মহাপ্রয়াণ পর্ব ৩১+৩২
নাফিসা তাবাসসুম খান
বাসকোভ প্রাসাদের হলরুমে আজ পিনপতন নীরবতা। কারো মুখেই কোনো কথা নেই। ক্রিয়াস হলরুমে প্রবেশ করতেই আরোণ তার দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকায়। ক্রিয়াস আস্বস্ত করে বলে,
” লোল্যান্ডা আছে ক্যাথরিনের পাশে। ”
আরোণ চুপচাপ বসে থাকে। হঠাৎ হলরুমের সকল নেকড়েরা এক হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে। আরোণ সামনে তাকিয়ে অবাক হয়। প্রশ্ন করে,
” কি করছো তোমরা? ”
নেকড়েদের মাঝে একজন বলে,
” আমাদের জন্য ক্যাথরিন আপনাকে ঘৃণা করে। আমাদের ক্ষমা করুন আলফা। ওর মা বাবার খুনী আমরা ছিলাম, আপনি নন। ”
আরোণ তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বলে,
” খুনি এবং খুনের আদেশদাতা উভয়ই অপরাধী হয়। তোমাদের আর কি দোষ বলো? তোমরা তো কেবল আমার আদেশ পালন করো। ”
ক্রিয়াস বলে উঠে,
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
” আপনি বললে আমরা সবাই মিলে ক্যাথরিনের কাছে ক্ষমা চাইবো আলফা। সকল শাস্তি মাথা পেতে নিবো। তবুও আপনাদের মাঝের ভুল বুঝাবুঝি দূর করবো আমরা। ”
সকলেই একমত পোষণ করে। আরোণ হালকা হাসে। উঠে দাঁড়িয়ে হলরুম থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে সে বলে,
” নেকড়েদের জীবনে ভালোবাসা হচ্ছে অভিশাপ। আর আমি সেই অভিশাপে অভিশপ্ত। ”
এটুকু বলে হলরুম থেকে বেরিয়ে পড়ে আরোণ। সকলেই তাকিয়ে আছে তার যাওয়ার পানে। তাদের আলফাকে তারা কখনো পরাজিত হতে দেখে নি। কিন্তু অতিতে যত নেকড়েকে তারা ভালোবাসতে দেখেছে তারা সকলেই পরাজিত হয়েছে। ক্রিয়াস মনে মনে প্রার্থনা করে,
” আলফা যেন পরাজিত না হয়। ”
” সকল নারী কোভেনদের মেরে ফেলো। ”
ম্যাথিউর কথা শুনে ভ্রু কুচকে তাকায় রিকার্ডো। ম্যাথিউ নিজেই আবার বলে,
” কোনো নারী ভ্যাম্পায়ার না থাকলে জ্যাকসনের সন্তান কে গর্ভে নিবে? তখন জ্যাকসনের হাইব্রিডে পরিণত হওয়ার স্বপ্ন স্বপ্নই রয়ে যাবে। ”
” আমার সাথে ঠাট্টা করছিস তুই? ”
” তোমার সাথে আমার সম্পর্ক কি ঠাট্টা করার? ”
” তাহলে আজেবাজে না বকে আমার কক্ষ থেকে বের হ। ”
” আমি তোমার আদেশ মানতে বাধ্য নই। ”
রিকার্ডো রেগে বলে উঠে,
” তুই কোভেনদের সদস্য। আর আমি তোর কাউন্ট। তাই তুই আমার আদেশ মানতে আলবাত বাধ্য। ”
” তোমার এই এক কথা শুনতে শুনতে কান পঁচে গেলো আমার। নতুন কিছু বলো তো। ”
রিকার্ডো বিরক্ত হয়ে আর কিছু বলে না। এই ছেলের সাথে কথা বলে লাভ নেই। সে নিজের তৈরি হওয়াতে মন দেয়। আজ অমাবস্যার রাত। এই রাতে ভ্যাম্পায়ারদের এখানে একটি আনুষ্ঠানিকতা পালন করা হয়। সকল কোভেনদের উপস্থিতিতে যেকোনো সাতজন ভৃত্যকে ভ্যাম্পায়ারে রূপান্তর করা হয়। সেই সাতজন ভৃত্য অবশ্যই নিজ ইচ্ছায় ভ্যাম্পায়ার হওয়ার আবেদন জানায়। আর তাদের ভ্যাম্পায়ারে পরিণত করে রিকার্ডো নিজে।
তৈরী হয়ে হলরুমে একসাথে প্রবেশ করে রিকার্ডো এবং ম্যাথিউ। যে যার আসনে গিয়ে বসে পড়ে। রিকার্ডো একবার চারিদিকে চোখ বুলিয়ে নেয়। হলরুমে এখন সকল ভ্যাম্পায়ার এবং ভৃত্য উপস্থিত আছে। কেবল আনাস্তাসিয়া নেই। রিকার্ডো চোখের ইশারায় একজন ভৃত্যকে কাছে ডাকে। তারপর তার কানে কানে কিছু একটা বলে। সেই ভৃত্যটা বেরিয়ে যেতেই রিকার্ডো আবার চারিদিকে চোখ বুলিয়ে নেয়। ক্যামিলো এবং ড্যানিয়েলও উপস্থিত নেই এখানে। আজকের রাতে তাদের শিকারে বের হতে কে বলেছিলো? এই রাতে সকলেরই এখানে উপস্থিত থাকা উচিত। নিশ্চিত ড্যানিয়েলই নিজের সাথে ক্যামিলোকে নিয়ে গিয়েছে। তারা ফিরলে তাদের সাথে এ বিষয়ে কথা বলবে বলে ঠিক করে রিকার্ডো।
ঘুমঘুম চোখে বিছানায় বসে টলছে আনাস্তাসিয়া। চোখেমুখে বিরক্তিও ফুটে আছে। তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা জোসেফকে তার মন চাচ্ছে জানালা থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে মেরে ফেলতে। ঘুমের মাঝে কারো বিরক্ত করাটা তার মোটেও পছন্দ নয়। জোসেফ আবার চেচিয়ে বলে,
” এই মেয়ে। উঠে চোখেমুখে ঠান্ডা পানি ছিটিয়ে আমার সাথে চলো। কাউন্ট সেই কখন ডেকে পাঠিয়েছে। যেই কুম্ভকর্ণের মতো ঘুমাচ্ছিলে তোমাকে ডেকে তুলতেই কত সময় পেরিয়ে গিয়েছে। ”
আনাস্তাসিয়া একবার চোখ তুলে জানালা দিয়ে বাইরে তাকায়। ঘুটঘুটে অন্ধকার বাহিরে। একদম মাঝরাত এখন। সে বিরক্ত স্বরে বলে,
” তোমার কাউন্ট ভ্যাম্পায়ার হতে পারে আমি না। সাধারণ মানুষের এটা ঘুমানোর সময়। তার যদি এই মাঝরাতে গোসল করার শখ জাগে তাহলে তাকে বলো তার প্রিয় কৃষ্ণ সাগরে গিয়ে ডুব দিয়ে গোসল করতে। আমি এই মাঝরাতে তার জন্য গিয়ে গোসলখানা তৈরী করতে পারবো না। ”
এটুকু বলেই আনাস্তাসিয়া চাদর টেনে শুয়ে পড়ে। জোসেফ চেচিয়ে উঠে,
” এই মেয়ে। এক লাইন বেশি বুঝা কি তোমার স্বভাব? উঠো বলছি। কাউন্ট অপেক্ষা করছে। ”
আনাস্তাসিয়া শোয়া থেকে লাফিয়ে বিছানার উপর উঠে দাঁড়িয়ে বলে,
” এই মেয়ে বলে কাকে ডাকো তুমি? হ্যাঁ? আনাস্তাসিয়া আমার নাম। আমার নাম ধরে ডাকবে। আর তোমার কাউন্টের কোনো আদেশ নিয়ে আমার সামনে বেশি ভাষন দিতে আসলে তোমাকে তুলে নিচে ছুড়ে ফেলবো। একদম তোমার কাউন্টের কোলে গিয়ে পড়বে তুমি। ”
আনাস্তাসিয়ার কথা শুনে জোসেফ বিস্ফোরিত চোখে তাকিয়ে থাকে। আনাস্তাসিয়া তাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে নিজেই বলে উঠে,
” আমার ঘুমের সমাধি হয়ে গিয়েছে। জেগে থেকে কি আর করবো এখন। তুমি বাহিরে অপেক্ষা করো আমি তৈরি হয়ে আসছি। দেখি তোমার কাউন্টের মাঝরাতে কি ব্যামো হয়েছে। ”
জোসেফ চুপচাপ কক্ষ থেকে বেরিয়ে যায়। তার কিছুক্ষণ পরই আনাস্তাসিয়া বেরিয়ে এসে চুপচাপ সিঁড়ি বেয়ে হাঁটা ধরে। জোসেফও পিছনে পিছনে নামতে থাকে। আনাস্তাসিয়া হঠাৎ প্রশ্ন করে,
” তোমার পরিবার নেই? ”
” আছে। ”
” কে কে আছে পরিবারে? ”
” স্ত্রী, সন্তান। ”
” তাহলে তুমি বাসায় যাও না? ”
” যখন প্রয়োজন পড়ে যাই। ”
” এই দূর্গে সব কি শুধু পুরুষ ভৃত্য? ”
” দাসীও আছে। কিন্তু তারা সন্ধ্যার আগেই নিজেদের বাড়ি ফিরে যায়। ”
আনাস্তাসিয়া হালকা চেচিয়ে বলে,
” তার মানে এই মুহুর্তে এই প্রাসাদে কেবল আমিই একমাত্র মানব কন্যা? ”
” হ্যাঁ। ”
আনাস্তাসিয়া আর কোনো প্রশ্ন করে না। চুপচাপ হাঁটতে হাঁটতে নিচে চলে আসে। হলরুমে প্রবেশ করতেই সবাইকে দেখে সে অবাক হয়ে যায়। জোসেফকে নিচুস্বরে প্রশ্ন করে,
” এই এতো রাতে সবাই এখানে কি করছে? ”
জোসেফ কিছু বলার আগেই রিকার্ডো চোখের ইশারায় তাদের একপাশে দাঁড়াতে বলে। জোসেফ আনাস্তাসিয়াকে নিয়ে বাকি ভৃত্যদের সাথে একদিকে গিয়ে দাঁড়াতে নিবে তখনই হঠাৎ হলরুমের দরজা খুলে বাতাসের বেগে একটি দেহ মাটিতে এসে ছুড়ে পড়ে। আকস্মিক ঘটনায় আনাস্তাসিয়া ভয় পেয়ে ভ্যাম্পায়ারদের সারির দিকে লাফ দিয়ে সড়ে দাঁড়ায়। রিকার্ডো সহ সকল ভ্যাম্পায়াররাই দাঁড়িয়ে পড়ে। হলরুমের মাঝে আহত ড্যানিয়েলের দেহ পড়ে আছে। সে কোনমতে উঠে দাঁড়াতেই হলরুমের দরজা দিয়ে প্রবেশ করে জ্যাকসন। সাথে সাথে সকল ভ্যাম্পায়াররা হিংস্র রূপ ধারণ করে। রিকার্ডো ঝড়ের গতিতে জ্যাকসনের উপর হামলা করে। এক হাতে তাকে তুলে ছুড়ে তাকে আরেক দেয়ালের কাছে নিয়ে ফেলে। জ্যাকসনের এতে কোনো ভাবান্তর হয় না। উল্টো সে হাসতে থাকে। রিকার্ডো আবার আঘাত করবে তার আগেই ড্যানিয়েল বলে উঠে,
” ক্যামিলো জ্যাকসনের কাছে বন্দী। ”
সাথে সাথেই রিকার্ডো থেমে যায়। জ্যাকসন হেসে বলে উঠে,
” কাউন্ট রিকার্ডো। আমি আশা করেছিলাম আপনি আরো সুন্দর করে আমায় স্বাগতম জানাবেন। ”
রিকার্ডো চোয়াল শক্ত করে বলে,
” কি চাচ্ছিস তুই? ”
” চিন্তা করবেন না। চিন্তা করার কিছুই নেই। আমি আপনার মা কে অবশ্যই ফিরিয়ে দিবো। শুধু বিনিময়ে আমি এখান থেকে একজন নারী ভ্যাম্পায়ারকে বন্দী করে নিতে চাই। ”
রিকার্ডো সহ সকল কোভেনরাই বুঝে যায় জ্যাকসনের উদ্দেশ্য কি। ম্যাথিউ বলে,
” জানোয়ারের বাচ্চা তুই ভ্যাম্পায়ারদের সাথে চুক্তি করতে এসেছিস? মেরে তোকে এমনভাবে গুম করবো কেউ তোর অস্তিত্বও খুঁজে পাবে না। ”
জ্যাকসন ম্যাথিউর কথায় বিশেষ একটা পাত্তা দেয় না। উল্টো সকল কোভেনদের দিকে একবার তাকিয়ে বাতাসের গতিতে গিয়ে আনাস্তাসিয়াকে ধরে ফেলে। আনাস্তাসিয়া ভয়ে চিৎকার দিয়ে উঠে। জ্যাকসন বলে,
” এই মেয়েটাকে চাই আমার। কি সুন্দর জেসমিনের ঘ্রাণ ভেসে আসছে এর শরীর থেকে। ”
আনাস্তাসিয়ার মনে পড়ে যায় সে বিকেলে জোসেফকে দিয়ে জেসমিন ফুল আনিয়েছিলো৷ তার কক্ষের জানালা দিয়ে দূর্গের প্রধান ফটকের দিকে যখন তার চোখ পড়ে তখন দেখে ফটকের দুপাশে গাছে ঝাকে ঝাকে জেসমিন ফুল ধরে আছে। সেই ফুল দিয়ে সে একধরণের সুগন্ধি বানিয়ে রাতে ঘুমানোর আগে লাগিয়েছিলো। আনাস্তাসিয়ার ভাবনায় ফোড়ন কাটে ম্যাথিউর কথায়,
” মরার খুব শখ জেগেছে তোর? ”
জ্যাকসন রিকার্ডোর দিকে তাকিয়ে বলে,
” আপনার নিজের মা চাই নাকি সামান্য এক কোভেন নারী? ”
রিকার্ডোসহ সকলেই বুঝতে পারে জ্যাকসন আনাস্তাসিয়াকে কোভেনদের সদস্য মনে করছে। তার শরীর থেকে আসা জেসমিনের তীব্র ঘ্রাণের ফলে তার মানব ঘ্রাণ এখন পাওয়া যাচ্ছে না। রিকার্ডো স্পষ্ট বলে দেয়,
” নিয়ে যা এই মেয়েকে। কিন্তু আমার মা যেন দূর্গে ফিরে আসে। ”
ম্যাথিউসহ হলরুমে উপস্থিত কেউই অবাক হয় না। সকলেই খুব ভালো করে জানে এই সামান্য মেয়ের জীবনের পরোয়া করে না রিকার্ডো। কিন্তু অবাক হয় আনাস্তাসিয়া। তার চোখে মুখে বিস্ময়। তার মনে হয় কেউ যেন তার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। রিকার্ডোর দিকে সে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। রিকার্ডো নির্লিপ্ত। তাকে দেখে মনে হচ্ছে আনাস্তাসিয়ার বাঁচা মরা দিয়ে তার কিচ্ছু আসে যায় না। রিকার্ডোর নির্লিপ্ততা দেখে আনাস্তাসিয়া পরাজিত অনুভব করে। মুখ ফুটে আর কিছু বলে না সে। কোনো প্রতিবাদও করে না। জ্যাকসন সবার সামনে থেকে তাকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যায় কিন্তু একজনও বাঁধা দিতে আসে না।
আনাস্তাসিয়াকে নিয়ে যাওয়ার সাথে সাথেই ম্যাথিউ রাগে চিল্লিয়ে বলে উঠে,
” এই হচ্ছে ভ্যাম্পায়ারদের ক্ষমতা? শেষমেশ আমাদের এখন এই জ্যাকসনের মতো এক ময়লা নর্দমার কীটের সাথে চুক্তি করতে হবে? ”
রিকার্ডো শান্ত ভঙ্গিতে বলে,
” জ্যাকসন একটা মূর্খ। নিজের মূর্খতার প্রমাণ দিয়ে গেলো সে এইমাত্র। ভ্যাম্পায়ারের জায়গায় এক মানুষ তুলে নিয়ে গিয়েছে সে। আমাদের কিছু করতে হবে না আর। মাও এখন ফিরে আসবে দূর্গে আর জ্যাকসনের ইচ্ছেও পূরণ হবে না। ”
ম্যাথিউ প্রশ্ন করে,
” আর আনাস্তাসিয়া? তার কি হবে? ”
” মরুক সে। আমার কি আসে যায় তাতে? ”
ম্যাথিউ এমন উত্তরের প্রত্যাশাই করছিলো। সে জানে এখানে কারো কিছু আসে যায় না আনাস্তাসিয়ার কি হলো তা দিয়ে। ম্যাথিউ চুপচাপ ফোসফাস করতে করতে বেরিয়ে যায়। জোসেফের যেন হালকা মন খারাপ হলো। আনাস্তাসিয়ার সাথে কি হতে পারে তা নিয়ে ভাবতেই তার খারাপ লাগছে। জ্যাকসন যখন উপলব্ধি করবে আনাস্তাসিয়া কোনো ভ্যাম্পায়ার না তখন নিজের সকল রাগ জেদ সে আনাস্তাসিয়ার উপর বের করবে সে।
সবার চক্ষুগোচরে ড্যানিয়েলের বিরক্তিতে মুখ দিয়ে একটি বিশ্রী গালি বেরিয়ে আসে। এই মূর্খ জ্যাকসন কিনা হাইব্রিড হতে চায়? যার কিনা সামান্য মানুষ এবং ভ্যাম্পায়ারদের মধ্যে পার্থক্য সম্পর্কে ধারণা নেই। জ্যাকসনের সাথে হাত মিলানোটাই তার ভুল হয়েছে। ক্ষমতার লোভে মূর্খের সাথে হাত মিলিয়ে বিপদ বাধানোটা বোকামি হবে।
লোল্যান্ডাকে জোর করে কক্ষ থেকে বের করে দেয় ক্যাথরিন। সেই কখন থেকে সে বাহির থেকে দরজার কড়া নেড়ে যাচ্ছে। ক্যাথরিন কোনো প্রতুত্তর করছে না। প্রহরী নেকড়ে দুজন একবার লোল্যান্ডাকে বলেছে তারা কি দরজা ভাঙবে? কিন্তু লোল্যান্ডা মানা করে দিয়েছে। এসব করলে ক্যাথরিন আরো রেগে যাবে। তার হয়তো এখন একা থাকাই উত্তম হবে। নিজের কক্ষে প্রবেশ করছিলো আরোণ কিন্তু ক্যাথরিনের কক্ষের সামনে থেকে শব্দ পেয়ে সেদিকে ছুটে আসে সে। এসেই দেখে লোল্যান্ডা এবং প্রহরী দুজন দরজার বাহিরে দাঁড়িয়ে আছে। আরোণকে দেখে লোল্যান্ডা বলে উঠে,
” দরজা খুলছে না আলফা। ”
আরোণ হালকা করে বলে,
” তোমরা যেতে পারো। ”
লোল্যান্ডা এবং প্রহরীরা চলে যেতেই আরোণ দরজার কাছে এসে হালকা স্বরে ডাকে,
” ক্যাথ। ”
ভেতর থেকে কোনো প্রতুত্তর ভেসে আসে না। আরোণ আর কোনো কথা না বলে দরজার সাথে পিঠ করে বসে পড়ে। তারপর নিজে একাই বলতে শুরু করে,
” আমি জানি দরজার ওপারে তুমি এখন বসে আছো আর আমার কথা শুনতে পাচ্ছো। বিশ্বাস করো ক্যাথ আমার কাছে যদি এমন কোনো শক্তি থাকতো যা দিয়ে আমি তোমার কষ্ট একাংশও দূর করতে পারতাম তাহলে বিনা সময় ব্যয়ে এক্ষুনি আমি তা করতাম। আমি জানি তোমার কাছে আমি নিকৃষ্ট কোনো জানোয়ারের থেকে কম নই। আমিও নিজেকে তাই মনে করি। কিন্তু আমার কি দোষ বলো? আমার এই জীবন তো আমি সাদরে গ্রহণ করি নি। আমার পিতার লোভের শাস্তি হিসেবে আমি এই জীবন পেয়েছি। নিজের হিংস্রতা এবং নেকড়ে সত্ত্বাকে নিয়ন্ত্রণে আনতে লোকালয় ছেড়ে পালিয়ে আসি সিবিউর এই গহীন অরণ্যে৷ অরণ্যের গহীনে আবিষ্কার করি পরিত্যক্ত এই বাসকোভ প্রাসাদ। ধীরে ধীরে হয়ে উঠি এই বাসকোভ প্রাসাদ এবং নেকড়েদের আলফা। এই অরণ্যের মালিক। যেই অরণ্যকে সকলে ভয়ে পরিত্যাগ করেছে আমি সেই অরণ্যকে আপন করে নিয়েছি৷ এইসব কিছুই আমি মন থেকে করিনি। বাধ্য হয়ে করেছি। তারপর একদিন শত্রুকে তাড়া করতে আমি এই অরণ্য ছেড়ে বের হই। পাশের দেশে গভীর রাতে শত্রুকে খুঁজে ফিরতে গিয়ে তোমাকে খুঁজে পাই। আমার হিংস্র হৃদয় মন্ত্রমুগ্ধের ন্যায় তোমার দখলে চলে যায়। আমার হৃদয়ের হিংস্র ঝড়ের তান্ডব শীতল হাওয়ায় বদল হয়৷ ”
এই পর্যায়ে আরোণ একটু থামে। দম নেয়। এতক্ষণ কথা বলার সময় তার কণ্ঠনালীতে সূক্ষ্ম ব্যথা অনুভব করছিলো সে। কিন্তু এখন সেই ব্যথা অনেকাংশেই কমে আসছে। দরজার ওপাশ থেকে ক্যাথরিনের ফুপিয়ে কান্নার শব্দ ভেসে আসছে। আরোণ আবার বলা শুরু করে,
” তুমি আমাকে প্রশ্ন করতে না আমি তোমাকে ভালোবাসি নাকি? ”
এবার অপাশ থেকে কান্নার শব্দ কমে আসে। আরোণ স্পষ্ট স্বীকারোক্তি দেয়,
” আমি তোমাকে ভালোবাসি ক্যাথ। এই তিনটি শব্দ আমার কাছে কম মনে হচ্ছে তোমার প্রতি আমার ভালোবাসার প্রমাণ দেওয়ার জন্য। তবুও আমি বলছি। আমি তোমাকে ভালোবাসি। আমার একটি সত্ত্বা যেমন শুধু হিংস্রতার জন্যই সৃষ্টি, তেমন আমার আরেকটি সত্ত্বার সৃষ্টি কেবল তোমায় ভালোবাসার জন্য। তুমি আমার জীবনে এমনভাবে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে পড়েছ যে এখন তোমায় ছাড়া জীবন কল্পনা করলে আমি শুধু একটাই উত্তর পাই। মৃত্যু। জীবন এবং মৃত্যু দুটোকে সাক্ষী রেখে আমি বলছি, আমি তোমায় ভালোবাসি। ”
ওপাশ থেকে কোনো শব্দ না পেয়ে আরোণ উঠে দাঁড়ায়। চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই পিছন থেকে দরজা খোলার শব্দ পায় সে। সম্পূর্ণ শরীর ঘুরিয়ে পিছনে ফিরে তাকায় সে। ক্যাথরিন দরজা খুলেছে। আরোণ তাকাতেই দুজনের দৃষ্টি মিলন হয়। আরোণ দুকদম এগিয়ে যায়। বারান্দার দরজা দিয়ে আসা ফিনফিনে বাতাসে ক্যাথরিনের দু একটা চুল উড়ছে। আরোণ এগিয়ে আসতেই ক্যাথরিন বলে,
” আমিও তোমাকে ভালোবাসি আরোণ। ”
এটুকু বলেই আরোণের বুকে মুখ গুজে ক্যাথরিন। আকস্মিক ঘটনায় আরোণ নির্বাক হয়ে রয়। ক্যাথরিনের এই ছোট স্বীকারোক্তি যেন এক পশলা বৃষ্টি হয়ে তাকে ছুঁয়ে গেলো। ক্যাথরিন অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে বলে,
” সবাইকে হারিয়েছি আমি। তোমার প্রতি ভালোবাসা আর অস্বীকার করা সম্ভব নয় আমার দ্বারা। তোমাকে হারাতে পারবো না আমি। পাহাড়সম পাপ যদি ঈশ্বর ক্ষমা করতে পারে তাহলে আমি কেন তোমায় ক্ষমা করতে পারবো না? সবাইকে হারানোর যন্ত্রণায় কাতর আমি। তোমাকে আঁকড়ে বাঁচতে চাচ্ছি। তুমি হারিয়ে যেও না অন্তত। ”
আরোণ দু’হাতে ক্যাথরিনকে আগলে ধরে। তার কপালে অধর ছোঁয়ায়। তারপর বলে,
” পরিণতি যাই হোক শেষ পর্যন্ত ছেড়ে যাবো না কোথাও। নিজেকে তোমার কাছে সমর্পণ করছি আজ আমি। আরোণের উপর শুধু তোমার অধিকার আছে। শুধু তোমার। ”
ক্যামিলো ফিরে এসেছে প্রাসাদে। ম্যাথিউ মা ঠিক আছে দেখে কক্ষে ফিরে আসে। চোখ বন্ধ করে বিছানায় শোয়ার পরও তার অস্থির লাগছে। রাগে সে বিড়বিড়িয়ে বলে,
” যে যাওয়ার সে চলে গিয়েছে। তাকে নিয়ে ভেবে আর মাথা খারাপ করিস না ম্যাথিউ। আমি এতো দূর্বল নই। উল্টো ওই মেয়ে মারা গেলে ভালোই হবে। আমার মন অন্তত শান্ত হবে। নাহয় এই মেয়েকে নিয়ে আমার অস্থিরতা কমবে না কখনো। ”
নিজেকে মিছে শান্তনা দিয়ে বেরাচ্ছে ম্যাথিউ। কারণ সে ভালো করেই জানে আনাস্তাসিয়াকে বাঁচানোর কোনো রাস্তা নেই। উল্টো জ্যাকসন হয়তো এতক্ষণে তাকে মেরেও ফেলেছে।
দরজায় করাঘাতের শব্দ পেতেই উঠে বসে ম্যাথিউ। ক্যামিলো কক্ষে প্রবেশ করে বলে,
” আমাকে ফিরিয়ে দেওয়ার বিনিময়ে জ্যাকসন আনাস্তাসিয়াকে তুলে নিয়ে গিয়েছে? ”
” হুম। ”
” তোরা কিছু বলিস নি জ্যাকসনকে? ”
” কি বলতাম? ”
” যে আনাস্তাসিয়া ভ্যাম্পায়ার নয়। ”
ম্যাথিউ বিরক্তির সুরে বলে,
” কি বলতাম মা? তোমাদের তো উল্টো উপকারই হয়েছে। কোনো ভ্যাম্পায়ার তুলে নেওয়ার পিছনে ওর উদ্দেশ্য সম্পর্কে নিশ্চয়ই তুমি অবগত আছো। সেখানে ভুল করে আনাস্তাসিয়াকে তুলে নেওয়ার ফলে এখন জ্যাকসনের উদ্দেশ্য সফল হবে না। ”
ক্যামিলো চিন্তা মিশ্রিত স্বরে বলে,
” কিন্তু জ্যাকসন যখন উপলব্ধি করবে যে আনাস্তাসিয়া ভ্যাম্পায়ার না তখন সে রেগে যাবে। আনাস্তাসিয়া তার কোনো কাজে আসবে না বিধায় তাকে মেরে ফেলবে। ”
” তুমি কেন এতো চিন্তা করছো? তোমার প্রিয় পুত্র বলে দিয়েছে আনাস্তাসিয়া মরুক কিংবা বাঁচুক তাতে তার কিচ্ছু আসে যায় না। তুমিও নিজের কক্ষে গিয়ে এখন আরাম করো। ”
ক্যামিলো এতটুকু শুনেই চুপচাপ বেরিয়ে যায়। সে
মনে মনে ভেবে পায় না যে রিকার্ডো এই কথা বলেছে। রিকার্ডোর মনে কি চলছে তা বুঝা মুশকিল হয়ে পড়েছে।
জ্যাকসন যতক্ষণে বুঝতে পেরেছে যে আনাস্তাসিয়া ভ্যাম্পায়ার না ততক্ষণে বেশ দেরি হয়ে গিয়েছে। ক্যামিলো এতক্ষণে দূর্গে ফিরেও গিয়েছে। রাগে জেদে সে আনাস্তাসিয়ার সামনে নিজের নেকড়ে রূপ ধারণ করে। আকস্মিক মানব রূপী কাউকে নেকড়ের রূপ ধারণ করতে দেখে আনাস্তাসিয়া ভয়ে চিৎকার করে উঠে। কিন্তু এই অরণ্যে তার চিৎকার শোনার জন্য কেউ নেই। জ্যাকসন লাফিয়ে এসে আনাস্তাসিয়ার উপর আক্রমণ করে। আনাস্তাসিয়াকে কামড় দেওয়ার জন্য যখনই সে উদ্ধুদ্ধ হয় তখনই হঠাৎ একটি মেয়েলি কণ্ঠ শুনতে পায়। ওয়ানা বলে উঠে,
” জ্যাকসন। ”
জ্যাকসন হিংস্র দৃষ্টিতে তাকায় ওয়ানার দিকে। আনাস্তাসিয়া ভয়ে একচুল পরিমাণ নড়তে পারছে না। ওয়ানা আবার বলে উঠে,
” আমাদের সময় থাকতেই এখান থেকে প্রস্থান করা উচিত। ”
জ্যাকসন মানব রূপ ধারণ করে হিংস্র স্বরে বলে উঠে,
” এই মেয়েকে জীবিত ফেলে যাবো? ”
” ওকে মারার ব্যবস্থা আমি করে ফেলেছি। তিলে তিলে মরবে এই মেয়ে। ”
এটা বলে ওয়ানা পাশে ইশারা করে। আনাস্তাসিয়া আর জ্যাকসন দুজনেই ওয়ানার পাশে তাকিয়ে দেখে একটি বস্তা এবং দড়ি। ওয়ানা বলে,
” এই মেয়েকে বস্তায় বেধে অভিশপ্ত লেকে ফেলে দাও। পানিতে ডুবে ধুকে ধুকে মরবে। ”
জ্যাকসনের মুখে এক রহস্যময়ী হাসি ফুটে উঠে। সে কিছু বলবে তার আগেই আনাস্তাসিয়া পিছনে থেকে উঠে দৌঁড়ে পালাতে নেয়। জ্যাকসন সাথে সাথে বাতাসের গতিতে আনাস্তাসিয়ার চুলের মুঠি ধরে তাকে ওয়ানার কাছে নিয়ে আসে। ধস্তাধস্তিতে আনাস্তাসিয়ার হাতে কিছু আঁচড় বসে। হাত প্রচুর জ্বলছে তার। তবুও আনাস্তাসিয়া অনুরোধ করে বলে,
” দয়া করে আমাকে যেতে দাও। আমার কি অপরাধ? আমি তো জানিও না তোমরা কে। আমাকে মেরে তোমাদের কি লাভ? ”
জ্যাকসন বলে,
” ভুল সময় ভুল জায়গায় ছিলি এটাই তোর অপরাধ। আর তোকে মেরে আমাদের কোনো লাভ নেই। কিন্তু জীবিত ছেড়ে দিলে লোকসান হওয়ার সম্ভাবনা ঠিকই আছে। তাই তোকে মরতে হবে। ”
আনাস্তাসিয়া কাদতে কাদতে প্রতিরোধ করার চেষ্টা করে। কিন্তু জ্যাকসনের শক্তির সাথে পারে না। ওয়ানা মাটির উপর থেকে ভারী তিন চারটা পাথর তুলে আগে বস্তায় ভরে। তারপর জ্যাকসনের দিকে তাকিয়ে হেসে বলে,
” এখন আর এই মেয়ের ভেসে উপরে উঠার কোনো সুযোগ নেই। বস্তায় ভরে বেধে ফেলো ওকে। ”
জ্যাকসন জোরজবরদস্তি করে আনাস্তাসিয়ার হাত এবং পা বাধে দড়ি দিয়ে। তারপর তাকে বস্তায় ভরে। পুরোটা সময় আনাস্তাসিয়া চিল্লিয়ে বলছিলো,
” কেউ আছো এখানে? দয়া করে আমাকে সাহায্য করো। ”
বস্তার মুখ বন্ধ করার আগে জ্যাকসন হেসে বলে,
” এই মুহুর্তে এখানে তোকে সাহায্য করার কেউ নেই। কিন্তু চিন্তা করিস না। ওই লেকে তুই একা থাকবি না। লোকমুখে শুনতে পাওয়া যায় যে ওই লেক অভিশপ্ত। ওখানে নাকি অনেক প্রেতাত্মার বসবাস। ”
আনাস্তাসিয়া ভীত হয়ে পড়ে। তার শরীর ভয়ে জমে গিয়েছে। সে কিছু বলবে তার আগেই জ্যাকসন বস্তার মুখ বাঁধা শুরু করে দেয়। আনাস্তাসিয়া ভিতর থেকে চিৎকার করে বলতে থাকে,
” দয়া করে যেতে দাও আমাকে। আমি কাউকে কিছু বলবো না। তোমাদের সম্পর্কে কাউকে জানাবো না আমি। আমাকে যেতে দাও। ”
আনাস্তাসিয়ার চিৎকার জ্যাকসন কানে তুলে না। সে ওয়ানার দিকে তাকিয়ে বলে,
” তুমি লোকালয়ে ফিরে যাও। আমি এই মেয়ের ব্যবস্থা করে আসছি। ”
ওয়ানা মাথা নাড়িয়ে কোনো এক রাস্তা ধরে জঙ্গলের ভেতর হারিয়ে যায়। আনাস্তাসিয়া অনুভব করে বাতাসের গতিতে কিছুক্ষণের মধ্যেই জ্যাকসন তাকে নিয়ে অন্য কোথাও চলে এসেছে। সে কিছু বুঝে উঠার আগেই জ্যাকসন তাকে ছুড়ে লেকের মাঝে ফেলে দেয়। পানি অনুভব করতেই আনাস্তাসিয়া ভীত হয়ে পড়ে। হাত পা ছোটাছুটি করতে থাকে বের হওয়ার জন্য। কিন্তু কোনো লাভ হয় না। হাত পা বাধা হওয়ায় সে কিছুই করতে পারছে না। উল্টো আরো অনুভব করছে যে পাথরের কারণে সে আরো লেকের ভেতর তলিয়ে যাচ্ছে। আনাস্তাসিয়া চিৎকার করার চেষ্টা করে। কিন্তু মুখ খুলতেই উল্টো আরো মুখের ভেতর পানি চলে যায় তার। সাথে সাথে তার গা গুলিয়ে আসে। পানিতে মারাত্মক বাজে গন্ধ। আনাস্তাসিয়ার মনে পড়ে জ্যাকসনের বলা কথাটা। যে এই লেকে প্রেতাত্মারা বাস করে। সে মনে মনে ভাবে সত্যিই কি তাই? হয়তো তাদের লাশই এই লেকের গভীরে লুকিয়ে আছে। সেই লাশপচা গন্ধই হয়তো সে পাচ্ছে। আনাস্তাসিয়ার চোখ মুখ উল্টে যাচ্ছে প্রায়। সে মনে মনে একটিই প্রার্থনা করে। সে এই লেকের গভীরে মরতে চায় না।
আবার সে হাত পা ছোটাছুটির চেষ্টা করে । কিন্তু কোনো লাভ হয় না। বস্তাটা লেকের একদম গভীরে ডুবে যেতেই পানির নিচের একটি পাথরের সাথে সে মাথায় আঘাত পায়। হঠাৎ এতো জোরে আঘাত পাওয়ার ফলে আনাস্তাসিয়ার হাত পা ছোটাছুটি ধীরে ধীরে কমে আসে। শরীর অসার হয়ে জ্ঞান হারায় সে।
সকাল সকাল ক্যামেলিয়া ফুলের ঘ্রাণ পেতেই ক্যাথরিনের ঘুম ভেঙে যায়। চোখ মেলে তাকিয়ে দেখে তার বালিশের পাশে এক গুচ্ছ লাল ক্যামেলিয়া ফুল রাখা। ক্যাথরিনের মুখে হাসি ফুটে উঠে। সে উঠে বসে ফুলগুলো হাতে নিয়ে সেগুলো নাকের কাছে নিয়ে ঘ্রাণ নেয়। বেশ তাজা। যেন একটু আগেই কেউ গাছ থেকে নিয়ে এসেছে। ক্যাথরিন বুঝতে পারে কাজটা কে করেছে। সে ফুলগুলো হাতে নিয়েই বিছানা ছেড়ে নেমে আসে। সাথে সাথেই সে আরোণকে বারান্দায় দেখতে পায়। তার দিকে পিঠ করে দাঁড়িয়ে আছে। সে মনে মনে ভাবে জীবনে যা কিছু হারিয়েছে তা নিয়ে দুঃখবিলাসী হয়ে বাকি জীবন কাটিয়ে দিলে তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এই খুশির কারণ থেকে সে আজীবনের জন্য বঞ্চিত হত। নিজের খুশি থাকার শেষ অবলম্বন সে এতো সহজে হারাতে চায় না। ক্যাথরিন হাসি মুখে বারান্দার দিকে পা বাড়াতে নিয়েও আবার আয়নার সামনে নিজেকে একবার দেখে নেয়। হাত দিয়ে চুলগুলো ঠিক করে পিঠে ছড়িয়ে দেয় সে। তারপর বারান্দায় গিয়ে আরোণের পিছনে দাঁড়িয়ে বলে,
” শুভ সকাল। ”
আরোণ হালকা হেসে বলে,
” এতো সকাল সকাল ঘুম ভেঙে গেলো? ”
ক্যাথরিন কিছু না বলে নিচের দিকে তাকিয়ে হালকা হাসে। আরোণ হেসে ক্যাথরিনকে টেনে নিজের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়। তারপর আলতো করে দু’হাতে তার কোমর জড়িয়ে প্রশ্ন করে,
” ফুল পছন্দ হয়েছে? ”
ক্যাথরিন হালকা হেসে বলে,
” হ্যাঁ। খুব সুন্দর। ”
আরোণ ফিসফিসিয়ে বলে,
” ক্যামেলিয়ার থেকে বেশি লাজে লাল তুমি হচ্ছো ক্যাথ। ”
ক্যাথরিন পিছনে ফিরে বলে,
” মোটেও লজ্জা পাচ্ছি না আমি। ”
আরোণ ক্যাথরিনের চোখের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে,
” তুমি লজ্জা পাচ্ছো না? ”
ক্যাথরিন ভাব নিয়ে আত্মবিশ্বাসী সুরে বলে,
” না। ”
আরোণ সামান্য সামনের দিকে ঝুকে মৃদু স্বরে প্রশ্ন করে,
” সত্যিই পাচ্ছো না? ”
ক্যাথরিন হঠাৎ আরোণকে সামনে ঝুকতে দেখে আমতা আমতা করে বলে,
” না। ”
আরোণ আরেকটু ঝুকে প্রশ্ন করে,
” তুমি নিশ্চিত ক্যাথ? ”
” হ্যাঁ। ”
এখন দুজনের মধ্যে ব্যবধান মাত্র এক আঙুল সমান। ক্যাথরিন আরোণের নিশ্বাস স্পষ্ট টের পাচ্ছে। আরোণ আরেকটু সামনে এগুলো নিলেই ক্যাথরিন চোখ বুজে ফেলে। সাথে সাথে আরোণ ক্যাথরিনের কপালে অধর ছুঁইয়ে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে। ক্যাথরিন বোকার মতো চোখ মেলে আরোণের দিকে তাকায়। আরোণ তার দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছে। ক্যাথরিন তাকানোর সাথে সাথেই আরোণ প্রশ্ন করে,
” তুমি কি মনে করছিলে? ”
” কিছু না। ”
আরোণ আবার হাসতে থাকে। ক্যাথরিন নিজের অদ্ভুত ভাবনাসহ আরোণের সামনে ধরা খাওয়াতে নিজের উপরই রাগ হচ্ছিলো। সে আরোণের বুকে ধাক্কা দিয়ে কক্ষে যেতে যেতে বলে,
” অসভ্য কোথাকার। ”
আরোণ পিছন থেকে হাসতে হাসতে বলে,
” নাস্তা করে তৈরি হয়ে নাও। একসঙ্গে নিচে যাবো। ”
জ্ঞান ফিরতেই আনাস্তাসিয়া ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকায়। সম্পূর্ণ অজানা এক জায়গায় নিজেকে আবিষ্কার করে সে। কাঠের তৈরী একটি কুটিরের এক কক্ষের মাঝে শুয়ে আছে সে। কক্ষে কাঠের এবং মাটির তৈরী বিভিন্ন আসবাবপত্র রয়েছে। আনাস্তাসিয়া তার পাশে তাকাতেই দেখতে পায় দুটি মেয়ে তার পাশে বসে আছে। বয়স হয়তো পাঁচ ছয় হবে। আনাস্তাসিয়াকে চোখ মেলতে দেখেই তারা মা মা বলে চিল্লিয়ে কক্ষ থেকে বেরিয়ে যায়। মেয়ে দুটির চিৎকারে আনাস্তাসিয়ার মাথা ব্যাথা শুরু হয়। মাথায় হাত দিয়ে সে বুঝতে পারে মাথায় কোনো কাপড় দিয়ে তার কপালের চারিপাশটা বাধা। গত রাতের কথা মনে পড়তেই তার আবার দম বন্ধ হয়ে আসার উপক্রম হয়। পেট গুলিয়ে বমি পায় তার। মাথা ধরে কোনমতে উঠে বসে সে কাশতে শুরু করে। সাথে সাথে একজন পঁচিশার্ধো বয়সী নারী কক্ষে প্রবেশ করে পানি হাতে। আনাস্তাসিয়ার পাশে বসে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে পানি পান করাতে থাকে। সম্পূর্ণ পানিটুকু শেষ করে আনাস্তাসিয়া শান্ত হয়ে বসতেই সেই যুবতী তাকে প্রশ্ন করে,
” এখন কেমন আছো? ”
আনাস্তাসিয়া বলে,
” মাথায় খুব ব্যাথা করছে। ”
সেই যুবতী মহিলাটি কক্ষের দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকা বাচ্চা দুটির দিকে তাকিয়ে বলে,
” বাচ্চারা তোমাদের আমি চিৎকার চেঁচামেচি করতে মানা করেছিলাম না? দেখলে এখন ওর মাথা ব্যাথা করছে। এক্ষুণি ওর কাছে ক্ষমা চাও। ”
মেয়ে দুটি দরজার আড়াল থেকে বেরিয়ে আসে অপরাধীর মতো মাথা নত করে। আনাস্তাসিয়ার কাছে এসে তার কাছে ক্ষমা চায়। আনাস্তাসিয়া বলে,
” তোমাদের নাম কি? ”
চুল বেণি করা মেয়েটি বলে,
” আমি জুন। ”
চুল খোলা রাখা মেয়েটি উত্তর দেয়,
” আমি জেনি। ”
আনাস্তাসিয়ার পাশে বসা যুবতী মহিলাটি বলে,
” এরা দুজন আমার মেয়ে। জমজ। আমি জোয়ান্দ্রা। ”
আনাস্তাসিয়া হালকা হেসে মেয়ে দুটির দিকে তাকিয়ে বলে,
” আমি আনাস্তাসিয়া। তোমাদের সঙ্গে পরিচয় হয়ে ভালো লাগলো। ”
জুন ভাঙ্গা ভাঙ্গা স্বরে বলে,
” এনাস্তা…? ”
আনাস্তাসিয়া হেসে বলে,
” তোমরা অ্যানা ডাকতে পারো আমাকে। ”
আনাস্তাসিয়া পাশে ফিরে মহিলাটিকে বলে,
” আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। আপনি আমাকে বাঁচিয়েছেন। ”
জোয়ান্দ্রা হেসে বলে,
” আমি নই। আমার স্বামী তোমাকে উদ্ধার করে নিয়ে এসেছে। আমি কেবল তোমার প্রাথমিক চিকিৎসা করেছি। ”
আনাস্তাসিয়া বলে,
” আপনার স্বামী? ”
” তুমি বসো। আমি তাকে ডেকে পাঠাচ্ছি। ”
এই বলে জোয়ান্দ্রা উঠে জুন এবং জেনিকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ে। একটু পরেই কক্ষে জোসেফ প্রবেশ করে। আনাস্তাসিয়া জোসেফকে দেখে অবাক হয়। প্রশ্ন করে,
” জোসেফ তুমি? ”
জোসেফ এগিয়ে এসে তার সামনে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করে,
” এখন কেমন আছো? ”
আনাস্তাসিয়া পাল্টা প্রশ্ন করে,
” এটা তোমার পরিবার? তুমি আমাকে বাঁচিয়েছো? ”
” হ্যাঁ। ”
” তুমি আমাকে কোথায় পেলে? ”
” লেকে। ”
আনাস্তাসিয়ার কাছে ঘাপলা মনে হয়। সে আবার প্রশ্ন করে,
” তুমি সেখানে কি করছিলে? ”
জোসেফ বিরক্ত হয়ে বলে,
” এর থেকে তো ভালো ছিলো তোমার জ্ঞানই না ফিরতো। জ্ঞান ফিরতেই প্রশ্নের ভান্ডার নিয়ে বসেছো। বেঁচে আছো এটা তোমার জন্য যথেষ্ট না? ”
আনাস্তাসিয়া আবার কিছু প্রশ্ন করতে যাবে তার আগেই জোসেফ বলে,
” শুয়ে আরাম করো তুমি। আমি রাতের আগে ফিরবো না। জোয়ান্দ্রা এবং বাচ্চারা বাসায় আছে। আমার মতো ওদের মাথাটাও নষ্ট করো না প্রশ্ন করতে করতে। ”
এটা বলেই জোসেফ কক্ষ থেকে বেরিয়ে সোজা তার বাসার সামনে দাঁড়ানো ফিটনের কাছে যায়। তার মনে পড়ে যায় গত রাতের ঘটনা।
ক্যামিলো দূর্গে পৌঁছানোর পর কাউন্ট রিকার্ডো জোসেফকে সহ জ্যাকসনের পিছু করতে করতে সেই লেকের কাছে পৌঁছায়। আনাস্তাসিয়াকে লেকে ফেলে দিয়ে জ্যাকসন সেখান থেকে প্রস্থান করার পর রিকার্ডো এবং জোসেফ লেকের কাছে যায়। রিকার্ডো ঝড়ের গতিতে গায়ের ক্লক এবং শার্ট খুলে লেকে ঝাপ দেওয়ার জন্য উদ্ধুদ্ধ হতেই জোসেফ মানা করে তাকে। কিন্তু রিকার্ডো তার কথায় পাত্তা না দিয়ে লেকে ঝাপিয়ে পড়ে। এই লেক সম্পর্কে জোসেফ যা শুনেছে তাতে এর কাছে দাঁড়িয়ে থাকতেও তার ভয় করছিলো। তবুও কাউন্টের আদেশ মানতে সে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রয়। কিছুক্ষণ পর রিকার্ডো আনাস্তাসিয়াকে নিয়ে লেকের পারে উঠে আসে। রিকার্ডো আর আনাস্তাসিয়াকে দেখে জোসেফের প্রাণে পানি আসে।
রিকার্ডো আনাস্তাসিয়াকে মাটিতে সোজা করে শুইয়ে দিয়ে দু হাত তার পেটের উপর রেখে চাপ দিয়ে পেটে জমে থাকা পানি বের করে। তারপর আনাস্তাসিয়ার মুখে নিজের মুখের সাহাযে কৃত্রিম অক্সিজেন দেয়। তবুও আনাস্তাসিয়ার হাত পা ঠান্ডা হয়ে থাকায় রিকার্ডো নিজের হাতে আনাস্তাসিয়ার হাত নিয়ে মালিশ করতে থাকে। এসব ঘটনা জোসেফের সামনে ঘটে। রিকার্ডো মৃৃদু স্বরে বার কয়েক ডাকে নাসিয়া বলে। কাউন্ট রিকার্ডোকে এতো বিচলিত দেখে অবাক হয় জোসেফ। এটা তার পরিচিত কাউন্ট রিকার্ডো নয়। যার ভয়ে কোভেন, দাস-দাসী, শত্রু সকলেই কাপে সে কিনা একজন সাধারণ মানবীর জন্য এতো বিচলিত?
রিকার্ডো আনাস্তাসিয়ার মাথা তুলে নিজের কোলে নিতেই সে দেখে আনাস্তাসিয়ার মাথা হতে রক্ত বের হচ্ছে। রিকার্ডো সাথে সাথে নিজের পকেট থেকে একটা রুমাল বের করে জোসেফকে বলে ফিটন নিয়ে আসতে। জোসেফ ফিটন নিয়ে আসতেই রিকার্ডো আনাস্তাসিয়াকে কোলে তুলে ফিটনের পিছনে উঠে বসে। নিজের কোলে আনাস্তাসিয়ার মাথা রেখে রুমাল দিয়ে চেপে ধরে রাখে। যেন রক্তপাত বেশি না হয়। জোসেফ প্রশ্ন করে,
” কোথায় যাবো কাউন্ট? ”
” তোমার বাসায় নিয়ে চলো। ”
জোসেফ এতকিছু ভাবার সময় পায়না। সে তাড়াতাড়ি ফিটনে উঠে বসে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হয়। পুরো রাস্তায় সে আনাস্তাসিয়ার মাথায় রুমাল ধরে ছিলো। মাঝে এক দুবার আনাস্তাসিয়ার হাতের পিঠে আলতো করে ঠোঁট ছোঁয়ায়। জোসেফের বাসার সামনে পৌঁছাতেই রিকার্ডো ফিটন হতে নেমে আনাস্তাসিয়াকে জোসেফের কোলে দিয়ে বলে,
” ওকে তুমি বাঁচিয়েছো। বুঝতে পেরেছো? ”
” জ্বি কাউন্ট। ”
মহাপ্রয়াণ পর্ব ২৯+৩০
” এখন বাসায় প্রবেশ করো আর ওর চিকিৎসার ব্যবস্থা করো। যা প্রয়োজন হয় সব করবে। ”
জোসেফ উপর নিচে মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানাতেই রিকার্ডো ঝড়ের গতিতে সেখান থেকে প্রস্থান করে।
কাল রাতের কথা মনে পড়তেই জোসেফ রিকার্ডোকে নিয়ে ভাবতে থাকে। কাল রাতে সে যাকে দেখেছে সে অন্য কেউ ছিলো। তার কাউন্ট নরম হতে পারেনা। রিকার্ডো কারো পরোয়া করে না। সে এক অনুভূতিশূণ্য বরফের ন্যায়।
সাথে সাথে জোসেফের মন বলে উঠে,
” বরফও কখনো না কখনো গলে পানি হয়। ”
