে এসেছে—শুধু তার কাছে, শুধু ওয়াজফানের কাছে?
ওয়াজফান ধীরে ধীরে তার কোলে আরও আঁকড়ে ধরল অর্ষাকে, যেন কোনোভাবেই ছাড়বে না।
ওয়াজফান ধীরে ধীরে অর্ষাকে শুইয়ে দেয় বিছানায়। পুরো ঘর নীরব, কেবল তাদের নিঃশ্বাসের হালকা শব্দ বাতাসে ভেসে আসে।
তার চোখ অর্ষার দিকে চেয়ে থাকে—অচেনা, শান্ত, কিন্তু ভেতরে গভীর আগুনে জ্বলছে।
তার ঠোঁট আলতোভাবে অর্ষার ঠোঁটের সাথে মিশে যায়, দীর্ঘ চুম্বনের ঝাঁকে ঝাঁকে সময় যেন থেমে যায়।
ধীরে ধীরে ঠোঁট থেকে নেমে আসে ওয়াজফান, তার চুম্বন ঘাড়ে পৌঁছায়। সেখানে আলতো করে কামড় দিয়ে মৃদু হাসি ফোটে তার ঠোঁটে। কিন্তু এই মুহূর্তের মধুরতা কেবল মুহূর্তের।
হঠাৎ, অর্ষা সব ভুলে যায়। কষ্ট, বিভ্রান্তি, এবং তার মধ্যে জমে থাকা আগের সব স্মৃতি একসাথে তার মনে ঝলসে ওঠে। সে চিৎকার করে কেঁদে ওঠে।
কান্নার শব্দ ঘর ভরিয়ে দেয়। ওয়াজফান তার দিকে তাকিয়ে থাকে, যেন কিছু বলার জন্য মুখ খুলছে, কিন্তু অর্ষা হঠাৎ তার কাঁধ ধাক্কা দিয়ে তার থেকে দূরে সরে যায়।
— “কে আপনি! কেন আমাকে ছুয়ে দিচ্ছেন? আমি আপনাকে চিনি না! কেন এভাবে আমাকে স্পর্শ করছেন? আমাকে আমার ক্যালিয়নের কাছে যেতে দিন! কে আপনি! আমাকে ছুবেন না! দূরে যান!”
ওয়াজফানের বুকের ভেতর দম বন্ধ হয়ে আসে। আজ যেন সে নিজেকে কন্ট্রোল রাখতে পারল না। এ আগেও যতবার সে অর্ষার সাথে এই ধরনের ঘনিষ্ঠ মুহূর্ত চেয়েছে, সব সময় অর্ষা এমনভাবে নিজেকে দূরে সরিয়ে নিয়েছে।
কিন্তু আজ—আজ তার ভেতরে অন্য এক বুদ্ধি কাজ করছে। সে জানে, কি করলে তার লিটল মনস্টার নিজে থেকে আজ নিজের সমস্ত কিছু তার কাছে সমর্পণ করবে।
ওয়াজফানের চোখে সেই চিন্তা নিয়ে এক বাঁকা হাসি ফুটে ওঠে। সে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়, অর্ষার দিকে তাকিয়ে। ঘরের নিঃশ্বাস যেন থমকে গেছে, সময় যেন স্থির হয়ে গেছে—এখন শুধু অপেক্ষা, ধৈর্য, আর আশা।
ওয়াজফান ধীরে ধীরে অর্ষার চোখে চোখ রেখে বলল—
— “তুমি ক্যালিয়নকে চাও, তাই তো? তার জন্য আমাকে উপেক্ষা করছো। তবে আজ তোমার ক্যালিয়ন বাঁচবে না। আজ তাকে আমি মেরে দেব—তুমি দেখবে, তোমার চোখের সামনে।”
তার হাত থেকে বের হলো এক লাল কাচের বল। সেই বলের মধ্যে যেন পুরো ঘটনা জীবন্ত হয়ে উঠল—কেউ ক্যালিয়নকে বেঁধে মারছে। অর্ষার হৃদয় জড়িয়ে ধরল। হৃদস্পন্দন দ্রুত বেড়ে গেল, চোখে অশ্রু জমে এল। এই দৃশ্য সত্যি না হলেও, অর্ষা তা বুঝতে পারল না। তার মনে হলো, ওর প্রিয় ক্যালিয়ন সত্যিই বিপদে।
হঠাৎ সে চিৎকার করে দৌড়ে গেল। ওয়াজফানের পায়ের কাছে এসে হাত পেঁচিয়ে ধরে, কেঁদে কেঁদে চিৎকার করল—
— “প্লিজ! আপনি এটা করবেন না! ওকে মারবেন না! ওকে কেন মারছেন? ও কি আপনাকে কোনো ক্ষতি করেছে?”
ওয়াজফানের ঠোঁটে বাঁকা হাসি ফোটে। চোখে এক অদ্ভুত খেলাপনা, ভয় এবং শক্তির মিশ্রণ। সে ধীরে ধীরে ফিসফিস করে বলল—
— “ক্ষতি কি করেছে, সেটা এখন জানা জরুরি না। তবে তুমি যদি ওকে বাঁচাতে চাও, তবে একটাই উপায়—তুমি আমাকে খুশি করো।”
অর্ষার চোখ বড় হয়ে যায়। কণ্ঠে ভীতিকর উত্তেজনা, চোখে ক্রোধ আর দুঃখের ছায়া—সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত ঝড়ের সৃষ্টি হয়।
ওয়াজফান আরও ধীরে বলে—
— “যদি আমাকে খুশি করতে পারো, তবে আমি ওকে ছেড়ে দেবো। শুধু তুমি আমাকে খুশি করবে।”
অর্ষা এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। মনে হলো পুরো পৃথিবী থমকে গেছে। তারপর সে ধীরে উঠে দাঁড়ালো, চোখে দৃঢ়তা, কণ্ঠে স্পষ্টতা—
— “বলুন, আমাকে কি করতে হবে? কি করলে আপনি খুশি হবেন?”
ঘরের নিঃশ্বাস যেন থমকে গেল। ওয়াজফান সেই প্রশ্ন শুনে বাঁকা হাসি আরও গভীর করল। এই মুহূর্ত—ভয়, টানাপোড়েন, প্রেম ও শক্তির এক মিলিত ধারা—মুহূর্তটাকে আরও আবেগঘন করে তুলল।
ওয়াজফান ধীরে ধীরে অর্ষার চোখে চোখ রেখে তাকাল। তার দৃষ্টি যেন একে একে অর্ষার পা থেকে মাথা পর্যন্ত স্ক্যান করছিল। প্রতিটি স্পর্শ, প্রতিটি আন্দোলন তার চোখে ভেসে উঠছিল। তারপর কণ্ঠে ফিসফিস করে বলল—
— “নিজের ইচ্ছায়, নিজের সবটুকু আমাকে বিলিয়ে দাও। তোমার শরীরের একেকটা অংশ আমার মধ্যে বিলিয়ে দাও। তাহলে আমি ওকে ছেড়ে দেব।”
অর্ষা যেন মুহূর্তের মধ্যে পুরোপুরি থমকে গেল। তার বুকের ওপর আকাশ ভেঙে পড়ল। হৃদয় ভেঙে গেছে মনে হলো, ভেতরে এমন চাপ, এমন অচেনা অন্ধকার, যা সে আগে কখনো অনুভব করেনি। সে পিছিয়ে গেল, চোখের কোণে অশ্রু জমে উঠল, কণ্ঠে কেঁপে ওঠা শব্দ—
— “এটা সম্ভব না! আপনি জানেন, আপনি কি চাইছেন!”
ওয়াজফানের চোখে তখনও তীব্রতা। সে কিছুক্ষণ চুপ করে তাকিয়ে থাকে, তারপর কণ্ঠে ধীরে ধীরে হালকা হাহাকার মেশানো রাগ—
— “আচ্ছা, তাহলে আমি ওকে মেরেই দিই। তুমি যেহেতু রাজি হবে না, আমার কথা শুনবে না।”
কথাটা বলেছে পা বাড়ি বেরিয়ে যেতে নিলে,,
মুহূর্তের মধ্যে অর্ষার ভেতরে ভয় আর ভালোবাসার এক অদ্ভুত মিশ্রণ জন্ম নেয়। সে দ্রুত হাত বাড়িয়ে ওয়াজফানের হাত ধরে বলল—
— “না, না! তাকে কিছু করবেন না! আমি রাজি… আপনি যা বলবেন, আমি সব করব। আমি সব করতে রাজি আছি… শুধু ওকে ছেড়ে দিন।”
Death or Alive part 38
ওয়াজফানের চোখে সেই অনিশ্চয়তা, উত্তেজনা এবং শক্তি আরও গভীর হয়ে উঠল। সে জানল—অর্ষা নিজেই স্বীকার করে ফেলেছে যে সে তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে নয়। তবে সেই স্বীকারোক্তির মধ্যে লুকিয়ে আছে ভয়, ভালোবাসা, আর অদৃশ্য বাধ্যবাধকতা।
ঘরের নীরবতা যেন হঠাৎ চূর্ণ হয়ে গেল, বাতাসে ভেসে আসে অর্ষার দ্রুত শ্বাস, ওয়াজফানের স্থির দৃষ্টি, এবং দু’জনের মধ্যে জমে থাকা সেই অদ্ভুত উত্তেজনা—যা শুধু অনুভব করা যায়, বলা যায় না।
